রূপালি গিটারের জাদুকর: বাংলা ব্যান্ডে আইয়ুব বাচ্চুর রেখে যাওয়া জাদুকরী মায়া

সর্বাধিক আলোচিত

কোনো কোনো শিল্পীর জন্মদিন ক্যালেন্ডারের একটি তারিখমাত্র নয়। সে দিনটি ফিরে এলে মনে হয়, একটি সময় আবার দরজা খুলে ঢুকে পড়েছে ঘরে। পুরোনো ক্যাসেটের ফিতা ঘুরছে, মঞ্চের আলো জ্বলছে, অন্ধকারের ভেতর থেকে একটি গিটার ধীরে ধীরে কথা বলতে শুরু করেছে। তারপর ভেসে আসে সেই কণ্ঠ—কখনো তীব্র, কখনো আহত, কখনো আশ্চর্য কোমল।

আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিন তেমনই একটি দিন।

তিনি মঞ্চে নেই বহু বছর। তবু বাংলাদেশের কোনো কনসার্টে গিটারের একটি দীর্ঘ সলো উঠলে, কোনো তরুণ গিটারিস্ট চোখ বন্ধ করে ফ্রেটবোর্ডে আঙুল ছুটিয়ে দিলে, কিংবা কোনো মধ্যরাতে হঠাৎ ‘সেই তুমি’ বা ‘রূপালি গিটার’ বাজতে শুরু করলে মনে হয়—মানুষটি বুঝি খুব দূরে যাননি। শুধু মঞ্চের দৃশ্যমান অংশটুকু থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।

১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া আইয়ুব বাচ্চু মাত্র ৫৬ বছরের জীবন পেয়েছিলেন। ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর তাঁর আকস্মিক মৃত্যু বাংলা সংগীতকে যে শূন্যতার মুখোমুখি করেছিল, সেই শূন্যতা আজও পুরোপুরি ভরাট হয়নি। ২০২৬ সালের এই জন্মদিনে তাঁর বয়স হতো ৬৪। অথচ তাঁর গানগুলোর বয়স যেন বাড়ে না। বরং এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের হাতে যেতে যেতে সেগুলো নতুন অর্থ খুঁজে পায়।

চট্টগ্রামের এক কিশোরের হাতে প্রথম গিটার

আইয়ুব বাচ্চুর শিল্পীজীবনের সবচেয়ে সুন্দর বৈপরীত্যগুলোর একটি লুকিয়ে আছে তাঁর প্রথম গিটারটির গল্পে। সংগীতকে পেশা হিসেবে নেওয়ার ব্যাপারে পারিবারিক পরিবেশ খুব অনুকূল ছিল না, কিন্তু তাঁর প্রথম অ্যাকুস্টিক গিটারটি এসেছিল বাবার কাছ থেকেই। নিজের এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ১৯৭৩ বা ১৯৭৪ সালের দিকে, স্কুলে পড়ার সময় বাবা তাঁকে সাধারণ একটি অ্যাকুস্টিক গিটার কিনে দিয়েছিলেন। পরে বন্ধুর কাছ থেকে একটি টিসকো গিটার ধার নিয়ে বাজাতেন; সেই গিটারটি শেষ পর্যন্ত বন্ধুই তাঁকে দিয়ে দেন। প্রাতিষ্ঠানিক সংগীতশিক্ষার সুযোগ তখন আজকের মতো সহজ ছিল না। চট্টগ্রামে থাকা একজন শিক্ষক তাঁকে কর্ড ও কর্ডের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝাতেন; বাকিটা এগিয়েছে শোনা, অনুশীলন এবং অদম্য কৌতূহলের ওপর ভর করে।

বন্ধু ও সংগীতশিল্পী কুমার বিশ্বজিতের স্মৃতিতেও সেই সময়ের আরেকটি ছবি পাওয়া যায়। দুজনের বাড়ি ছিল চট্টগ্রামের জুবিলী রোডের কাছাকাছি। পরিবারের চোখ এড়িয়ে সংগীতচর্চায় বের হওয়ার জন্য কখনো একজন অন্যজনের নামকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতেন। বাদ্যযন্ত্র সহজলভ্য ছিল না; একটি গিটার অনেকের মধ্যে ভাগ করে বাজানো ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। সেই সীমাবদ্ধতার ভেতরেই তৈরি হচ্ছিল এমন এক প্রজন্ম, যারা পরে বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ভাষা বদলে দেবে।

এখানে আইয়ুব বাচ্চুর কাহিনি শুধু প্রতিভার গল্প নয়। এটি এক ধরনের জেদেরও গল্প। পরিবার ও সমাজের নিরাপদ পেশার প্রত্যাশার বিপরীতে দাঁড়িয়ে একজন তরুণ বিশ্বাস করেছিলেন, গানও জীবন হতে পারে, গিটারও জীবিকা হতে পারে।

নিজের ভাষায় তাঁর লক্ষ্য ছিল একটাই—সংগীতশিল্পী হওয়া। অন্য কোনো পথ তিনি নিজের জন্য কল্পনাই করেননি।

Ayub Bachchu short biography

ব্যক্তিগত জীবন সংক্ষেপে

বিষয় তথ্য
পূর্ণ নাম আইয়ুব বাচ্চু
ডাকনাম রবিন; ভক্ত ও সহকর্মীদের কাছে ‘এবি’, ‘বাচ্চু ভাই’ ও ‘বস’ নামেও পরিচিত ছিলেন
জন্ম ১৬ আগস্ট ১৯৬২
জন্মস্থান চট্টগ্রাম; বিভিন্ন জীবনীসূত্রে পটিয়ার খরনা এলাকার উল্লেখও রয়েছে
শিক্ষা চট্টগ্রাম সরকারি মুসলিম হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন
স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার চন্দনা
সন্তান ছেলে আহনাফ তাজওয়ার আইয়ুব ও মেয়ে ফাইরুজ সাফরা আইয়ুব
প্রধান পরিচয় গায়ক, গিটারিস্ট, গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক
প্রধান ব্যান্ড ফিলিংস, সোলস এবং এলআরবি
মৃত্যু ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ঢাকা
সমাধি চট্টগ্রামের চৈতন্য গলি কবরস্থানে, মায়ের কবরের পাশে

ছয়শ টাকা, একটি স্বপ্ন এবং ঢাকা শহর

শিল্পীর সাফল্যের গল্প আমরা সাধারণত আলো জ্বলার পর থেকে শুনি। আলো জ্বলার আগের অন্ধকারটা আড়ালেই থেকে যায়।

আইয়ুব বাচ্চুর জীবনের সেই অন্ধকারে ছিল অনিশ্চয়তা। প্রথম আলোর একটি স্মৃতিচারণে বলা হয়েছে, ১৯৮৩ সালে মাত্র ৬০০ টাকা নিয়ে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন এবং প্রথমদিকে এলিফ্যান্ট রোডের একটি হোটেলে উঠেছিলেন। পরবর্তী সময়ে কুমার বিশ্বজিৎ স্মরণ করেছেন, ঢাকায় স্থায়ী হওয়ার পর কয়েক বছর তাঁর সঙ্গে একই বাসায়ও ছিলেন বাচ্চু।

ছয়শ টাকা দিয়ে একজন মানুষ কত দূর যেতে পারেন?

হিসাবের খাতায় উত্তর খুব বেশি নয়। কিন্তু মানুষের ভেতরের জেদ হিসাবের নিয়ম মানে না। আইয়ুব বাচ্চুর হাতে তখন অর্থের চেয়ে বড় সম্পদ ছিল—গিটার বাজানোর ক্ষমতা, শেখার ক্ষুধা এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এক ধরনের একরোখা বিশ্বাস।

সত্তরের দশকের শেষভাগে চট্টগ্রামের ব্যান্ড-পরিমণ্ডলে তাঁর চলাফেরা শুরু। ‘স্পাইডার’, নিজের তরুণ বয়সের ব্যান্ড উদ্যোগ এবং পরে ফিলিংসের সঙ্গে বাজানোর অভিজ্ঞতা তাঁকে মঞ্চের ভাষা শিখিয়েছিল। ফিলিংসের পর ১৯৮০ সালে তিনি যোগ দিলেন সোলসে। সেখানে প্রায় এক দশক লিড গিটারিস্ট হিসেবে কাজ করেন।

সোলস: যে দশক তাঁকে প্রস্তুত করেছিল

বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে সোলস একটি আলাদা অধ্যায়। আইয়ুব বাচ্চুর নিজের ইতিহাসেও তাই।

১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সোলসে থাকা সময়টি তাঁকে শুধু পরিচিত গিটারিস্টে পরিণত করেনি; গীতিকার, সুরকার এবং সংগীত-আয়োজনের মানুষ হিসেবেও পরিণত করেছে। তপন চৌধুরীসহ সে সময়ের অনেক শিল্পীর জন্য তিনি সুর করেছেন। ‘কলেজের করিডোরে’, ‘মানুষ মাটির কাছাকাছি’ ও ‘ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট’-এর সময়কার সোলসের সংগীতযাত্রায় তাঁর গিটারের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কিন্তু বাচ্চুর ভেতরে তখন অন্য ধরনের শব্দ জমছিল।

তিনি চেয়েছিলেন আরও শক্তিশালী গিটার, আরও রকধর্মী শব্দ, আরও স্বাধীন পরীক্ষা। ব্যান্ডের সংগীতভাবনা আর তাঁর ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা সব সময় একই পথে যাচ্ছিল না। বিচ্ছেদ তাই শেষ পর্যন্ত অনিবার্য হয়ে ওঠে।

সোলস ছেড়ে যাওয়া তাঁর জন্য শুধু একটি ব্যান্ড পরিবর্তন ছিল না। সেটি ছিল নিজের সংগীতভাষার ঝুঁকি নিজেই নেওয়ার সিদ্ধান্ত।

আর সেই সিদ্ধান্ত থেকেই জন্ম নেয় এলআরবি।

এলআরবি: একটি ব্যান্ডের চেয়ে বড় একটি সাংস্কৃতিক ঘটনা

৫ এপ্রিল ১৯৯১ সালে আইয়ুব বাচ্চু নিজের ব্যান্ড গড়ে তোলেন। নামটি প্রথমে ছিল ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’; পরে তা পরিচিত হয় ‘লাভ রানস ব্লাইন্ড’—সংক্ষেপে এলআরবি নামে। ১৯৯২ সালে এলআরবি একসঙ্গে দুটি অ্যালবাম প্রকাশ করে। বাংলাদেশের সংগীতের ইতিহাসে সেই ডাবল অ্যালবাম প্রকাশ ছিল সে সময়ের জন্য অত্যন্ত সাহসী ঘটনা।

তারপর যেন বাঁধ ভাঙল।

‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে’, ‘চলো বদলে যাই’, ‘সেই তুমি’, ‘ফেরারি এই মনটা আমার’, ‘রূপালি গিটার’, ‘ঘুমন্ত শহরে’—গানগুলো কেবল জনপ্রিয় হলো না; বাংলা ব্যান্ডসংগীতের শ্রোতাভাষাই বদলে দিল।

রক আর তখন কেবল পশ্চিমা গানের অনুকরণ নয়। আইয়ুব বাচ্চু স্পষ্টভাবেই বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশের শ্রোতার জন্য সংগীত করতে হলে পশ্চিমের সংগীত হুবহু নকল করলে চলবে না; রকের শক্তিকে বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের আবেগের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। তিনি নিজেই ‘সেই তুমি’, ‘চলো বদলে যাই’ ও ‘ফেরারি মন’-এর গ্রহণযোগ্যতাকে সেই পথের উদাহরণ হিসেবে দেখিয়েছিলেন।

এই জায়গাতেই তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্ব।

তিনি বাংলাদেশে রকের সূচনাকারী নন—তাঁর আগে আজম খানসহ পথিকৃৎরা পথ তৈরি করে গেছেন। কিন্তু সেই পথকে নব্বইয়ের দশকের বিপুল তরুণ শ্রোতার সামনে আরও বিস্তৃত, দৃশ্যমান ও পেশাদার করে তুলতে আইয়ুব বাচ্চুর অবদান ছিল অসাধারণ। তাঁর হাতে রক শুধু প্রতিবাদের শব্দ থাকেনি; প্রেম, বিচ্ছেদ, নিঃসঙ্গতা, শহুরে জীবন, স্বপ্ন, ব্যর্থতা—সবই রকের বিষয় হয়ে উঠেছে।

গিটার যখন দ্বিতীয় কণ্ঠ

আইয়ুব বাচ্চুকে শুধু গায়ক হিসেবে শুনলে তাঁর অর্ধেককে শোনা হয়।

বাকি অর্ধেক মানুষটি থাকেন গিটারে।

জিমি হেন্ডরিক্স ছিলেন তাঁর বড় অনুপ্রেরণা। পাশাপাশি স্টিভ ভাই, জো স্যাটরিয়ানি থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রজন্মের বহু গিটারিস্টের বাজনা তিনি শুনতেন। কিন্তু অনুকরণের মধ্যে নিজেকে আটকে রাখেননি। তাঁর গিটার-সলো অনেক সময় গানের ভেতর আলাদা আরেকটি কণ্ঠের মতো কাজ করেছে। শব্দ কখনো দীর্ঘশ্বাস হয়েছে, কখনো চিৎকার, কখনো প্রেমপত্র।

‘রূপালি গিটার’ তার সবচেয়ে সুন্দর দৃষ্টান্তগুলোর একটি। ১৯৯৩ সালের সুখ অ্যালবামের গানটি পরে ১৯৯৬ সালের আনপ্লাগড আয়োজনেও নতুন মাত্রা পায়। বেহালার সঙ্গে গিটারের সংলাপ গানটিকে বাংলা রকের একটি স্মরণীয় সৃষ্টিতে পরিণত করে।

আজ তাই ‘রূপালি গিটার’ শুধু একটি গানের নাম নয়। আইয়ুব বাচ্চুর গোটা শিল্পীসত্তারই এক ধরনের প্রতীক। যেন গিটারটি তাঁর হাতে ধাতু আর কাঠের তৈরি কোনো যন্ত্র থাকত না—একসময় প্রাণ পেত।

‘চলো বদলে যাই’: সহজ কথার অসাধারণ ক্ষমতা

আইয়ুব বাচ্চুর সংগীতের আরেক শক্তি ছিল তাঁর ভাষা।

তিনি জটিল দর্শনকে কঠিন শব্দে বলার চেষ্টা করেননি। বরং খুব সাধারণ মানুষের খুব সাধারণ ব্যথাকে এমনভাবে লিখেছেন যে সেটিই হয়ে উঠেছে অসাধারণ।

‘চলো বদলে যাই’ ১৯৯৩ সালে লেখা ও সুর করা। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি স্মরণ করেছিলেন, পশ্চিম মালিবাগের বাসায় বসে একদিনে লাইন লিখতে লিখতে এবং গিটারে সুর করতে করতে গানটি তৈরি হয়েছিল। ‘ফেরারি মন’, ‘মাধবী’, ‘উড়াল দেব আকাশে’, ‘হকার’-এর মতো আরও বহু গানে তাঁর গীতিকার সত্তা ধরা পড়ে।

তাঁর প্রেমের গানও তাই নিছক প্রেমের গান হয়ে থাকে না। সেখানে চলে আসে অনুপস্থিতি, অভিমান, না-পাওয়া এবং একাকিত্ব। সে কারণেই হয়তো তাঁর অনেক গান ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে এত সহজে মিশে যায়। কারও কলেজজীবন, কারও প্রথম প্রেম, কারও বিচ্ছেদের রাত—সবকিছুর নিজস্ব সাউন্ডট্র্যাক হয়ে ওঠেন আইয়ুব বাচ্চু।

মানুষের কাছে নেমে আসা তারকা

বড় শিল্পীর চারপাশে সাধারণত একটি দূরত্ব তৈরি হয়। আইয়ুব বাচ্চু সেই দূরত্ব ভাঙতে পছন্দ করতেন।

তাঁকে কাছ থেকে দেখা মানুষদের স্মৃতিতে বারবার উঠে আসে, কনসার্ট বা শুটিং সেটে তিনি শুধু তারকাদের সঙ্গে নয়, কর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গেও কথা বলতেন। আলোকচিত্রী ইমতিয়াজ আলম বেগ স্মরণ করেছেন—পরিচয় বা পেশা দিয়ে মানুষকে বিচার করার প্রবণতা তাঁর ছিল না। নতুন কোনো শিল্পীর গান শোনার অনুরোধ এলেও মন দিয়ে শুনতেন।

মঞ্চেও তাঁর একটি বহুল স্মরণীয় অভ্যাস ছিল। বহু কনসার্টের শেষে গিটারে ‘আমার সোনার বাংলা’র সুর তুলতেন তিনি। শ্রোতারা উঠে দাঁড়িয়ে সেই গিটারের সঙ্গে জাতীয় সংগীত গাইতেন। একটি রক কনসার্ট তখন মুহূর্তের মধ্যে অন্য ধরনের সম্মিলিত আবেগে রূপ নিত।

তরুণ শিল্পীদের জন্য তাঁর দরজাও খোলা ছিল। পার্থ বড়ুয়া স্মরণ করেছেন, পেশাদার সংগীতজীবনের শুরুর দিকে বাচ্চু তাঁকে সাহায্য করেছিলেন, কাজ শিখিয়েছিলেন এবং সুযোগ তৈরি করেছিলেন। নতুন শিল্পীদের অনুশীলন, রেকর্ডিং ও অ্যালবাম প্রকাশে সহায়তার কথাও তাঁর সহকর্মীরা বলেছেন।

একজন তারকার প্রকৃত উত্তরাধিকার সম্ভবত এখানেই—তিনি নিজের জন্য কতটা আলো অর্জন করলেন তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেই আলোয় আর কতজনকে দাঁড়ানোর জায়গা দিলেন।

কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপঞ্জি

সময় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
১৯৭০-এর দশকের শেষভাগ চট্টগ্রামের ব্যান্ড-পরিমণ্ডলে সক্রিয় হন; ফিলিংসের সঙ্গে বাজান
১৯৮০ সোলসে যোগ দেন
১৯৮০–১৯৯০ সোলসের লিড গিটারিস্ট হিসেবে প্রায় এক দশক কাজ
১৯৮৬ প্রথম একক অ্যালবাম রক্তগোলাপ প্রকাশ
১৯৯১ এলআরবি প্রতিষ্ঠা
১৯৯২ এলআরবির অভিষেক ডাবল অ্যালবাম LRB ILRB II প্রকাশ
১৯৯৩ সুখ; ‘চলো বদলে যাই’, ‘রূপালি গিটার’-এর মতো গান প্রতিষ্ঠা পায়
১৯৯৫ একক অ্যালবাম কষ্ট প্রকাশ
১৯৯৬ ফেরারি মন ও আনপ্লাগড আয়োজনের মাধ্যমে নতুন সংগীত-পরীক্ষা
২০০৭ গিটারনির্ভর ইন্সট্রুমেন্টাল অ্যালবাম Sound of Silence প্রকাশ
২০১৭ টেলি সিনে অ্যাওয়ার্ডসে আজীবন সম্মাননা
১৮ অক্টোবর ২০১৮ ঢাকায় মৃত্যুবরণ
২০২৬ সংগীতে অবদানের জন্য মরণোত্তর একুশে পদক

গুরুত্বপূর্ণ অ্যালবাম ও সৃষ্টি

আইয়ুব বাচ্চুর কাজের পরিমাণ এত বিস্তৃত যে কয়েকটি নাম দিয়ে তাঁর সৃষ্টিকে মাপা কঠিন। তবু তাঁর সংগীতযাত্রার প্রধান রেকর্ডগুলোর দিকে তাকালে বিবর্তনের একটি রেখা দেখা যায়।

এলআরবির উল্লেখযোগ্য অ্যালবাম: LRB ILRB II (১৯৯২), সুখ (১৯৯৩), তবুও (১৯৯৪), ঘুমন্ত শহরে (১৯৯৫), ফেরারি মন (১৯৯৬), স্বপ্ন (১৯৯৬), আমাদের বিস্ময় (১৯৯৮), মন চাইলে মন পাবে (২০০০), অচেনা জীবন (২০০৩), মনে আছে নাকি নেই (২০০৫), স্পর্শ (২০০৮) এবং যুদ্ধ (২০১২)।

উল্লেখযোগ্য একক অ্যালবাম: রক্তগোলাপ (১৯৮৬), ময়না (১৯৮৮), কষ্ট (১৯৯৫), সময় (১৯৯৮), একা (১৯৯৯), প্রেম তুমি কি! (২০০২), দুটি মন (২০০২), কাফেলা (২০০২), প্রেম প্রেমের মতো (২০০৩), পথের গান (২০০৪), ভাটির টানে মাটির গানে (২০০৬), জীবন (২০০৬), Sound of Silence (২০০৭), রিমঝিম বৃষ্টি (২০০৮), বলিনি কখনো (২০০৯) এবং জীবনের গল্প (২০১৫)।

যে গানগুলো তাঁকে বারবার ফিরিয়ে আনে

তাঁর বহুল স্মরণীয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • ‘চলো বদলে যাই’
  • ‘সেই তুমি’
  • ‘রূপালি গিটার’
  • ‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে’
  • ‘ফেরারি এই মনটা আমার’
  • ‘ঘুমন্ত শহরে’
  • ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’
  • ‘কেউ সুখী নয়’
  • ‘হাসতে দেখো গাইতে দেখো’
  • ‘এখন অনেক রাত’
  • ‘গতকাল রাতে’
  • ‘তারা ভরা রাতে’
  • ‘মেয়ে তুমি কি দুঃখ চেনো’
  • ‘বাংলাদেশ’
  • ‘উড়াল দেব আকাশে’
  • ‘এক আকাশের তারা’
  • ‘মাধবী’
  • ‘হকার’

চলচ্চিত্রের জন্য তাঁর কণ্ঠ ও সংগীতায়োজনেও ‘আম্মাজান’, ‘সাগরিকা’, ‘অনন্ত প্রেম’ এবং ‘আমি তো প্রেমে পড়িনি’র মতো জনপ্রিয় গান রয়েছে।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

আইয়ুব বাচ্চু জীবদ্দশায় জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় পুরস্কার পেয়েছিলেন শ্রোতার কাছ থেকে। আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির তালিকাতেও রয়েছে মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার, এলআরবির সঙ্গে সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড, ২০০৪ সালে বাচসাসের সেরা পুরুষ কণ্ঠশিল্পীর স্বীকৃতি এবং ২০১৭ সালের টেলি সিনে আজীবন সম্মাননা।

তবে তাঁর মৃত্যুর প্রায় সাড়ে সাত বছর পর এলো রাষ্ট্রের একটি বিশেষ স্বীকৃতি। ২০২৬ সালে সংগীতে অবদানের জন্য আইয়ুব বাচ্চুকে মরণোত্তর একুশে পদক দেওয়া হয়। তাঁর পক্ষে পুরস্কার গ্রহণ করেন স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার চন্দনা।

স্বীকৃতিটি এমন এক সময়ে এলো, যখন আইয়ুব বাচ্চুর প্রভাব আর শুধু স্মৃতির বিষয় নয়; সেটি ইতিমধ্যে উত্তরাধিকারে রূপ নিয়েছে।

শেষ মঞ্চ, শেষ অনুশীলন, অসমাপ্ত যাত্রা

২০১৮ সালের জুনে দ্য ডেইলি স্টার যখন তাঁর দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেয়, তখনও তিনি নতুন গান নিয়ে ব্যস্ত। সাংবাদিক তাঁর কাছে পৌঁছে দেখেছিলেন, তিনি গিটার অনুশীলন করছেন এবং পরবর্তী অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এত বছরের সাফল্যের পরও তাঁর বক্তব্য ছিল—একজন সংগীতশিল্পীর যাত্রা শেষ হয় না; তাঁর নিজের ‘সেরা কাজ’ এখনো সামনে।

এই কথাটি এখন ফিরে পড়লে বেদনাদায়ক মনে হয়।

কারণ সামনে সময় ছিল খুব অল্প।

২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর সকালে হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যায় ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়। দুই দিন আগেও তিনি রংপুরে মঞ্চে উঠেছিলেন। মৃত্যুর পর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে মানুষের ঢল নামে। পরে চট্টগ্রামে মায়ের কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়—যেটি ছিল তাঁর নিজের ইচ্ছাও।

একজন রক তারকার শেষযাত্রায় এত সাধারণ মানুষের উপস্থিতি আসলে অন্য একটি সত্য দেখিয়েছিল—আইয়ুব বাচ্চু কেবল সংগীতজগতের মানুষ ছিলেন না। তিনি বহু মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতির অংশ হয়ে গিয়েছিলেন।

Ayub Bachchu Legacy

চলে যাওয়ার পরও যে গিটার থামেনি

মৃত্যুর পর শিল্পীর জনপ্রিয়তা টিকে থাকা আর তাঁর কাজ জীবন্ত থাকা এক জিনিস নয়।

আইয়ুব বাচ্চুর ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ঘটনাটিই ঘটেছে।

নতুন প্রজন্ম এখনো তাঁর গান কাভার করে। তরুণ গিটারিস্টরা তাঁর সলো শিখে। কনসার্টে ‘চলো বদলে যাই’ শুরু হলে এমন শ্রোতাও গলা মেলান, যাঁদের জন্ম গানটির প্রকাশের বহু পরে। পার্থ বড়ুয়া থেকে শুরু করে অসংখ্য সংগীতশিল্পী তাঁকে নিজেদের পেশাদার যাত্রার শিক্ষক ও প্রেরণা হিসেবে স্মরণ করেছেন।

২০২৬ সালের জন্মদিনে সেই উত্তরাধিকার আরও দৃশ্যমান। আটটি ব্যান্ড ও একাধিক একক শিল্পীর কণ্ঠে তাঁর ২০টি গান নতুন সংগীতায়োজনে প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে উত্তরাধিকার নামে। প্রকল্পটির আয় আইয়ুব বাচ্চুর স্মৃতি, ব্যবহৃত গিটার ও সংগীতসামগ্রী নিয়ে পরিকল্পিত জাদুঘর নির্মাণের কাজে ব্যবহারের কথা রয়েছে। তাঁর পরিবারের কাছে এখনো প্রায় ৫০টি গিটারসহ বহু স্মারক সংরক্ষিত রয়েছে।

এ যেন যথার্থই উত্তরাধিকার—গান শুধু সংরক্ষণ নয়, নতুন কণ্ঠে আবার জন্ম নেওয়া।

রূপালি গিটার এখন কার হাতে?

আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে লিখতে গেলে শেষ পর্যন্ত গিটারের কাছেই ফিরে আসতে হয়।

একদিন চট্টগ্রামের এক কিশোর একটি সাধারণ অ্যাকুস্টিক গিটার হাতে নিয়েছিল। সেই কিশোরকে হয়তো তখন কেউ বলেনি, তার আঙুলের ভেতর দিয়ে একদিন একটি দেশের কয়েক প্রজন্মের আবেগ প্রবাহিত হবে। কেউ জানত না, ছয়শ টাকা হাতে ঢাকা শহরে আসা সেই তরুণ একদিন হাজারো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে একটি মাত্র গিটার দিয়ে মঞ্চকে ঝড়ের মতো নাড়িয়ে দেবেন।

তিনি নিজেও সম্ভবত জানতেন না।

কিন্তু তিনি জানতেন, তাঁকে বাজাতে হবে।

এই বিশ্বাসটুকুই হয়তো আইয়ুব বাচ্চুর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। প্রতিভা তাঁকে অনেক দূর নিয়ে গেছে, কিন্তু তার চেয়েও দূরে নিয়ে গেছে অনুশীলন, একাগ্রতা এবং নিজের নির্বাচিত জীবনের প্রতি নিষ্ঠা। তাঁর শেষ দিকের সাক্ষাৎকারেও সেই একই মানুষকে দেখা যায়—যাঁর ঘরে পুরস্কার আছে, খ্যাতি আছে, অসংখ্য ভক্ত আছে, অথচ তিনি তখনও গিটার হাতে অনুশীলন করছেন।

‘রূপালি গিটার’ এখন আর একজন মানুষের হাতে নেই।

সেটি ছড়িয়ে গেছে অগণিত হাতে।

কোনো তরুণ যখন প্রথমবার একটি গিটার কাঁধে তুলে নেয়, কোনো ব্যান্ড যখন সাহস করে নিজের ভাষায় নিজের শব্দ তৈরি করতে চায়, কোনো শ্রোতা বহু বছর পর পুরোনো একটি গান শুনে আচমকা নিজের ফেলে আসা সময়ে ফিরে যায়—সেখানেই আইয়ুব বাচ্চুর রেখে যাওয়া সেই জাদুকরী মায়া কাজ করে।

জাদুকর মঞ্চ থেকে চলে গেছেন।

কিন্তু তাঁর রূপালি গিটারের শেষ নোটটি এখনো বাজেনি।

সর্বশেষ