কল্প-জগতের জাদুকর সুকুমার রায় — বাংলা সাহিত্য যাঁর পদরচনায় হয়ে উঠেছিল রঙিন ও আনন্দময়

সর্বাধিক আলোচিত

বাংলা ভাষায় এমন কিছু শব্দ আছে, যাদের কোনো বাস্তব ঠিকানা নেই, অথচ শুনলেই চোখের সামনে আস্ত একটা প্রাণী দাঁড়িয়ে যায়। হাঁসজারু। বকচ্ছপ। হাতিমির। ট্যাঁশগরু।

তারা কোথায় থাকে? কোন জঙ্গলে তাদের দেখা মেলে? কোনো প্রাণিবিজ্ঞানী কি তাদের নাম লিখেছেন জীবজগতের তালিকায়?

না। তবু বাঙালি তাদের চেনে।

তাদের জন্ম প্রকৃতির নিয়মে নয়, সুকুমার রায়ের কল্পনায়।

একজন মানুষ মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বেঁচেছিলেন। সেই অল্প জীবনের মধ্যেই তিনি বাংলা শিশুসাহিত্যের ভাষা বদলে দিয়েছিলেন, হাসির মধ্যে লুকিয়ে দিয়েছিলেন বিদ্রূপ, অসম্ভবকে দিয়েছিলেন বিশ্বাসযোগ্য চেহারা, বিজ্ঞানকে করেছিলেন সহজ, আর ছাপাখানার প্রযুক্তিকেও দেখেছিলেন শিল্পের চোখে। তাঁর মৃত্যুর এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরে আজও কোনো শিশু প্রথমবার আবোল তাবোল খুলে যেমন হেসে ওঠে, তেমনি প্রাপ্তবয়স্ক পাঠক সেই একই ছড়ার আড়ালে খুঁজে পান সমাজ, ক্ষমতা ও মানুষের অদ্ভুত আচরণের আরেক মানচিত্র।

জীবন এত ছোট, অথচ ছায়া এত দীর্ঘ—এমন ঘটনা সাহিত্যে খুব বেশি ঘটে না।

সুকুমার রায় সেই বিরল মানুষদের একজন।

যে বাড়িতে ‘কল্পনা শক্তি’ ছিল পারিবারিক উত্তরাধিকার

Sukumar Ray biography

১৮৮৭ সালের ৩০ অক্টোবর কলকাতায় সুকুমার রায়ের জন্ম। তিনি এসেছিলেন ব্রাহ্ম পরিবারের এক শিক্ষিত, সংস্কৃতিমনস্ক পরিবেশে। পারিবারিক শিকড় ছিল দক্ষিণ রাঢ়ীয় কায়স্থ বংশে। তাঁদের পূর্বপুরুষ রামসুন্দর দেও নদিয়ার চাকদহ থেকে পূর্ববাংলার শেরপুরে এসেছিলেন; পরে পরিবারটির একটি শাখা স্থায়ী হয় কিশোরগঞ্জের মসূয়া গ্রামে।

এই পারিবারিক ইতিহাসের দিকে তাকালে মনে হয়, সুকুমারের জীবনে পূর্ববাংলা ও কলকাতা যেন এক সরলরেখার দুই প্রান্ত। একপ্রান্তের মাটিতে ছিল শিকড়, অন্যটিতে ফুটেছিল প্রতিভার ফুল।

আর যে ঘরে তিনি বড় হচ্ছিলেন, সেটি মোটেই সাধারণ কোনো মধ্যবিত্ত সাহিত্যিক পরিবার ছিল না।

তাঁর বাবা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছিলেন এক আশ্চর্য বহুমুখী মানুষ—শিশুসাহিত্যিক, চিত্রকর, সংগীতজ্ঞ, অপেশাদার জ্যোতির্বিদ এবং মুদ্রণপ্রযুক্তির উদ্ভাবক। গল্প লিখছেন, ছবি আঁকছেন, আবার ছাপার ছবিকে কীভাবে আরও নিখুঁত করা যায় তা নিয়েও পরীক্ষা করছেন—একই মানুষের মধ্যে এমন বহু জগৎ পাশাপাশি ছিল।

সুকুমারের মা বিধুমুখী দেবীও এসেছিলেন বিশিষ্ট ব্রাহ্ম পরিবার থেকে। তিনি ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের অন্যতম ব্যক্তিত্ব দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের কন্যা।

সুকুমারের ভাই সুবিনয় ও সুবিমল; বোন সুখলতা, পুণ্যলতা ও শান্তিলতা। পরিবারটির সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জগদীশচন্দ্র বসু ও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মতো ব্যক্তিদের যাতায়াত ও ঘনিষ্ঠতা ছিল।

একটি শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য এর চেয়ে বিস্ময়কর পরিবেশ আর কী হতে পারে?

বাড়িতে সাহিত্য আছে। ছবি আছে। সংগীত আছে। বিজ্ঞান আছে। ছাপাখানার যন্ত্র আছে। বড়দের আড্ডায় বাংলার শ্রেষ্ঠ মনীষীরা আসছেন। যেন একটি বাড়িই ছোট্ট এক বিশ্ববিদ্যালয়।

সেই পরিবেশে বড় হয়ে সুকুমার শুধু কবি হবেন—এমন সরল সমীকরণ যেন সম্ভবই ছিল না।

কবির ভেতরে লুকিয়ে থাকা বিজ্ঞানী

সুকুমার রায়ের নাম শুনলে প্রথমেই ছড়া মনে পড়ে। কিন্তু তাঁর শিক্ষাজীবনের দিকে তাকালে অন্য এক মানুষকে দেখা যায়।

কলকাতার সিটি স্কুল থেকে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন। পরে প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়েন পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন নিয়ে। তিনি রসায়নে অনার্সসহ বিএসসি সম্পন্ন করেছিলেন।

 এ কারনেই তাঁর সাহিত্যকে বোঝার জন্য বিজ্ঞানমনস্ক সুকুমারকে মনে রাখা দরকার।

যে লেখক হাঁস আর সজারুকে জুড়ে হাঁসজারু বানাচ্ছেন, তিনি নিছক এলোমেলো কল্পনা করছেন না। তাঁর কল্পনায়ও যেন পরীক্ষাগারের আনন্দ আছে—দুটি অসম জিনিস মিশিয়ে দেখা যাক, কী হয়!

কলেজজীবনেই তাঁর সেই খেলার আরও একটি চিহ্ন দেখা যায়। তিনি তৈরি করেছিলেন “ননসেন্স ক্লাব”। ক্লাবের নিজস্ব হাতে লেখা পত্রিকার নাম—“সাড়ে বত্রিশ ভাজা”।

নামটিই যথেষ্ট।

কেন বত্রিশ নয়? তেত্রিশও নয় কেন? সাড়ে বত্রিশ কেন?

এই অর্ধেক বাড়তি অংশটুকুতেই যেন সুকুমারের ভবিষ্যৎ সাহিত্যজগতের চাবি লুকিয়ে আছে। যুক্তি থাকবে, কিন্তু তার পাশে একটু বেয়াড়া অযুক্তিও থাকবে। পরিচিত শব্দ থাকবে, কিন্তু সেটিকে এমনভাবে ঘুরিয়ে দেওয়া হবে যে হঠাৎ সবকিছু নতুন মনে হবে।

পরে আবোল তাবোল, হ-য-ব-র-ল বা পাগলা দাশু যে পৃথিবী তৈরি করবে, তার বীজ যেন সেই কলেজের ননসেন্স ক্লাবেই রোপিত হয়েছিল।

লন্ডনের পথে: ছড়াকার নয়, এক তরুণ প্রযুক্তিবিদ

সুকুমার রায়ের জীবনের সবচেয়ে কম আলোচিত অধ্যায় সম্ভবত তাঁর ইংল্যান্ডযাত্রা।

১৯১১ সালে গুরুপ্রসন্ন ঘোষ স্কলারশিপ নিয়ে তিনি ইংল্যান্ড যান। উদ্দেশ্য ছিল ফটোগ্রাফি ও মুদ্রণপ্রযুক্তির উচ্চতর শিক্ষা। অর্থাৎ যে তরুণকে আমরা পরে ছড়ার জাদুকর হিসেবে জানব, তিনি বিলেতে গিয়েছিলেন মূলত প্রযুক্তি শিখতে।

লন্ডনের এল.সি.সি. স্কুল অব ফটো-এনগ্রেভিং অ্যান্ড লিথোগ্রাফিতে তিনি পড়াশোনা করেন। এরপর ১৯১২ সালে ম্যানচেস্টার স্কুল অব টেকনোলজিতেও প্রশিক্ষণ নেন। সেখানে তিনি তাঁর বাবা উপেন্দ্রকিশোরের উন্নত করা হাফটোন ব্লক তৈরির পদ্ধতি প্রদর্শন করেছিলেন।

আজ ডিজিটাল স্ক্রিনে একটি ছবি কত সহজে ছাপার উপযোগী হয়ে যায়, তা দেখে সেই যুগের জটিলতা বোঝা কঠিন। তখন ছবির আলো-ছায়া, সূক্ষ্ম রেখা ও টোন কাগজে পরিষ্কারভাবে তুলে আনা ছিল বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। উপেন্দ্রকিশোর সেই সমস্যার সমাধান নিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন; ছেলে সুকুমার সেই কাজকে আন্তর্জাতিক পরিসরে নিয়ে গেলেন।

এখানেই বিস্ময়ের শেষ নয়।

১৯১৩ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি দেশে ফেরেন রয়্যাল ফটোগ্রাফিক সোসাইটির ফেলো—এফআরপিএস—হিসেবে। সে সময় একজন ভারতীয়, বিশেষ করে একজন তরুণ বাঙালির জন্য এটি ছিল বিরল সম্মান। তাঁর আগে বাঙালিদের মধ্যে যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর এই স্বীকৃতি পেয়েছিলেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।

ভাবা যায়? যে মানুষটির নাম শুনলেই আমাদের মনে পড়ে ট্যাঁশগরু আর রামগরুড়ের ছানা, তিনি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিসম্পন্ন একজন ফটোগ্রাফার ও মুদ্রণপ্রযুক্তিবিদও ছিলেন।

এই পরিচয়টি যেন জনপ্রিয় ছড়াকার সুকুমারের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক সুকুমার।

ইংল্যান্ডে থাকার সময় তাঁর সাংস্কৃতিক আগ্রহও থেমে ছিল না। তিনি রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে বক্তৃতা দিয়েছিলেন—এমন এক সময়ে, যখন রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পাননি। বাংলা সংস্কৃতিকে বিদেশি শ্রোতার কাছে ব্যাখ্যা করা, আবার পাশ্চাত্যের প্রযুক্তিকে গভীরভাবে শেখা—দুটি কাজই একই সঙ্গে চলছিল।

দেশে ফিরে তাঁর আড্ডার স্বভাব আরও নতুন রূপ পেল। গড়ে উঠল “মন্ডা ক্লাব”। সেখানে আলোচনার বিষয়ের কোনো সীমানা ছিল না—কথায় কথায় বলা হতো, “জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ” পর্যন্ত সবই সেখানে আলোচ্য। অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবনের একেবারে ব্যবহারিক বিষয় থেকে সাহিত্য, সংস্কৃতি, দর্শন—সবকিছুর জন্যই দরজা খোলা।

ক্লাবের বৈঠকের জন্য সুকুমার মজার ছড়ায় আমন্ত্রণপত্রও লিখতেন।

“সম্পাদক বেয়াকুব কোথা যে দিয়েছে ডুব—

এদিকেতে হায় হায় ক্লাবটি তো যায় যায়।

তাই বলি সোমবারে মদগৃহে গড়পারে

দিলে সবে পদধূলি ক্লাবটিরে ঠেলে তুলি।

রকমারি পুঁথি কত নিজ নিজ রুচিমত

আনিবেন সাথে সবে কিছু কিছু পাঠ হবে।

করযোড়ে বারবার নিবেদিছে সুকুমার।” 

মন্ডা ক্লাবের এই প্রথম আমন্ত্রণপত্র থেকেই বোঝা যায় কী স্বাভাবিকভাবেই না ছন্দ মিশে ছিল তাঁর সকল চিন্তায়।

আবার ফটোগ্রাফি নিয়ে তাঁর আগ্রহ শুধু পেশাগত ছিল না মোটেই। বায়োস্কোপ ধরনের লেখায় সময়ের পরিবর্তনকে ছবিতে ধরে রাখার কৌশলসহ ফটোগ্রাফির জটিল ধারণাও তিনি সহজ করে ব্যাখ্যা করেছিলেন। সেই সময়ের একজন বাংলা শিশুসাহিত্যিক যে টাইম-ল্যাপস ফটোগ্রাফির মতো বিষয় নিয়েও ভাবছেন—এই তথ্য তাঁর প্রতিভার বিস্তার সম্পর্কে নতুন ধারণা দেয়।

বিয়ে, সংসার এবং হঠাৎ কাঁধে এসে পড়া বিরাট দায়িত্ব

ইংল্যান্ড থেকে ফেরার পর ১৯১৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর সুপ্রভা দেবীর সঙ্গে সুকুমার রায়ের বিয়ে হয়। সেই বিয়েতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও উপস্থিত ছিলেন।

জীবন যেন তখন সুন্দর একটি নতুন অধ্যায় খুলছে।

কিন্তু খুব বেশিদিন নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ তিনি পাননি। উপেন্দ্রকিশোরের মৃত্যুর পর মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে পরিবারের প্রকাশনা ও ছাপাখানার গুরুদায়িত্ব এসে পড়ে সুকুমারের কাঁধে। তাঁকে সামলাতে হয় ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স এবং শিশু-কিশোরদের প্রিয় পত্রিকা সন্দেশ

একদিকে প্রযুক্তিনির্ভর ছাপাখানা। অন্যদিকে সম্পাদনা। সঙ্গে লেখা, আঁকা, পরিকল্পনা।

তিনি লিখতেন নিজের নামেও, আবার “উহ্যনাম পণ্ডিত” ছদ্মনামেও।

সন্দেশ-এর পাতায় তাঁর বহুমুখী প্রতিভা যেন পুরোপুরি মুক্তি পেল। গল্পের পাশে বিজ্ঞান, ছড়ার পাশে জীবজন্তুর অদ্ভুত তথ্য, হাসির মধ্যে শিক্ষা, ছবির মধ্যে নাটক—শিশুদের পত্রিকা যে কেবল নীতিকথা শেখানোর জায়গা নয়, বরং বিস্ময় ও অনুসন্ধানের দরজা হতে পারে, তিনি তা দেখিয়ে দিলেন।

১৯২১ সালে জন্ম নিল তাঁর একমাত্র ছেলে সত্যজিৎ।

সেই শিশুটিই বড় হয়ে বিশ্বচলচ্চিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নির্মাতা হবেন—বাবা তা দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু রায় পরিবারের শিল্প, ছবি, গল্প, পর্যবেক্ষণ ও প্রযুক্তির যে উত্তরাধিকার উপেন্দ্রকিশোর থেকে সুকুমারের হাতে এসেছিল, সেটিই পরে সত্যজিতের সৃষ্টিশীলতায় আরেক রূপে ফিরে আসবে।

যেখানে হাঁস সজারুর সঙ্গে মেশে

Sukumar Ray Legacy

সুকুমার রায়ের সাহিত্য নিয়ে কথা বলতে গেলে শেষ পর্যন্ত ফিরে আসতেই হয় আবোল তাবোল-এ।

বাংলা ননসেন্স সাহিত্যের এমন স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ জগৎ বিরল। বিশ্বসাহিত্যে অসম্ভব কল্পনা ও যুক্তির খেলায় Alice in Wonderland-এর কথা যেমন মনে পড়ে, বাংলা ভাষায় তেমনি নিজের সম্পূর্ণ আলাদা ভুবন তৈরি করেছে আবোল তাবোল

এই বইয়ের প্রাণ কেবল ছন্দ নয়। এর আসল বিস্ময়—ভাষাকে বাস্তবের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত করে দেওয়া।

“খিচুড়ি”তে দেখা যায় হাঁসজারু, বকচ্ছপ, হাতিমির, ট্যাঁশগরুর মতো অসম্ভব সব প্রাণী। জীববিজ্ঞানের বই খুললে তাদের পাওয়া যাবে না। সারা পৃথীবি ঘুরলেও যাদের টিকিটিরও দেখা মিলবেনা। কিন্তু একবার নাম শুনলে ভুলতে পারবেন না, কল্পনার জগতে এরাই দোর্দন্ড দাপটে ঘুরে বেড়াবে।

এটাই সুকুমারের জাদু।

“বাপুরাম সাপুড়ে”, “গোঁফচুরি”, “রামগরুড়ের ছানা”, “ছায়াবাজি”, “জীবনের হিসাব”, “মহাভারত: আদিপর্ব”—প্রতিটি রচনায় ভাষা যেন নিজের নিয়ম নিজেই বানায়। কোথাও শব্দ মুখ বাঁকায়, কোথাও যুক্তি উল্টো দিকে হাঁটে, কোথাও পরিচিত পৃথিবী হঠাৎ এমন আচরণ করতে শুরু করে যেন তার মাথায় দুষ্টুমি চেপেছে।

শিশু হাসে।

বড় মানুষ একটু থেমে ভাবে।

এই দ্বৈততাই সুকুমার রায়ের বিশেষ শক্তি।

হ-য-ব-র-ল থেকে পাগলা দাশু: হাসতে হাসতে পৃথিবী দেখা

তাঁর গদ্যেও একই বিস্ময়।

হ-য-ব-র-ল সম্ভবত বাংলা ননসেন্স গদ্যের সবচেয়ে পরিচিত সৃষ্টি। সেখানে বাস্তব পৃথিবীর নিয়ম যেন দরজার বাইরে জুতো খুলে রেখে ভেতরে ঢোকে। কথার সঙ্গে কথার যোগ নেই বলেই মনে হয়, অথচ সেই অযোগের মধ্যেই তৈরি হয় নিজস্ব এক যুক্তি।

এ যেন স্বপ্ন দেখার সময় মস্তিষ্কের কাজ।

সবকিছু অস্বাভাবিক, তবু স্বপ্নের মধ্যে একটুও অস্বাভাবিক মনে হয় না।

অন্যদিকে পাগলা দাশুর জগৎ অনেক বেশি পরিচিত। স্কুল আছে, সহপাঠী আছে, শিক্ষক আছে। আর আছে দাশু—দুষ্টু, বুদ্ধিমান, অপ্রত্যাশিত কাণ্ডে সিদ্ধহস্ত এক কিশোর। তার পাগলামি নিছক বিশৃঙ্খলা নয়; অনেক সময় তা প্রচলিত বুদ্ধি আর আত্মগরিমাকে উল্টে দেয়। সমাজের অসার রীতিগুলোকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি আবার এক কাল্পনিক অভিযাত্রীর ডায়েরির ভঙ্গিতে তৈরি। অজানা ভূখণ্ড, অসম্ভব প্রাণী, বৈজ্ঞানিক অভিযানের ভাষা—সব মিলিয়ে সেখানে সুকুমারের বিজ্ঞানমনস্কতা ও কৌতুক একই পাতায় এসে দাঁড়ায়। আমার কাছে মনে হয় সত্যজিৎ এর প্রোফেসর শঙ্কু যেন হেশোরাম হুঁশিয়ার-এরই ছায়ায় বেড়ে উঠেছে। 

“যতীনের জুতো”, “হিংসুটি”, “ব্যোমকেশের মাঞ্জা”—এ ধরনের গল্পেও তিনি শিশুকে সামনে বসিয়ে নীতিশিক্ষার বক্তৃতা দেননি। বরং মানুষ কীভাবে হিংসা করে, বাড়াবাড়ি করে, ভুল বোঝে বা নিজের বুদ্ধিতে নিজেই বিপদে পড়ে—সেটা হাসতে হাসতে দেখিয়েছেন।

শিশুসাহিত্যে এই পার্থক্যটি বড়।

শিশুকে শিক্ষা দেওয়া যায়। আবার শিশুকে নিজে বুঝতে দেওয়াও যায়।

সুকুমার দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলেন।

মঞ্চে সুকুমারের অদ্ভুত পৃথিবী

সুকুমারের নাটক পড়লেও একই খেলাধুলোর স্বভাব দেখা যায়।

অবাক জলপান-এর ঘটনাটি খুব সাধারণ—এক পথিক একটু পানি খেতে চায়। এতটুকুই। কিন্তু সেই সহজ কাজটিই একের পর এক ভুল বোঝাবুঝি ও হাস্যকর কথোপকথনের কারণে অসম্ভব অভিযানে পরিণত হয়।

এক গ্লাস পানি।

সেটাও কি এত কঠিন?

সুকুমারের হাতে অবশ্যই।

ঝালাপালা, চলচ্চিত্তচঞ্চরীলক্ষণের শক্তিশেল-এও ভাষা, নাটকীয়তা ও ব্যঙ্গ পাশাপাশি চলে। তিনি জানতেন, মঞ্চে হাসি শুধু কথায় আসে না; ভুল সময়ে সঠিক কথা আর সঠিক সময়ে সম্পূর্ণ ভুল কথা বলাও বিরাট কৌতুক তৈরি করতে পারে।

শিশুদের কাছে সক্রেটিস, গ্যালিলিও আর পাস্তুরকে নিয়ে আসা

ননসেন্স সাহিত্যে সুকুমার রায়ের মুন্সিয়ানা এতটাই প্রবল যে তাঁর অন্যান্য স্বাভাবিক লেখাগুলো সাধারণত আলোচনার বাইরেই থেকে যায়।

তিনি চেয়েছিলেন ছোটরা পৃথিবীকে জানুক।

সেই জন্যই তিনি শিশুদের উপযোগী ভাষায় লিখেছেন সক্রেটিস, গ্যালিলিও, আর্কিমিডিস, ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল, ডেভিড লিভিংস্টোন, আলফ্রেড নোবেল, অ্যান্ড্রু কার্নেগি, চার্লস ডারউইন, লুই পাস্তুর, জোয়ান অব আর্ক ও কলম্বাসের মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের জীবন নিয়ে।

“নোবেলের দান” বা “দানবীর কার্নেগী”র মতো রচনা পড়ে ছোট পাঠক শুধু একজন বিখ্যাত মানুষের নাম জানত না; জানতে পারত কৌতূহল, অধ্যবসায়, জ্ঞানচর্চা কিংবা মানুষের জন্য কাজ করার গল্প।

একই কাজ তিনি বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও করেছেন।

“জীবজন্তু” বিষয়ক লেখায় সিন্ধু ঈগল থেকে বাঘ, তিমি—বিচিত্র প্রাণিজগতকে তিনি গল্প বলার আনন্দে শিশুদের সামনে এনেছেন। “বিবিধ বিষয়” ধরনের লেখায় এসেছে ছাপাখানা, নীহারিকা, বুমেরাং, চীনের পাঁচিল, পিরামিড।

বিষয়ের এই বিস্তার লক্ষ করার মতো।

একই লেখক সকালে যদি ট্যাঁশগরু বানান, বিকেলে তিনি নীহারিকা ব্যাখ্যা করতে পারেন। রাতে ছাপাখানার প্রযুক্তি নিয়ে ভাবতে পারেন।

এমন প্রতিভাকে একটি পরিচয়ের বাক্সে রাখলে সাহিত্যের অনন্য কিছু রত্ন থেকে বঞ্চিতই হতে হয়।

সন্দেশ: একটি পত্রিকার ভেতর দিয়ে তৈরি হওয়া নতুন শৈশব

সম্পাদক হিসেবে সুকুমার রায়ের শুরুটা এখানেই।

সন্দেশ তাঁর কাছে শুধু লেখা ছাপার পত্রিকা ছিল না। সেটি ছিল ছোটদের জন্য পৃথিবী আবিষ্কারের জানালা।

একটি সংখ্যায় শিশু হাসতে পারে। আরেকটি লেখা পড়ে বিজ্ঞান জানতে পারে। একটি ছবি দেখে কল্পনা করতে পারে। কোনো জীবনী পড়ে বুঝতে পারে, পৃথিবীর বড় আবিষ্কারগুলোও একদিন কারও ছোট কৌতূহল থেকেই শুরু হয়েছিল।

বাংলা শিশুসাহিত্যে যে উজ্জ্বল পর্বটি সন্দেশকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল, তার কেন্দ্রে ছিল এই দৃষ্টিভঙ্গি।

শিশুকে ছোট মানুষ হিসেবে দেখা নয়।

তাকে পূর্ণ কৌতূহলী মানুষ হিসেবে দেখা।

সুকুমার রায়ের সাহিত্য আজও এত আধুনিক মনে হওয়ার এটিই সবচেয়ে বড় কারণ।

হাসির মোড়কে যে কাঁটা লুকিয়ে থাকে

কিন্তু তাঁর সব হাসি নিষ্পাপ ছিল না।

সুকুমারের ব্যঙ্গের ধার বুঝতে “একুশে আইন”-এর মতো কবিতার দিকে তাকাতে হয়। ওপর থেকে দেখলে সেখানে অদ্ভুত নিয়মকানুন, আজগুবি নির্দেশ, অকারণ শাস্তি—সবই হাসির উপাদান।

কিন্তু একটু বড় হয়ে আবার পড়লে প্রশ্ন জাগে—এই হাসিটা কাকে নিয়ে?

যে ক্ষমতা কোনো যুক্তি ছাড়াই মানুষের ওপর নিয়ম চাপায়, যে প্রশাসন নিজের ইচ্ছাকেই আইন বানিয়ে ফেলে, যে শাসনে অপরাধের সঙ্গে শাস্তির সম্পর্ক থাকতেই হয় না—সুকুমারের কৌতুক কি সেই পৃথিবীকেই আয়নায় দেখাচ্ছে না?

শিশু সেখানে আজগুবি আইন দেখে হাসতে পারে। প্রাপ্তবয়স্ক পাঠক সেই হাসির নিচে কর্তৃত্বের নিষ্ঠুরতা ও ঔপনিবেশিক ধরনের শাসনের ব্যঙ্গও অনুভব করতে পারেন।

এটাই তাঁর সাহিত্যের দীর্ঘায়ুর আরেক রহস্য।

শিশুকালে একরকম পড়া যায়।

বড় হলে আবার পড়তে হয়।

আর দ্বিতীয়বার পড়ে আবিষ্কার করা যায়, ছড়াকারটি আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি তীক্ষ্ণ ছিলেন।

পঁয়ত্রিশ বছরের জীবনে কতগুলো জীবন

সুকুমারের অর্জনের দিকে একবার একসঙ্গে তাকালে বিস্ময় বাড়ে।

তিনি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিসম্পন্ন ফটোগ্রাফার ছিলেন। রয়্যাল ফটোগ্রাফিক সোসাইটির ফেলো হয়েছিলেন। হাফটোন ব্লক ও মুদ্রণপ্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাংলা শিশুসাহিত্যের এক নতুন ভাষা তৈরি করেছিলেন। সম্পাদনা করেছেন সন্দেশ। বিজ্ঞান লিখেছেন, জীবনী লিখেছেন, নাটক লিখেছেন, গল্প লিখেছেন, ছড়া লিখেছেন।

আর সবচেয়ে বড় কথা, ননসেন্সকে তিনি কখনো অর্থহীন করেননি।

সুকুমারের “আবোল-তাবোল” আসলে খুব সচেতনভাবে নির্মিত। তার ছন্দ নিখুঁত, শব্দের ব্যবহার পরিকল্পিত, কল্পনার ভেতরেও নিজস্ব নিয়ম আছে। তাই এক শতাব্দী পরে এসে সেই লেখা পুরোনো ঠেকে না।

তাঁর কাজ বারবার পুনর্মুদ্রিত হয়েছে, অনূদিত হয়েছে, মঞ্চে ও অন্য মাধ্যমে অভিযোজিত হয়েছে। বাংলা হাস্যরস ও শিশুসাহিত্যে তাঁর প্রভাব এত গভীর যে পরবর্তী প্রজন্মের বহু লেখকের লেখায় সরাসরি বা পরোক্ষভাবে তাঁর ছায়া অনুভব করা যায়।

১৯৮৭ সালে সত্যজিৎ রায় তাঁর বাবাকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। নিজের পিতাকে সত্যজিৎ স্মৃতির মানুষ হিসেবেই পেয়েছিলেন বেশি—কারণ সুকুমারের মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স মাত্র দুই বছর। বহু দশক পরে চলচ্চিত্রকার ছেলে যখন ক্যামেরায় বাবার জীবন ও কাজের দিকে ফিরে তাকালেন, তখন সেটি যেন রায় পরিবারের শিল্পীসত্তার এক অদ্ভুত পূর্ণবৃত্ত হয়ে উঠল। সত্যজিতের নিজের মৃত্যুর পাঁচ বছর আগে তৈরি হয়েছিল সেই ছবি।

শেষ শয্যাতেও থামেনি কলম

১৯২৩ সালে সুকুমার রায় কালাজ্বরে আক্রান্ত হন—যে রোগকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভিসেরাল লিশম্যানিয়াসিস বলা হয়। সেই সময় রোগটির কার্যকর চিকিৎসার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত ছিল।

শরীর দ্রুত দুর্বল হয়ে আসছিল।

কিন্তু লেখা থামেনি।

এই দৃশ্যটি ভাবলে আবোল তাবোল যেন অন্য আলোয় দেখা দেয়। যে মানুষ মৃত্যুর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর কল্পনার পৃথিবীতে তখনও দৌড়াচ্ছে অদ্ভুত প্রাণী, হাসছে অসম্ভব চরিত্র, নিয়ম ভেঙে নতুন নিয়ম বানাচ্ছে শব্দ।

১৯২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর কলকাতার গড়পার রোডের বাড়িতে সুকুমার রায় মারা যান।

বয়স মাত্র পঁয়ত্রিশ।

আরও মর্মান্তিক একটি সময়ের ব্যবধান আছে এখানে। তাঁর মৃত্যুর মাত্র নয় দিন পরে বই আকারে প্রকাশিত হয় আবোল তাবোল

যে বই তাঁকে বাংলা সাহিত্যে এক অর্থে অমর করে রাখবে, নিজের হাতে তার প্রকাশিত কপি তুলে নেওয়ার সুযোগ তিনি পেলেন না।

পেছনে রইলেন স্ত্রী সুপ্রভা দেবী।

রইল দুই বছরের ছেলে সত্যজিৎ।

আর রইল কয়েকটি বই, কিছু ছবি, ছাপাখানার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ, সন্দেশ-এর পাতা এবং এমন এক কল্পনার মহাদেশ—যার মানচিত্র আজ পুরনো হলেও রঙ বিবর্ণ হয়নি, হবেনা কখনো।

হাঁসজারু আজও বেঁচে আছে

সময় অদ্ভুত জিনিস।

একজন মানুষের শরীরকে সে পঁয়ত্রিশ বছরেই থামিয়ে দিতে পারে। আবার সেই মানুষের বানানো একটি শব্দকে একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে শিশুর মুখে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।

সুকুমার রায়ের জীবন তাই শুধু অকালমৃত এক প্রতিভাবানের গল্প নয়। এটি কৌতূহলের গল্প। বিজ্ঞান আর কল্পনা যে পরস্পরের শত্রু নয়, তার গল্প। শিশুদের জন্য লেখা মানে ভাষাকে সহজ করে ফেলা নয়, বরং কল্পনাকে আরও স্বাধীন করে দেওয়া—তার গল্প।

হয়তো এ কারণেই হাঁসজারুর কোনো বাস্তব ঠিকানা দরকার হয় না।

বকচ্ছপেরও কোনো জীবাশ্ম আবিষ্কার করতে হয় না।

রামগরুড়ের ছানাকে কোনো পাখিবিদ্যার বইয়ে খুঁজতে হয় না।

তারা আছে বাংলা ভাষার ভেতর। শিশুর প্রথম বিস্ময়ে, বড়দের ফিরে দেখা শৈশবে, ছন্দের দুষ্টুমিতে, অযৌক্তিকতার আনন্দে।

আর যতদিন কোনো শিশু বইয়ের পাতায় হঠাৎ অসম্ভব এক প্রাণীর নাম দেখে হেসে উঠবে, যতদিন কোনো বড় মানুষ “একুশে আইন” পড়ে হাসতে হাসতে একটু অস্বস্তিও অনুভব করবে, ততদিন সেই পঁয়ত্রিশ বছরের মানুষটির জীবন আসলে শেষ হবে না।

কল্পনার আকাশে তাঁর তৈরি প্রাণীরা তখনও ঘুরে বেড়াবে।

সর্বশেষ