মঞ্চের আলো যখন ধীরে ধীরে নিভে আসে এবং একটি মাত্র স্পটলাইট এসে পড়ে অভিনেতার চোখে-মুখে, তখন শুরু হয় এক জাদুকরী মুহূর্ত। দর্শকের শ্বাসরুদ্ধকর নীরবতা আর অভিনেতার সংলাপের মাঝে তৈরি হয় এক অদৃশ্য সেতু। এই সেতু নির্মাণের রয়েছে দীর্ঘ ও বর্ণিল এক নাটকীয় বিবর্তন। হাজার বছরের পুরোনো লোকজ আঙ্গিক থেকে শুরু করে ব্রিটিশদের হাত ধরে আসা কাঠামোগত মঞ্চ, এবং সেখান থেকে নিজেদের মাটির কাছাকাছি ফিরে যাওয়ার এক অনবদ্য যাত্রার গল্পই বাংলা নাটকের বিবর্তন – ইতিহাস।
বাংলা থিয়েটারের বিবর্তন কেবল বিনোদনের গল্প নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয় খোঁজার গল্প। উপনিবেশিক শাসনামলে ইউরোপীয় ধাঁচের প্রসেনিয়াম থিয়েটার আমাদের মঞ্চে জাঁকিয়ে বসেছিল। মঞ্চের তিন দিক বন্ধ, একদিকে দর্শক—যেন একটি ছবির ফ্রেমের ভেতর জীবনকে দেখার আয়োজন। কিন্তু বাঙালি কেবল সেই ফ্রেমে আবদ্ধ থাকতে চায়নি। সময়ের সাথে সাথে, সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার তাগিদে প্রসেনিয়াম থিয়েটার থেকে বেরিয়ে এসে বাংলা নাট্যচর্চা খুঁজে নিয়েছে তার নিজস্ব শিকড়। তৈরি হয়েছে এমন এক স্বকীয় বাংলা থিয়েটার, যার ভাষা, প্রকাশভঙ্গি এবং স্পন্দন একান্তই এই বদ্বীপের মানুষের। এই বিবর্তনের প্রতিটি ধাপে লুকিয়ে আছে সংগ্রাম, নিরীক্ষা এবং স্বকীয়তা নির্মাণের অবিরাম চেষ্টা।
এই সুদীর্ঘ পথপরিক্রমা বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই প্রাচীন শেকড়ের কাছে, যেখান থেকে বাংলার নিজস্ব নাট্য আঙ্গিকের জন্ম হয়েছিল।
প্রাচীন ও লোকজ থিয়েটার: শেকড়ের সন্ধান ও উন্মুক্ত মঞ্চ

প্রাচীন বাংলার সমাজ কাঠামোতে বিনোদন ও শিল্পচর্চার মূল কেন্দ্র ছিল লোকজ উৎসব ও ধর্মীয় পার্বণ। বাংলা থিয়েটারের বিবর্তন বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে সেই সুদূর অতীতে, যখন থিয়েটার কোনো বদ্ধ ঘরে বা চারকোনা মঞ্চে সীমাবদ্ধ ছিল না। থিয়েটারের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, প্রাচীন ভারতে ভরত মুনির ‘নাট্যশাস্ত্র’ এবং কালিদাস বা ভবভূতির মতো মহাকবিদের সংস্কৃত নাটকের গভীর প্রভাব ছিল এ অঞ্চলের শিক্ষিত শ্রেণির শিল্পচর্চায়। কিন্তু সাধারণ মানুষের বিনোদন ও জীবনবোধের প্রকাশ ঘটত একেবারে খোলা আকাশের নিচে, ধুলোমাখা মাটিতে। চর্যাপদের চর্যাগুলোতেও নৃত্য-গীত-অভিনয়ের আদিরূপের আভাস পাওয়া যায়। পরবর্তীতে জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দ’ এবং বড়ু চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যে নাট্যগুণের যে বিকাশ ঘটে, তা মূলত বাংলার নিজস্ব আখ্যানরীতিরই একটি প্রকাশ।
সেখানে কোনো বিশাল সেট, আধুনিক আলোকসজ্জা বা সাজানো গ্যালারি ছিল না; ছিল কেবল মানুষের আদিম আবেগ আর লোকজ সুর। যাত্রা, পালাগান, গম্ভীরা, আলকাপ বা ভাসান গানের মতো লোকনাট্যগুলোই ছিল তৎকালীন বাংলা নাট্যচর্চা-র প্রধান মাধ্যম। ‘যাত্রা’ শব্দটি মূলত উদ্ভূত হয়েছিল ধর্মীয় শোভাযাত্রা থেকে, যা পরবর্তীতে কাহিনিভিত্তিক গীতিনাট্যে রূপ নেয়। গ্রামের খোলা মাঠে বা জমিদার বাড়ির বিশাল উঠোনে যখন চট বিছিয়ে আসর বসত, তখন দর্শক আর অভিনেতার মাঝে কোনো অদৃশ্য দেওয়াল থাকত না। নাচ, গান আর অভিনয়ের এক অপূর্ব মিশ্রণে তৈরি হতো স্থানীয় মঞ্চ-সংস্কৃতি। এই লোকজ থিয়েটারই মূলত বাংলা নাটকের বিকাশ-এর আদিম ও অকৃত্রিম রূপ। দর্শকরা গল্পের সাথে এতটা একাত্ম হয়ে যেতেন যে, তারা মাঝে মাঝে পালা চলাকালীনই অভিনেতাদের সাথে কথা বলে উঠতেন, এমনকি কাঁদতেন বা হাসতেন উচ্চস্বরে। এই যে মানুষের সাথে সরাসরি সংযোগ, এটিই পরবর্তীকালে স্বকীয় বাংলা থিয়েটার নির্মাণের অন্যতম প্রধান রসদ হিসেবে কাজ করেছে।
প্রাচীন এই লোকজ মাধ্যমগুলোর বৈচিত্র্য বুঝতে নিচের সারণিটি লক্ষ্য করুন। নিচে প্রাচীন লোকজ থিয়েটারের প্রধান ধরনগুলোর একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| লোকনাট্যের ধরন | মূল অঞ্চল | প্রধান বৈশিষ্ট্য |
| যাত্রা | সমগ্র বাংলা | পৌরাণিক বা ঐতিহাসিক কাহিনি নির্ভর, উচ্চকণ্ঠের অভিনয় ও গীতিবহুল। |
| গম্ভীরা | মালদহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ | নানা ও নাতির সংলাপের মাধ্যমে সমসাময়িক সামাজিক সমস্যার রসাত্মক উপস্থাপন। |
| আলকাপ | মুর্শিদাবাদ, রাজশাহী | নাচ, গান ও হাস্যকৌতুকের মাধ্যমে গ্রামীণ জীবনের সাধারণ চিত্র তুলে ধরা। |
| ভাসান গান | বৃহত্তর ময়মনসিংহ | মনসামঙ্গল কাব্য অবলম্বনে বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনি নির্ভর গীতিনাট্য। |
খোলা মাঠের এই উন্মুক্ত নাট্যধারা যখন উপনিবেশিক যুগে প্রবেশ করল, তখন পাশ্চাত্যের প্রভাবে বাংলার নাট্যমঞ্চ এক কাঠামোগত পরিবর্তনের মুখোমুখি হলো।
আধুনিক বাংলা নাটকের সূচনা: ঔপনিবেশিক প্রভাব ও নবজাগরণ
কালের আবর্তনে বাংলার সমাজ ব্যবস্থায় যখন পরিবর্তন আসতে শুরু করল, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরে ইংরেজি শিক্ষা ও সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটল, তখন বাংলা নাটকের ইতিহাস-ও এক নতুন মোড় নিল। আঠারো শতকের শেষভাগে, ১৭৯৫ সালে রাশিয়ান পর্যটক হেরাসিম লেবেদেভ কলকাতায় প্রথম একটি থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করেন, যা আধুনিক বাংলা থিয়েটার-এর ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। তিনি রিচার্ড জর্ড্রপ-এর ‘দ্য ডিসগাইজ’ নামের একটি ইংরেজি নাটক অনুবাদ করে ‘ছদ্মবেশ’ নামে বাঙালি পাত্র-পাত্রী দিয়ে অভিনয় করিয়েছিলেন। এটি ছিল প্রসেনিয়াম কাঠামোর ভেতরে বাংলা ভাষায় প্রথম নাট্যপ্রদর্শন। এরপর উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এসে বাংলা মঞ্চ নাটক এক নতুন যুগের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ায়। ১৮৫২ সালে তারাচরণ শিকদারের ‘ভদ্রার্জুন’ এবং যোগেন্দ্রচন্দ্র গুপ্তের ‘কীর্তিবিলাস’ প্রকাশিত হয়, যা ছিল পাশ্চাত্যের ট্র্যাজেডি ও কমেডির আদলে লেখা প্রথম দিককার বাংলা নাটক।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত যখন সংস্কৃত নাটকের বাঁধা ধরা নিয়ম ভেঙে ১৮৫৯ সালে ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটকটি লিখলেন, তখন আধুনিক বাংলা নাটকের সূচনা পাকাপাকিভাবে হয়ে গেল। তিনি কেবল ভাষারই আধুনিকায়ন করেননি, বরং নাটকের কাঠামোতেও ইউরোপীয় রেনেসাঁসের ছোঁয়া নিয়ে এসেছিলেন। তবে বাংলা নাটকের ইতিহাস যে নাটকটি ছাড়া একেবারেই অসম্পূর্ণ, সেটি হলো দীনবন্ধু মিত্র নীলদর্পণ। ১৮৬০ সালে প্রকাশিত এই নাটকটি কেবল একটি সাহিত্যকর্ম ছিল না, এটি ছিল ব্রিটিশ নীলকরদের অমানবিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে একটি জ্বলন্ত বিদ্রোহ। এই প্রথম বাংলা নাট্যচর্চা সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে কথা বলে উঠল এবং সাধারণ শোষিত কৃষকের যন্ত্রণাকে মঞ্চের আলোয় তুলে আনল। ‘নীলদর্পণ’ মঞ্চস্থ হওয়ার পর সমাজে যে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল, তা বাংলা নাট্য আন্দোলন-এর বীজ বপন করেছিল। মানুষের কান্না, ক্ষোভ এবং প্রতিরোধ কীভাবে মঞ্চের মাধ্যমে পুরো দেশে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তা এই যুগের বাংলা নাট্যকার-রা প্রথমবারের মতো প্রমাণ করেছিলেন। ১৮৭২ সালে ন্যাশনাল থিয়েটার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ‘নীলদর্পণ’ মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে বাংলা থিয়েটার একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
উনিশ শতকের এই নবজাগরণের সময়কার উল্লেখযোগ্য কাজগুলো সম্পর্কে আরও জানতে নিচের তথ্যগুলো সহায়ক হবে। উনিশ শতকের শুরুর দিকের উল্লেখযোগ্য নাটক ও নাট্যকারদের একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| নাট্যকার | নাটক | প্রকাশের বছর | ঐতিহাসিক তাৎপর্য |
| মাইকেল মধুসূদন দত্ত | শর্মিষ্ঠা | ১৮৫৯ | আধুনিক রীতিতে লেখা প্রথম সার্থক বাংলা নাটক। |
| দীনবন্ধু মিত্র | নীলদর্পণ | ১৮৬০ | নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদী সামাজিক নাটক। |
| রামনারায়ণ তর্করত্ন | কুলীন কুলসর্বস্ব | ১৮৫৪ | বহুবিবাহ প্রথার বিরুদ্ধে লেখা প্রথম সার্থক সামাজিক প্রহসন। |
সামাজিক নাটকের এই জোয়ারের পর বাংলা থিয়েটার আস্তে আস্তে পেশাদারিত্বের দিকে পা বাড়ায়, যেখানে বিশাল মঞ্চ আর চোখ ধাঁধানো সেটের আধিপত্য শুরু হয়।
প্রসেনিয়াম থিয়েটার ও গিরিশচন্দ্র যুগ: পেশাদারিত্বের উত্থান
উনিশ শতকের শেষ দিকে এসে বাংলা থিয়েটারের বিবর্তন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত রূপ পায়। ব্রিটিশদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কলকাতায় স্থায়ী ও পেশাদার রঙ্গমঞ্চ তৈরি হতে শুরু করে। এই সময়েই প্রসেনিয়াম থিয়েটার বা ‘পিকচার ফ্রেম’ মঞ্চের ধারণাটি বাংলা নাট্যচর্চা-র মূল ধারায় পরিণত হয়। মঞ্চের তিন দিক বন্ধ, সামনে একটি ভারী পর্দা, নির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত আলোকসজ্জা, ভারী মেকআপ এবং বিশাল ক্যানভাসের সেট—সব মিলিয়ে থিয়েটারের ইতিহাস পেল এক নতুন পেশাদারি রূপ। দর্শক এখন আর খোলা মাঠে বসে নেই, তারা নির্দিষ্ট মূল্যের টিকিট কেটে অন্ধকার গ্যালারিতে বসে মঞ্চের আলোকিত জগতকে উপভোগ করতে শুরু করল।
এই পেশাদারি প্রসেনিয়াম থিয়েটার-এর প্রধান কাণ্ডারি ছিলেন নটসূর্য গিরিশচন্দ্র ঘোষ। গিরিশচন্দ্র ঘোষ নাটক লেখা, পরিচালনা এবং অভিনয়ের মাধ্যমে ন্যাশনাল থিয়েটার, স্টার থিয়েটার ও মিনার্ভার মতো মঞ্চগুলোকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যান। এই যুগে বাংলা মঞ্চ নাটক হয়ে উঠেছিল বিশাল এক ক্যানভাস। পৌরাণিক (যেমন: জনা, পাণ্ডবগৌরব), ঐতিহাসিক (যেমন: সিরাজউদ্দৌলা) এবং সামাজিক (যেমন: প্রফুল্ল) গল্পগুলো অত্যন্ত আবেগময় ও উচ্চকণ্ঠের সংলাপে প্রসেনিয়াম থিয়েটার-এর গণ্ডির ভেতর দিয়ে দর্শকের কাছে পৌঁছাতে শুরু করল। গিরিশ যুগের মাধ্যমে প্রসেনিয়াম থিয়েটার কীভাবে বাংলা মঞ্চে স্থায়ী আসন গেড়ে বসে, তা বাংলা নাটকের বিকাশ-এর ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। যদিও এটি ছিল পুরোপুরি ইউরোপীয় কাঠামো, কিন্তু এর ভেতরেই বাঙালি আবেগ, ভক্তি আর গল্পের যে অনুরণন তৈরি হয়েছিল, তা সেকালের আধুনিক বাংলা থিয়েটার-কে এক শক্তিশালী ভিত্তি ও বিপুল দর্শকপ্রিয়তা দিয়েছিল। বিনোদিনী দাসীর মতো কিংবদন্তি অভিনেত্রীদের উত্থানও ঘটে এই প্রসেনিয়াম যুগেই।
পেশাদার মঞ্চের এই বিস্তৃতি বুঝতে সেকালের বিখ্যাত থিয়েটার হলগুলোর দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। গিরিশচন্দ্র যুগের উল্লেখযোগ্য থিয়েটার মঞ্চ এবং তাদের প্রতিষ্ঠার তথ্যাদি নিচে সারণিতে দেওয়া হলো:
| রঙ্গমঞ্চের নাম | প্রতিষ্ঠার সাল | মূল উদ্যোক্তা/সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি | বর্তমান অবস্থা |
| ন্যাশনাল থিয়েটার | ১৮৭২ | গিরিশচন্দ্র ঘোষ ও অন্যান্য | বিলুপ্ত (বাংলা সাধারণ রঙ্গমঞ্চের আদি রূপ) |
| স্টার থিয়েটার | ১৮৮৩ | গুর্মুখ রায় (পরবর্তীতে গিরিশচন্দ্র) | কলকাতার হাতিবাগানে আজও ঐতিহ্য বহন করছে। |
| মিনার্ভা থিয়েটার | ১৮৯৩ | নটেন্দ্রকৃষ্ণ মিত্র | একাধিকবার অগ্নিকাণ্ডের পর পুনর্নির্মিত ও বর্তমানে চালু। |
গিরিশচন্দ্রের তৈরি করা এই মেলোড্রামাটিক ও বাণিজ্য-নির্ভর মঞ্চব্যবস্থার বিপরীতে দাঁড়িয়ে একজন মহামানব সম্পূর্ণ ভিন্ন এক নাট্যদর্শনের সূচনা করলেন।
রবীন্দ্রনাথ ও নাট্যনন্দনের পরিবর্তন: মনস্তাত্ত্বিক বিপ্লব

বাণিজ্যিক প্রসেনিয়াম থিয়েটার যখন পৌরাণিক মেলোড্রামা আর ভারী সেটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল, দৃশ্যসজ্জাই যখন মুখ্য হয়ে উঠল, তখন বাংলা নাটকের ইতিহাস পেল এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি। এই পরিবর্তনের রূপকার ছিলেন স্বয়ং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাটক রচনার ক্ষেত্রে সমকালীন প্রথাগত ধারার বাইরে গিয়ে এক নতুন নাট্যনন্দনের জন্ম দিলেন, যা বাংলা থিয়েটারের বিবর্তন-কে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। তিনি মনে করতেন, মঞ্চের কৃত্রিম সেট দর্শকের কল্পনাশক্তিকে বাধাগ্রস্ত করে।
তার নাটকের বিশেষত্ব ছিল এর কাব্যিক ভাষা, গভীর মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, প্রতীকী অর্থ এবং অসামান্য যুক্তিধর্মিতা। তিনি প্রসেনিয়াম থিয়েটার-এর বদ্ধ পরিবেশ পছন্দ করতেন না। তাই শান্তিনিকেতনের খোলা প্রান্তরে, প্রকৃতির কোলে তিনি মঞ্চস্থ করতেন তার নাটকগুলো, যা অনেকটা প্রাচ্যের লোকজ উন্মুক্ত মঞ্চের ধারণার কাছাকাছি ছিল। রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’, ‘ডাকঘর’, ‘অচলায়তন’, ‘রাজা’ ইত্যাদির মতো নাটকগুলো থেকে উদাহরণ দিয়ে দেখানো যায় যে বাংলা নাট্যচর্চা সেসময় একটি নতুন দিগন্ত পেয়েছিল। ‘রক্তকরবী’র যক্ষপুরীর লোভী রাজা, নন্দিনীর মুক্তিকামী সত্তা বা বিশুর গান—এই চরিত্রগুলো প্রথাগত প্রসেনিয়াম থিয়েটার-এর অভিনয়ের চেয়ে অনেক বেশি মনস্তাত্ত্বিক ও রূপকধর্মী ছিল। ‘ডাকঘর’-এর অমলের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা কেবল একটি শিশুর গল্প নয়, বরং মানুষের অনন্ত অসীমে মিশে যাওয়ার তৃষ্ণা। রবীন্দ্রনাথের এই নাট্যদর্শন আধুনিক বাংলা থিয়েটার-কে কেবল দৃশ্যগত দিক থেকেই নয়, বরং আত্মিক ও দার্শনিক দিক থেকেও সমৃদ্ধ করে তুলেছিল, যা পরবর্তীকালে স্বকীয় বাংলা থিয়েটার তৈরির এক বিরাট অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথের নাট্য রচনার বৈচিত্র্য তার বিবর্তনের পর্যায়গুলো থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাটক-এর পর্যায়ক্রমিক বিবর্তনের একটি সারণি নিচে দেওয়া হলো:
| নাটকের পর্যায় | উল্লেখযোগ্য উদাহরণ | মূল বিষয়বস্তু বা ফোকাস |
| গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য | বাল্মীকিপ্রতিভা, মায়ার খেলা | গান ও নাচের মাধ্যমে কাহিনি বর্ণনা, লোকজ সুরের ব্যবহার। |
| রূপক-সাংকেতিক নাটক | রক্তকরবী, ডাকঘর, রাজা | বস্তুতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, আধ্যাত্মিকতা ও মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা। |
| সামাজিক ও প্রহসন | চিরকুমার সভা, তাসের দেশ | সমাজের অন্ধ অনুকরণ ও প্রথাগত নিয়মের বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ। |
রবীন্দ্রনাথ যখন পাণ্ডুলিপিতে মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা আনলেন, ঠিক সেই সময়েই পেশাদার মঞ্চে একজন কিংবদন্তি অভিনেতা অভিনয়ের ব্যাকরণটাই পালটে দিলেন।
শিশির ভাদুড়ি ও অভিনয় বিপ্লব: বাস্তবতার ছোঁয়া
রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক চিন্তাধারার পাশাপাশি বিশ শতকের শুরুর দিকে বাংলা মঞ্চ নাটক অভিনয়ের ক্ষেত্রে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়। আর এই বিপ্লবের মহানায়ক ছিলেন নাট্যাচার্য শিশির কুমার ভাদুড়ী। প্রসেনিয়াম থিয়েটার-এর আদি যুগে গিরিশচন্দ্রের সময়কার উচ্চকণ্ঠের সংলাপ প্রক্ষেপণ, অতি-নাটকীয় বাচনভঙ্গি এবং মেলোড্রামাটিক অভিনয়ের ধারাকে ভেঙে শিশির ভাদুড়ি নিয়ে এলেন মনস্তাত্ত্বিক ও বাস্তবধর্মী অভিনয় শৈলী। তিনি ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক, থিয়েটারের প্রতি অগাধ ভালোবাসায় চাকরি ছেড়ে পেশাদার মঞ্চে অবতীর্ণ হন।
শিশির ভাদুড়ি অবদান কেবল অভিনয়েই সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি নাট্য-শিক্ষার ওপরও জোর দিয়েছিলেন। তার প্রতিষ্ঠিত শ্রীরঙ্গম (পরবর্তীতে বিশ্বরূপা) থিয়েটারে তিনি নতুন যুগের সূচনা করেন। শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের তিনি থিয়েটারে টেনে এনেছিলেন, যা বাংলা নাটকের ইতিহাস-এ একটি বড় বাঁকবদল। ১৯২৪ সালে যোগেশ চৌধুরীর লেখা ‘সীতা’ নাটকে রাম চরিত্রে তার অসামান্য অভিনয় দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করেছিল। তার অভিনয়ে চরিত্রের ভেতরের দ্বন্দ্ব, সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি, নীরবতার ব্যবহার এবং স্বাভাবিক কথা বলার ধরন আধুনিক বাংলা থিয়েটার-এর ভিত্তি আরও মজবুত করে। তিনি দেখিয়েছিলেন যে প্রসেনিয়াম থিয়েটার-এর কাঠামো ঠিক রেখেও কীভাবে বাস্তবসম্মত অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকের আত্মার খুব কাছাকাছি পৌঁছানো যায়। তার এই বাস্তবধর্মী অভিনয়ের প্রভাবেই বাংলা থিয়েটারের বিবর্তন এক নতুন যুগের দিকে অগ্রসর হয়, যেখানে অভিনেতা কেবল সংলাপ মুখস্থ বলা পুতুল নন, বরং একজন চিন্তাশীল শিল্পী।
শিশির ভাদুড়ির কর্মময় জীবনের প্রভাব কতটুকু ছিল, তা তার কাজগুলোর দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়। শিশির ভাদুড়ির বর্ণাঢ্য নাট্যজীবনের কিছু উল্লেখযোগ্য মাইলফলক নিচে উল্লেখ করা হলো:
| নাটক | শিশির ভাদুড়ির ভূমিকা | ঐতিহাসিক প্রভাব |
| সীতা (১৯২৪) | রাম চরিত্রে অভিনয় ও পরিচালনা | উচ্চকণ্ঠের বদলে স্বাভাবিক ও মনস্তাত্ত্বিক অভিনয়ের প্রবর্তন। |
| আলমগীর | নামভূমিকায় অভিনয় | ঐতিহাসিক চরিত্রের ভেতরের মানসিক দ্বন্দ্ব সার্থকভাবে মঞ্চে ফুটিয়ে তোলা। |
| ষোড়শী | জীবানন্দের চরিত্রে অভিনয় | শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসকে মঞ্চে তুমুল জনপ্রিয়তা এনে দেওয়া। |
বাস্তবসম্মত অভিনয়ের এই যুগে যখন বাংলার আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেল, তখন থিয়েটার হয়ে উঠল মানুষের প্রতিবাদের ভাষা।
রাজনৈতিক নাট্য আন্দোলন: প্রতিবাদের মঞ্চ ও গণজাগরণ
চল্লিশের দশকে এসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পঞ্চাশের মন্বন্তর (১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ), দেশভাগ এবং পরবর্তীতে ভাষা আন্দোলনের মতো বিশাল সব রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা বাংলা থিয়েটারের বিবর্তন-এর গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দেয়। থিয়েটার আর কেবল বিনোদনের মাধ্যম বা শিল্পচর্চা রইল না, এটি হয়ে উঠল মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই ও প্রতিবাদের অন্যতম ধারালো হাতিয়ার। শুরু হলো একটি সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক বাংলা নাট্য আন্দোলন।
১৯৪৪ সালে বিজন ভট্টাচার্যের লেখা এবং শম্ভু মিত্র ও বিজন ভট্টাচার্যের যৌথ নির্দেশনায় ‘নবান্ন’ নাটকের মাধ্যমে আইপিটিএ (IPTA – Indian People’s Theatre Association) বা ভারতীয় গণনাট্য সংঘ যে রাজনৈতিক থিয়েটারের সূচনা করেছিল, তা বাংলা নাটকের বিকাশ-এ এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাস এবং কৃষকের দুর্দশাকে কোনো ভারী মেকআপ ছাড়াই অত্যন্ত রূঢ় বাস্তবতায় মঞ্চে তুলে আনা হয়েছিল। পরবর্তীতে উৎপল দত্তের মতো প্রবাদপ্রতিম বাংলা নাট্যকার তার লিটল থিয়েটার গ্রুপ এবং ‘এপিক থিয়েটার’-এর মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তাকে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে মঞ্চে উপস্থাপন করেন (‘টিনের তলোয়ার’, ‘অঙ্গার’, ‘কল্লোল’)।
অন্যদিকে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) নাট্য আন্দোলন বাংলাদেশ এক অনন্য রাজনৈতিক মাত্রা পায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে। ১৯৫৩ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বসে ভাষা সৈনিকদের দ্বারা প্রথম মঞ্চস্থ হয় মুনীর চৌধুরী নাটক ‘কবর’। হারিকেনের আলোয়, জেলের ভেতর রাজবন্দীদের করা সেই অভিনয় আধুনিক বাংলা থিয়েটার-এর রাজনৈতিক প্রতিবাদের এক অমর দৃষ্টান্ত। এই রাজনৈতিক চেতনা থেকেই বাংলা মঞ্চ নাটক সরাসরি শোষিত মানুষের পক্ষে, স্বৈরাচারের বিপক্ষে কথা বলতে শুরু করে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রচিত এই নাটকগুলো কেবল ইতিহাস নয়, সমাজ পরিবর্তনের দলিল। রাজনৈতিক বাংলা নাট্য আন্দোলন-এর গুরুত্বপূর্ণ নাটক ও থিয়েটারের প্রেক্ষাপট নিচে সারণিভুক্ত করা হলো:
| নাটক | নাট্যকার / নির্দেশক | সাল | রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট |
|---|---|---|---|
| নবান্ন | বিজন ভট্টাচার্য | ১৯৪৪ | ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ বাংলা দুর্ভিক্ষ বা পঞ্চাশের মন্বন্তর। |
| কবর | মুনীর চৌধুরী | ১৯৫৩ | ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও শহীদদের আত্মত্যাগ। |
| কল্লোল | উৎপল দত্ত | ১৯৬৫ | ১৯৪৬ সালের নৌ-বিদ্রোহ এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম। |
রাজনৈতিক এই উত্তাপ থেকেই পরবর্তীতে মঞ্চের প্রচলিত সীমানা ভেঙে ফেলার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয় নাট্যকর্মীদের মাঝে।
বিকল্প থিয়েটার আন্দোলন: থার্ড থিয়েটার ও প্রসেনিয়ামের দেওয়াল ভাঙন
ষাটের ও সত্তরের দশকে এসে প্রসেনিয়াম থিয়েটার-এর কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বুর্জোয়া রূপ নিয়ে অনেক নাট্যকর্মীর মনে প্রশ্ন জাগতে শুরু করে। প্রসেনিয়াম থিয়েটার-এর দামি টিকিট কেটে, অন্ধকারে গদি আঁটা চেয়ারে বসে অনেক দূর থেকে একটি ইলিউশন বা মায়াবী নাটক দেখার যে মধ্যবিত্ত রেওয়াজ, তাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে শুরু হয় বিকল্প থিয়েটারের খোঁজ। এই ধারার সবচেয়ে শক্তিশালী রূপকার ও দার্শনিক ছিলেন বাদল সরকার।
বাদল সরকার থিয়েটার চর্চায় ‘থার্ড থিয়েটার’ বা তৃতীয় ধারার নাটকের প্রবর্তন করেন। তার মতে, ফার্স্ট থিয়েটার হলো গ্রামীণ লোকজ থিয়েটার এবং সেকেন্ড থিয়েটার হলো শহরের বাবুদের প্রসেনিয়াম থিয়েটার। এই দুইয়ের সমন্বয়ে তিনি তৈরি করলেন থার্ড থিয়েটার, যাকে হতে হবে সস্তা, বহনযোগ্য এবং সাধারণ মানুষের খুব কাছের। তাই তিনি তার ‘শতাব্দী’ নাট্যদলের মাধ্যমে মঞ্চের দেওয়াল ভেঙে, স্টেজ-সেট এবং আলোকসজ্জার বিশাল খরচ বাদ দিয়ে নাটককে নিয়ে এলেন সরাসরি মানুষের ভিড়ে—পার্কে, গ্রামের হাটে, কারখানার গেটে বা রাস্তার মোড়ে। ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’, ‘মিছিল’, ‘ভোমা’ বা ‘বাসি খবর’-এর মতো নাটকগুলোতে তিনি শারীরিক অভিনয় বা ফিজিক্যাল অ্যাক্টিংয়ের ওপর জোর দেন। দর্শক আর অভিনেতার মাঝের দূরত্ব ঘুচিয়ে ফেলার এই যে চেষ্টা, তা বাংলা নাট্যচর্চা-কে এক নতুন শরীরী ভাষা দেয়। এখানেই বাংলা নাটকের বিকাশ আরও গণ-ভিত্তিক হয়ে ওঠে এবং বাংলা নাট্য ইতিহাস প্রসেনিয়ামের ফ্রেম ভেঙে সরাসরি মাটির স্পর্শ ও মানুষের ঘামের গন্ধ পায়।
প্রথাগত মঞ্চ ও এই নতুন ধারার মধ্যে বিস্তর ফারাক ছিল। প্রসেনিয়াম থিয়েটার এবং থার্ড থিয়েটারের মধ্যকার মূল পার্থক্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
| বৈশিষ্ট্য | প্রসেনিয়াম থিয়েটার | থার্ড থিয়েটার (বিকল্প ধারা) |
| দর্শক-অভিনেতা সম্পর্ক | অদৃশ্য দেওয়াল বা ‘ফোর্থ ওয়াল’ দ্বারা বিচ্ছিন্ন। | কোনো দেওয়াল নেই, দর্শক ও অভিনেতা একই সমতলে। |
| মঞ্চ ও সেট | ব্যয়বহুল সেট, আলোকসজ্জা এবং প্রপস নির্ভর। | কোনো সেট নেই, অভিনেতার শরীর ও অঙ্গভঙ্গিই মূল প্রপস। |
| অর্থনীতি | টিকিট কেটে দেখতে হয়, বাণিজ্য নির্ভর। | উন্মুক্ত স্থানে হয়, খরচা ন্যূনতম এবং টিকিটের বাধ্যবাধকতা নেই। |
মঞ্চ ভাঙার এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের থিয়েটার কর্মীরা অনুধাবন করলেন যে তাদের নিজস্ব একটি থিয়েটার-ভাষা প্রয়োজন।
স্বাধীনতা-পরবর্তী স্বকীয় বাংলা থিয়েটার: শিকড়ের কাছে ফেরা

১৯৭১ সালে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বাংলা থিয়েটারের বিবর্তন একটি সম্পূর্ণ নতুন এবং নিজস্ব আত্মপরিচয় খোঁজার প্রবল তাগিদ অনুভব করে। উপনিবেশিক প্রসেনিয়াম থিয়েটার-এর কাঠামো এবং পাশ্চাত্যের নাট্যতত্ত্ব (যেমন: অ্যারিস্টটলের থ্রি ইউনিটিজ বা স্টানিস্লাভস্কির রিয়েলিজম) আমাদের ধার করা সম্পত্তি। তাই এসবের বাইরে গিয়ে, হাজার বছর ধরে বাংলার যে নিজস্ব একটি বর্ণনাত্মক নাট্যরীতি ছিল, তাকে আধুনিক মঞ্চে ফিরিয়ে আনার একটি জোরালো চেষ্টা শুরু হয়। এই চেষ্টার ফসলই হলো বর্তমানের স্বকীয় বাংলা থিয়েটার।
এই নিজস্ব নাট্যভাষা তৈরির ক্ষেত্রে অন্যতম শ্রেষ্ঠ পথিকৃৎ ছিলেন নাট্যচার্য সেলিম আল দীন এবং নির্দেশক নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু। ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ঢাকা থিয়েটার’-এর মধ্য দিয়ে তারা এই রীতির চর্চা শুরু করেন। সেলিম আল দীন নাট্যভাষা ছিল পাশ্চাত্যের রৈখিক (লিনিয়ার) কাঠামোর চেয়ে একেবারেই আলাদা। তিনি পাশ্চাত্যের অ্যাকশন-নির্ভর রীতির বদলে বাংলার নিজস্ব আখ্যান বা বর্ণনাত্মক রীতি (যেমন পাঁচালি, কথকতা, বয়ান) ব্যবহার করেন, যাকে তিনি নাম দিয়েছিলেন ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব’। তার ‘কীত্তনখোলা’, ‘কেরামত মঙ্গল’, ‘হাতহদাই’, ‘চাকা’ বা ‘যৈবতী কন্যার মন’-এর মতো নাটকগুলোতে লোকজ রূপ ও আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক জীবনবোধের এক অপূর্ব মিশ্রণ দেখা যায়।
পাশাপাশি নাট্য আন্দোলন বাংলাদেশ-এর আরেক পুরোধা ব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ এবং তার দল ‘আরণ্যক নাট্যদল’-এর সামাজিক নাটক-সংস্কৃতি (‘রাঢ়াঙ’, ‘ওরা কদম আলী’, ‘ইবলিশ’) প্রান্তিক মানুষের জীবন, সাঁওতাল বিদ্রোহ বা শ্রমিকের ঘামকে সরাসরি মঞ্চে তুলে আনে। সৈয়দ জামিল আহমেদের ‘বিষাদ সিন্ধু’ বা ‘বেহুলার ভাসান’ নির্দেশনায় দেশজ আঙ্গিকের যে বিশাল ক্যানভাস তৈরি হয়, তা অকল্পনীয়। এই যুগে এসেই আধুনিক বাংলা থিয়েটার সত্যিকার অর্থে তার নিজস্ব দেশীয় ভাষা ও অভিব্যক্তি খুঁজে পায়, যা কেবল ইউরোপের অনুকরণ নয়, বরং একান্তই বাংলার মাটির ফসল।
স্বাধীন বাংলাদেশে এই স্বকীয় ধারা নির্মাণে বেশ কয়েকটি নাট্যদল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে স্বকীয় বাংলা থিয়েটার নির্মাণে অগ্রণী নাট্যদলগুলোর একটি চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
| নাট্যদল | মূল ব্যক্তিত্ব | নিজস্বতা বা সিগনেচার স্টাইল | উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা |
| ঢাকা থিয়েটার | সেলিম আল দীন, নাসির উদ্দীন ইউসুফ | বাংলার নিজস্ব আখ্যান রীতি ও দ্বৈতাদ্বৈতবাদী ফর্মের প্রয়োগ। | কীত্তনখোলা, কেরামত মঙ্গল |
| আরণ্যক নাট্যদল | মামুনুর রশীদ | শ্রেণি সংগ্রাম, প্রান্তিক মানুষের জীবন এবং মুক্তনাটকের চর্চা। | রাঢ়াঙ, ওরা কদম আলী |
| থিয়েটার | রামেন্দু মজুমদার, আবদুল্লাহ আল-মামুন | নাগরিক জীবনের টানাপোড়েন এবং সমসাময়িক সামাজিক সংকট। | পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, মেরাজ ফকিরের মা |
শেকড় সন্ধানের এই সুদীর্ঘ যাত্রার শেষে এসে আমরা দাঁড়াই এক অনন্ত সম্ভাবনার সামনে।
আগামীর ইশতেহার: স্বকীয় থিয়েটারের অবিনশ্বর যাত্রা
বাংলা থিয়েটারের বিবর্তন একটি স্থির কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি একটি প্রবহমান নদীর মতো, যা কালের সাথে সাথে বারবার নিজের রূপ বদলেছে কিন্তু কখনো থেমে থাকেনি। হাজার বছর আগে খোলা মাঠে, ধুলোমাখা মাটিতে যে লোকজ পালার জন্ম হয়েছিল, তা ব্রিটিশ শাসনামলে প্রসেনিয়াম থিয়েটার-এর জাঁকজমকপূর্ণ ফ্রেমে আবদ্ধ হলেও, বাঙালি তার নিজস্ব আবেগ, কান্না আর হাসি দিয়ে সেই ধার করা কাঠামোকেও প্রাণবন্ত করেছে। গিরিশচন্দ্র ঘোষের পেশাদারি মঞ্চ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রূপক ও দার্শনিক বিদ্রোহ, শিশির কুমার ভাদুড়ির মনস্তাত্ত্বিক অভিনয় বিপ্লব থেকে শুরু করে মুনীর চৌধুরী ও বাদল সরকারের তীব্র রাজনৈতিক আন্দোলন—প্রতিটি স্তরেই বাংলা নাটকের ইতিহাস সমৃদ্ধ হয়েছে।
সবশেষে, মুক্তিযুদ্ধের পর সেলিম আল দীনের মতো দূরদর্শী স্রষ্টাদের হাত ধরে আমরা প্রসেনিয়ামের মোহ থেকে বেরিয়ে আমাদের একান্ত স্বকীয় বাংলা থিয়েটার-ভাষা খুঁজে পেয়েছি, যা আমাদের লোকজ ঐতিহ্য এবং আধুনিক মনন উভয়েরই প্রতিনিধিত্ব করে। বর্তমানে আধুনিক বাংলা থিয়েটার বিশ্বমানের প্রযুক্তির সাথে তাল মেলানোর পাশাপাশি নিজের শেকড়কেও শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে আছে। থিয়েটারের ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, আগামী দিনে মঞ্চের রূপ হয়তো বদলাবে, লাইট বা সাউন্ডের প্রযুক্তির ছোঁয়া হয়তো আরও বাড়বে, কিন্তু মানুষের সাথে মানুষের সরাসরি সংযোগ স্থাপনের যে আদিম ও ঐন্দ্রজালিক শক্তি, তা বাংলা নাট্যচর্চা-র বুকে চিরকাল অম্লান থাকবে। প্রসেনিয়াম থেকে স্বকীয়তায় ফেরার এই যাত্রা আমাদের প্রমাণ করে যে, শিল্পের সত্যিকারের মুক্তি নিজের শেকড় চেনার মাঝেই নিহিত। আগামীর দিনগুলোতে বাংলা মঞ্চ নাটক নতুন প্রজন্মের হাতে পড়ে আরও নতুন কোনো ভাষার জন্ম দেবে, সেই আশাবাদ নিয়েই সগৌরবে এগিয়ে চলেছে বাংলা থিয়েটারের এই অনন্ত ও অবিনশ্বর যাত্রা।


