ঘরের এক কোণে, সংসারের প্রান্তে, মানুষের চোখের ঠিক বাইরে। যেখানে অভিমান আছে, অপেক্ষা আছে, ছোট ছোট আনন্দ আছে। শুধু সেগুলোর দিকে কেউ তাকায় না। জীবন তাকে সরিয়ে রেখেছে, যেন আলো পড়লে অন্যদের মুখটাই আগে দেখা দরকার।
উপেক্ষিতা পড়ার পর যে মৃদু ব্যথাটি থেকে যায়, সেটি গল্পের ঘটনার জন্য নয়। বরং একজন মানুষের অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার জন্য। চারপাশে এত লোক, তবু তাকে যেন কেউ দেখল না।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যজীবনের শুরুতেই এই দৃষ্টি ছিল। ১৩২৮ বঙ্গাব্দে প্রবাসী-তে প্রকাশিত প্রথম গল্প উপেক্ষিতা-তেই যেন তার আভাস মেলে। যাদের দিকে বড় সাহিত্যের চোখ সহজে যেত না, তিনি তাদের দেখেছিলেন। গরিব ঘরের শিশু। পথের বুড়ি। অরণ্যের আদিবাসী। দূর দেশের স্বপ্ন দেখা বেকার যুবক। নদীর ধারে নামহীন মানুষ। আর এমন সব গাছপালা, পাখি, ঘাস, আলো, কুয়াশা—যাদের আমরা দৃশ্য বলেই পাশ কাটিয়ে যাই।
তাঁর কাছে কেউই নিছক পটভূমি ছিল না।
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ তাঁর জন্মের ১৩২ বছর পূর্ণ হচ্ছে। সময়ের হিসাবে দীর্ঘ পথ। কিন্তু বিভূতিভূষণকে পড়লে সময় কখনো সোজা রেখায় চলে না। একটি কাশবন হঠাৎ শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। দূরের রেলগাড়ির শব্দে মনে হয়, কিছু একটা চলে যাচ্ছে। নদীর জলে বিকেলের আলো পড়লে মনে হয়, এই দৃশ্য একদিন ছিল—এখন আর নেই।
সম্ভবত সেখানেই তাঁর আসল দেশ।
অভাবের ভেতরে যে জীবন খুলে দেয় অন্য ভুবনের দরজা
মুরাতিপুরে জন্ম। শিকড় অন্য গ্রামে। সংসারে স্বচ্ছলতা ছিল না। পড়াশোনা ছিল, মেধা ছিল, কিন্তু মেধা সব দরজা খুলে দেয় না। কখনো স্কুলে শিক্ষকতা, কখনো গৃহশিক্ষকতা, কখনো অন্যের জমিদারি এস্টেটের কাজ। জীবনের শুরুটা যেন কোনো স্থির ঘরের নয়—এক রাস্তা থেকে আরেক রাস্তায়।
এই অনিশ্চয়তাকে তিনি পরে সাজিয়ে লেখেননি। তার দরকারও পড়েনি। অনিশ্চয়তা তাঁর চোখের ভেতর ঢুকে গিয়েছিল।
যে মানুষটি দারিদ্র্য কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁর লেখায় দরিদ্র মানুষদের কণ্ঠ তাই করুণার ভাষায় বাজে না। হরিহরকে তিনি অসহায় বলে দয়া চান না। সর্বজয়ার ক্লান্তিকে মহৎ বানান না। ইন্দির ঠাকরুনের ক্ষুধাকে কোনো সামাজিক বক্তৃতায় ঠেলে দেন না। মানুষকে তাঁর অবস্থার ভেতর দাঁড় করিয়ে দেন। তারপর একটু সরে যান।
সম্ভবত তিনি জানতেন, অভাবের সবচেয়ে কঠিন দিক ক্ষুধা নয়। অপমানও নয়। কঠিন হলো—অভাব ধীরে ধীরে মানুষের পছন্দের অধিকার কেড়ে নেয়।
তাঁর নিজের জীবনেও হারানো খুব তাড়াতাড়ি এসে গিয়েছিল। অল্প বয়সের দাম্পত্য দীর্ঘ হয়নি। প্রথম স্ত্রী গৌরী চলে গেলেন। পড়াশোনার পথও থামল। সংসারের দায় এসে দাঁড়াল। স্কুলের চাকরি নিতে হলো। জীবনের যে পথটি হয়তো অন্য দিকে যাওয়ার কথা ছিল, সেটি হঠাৎ মোড় নিল।
কিন্তু এই মোড়ই তাঁকে মানুষের কাছে নিয়ে গেল।
স্কুলঘরের বেঞ্চ, গ্রামের রাস্তা, নৌপথ, ছোট শহর, দূরের অঞ্চল—তিনি চলেছেন। গোরক্ষিণী সভার কাজে বাংলা, আসাম, ত্রিপুরা, আরাকান পর্যন্ত ঘুরেছেন। পরে ভাগলপুরের জমিদারি এস্টেটে কাজ করতে গিয়ে পৌঁছেছেন উত্তর বিহারের বিস্তীর্ণ অরণ্যভূমিতে। সেখানে তাঁর কাজের সঙ্গে জমি, প্রজা, বসতি, বন পরিষ্কার—সব জড়িয়ে ছিল।
দিনের শেষে একজন কর্মচারী হিসাব মিলিয়েছেন। রাতের শেষে একজন লেখক অন্য হিসাব খুলেছেন।
বনের অন্ধকারে মানুষের মুখ অন্যরকম দেখা যায়। শহরে যার কোনো পরিচয় নেই, সেখানে সে একা একটি সম্পূর্ণ জীবন। অরণ্যের মানুষের কাছে দারিদ্র্য আছে, কিন্তু আকাশও আছে। ক্ষুধা আছে, কিন্তু ঋতু আছে। জমি নেই, তবু মাটির সঙ্গে সম্পর্ক আছে। সভ্যতার ভাষায় তারা প্রান্তিক; বিভূতিভূষণের চোখে তারা পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে খুব দূরে নয়।
সেই বছরগুলো তাঁর ভেতর জমে ছিল। সঙ্গে জমেছিল বনপথ, ঘোড়ায় চলা সন্ধ্যা, নিঃসঙ্গতা, পাহাড়ের রেখা, অচেনা ফুল, অন্ধকার নামার আগের আলো।
পরে ঘাটশিলার দিকে তাঁর টানও যেন সেই পুরোনো ডাকেরই উত্তর। সুবর্ণরেখা, পাহাড়, শালবন। সেখানে তিনি একটি বাড়ি কিনলেন। নাম রাখলেন ‘গৌরীকুঞ্জ’—হারিয়ে যাওয়া একজন মানুষের নাম একটি বাড়ির গায়ে থেকে গেল।
১৯৫০ সালের ১ নভেম্বর ঘাটশিলাতেই তাঁর জীবন থামল।
কিন্তু তাঁর জীবনের মানচিত্রে কোনো জায়গা শুধু জায়গা ছিল না। মুরাতিপুর ছিল জন্মের স্মৃতি। বারাকপুর ছিল শিকড়। ভাগলপুর ছিল অরণ্যের দরজা। ঘাটশিলা ছিল ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে।
ভূগোল ধীরে ধীরে তাঁর আত্মজীবনীর অন্য নাম হয়ে উঠেছিল।
পথের পাঁচালী — একটি মহাজীবনের আয়না
নিশ্চিন্দিপুরে সকাল হলে পৃথিবী খুব বড় নয়। একটি ভাঙা বাড়ি। পুকুর। বাঁশঝাড়। আমবাগান। পথ। কিছু ঋণ। কিছু স্বপ্ন। কয়েকটি শিশু-চোখ।
তবু অপুর কাছে সেই পৃথিবী অসীম।
ঔপনিবেশিক বাংলার গ্রাম এখানে ইতিহাসের বইয়ের মতো আসে না। আসে ভাঙা চালের নিচে। অনিশ্চিত আয়ে। পুরোনো বংশগৌরবের ক্ষয়ে। জমির টানাপোড়েনে। শহর ও গ্রামের দূরত্বে। এমন এক সমাজে, যেখানে আধুনিকতা দূরে কোথাও ঘটছে—আর তার শব্দ প্রথমে শোনা যায় রেললাইনের ওপার থেকে।
অপু আর দুর্গা কাশবনের মধ্যে দিয়ে দৌড়ায়।
এই দৃশ্য এত বিখ্যাত হয়ে গেছে যে কখনো কখনো আমরা তার ভেতরের শূন্যতাটি ভুলে যাই। দুটি শিশু দৌড়াচ্ছে এমন কিছুর দিকে, যা তাদের গ্রামের বাইরে। ট্রেন যেন নতুন পৃথিবীর দূত। কিন্তু সেই নতুন পৃথিবী তাদের জন্য কী আনবে, তারা জানে না। তারা শুধু বিস্মিত।
শৈশবও এমন। সামনে কী আছে জানে না। তাই সবকিছু দেখতে পারে।
বিভূতিভূষণের হাতে প্রকৃতি এখানে কোনো সুন্দর পর্দা নয়। কাশফুল শুধু শরৎ বোঝায় না। বৃষ্টির জল শুধু বর্ষা বোঝায় না। আমের গুটি, কাদামাটি, পুকুরের ধারে ঝোপ, দূরের আকাশ—সবাই অপুর বড় হয়ে ওঠার অংশ। প্রকৃতি তার প্রথম বিদ্যালয়। প্রথম রহস্য। প্রথম আনন্দ। প্রথম ভয়।
আর প্রথম হারানোও।
দুর্গা আছে বলেই নিশ্চিন্দিপুরের পথগুলো এত জীবন্ত। দুর্গা নেই বলেই সেই পথ পরে আর আগের মতো থাকে না।
ইন্দির ঠাকরুন চলে যান। দুর্গা চলে যায়। বাড়ি ছাড়তে হয়। একসময় যে গ্রামকে পৃথিবীর শেষ সীমানা মনে হতো, তাকেও পিছনে ফেলে যেতে হয়। পথের পাঁচালী তাই কেবল বড় হয়ে ওঠার গল্প নয়। বড় হতে হতে কত কিছু পিছনে পড়ে যায়—তার গল্প।
অদ্ভুত হলো, বিভূতিভূষণ এই ক্ষয়কে কুৎসিত করেন না।
দুঃখের পাশেই তিনি আলো রাখেন। মৃত্যুর পাশেই কাশফুল। অভাবের পাশেই আকাশ। যেন সৌন্দর্য দুঃখকে বাতিল করে না; বরং দুঃখের কারণেই কখনো সৌন্দর্য আরও ধারালো হয়ে ওঠে।
বহু বছর পরে এক তরুণ গ্রাফিক শিল্পী সিগনেট প্রেসের জন্য আম আঁটির ভেঁপু নামে পথের পাঁচালী-র সংক্ষিপ্ত সংস্করণের ছবি আঁকার কাজ পেলেন। তাঁর নাম সত্যজিৎ রায়। বইটি পড়তে পড়তে তিনি আবিষ্কার করলেন এমন এক জগৎ, যেখানে সিনেমার জন্য আলাদা করে দৃশ্য বানাতে হয় না। দৃশ্য আগে থেকেই আছে। পথ আছে। মুখ আছে। নীরবতা আছে। বাতাসের শব্দ আছে।
আর আছে দেখার এক বিশেষ পদ্ধতি।
সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে যে কাশবনের ভেতর দিয়ে অপু ও দুর্গা ছুটে যায়, তার জন্ম ক্যামেরায় নয়। তার জন্ম হয়েছিল অনেক আগে এক লেখকের দৃষ্টিতে।
বিভূতিভূষণ জানতেন, শিশুর চোখে পৃথিবীকে দেখলে সামান্য জিনিসও মহাবিশ্বের আকার নিতে পারে।
সম্ভবত সে কারণেই পথের পাঁচালী শেষ করে বই বন্ধ করলে নিশ্চিন্দিপুর বন্ধ হয় না। একটু দূরে রয়ে যায়। এমন একটি শৈশবের মতো, যেখানে আর ফিরে যাওয়া যায় না—তবু মনে হয়, বাঁশঝাড়ের পরের পথটি এখনও আছে।
আরণ্যক — প্রকৃতির দার্শনিক
বনের ভেতর দাঁড়িয়ে কেউ যদি গাছ কাটার শব্দ শোনে, শব্দটা খুব ছোট।
একটি কুড়াল। একটি গাছ। তারপর মাটিতে পড়ার ভারী আওয়াজ।
কিন্তু আরণ্যক-এ সেই শব্দের পেছনে একটি যুগ ভেঙে পড়ে।
ভাগলপুর অঞ্চলের জমিদারি এস্টেটে কাজ করার সময় বিভূতিভূষণের দায়িত্বের একটি অংশ ছিল বনভূমি বসতির জন্য ছেড়ে দেওয়া, জমি বন্দোবস্ত করা, রাজস্বের উপযোগী করে তোলা। চাকরির ভাষায় এটি প্রশাসনিক কাজ। সভ্যতার ভাষায় উন্নয়ন। কৃষিজমি বাড়ছে, বসতি হচ্ছে, আয় হচ্ছে।
কিন্তু একজন মানুষ প্রতিদিন দেখছেন—এই হিসাবের অন্য পাশে কী কমছে।
এই দ্বন্দ্ব থেকেই আরণ্যক-এর সত্যচরণ জন্ম নেয়। সে বাইরের মানুষ। শহর থেকে এসেছে। প্রথমে বন তাকে অস্বস্তি দেয়। পরে সেই বনই তার ভেতরের একটি অজানা দরজা খুলে দেয়। আর যখন সে ভালোবাসতে শেখে, তখনই তার কাজ তাকে ধ্বংসের অংশীদার করে তোলে।
এই অপরাধবোধ উপন্যাসটির গভীরতম সুর।
বিভূতিভূষণের সময়ে ব্রিটিশ শাসনের জমি-রাজস্ব ব্যবস্থা, জমিদারি কাঠামো এবং আবাদ বাড়ানোর অর্থনীতি বহু অরণ্যভূমিকে অন্য চোখে দেখত। বন মানে শুধু জীবন্ত জগৎ নয়—অব্যবহৃত জমি, সম্ভাব্য রাজস্ব, কাঠ, বসতি, চাষ। কাগজে জমির নতুন মূল্য তৈরি হচ্ছিল। সেই মূল্যের বাইরে পড়ে যাচ্ছিল বনবাসী মানুষের পুরোনো সম্পর্ক, অদৃশ্য পথ, মৌসুমি জীবন, গাছের সঙ্গে স্মৃতি।
আরণ্যক সেই হারানোর দলিল, কিন্তু দলিলের ভাষায় লেখা নয়।
সেখানে ভানুমতী আছে। রাজু পাঁড়ে আছে। যুগলপ্রসাদ আছে। মটুকনাথ আছে। তাদের জীবন কোনো উন্নয়ন-পরিসংখ্যানের সারি নয়। কেউ দরিদ্র, কেউ অদ্ভুত, কেউ স্বপ্নবিলাসী, কেউ মাটির সঙ্গে এমনভাবে বাঁধা যে তাকে আলাদা করলে মানুষটিও বদলে যায়।
বন কাটলে শুধু গাছ কমে না।
একটি পথ মুছে যায়। কোনো ফুলের নাম আর কেউ জানে না। কোনো গোষ্ঠীর স্মৃতি ছিন্ন হয়। এক ধরনের নীরবতা হারিয়ে যায়। মানুষ নিজের চারপাশের জীবন্ত জগতের সঙ্গে কথা বলার একটি ভাষা ভুলে যায়।
বিভূতিভূষণের শোক তাই আজকের অর্থে শুধু পরিবেশবাদী শোক নয়। আরও পুরোনো। আরও ব্যক্তিগত। যেন তিনি দেখছেন, মানুষ নিজেই নিজের একটি অংশ কেটে ফেলছে।
সভ্যতা আসছে—রাস্তা, চাষ, বসতি, মালিকানা, হিসাব।
তারপর একদিন কেউ ফিরে তাকিয়ে দেখে, যে বনের ভেতর দিয়ে সে এসেছিল, বনটি আর নেই।
সত্যচরণের অপরাধবোধ তখন এক ব্যক্তির থাকে না। পাঠকেরও হয়ে যায়।
লেখার দর্শন — প্রকৃতি, সমাজ ও আত্মা
ইছামতী নদী বয়ে যায়। তার ধারে মানুষের জন্ম, প্রেম, অপমান, শোষণ, মৃত্যু। নীলকরদের ইতিহাস আসে, গ্রামবাংলার সম্পর্ক বদলায়, মানুষ বদলে যায়। নদী তবু কেবল সাক্ষী নয়। সে সময়কে বহন করে।
ইছামতী পড়লে বোঝা যায়, ইতিহাস বড় ঘটনার মধ্যে একা থাকে না। ইতিহাস থাকে গৃহস্থের উঠোনে। নারীর নীরবতায়। কৃষকের মাটিতে। নদীর গতিতে। যে সমাজকে ইতিহাসের বই কয়েকটি তারিখে ধরে, বিভূতিভূষণ তাকে একটি বিকেলের আলোয় ধরে ফেলতে পারেন।
চাঁদের পাহাড়-এ ভূগোল এক লাফে আফ্রিকায় চলে যায়।
বিভূতিভূষণ আফ্রিকায় যাননি। বই, মানচিত্র, বিবরণ আর কল্পনা দিয়ে তিনি শঙ্করের পৃথিবী তৈরি করেছিলেন। অথচ সেই অজানা ভূমিও নিছক রোমাঞ্চের মঞ্চ হয়ে থাকে না। আগ্নেয়গিরি, তৃণভূমি, অরণ্য, বিপদ—সব মিলিয়ে মানুষ সেখানে নিজের ক্ষুদ্রতা বুঝতে শেখে। শঙ্করের সাহস বড়, কিন্তু তার চেয়েও বড় পৃথিবী।
এই অনুপাতটি বিভূতিভূষণের কাছে জরুরি।
মানুষ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মানুষ একমাত্র নয়।
দেবযান-এ তিনি আরও দূরে যান। জীবন ও মৃত্যুর সীমানা ছাড়িয়ে এমন এক বিশ্ব কল্পনা করেন, যেখানে মানুষের অস্তিত্ব বৃহত্তর মহাজাগতিক প্রবাহের অংশ। বাস্তব গ্রামবাংলার লেখক হঠাৎ আধ্যাত্মিক ও মহাজাগতিক হয়ে ওঠেন না—আসলে তিনি শুরু থেকেই ছিলেন। অপুর আকাশ আর দেবযান-এর আকাশের মধ্যে দূরত্ব যতটা মনে হয়, ততটা নয়।
তাঁর চরিত্রেরা বারবার আকাশের দিকে তাকায়।
এই তাকানো নিছক কবিত্ব নয়। তারা যেন নিজেদের অবস্থান মাপে।
আমরা সাধারণত উপন্যাসে মানুষ দেখি, মানুষের সমস্যা দেখি, মানুষের সম্পর্ক দেখি। বিভূতিভূষণের কাছে মানুষের চারপাশের পৃথিবীও সমান বাস্তব। গাছের বয়স আছে। নদীর স্মৃতি আছে। ঋতুর নিজস্ব সময় আছে। একটি গ্রাম মানুষের জীবনের চেয়েও দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারে—আবার মানুষের লোভে দ্রুত হারিয়েও যেতে পারে।
তাই তাঁর লেখায় সময় একরকম নয়।
শিশুর সময় ধীর। দরিদ্রের সময় অপেক্ষায় ভরা। নদীর সময় দীর্ঘ। অরণ্যের সময় আরও দীর্ঘ। সভ্যতার সময় তাড়াহুড়োর।
এই ভিন্ন সময়গুলো একই পাতায় এসে মিশে যায়।
বাংলা কথাসাহিত্যে প্রকৃতি নিয়ে অনেকেই লিখেছেন। কিন্তু বিভূতিভূষণের মতো প্রকৃতিকে মানুষের ভাগ্যের ভেতর, ইতিহাসের ভেতর, মহাবিশ্বের ভেতর এমন নিরবচ্ছিন্নভাবে রেখে দেওয়া বিরল। তিনি মানুষকে পৃথিবীর মালিক করে দেখেন না। বরং পৃথিবীর মধ্যে অল্প সময়ের জন্য থাকা এক যাত্রী হিসেবে দেখেন।
এই কারণেই তাঁর পাতায় একটি শুকনো পাতা কখনো কখনো একটি মানুষের মৃত্যুর মতোই স্পষ্ট।
তখনকার সমাজ, এখনকার বেদনা
তাঁর জন্মের সময় ভারত ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের অধীন। তাঁর জীবন কেটেছে সাম্রাজ্য, জাতীয়তাবাদ, দারিদ্র্য, মহামারি, দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ—সবকিছুর ছায়ায়। ১৯৫০ সালে তিনি চলে গেলেন। স্বাধীনতা তখন মাত্র তিন বছরের।
একটি পুরোনো পৃথিবী ভেঙে যাচ্ছিল। নতুন পৃথিবী তখনও নিজের নাম ঠিক করেনি।
বিভূতিভূষণের চরিত্রেরা সেই ভাঙনের মধ্যে বাস করে। কেউ গ্রাম ছাড়ে। কেউ কাজের জন্য দূরে যায়। কেউ জমি হারায়। কেউ পরিচিত সমাজের বাইরে ছিটকে পড়ে। অপুর মতো কেউ পিছনে ফেলে আসে বাড়ি। সত্যচরণের মতো কেউ পিছনে ফেলে আসে বন। শঙ্করের মতো কেউ অজানার দিকে যায়, কারণ পরিচিত জায়গায় তার জন্য যথেষ্ট জায়গা নেই।
স্থানচ্যুতি তাঁর সাহিত্যে শুধু রাজনৈতিক শব্দ নয়। শরীরের অভিজ্ঞতা।
নিজের জায়গা ছেড়ে যাওয়া মানে শুধু ঠিকানা বদলানো নয়। গন্ধ বদলানো। ভাষার স্বর বদলানো। কোন পাখি ভোরে ডাকবে, সেটিও বদলানো।
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে এই অনুভূতি অচেনা নয়।
আমাদের শহর বড় হয়েছে। রাস্তা বেড়েছে। আলো বেড়েছে। পর্দা বেড়েছে। শব্দ বেড়েছে। এমন রাত এখন সহজ, যেখানে আকাশ দেখা যায় না; এমন সকালও সহজ, যেখানে কোনো পাখির ডাক আলাদা করে শোনা যায় না।
যে অরণ্যের নিঃসঙ্গতা বিভূতিভূষণকে টেনেছিল, তার বহু ভূদৃশ্য আজ আর তাঁর দেখা রূপে নেই। বন ভাঙে বসতিতে, সড়কে, খনিতে, চাষে, প্রকল্পে। নদী বাঁধা পড়ে। গ্রাম শহরের প্রান্তে মিশে যায়। পুরোনো পথের ওপর নতুন রাস্তা ওঠে।
কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ক্ষয়টি সম্ভবত শব্দহীন।
আমরা জিনিসের নাম ভুলে যাই।
একটি গাছ চিনতে পারি না। একটি পাখির ডাক আলাদা করতে পারি না। আকাশে কোন নক্ষত্র উঠেছে জানি না। শিশুরা কাশবন দেখে ছবিতে। ট্রেন আর বিস্ময় নয়, সময়সূচি। দূরত্ব আর রহস্য নয়, মানচিত্রের নীল রেখা।
বিভূতিভূষণের লেখা ভবিষ্যৎবাণী করেনি।
তিনি তাঁর বর্তমানকে খুব গভীরভাবে দেখেছিলেন। এত গভীরভাবে যে সেই বর্তমানের ভেতরে আমাদের ভবিষ্যৎ ইতিমধ্যেই তৈরি হচ্ছিল।
আরণ্যক-এ যে বন কাটা হচ্ছিল, সেটি একটি নির্দিষ্ট বনের গল্প। আবার শুধু সেটি নয়। যে মুহূর্তে মানুষ কোনো জীবন্ত ভূখণ্ডকে কেবল সম্পদ হিসেবে দেখতে শেখে, সেই মুহূর্ত থেকেই ভবিষ্যতের একটি শূন্যতা তৈরি হয়।
আজ সেই শূন্যতার ভাষা আমাদের কাছে অনেক বেশি পরিচিত।
জলবায়ু বদলেছে। ঋতু অনিশ্চিত হয়েছে। বন হারানোর খবর সংখ্যায় আসে। প্রজাতি হারানোর খবর তালিকায় আসে। কিন্তু সংখ্যা কখনো একটি নির্দিষ্ট গাছের নিচে বিকেলের ছায়া ফিরিয়ে দেয় না।
বিভূতিভূষণ সংখ্যার আগে সেই ছায়াটি লিখে রেখেছিলেন।
তাই তাঁকে পড়া কখনো কখনো পুরোনো বাংলা পড়া নয়। হারিয়ে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তটি দেখা।
একটি পৃথিবী এখনও আছে—কিন্তু তার চলে যাওয়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
ঘন অরণ্যের মধ্যে সন্ধ্যা নেমেছে। পথ সরু। কোথাও মানুষ নেই। দূরে হয়তো একটি পাখি ডেকে উঠল। গাছের মাথায় শেষ আলো আটকে আছে। একটু পর সব অন্ধকার হবে।
কেউ সেই পথ দিয়ে একসময় হেঁটেছিল।
তার কাজ ছিল জমির হিসাব রাখা। সে হিসাব রেখেছিল। জমি ভাগ হয়েছে। গাছ কাটা হয়েছে। বসতি উঠেছে। কাগজে কাজ শেষ।
তবু বহু বছর পরে সে মনে করেছে সেই অরণ্যের কথা।
যাদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তাদের কথা। যেসব গাছ আর নেই, তাদের কথা। যে নীরবতা একদিন তাকে ঘিরে ধরেছিল, তার কথা।
বিভূতিভূষণের বই খুললে সেই নীরবতা এখনও একটু শোনা যায়।
পাতার ভেতর কাশফুল দোলে। ইছামতী বয়ে যায়। দূরে ট্রেন আসে। কোনো ছেলে আকাশের দিকে তাকায়। কোনো পথ বনের মধ্যে ঢুকে গেছে।
বাইরের পৃথিবীতে হয়তো সেই পথ আর নেই।
কিন্তু বইয়ের পাতায় একটু এগোলেই মনে হয়, বনটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে—গভীর, অন্ধকার, নিঃশব্দ।



