একটি পাণ্ডুলিপি, একটি রাত
১৯৭০ সাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল। রাত গভীর হয়েছে। জানালার বাইরে ঘন অন্ধকার, ভেতরে টেবিলের উপর ঝুঁকে আছেন এক তরুণ। হাতে কলম, সামনে কাগজের স্তূপ। তিনি জানেন না, এই রাতে যা লেখা হচ্ছে, তা একদিন বাংলা কথাসাহিত্যের চেনা পথ বদলে দেবে। তিনি শুধু লিখছেন।
লেখাটির নাম ‘নন্দিত নরকে’।
পাণ্ডুলিপিটি হাতে নিয়ে আহমদ ছফা বুঝেছিলেন, এই লেখক অন্য রকম। তিনি প্রকাশকের দরজায় দরজায় গেলেন। এক জায়গায় অনাগ্রহ, আরেক জায়গায় অনিশ্চয়তা। ছফার এই দৌড়ঝাঁপ ছিল কেবল একটি পাণ্ডুলিপির জন্য নয়; তিনি এমন একটি কণ্ঠস্বর চিনে ফেলেছিলেন, যে কণ্ঠস্বরকে পাঠকের কাছে পৌঁছাতেই হবে। শেষ পর্যন্ত ১৯৭২ সালে ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশিত হলো।

সদ্য স্বাধীন, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে হুমায়ূন আহমেদ কোনো মহাকাব্যিক উচ্চারণ নিয়ে এলেন না। তিনি একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের দরজা খুলে দিলেন। সেখানে অভাব, মানসিক অসুস্থতা, অপমান, নিষ্ঠুরতা এবং প্রকাশ করতে না পারা মমতা পাশাপাশি বাস করে। পাঠকেরা সেই ঘরে ঢুকে নিজেদেরই আত্মীয়স্বজনকে চিনলেন।
সদ্য স্বাধীন একটি দেশের টালমাটাল সময়ে একজন লেখকের জন্ম হচ্ছিল। একই সঙ্গে তাঁর ভেতরে জমা হচ্ছিল এমন কিছু অভিজ্ঞতা, যেগুলো থেকে তিনি কোনোদিন পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারবেন না।
পিতার মৃত্যু, রাষ্ট্রের আঘাত
১৯৭১ সালে হুমায়ূন আহমেদের বয়স বাইশ। যে বয়সে একজন তরুণ ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখে, সেই বয়সেই তাঁকে ভবিষ্যতের হিসাব কষতে বসতে হয়েছিল।
তাঁর বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ ছিলেন পিরোজপুরের মহকুমা পুলিশ কর্মকর্তা। কর্তব্যনিষ্ঠ ও দেশপ্রেমিক মানুষ। পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে আটক করে। ৫ মে বালেশ্বর নদীর তীরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়।
একটি পরিবার যুদ্ধকে মানচিত্রে দেখে না। তারা যুদ্ধকে দেখে একজন মানুষের অনুপস্থিতিতে। দরজার দিকে তাকিয়ে থাকা এক নারীর চোখে। আলনায় ভাঁজ করে রাখা পোশাকে। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামলেও পরিচিত পায়ের শব্দ না ফেরার মধ্যে।
ফয়জুর রহমানের মৃত্যুসংবাদ পরিবারটির কাছে কীভাবে, কোন মুহূর্তে পৌঁছেছিল, তার প্রতিটি দৃশ্য আমাদের জানা নেই। কিন্তু অপেক্ষা একসময় শেষ হয়েছিল। অপেক্ষার জায়গায় এসেছিল নিশ্চিত শূন্যতা। থেমে গিয়েছিল একটি পরিবারের স্বাভাবিক ছন্দ।
বালেশ্বর নদী অবশ্য থামেনি।
তার জল বয়ে গেছে, জোয়ার এসেছে, নৌকা চলেছে। প্রকৃতি মানুষের ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের জন্য থেমে থাকে না। একটি পরিবারের পৃথিবী শেষ হয়ে গেলেও বাইরের পৃথিবী আগের মতো চলতে থাকে। চারপাশের এই নির্লিপ্ততাই শোককে কখনো কখনো আরও নির্মম করে তোলে।
আয়েশা ফয়েজ তখন শুধু স্বামীহারা নারী নন। সামনে ছোট ছোট সন্তান। তাঁদের খাবার, শিক্ষা, আশ্রয় ও নিরাপত্তার প্রশ্ন। হুমায়ূন পরিবারের বড় ছেলে। বাবার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কাঁধে এমন এক দায় এসে পড়ল, যার জন্য কোনো তরুণ প্রস্তুত থাকে না। তাঁকে নিজের শোকের পাশাপাশি মায়ের নীরবতা বুঝতে হয়েছে, ছোট ভাই-বোনদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হয়েছে।
স্বাধীনতার পরে শহীদ পরিবারের বিধবা আয়েশা ফয়েজকে ঢাকার বাবর রোডে একটি বাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সেটি ক্ষতিপূরণ ছিল না। একজন মানুষের মৃত্যুর বদলে কোনো বাড়ি দেওয়া যায় না। তবু মাথার ওপর ছাদ ছিল। নতুন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সামান্য স্বীকৃতি ছিল।
আয়েশা ফয়েজের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, সেই আশ্রয়ও স্থায়ী হয়নি। সশস্ত্র রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা পরিবারটিকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে। যে রাষ্ট্রের পতাকার জন্য স্বামী প্রাণ দিয়েছিলেন, সেই রাষ্ট্রেরই একটি বাহিনী তাঁকে বারান্দা থেকে নামিয়ে দিল।
আহমদ ছফা প্রতিবাদ করেছিলেন। যে মানুষটি হুমায়ূনের পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশকের কাছে ঘুরেছেন, তিনিই আবার তাঁর পরিবারের আশ্রয়ের প্রশ্নে পাশে দাঁড়ালেন। পরে ব্যবস্থা হয়েছিল, ক্ষমাও এসেছিল। কিন্তু ক্ষমা একটি ঠিকানা ফিরিয়ে দিতে পারে; সন্তানদের সামনে ঘর ছাড়ার মুহূর্তটি মুছে দিতে পারে না।
বাবর রোডের বাড়িটি পেছনে রয়ে গেল। বহু বছর পর হুমায়ূন গাজীপুরে নিজের হাতে এমন একটি জায়গা বানাবেন, যেখানকার প্রতিটি পথ, পুকুর ও গাছ তিনি নিজে বেছে নেবেন।
রসায়ন, সংসার ও প্রথম বইগুলো
হুমায়ূন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন পড়ছিলেন। অণু কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়, কোন বন্ধন স্থায়ী, কোনটি সামান্য চাপে ভেঙে যায়, তিনি তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা শিখছিলেন। একই সময়ে তাঁর চারপাশে মানুষের সংসারের আরও জটিল রসায়ন চলছিল। সেখানে ভালোবাসা ছিল, অভিমান ছিল, দায় ছিল; কিন্তু কোনো সমীকরণ ছিল না।
১৯৭৩ সালে তাঁর সঙ্গে গুলতেকিন খানের বিয়ে হয়। তখন হুমায়ূন বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক নন। তিনি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের একজন তরুণ শিক্ষক ও নবীন কথাসাহিত্যিক। পেছনে পিতৃহীন পরিবার, সামনে দীর্ঘ পথ। গুলতেকিন তাঁর জীবনে এসেছিলেন সেই সময়ে, যখন খ্যাতির উজ্জ্বল আলো দূরের বিষয়।
এই উপস্থিতির অর্থ শুধু একটি বিবাহের তারিখে ধরা যায় না। প্রথম লেখালেখির উত্তেজনা, অল্প আয়ের সংসার, শিক্ষকতার ব্যস্ততা, সন্তানদের জন্ম, বিদেশে পড়তে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এবং দেশে ফিরে আবার জীবন গোছানো, সবকিছুর মধ্যে তিনি ছিলেন। পৃথিবী যখন হুমায়ূনের নতুন বইয়ের জন্য অপেক্ষা করতে শেখেনি, তখন তাঁদের ভাগ করে নিতে হয়েছে অনিশ্চয়তা।
‘নন্দিত নরকে’র পরে এল ‘শঙ্খনীল কারাগার’। আবারও একটি পরিবার, আবারও ঘরের ভেতর চাপা পড়ে থাকা ক্ষত। হুমায়ূন এমন ভাষায় এসব লিখলেন, যা সহজে পড়া যায়, কিন্তু সহজে ভুলে থাকা যায় না। পাঠকের কাছে তাঁর মানুষগুলো কল্পিত চরিত্রের চেয়ে বেশি পরিচিত হয়ে উঠতে শুরু করল।
এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ এল। যাওয়া মানে নিজের মেধার প্রতি সুবিচার করা। আবার যাওয়া মানে সদ্য গড়ে ওঠা সংসার এবং দীর্ঘদিন ধরে বিপর্যস্ত পরিবারকে পেছনে রেখে যাওয়া। কিছু যাত্রায় উত্তেজনার সঙ্গে অপরাধবোধও থাকে; বিমান যত দূরে যায়, দুটি টান তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
হুমায়ূন গেলেন, পিএইচডি অর্জন করলেন, দেশে ফিরে এলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করলেন। দিনের একটি অংশ কাটত শ্রেণিকক্ষে, অন্য অংশে লেখা। ডিগ্রির সনদ, শিশুর বই, পরীক্ষার খাতা এবং অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি একই ঘরে জায়গা করে নিল।
বইয়ের পাতা থেকে ঘরে ঘরে
আশির দশকে হুমায়ূন আহমেদের গল্প বইয়ের পাতা ছেড়ে টেলিভিশনের পর্দায় প্রবেশ করল। ‘এইসব দিনরাত্রি’তে দর্শকেরা কোনো দূরবর্তী নায়ককে দেখল না; দেখল একটি পরিচিত পরিবার। অসুখ, রাগ, হাসি, অর্থকষ্ট এবং শিশুর মৃত্যু এমনভাবে পর্দায় এল, যেন পাশের বাড়ির দরজাটি কিছুক্ষণের জন্য খোলা হয়েছে।
টুনির মৃত্যুর পর দর্শকের কান্না কেবল একটি চরিত্রের জন্য ছিল না। হুমায়ূন দেখিয়েছিলেন, সাধারণ একটি পরিবারের সামান্য একটি শিশুর মৃত্যুও জাতীয় শোক হয়ে উঠতে পারে, যদি গল্পকার মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানোর পথটি জানেন।
এরই মধ্যে তাঁর কথাসাহিত্যে এল মিসির আলি। ‘দেবী’তে দেখা গেল এক নিঃসঙ্গ যুক্তিবাদী মানুষকে, যিনি অতিপ্রাকৃত বলে মনে হওয়া ঘটনার ব্যাখ্যা খোঁজেন। মিসির আলি অন্ধ বিশ্বাসের মানুষ নন, আবার অহংকারী যুক্তিরও নন। তিনি জানেন, মানুষের মন অন্ধকার ঘরের মতো; বাইরে থেকে যতটা দেখা যায়, ভেতরে তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু থাকে।
তারপর এল ‘বহুব্রীহি’। পরিবার, রাজনীতি, সামাজিক ভণ্ডামি ও দৈনন্দিন হাস্যরসকে এমনভাবে একত্র করা হলো, যা আগে বাংলাদেশের টেলিভিশনে দেখা যায়নি। ‘অয়োময়’ দর্শককে নিয়ে গেল অন্য সময়ে, অন্য সামাজিক পরিসরে। হুমায়ূনের গল্পের বিস্তার বাড়ছিল, কিন্তু তাঁর মানুষেরা একই থাকছিল। তারা হাসে, লজ্জা পায়, ভুল করে, ভালোবাসতে গিয়ে আহত হয়।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ‘ময়ূরাক্ষী’র মাধ্যমে হিমুর আবির্ভাব। হলুদ পাঞ্জাবি পরা, খালি পায়ে হাঁটা, চাকরি ও সম্পত্তির বাইরে থাকা এক যুবক। হিমু যেন সামাজিক নিয়মের বিরুদ্ধে কোনো উচ্চকণ্ঠ বিদ্রোহ নয়; সে নিয়মগুলোকে গুরুত্ব না দেওয়ার সাহস। যে লেখক একসময় পরিবারের দায়ে শৈশব হারিয়েছিলেন, তাঁর কল্পনায় এমন একজন মানুষ জন্ম নিল, যার কোনো দায় নেই, ঠিকানা নেই, ভবিষ্যতের হিসাব নেই।

তবে এই সময়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান মুহূর্ত হয়ে থাকে ‘কোথাও কেউ নেই’। শেষ পর্বের আগে ঢাকার কোথাও কোথাও দেয়ালে লেখা হলো, বাকের ভাইয়ের ফাঁসি চাই না। মিছিলের মতো মানুষ জড়ো হলো, যেন আদালতের রায় বদলে দেওয়া সম্ভব। কল্পিত একজন মানুষের জন্য বাস্তব শহরের এই আন্দোলন আজ স্মৃতি ও কিংবদন্তির মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু ঘটনাটি একটি বিষয় স্পষ্ট করে: পুরো দেশ একই সময়ে একই গল্পের ভেতরে বাস করছিল।
এই সাফল্যের পেছনে একজন মানুষকে ক্রমাগত বহু দিকে ছড়িয়ে যেতে হচ্ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ, লেখার টেবিল, টেলিভিশন স্টুডিও, প্রকাশকের তাগাদা, বইমেলার ভিড় এবং সংসার, সবকিছু একই সময় চাইছিল। তাঁর চরিত্রেরা যত ঘরে প্রবেশ করছিল, নিজের ঘরে অবসর নিয়ে বসার সময় তত কমছিল।
‘কোথাও কেউ নেই’-এর শেষ পর্ব শেষ হয়ে যাওয়ার পরও বহু দর্শক পর্দার সামনে বসে ছিল। অনুষ্ঠান শেষ, কিন্তু বাকের ভাইয়ের মৃত্যুকে তারা তখনো নাটকের ঘটনা বলে মেনে নিতে পারেনি।
পর্দার আলো এবং ভেতরের ভাঙন
১৯৯৪ সালে ‘আগুনের পরশমণি’ দিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে হুমায়ূন আহমেদের যাত্রা শুরু হলো।মুক্তিযুদ্ধকে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রের বিস্তৃত দৃশ্য দিয়ে নয়, অবরুদ্ধ একটি পরিবারের ঘর থেকে দেখালেন। বাইরে দখলদার বাহিনী, ভেতরে ভয়, অপেক্ষা, প্রেম এবং এক তরুণ মুক্তিযোদ্ধার অস্থির উপস্থিতি। যে যুদ্ধ তাঁর নিজের বাবাকে কেড়ে নিয়েছিল, সেই যুদ্ধের কাছে তিনি বহু বছর পরে ক্যামেরা নিয়ে ফিরে গেলেন।
এরপর টেলিভিশনে ‘নক্ষত্রের রাত’, চলচ্চিত্রে ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’ ও ‘চন্দ্রকথা’। একটিতে গ্রামবাংলার সংগীত, প্রেম ও মৃত্যু; অন্যটিতে একটি পরিবারের মধ্যে প্রবেশ করা রহস্যময় আগন্তুক; আরেকটিতে আকাঙ্ক্ষা, ক্ষমতা ও সামাজিক ব্যবধান। বইমেলায় তাঁর পাঠকের সারি দীর্ঘ হতে থাকে। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে নতুন বই প্রকাশের দিনটি নিজেই একটি ঘটনা হয়ে ওঠে।
হুমায়ূনের শিল্পজগতে তখন আলো ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছিল। ব্যক্তিগত জীবনে ঠিক সেই সময়ে ফাটলও দৃশ্যমান হলো।
মেহের আফরোজ শাওনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। গুলতেকিনের সঙ্গে দীর্ঘ দাম্পত্য শেষ হয়, পরে হুমায়ূন শাওনকে বিয়ে করেন। প্রথম সংসারের সন্তানদের সঙ্গে দূরত্বও প্রকাশ্য আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে।
ঘটনাগুলো সংবাদপত্রের কলাম, টেলিভিশনের আড্ডা এবং ব্যক্তিগত কথোপকথনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। বিচ্ছেদ ও পুনর্বিবাহকে ঘিরে শাওনকে বিশেষভাবে আক্রমণ করা হয়; হুমায়ূনের বিরুদ্ধেও নৈতিক রায় উচ্চারিত হতে থাকে। তিনি কোনো দীর্ঘ আত্মপক্ষসমর্থন লিখলেন না। সাক্ষাৎকারে বিচ্ছিন্ন কিছু কথা বলেছেন, কিন্তু জনতার সামনে নিজের জীবনের পূর্ণ বিবরণ হাজির করেননি।
প্রথম পরিবারের আঘাত বাস্তব। বহু বছরের সংসার ভেঙে গেলে শুধু দুজন মানুষের সম্পর্ক শেষ হয় না। সন্তানদের নিরাপত্তাবোধ বদলে যায়, পুরোনো স্মৃতি নতুন অর্থ পায়, আত্মীয়তার মধ্যে দেয়াল ওঠে। হুমায়ূনের সৃষ্টিশীল সাফল্য তাঁকে এই সিদ্ধান্তের ফল থেকে মুক্ত করে না।
একই সঙ্গে জনতার আদালত জটিল গল্প পছন্দ করে না। সেখানে দ্রুত ভূমিকা ভাগ হয়ে যায়: একজন অপরাধী, একজন প্রলোভনদাত্রী, একজন পরিত্যক্তা এবং কয়েকজন আহত সন্তান। মানুষের দীর্ঘ জীবনকে কয়েকটি সরল চরিত্রে নামিয়ে আনা হয়।
অভিযোগ ছিল, সাক্ষ্য ছিল, ক্ষত ছিল। তবু সব পক্ষের সম্পূর্ণ কথা শোনার কোনো স্থান ছিল না। জনতার আদালতে সাক্ষী অনেক, কিন্তু পূর্ণ শুনানি নেই। রায় আছে, মানুষের সমগ্র জীবন দেখার ধৈর্য নেই।
এখানেই তাঁর জীবনের এক গভীর পরিহাস। কয়েক দশক ধরে হুমায়ূন এমন মানুষদের গল্প লিখেছেন, যারা ভুল করে, অন্যকে আঘাত করে, নিজেরাও আহত হয়, তবু মানুষ হিসেবে সম্পূর্ণ থাকে। তিনি পাঠককে শিখিয়েছিলেন, কোনো ব্যক্তিকে তার সবচেয়ে খারাপ মুহূর্তের মধ্যে বন্দী করা যায় না। তাঁর নিজের সবচেয়ে বিতর্কিত সিদ্ধান্তের সময় সেই পাঠই আর মনে রাখা হলো না।
তাঁকে নির্দোষ প্রমাণ করা এই গল্পের কাজ নয়। দোষী সাব্যস্ত করাও নয়। শুধু এটুকু স্বীকার করা দরকার, যে মানুষটি তাঁর চরিত্রদের জন্য অসংখ্য ব্যাখ্যার দরজা খোলা রেখেছিলেন, তাঁর নিজের জন্য সমাজ প্রায় সব দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল।
তিনি আর কোনো দীর্ঘ জবাব দিলেন না।
নুহাশপল্লী, হারানো সন্তান
হুমায়ূন ধীরে ধীরে শহরের কোলাহল থেকে সরে গেলেন। গাজীপুরের সবুজের মধ্যে নুহাশপল্লী হয়ে উঠল তাঁর প্রধান আশ্রয়। সেখানে পুকুর, বাগান, দুর্লভ বৃক্ষ, ভাস্কর্য, বৃষ্টির ঘর এবং খোলা আকাশ। কিন্তু নুহাশপল্লীকে শুধু সফল লেখকের বিলাসী অবকাশকেন্দ্র মনে করলে তার গভীর অর্থটি ধরা পড়ে না।
একদিন তাঁর পরিবারকে একটি বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। বহু বছর পর তিনি এমন একটি পৃথিবী বানালেন, যার প্রতিটি গাছের সঙ্গে তাঁর নিজের সম্পর্ক, প্রতিটি পথের ওপর তাঁর নিজের অধিকার। একটি ঘর নয়, সম্পূর্ণ একটি ভূদৃশ্য।
গাছেরা মানুষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রশ্ন করে না। পুকুরের জল নৈতিক রায় দেয় না। সেখানে তিনি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নন, বিতর্কের আসামিও নন। তিনি সেখানে খালি পায়ে হাঁটতেন, বৃষ্টি দেখতেন, অদ্ভুত গাছ সংগ্রহ করতেন, রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেন।
শাওনের সঙ্গে তাঁর নতুন সংসারে সন্তান এল। আবার ক্ষতিও এল। তাঁদের একটি কন্যা পৃথিবীর আলো দেখার আগেই চলে গেল। নাম রাখা হয়েছিল লীলাবতী। নুহাশপল্লীর একটি দিঘি তার নামে।

বাস্তবে যে মেয়ে বড় হতে পারেনি, কল্পনায় তাকে বড় করে ভালোবাসায় ভরা একটি জীবন দেওয়ার চেষ্টা করেছেন হুমায়ূন। লেখকের হাতে তখন আর কোনো উপায় ছিল না। বাস্তব থেকে চলে যাওয়া শিশুকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনা যায় না। তাই তিনি ভাষার ভেতরে তার জন্য সময় বানালেন। তাকে শৈশব দিলেন, মুখ দিলেন, হাঁটার পথ দিলেন। যে ভবিষ্যৎটি তার পাওয়ার কথা ছিল, গল্পের মধ্যে সেই ভবিষ্যতের একটি প্রতিরূপ আঁকলেন।
এই সময়ে তিনি লিখলেন ‘জোছনা ও জননীর গল্প’। মুক্তিযুদ্ধ, মা এবং মাতৃভূমিকে নিয়ে তাঁর বিস্তৃত উপন্যাস। পিতার মৃত্যুর বহু বছর পর তিনি আবার ১৯৭১-এর কাছে ফিরে গেলেন, এবার শুধু ব্যক্তিগত ক্ষত নিয়ে নয়, একটি জাতির স্মৃতি নিয়ে।
চলচ্চিত্রে নির্মাণ করলেন ‘শ্যামল ছায়া’। নৌকায় চলা কয়েকজন সাধারণ মানুষের চোখ দিয়ে যুদ্ধকে দেখলেন। যেন বালেশ্বরের তীরে নিহত পিতার কাছে আরেকবার ফিরে যাওয়া, যদিও সেই ফিরে যাওয়ায় কোনো পুনর্মিলন নেই।
পরে এল ‘আমার আছে জল’, ‘ঘেটুপুত্র কমলা’। অন্যদিকে উপন্যাসে ‘মধ্যাহ্ন’, ‘লীলাবতী’সহ নানা কাজে ইতিহাস, আকাঙ্ক্ষা, ক্ষমতা ও মৃত্যুর কাছে ফিরে গেলেন। সৃষ্টির পরিসর বাড়ছিল, কিন্তু নুহাশপল্লীর নির্জনতার ভেতরে কিছু ব্যক্তিগত সম্পর্ক অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছিল।
প্রথম সংসারের সন্তানদের সঙ্গে দূরত্ব, ভাই মুহম্মদ জাফর ইকবালের সঙ্গে অভিমান, হারানো সন্তানের স্মৃতি, এসবের নির্ভুল পরিমাণ বাইরের কেউ মাপতে পারে না। জাফর ইকবাল পরে বড় ভাইয়ের সঙ্গে শেষ জীবনের দূরত্বের কথা বলেছেন, বলেছেন সময় থাকতে সেই দূরত্ব ঘোচাতে না পারার আক্ষেপের কথা।
দুই ভাই বাংলা ভাষার দুই জনপ্রিয় লেখক। শৈশবে একই পিতার মৃত্যুর অন্ধকার তাঁদের ওপর নেমেছিল। অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে তাঁদের মধ্যে এমন কিছু কথা জমে রইল, যা আর বলা হলো না।
রাত নামলে নুহাশপল্লীর গাছের ফাঁক দিয়ে আলো পড়ত। লীলাবতী দিঘির জল সেই আলো ধরে রাখত। কাছেই হয়তো বসে থাকতেন হুমায়ূন। চারদিকে তাঁর নিজের তৈরি পৃথিবী।
তবু কিছু অনুপস্থিতির ওপর কোনো ঘর তৈরি করা যায় না।
নিউইয়র্কের জানালা
২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে হুমায়ূন আহমেদের কোলোরেক্টাল ক্যানসার ধরা পড়ে। চিকিৎসার জন্য যেতে হলো নিউইয়র্কে। শুরু হলো কেমোথেরাপি, পরীক্ষা, হাসপাতাল, অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি।
তাঁর সাহিত্যের পৃথিবীতে ছিল বর্ষার ভেজা পথ, কালো নদী, কদমফুল, শালবনের গন্ধ, দূরের বাঁশি, রান্নাঘরের ধোঁয়া। নিউইয়র্কে জানালার বাইরে ছিল কাচ ও ইস্পাতের শহর। হাসপাতালের সাদা আলোয় রাত ও দিনের পার্থক্য কমে আসে। যন্ত্র নিয়মিত শব্দ করে। খাবারের গন্ধে কোনো শৈশব জেগে ওঠে না।
এই বৈপরীত্য সব সময় নিখুঁত ছিল না। চিকিৎসার মধ্যেও পরিচিত মানুষ এসেছেন, হাসি ফিরেছে, লেখালেখির কথা হয়েছে। তবু একটি দূরত্ব সারাক্ষণ থেকে গেছে। তাঁর ভাষা, মাটি, বৃষ্টি এবং নিজের হাতে লাগানো গাছ থেকে হাজার হাজার মাইলের দূরত্ব।
২০১২ সালে তিনি অল্প সময়ের জন্য বাংলাদেশে ফিরেছিলেন। তখনকার সংবাদমাধ্যমে তাঁর নিজের বক্তব্য উদ্ধৃত করে লেখা হয়, বিমান ঢাকার মাটি ছোঁয়ার আগে তাঁর চোখে পানি এসেছিল। বহু দেশ দেখা একজন মানুষের কাছে সেই মাটি তখন কেবল একটি ভূখণ্ড ছিল না; ছিল শরীরের হারানো অংশ ফিরে পাওয়ার মতো।
তিনি নুহাশপল্লীতে গেলেন। পরিচিত গাছগুলোর কাছে দাঁড়ালেন, পুকুর দেখলেন, কর্মীদের সঙ্গে কথা বললেন। লীলাবতী দিঘির পাশে কতক্ষণ ছিলেন, জানা নেই। কিন্তু এ ছিল মৃত কন্যার নামে রাখা জলের কাছে তাঁর শেষ ফিরে আসা।
দৃশ্যটি থামিয়ে দেখা যায়। অসুস্থ একজন মানুষ স্থির জলের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। এই পুকুর তাঁর বানানো, নামটিও তাঁর দেওয়া। জল কোনো উত্তর দেয় না; শুধু মানুষের মুখের সঙ্গে তার হারিয়ে যাওয়া সময়ও ফিরিয়ে দেখায়।
চিকিৎসা তখনো অসমাপ্ত। তাঁকে আবার নিউইয়র্কে ফিরতে হলো। যাওয়ার সময় তিনি শেষবারের মতো তাকাচ্ছেন, এ কথা জানতেন কি না, তা জানা সম্ভব নয়। মানুষ নিজের শেষ দৃশ্যকে সব সময় শেষ দৃশ্য হিসেবে চিনতে পারে না। হয়তো তিনি ভেবেছিলেন, ফিরে এসে আবার গাছ লাগাবেন, বর্ষা দেখবেন, নতুন গল্পের প্রথম বাক্য লিখবেন।
বিমান উড়ে গেল। নুহাশপল্লীর গাছ, দিঘি ও পরিচিত পথ নিচে ছোট হয়ে এল।
চান্নি পসরের প্রার্থনা
হুমায়ূন আহমেদের কাছে জোছনা শুধু দৃশ্যসজ্জা ছিল না। জোছনা রাতের ব্যাপারে তিনি এতটাই আচ্ছন্ন ছিলেন তাঁর প্রতিটা গল্পে, নাটকে, সিনেমায় এর ব্যবহার ছিল খুব আবেগ আর সতর্কতায়। তাঁর শিল্পের অন্যতম গভীর ভাষায় বার বার তিনি বলেছেন- জোছনায় অন্ধকার দূর হয় না, কিন্তু অন্ধকারের চেহারা বদলে যায়। কঠিন পৃথিবী কিছুক্ষণের জন্য কোমল হয়ে ওঠে। পরিচিত গাছ, ঘর, নদী ও মানুষের মুখে অপরিচিত সৌন্দর্য নামে।
তাঁর চরিত্রেরা তাই রাতে বেরিয়ে পড়ে। কেউ উদ্দেশ্যহীন হাঁটে, কেউ অপেক্ষা করে, কেউ এমন কথা বলে, যা দিনের আলোয় বলা যায় না। হিমুর পৃথিবী জোছনায় আরও রহস্যময় হয়। ‘চন্দ্রকথা’র মানুষদের ওপর চাঁদের আলো পড়ে, কিন্তু তাদের সামাজিক বাস্তবতা বদলে দেয় না। ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ নামেই তিনি আলো ও মাতৃত্বকে পাশাপাশি রাখেন।
জোছনা তাঁর কাছে বাস্তবতা থেকে পালানোর পথ ছিল না। বরং কঠিন বাস্তবতাকে কিছুক্ষণ সহ্য করার উপায়। তাঁর গল্পও পাঠকের জন্য একই কাজ করেছে। দুঃখ মুছে দেয়নি, দুঃখের পাশে বসার মতো আলো দিয়েছে।
এই মানুষটিই ‘ও কারিগর, দয়ার সাগর’ গানে আকুতি জানিয়েছিলেন, “চান্নি পসর রাইতে যেন আমার মরণ হয়।”
লাইনটি মৃত্যুকে ভালোবাসা মানুষের প্রার্থনা নয়। এটি এমন এক ইচ্ছা, যেন তিনি পৃথিবীর শেষ দৃশ্যটিকেও সৌন্দর্যের মধ্যে দেখতে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, তাঁর শেষ মুহূর্তে অন্ধকার থাকলেও তার ওপর নরম আলো পড়ুক। মৃত্যু আসুক, কিন্তু নিষ্ঠুর মুখে নয়।

২০১২ সালের ১৯ জুলাই নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালে হুমায়ূন আহমেদ মারা গেলেন।
সেদিন পূর্ণিমা ছিল না।
সেদিন ছিল ঘোর অমাবস্যা।
এটি কাকতালমাত্র। আকাশ কোনো মানুষের ব্যক্তিগত ইচ্ছা অনুসারে নিজের দিনপঞ্জি বদলায় না। চাঁদ জানত না, নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালের ঘরে এমন একজন মানুষ শুয়ে আছেন, যিনি সারা জীবন তার উপস্থিতিকে ভাষা দিয়েছেন গভীর মমতা আর ভালোবাসায়।
তবু তাঁর জীবনের পাশে এই কাকতাল রাখলে একটি নিদারুণ রুপক জন্ম নেয়। অথবা আমরা নিজেরাই সেই রুপক সৃষ্টি করি। কারণ কিছু জীবন বোঝার জন্য তথ্য যথেষ্ট হয় না, রূপকের প্রয়োজন হয়।
পিতার মৃত্যু, ঘর থেকে উচ্ছেদ, পরিবারের দায়, দীর্ঘ সংসারের ভাঙন, জনতার আদালত, সন্তান হারানো, ভাইয়ের সঙ্গে না-মেটা দূরত্ব, নিজের মাটি থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে শেষ চিকিৎসা, সব যেন এসে মিলল একটি চাঁদহীন নিকষ কালো রাতে।
প্রকৃতি তাঁর জীবনের শেষ রূপকটি লিখেছিল কি না, তা বলার উপায় নেই। তিনি অন্যদের জন্য অন্ধকারের মধ্যে জোছনার জায়গা তৈরি করে গেছেন। পাঠকের হাতে তুলে দিয়েছেন হিমুর হলুদ পাঞ্জাবি, মিসির আলির যুক্তি, বাকের ভাইয়ের অসহায় সাহস, টুনির নিষ্পাপ মুখ। তিনি দেখিয়েছেন, একটি দুঃখী সন্ধ্যাতেও বৃষ্টি নামতে পারে, দরজায় অদ্ভুত কেউ এসে দাঁড়াতে পারে, দূরের বাঁশি শোনা যেতে পারে।
শেষ রাতে তাঁর জন্য সেই চান্নি পসর ছিল না।
সেদিন বাংলাদেশে অবশ্য একে একে বাতি জ্বলেছিল। টেলিভিশনের পর্দায় তাঁর মুখ, মুঠোফোনে মৃত্যুসংবাদ, পাঠকের কোলে পুরোনো বই। কেউ ‘নন্দিত নরকে’র প্রথম পাতা খুলেছেন, কেউ বাকের ভাইকে মনে করেছেন, কেউ হিমুর সঙ্গে হাঁটার কোনো রাত ফিরে পেয়েছেন। কেউ তাঁর গান শুনে কেঁদেছেন।
মানুষটি শুধু তা দেখতে পেলেন না।
মানুষটিকে দেখা
হুমায়ূন আহমেদকে আমরা দীর্ঘদিন দুই প্রান্ত থেকে দেখেছি। কখনো তাঁকে প্রায় অলৌকিক প্রতিভায় পরিণত করেছি, কখনো ব্যক্তিগত জীবনের একটি সিদ্ধান্ত দিয়ে পুরো মানুষটিকে বিচার করেছি। দেবতা ও আসামি, দুটি পরিচয়ই শেষ পর্যন্ত একই কাজ করে: মাঝখান থেকে মানুষটিকে সরিয়ে দেয়।
তাঁকে পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখার অর্থ তাঁর সিদ্ধান্তের ক্ষত অস্বীকার করা নয়। আবার তাঁর ভুলের কারণে তাঁর সমস্ত সৃষ্টিকেও বাতিল করা নয়। তাঁর নিজের চরিত্রগুলোর মতোই তিনি ছিলেন পরস্পরবিরোধী, স্নেহশীল ও কঠিন, আহত এবং অন্যকে আহত করতে সক্ষম।
কিন্তু আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে তিনি যে জায়গাটি তৈরি করেছেন, তা রয়ে গেছে। অসুখের রাতে, বৃষ্টির দুপুরে, একাকী যাত্রায় কিংবা প্রিয়জন হারানোর পরে তাঁর গল্প বহু পাঠকের পাশে বসেছে। সমস্যার সমাধান দেয়নি; সন্ধ্যাটি পার হওয়ার মতো সঙ্গ দিয়েছে।
নিউইয়র্কের আকাশে যে চাঁদ ওঠেনি, সেই চাঁদ আজও আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে তাঁর পাঠকদের মনে।

