বাংলা চলচ্চিত্রে সায়েন্স ফিকশন কেন কম? ৬টি উল্লেখযোগ্য বাংলা Sci-Fi সিনেমা

সর্বাধিক আলোচিত

বিশ্ব চলচ্চিত্রে কল্পবিজ্ঞান বা সায়েন্স ফিকশন একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং ব্যবসা সফল ধারা। হলিউড থেকে শুরু করে বলিউডেও এই ধারার সিনেমার জয়জয়কার। কিন্তু আমাদের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে, বাংলা চলচ্চিত্রে সায়েন্স ফিকশন কেন এত কম? দর্শক হিসেবে আমাদের মনে এই ভিন্ন ঘরানার সিনেমা নিয়ে প্রচুর কৌতূহল রয়েছে। তবুও, মূলধারার পরিচালকরা এই পথে হাঁটতে দ্বিধা বোধ করেন। বিখ্যাত পরিচালক সত্যজিৎ রায় একসময় হলিউডের সঙ্গে মিলে ‘দি অ্যালিয়েন’ নামের একটি দুর্দান্ত সিনেমা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, যা নানা কারণে আর আলোর মুখ দেখেনি। সেই প্রজেক্টটি সফল হলে হয়তো আজ ইতিহাস অন্যরকম হতো।

এই আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করব কেন টলিউড বা ঢালিউডে কল্পবিজ্ঞান সিনেমার অভাব রয়েছে। একইসঙ্গে, আমরা সেরা ৬টি উল্লেখযোগ্য বাংলা Sci-Fi সিনেমা সম্পর্কে বিস্তারিত জানব, যা দর্শকদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছে এবং এই ধারায় নতুন পথ দেখিয়েছে।

কেন বাংলা চলচ্চিত্রে সায়েন্স ফিকশন এত বিরল?

Why is science fiction so rare in Bengali films?

সিনেমা প্রেমীদের মনে প্রায়ই একটি আক্ষেপ থাকে যে, আমরা কেন নিয়মিত উন্নত মানের বাংলা সায়েন্স ফিকশন সিনেমা পাই না। এর পেছনে কেবল সদিচ্ছার অভাব নয়, বরং বেশ কয়েকটি যৌক্তিক ও কাঠামোগত কারণ রয়েছে। নিচে সেই কারণগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

স্বল্প বাজেট

সায়েন্স ফিকশন সিনেমা তৈরির জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়। উন্নত সেট ডিজাইন, স্পেসশিপ, ভবিষ্যতের গ্যাজেট, কস্টিউম এবং প্রযুক্তির জন্য যে পরিমাণ বাজেটের দরকার, বাংলা সিনেমায় সাধারণত তা থাকে না। সীমিত বাজেটের কারণে পরিচালকরা এই ধরনের বড় প্রজেক্ট হাতে নিতে ভয় পান এবং নিরাপদ গল্পের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

সীমিত ভিএফএক্স (VFX) প্রযুক্তি

কল্পবিজ্ঞানের গল্পকে পর্দায় জীবন্ত করতে উচ্চমানের ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস (VFX) এবং কম্পিউটার জেনারেটেড ইমেজারির (CGI) অত্যন্ত জরুরি। আমাদের দেশীয় স্টুডিওগুলোতে হলিউড বা দক্ষিণী সিনেমার মতো উন্নত ভিএফএক্স প্রযুক্তি বা দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। ফলে অনেক সময় গল্প ভালো হলেও ভিজ্যুয়াল দুর্বল থেকে যাওয়ার কারণে দর্শক সিনেমাটি গ্রহণ করেন না।

প্রযোজকদের জন্য ঝুঁকির কারণ

যেকোনো নতুন বা ভিন্নধর্মী সিনেমা প্রযোজকদের জন্য একটি বড় ঝুঁকি। যেহেতু সায়েন্স ফিকশন সিনেমা তৈরি করতে খরচ সাধারণ সিনেমার তুলনায় অনেক বেশি, তাই বক্স অফিসে সিনেমাটি ব্যর্থ হলে প্রযোজকদের বিশাল ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। এই আর্থিক ঝুঁকির কারণেই বিনিয়োগকারীরা কল্পবিজ্ঞানের গল্পে টাকা ঢালতে পিছিয়ে যান।

দর্শকের চাহিদার অভাব ও নির্দিষ্ট গণ্ডি

দীর্ঘদিন ধরে বাঙালি দর্শক পারিবারিক ড্রামা, রোমান্টিক সিনেমা বা গোয়েন্দা থ্রিলার দেখতে বেশি অভ্যস্ত। মূলধারার দর্শক এখনো পুরোপুরি কল্পবিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হননি। সায়েন্স ফিকশনের একটি নির্দিষ্ট বা নিস দর্শকশ্রেণি রয়েছে। তবে ধীরে ধীরে ইন্টারনেট এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কারণে দর্শকদের এই রুচির পরিবর্তন ঘটছে।

সিনেমায় কল্পবিজ্ঞানের গল্পের ঐতিহ্যের অভাব

আমাদের সিনেমা জগতে সায়েন্স ফিকশন গল্প বলার কোনো ধারাবাহিক ঐতিহ্য গড়ে ওঠেনি। গুটিকয়েক পরিচালক মাঝে মাঝে সাহস দেখালেও, একটি নিয়মিত ধারা বা ফ্র্যাঞ্চাইজি তৈরি হয়নি। একটি ঐতিহ্য থাকলে তা দর্শকদের এই ঘরানার প্রতি ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করে তুলত।

সাহিত্য বনাম সিনেমা নির্মাণের গ্যাপ

বাংলা সাহিত্যে প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘ঘনাদা’, সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রফেসর শঙ্কু’ বা মুহম্মদ জাফর ইকবালের অসংখ্য চমৎকার সব কল্পবিজ্ঞানের গল্প রয়েছে। আমাদের সাহিত্য কল্পবিজ্ঞানে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। কিন্তু সেই চমৎকার সাহিত্যগুলোকে সিনেমার পর্দায় সফলভাবে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে একটি বড় গ্যাপ বা দূরত্ব রয়ে গেছে।

৬টি উল্লেখযোগ্য বাংলা Sci-Fi সিনেমা

নানান সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান পরিচালক সাহস করে উন্নত মানের বাংলা কল্পবিজ্ঞান সিনেমা নির্মাণ করেছেন। নিচে এমনই ৬টি সিনেমার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হলো, যা প্রতিটি সিনেমাপ্রেমীর দেখা উচিত।

১. পাতালঘর (Patalghar)

মুক্তির বছর: ২০০৩

পরিচালক: অভিজিৎ চৌধুরী

প্রধান অভিনয়শিল্পী: সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, জয় সেনগুপ্ত, খরাজ মুখোপাধ্যায়, মিতা বশিষ্ঠ, কেতকী দত্ত

গল্পের বিস্তারিত সারাংশ:

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের বিখ্যাত শিশুতোষ উপন্যাস অবলম্বনে এই সিনেমাটি নির্মিত। প্রায় ১৫০ বছর আগে অঘোর সেন নামের এক খামখেয়ালি ও প্রতিভাবান বিজ্ঞানী এমন একটি অদ্ভুত যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন, যা থেকে নির্গত তরঙ্গ যেকোনো মানুষকে ঘুম পাড়িয়ে দিতে পারে। বর্তমান সময়ে ডক্টর ভূতনাথ নন্দী (জয় সেনগুপ্ত) একটি পুরনো ডায়েরি থেকে সেই যন্ত্রটির খোঁজ পান এবং সেটি উদ্ধারের জন্য নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের ‘পাতালঘর’ বা ভূগর্ভস্থ ল্যাবরেটরিতে পৌঁছান। একইসঙ্গে একদল ভিনগ্রহের প্রাণী (অ্যালিয়েন) এবং বেগমের (মিতা বশিষ্ঠ) মতো কিছু ভয়ংকর অপরাধীও সেই যন্ত্রটি দখল করতে চায়। কার্তিক নামের এক সাহসী ছেলে এবং ডক্টর নন্দী মিলে কীভাবে তাদের প্রতিহত করে, সেটাই এই সিনেমার মূল গল্প।

সায়েন্স ফিকশন বা কল্পবিজ্ঞানের উপাদান:

এই সিনেমায় একটি অদ্ভুত ক্ষমতাসম্পন্ন ঘুম পাড়ানি যন্ত্র, ক্রায়োস্লিপ বা দীর্ঘকাল ঘুমিয়ে থাকার ধারণা, এবং ছদ্মবেশী ভিনগ্রহের প্রাণীদের (অ্যালিয়েন) উপস্থিতি রয়েছে। এছাড়া পুরোনো দিনের উন্নত ল্যাবরেটরির নকশা এটিকে অনন্য করেছে।

সাংস্কৃতিক বা সিনেমাটিক গুরুত্ব:

২০০৩ সালে দাঁড়িয়ে এমন একটি বুদ্ধিদীপ্ত কমেডি ও সায়েন্স ফিকশনের মিশ্রণ তৈরি করা বাংলা চলচ্চিত্রে একটি বড় মাইলফলক ছিল। দেবজ্যোতি মিশ্রের অসাধারণ আবহসংগীত এবং দুর্দান্ত কাস্টিং প্রমাণ করেছিল যে, সীমিত প্রযুক্তি ব্যবহার করেও দুর্দান্ত একটি বাংলা Sci-Fi সিনেমা তৈরি করা সম্ভব।

এক নজরে

সিনেমার নাম মুক্তির বছর পরিচালক ধরন (জঁরা) প্রধান অভিনয়শিল্পী আইএমডিবি (IMDb) রেটিং সংক্ষিপ্ত কাহিনি 
পাতালঘর ২০০৩ অভিজিৎ চৌধুরী কল্পবিজ্ঞান ও কমেডি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, জয় সেনগুপ্ত ৭.১/১০ একদল ভিনগ্রহের প্রাণী ও দুষ্কৃতী একটি ঘুম পাড়ানি যন্ত্র খুঁজছে, যা একজন বিজ্ঞানী ১৫০ বছর আগে আবিষ্কার করেছিলেন।

২. বুমেরাং (Boomerang)

মুক্তির বছর: ২০২৪

পরিচালক: শৌভিক কুণ্ডু

প্রধান অভিনয়শিল্পী: জিৎ, রুক্মিণী মৈত্র, সৌরভ দাস, দেবচন্দ্রিমা সিংহ রায়

গল্পের বিস্তারিত সারাংশ:

সমর সেন (জিৎ) একজন অত্যন্ত মেধাবী বিজ্ঞানী এবং উদ্ভাবক। তিনি একটি বিশেষ স্পোর্টস বাইক ‘বুমেরাং’ তৈরি করেছেন। নিরলস গবেষণার পর তিনি একটি অত্যাধুনিক হিউম্যানয়েড রোবট আবিষ্কার করেন, যার নাম তিনি দেন নিশা। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, রোবটটি দেখতে হুবহু তার স্ত্রী ইশার (রুক্মিণী মৈত্র) মতো। সমরের বন্ধু এবং অন্যান্য চরিত্ররা আসল স্ত্রী ও রোবট স্ত্রীর মধ্যে পার্থক্য করতে গিয়ে চূড়ান্ত বিভ্রান্তির শিকার হয়। রোবটের যান্ত্রিক আচরণ এবং স্ত্রীর মানবিক আবেগের এই দ্বন্দ্ব নিয়েই কমেডিতে ভরপুর সিনেমার গল্প এগিয়ে যায়।

সায়েন্স ফিকশন বা কল্পবিজ্ঞানের উপাদান:

সিনেমার মূল সায়েন্স ফিকশন উপাদান হলো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং হিউম্যানয়েড রোবোটিক্স। ভবিষ্যতে কীভাবে একটি এআই (AI) চালিত রোবট মানুষের আবেগ এবং আচরণ নকল করতে পারে এবং সমাজের অংশ হতে পারে, তা এখানে মজার ছলে দেখানো হয়েছে।

সাংস্কৃতিক বা সিনেমাটিক গুরুত্ব:

মূলধারার কমার্শিয়াল সিনেমায়, বিশেষ করে সুপারস্টার জিৎ-এর নিজস্ব প্রযোজনায় এমন একটি বাংলা Sci-Fi সিনেমা নির্মাণ টলিউডের জন্য একটি বড় এবং সাহসী পদক্ষেপ। এটি সাধারণ দর্শকদের কল্পবিজ্ঞানের ভারী বিষয়গুলোর সঙ্গে হাসির মাধ্যমে পরিচিত করতে দারুণ ভূমিকা রেখেছে।

এক নজরে

সিনেমার নাম মুক্তির বছর পরিচালক ধরন প্রধান অভিনয়শিল্পী আইএমডিবি (IMDb) রেটিং সংক্ষিপ্ত কাহিনি
বুমেরাং ২০২৪ শৌভিক কুণ্ডু কল্পবিজ্ঞান ও কমেডি জিৎ, রুক্মিণী মৈত্র ৬.৫/১০ একজন বিজ্ঞানী তার স্ত্রীর চেহারার হুবহু নকল একটি এআই রোবট তৈরি করেন, যা চরম হাসির বিভ্রান্তি তৈরি করে।

Best Bengali Sci-Fi Movies

৩. অ্যাবি সেন (Abby Sen)

মুক্তির বছর: ২০১৫

পরিচালক: অতনু ঘোষ

প্রধান অভিনয়শিল্পী: আবির চট্টোপাধ্যায়, রাইমা সেন, চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী, অরুণিমা ঘোষ

গল্পের বিস্তারিত সারাংশ:

অ্যাবি সেন (আবির চট্টোপাধ্যায়) একজন সৎ কিন্তু ব্যর্থ টেলিভিশন প্রডিউসার, যে কলকাতা শহরে কোনো চাকরি টিকিয়ে রাখতে পারে না। পরপর সাতটি চাকরি হারানোর পর চরম হতাশায় সে এক রহস্যময় বিজ্ঞানীর (চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী) খোঁজ পায়। সেই বিজ্ঞানী অ্যাবিকে একটি টাইম ট্রাভেল ক্যাপসুলের মাধ্যমে ২০১৩ সাল থেকে ১৯৮০ সালের কলকাতায় পাঠিয়ে দেন, কারণ তখনকার দিনে টেলিভিশন জগতে প্রতিযোগিতা কম ছিল এবং চাকরি পাওয়া তুলনামূলক সহজ ছিল। কিন্তু অতীতে গিয়ে অ্যাবি শুধু যে সফল হয় তা নয়, বরং ১৯৮০ সালের মানুষের জীবনযাপন, আবেগ এবং নতুন সম্পর্কের জটিলতায় জড়িয়ে পড়ে।

সায়েন্স ফিকশন বা কল্পবিজ্ঞানের উপাদান:

টাইম ট্রাভেল বা সময় ভ্রমণই এই সিনেমার প্রধান সায়েন্স ফিকশন অনুষঙ্গ। অতীত ও বর্তমানের মধ্যে সময়ের প্যারাডক্স (Time Paradox) কীভাবে একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে, তা এখানে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

সাংস্কৃতিক বা সিনেমাটিক গুরুত্ব:

মহাকাশ বা ভিনগ্রহের প্রাণীর বদলে, খুব সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবনের বেকারত্বের সমস্যার সঙ্গে টাইম ট্রাভেলকে যুক্ত করার এই অভিনব প্রয়াস সত্যিই প্রশংসনীয়। ১৯৮০ সালের কলকাতার দুর্দান্ত সেট ডিজাইন এই সিনেমাকে এক নস্টালজিক মাত্রা দিয়েছে।

এক নজরে

সিনেমার নাম মুক্তির বছর পরিচালক ধরন (জঁরা) প্রধান অভিনয়শিল্পী আইএমডিবি (IMDb) রেটিং সংক্ষিপ্ত কাহিনি
অ্যাবি সেন ২০১৫ অতনু ঘোষ কল্পবিজ্ঞান ও ড্রামা আবির চট্টোপাধ্যায়, রাইমা সেন ৬.৫/১০ চাকরি পেতে ব্যর্থ একজন টিভি প্রডিউসার সময় ভ্রমণের মাধ্যমে ১৯৮০ সালের কলকাতায় পাড়ি জমান।

৪. পরবাসিনী (Porobashinee)

মুক্তির বছর: ২০১৭

পরিচালক: স্বপন আহমেদ

প্রধান অভিনয়শিল্পী: মামনুন হাসান ইমন, রীথ মজুমদার, সব্যসাচী চক্রবর্তী, উর্বশী রাউতেলা

গল্পের বিস্তারিত সারাংশ:

পৃথিবীর উপর একদল বুদ্ধিমান ও ভয়ংকর ভিন্ন গ্রহের প্রাণীর (অ্যালিয়েন) আক্রমণ এবং মানবজাতিকে রক্ষার আন্তর্জাতিক মিশন নিয়ে এর গল্প গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের গোয়েন্দা বিভাগের একদল বিশেষ এজেন্ট অ্যালিয়েনদের মহাকাশযান এবং তাদের গোপন ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনার কথা জানতে পারে। এরপর পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে তারা ইউরোপ ও অন্যান্য দেশে এক ভয়ংকর আন্তর্জাতিক মহাকাশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, যেখানে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

সায়েন্স ফিকশন বা কল্পবিজ্ঞানের উপাদান:

ভীনগ্রহের প্রাণী, স্পেসশিপ, ইন্টারগ্যালাকটিক ওয়ার বা আন্তঃগ্রহ মিশন এবং ভবিষ্যতের লেজার অস্ত্রের ব্যবহার এই সিনেমার প্রধান সায়েন্স ফিকশন উপাদান।

সাংস্কৃতিক বা সিনেমাটিক গুরুত্ব:

‘পরবাসিনী’ বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ এবং বড় বাজেটের সায়েন্স ফিকশন সিনেমা। ইউরোপের বিভিন্ন লোকেশনে এর শুটিং হয়েছিল। যদিও চিত্রনাট্য এবং ভিএফএক্সের কিছু দুর্বলতার কারণে এটি বক্স অফিসে আশানুরূপ সফল হয়নি, তবুও ঢালিউডে বাংলা চলচ্চিত্রে সায়েন্স ফিকশন ধারার সূত্রপাত ঘটানোর জন্য এটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।

এক নজরে

সিনেমার নাম মুক্তির বছর পরিচালক ধরন (জঁরা) প্রধান অভিনয়শিল্পী আইএমডিবি (IMDb) রেটিং সংক্ষিপ্ত কাহিনি (১ লাইনে)
পরবাসিনী ২০১৭ স্বপন আহমেদ কল্পবিজ্ঞান ও অ্যাকশন ইমন, রীথ মজুমদার ৪.১/১০ পৃথিবীকে একদল ভয়ংকর ভিনগ্রহের প্রাণীর আক্রমণ থেকে বাঁচাতে এজেন্টদের একটি আন্তর্জাতিক মিশন।

৫. বনি (Boni)

মুক্তির বছর: ২০২১

পরিচালক: পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়

প্রধান অভিনয়শিল্পী: পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, কোয়েল মল্লিক, অঞ্জন দত্ত, কাঞ্চন মল্লিক

গল্পের বিস্তারিত সারাংশ:

ইতালির মিলান শহরে বসবাসরত এক প্রবাসী বাঙালি দম্পতি সব্যসাচী ও প্রতিভার (পরমব্রত ও কোয়েল) ঘরে একটি বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন শিশুর জন্ম হয়। তারা ধীরে ধীরে বুঝতে পারে শিশুটি সাধারণ নয়, তার মধ্যে অতিপ্রাকৃত কিছু ক্ষমতা রয়েছে। অন্যদিকে, আমেরিকা থেকে বিতাড়িত একজন উন্মাদ বিজ্ঞানী (অঞ্জন দত্ত) তার জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অশুভ গবেষণার জন্য এই শিশুটিকে হন্যে হয়ে খুঁজছেন। বাবা-মা তাদের সদ্যোজাত সন্তানকে সেই ভয়ংকর বিজ্ঞানীর হাত থেকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন।

সায়েন্স ফিকশন বা কল্পবিজ্ঞানের উপাদান:

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, হিউম্যান ক্লোনিং, বায়ো-টেকনোলজি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) মতো আধুনিক বিজ্ঞানের জটিল ও ডার্ক বিষয়গুলো এই গল্পে উঠে এসেছে।

সাংস্কৃতিক বা সিনেমাটিক গুরুত্ব:

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের জনপ্রিয় কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস ‘বনি’ অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমাটি ইউরোপের চমৎকার লোকেশনে চিত্রায়িত। আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং বৈজ্ঞানিক নৈতিকতার প্রশ্নগুলোকে এটি চমৎকারভাবে দর্শকের সামনে তুলে ধরেছে, যা বাংলা সিনেমায় বেশ বিরল।

এক নজরে

সিনেমার নাম মুক্তির বছর পরিচালক ধরন (জঁরা) প্রধান অভিনয়শিল্পী আইএমডিবি (IMDb) রেটিং সংক্ষিপ্ত কাহিনি (১ লাইনে)
বনি ২০২১ পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় কল্পবিজ্ঞান থ্রিলার পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, কোয়েল মল্লিক ৫.৪/১০ ইতালিতে এক বাঙালি দম্পতি তাদের বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন নবজাতককে এক উন্মাদ বিজ্ঞানীর হাত থেকে রক্ষার চেষ্টা করে।

৬. প্রফেসর শঙ্কু ও এল ডোরাডো (Professor Shanku O El Dorado)

মুক্তির বছর: ২০১৯

পরিচালক: সন্দীপ রায়

প্রধান অভিনয়শিল্পী: ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়, শুভাশিস মুখোপাধ্যায়, এদুয়ার্দো মুনিজ

গল্পের বিস্তারিত সারাংশ:

বাঙালি বিজ্ঞানী প্রফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু (ধৃতিমান) তার অদ্ভুত ক্ষমতার অধিকারী বন্ধু নকুড় বাবুকে (শুভাশিস) নিয়ে আমাজন জঙ্গলের গভীরে অবস্থিত রূপকথার সোনার শহর ‘এল ডোরাডো’-এর সন্ধানে একটি রোমাঞ্চকর অভিযানে বের হন। নকুড় বাবুর ভবিষ্যদ্বাণী করার অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা তাদের অনেক বিপদ থেকে রক্ষা করে। সেখানে গিয়ে তারা এক আদিবাসী উপজাতির মুখোমুখি হন এবং একদল লোভী আন্তর্জাতিক গুপ্তধনের সন্ধানীর সঙ্গে লড়াই করে সেই লুকানো শহরের গভীর রহস্য উন্মোচন করেন।

সায়েন্স ফিকশন বা কল্পবিজ্ঞানের উপাদান:

প্রফেসর শঙ্কুর আবিষ্কৃত অদ্ভুত সব যন্ত্র এই সিনেমার মূল সায়েন্স ফিকশন আকর্ষণ। এর মধ্যে রয়েছে অ্যানাইহিলিন পিস্তল (যা শত্রুকে হত্যা না করে নিশ্চিহ্ন করে দেয়), মিরাকিউরল (সব রোগের অব্যর্থ ওষুধ), এবং অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক সেন্সর।

সাংস্কৃতিক বা সিনেমাটিক গুরুত্ব:

সত্যজিৎ রায়ের অমর সৃষ্টি এবং বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় বিজ্ঞানী চরিত্র ‘প্রফেসর শঙ্কু’ প্রথমবারের মতো বড় পর্দায় আসে এই সিনেমার মাধ্যমে। এটি শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষের মধ্যে কল্পবিজ্ঞানের প্রতি নতুন করে ভালোবাসা জাগিয়ে তোলে। আমাজন জঙ্গলে এর চিত্রায়ণ সিনেমাটিকে একটি আন্তর্জাতিক রূপ দিয়েছে।

এক নজরে

সিনেমার নাম মুক্তির বছর পরিচালক ধরন (জঁরা) প্রধান অভিনয়শিল্পী আইএমডিবি (IMDb) রেটিং সংক্ষিপ্ত কাহিনি (১ বিলম্ব)
প্রফেসর শঙ্কু ও এল ডোরাডো ২০১৯ সন্দীপ রায় কল্পবিজ্ঞান ও অ্যাডভেঞ্চার ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায় ৬.৮/১০ বাঙালি বিজ্ঞানী প্রফেসর শঙ্কু তার অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে আমাজনের বুকে সোনার শহর এল ডোরাডো খুঁজতে যান।

এই তালিকাটি প্রস্তুত করার সময় এবং বাংলা কল্পবিজ্ঞান সিনেমার বিবর্তন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার পর একটি বিষয় আমার কাছে অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আমাদের বাংলা সাহিত্য সায়েন্স ফিকশনে যতটা সমৃদ্ধ, সিনেমা শিল্প ঠিক ততটাই পিছিয়ে রয়েছে। সত্যজিৎ রায় যখন হলিউডে গিয়ে ‘দি অ্যালিয়েন’ নির্মাণের চেষ্টা করেছিলেন, তখন যদি প্রজেক্টটি সফল হতো, তবে হয়তো আজ বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস অন্যরকম হতো। আমরা প্রায়ই বাজেটের অভাবকে মূল কারণ হিসেবে দাঁড় করাই, কিন্তু আমার মনে হয়, মূল সংকটটি হলো দূরদর্শিতা এবং সাহসের অভাব।

‘পাতালঘর’ বা ‘অ্যাবি সেন’-এর মতো সিনেমাগুলো প্রমাণ করে যে, বুদ্ধিদীপ্ত চিত্রনাট্য থাকলে বিশাল বাজেটের ভিএফএক্স ছাড়াও দুর্দান্ত সায়েন্স ফিকশন তৈরি করা সম্ভব। বর্তমান প্রজন্মের দর্শকরা মার্ভেল বা ডিসির সিনেমা দেখে অভ্যস্ত হলেও, তারা কিন্তু নিজেদের শিকড়ের সাথে যুক্ত গল্প দেখতে চায়। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বা মুহম্মদ জাফর ইকবালের কিংবা হুমায়ুন আহমেদ এর অসাধারণ কল্পবিজ্ঞানের গল্পগুলো যদি সঠিক ভিজ্যুয়াল ট্রিটমেন্ট পায়, তবে তা শুধু বাংলা নয়, বিশ্বমঞ্চেও সমাদৃত হতে বাধ্য। ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো এই শূন্যস্থান পূরণে এগিয়ে এলে আগামী দিনে আমরা হয়তো বাংলা সিনেমায় একটি নতুন এবং শক্তিশালী কল্পবিজ্ঞান ধারার সূচনা দেখতে পাব।

ভবিষ্যতের দিশা ও আমাদের প্রত্যাশা: বাংলা কল্পবিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত

বাংলা চলচ্চিত্রে কল্পবিজ্ঞানের পথচলা এখনো খুব একটা মসৃণ নয়। তবে, ভবিষ্যতের সম্ভাবনা কিন্তু অত্যন্ত উজ্জ্বল। বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট এবং ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্মগুলোর উত্থানের ফলে নির্মাতারা নতুন নতুন গল্প নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার অভাবনীয় স্বাধীনতা পাচ্ছেন।

এখনকার নির্মাতারা গল্প বলার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সাহসী হয়ে উঠছেন। বিশ্বজুড়ে ভিএফএক্স (VFX) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতির কারণে আগের মতো বিশাল বাজেটের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমেছে। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার জানলে সীমিত বাজেটেও দারুণ ভিজ্যুয়াল তৈরি করা সম্ভব, যা ইতিমধ্যে কিছু স্বাধীন নির্মাতা প্রমাণ করেছেন।

নতুন প্রজন্মের দর্শকরাও এখন অনেক বেশি স্মার্ট। তারা প্রতিনিয়ত আন্তর্জাতিক মানের কন্টেন্ট দেখে অভ্যস্ত। তাই নির্মাতাদের ওপর ভালো মানের বাংলা Sci-Fi সিনেমা তৈরির একটি ইতিবাচক চাপ তৈরি হয়েছে। আশা করা যায়, আগামী দিনগুলোতে আমাদের পরিচালকরা দেশীয় পুরাণ, আধুনিক বিজ্ঞান ও আমাদের শক্তিশালী সাহিত্যের সংমিশ্রণে এমন সব মাস্টারপিস তৈরি করবেন, যা বিশ্বমঞ্চে বাংলা সিনেমাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

সর্বশেষ