বিছানায় শুয়েই ফোন থেকে ঘরের আলো বন্ধ করলেন। অফিসে বসে মোবাইলে দেখে নিলেন, বাসার দরজার সামনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে কি না। হাতে থাকা ফিটনেস ব্যান্ড জানিয়ে দিল আজ কতটা হাঁটলেন। আবার শহরের কোনো সড়কে যানবাহনের চাপ বুঝে ট্রাফিক সিগন্যালের সময় বদলে যাচ্ছে।
ঘটনাগুলো আলাদা মনে হলেও এগুলোর পেছনে একটি সাধারণ প্রযুক্তিগত ধারণা কাজ করছে—ইন্টারনেট অব থিংস (Internet of Things) বা আইওটি (IoT)।
সহজ করে বললে, আমাদের চারপাশের বিভিন্ন বাস্তব যন্ত্র বা বস্তুতে সেন্সর, সফটওয়্যার ও নেটওয়ার্ক সংযোগ (network connectivity) যোগ করে সেগুলোকে তথ্য সংগ্রহ, তথ্য আদান-প্রদান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করার সক্ষমতা দেওয়াই আইওটির মূল ধারণা।
স্মার্ট হোম থেকে স্মার্ট সিটি, কৃষিজমি থেকে কারখানা—সব জায়গাতেই একই ধারণা ভিন্ন ভিন্নভাবে কাজে লাগানো যায়। আসলে আমরা অনেকেই প্রতিদিন আইওটি প্রযুক্তি ব্যবহার করছি, শুধু সব সময় নামটা আলাদা করে ভাবছি না।
ইন্টারনেট অব থিংস বা আইওটি আসলে কী?
ইন্টারনেট অব থিংস বলতে এমন সব বাস্তব যন্ত্র, বস্তু ও ব্যবস্থার সমষ্টিকে বোঝায়, যেগুলো সেন্সর, সফটওয়্যার এবং যোগাযোগব্যবস্থার সাহায্যে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, অন্য যন্ত্র বা ব্যবস্থার সঙ্গে সেই তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে মানুষের প্রতিবার সরাসরি নির্দেশ ছাড়াই নির্দিষ্ট কাজ করতে পারে।
এখানে “থিংস” বলতে শুধু কম্পিউটার বা স্মার্টফোন বোঝানো হচ্ছে না।
একটি বৈদ্যুতিক বাতি, দরজার তালা, নিরাপত্তা ক্যামেরা, বিদ্যুৎ মিটার, হাতঘড়ি, গাড়ির সেন্সর কিংবা কারখানার কোনো যন্ত্র—সবকিছুই প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি যুক্ত হলে আইওটির অংশ হতে পারে।
ধরা যাক, ঘরে একটি সাধারণ বৈদ্যুতিক বাতি আছে। সুইচ চাপলে সেটি জ্বলে, আবার সুইচ বন্ধ করলে নিভে যায়। এটিকে আইওটি যন্ত্র বলা যাবে না।
কিন্তু সেই বাতি যদি ওয়াই-ফাইয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে, মোবাইল অ্যাপ থেকে নির্দেশ নিতে পারে, নির্দিষ্ট সময়ে নিজে থেকে জ্বলে বা নিভে যায় কিংবা ঘরে কেউ ঢুকেছে কি না তা বুঝে আলো জ্বালাতে পারে, তখন সেটি একটি সংযুক্ত স্মার্ট যন্ত্রে পরিণত হয়।
আইওটির মূল পার্থক্য এখানেই। একটি যন্ত্র শুধু নিজের কাজ করছে না; এটি চারপাশের অবস্থা বুঝছে, তথ্য পাঠাচ্ছে, কখনো অন্য যন্ত্রের কাছ থেকে তথ্য নিচ্ছে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করছে।
“ইন্টারনেট অব থিংস” নামটি কোথা থেকে এল?
“ইন্টারনেট অব থিংস” শব্দবন্ধটির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যে নামটি জড়িয়ে আছে, তিনি ব্রিটিশ প্রযুক্তিবিদ কেভিন অ্যাশটন (Kevin Ashton)।
সাধারণভাবে মনে করা হয়, ১৯৯৯ সালের দিকে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন বা আরএফআইডি (RFID) এবং পণ্য সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে কাজ করার সময় তিনি “Internet of Things” কথাটি ব্যবহার করেছিলেন।
কেভিন অ্যাশটন পরে নিজেও উল্লেখ করেন যে, যতদূর তাঁর মনে পড়ে, ১৯৯৯ সালে প্রোক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বলের জন্য তৈরি একটি উপস্থাপনায় তিনি এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছিলেন।
তবে আইওটির ইতিহাসকে একটি নির্দিষ্ট উপস্থাপনা বা একটি ঘটনার মধ্যেই আটকে দেখা ঠিক হবে না। মূল ধারণাটি হলো—কম্পিউটারে মানুষ নিজে তথ্য লিখে দেওয়ার বদলে বাস্তব জগতের বস্তু ও সেন্সর যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।
পরবর্তী সময়ে ছোট সেন্সর, দ্রুতগতির বেতার যোগাযোগ, ক্লাউডভিত্তিক সেবা এবং কম বিদ্যুৎ খরচের প্রসেসর সহজলভ্য হওয়ায় আইওটির ব্যবহার দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে।
আইওটি যন্ত্র আসলে কীভাবে কাজ করে?
একটি স্মার্ট বাতি বা স্মার্ট দরজার তালা বাইরে থেকে যতটা আধুনিক মনে হোক, এর কাজের মূল ধাপগুলো বেশ সহজ।
ধরা যাক, একটি ঘরে চলাচল শনাক্ত করার সেন্সর আছে। কেউ ঘরে ঢুকলে সেন্সরটি তা বুঝল। সেই তথ্য সংযোগব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় পৌঁছাল। আগে থেকেই ঠিক করা নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা সিদ্ধান্ত নিল, ঘরে কেউ ঢুকলে আলো জ্বালাতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে বাতির কাছে নির্দেশ গেল এবং আলো জ্বলে উঠল।
অর্থাৎ একটি সাধারণ আইওটি ব্যবস্থায় মূলত চারটি বিষয় থাকে—তথ্য সংগ্রহ, সংযোগ, তথ্য বিশ্লেষণ এবং কাজ।
১. সেন্সর চারপাশের অবস্থা বুঝতে সাহায্য করে
সেন্সরকে আইওটি ব্যবস্থার চোখ-কান বলা যায়।
প্রয়োজন অনুযায়ী সেন্সর তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, আলো, নড়াচড়া, অবস্থান, চাপ, শব্দ, পানির প্রবাহ বা অন্য কোনো বাস্তব অবস্থা শনাক্ত করতে পারে।
নিরাপত্তা ক্যামেরা ছবি ও ভিডিও ধারণ করে। ফিটনেস ব্যান্ড শরীরের নড়াচড়া এবং যন্ত্রভেদে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সংকেত শনাক্ত করতে পারে। স্মার্ট থার্মোস্ট্যাট ঘরের তাপমাত্রা মাপে।
২. সংযোগব্যবস্থা তথ্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেয়
সেন্সর তথ্য সংগ্রহ করলেই কাজ শেষ নয়। সেই তথ্য কোনো নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, অ্যাপ, স্থানীয় কেন্দ্র বা সার্ভারে পৌঁছাতে হয়।
এ জন্য ওয়াই-ফাই, ব্লুটুথ, মোবাইল নেটওয়ার্ক, ইথারনেট, জিগবি কিংবা অন্য কোনো বেতার প্রযুক্তি ব্যবহার হতে পারে।
সব আইওটি যন্ত্র যে সরাসরি ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত থাকবে, এমনও নয়। অনেক ক্ষেত্রে একটি যন্ত্র প্রথমে স্থানীয় কেন্দ্র বা গেটওয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য অন্য জায়গায় পাঠানো হয়।
৩. সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়
তথ্য পৌঁছানোর পর ব্যবস্থা বুঝতে চেষ্টা করে, সেই তথ্যের অর্থ কী এবং এখন কী করা দরকার।
কিছু ক্ষেত্রে তথ্য দূরের ক্লাউড সার্ভারে বিশ্লেষণ করা হয়। আবার দ্রুত সিদ্ধান্ত দরকার হলে যন্ত্রের ভেতরেই বা কাছাকাছি কোনো নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় তা বিশ্লেষণ হতে পারে।
যেমন, নিরাপত্তা ব্যবস্থার সেন্সর অস্বাভাবিকভাবে দরজা খোলার সংকেত পেলে সঙ্গে সঙ্গে সতর্কসংকেত চালু করতে পারে। এর জন্য প্রতিবার দূরের কোনো সার্ভারের উত্তর অপেক্ষা করা সব সময় প্রয়োজন হয় না।
৪. এরপর কোনো কাজ বা ফলাফল দেখা যায়
সবশেষে ব্যবস্থা পাওয়া তথ্য অনুযায়ী কিছু করে।
আলো জ্বলে উঠতে পারে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্রের তাপমাত্রা বদলে যেতে পারে, ফোনে সতর্কবার্তা আসতে পারে কিংবা কোনো নিয়ন্ত্রণপর্দায় তথ্য দেখা যেতে পারে।
| মূল উপাদান | কাজ |
| সেন্সর | তাপমাত্রা, নড়াচড়া, আলো, অবস্থান, চাপসহ চারপাশের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে |
| সংযোগব্যবস্থা | ওয়াই-ফাই, ব্লুটুথ, মোবাইল নেটওয়ার্ক বা অন্য মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান করে |
| তথ্য বিশ্লেষণ | পাওয়া তথ্য দেখে কী করা প্রয়োজন তা নির্ধারণ করে |
| কাজ বা ফলাফল | যন্ত্র চালু-বন্দ করা, সেটিং বদলানো, সতর্কবার্তা পাঠানো বা তথ্য দেখানোর মতো কাজ করে |
স্মার্ট হোমে আইওটির ব্যবহার কোথায় দেখা যায়?
আইওটি বোঝার সবচেয়ে সহজ জায়গা নিজের ঘর। কারণ স্মার্ট হোমে ব্যবহৃত অনেক যন্ত্রের কাজ আমরা সরাসরি দেখতে পাই।
স্মার্ট থার্মোস্ট্যাট
স্মার্ট থার্মোস্ট্যাট ঘরের তাপমাত্রা মাপে এবং ঘর গরম বা ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
কিছু যন্ত্র সময়সূচি, ঘরে মানুষের উপস্থিতি বা ব্যবহারকারীর পছন্দ অনুযায়ী তাপমাত্রা সামঞ্জস্য করতে পারে।
ফলে প্রতিবার গিয়ে হাতে তাপমাত্রা বদলাতে হয় না। প্রয়োজন না থাকলেও দীর্ঘ সময় শীতাতপ বা ঘর গরম রাখার ব্যবস্থা চালু থাকার মতো অপচয় কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
স্মার্ট আলো
স্মার্ট বাতি বা আলোর ব্যবস্থা মোবাইল অ্যাপ, কণ্ঠনির্দেশ, সময়সূচি কিংবা নড়াচড়া শনাক্তকারী সেন্সরের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
ধরা যাক, রাতে করিডরে কেউ ঢুকলেই আলো জ্বলে উঠল। কয়েক মিনিট কোনো নড়াচড়া না থাকলে সেটি আবার নিজে থেকে নিভে গেল।
এখানে সেন্সর, স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ এবং সংযুক্ত বাতি—তিনটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করছে।
স্মার্ট প্লাগ
দেখতে সাধারণ প্লাগের মতো হলেও স্মার্ট প্লাগ আসলে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য একটি বৈদ্যুতিক সুইচ।
এর সঙ্গে বাতি, পাখা বা উপযুক্ত অন্য কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র যুক্ত করলে ফোন থেকে সেটি চালু বা বন্ধ করা যায়। অনেক স্মার্ট প্লাগে নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে দেওয়ার সুবিধা থাকে। কিছু যন্ত্র বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্যও দেখাতে পারে।
স্মার্ট দরজার তালা
স্মার্ট তালায় প্রচলিত চাবির পাশাপাশি যন্ত্রভেদে মোবাইল অ্যাপ, পিন নম্বর, কার্ড, আঙুলের ছাপ বা অন্য কোনো ডিজিটাল পদ্ধতিতে দরজা খোলার সুবিধা থাকতে পারে।
কিছু স্মার্ট তালা দরজা বন্ধ আছে কি না তা দূর থেকে জানাতে পারে। আবার দরজা খোলা হলে ফোনে বার্তাও পাঠাতে পারে।
তবে এমন যন্ত্র ব্যবহারের আগে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সফটওয়্যার হালনাগাদ এবং জরুরি অবস্থায় বিকল্পভাবে দরজা খোলার উপায় সম্পর্কে জানা দরকার।
নিরাপত্তা ক্যামেরা ও স্মার্ট ডোরবেল
সংযুক্ত নিরাপত্তা ক্যামেরা ভিডিও ধারণ করতে পারে, নড়াচড়া শনাক্ত করতে পারে এবং প্রয়োজন হলে ফোনে সতর্কবার্তা পাঠাতে পারে।
স্মার্ট ডোরবেলে ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন থাকলে বাড়ির বাইরে থেকেও দরজায় আসা ব্যক্তিকে দেখা বা তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হতে পারে।
তবে সুবিধার পাশাপাশি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টি এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। ক্যামেরা কোথায় বসানো হয়েছে, ধারণ করা ভিডিও কোথায় রাখা হচ্ছে এবং কারা সেগুলো দেখতে পারে—এসব প্রশ্ন আগে থেকেই ভাবা দরকার।
ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট ও স্মার্ট স্পিকার
স্মার্ট স্পিকার অনেক বাড়িতে বিভিন্ন স্মার্ট যন্ত্র নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
কণ্ঠনির্দেশ দিয়ে সমর্থিত বাতি, প্লাগ, থার্মোস্ট্যাট বা অন্য যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
তবে স্মার্ট স্পিকার নিজে পুরো আইওটি ব্যবস্থা নয়। এর আসল সুবিধা দেখা যায় যখন এটি বাড়ির অন্য সংযুক্ত যন্ত্র ও সেবার সঙ্গে একযোগে কাজ করে।
ফিটনেস ব্যান্ড ও পরিধানযোগ্য স্মার্ট যন্ত্র
হাতে থাকা ফিটনেস ব্যান্ডও আইওটির পরিচিত উদাহরণ।
এর সেন্সর হাঁটা, নড়াচড়া এবং যন্ত্রভেদে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য বা শরীরসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। পরে সেই তথ্য ফোনের অ্যাপ বা সংশ্লিষ্ট সেবায় দেখা যায়।
এখানে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি বাতি কখন জ্বলেছে সেই তথ্যের তুলনায় শরীর বা স্বাস্থ্যের তথ্য অনেক বেশি সংবেদনশীল।
স্মার্ট বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির মিটার
সংযুক্ত মিটার নির্দিষ্ট সময় পরপর বিদ্যুৎ, গ্যাস বা পানির ব্যবহারসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও পাঠাতে পারে।
এতে হাতে গিয়ে মিটার পড়ার প্রয়োজন কমতে পারে। একই সঙ্গে কোন সময়ে কতটা সম্পদ ব্যবহার হচ্ছে, সে সম্পর্কেও আরও বিস্তারিত ধারণা পাওয়া যায়।
| যন্ত্র | এটি কী করে |
| স্মার্ট থার্মোস্ট্যাট | ঘরের তাপমাত্রা মাপে এবং গরম বা ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে |
| স্মার্ট আলো | অ্যাপ, সময়সূচি বা সেন্সরের তথ্য অনুযায়ী আলো নিয়ন্ত্রণ করে |
| স্মার্ট প্লাগ | বৈদ্যুতিক যন্ত্র দূর থেকে বা নির্ধারিত সময়ে চালু-বন্দ করতে সাহায্য করে |
| স্মার্ট দরজার তালা | ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রবেশের সুযোগ দেয় এবং কিছু ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা পাঠায় |
| নিরাপত্তা ক্যামেরা ও ডোরবেল | ভিডিও ধারণ, নড়াচড়া শনাক্ত এবং দূর থেকে নজরদারির সুবিধা দেয় |
| স্মার্ট স্পিকার | কণ্ঠনির্দেশের মাধ্যমে অন্য সংযুক্ত যন্ত্র নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে |
| ফিটনেস ব্যান্ড | চলাফেরা ও অন্যান্য শারীরিক তথ্য সংগ্রহ করে |
| স্মার্ট মিটার | বিদ্যুৎ, পানি বা গ্যাস ব্যবহারের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংগ্রহ করতে পারে |
স্মার্ট সিটিতে আইওটি কীভাবে কাজে লাগে?
একটি বাড়িতে কয়েকটি সেন্সরের কাজ বোঝা সহজ। কিন্তু একই ধারণা যখন একটি শহরের সড়ক, আলো, পানি, বিদ্যুৎ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণে ব্যবহার করা হয়, তখন সেটিই স্মার্ট সিটি প্রযুক্তির অংশ হয়ে ওঠে।
স্মার্ট সিটিতে আইওটির মূল কাজ হলো শহরের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করা এবং সেই তথ্য ব্যবহার করে বিভিন্ন সেবা আরও ভালোভাবে পরিচালনা করা।
যানবাহনের চাপ বুঝে ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ
প্রচলিত ট্রাফিক সিগন্যাল অনেক সময় আগে থেকে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী চলে।
কিন্তু রাস্তার যানবাহনের সংখ্যা, চলাচলের গতি বা যানজটের অবস্থা সেন্সর বা ক্যামেরার মাধ্যমে জানা গেলে সেই তথ্য অনুযায়ী সিগন্যালের সময় কিছুটা সামঞ্জস্য করা সম্ভব।
ধরা যাক, একটি রাস্তায় গাড়ির চাপ অনেক বেশি, অথচ পাশের রাস্তাটি প্রায় ফাঁকা। তথ্যভিত্তিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এই পার্থক্য বুঝে সিগন্যালের সময় পরিবর্তন করতে পারে।
তবে শুধু সেন্সর বসালেই যানজটের সমাধান হয়ে যায় না। সড়কের নকশা, গণপরিবহন, আইন প্রয়োগ, পথচারীর চলাচল এবং সামগ্রিক পরিবহনব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
স্মার্ট সড়কবাতি
সড়কবাতির সঙ্গে আলো বা মানুষের উপস্থিতি শনাক্ত করার সেন্সর যুক্ত করা যায়।
দিনের আলো থাকলে বাতি বন্ধ রাখা, গভীর রাতে প্রয়োজন অনুযায়ী উজ্জ্বলতা কমানো কিংবা কোনো বাতি নষ্ট হলে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় খবর পাঠানো—এসবই স্মার্ট সড়কবাতির ব্যবহার হতে পারে।
এতে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা সহজ হওয়ার পাশাপাশি নষ্ট বাতি শনাক্ত করতেও কম সময় লাগতে পারে।
বর্জ্যের পাত্রে সেন্সর
কোনো ময়লার পাত্র কতটা ভর্তি হয়েছে, তা সেন্সরের মাধ্যমে জানা গেলে বর্জ্য সংগ্রহের গাড়ির পথ আরও প্রয়োজনভিত্তিকভাবে ঠিক করা সম্ভব।
যে পাত্র এখনো প্রায় খালি, সেখানে প্রতিদিন গাড়ি পাঠানোর প্রয়োজন নাও হতে পারে। অন্যদিকে যে এলাকায় পাত্র দ্রুত ভরে যায়, সেটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া যায়।
তবে বাস্তবে এ ধরনের ব্যবস্থা ভালোভাবে চালাতে সেন্সর রক্ষণাবেক্ষণ, যোগাযোগব্যবস্থা এবং বর্জ্য সংগ্রহের পর্যাপ্ত সক্ষমতা প্রয়োজন।
স্মার্ট পার্কিং
পার্কিং এলাকায় সেন্সর বা ক্যামেরার মাধ্যমে কোনো জায়গা খালি আছে কি না শনাক্ত করা যায়।
সেই তথ্য মোবাইল অ্যাপ, রাস্তার পাশে থাকা প্রদর্শনপর্দা বা পার্কিং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় দেখানো হলে চালকেরা তুলনামূলক দ্রুত খালি জায়গা খুঁজে পেতে পারেন।
এতে শুধু সময়ই বাঁচে না, পার্কিং খুঁজতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ঘোরাঘুরিও কমতে পারে।
বায়ুর মান ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণ
শহরের বিভিন্ন জায়গায় পরিবেশ পর্যবেক্ষণের সেন্সর বসিয়ে বায়ুর মান, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, শব্দ কিংবা অন্য পরিবেশগত তথ্য সংগ্রহ করা যায়।
একটি মাত্র সেন্সর দিয়ে পুরো শহরের অবস্থা বোঝা সম্ভব নয়। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন জায়গা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা গেলে সময় ও এলাকাভেদে পরিবেশের পরিবর্তন সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যায়।
পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার পর্যবেক্ষণ
সংযুক্ত মিটার, পানির প্রবাহ মাপার যন্ত্র বা চাপ শনাক্তকারী সেন্সর ব্যবহার করে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যায়।
কোনো এলাকায় পানির প্রবাহ হঠাৎ অস্বাভাবিক হলে সেখানে পাইপে ফুটো আছে কি না তা খুঁজে দেখার প্রয়োজন হতে পারে।
একইভাবে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ব্যবহার বা যন্ত্রপাতির অবস্থায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন ধরা পড়লে সমস্যাটি বড় হওয়ার আগেই পরীক্ষা করার সুযোগ তৈরি হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এসব প্রযুক্তির সম্ভাবনা আছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট শহরে কোন ব্যবস্থা কতটা চালু রয়েছে, তা যাচাই ছাড়া ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। বিশ্বের বিভিন্ন শহরে স্মার্ট সিটি প্রযুক্তির নানা রূপ ব্যবহৃত হচ্ছে, আর উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও এমন প্রযুক্তি নিয়ে আগ্রহ ধীরে ধীরে বাড়ছে।
| ব্যবহারক্ষেত্র | এটি কী করে |
| স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল | যানবাহনের চাপের তথ্য অনুযায়ী সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে |
| স্মার্ট সড়কবাতি | আলো বা উপস্থিতির ভিত্তিতে বাতি নিয়ন্ত্রণ এবং ত্রুটি শনাক্ত করতে পারে |
| স্মার্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা | ময়লার পাত্র কতটা ভর্তি তা জানিয়ে সংগ্রহের পরিকল্পনায় সাহায্য করে |
| স্মার্ট পার্কিং | খালি পার্কিং জায়গা শনাক্ত করতে সাহায্য করে |
| পরিবেশ পর্যবেক্ষণ | বায়ুর মান, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও অন্যান্য পরিবেশগত তথ্য সংগ্রহ করে |
| পানি ও বিদ্যুৎ পর্যবেক্ষণ | ব্যবহার, প্রবাহ বা সরবরাহব্যবস্থার অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করতে সাহায্য করে |
আইওটির সবচেয়ে বড় সুবিধা কী?
আইওটির আকর্ষণ শুধু ফোন দিয়ে বাতি জ্বালানো বা দরজার তালা খোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর আসল মূল্য তৈরি হয় যখন সংগৃহীত তথ্য কোনো বাস্তব কাজ সহজ করে বা সমস্যা কমাতে সাহায্য করে।
দৈনন্দিন কাজ স্বয়ংক্রিয় করা যায়
একই কাজ বারবার হাতে করার বদলে আগে থেকেই নিয়ম ঠিক করে দেওয়া যায়।
সন্ধ্যা হলে বাইরের আলো জ্বলা, নির্দিষ্ট সময় পর বৈদ্যুতিক যন্ত্র বন্ধ হওয়া কিংবা দরজা খোলা হলে ফোনে সতর্কবার্তা আসা—এসব ছোট ছোট স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা দৈনন্দিন কাজ সহজ করতে পারে।
বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য সম্পদের অপচয় কমানোর সুযোগ থাকে
সেন্সর যদি জানাতে পারে কখন আলো প্রয়োজন, কোথায় পানির ব্যবহার অস্বাভাবিক বা কোন যন্ত্র প্রয়োজন ছাড়া চলছে, তাহলে অনুমানের বদলে বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।
এতে বিদ্যুৎ, পানি, সময় বা জনশক্তির অপচয় কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
অবশ্য কতটা সাশ্রয় হবে, তা নির্ভর করবে যন্ত্রের ধরন, ব্যবহারের নিয়ম এবং পুরো ব্যবস্থা কতটা ভালোভাবে পরিকল্পিত তার ওপর।
দূর থেকে নজর রাখা যায়
আইওটির একটি বড় সুবিধা হলো, কোনো যন্ত্রের পাশে না থেকেও তার অবস্থা সম্পর্কে জানা যায়।
বাড়ির নিরাপত্তা ক্যামেরা, কৃষিজমির সেন্সর, বিদ্যুৎ মিটার কিংবা কারখানার যন্ত্র—সঠিক ব্যবস্থা থাকলে দূর থেকেই এসবের অবস্থা দেখা সম্ভব।
সমস্যা আগেভাগে বোঝার সুযোগ তৈরি হয়
কোনো যন্ত্র অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে, পানির প্রবাহ হঠাৎ বেড়ে গেলে বা নিরাপত্তা সেন্সর অস্বাভাবিক নড়াচড়া শনাক্ত করলে ব্যবস্থা দ্রুত সতর্ক করতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে এ ধরনের আগাম সতর্কতা নিরাপত্তা বাড়াতে এবং বড় ক্ষতি এড়াতে সাহায্য করতে পারে।
| দিক | সুবিধা বা উদ্বেগ |
| স্বয়ংক্রিয় কাজ | নিয়মিত কাজ মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই সম্পন্ন করতে পারে |
| দক্ষ ব্যবহার | বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য সম্পদের ব্যবহার আরও নিয়ন্ত্রিত করার সুযোগ দেয় |
| দূর থেকে পর্যবেক্ষণ | অন্য জায়গা থেকেও যন্ত্র বা ব্যবস্থার অবস্থা জানা যায় |
| তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত | বাস্তব তথ্য দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয় |
| নিরাপত্তা | অস্বাভাবিক ঘটনা দ্রুত শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে |
| তথ্যের গোপনীয়তা | ব্যক্তিগত ও পরিবেশগত তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ হতে পারে |
| সাইবার নিরাপত্তা | দুর্বল যন্ত্র বা পুরোনো সফটওয়্যার আক্রমণের সুযোগ তৈরি করতে পারে |
| সামঞ্জস্যের সমস্যা | ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যন্ত্র সব সময় সহজে একসঙ্গে কাজ করে না |
| খরচ ও রক্ষণাবেক্ষণ | যন্ত্র, সংযোগ, ব্যাটারি, সফটওয়্যার ও মেরামতের অতিরিক্ত খরচ থাকতে পারে |
আইওটির ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতা কী?
কোনো যন্ত্র ইন্টারনেটে যুক্ত হলে যেমন নতুন সুবিধা তৈরি হয়, তেমনি নতুন ঝুঁকিও দেখা দেয়।
তাই “স্মার্ট” লেখা দেখেই কোনো যন্ত্রকে ভালো বা নিরাপদ ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা
একটি স্মার্ট বাতি খুব বেশি সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ না-ও করতে পারে। কিন্তু নিরাপত্তা ক্যামেরা, স্মার্ট ডোরবেল, ফিটনেস ব্যান্ড বা অবস্থান শনাক্ত করতে পারে এমন যন্ত্রের তথ্য অনেক বেশি ব্যক্তিগত।
কী তথ্য সংগ্রহ হচ্ছে? কোথায় রাখা হচ্ছে? কতদিন রাখা হচ্ছে? অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভাগ করা হচ্ছে কি না? ব্যবহারকারী হিসাব বন্ধ করলে পুরোনো তথ্যের কী হয়?
স্মার্ট যন্ত্র কেনার সময় এসব প্রশ্ন দাম বা নকশার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্বল নিরাপত্তা বড় সমস্যার কারণ হতে পারে
আইওটির নিরাপত্তা ঝুঁকির সবচেয়ে পরিচিত ঐতিহাসিক উদাহরণগুলোর একটি হলো মিরাই বটনেট (Mirai botnet)।
২০১৬ সালের দিকে মিরাই নামের ক্ষতিকর সফটওয়্যার দুর্বলভাবে সুরক্ষিত বিভিন্ন ইন্টারনেট-সংযুক্ত ক্যামেরা, রাউটার ও অন্য যন্ত্র দখল করে সেগুলোকে একসঙ্গে আক্রমণে ব্যবহার করেছিল।
ঘটনার খুঁটিনাটি সংখ্যা মনে রাখা এখানে জরুরি নয়। গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—একটি ছোট সংযুক্ত যন্ত্রেও যদি দুর্বল পাসওয়ার্ড থাকে, সফটওয়্যার হালনাগাদ না করা হয় বা নিরাপত্তার নকশায় ত্রুটি থাকে, তাহলে সেটি বড় সাইবার আক্রমণের অংশ হয়ে যেতে পারে।
সব স্মার্ট যন্ত্র একে অন্যের সঙ্গে ঠিকমতো কাজ করে না
এক প্রতিষ্ঠানের স্মার্ট বাতি, অন্য প্রতিষ্ঠানের সেন্সর এবং তৃতীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র কিনলেই যে সবকিছু নির্বিঘ্নে একসঙ্গে কাজ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
ভিন্ন যোগাযোগমান, সফটওয়্যার, অ্যাপ ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার কারণে সামঞ্জস্যের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বড় কোনো স্মার্ট সিটি ব্যবস্থায় এই সমস্যা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেখানে অনেক প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি একই অবকাঠামোর অংশ হতে পারে।
স্মার্ট যন্ত্রেরও নিয়মিত যত্ন দরকার
আইওটি যন্ত্র কিনে বসিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না।
ব্যাটারি বদলাতে হতে পারে। সফটওয়্যার হালনাগাদ করতে হয়। রাউটার পরিবর্তন করলে যন্ত্র আবার সংযুক্ত করতে হতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠানের অনলাইন সেবা বন্ধ হয়ে গেলে কিছু সুবিধা কাজ করা বন্ধ করতে পারে।
কিছু যন্ত্রে মাসিক বা বার্ষিক সেবামূল্যও থাকতে পারে।
অর্থাৎ কেনার সময় শুধু যন্ত্রের দাম দেখলে চলবে না। দীর্ঘমেয়াদে সেটি চালাতে কতটা খরচ ও ঝামেলা হবে, সেটিও ভাবতে হবে।
আইওটি যন্ত্র কেনার আগে কী দেখবেন?
ঘরের জন্য কোনো স্মার্ট যন্ত্র কেনার সময় শুধু কতগুলো সুবিধা আছে, তা দেখলে হবে না। কয়েকটি বাস্তব বিষয় আগে যাচাই করা ভালো।
- সফটওয়্যার হালনাগাদের ব্যবস্থা দেখুন। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নিয়মিত নিরাপত্তা হালনাগাদ দেয় কি না খোঁজ নিন।
- আগের পাসওয়ার্ড বদলে ফেলুন। শক্তিশালী এবং আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন। সম্ভব হলে দুই ধাপের পরিচয় যাচাই চালু করুন।
- কী তথ্য সংগ্রহ করা হয় জানুন। ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, অবস্থান বা স্বাস্থ্যসংক্রান্ত যন্ত্র হলে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
- আপনার অন্য যন্ত্রের সঙ্গে এটি চলবে কি না দেখুন। “স্মার্ট” লেখা থাকলেই সব স্মার্ট যন্ত্র একসঙ্গে কাজ করবে না।
- ইন্টারনেট বন্ধ হলে কী হয় জানুন। প্রয়োজনীয় কাজগুলো স্থানীয়ভাবে চালু থাকবে কি না জেনে নেওয়া ভালো।
- পুরো খরচ হিসাব করুন। কেনার দাম ছাড়াও সেবামূল্য, ব্যাটারি, আলাদা নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র বা যন্ত্র বদলের খরচ থাকতে পারে।
সবচেয়ে বেশি সুবিধা আছে এমন যন্ত্রই সব সময় সবচেয়ে ভালো নয়। যে যন্ত্রটি আপনার প্রয়োজনের কাজ নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদভাবে করতে পারে, সেটিই ভালো পছন্দ।
আইওটি কি শুধু ঘর ও শহরের জন্য?
একেবারেই নয়।
কৃষিতে মাটির আর্দ্রতা, তাপমাত্রা বা সেচের অবস্থা পর্যবেক্ষণে সেন্সর ব্যবহার করা যায়। জমির বাস্তব অবস্থা বুঝে সেচের পানি চালু বা বন্ধ করার ব্যবস্থাও তৈরি করা সম্ভব।
স্বাস্থ্যসেবায় বিভিন্ন সংযুক্ত চিকিৎসাযন্ত্র ও দূরবর্তী পর্যবেক্ষণব্যবস্থা রোগীর নির্দিষ্ট শারীরিক তথ্য চিকিৎসাসেবায় ব্যবহার করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে তথ্যের গোপনীয়তা, যন্ত্রের নির্ভুলতা এবং চিকিৎসকের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারখানায় কোনো যন্ত্রের তাপমাত্রা, কম্পন, চাপ বা কাজের অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা যায়। কোনো পরিবর্তন অস্বাভাবিক মনে হলে যন্ত্র নষ্ট হওয়ার আগেই রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন আছে কি না তা দেখা যায়।
কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন, বিদ্যুৎ, কারখানা—সব ক্ষেত্রেই মূল ধারণাটি একই: বাস্তব জগত থেকে তথ্য সংগ্রহ করা এবং সেই তথ্যকে ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে কাজে লাগানো।
আইওটির ভবিষ্যৎ: বেশি যন্ত্র নয়, ভালো ব্যবস্থা বেশি গুরুত্বপূর্ণ
নতুন নতুন সংযুক্ত যন্ত্র বাজারে আসা সহজেই নজর কাড়ে। কিন্তু আইওটির ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত “আর কত যন্ত্র ইন্টারনেটে যুক্ত হবে?” নয়।
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—এই যন্ত্রগুলো কতটা নিরাপদ, প্রয়োজনীয়, একে অন্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারযোগ্য?
একটি শহরে হাজার হাজার সেন্সর বসানো হলো, কিন্তু সেগুলো থেকে পাওয়া তথ্য ঠিকমতো কাজে লাগানো গেল না—তাহলে শুধু যন্ত্রের সংখ্যা বাড়িয়ে লাভ নেই।
একইভাবে একটি স্মার্ট হোমে প্রতিটি যন্ত্র চালাতে আলাদা অ্যাপ লাগলে সুবিধার বদলে বিরক্তিই বাড়তে পারে।
আবার এমন একটি ব্যবস্থা যদি পানির অপচয় দ্রুত ধরতে পারে, প্রয়োজন ছাড়া বিদ্যুৎ ব্যবহার কমাতে সাহায্য করে, কোনো যন্ত্র নষ্ট হওয়ার আগেই সতর্ক করে বা মানুষের নিরাপত্তা বাড়ায়, তাহলে সেই প্রযুক্তির বাস্তব মূল্য আছে।
তাই ইন্টারনেট অব থিংস (Internet of Things), স্মার্ট হোম ও স্মার্ট সিটি নিয়ে ভাবার সময় “স্মার্ট” শব্দটির চেয়ে কাজের ফল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কী তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, কেন সংগ্রহ করা হচ্ছে, সেই তথ্য দিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে এবং ব্যবস্থা ব্যর্থ হলে কী হবে—এই প্রশ্নগুলোর ভালো উত্তর থাকলেই আইওটি সত্যিকার অর্থে মানুষের কাজে লাগে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
আইওটি কি শুধু বড় শহরের জন্য?
না। আইওটি একটি প্রযুক্তিগত ধারণা; শহরের আকারের সঙ্গে এর মৌলিক সংজ্ঞার সম্পর্ক নেই। বাসার স্মার্ট প্লাগ, কৃষিজমির আর্দ্রতা সেন্সর কিংবা ছোট কারখানার যন্ত্র পর্যবেক্ষণব্যবস্থাও আইওটির অংশ হতে পারে।
আইওটি যন্ত্র কি ইন্টারনেট ছাড়া কাজ করতে পারে?
কিছু পারে, কিছু পারে না। অনেক যন্ত্র অনলাইন সেবার ওপর নির্ভর করে। আবার কিছু যন্ত্র স্থানীয় নেটওয়ার্ক বা নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের মাধ্যমে ইন্টারনেট ছাড়াও নির্দিষ্ট কাজ চালিয়ে যেতে পারে। কেনার আগে এ বিষয়টি জানা ভালো।
আইওটি যন্ত্র কি নিরাপদ?
সব আইওটি যন্ত্রকে এক কথায় নিরাপদ বা অনিরাপদ বলা যায় না। নিরাপত্তা নির্ভর করে যন্ত্রের নকশা, সফটওয়্যার হালনাগাদ, পাসওয়ার্ড, পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা এবং ব্যবহারকারীর অভ্যাসের ওপর। দুর্বলভাবে সুরক্ষিত যন্ত্র যে বড় সাইবার আক্রমণের অংশ হতে পারে, মিরাই বটনেট তার পরিচিত উদাহরণ।
স্মার্ট হোম আর আইওটি কি একই জিনিস?
না। স্মার্ট হোম হলো আইওটির একটি ব্যবহারক্ষেত্র। আইওটির ব্যবহার আরও বিস্তৃত—স্মার্ট সিটি, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, কারখানা, পরিবহন এবং বিদ্যুৎ-পানি ব্যবস্থাপনাতেও একই ধরনের সেন্সর, সংযোগ ও তথ্যভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হতে পারে।



