কিছু মানুষের কাছে বই কেবল পাঠের বস্তু নয়; পৃথিবীকে দেখার এক ধরনের যন্ত্র। তাঁরা বইয়ের পাতায় যা পড়েন, তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন গ্রামের পথ, মানুষের মুখ, রাষ্ট্রের ভাষা, ধর্মের নামে তৈরি বিভাজন, লোকগানের সুর, শ্রেণির সংঘাত, ইতিহাসের বাঁক। যতীন সরকার ছিলেন সেই বিরল গোত্রের মানুষ, যাঁর কাছে সাহিত্য কোনো অলংকারসর্বস্ব নিভৃতচর্চা ছিল না। সাহিত্য ছিল সমাজকে বোঝার উপায়, আবার সমাজকে প্রশ্ন করারও এক অস্ত্র।
১৮ আগস্ট ১৯৩৬ সালে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার চন্দ্রপাড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। প্রায় নয় দশক পরে, ১৩ আগস্ট ২০২৫ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। মাঝখানের দীর্ঘ সময়টুকুতে তিনি শিক্ষকতা করেছেন, লিখেছেন, পড়েছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন, সংস্কৃতি ও সমাজ নিয়ে তর্ক করেছেন; সর্বোপরি বাঙালির চিন্তার জগতে যুক্তি ও ইতিহাসবোধের পক্ষে এক অবিচল উপস্থিতি হয়ে থেকেছেন।
তাঁর পরিচয়ের পাশে অনেক শব্দ বসানো যায়—প্রাবন্ধিক, চিন্তক, লোকসংস্কৃতি গবেষক, সাহিত্যসমালোচক, বক্তা, গবেষক। কিন্তু শব্দের এই সমাবেশও তাঁকে পুরোপুরি ধারণ করে না। কারণ তাঁর আসল কর্মক্ষেত্র ছিল মানুষের চিন্তা। প্রচলিত ধারণাকে তিনি পরীক্ষা করতে চাইতেন ইতিহাসের আলোয়, যুক্তির কষ্টিপাথরে, সমাজের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে। এই পরীক্ষার কাজটিই তাঁর লেখাকে অন্য অনেক প্রাবন্ধিকের লেখা থেকে পৃথক করেছে।
জীবনী এক নজরে
| বিষয় | তথ্য |
| পূর্ণ নাম | যতীন সরকার |
| জন্ম | ১৮ আগস্ট ১৯৩৬ |
| জন্মস্থান | চন্দ্রপাড়া গ্রাম, কেন্দুয়া উপজেলা, নেত্রকোনা জেলা |
| মৃত্যু | ১৩ আগস্ট ২০২৫, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল |
| বয়স | ৮৯ বছর |
| শিক্ষা | আনন্দমোহন কলেজ, ময়মনসিংহ; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় |
| প্রধান পেশা | বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক |
| কর্মস্থল | নাসিরাবাদ কলেজ, ময়মনসিংহ |
| পরিবার | স্ত্রী কানন সরকার |
| অবসর-পরবর্তী নিবাস | কেন্দুয়া, নেত্রকোনায় পৈতৃক বাড়ি ‘বানপ্রস্থ’ |
শিক্ষকতার ঘর থেকে চিন্তার বৃহত্তর প্রান্তর
ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজে বাংলা সাহিত্য পড়িয়েছেন যতীন সরকার চার দশকেরও বেশি সময়—বিয়াল্লিশ বছরের অধিক। শিক্ষকতা তাঁর কাছে কেবল চাকরি ছিল বলে মনে করার কারণ নেই; তাঁর পরবর্তী লেখালেখির প্রকৃতি দেখলেই বোঝা যায়, সাহিত্য পাঠের সঙ্গে সমাজপাঠকে তিনি কখনো আলাদা করে দেখেননি। শ্রেণিকক্ষে যে সাহিত্য, শ্রেণিকক্ষের বাইরে সেই সাহিত্যেরই মানুষ, ইতিহাস, বিশ্বাস, ভাষা ও সংস্কৃতি—এই বৃহত্তর সংযোগ তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে ছিল।
২০০২ সালে অবসর নেওয়ার পর অনেকের মতো শহুরে নাগরিক সুবিধার মধ্যে থেকে যাওয়ার পথ তিনি বেছে নেননি। স্ত্রী কানন সরকারকে নিয়ে ফিরে যান নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় পৈতৃক ভিটায়। বাড়িটির নাম দিয়েছিলেন ‘বানপ্রস্থ’।
নামটির মধ্যে এক ধরনের সচেতন দূরত্ব আছে। কিন্তু যতীন সরকারের বানপ্রস্থ নিঃশব্দ আত্মগোপন ছিল না। কর্মজীবনের প্রতিষ্ঠানগত ব্যস্ততা থেকে দূরে গেলেও চিন্তার জগত থেকে তিনি অবসর নেননি। বরং তাঁর লেখকসত্তাকে বোঝার জন্য এই প্রত্যাবর্তনের ছবিটি তাৎপর্যপূর্ণ। যে মানুষ লোকজীবন, সমাজ ও সংস্কৃতিকে বুঝতে চেয়েছেন, তাঁর শেষ পর্বের বাসস্থানও এসে দাঁড়ায় সেই মাটির কাছাকাছি, যেখান থেকে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল।
প্রবন্ধের ভেতরে সমাজের শরীর
যতীন সরকারের সবচেয়ে বড় পরিচয় খুঁজতে গেলে তাঁর প্রবন্ধসাহিত্যের কাছেই ফিরে যেতে হয়। পাঁচ দশকজুড়ে বিস্তৃত তাঁর রচনার প্রধান শক্তি ছিল দৃষ্টিভঙ্গির ধারাবাহিকতা। তিনি বিষয় বদলেছেন, প্রশ্ন বদলেছে, সময় বদলেছে; কিন্তু ইতিহাস ও সমাজকে দেখার যে বুদ্ধিবৃত্তিক পদ্ধতি তিনি গ্রহণ করেছিলেন, তার ভিত নড়েনি সহজে।
তাঁর প্রথম বই ‘সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা’—শিরোনামটির মধ্যেই যেন তাঁর সাহিত্যভাবনার একটি দরজা খুলে যায়। সাহিত্যকে তিনি শুধু রূপ, ভাষা ও সৌন্দর্যের বিচারে দেখেননি। সাহিত্যের কাছে তাঁর প্রত্যাশা ছিল মানুষের জীবনকে উন্মোচন করা, সমাজের অদৃশ্য সম্পর্কগুলোকে দৃশ্যমান করে তোলা এবং পাঠকের চেতনাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে সে নিজের পরিচিত বাস্তবতাকেও নতুন চোখে দেখতে পারে।
এই কারণেই যতীন সরকারের প্রবন্ধে সাহিত্য প্রায়ই সাহিত্যের সীমানা অতিক্রম করে। কোনো সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি সমাজের ইতিহাসে পৌঁছাতে পারেন; সংস্কৃতি নিয়ে ভাবতে গিয়ে শ্রেণি, বিশ্বাস, রাষ্ট্র বা ভাষার প্রশ্নে যেতে পারেন। তাঁর কাছে কোনো সাংস্কৃতিক ঘটনা শূন্যে জন্ম নেয় না। তার পেছনে থাকে মানুষের উৎপাদনব্যবস্থা, সামাজিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক ক্ষমতা, মানসিক অভ্যাস এবং দীর্ঘ ইতিহাস।
এই দৃষ্টি মূলত তাঁর দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী বিশ্ববীক্ষা থেকে উৎসারিত। কিন্তু তাঁর লেখার গুরুত্ব শুধু এ কারণে নয় যে তিনি একটি নির্দিষ্ট দর্শনের অনুসারী ছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই দর্শনকে তিনি কেমন করে বাংলা সমাজ ও সংস্কৃতির বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ তাঁর কাছে সম্ভবত কেবল কিছু তাত্ত্বিক পরিভাষার সমষ্টি ছিল না; এটি ছিল পরিবর্তনকে বোঝার পদ্ধতি। সমাজ স্থির নয়, সংস্কৃতিও নয়। বিশ্বাস, রুচি, ভাষা, প্রতিষ্ঠান—সবকিছু সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। এবং পরিবর্তনটি ঘটে বিরোধ, সংঘাত, সামাজিক প্রয়োজন ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। যতীন সরকারের লেখায় এই সচেতনতাই বারবার ফিরে আসে।
ফলে তিনি সংস্কৃতিকে কোনো বিশুদ্ধ, সময়ের বাইরে রাখা স্মারক হিসেবে দেখেননি। লোকসংস্কৃতিও তাঁর কাছে জাদুঘরের কাচে বন্দী বস্তু নয়। তার জন্ম আছে, ব্যবহার আছে, সামাজিক ভিত্তি আছে; একই সঙ্গে আছে পরিবর্তনের ইতিহাস।
লোকসংস্কৃতির দিকে তাকানো: মুগ্ধতা নয়, অনুসন্ধান
বাংলা লোকসংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি সহজ বিপদ থাকে—গ্রামকে রোমান্টিক করে দেখা। মাঠ, নদী, গান, মেলা ও লোকবিশ্বাসের মধ্যে এক হারিয়ে যাওয়া শুদ্ধতার ছবি খুঁজে নেওয়া খুব সহজ। যতীন সরকারের লোকসংস্কৃতি-চিন্তার স্বাতন্ত্র্য এখানেই যে তিনি শুধু এই মোহের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি।
লোকসংস্কৃতি তাঁর কাছে মানুষের দীর্ঘ সামাজিক অভিজ্ঞতার দলিল। সেখানে যেমন সৃজনশীলতা আছে, তেমনি আছে ভয় ও অজ্ঞতার ছাপ; যেমন প্রতিবাদ আছে, তেমনি কখনো আত্মসমর্পণের ভাষাও আছে। সমাজ যে দ্বন্দ্বে বাঁচে, সংস্কৃতিও সেই দ্বন্দ্ব বহন করে।
তাই লোকজ সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা তাঁর চোখকে অন্ধ করেনি। বরং সেই ভালোবাসা তাঁকে আরও গভীর প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে—কোন বিশ্বাসের পেছনে কোন সামাজিক অভিজ্ঞতা কাজ করছে? কোন লোকরীতি মানুষের সম্মিলিত জীবনের স্মৃতি বহন করছে? কোন ধারণা মুক্তির, কোনটি আবার শৃঙ্খলের?
এই অনুসন্ধানী অবস্থানই তাঁকে নিছক সংগ্রাহকের চেয়ে আলাদা করে। লোকসংস্কৃতির বিচিত্র উপাদানের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল, কিন্তু সেই উপাদানের অর্থ উদ্ধারের প্রশ্নটি ছিল আরও বড়।
বাংলার গ্রামীণ সমাজকে বুঝতে গেলে মানুষ কীভাবে পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করেছে, দুর্যোগ ও অনিশ্চয়তার সামনে কী ধরনের বিশ্বাস নির্মাণ করেছে, আনন্দ ও বেদনা কোন ভাষায় প্রকাশ করেছে—এসব দেখতে হয়। যতীন সরকারের চিন্তার পরিসরে লোকজীবনের এই বহমান জগৎ তাই কোনো প্রান্তিক বিষয় ছিল না। বরং বাঙালির সামাজিক মনস্তত্ত্ব বোঝার গুরুত্বপূর্ণ পথ।
যুক্তিবাদের প্রতি তাঁর দায়
যতীন সরকারের প্রবন্ধের আরেকটি প্রধান ভিত্তি যুক্তিবাদ। কিন্তু যুক্তিবাদ বলতে তিনি নিছক তর্কে জিতে যাওয়ার কৌশল বোঝাতেন না। তাঁর লেখার বৃহত্তর প্রকৃতি দেখলে বোঝা যায়, মানুষের বিশ্বাসকে বুঝতে হলে তার ঐতিহাসিক ও সামাজিক উৎসও বুঝতে হবে।
এই জায়গায় তাঁর দৃষ্টি ছিল কঠোর, আবার একই সঙ্গে সমাজসচেতন। কোনো কুসংস্কারকে শুধু উপহাস করলেই সেটি দূর হয় না; সেটি কেন মানুষের মনে জন্ম নেয়, কীভাবে টিকে থাকে, কোন সামাজিক অবস্থায় তার প্রয়োজন তৈরি হয়—এই প্রশ্নগুলোও জরুরি। বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে সেই গভীরে যেতে সাহায্য করেছে।
ধর্ম, সমাজ, সংস্কার, রাষ্ট্র বা জাতীয় পরিচয়ের কোনো প্রশ্নই তাঁর কাছে যুক্তির বাইরে নিরাপদ জায়গা পায়নি। এ কারণেই তাঁর চিন্তার সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষতা নিবিড়ভাবে যুক্ত।
তবে তাঁর ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল কেবল রাষ্ট্রীয় নীতির কোনো বিমূর্ত শব্দ নয়। মানুষের পরিচয়কে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না করে ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনের বৃহত্তর সম্পর্কের মধ্যে দেখার চেষ্টা ছিল তার অন্তর্গত শক্তি।
বাংলা সমাজের ইতিহাসে ধর্মীয় পরিচয় যেমন বাস্তব, তেমনি ভাষা, শ্রেণি, অঞ্চল, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও বাস্তব। একটি পরিচয়কে অন্য সব পরিচয়ের ওপরে বসিয়ে দিলে মানুষের জটিল জীবনকে সরলীকৃত করে ফেলা হয়। যতীন সরকারের সমাজবীক্ষা এই সরলীকরণের বিপরীতে দাঁড়ায়।
ভাষা তাঁর কাছে শুধু ব্যাকরণের বিষয় ছিল না
ভাষা নিয়ে তাঁর আগ্রহের একটি উজ্জ্বল নিদর্শন শিশুদের জন্য লেখা ‘গল্পে গল্পে ব্যাকরণ’, যা বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত। ব্যাকরণ সাধারণত শিশুদের কাছে নিয়মের কড়াকড়ি, সংজ্ঞা ও মুখস্থবিদ্যার এক ভীতিকর অঞ্চল। সেই জায়গায় গল্পের মাধ্যমে ভাষার নিয়ম বোঝানোর প্রয়াস যতীন সরকারের শিক্ষকসত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ করে।
এখানে তাঁর প্রাবন্ধিক পরিচয়ের সঙ্গে শিক্ষক পরিচয়টি এসে মিলে যায়। ভাষাকে তিনি শুধু শুদ্ধ-অশুদ্ধের পুলিশি ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ করেননি; ভাষা মানুষ কীভাবে ব্যবহার করে, কীভাবে শেখে, কীভাবে চিন্তা প্রকাশ করে—সেই জীবন্ত সম্পর্কটিও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ভাষা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থা নয়। একটি জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা, ইতিহাস ও সামাজিক সম্পর্ক ভাষার মধ্যে জমা থাকে। আবার ভাষার পরিবর্তনও সমাজের পরিবর্তনের সাক্ষ্য বহন করে। যে চিন্তক সমাজ ও সংস্কৃতিকে দ্বান্দ্বিকভাবে দেখেন, তাঁর পক্ষে ভাষাকে স্থির কোনো পাথরের ফলক হিসেবে দেখা সম্ভব নয়।
ইতিহাসের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের বানানো কাহিনি
যতীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর মধ্যে ‘পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু দর্শন’ বিশেষভাবে স্মরণীয়। ২০০৫ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থ পরে বাংলা ১৪১১ সালের প্রথম আলো বর্ষসেরা গ্রন্থ পুরস্কার পায়, যার পুরস্কারবর্ষ ২০০৬।
বইটির নামেই দুটি শব্দ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে—জন্ম ও মৃত্যু। রাষ্ট্রের জন্মকে আমরা সাধারণত রাজনৈতিক ঘটনারূপে দেখি; কিন্তু যতীন সরকারের দৃষ্টিতে রাজনৈতিক ঘটনার পাশাপাশি তার পেছনের ধারণা, সমাজের দ্বন্দ্ব এবং ইতিহাসের গতিও গুরুত্বপূর্ণ।
এই বইয়ের তাৎপর্য এখানেই যে পাকিস্তানকে একটি প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে দেখলেই তার জন্ম ও বিলয়ের গভীর কারণ বোঝা যায় না। রাষ্ট্রের পেছনে থাকা দর্শন, পরিচয়ের নির্মাণ এবং বাস্তব সমাজের ভেতরের অসামঞ্জস্যের দিকেও তাকাতে হয়।
যতীন সরকারের দ্বান্দ্বিক দৃষ্টি এমন প্রশ্নকে স্বভাবতই আকর্ষণ করেছিল। কারণ কোনো রাষ্ট্রীয় মতাদর্শ নিজেকে যতই চূড়ান্ত বলে উপস্থাপন করুক, সমাজের বাস্তব দ্বন্দ্ব তার মধ্যে কাজ করতে থাকে। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সেই দ্বন্দ্বের হিসাব নেয়।
এ ধরনের বিশ্লেষণ তাঁর লেখাকে নিছক ঘটনাবিবরণ থেকে পৃথক করে। তিনি তথ্যের ওপর একটি চিন্তার কাঠামো নির্মাণ করেন; আবার সেই কাঠামোকে বাস্তবতা দিয়ে পরীক্ষা করেন। এ কারণেই তাঁর প্রবন্ধে পাঠক শুধু ‘কী ঘটেছিল’ জানতে যায় না, বরং ‘কেন ঘটেছিল’—এই অস্বস্তিকর কিন্তু জরুরি প্রশ্নটির মুখোমুখি হয়।
‘শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ’ থেকে রচনাসমগ্র: দীর্ঘ চিন্তার মানচিত্র
তাঁর নির্বাচিত প্রবন্ধের সংকলন ‘শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ’ এবং ছয় খণ্ডে প্রকাশিত ‘যতীন সরকার রচনাসমগ্র’ তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যজীবনের বিস্তার বুঝতে সাহায্য করে। পাঁচ দশক ধরে একজন চিন্তক একই সমাজকে দেখছেন—কিন্তু সমাজ এক নেই, রাষ্ট্র এক নেই, রাজনৈতিক ভাষা এক নেই, পাঠকের অভিজ্ঞতাও এক নেই। ফলে এই দীর্ঘ রচনাযাত্রা একই সঙ্গে বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের একটি চিন্তামূলক মানচিত্র হয়ে ওঠে।
যতীন সরকারের লেখার সবচেয়ে মূল্যবান বৈশিষ্ট্য সম্ভবত তাঁর প্রশ্ন করার অভ্যাস। কোনো ধারণা প্রচলিত বলেই সত্য নয়; কোনো বিশ্বাস পুরোনো বলেই পবিত্র নয়; আবার কোনো আধুনিক ধারণা নতুন বলেই প্রগতিশীল নয়। প্রত্যেকটি বিষয়কেই তার সামাজিক ফল, ঐতিহাসিক উৎস ও মানবিক তাৎপর্যের মধ্যে বিচার করতে হয়।
এই জায়গায় সাহিত্যসমালোচক যতীন সরকার ও সমাজচিন্তক যতীন সরকারকে আলাদা করা কঠিন। তিনি সাহিত্যের রূপ নিয়ে ভাবেন, কিন্তু তার পেছনের সমাজ ভুলে যান না। সংস্কৃতিকে মূল্যায়ন করেন, কিন্তু শ্রেণি ও ইতিহাসকে বাইরে রাখেন না। যুক্তির কথা বলেন, কিন্তু মানুষ যে ইতিহাসের মধ্যে তৈরি হয়, সেটিও মনে রাখেন।
এই ভারসাম্যের কারণেই তাঁর লেখায় এক ধরনের বৌদ্ধিক সততা দেখা যায়। তিনি এমন এক বাঙালি যুক্তিবাদের প্রতিনিধি, যে নিজের সংস্কৃতিকে ভালোবাসে, কিন্তু তাকে প্রশ্ন করতে ভয় পায় না।
রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সংগঠনের পরিসর
যতীন সরকারের বাম ও প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক তাঁর চিন্তার স্বাভাবিক সম্প্রসারণ। তিনি সমাজকে বৈষম্য, শ্রেণিসম্পর্ক ও ক্ষমতার কাঠামোর মধ্য দিয়ে দেখতেন। ফলে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান তাঁর সাহিত্যচিন্তা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো পরিচয় ছিল না।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি হিসেবে তিনি দুই মেয়াদ দায়িত্ব পালন করেছেন। এই দায়িত্ব তাঁর সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর কাছে সংস্কৃতি শুধু মঞ্চের গান বা শিল্পের আনন্দ ছিল না; সংস্কৃতি মানুষের সামাজিক চেতনার অংশ। তাই সাংস্কৃতিক সংগঠনও ছিল মানুষের মুক্তচিন্তা ও প্রগতিশীল মূল্যবোধ গঠনের একটি ক্ষেত্র।
তবে তাঁকে শুধু রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে দেখলে তাঁর বৌদ্ধিক ব্যাপ্তি ছোট হয়ে যায়। তাঁর রাজনীতি ছিল তাঁর সমাজবীক্ষার একটি অঙ্গ; তাঁর প্রধান শক্তি ছিল সেই সমাজবীক্ষাকে ভাষা দেওয়া।
কর্মজীবন ও অর্জন এক নজরে
| ক্ষেত্র | তথ্য |
| শিক্ষকতা | নাসিরাবাদ কলেজ, ময়মনসিংহে বাংলা সাহিত্য; ৪২ বছরেরও বেশি সময় |
| অবসর | ২০০২ |
| সাংস্কৃতিক দায়িত্ব | বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি, দুই মেয়াদ |
| প্রধান সাহিত্যিক পরিচয় | প্রাবন্ধিক, চিন্তক, লোকসংস্কৃতি গবেষক, সাহিত্যসমালোচক, বক্তা ও গবেষক |
| বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার | ২০০৭/০৮ |
| স্বাধীনতা পুরস্কার | ২০১০ |
| ড. মোহাম্মদ এনামুল হক স্বর্ণপদক | বাংলা একাডেমি |
| প্রথম আলো বর্ষসেরা গ্রন্থ পুরস্কার | বাংলা ১৪১১ / ২০০৬; ‘পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু দর্শন’-এর জন্য |
| অন্যান্য সম্মাননা | খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার; মনিরুদ্দীন ইউসুফ সাহিত্য পুরস্কার |
স্বাধীনতা পুরস্কার ও বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের মতো রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি তাঁর দীর্ঘ চিন্তাচর্চার গুরুত্বকেই প্রকাশ করে। তবে যতীন সরকারের মূল্য শুধু পুরস্কারের তালিকা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। পুরস্কার একজন লেখকের কাজকে চিহ্নিত করতে পারে; কাজটির গভীরতা তৈরি হয় পাঠক, সময় ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাবের মধ্যে।
প্রয়াত বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান তাঁকে তাঁর প্রজন্মের অন্যতম তীক্ষ্ণ পণ্ডিত এবং সমাজ ও সংস্কৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার হিসেবে মূল্যায়ন করেছিলেন। এই মূল্যায়ন যথার্থ মনে হয়, কারণ যতীন সরকারের রচনায় পাণ্ডিত্য কখনো প্রদর্শনের বস্তু হয়ে ওঠেনি; বরং তা সমাজকে ব্যাখ্যা করার উপকরণ হয়েছে।
তাঁকে ঘিরে প্রকাশিত ‘নব্বইয়ের পথে যতীন সরকার’, স্বপন ধরের সম্পাদনায়, সেই স্বীকৃতির আরেকটি নিদর্শন। আনিসুজ্জামান, কবীর চৌধুরী, সেলিনা হোসেনসহ বিশিষ্ট লেখকদের শ্রদ্ধালেখা সেখানে স্থান পেয়েছে। একজন লেখকের দীর্ঘ জীবনকে বোঝার একটি উপায় তাঁর নিজের লেখা; আরেকটি উপায় সমকাল ও উত্তরসূরিরা তাঁকে কীভাবে পাঠ করছেন, তা দেখা। এই সংকলন দ্বিতীয় পথটিরই একটি দলিল।
তিনি যে প্রশ্নগুলো রেখে গেলেন
যতীন সরকারের জীবনকে কেবল একজন সফল প্রাবন্ধিকের জীবন বললে সবচেয়ে জরুরি কথাটি বলা হয় না। তাঁর কাজের গভীরে ছিল এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশাসন—বিশ্বাস করার আগে প্রশ্ন করা, ভালোবাসার সঙ্গে সমালোচনার দূরত্ব রাখা, ইতিহাসকে আবেগের কাছে বন্ধক না দেওয়া।
আমাদের সমাজে ‘ঐতিহ্য’ শব্দটি কখনো কখনো এমনভাবে উচ্চারিত হয়, যেন অতীতের সবকিছুই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। আবার ‘আধুনিকতা’ শব্দটিও কখনো এমন এক আত্মম্ভরিতায় ব্যবহৃত হয়, যেন নতুন মানেই ভালো। যতীন সরকারের চিন্তাপদ্ধতি এই দুই সরলতার বিরুদ্ধেই সতর্ক করে।
লোকসংস্কৃতিকে জানতে হবে, কারণ সেখানে মানুষের বহু শতকের অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু তার সব উপাদানকে অন্ধভাবে মহিমান্বিত করার প্রয়োজন নেই। ধর্মীয় বিশ্বাসের সামাজিক গুরুত্ব বুঝতে হবে, কিন্তু সেই বিশ্বাসকে যুক্তির বাইরে রাখা যাবে না। জাতীয় ইতিহাসকে ভালোবাসতে হবে, কিন্তু রাষ্ট্রের তৈরি সুবিধাজনক কাহিনি দিয়ে ইতিহাসের জটিলতা ঢেকে দেওয়া চলবে না। সাহিত্যকে সৌন্দর্যের জন্য পড়তে হবে, একই সঙ্গে দেখতে হবে সেই সৌন্দর্যের ভেতরে কোন মানুষ কথা বলছে, কোন মানুষের কণ্ঠ অনুপস্থিত।
এ ধরনের প্রশ্নের কোনো দ্রুত উত্তর নেই। যতীন সরকারের লেখার স্থায়িত্বও সম্ভবত এখানেই—তিনি পাঠককে প্রস্তুত উত্তর দেওয়ার চেয়ে উত্তর তৈরির পদ্ধতির দিকে নিয়ে যান।
তাঁর দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী অবস্থানের সঙ্গে সবাই একমত হবেন, এমন নয়। একজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তকের মূল্যও সর্বসম্মত হওয়ার মধ্যে নয়। বরং তিনি এমন কিছু প্রশ্ন তৈরি করতে পারেন কি না, যা ভিন্নমতের মানুষকেও নিজের অবস্থান নতুন করে পরীক্ষা করতে বাধ্য করে—সেটিই বড় কথা।
যতীন সরকার সেই ধরনের প্রশ্ন রেখে গেছেন।
তাঁর মৃত্যুতে বাংলা প্রবন্ধসাহিত্য একজন লেখককে হারিয়েছে, কিন্তু শুধু এটুকু বললে ছবিটি অসম্পূর্ণ থাকবে। হারিয়েছে এমন একজন পাঠককেও, যিনি নিজের সমাজকে অবিরাম পড়ে গেছেন—কখনো লোকসংস্কৃতির বর্ণমালা দিয়ে, কখনো ইতিহাসের দীর্ঘ বাক্য দিয়ে, কখনো সাহিত্যের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত দিয়ে।
এখন তাঁর ছয় খণ্ডের রচনাসমগ্র, তাঁর প্রবন্ধ, তাঁর ভাষা ও সমাজবীক্ষা নতুন পাঠকের হাতে যাবে। ভবিষ্যতের কোনো তরুণ হয়তো সেই বই খুলে তাঁর সব সিদ্ধান্ত মেনে নেবে না। বরং প্রশ্ন তুলবে। কোনো যুক্তির সঙ্গে দ্বিমত করবে। কোনো ব্যাখ্যার সামনে আরেকটি ব্যাখ্যা দাঁড় করাবে।
সেখানেই যতীন সরকারের সবচেয়ে যথার্থ উত্তরাধিকার।



