ইতিহাস কেবল তারিখ আর সালের নীরস খতিয়ান নয়; এটি মানুষের হাসি-কান্না, উত্থান-পতন আর বেঁচে থাকার এক জীবন্ত দলিল। ইতিহাসের গতিপথ কখনো সরল রেখায় চলে না। এটি এগিয়ে যায় আকস্মিক ঢেউয়ের মতো, কখনো নীরব আত্মোপলব্ধির মধ্য দিয়ে, আবার কখনোবা অপ্রত্যাশিত কোনো ভাঙনের শব্দে। ক্যালেন্ডারের পাতায় ৪ সেপ্টেম্বর ঠিক এমনই এক গতিশীল ও বৈচিত্র্যময় দিন। শতাব্দী থেকে শতাব্দীতে চোখ রাখলে দেখা যায়, এই দিনটি পশ্চিমা বিশ্বের এক বিশাল সাম্রাজ্যের পতনের সাক্ষী হয়েছে, আবার ঠিক এই দিনেই জন্ম নিয়েছে এমন এক প্রযুক্তি যা মানুষের জ্ঞানভাণ্ডারকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন থেকে শুরু করে মানবাধিকার আদায়ের লড়াই, কিংবা শিল্প-সাহিত্যের নীরব বিপ্লব—সবকিছুরই এক অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটেছে এই ৪ সেপ্টেম্বরে। চলুন, একটু বিস্তারিতভাবে ফিরে দেখা যাক ইতিহাসের এই অনন্য দিনটিকে।
বাংলা ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপট
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি, সাহিত্য এবং সংস্কৃতির ইতিহাসেও ৪ সেপ্টেম্বরের রয়েছে গভীর তাৎপর্য। এটি এমন এক দিন যা আমাদের শেখায় কীভাবে মেধা ও কলম দিয়ে সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া যায়।
-
দাদাভাই নওরোজি (জন্ম: ৪ সেপ্টেম্বর ১৮২৫): “গ্র্যান্ড ওল্ড ম্যান অফ ইন্ডিয়া” খ্যাত দাদাভাই নওরোজি ছিলেন একাধারে শিক্ষক, গণিতবিদ এবং ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রথম ভারতীয় সদস্য। তার বিখ্যাত বই ‘পভার্টি অ্যান্ড আন-ব্রিটিশ রুল ইন ইন্ডিয়া’-তে তিনি তার যুগান্তকারী “ড্রেইন থিওরি” বা সম্পদ পাচার তত্ত্ব তুলে ধরেন। তিনি নিখুঁত গাণিতিক হিসাব দিয়ে প্রমাণ করেন যে, ব্রিটিশরা ভারতকে সভ্য করতে আসেনি; বরং তারা প্রতি বছর প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন পাউন্ডের সম্পদ ভারত থেকে ব্রিটেনে পাচার করছে। তার এই তত্ত্বই পরবর্তীতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ারে পরিণত হয়।
-
প্রেমেন্দ্র মিত্র (জন্ম: ৪ সেপ্টেম্বর ১৯০৪): বাংলা কল্পবিজ্ঞানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপকার প্রেমেন্দ্র মিত্র। কলকাতার মেসবাড়ির আড্ডায় বসে তার সৃষ্টি করা অমর চরিত্র “ঘনাদা” (ঘনশ্যাম দাস) মশার ধূপ আর চায়ের কাপের টুংটাং শব্দের মাঝে বসে ভূগোল, বিজ্ঞান আর কল্পনার যে জাল বুনতেন, তা আজও বাঙালি পাঠককে মুগ্ধ করে। প্রেমেন্দ্র মিত্র কেবল কল্পবিজ্ঞান নয়, সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের যন্ত্রণাও তার কলমে নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
-
গাজী মাজহারুল আনোয়ার (মৃত্যু: ৪ সেপ্টেম্বর ২০২২): বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ তিনি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সেই ভয়াবহ দিনগুলোতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তার লেখা “জয় বাংলা বাংলার জয়” বা “একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়”-এর মতো গানগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের বুকে বারুদের মতো জ্বলে উঠেছিল। দীর্ঘ ছয় দশকের ক্যারিয়ারে ২০ হাজারেরও বেশি গানের স্রষ্টা এই গুণী মানুষটি চিরবিদায় নেন এই দিনেই।
-
১৯৭৮ সালের প্রলয়ংকরী বন্যা: ১৯৭৮ সালের এই দিনে প্রবল বর্ষণ এবং উজানের পানিতে ভাগীরথী, দামোদর ও ময়ূরাক্ষী নদীর অববাহিকা ভেসে যায়। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রায় দেড় কোটি মানুষ রাতারাতি গৃহহীন হয়ে পড়ে। চোখের সামনে ভেসে যায় মাঠের পর মাঠ ফসল আর গবাদিপশু। এই বন্যা দক্ষিণ এশিয়ার নদী ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাগুলোকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
-
মাদার তেরেসার সন্তত্ব লাভ (২০১৬): ভ্যাটিকানের সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে পোপ ফ্রান্সিস আনুষ্ঠানিকভাবে মাদার তেরেসাকে “সেন্ট তেরেসা অফ ক্যালকাটা” হিসেবে ঘোষণা করেন। ১৯২৯ সালে বাংলায় এসে কলকাতার বস্তিতে কুষ্ঠ, যক্ষ্মা ও দরিদ্র রোগীদের সেবায় যে জীবনের শুরু হয়েছিল, এই দিনটিতে তার সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার বৈশ্বিক স্বীকৃতি মেলে।
যুগান্তকারী ঐতিহাসিক মোড়
৪৭৬ খ্রিস্টাব্দ: পশ্চিমা রোমান সাম্রাজ্যের নীরব বিদায়
ভাবতে অবাক লাগে, শত শত বছর ধরে ইউরোপ শাসন করা রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছিল খুব নীরবে। ৪৭৬ সালের এই দিনে জার্মানিক সেনাপতি ওডোয়াসার ইতালির রাভেন্না শহরে রোমান সম্রাট রোমুলাস অগাস্টুলাসকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। রোমুলাস তখনো কিশোর, বয়স মাত্র ষোলো। তার এই অল্প বয়সের কারণেই তাকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে সামান্য ভাতার বিনিময়ে নির্বাসনে পাঠানো হয়। কিন্তু তার এই বিদায়ের মধ্য দিয়ে ইউরোপের বুকে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য পূর্বে টিকে থাকলেও, পশ্চিমা বিশ্বে প্রাচীন যুগের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি এবং সামন্ততান্ত্রিক মধ্যযুগের অন্ধকার ও অনিশ্চিত এক অধ্যায়ের সূচনা হয় এই দিনেই।
১৭৮১: লস অ্যাঞ্জেলেসের ধুলোমাখা জন্মকথা
আজকের দিনের গ্ল্যামারাস লস অ্যাঞ্জেলেস বা হলিউডের কথা ভাবলে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। কিন্তু ১৭৮১ সালের ৪ সেপ্টেম্বরে এর শুরুটা ছিল একেবারেই সাদামাটা। মাত্র ৪৪ জন স্প্যানিশ সেটেলার বা “লস পোবলাডোরেস” ক্যালিফোর্নিয়ার এক অনুর্বর জমিতে একটি ছোট্ট কৃষিনির্ভর গ্রাম প্রতিষ্ঠা করেন। এই ৪৪ জন কোনো অভিজাত বংশের মানুষ ছিলেন না; তারা ছিলেন আদিবাসী আমেরিকান, আফ্রো-ল্যাটিনো এবং ইউরোপীয়দের এক অভাবনীয় সংমিশ্রণ, যারা শুধু একটু ভালো থাকার আশায় এই রুক্ষ প্রান্তরে বসতি গড়েছিলেন। সেই ধুলোমাখা ছোট্ট গ্রামটিই আজ চার কোটি মানুষের মেগাসিটি এবং বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।
১৮৭০: ফরাসি তৃতীয় প্রজাতন্ত্রের রক্তস্নাত সূচনা
সেডানের যুদ্ধে প্রুশিয়ানদের কাছে ফরাসি সেনাবাহিনীর লজ্জাজনক পরাজয় এবং সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়নের বন্দিদশার খবর যখন প্যারিসে পৌঁছায়, তখন সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ফেটে পড়ে। ৪ সেপ্টেম্বর প্যারিসের রাস্তায় জনতার ঢল নামে। এই উত্তাল পরিস্থিতির মাঝেই ফরাসি রাষ্ট্রনায়ক লিওঁ গ্যামবেটা প্যারিসের আইকনিক ‘হোটেল ডি ভিল’ থেকে দ্বিতীয় সাম্রাজ্যের পতন এবং তৃতীয় প্রজাতন্ত্রের ঘোষণা দেন। চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্যারিস কমিউনের রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহের মাঝে জন্ম নিলেও, এই প্রজাতন্ত্রটি ১৯৪০ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল এবং আধুনিক ফ্রান্সের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে মজবুত করেছিল।
১৮৮২ ও ১৮৮৮: আধুনিক জীবনের দুই জাদুকরী মুহূর্ত
মানব ইতিহাসের শিল্পায়নে ৪ সেপ্টেম্বর একটি অবিস্মরণীয় দিন।
-
বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত নিউইয়র্ক (১৮৮২): থমাস এডিসন ম্যানহাটনে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ‘পার্ল স্ট্রিট স্টেশন’ চালু করেন। শুরুতে এটি মাত্র এক বর্গমাইল এলাকার প্রায় ৪০০টি বাতি জ্বালানোর সক্ষমতা রাখত। কিন্তু কয়লাচালিত এই ছোট বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিই বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছিল যে, বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
-
সবার হাতে ক্যামেরা (১৮৮৮): জর্জ ইস্টম্যান তার পোর্টেবল বক্স ক্যামেরার প্যাটেন্ট পান এবং “কোডাক” (Kodak) ট্রেডমার্কটি নিবন্ধন করেন। এর আগে ছবি তোলা ছিল রাসায়নিক ধোঁয়া আর ভারী যন্ত্রপাতির এক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, যা কেবল পেশাদাররাই করতে পারতেন। ইস্টম্যানের “আপনি বোতাম চাপুন, বাকিটা আমরা দেখছি”—এই একটি স্লোগান সাধারণ মানুষের জীবনের স্মৃতি ধরে রাখার উপায়কে চিরতরে বদলে দেয়।
১৯৫৭: লিটল রক নাইন এবং এক অদম্য সাহসের গল্প
আমেরিকার নাগরিক অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে এটি এক শিহরণ জাগানো দিন। আরকানসাসের লিটল রক সেন্ট্রাল হাই স্কুলে নয়জন কৃষ্ণাঙ্গ কিশোর-কিশোরী প্রথমবারের মতো শ্বেতাঙ্গদের সাথে এক স্কুলে ক্লাস করতে যায়। কিন্তু সেখানে তাদের স্বাগত জানানোর বদলে অপেক্ষা করছিল ক্ষুব্ধ শ্বেতাঙ্গদের গালিগালাজ আর ন্যাশনাল গার্ডের বন্দুকের নল। ১৫ বছর বয়সী এলিজাবেথ একফোর্ড যখন একা একা সেই উন্মত্ত জনতার ভিড় ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনকার তোলা একটি ছবি পুরো বিশ্বের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এই ঘটনা প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারকে বাধ্য করেছিল সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে ওই শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে।
১৯৯৮: গুগলের জন্ম
ক্যালিফোর্নিয়ার মেনলো পার্কে সুসান ওজিস্কির একটি সাদামাটা গ্যারেজে স্ট্যানফোর্ডের দুই স্বপ্নবাজ ছাত্র ল্যারি পেজ এবং সের্গেই ব্রিন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গুগল’ প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের তৈরি ‘পেজর্যাংক’ (PageRank) অ্যালগরিদমটি ইন্টারনেটকে এক জঞ্জাল থেকে সুশৃঙ্খল তথ্যভাণ্ডারে পরিণত করে। সেদিন গ্যারেজে বসে হয়তো তারা নিজেরাও ভাবেননি যে, দুই দশকের মাথায় এটি মানুষের জীবনযাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতকে পুরোপুরি বদলে দেবে।
মহাদেশজুড়ে বিশ্ব ইতিহাস

বিশ্বের নানা প্রান্তে নানা সময়ে ৪ সেপ্টেম্বর এমন কিছু ঘটনার জন্ম দিয়েছে, যা ভূ-রাজনীতি ও সমাজ ব্যবস্থায় গভীর প্রভাব ফেলেছে:
| বছর | স্থান | ঐতিহাসিক ঘটনা |
| ১০৬৩ | মধ্যপ্রাচ্য | সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান তুঘরিল বেগের মৃত্যু। তার এই রাজত্বই পরবর্তীতে শক্তিশালী উসমানীয় সাম্রাজ্যের সামরিক ও প্রশাসনিক ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। |
| ১৮৮৪ | অস্ট্রেলিয়া | নিউ সাউথ ওয়েলসে ব্রিটিশ বন্দিদের নির্বাসন আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করা হয়। এই সিদ্ধান্তটি অস্ট্রেলিয়াকে একটি অপরাধীদের উপনিবেশের তকমা থেকে মুক্ত করে স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক যাত্রার পথ সুগম করে। |
| ১৮৮৬ | আমেরিকা | অ্যাপাচি উপজাতি নেতা জেরোনিমো মার্কিন সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ কয়েক দশকের আমেরিকান ইন্ডিয়ান যুদ্ধের এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। |
| ১৯৪৪ | ইউরোপ | মিত্রবাহিনীর ব্রিটিশ সেনারা ব্রাসেলসে প্রবেশ করে শহরটিকে দীর্ঘ চার বছরের নির্মম নাৎসি দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত করে। মুক্তির আনন্দে সেদিন রাস্তায় নেমে এসেছিল হাজারো মানুষ। |
| ১৯৭০ | চিলি | সালভাদর আলেন্তে চিলির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হন। তিনিই লাতিন আমেরিকার প্রথম নির্বাচিত মার্ক্সবাদী রাষ্ট্রপ্রধান, যার বিজয় ওয়াশিংটনে রীতিমতো কাঁপন ধরিয়েছিল এবং ১৯৭৩ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরি করেছিল। |
| ১৯৯৩ | লিথুয়ানিয়া | পোপ জন পল দ্বিতীয় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মাটিতে পা রাখেন। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর পূর্ব ইউরোপে এটি ছিল এক বিশাল প্রতীকী ঘটনা। |
| ২০১০ | নিউজিল্যান্ড | ক্রাইস্টচার্চের কাছে ভোরে ৭.১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। ব্যাপক কাঠামোগত ক্ষতি হলেও, নিউজিল্যান্ডের কঠোর বিল্ডিং কোডের কারণে প্রাণহানি ছিল অবিশ্বাস্যরকম কম, যা সারা বিশ্বের জন্য এক বড় শিক্ষণীয় বিষয়। |
বিখ্যাত জন্ম ও মৃত্যু
যাদের জন্ম এই দিনে:
-
ম্যাক্স ডেলব্রুক (১৯০৬–১৯৮১): নোবেলজয়ী জার্মান-আমেরিকান বায়োফিজিসিস্ট। ভাইরাসের জেনেটিক্স নিয়ে তার কাজ আধুনিক মলিকুলার বায়োলজির ভিত গড়ে দিয়েছিল।
-
রিচার্ড রাইট (১৯০৮–১৯৬০): বিখ্যাত আমেরিকান ঔপন্যাসিক। তার লেখা ‘নেটিভ সন’ এবং ‘ব্ল্যাক বয়’ আমেরিকার বর্ণবাদের বিরুদ্ধে তীব্র শৈল্পিক প্রতিবাদ ছিল।
-
জন ম্যাকার্থি (১৯২৭–২০১১): প্রখ্যাত কম্পিউটার বিজ্ঞানী। ১৯৫৫ সালে তিনিই প্রথম “আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স” (AI) শব্দটি ব্যবহার করেন। আজকের ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের পেছনেও তার বড় অবদান রয়েছে।
-
ঋষি কাপুর (১৯৫২–২০২০): বলিউডের চিরসবুজ অভিনেতা। ‘ববি’ সিনেমা দিয়ে শুরু করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ভারত, বাংলাদেশসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়ার দর্শকদের তার মিষ্টি হাসি আর অনবদ্য অভিনয় দিয়ে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলেন।
-
বিয়ন্সে নোলস-কার্টার (জন্ম ১৯৮১): ৩২টি গ্র্যামি জয়ী আমেরিকান পপ আইকন। সংগীতে নারী ক্ষমতায়ন ও আফ্রো-আমেরিকান সংস্কৃতির এক অনন্য কণ্ঠস্বর তিনি।
যাদের প্রয়াণ এই দিনে:
-
স্টিভ আরউইন (১৯৬২–২০০৬): “দ্য ক্রোকোডাইল হান্টার” খ্যাত তুমুল জনপ্রিয় অস্ট্রেলিয়ান প্রকৃতিবিদ। গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে ডকুমেন্টারি চিত্রায়নের সময় একটি স্টিংরের (Stingray) কাঁটা তার বুকে বিদ্ধ হলে তিনি মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান। তার এই আকস্মিক মৃত্যু পুরো বিশ্বকে কাঁদিয়েছিল।
-
জোন রিভার্স (১৯৩৩–২০১৪): আমেরিকান কমেডিয়ান ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব। পুরুষশাসিত কমেডি জগতে নারীদের জন্য তিনি এক নতুন দরজা খুলে দিয়েছিলেন। তার তীক্ষ্ণ ও স্বতঃস্ফূর্ত রসবোধ ছিল কিংবদন্তিতুল্য।
আন্তর্জাতিক দিবস ও কিছু অজানা তথ্য
-
বিশ্ব তায়কোয়ান্দো দিবস: ১৯৯৪ সালের এই দিনে প্যারিসে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি তায়কোয়ান্দোকে ২০০০ সালের সিডনি অলিম্পিক গেমসের আনুষ্ঠানিক পদকের ইভেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বিশ্বজুড়ে মার্শাল আর্ট স্কুলগুলো দিনটি উদযাপন করে।
-
জাতীয় বন্যপ্রাণী দিবস (যুক্তরাষ্ট্র): ২০০৫ সালে শুরু হওয়া বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধির এই দিনটি ২০০৬ সালে স্টিভ আরউইনের প্রয়াণের পর থেকে আবেগঘন এক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
চমকপ্রদ তথ্য (ট্রিভিয়া):
-
“কোডাক” (Kodak) নামের রহস্য: ১৮৮৮ সালে জর্জ ইস্টম্যান যখন তার ট্রেডমার্ক নিবন্ধন করেন, তখন তিনি এমন একটি শব্দ খুঁজছিলেন যা পৃথিবীর যেকোনো ভাষায় উচ্চারণ করা সহজ। তিনি ‘K’ অক্ষরটিকে খুব শক্তিশালী মনে করতেন। তাই সম্পূর্ণ নিজের কল্পনা থেকে তিনি “Kodak” শব্দটি তৈরি করেন, যার আভিধানিক কোনো অর্থ নেই!
-
মার্ক স্পিটজের অজেয় রেকর্ড: ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিকে আমেরিকান সাঁতারু মার্ক স্পিটজ এই দিনে তার সপ্তম স্বর্ণপদকটি জেতেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনি যে কয়টি ইভেন্টে অংশ নিয়েছিলেন, তার প্রতিটিতেই বিশ্ব রেকর্ড গড়েছিলেন! ২০০৮ সালে মাইকেল ফেল্পসের আটটি সোনা জয়ের আগ পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৬ বছর তার এই রেকর্ড অক্ষুণ্ণ ছিল।
শেষ কথা
৪ সেপ্টেম্বরের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের গল্প কখনো শেষ হয় না। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের মতো কোনো ধ্বংসের মধ্য দিয়ে যে অধ্যায়ের শুরু হয়েছিল, এডিসনের আলো আর গুগলের মতো প্রযুক্তি দিয়ে মানুষের সৃজনশীলতা তাকে নতুন পথ দেখিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের জন্য এই দিনটি বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম, সাহিত্যের গভীরতা আর স্বাধীনতার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার এক জীবন্ত দলিল। ৪ সেপ্টেম্বর শুধু ক্যালেন্ডারের একটি সাধারণ তারিখ নয়; এটি মানুষের অদম্য টিকে থাকার স্পৃহা, আবিষ্কারের নেশা এবং শিল্পের প্রতি অবিচল প্রেমের এক দুর্দান্ত মহাকাব্য।

