বাংলাদেশে সোনা ও রুপোর দাম ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫: ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড ভেঙে নতুন মূল্য নির্ধারণ

সর্বাধিক আলোচিত

বাংলাদেশের স্বর্ণ বাজারে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ সন্ধ্যায় সোনার দাম আবারও বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে, যা ২৩ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর রয়েছে এবং ২৪ ডিসেম্বরেও এই দাম বজায় থাকবে। ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ৩ হাজার ৯৬৬ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ২ লাখ ২২ হাজার ৮৩ টাকায় পৌঁছেছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দাম। বর্তমান মূল্য তালিকা অনুযায়ী, ২২ ক্যারেট সোনার প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২ লাখ ২২ হাজার ৮৩ টাকা, ২১ ক্যারেট ২ লাখ ১১ হাজার ৯৯৩ টাকা এবং ১৮ ক্যারেট ১ লাখ ৮১ হাজার ৭২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একইসাথে রুপোর দামও বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ২২ ক্যারেট রুপো প্রতি ভরি ৪ হাজার ৯৫৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

স্বর্ণের বিস্তারিত মূল্য তালিকা: সকল ক্যারেট অনুযায়ী

বাজুসের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, বিভিন্ন ক্যারেটের স্বর্ণের দাম নিম্নরূপ নির্ধারণ করা হয়েছে। ২২ ক্যারেট স্বর্ণ, যা সর্বোচ্চ মানের হলমার্ক সোনা হিসেবে বিবেচিত, তার প্রতি ভরি দাম ২ লাখ ২২ হাজার ৮৩ টাকা নির্ধারিত হয়েছে। ২১ ক্যারেটের স্বর্ণের মূল্য প্রতি ভরি ২ লাখ ১১ হাজার ৯৯৩ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের স্বর্ণ প্রতি ভরি ১ লাখ ৮১ হাজার ৭২৫ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ, যা হলমার্কবিহীন, তার মূল্য প্রতি ভরি ১ লাখ ৫১ হাজার ৩৯৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিভিন্ন ওজন অনুযায়ী স্বর্ণের দাম

ক্যারেট প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) প্রতি গ্রাম (আনুমানিক) প্রতি আনা (০.৭২৯ গ্রাম) প্রতি রতি (০.১২১৫ গ্রাম)
২২ ক্যারেট ২,২২,০৮৩ টাকা ১৯,০৩৭ টাকা ১৩,৮৮০ টাকা ২,৩১৩ টাকা
২১ ক্যারেট ২,১১,৯৯৩ টাকা ১৮,১৭২ টাকা ১৩,২৫০ টাকা ২,২০৮ টাকা
১৮ ক্যারেট ১,৮১,৭২৫ টাকা ১৫,৫৮০ টাকা ১১,৩৫৮ টাকা ১,৮৯৩ টাকা
সনাতন পদ্ধতি ১,৫১,৩৯৯ টাকা ১২,৯৮০ টাকা ৯,৪৬২ টাকা ১,৫৭৭ টাকা

এই মূল্য তালিকার সাথে ক্রেতাদের অতিরিক্ত ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং সর্বনিম্ন ৬ শতাংশ মজুরি যোগ করতে হবে। তবে গহনার ডিজাইন ও জটিলতা অনুযায়ী মজুরির পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।

রুপোর সর্বশেষ মূল্য তালিকা

স্বর্ণের পাশাপাশি রুপোর দামও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজুসের নতুন মূল্য তালিকা অনুযায়ী, ২২ ক্যারেট রুপোর প্রতি ভরি মূল্য ৪ হাজার ৯৫৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২১ ক্যারেট রুপোর দাম প্রতি ভরি ৪ হাজার ৭২৪ টাকা এবং ১৮ ক্যারেট রুপোর মূল্য ৪ হাজার ৮২ টাকা। সনাতন পদ্ধতির রুপো প্রতি ভরি ৩ হাজার ৩৩ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।

বিভিন্ন ওজন অনুযায়ী রুপোর দাম

ক্যারেট প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) প্রতি গ্রাম (আনুমানিক) প্রতি আনা (০.৭২৯ গ্রাম) প্রতি রতি (০.১২১৫ গ্রাম)
২২ ক্যারেট ৪,৯৫৭ টাকা ৪২৫ টাকা ৩১০ টাকা ৫২ টাকা
২১ ক্যারেট ৪,৭২৪ টাকা ৪০৫ টাকা ২৯৫ টাকা ৪৯ টাকা
১৮ ক্যারেট ৪,০৮২ টাকা ৩৫০ টাকা ২৫৫ টাকা ৪২ টাকা
সনাতন পদ্ধতি ৩,০৩৩ টাকা ২৬০ টাকা ১৯০ টাকা ৩২ টাকা

রুপার ক্ষেত্রেও স্বর্ণের মতো একই হারে ভ্যাট এবং মজুরি প্রযোজ্য হবে। চলতি বছরে এ পর্যন্ত ১১ বার রুপার দাম সমন্বয় করা হয়েছে, যার মধ্যে ৮ বার বৃদ্ধি এবং ৩ বার হ্রাস পেয়েছে।

স্বর্ণের ওজন পরিমাপ পদ্ধতি: ভরি, আনা, রতি ও গ্রাম

স্বর্ণের ওজন পরিমাপ পদ্ধতি

বাংলাদেশে স্বর্ণ ও রুপা ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ঐতিহ্যবাহী ওজন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এই পদ্ধতিতে ভরি, আনা, রতি এবং পয়েন্ট ব্যবহৃত হয়। ১ ভরি সমান ১১.৬৬৪ গ্রাম, যা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ০.৩৭৪৪১ ট্রয় আউন্সের সমতুল্য। প্রতি ভরিতে ১৬ আনা থাকে এবং প্রতি আনা সমান ০.৭২৯ গ্রাম। প্রতি আনায় ৬ রতি থাকে এবং ১ রতি সমান ০.১২১৫ গ্রাম। এই পরিমাপ পদ্ধতি দীর্ঘদিন ধরে উপমহাদেশে প্রচলিত এবং ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের কাছেই সুপরিচিত।

ওজন রূপান্তর সারণী

একক সমতুল্য গ্রামে ওজন
১ ভরি ১৬ আনা = ৯৬ রতি = ৯৬০ পয়েন্ট ১১.৬৬৪ গ্রাম
১ আনা ৬ রতি = ৬০ পয়েন্ট ০.৭২৯ গ্রাম
১ রতি ১০ পয়েন্ট ০.১২১৫ গ্রাম
১ পয়েন্ট ০.০১২১৫ গ্রাম

এই রূপান্তর সারণী ব্যবহার করে ক্রেতারা সহজেই যেকোনো পরিমাণ স্বর্ণ বা রুপোর মূল্য নির্ণয় করতে পারবেন। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ ৫ আনা ২২ ক্যারেট সোনা কিনতে চান, তাহলে মূল্য হবে প্রায় ৬৯,৪০০ টাকা (১৩,৮৮০ × ৫)।

দাম বৃদ্ধির কারণ: আন্তর্জাতিক বাজার ও স্থানীয় প্রভাব

আন্তর্জাতিক স্বর্ণের বাজারে মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব বাংলাদেশের বাজারেও পড়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপ স্বর্ণের চাহিদা বৃদ্ধি করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এছাড়া, স্থানীয় মুদ্রার বিপরীতে ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধিও মূল্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। বাজুস নিয়মিত আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণ করে এবং সে অনুযায়ী স্থানীয় মূল্য সমন্বয় করে থাকে।

চলতি বছরের মূল্য সমন্বয়ের পরিসংখ্যান

২০২৫ সালে স্বর্ণের দাম অভূতপূর্ব সংখ্যক বার সমন্বয় করা হয়েছে। চলতি বছরে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৮৮ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে, যার মধ্যে ৬১ বার দাম বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মাত্র ২৭ বার হ্রাস পেয়েছে। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, বছরব্যাপী স্বর্ণের মূল্য ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ছিল। বিপরীতে, ২০২৪ সালে মোট ৬২ বার মূল্য সমন্বয় হয়েছিল, যার মধ্যে ৩৫ বার বৃদ্ধি এবং ২৭ বার হ্রাস পেয়েছিল। রুপোর ক্ষেত্রে ২০২৫ সালে ১১ বার মূল্য সমন্বয় হয়েছে, যেখানে ২০২৪ সালে মাত্র ৩ বার সমন্বয় করা হয়েছিল।

বছরভিত্তিক মূল্য সমন্বয়ের তুলনা

বছর স্বর্ণ সমন্বয় (মোট) বৃদ্ধি হ্রাস রুপো সমন্বয় (মোট) বৃদ্ধি হ্রাস
২০২৫ ৮৮ বার ৬১ বার ২৭ বার ১১ বার ৮ বার ৩ বার
২০২৪ ৬২ বার ৩৫ বার ২৭ বার ৩ বার

 

এই তথ্য থেকে বোঝা যায় যে, ২০২৫ সালে স্বর্ণ ও রুপো উভয়ের বাজারই অধিক অস্থিতিশীল ছিল এবং মূল্য বৃদ্ধির প্রবণতা শক্তিশালী ছিল।

ভ্যাট ও মজুরি: অতিরিক্ত খরচের হিসাব

স্বর্ণ বা রুপা ক্রয়ের সময় ঘোষিত মূল্যের সাথে অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হয়। সরকার নির্ধারিত ৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বিক্রয়মূল্যের সাথে যোগ করতে হয়। এছাড়া, বাজুস নির্ধারিত সর্বনিম্ন ৬ শতাংশ মজুরি বা কারিগর খরচ যুক্ত হয়। গহনার ডিজাইন জটিল হলে বা বিশেষ কারুকাজ থাকলে মজুরি ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ২২ ক্যারেট ১ ভরি সোনার বেসিক মূল্য ২,২২,০৮৩ টাকা হলে, ৫% ভ্যাট যোগ করলে ১১,১০৪ টাকা এবং ৬% মজুরি যোগ করলে ১৩,৩২৫ টাকা বাড়বে, যার ফলে মোট খরচ দাঁড়াবে প্রায় ২,৪৬,৫১২ টাকা।

বিনিয়োগের দৃষ্টিকোণ: স্বর্ণ কি এখনও ভালো বিকল্প?

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান অনিশ্চিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে স্বর্ণ এখনও নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত। মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে হেজ হিসেবে স্বর্ণ কাজ করে এবং দীর্ঘমেয়াদে মূল্য সংরক্ষণ করে। তবে, স্বল্পমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের জন্য বর্তমান উচ্চ মূল্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ক্রেতাদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে যে, বিনিয়োগের জন্য হলমার্ক সোনা কেনা উচিত এবং গহনা কেনার ক্ষেত্রে মজুরি কম এমন ডিজাইন বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। এছাড়া, বাজারের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে উপযুক্ত সময়ে ক্রয় সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

ক্রেতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

স্বর্ণ বা রুপো ক্রয়ের পূর্বে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা আবশ্যক। প্রথমত, সর্বদা বাজুসের সদস্য এবং নির্ভরযোগ্য দোকান থেকে কিনুন। দ্বিতীয়ত, হলমার্ক সিল যাচাই করুন এবং নিশ্চিত হন যে গহনায় সঠিক ক্যারেট উল্লেখ আছে। তৃতীয়ত, রসিদে ওজন, ক্যারেট, মজুরি এবং ভ্যাট সহ সকল তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে কিনা পরীক্ষা করুন। চতুর্থত, ভবিষ্যতে বিক্রয়ের সুবিধার জন্য বাই-ব্যাক পলিসি সম্পর্কে জেনে নিন। পঞ্চমত, বর্তমান উচ্চ মূল্যের কারণে প্রয়োজন না হলে ক্রয় বিলম্বিত করার কথা বিবেচনা করুন।

আগামী দিনের প্রত্যাশা: মূল্য কোন দিকে যাবে?

বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী, আগামী কয়েক সপ্তাহে স্বর্ণের মূল্য আরও ওঠানামা করতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, কেন্দ্রীয় বাংলাদেশের মুদ্রানীতি এবং ডলারের বিনিময় হার মূল্যকে প্রভাবিত করবে। বিশ্ব অর্থনীতির মন্দার আশঙ্কা থাকলে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকবেন, যা চাহিদা বাড়াবে। অন্যদিকে, যদি বৈশ্বিক অর্থনীতি স্থিতিশীল হয় এবং ডলার শক্তিশালী হয়, তবে স্বর্ণের মূল্য কিছুটা হ্রাস পেতে পারে। স্থানীয় বাজারে আসন্ন বিবাহ মৌসুম এবং উৎসবের কারণে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা মূল্যকে উচ্চ পর্যায়ে রাখতে পারে।

শেষ কথা

বাংলাদেশে স্বর্ণ ও রুপোর বাজার বর্তমানে নজিরবিহীন উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে এই মূল্য ধারা অব্যাহত রয়েছে। ২২ ক্যারেট সোনার প্রতি ভরি দাম ২ লাখ ২২ হাজার ৮৩ টাকায় পৌঁছানো দেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। ক্রেতারা ক্রয় সিদ্ধান্তের পূর্বে বাজার পর্যবেক্ষণ করবেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিনিয়োগ পরিকল্পনা করবেন বলে আশা করা যায়। বাজুসের নিয়মিত মূল্য সমন্বয়ন প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা করছে, যদিও ঘন ঘন দাম পরিবর্তন ক্রেতাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং। স্বর্ণ-রুপার মূল্য বৃদ্ধি শুধুমাত্র বাংলাদেশের সমস্যা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিফলন। ভবিষ্যতে মূল্যের গতিপথ নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাজার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক নীতির উপর। ক্রেতাদের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে তথ্যসচেতন থাকা এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া।

সর্বশেষ