চিকিৎসা বিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্যের ইতিহাসে মানবজাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং যুগান্তকারী আবিষ্কার হলো টিকাদান বা ইমিউনাইজেশন ব্যবস্থা। পৃথিবীতে প্রতি বছর লাখ লাখ শিশু নানা ধরনের ভয়াবহ সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, যার মধ্যে একটি বড় অংশ অকালমৃত্যুর শিকার হয় অথবা চিরস্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করে নেয়। জন্মের পরপরই একটি নবজাতকের শরীর বাইরের পৃথিবীর অসংখ্য ক্ষতিকারক ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত থাকে না। মায়ের শরীর থেকে গর্ভকালীন সময়ে পাওয়া অ্যান্টিবডিগুলো জন্মের পর মাত্র কয়েক মাস পর্যন্ত শিশুকে আংশিক সুরক্ষা দিতে পারে।
এরপর শিশুর নিজস্ব ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে হয়। ঠিক এই অরক্ষিত এবং স্পর্শকাতর সময়ে শিশুকে বাইরের জীবাণুর আক্রমণ থেকে বাঁচাতে কৃত্রিমভাবে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সবচেয়ে নিরাপদ, সাশ্রয়ী এবং কার্যকর পদ্ধতিটিই হলো টিকাদান। একজন সচেতন অভিভাবক হিসেবে শিশুর সুরক্ষায় টিকা কেন দেবেন কখন দেবেন, তা নিয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রতিটি পরিবারের জন্য অত্যাবশ্যক।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফ (UNICEF)-এর মতে, বিশ্বজুড়ে টিকাদান কর্মসূচির কারণে প্রতি বছর প্রায় ৩৫ থেকে ৫০ লাখ মানুষের প্রাণ রক্ষা পাচ্ছে । একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার সুস্থ ও সবল শিশু প্রজন্মের ওপর। শিশুদের সুস্থতা নিশ্চিত করতে এবং প্রতিরোধযোগ্য রোগব্যাধি থেকে তাদের দূরে রাখতে সঠিক সময়ে নির্ধারিত টিকার কোর্স সম্পন্ন করা অত্যন্ত জরুরি। এটি কেবল একটি স্বাস্থ্যগত পদক্ষেপ নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ও জাতীয় দায়িত্ব। টিকার মাধ্যমে শুধু নিজের শিশুই সুরক্ষিত থাকে না, বরং পুরো সমাজে জীবাণুর বিস্তার রোধ করে একটি সুরক্ষিত বলয় তৈরি হয়।
শিশুর সুরক্ষায় টিকা কেন দেবেন কখন দেবেন
শিশুর সার্বিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং রোগ প্রতিরোধ কাঠামো মজবুত করার জন্য নির্দিষ্ট সময়ে সঠিক টিকা প্রদান করা প্রতিটি পিতা-মাতার প্রাথমিক দায়িত্ব। টিকা মূলত একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে শিশুর শরীরকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় যাতে সে ভবিষ্যতে কোনো ক্ষতিকারক জীবাণুর আক্রমণ সহজেই প্রতিহত করতে পারে। অনেক অভিভাবকই দ্বিধায় ভোগেন যে, সম্পূর্ণ সুস্থ একটি শিশুকে কেন ইনজেকশন বা টিকা দিয়ে সাময়িক কষ্টের মধ্যে ফেলা হবে। এর সহজ এবং বৈজ্ঞানিক উত্তর হলো, রোগ হওয়ার পর চিকিৎসা করার চেয়ে রোগ হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা বহুগুণ বেশি নিরাপদ ও বুদ্ধিমানের কাজ। শিশুর সুরক্ষায় টিকা কেন দেবেন কখন দেবেন, তা নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এটি শিশুমৃত্যু রোধের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার স্বাভাবিক বিকাশ
টিকা বা ভ্যাকসিন হলো মূলত দুর্বল, মৃত বা নিষ্ক্রিয় করা জীবাণুর একটি ক্ষুদ্র অংশ, যা শরীরে প্রবেশ করালে কোনো রোগ সৃষ্টি করতে পারে না, তবে ইমিউন সিস্টেমকে উদ্দীপ্ত করে । যখন এই দুর্বল জীবাণু শিশুর শরীরে প্রবেশ করে, তখন শ্বেত রক্তকণিকাগুলো একে বহিরাগত শত্রু হিসেবে চিনে রাখে এবং বিশেষ ধরনের প্রোটিন বা অ্যান্টিবডি তৈরি করে । পরবর্তীতে যদি সত্যিকার অর্থেই ওই নির্দিষ্ট শক্তিশালী ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া শরীরকে আক্রমণ করে, তখন আগে থেকে প্রস্তুত থাকা অ্যান্টিবডিগুলো অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ওই জীবাণুকে ধ্বংস করে ফেলে । প্রাকৃতিক সংক্রমণের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনের চেয়ে টিকার মাধ্যমে তা অর্জন করা অনেক বেশি নিরাপদ, কারণ এতে রোগের মারাত্মক জটিলতার ঝুঁকি থাকে না ।
অকালমৃত্যু এবং পঙ্গুত্ব থেকে রক্ষা
যেসব শিশুদের সঠিক সময়ে টিকা দেওয়া হয় না, তারা খুব সহজেই হাম, হুপিং কাশি, ডিপথেরিয়া বা নিউমোনিয়ার মতো মারাত্মক সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে পারে । এই রোগগুলো এতটাই ভয়াবহ যে, সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে শিশুর অকালমৃত্যু ঘটতে পারে । তাছাড়া পোলিওমাইলাইটিসের মতো রোগ শিশুদের স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে চিরস্থায়ী পঙ্গুত্ব বা বিকলাঙ্গতা সৃষ্টি করে । সঠিক সময়ে টিকা দিলে এই ধরনের শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর হাত থেকে শিশুকে নিরাপদে রাখা সম্ভব হয় ।
হার্ড ইমিউনিটি এবং সামাজিক সুরক্ষাবলয়
টিকাদানের অন্যতম বড় একটি সুবিধা হলো এটি ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা গোষ্ঠীগত প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে । যখন সমাজের অধিকাংশ মানুষকে (সাধারণত ৯০-৯৫%) কোনো নির্দিষ্ট রোগের টিকা দেওয়া হয়, তখন সেই রোগের জীবাণু সমাজ থেকে ক্রমশ বিলুপ্ত হতে থাকে । এর ফলে নবজাতক, চরম অসুস্থ শিশু বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাহীন ব্যক্তিরা—যারা চাইলেও টিকা নিতে পারে না—তারাও প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত থাকে ।
| টিকার প্রধান উপকারিতা | বৈজ্ঞানিক প্রভাব ও দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল |
|---|---|
| অ্যান্টিবডি ও মেমরি সেল তৈরি |
ক্ষতিকারক ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে ইমিউন মেমরি তৈরি করে আজীবন বা দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা দেয় । |
| সংক্রামক ব্যাধি ও মৃত্যুহার হ্রাস |
হাম, নিউমোনিয়া এবং ধনুষ্টংকারের মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি ৯৫% এর বেশি কমিয়ে দেয় । |
| পঙ্গুত্ব ও বিকলাঙ্গতা প্রতিরোধ |
পোলিওমাইলাইটিস ও রুবেলার মতো রোগ নির্মূল করে শারীরিক বিকলাঙ্গতা এবং জন্মগত ত্রুটি রোধ করে । |
| অর্থনৈতিক সাশ্রয় ও বিনিয়োগ |
টিকাদানে ১ ডলার বিনিয়োগ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে ভবিষ্যতে ২০-২৫ ডলার সমমূল্যের স্বাস্থ্য ব্যয় সাশ্রয় করে । |
বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) ও ঐতিহাসিক অর্জন
বাংলাদেশ সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই (EPI) একটি যুগান্তকারী এবং অত্যন্ত সফল জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ, যা দেশের শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাসে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছে । ১৯৭৯ সালের ৭ এপ্রিল মাত্র ২% কভারেজ নিয়ে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি আজ দেশের অন্যতম সফল স্বাস্থ্য কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে । বর্তমানে এই কর্মসূচির আওতায় দেশের সকল শিশুকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ১০টি মারাত্মক সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে টিকা প্রদান করা হয় । এই দীর্ঘ যাত্রায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেকগুলো স্বীকৃতি ও মাইলফলক অর্জন করেছে।
ইপিআই কর্মসূচির সূচনা ও ক্রমবিকাশ
স্বাধীনতার পর পর বাংলাদেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থা অত্যন্ত ভঙ্গুর ছিল। ১৯৭৯ সালে যখন প্রথম ইপিআই কার্যক্রম শুরু হয়, তখন প্রতি হাজার জীবিত জন্মে শিশুমৃত্যুর হার ছিল ২১১, যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি মারা যেত মাত্র ছয়টি সংক্রামক রোগে । ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ ‘গ্লোবাল ইউনিভার্সাল চাইল্ড ইমিউনাইজেশন’ (UCI) উদ্যোগে স্বাক্ষর করে এবং নিবিড় টিকাদান কার্যক্রম শুরু করে । এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ধাপে ধাপে হেপাটাইটিস বি (২০০৩), হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা বি বা হিব (২০০৯), রুবেলা (২০১২) এবং নিউমোকক্কাল নিউমোনিয়া (২০১৫) টিকা এই কর্মসূচিতে সংযুক্ত করা হয় ।
পোলিও এবং ধনুষ্টংকার নির্মূলের মাইলফলক
নিয়মিত টিকাদান এবং দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচারণার ফলে বাংলাদেশ ২০০৬ সালের পর থেকে পোলিওমুক্ত রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সার্টিফিকেশন কমিটি ২০১৪ সালের ২৭ মার্চ বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পোলিওমুক্ত’ রাষ্ট্র হিসেবে সনদ প্রদান করে । পাশাপাশি, গর্ভবতী মায়েদের এবং কিশোরীদের ধারাবাহিকভাবে টিটি (Tetanus Toxoid) টিকা প্রদানের মাধ্যমে ২০০৮ সালেই বাংলাদেশ সফলভাবে মাতৃ ও নবজাতক ধনুষ্টংকার (MNTE) নির্মূল করতে সক্ষম হয় ।
শিশুমৃত্যু হ্রাসে অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
ইপিআই কর্মসূচির কারণে বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার ৭৩% এরও বেশি হ্রাস পেয়েছে । একটি হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি প্রতি বছর প্রায় ৯৪,০০০ শিশুর জীবন বাঁচায় এবং প্রায় ৫০ লাখ শিশুকে মারাত্মক অসুস্থতার হাত থেকে রক্ষা করে । সরকার এবং দাতা সংস্থা গ্যাভি (Gavi)-এর যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত এই কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্বনির্ভরতার দিকে এগোচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ তার টিকাদান কর্মসূচির সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ।
| ঐতিহাসিক সাল | ইপিআই কর্মসূচির মাইলফলক ও অর্জন |
|---|---|
| ১৯৭৯ সাল |
বাংলাদেশে মাত্র ২% কভারেজ নিয়ে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে । |
| ১৯৮৫ সাল |
দেশব্যাপী নিবিড় টিকাদান কার্যক্রম (Universal Child Immunization) বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ । |
| ২০০৮ সাল |
প্রজননক্ষম নারী ও মায়েদের টিকাদানের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে মাতৃ ও নবজাতকের ধনুষ্টংকার সফলভাবে নির্মূল । |
| ২০১৪ সাল |
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কর্তৃক বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পোলিওমুক্ত দেশ’ হিসেবে স্বীকৃতি ও সনদ প্রদান । |
সরকারি ইপিআই টিকাদানের বিস্তারিত সময়সূচী (২০২৪-২০২৬ আপডেট)
বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (EPI) একটি শিশুকে ১৫ মাস বয়স পর্যন্ত অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সময়সূচী মেনে টিকা প্রদান করা হয় । শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার পর্যায়ক্রমিক বিকাশ এবং নির্দিষ্ট বয়সে রোগের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করেই এই সময়সূচী নির্ধারণ করা হয়েছে । কোনো ডোজ যেন বাদ না পড়ে, সেজন্য টিকাদান কার্ড বা রেজিস্ট্রি বইতে প্রতিটি টিকার রেকর্ড অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ করা হয় । নিচে বর্তমান ইপিআই সময়সূচীর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো।
জন্মের পর থেকে প্রথম ছয় মাসের টিকার তালিকা
একটি শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরপরই অথবা জন্মের পর প্রথম সুযোগেই তাকে যক্ষ্মা প্রতিরোধের জন্য এক ডোজ বিসিজি (BCG) টিকা এবং পোলিও রোগের বিরুদ্ধে ওপিভি (OPV) জিরো ডোজ দেওয়া হয় । এরপর শিশুর বয়স ৬ সপ্তাহ বা ৪২ দিন পূর্ণ হলে তাকে একসঙ্গে তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ টিকা দেওয়া হয়: পেন্টাভ্যালেন্ট-১, ওপিভি-১ এবং পিসিভি-১ । এই টিকাগুলোর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয় শিশুর ১০ সপ্তাহ বয়সে। এরপর ১৪ সপ্তাহ বয়সে তৃতীয় ডোজ পেন্টাভ্যালেন্ট, ওপিভি এবং পিসিভি দেওয়া হয় । এর পাশাপাশি ১৪ সপ্তাহ বয়সে শিশুর পেশিতে এক ডোজ ইনজেকটেবল পোলিও ভ্যাকসিন বা আইপিভি (IPV) প্রদান করা হয়, যা পোলিও ভাইরাসের বিরুদ্ধে আরও জোরালো সুরক্ষা নিশ্চিত করে ।
নয় মাস থেকে পনেরো মাস বয়সের টিকাদান
শিশুর বয়স ৯ মাস (বা ২৭০ দিন) পূর্ণ হলে তাকে হাম ও রুবেলা ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য এমআর (MR) ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ দেওয়া হয় । সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এই ৯ মাস বয়সেই শিশুদের জন্য টাইফয়েড জ্বর প্রতিরোধক টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন বা টিসিভি (TCV) এক ডোজ রুটিন টিকাদানে অন্তর্ভুক্ত করেছে । এরপর শিশুর বয়স ১৫ মাস পূর্ণ হলে তাকে হাম ও রুবেলার দ্বিতীয় ডোজ (MR-2) প্রদান করা হয়, যা এই অতি-সংক্রামক রোগগুলোর বিরুদ্ধে তার ইমিউন মেমরিকে চিরস্থায়ী করতে সাহায্য করে ।
কিশোরী ও প্রজননক্ষম মায়েদের জন্য নির্ধারিত টিকা
শিশুদের পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকার কিশোরী এবং প্রজননক্ষম নারীদের সুরক্ষায়ও বিশেষ টিকা প্রদান করে। পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে থাকা ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী সকল কিশোরীকে জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে এক ডোজ এইচপিভি (HPV) টিকা বিনামূল্যে প্রদান করা হচ্ছে । অন্যদিকে, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী সকল সন্তান ধারণক্ষম নারীকে ধনুষ্টংকার থেকে রক্ষা করার জন্য টিটি (Tetanus Toxoid) বা টিডি টিকার ৫টি ডোজ পর্যায়ক্রমে প্রদান করা হয় । এটি গর্ভাবস্থায় মা এবং জন্মের পর নবজাতককে ধনুষ্টংকারের মৃত্যুঝুঁকি থেকে রক্ষা করে ।
| শিশুর বয়সসীমা | সরকারি ইপিআই টিকার নাম ও মাত্রা | যেসব রোগ প্রতিরোধ করে |
|---|---|---|
| জন্মের পরপরই | বিসিজি (১ ডোজ), ওপিভি (জিরো ডোজ) |
মারাত্মক যক্ষ্মা ও পোলিও । |
| ৬, ১০ ও ১৪ সপ্তাহ | পেন্টাভ্যালেন্ট (১, ২, ৩), ওপিভি (১, ২, ৩), পিসিভি (১, ২, ৩), আইপিভি (শুধুমাত্র ১৪ সপ্তাহে) |
ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস বি, হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা বি, নিউমোনিয়া ও পোলিও । |
| ৯ মাস পূর্ণ হলে | এমআর-১ (MR-1), টিসিভি (TCV) (১ ডোজ) |
হাম, রুবেলা এবং পানিবাহিত টাইফয়েড জ্বর । |
| ১৫ মাস পূর্ণ হলে | এমআর-২ (MR-2) বা হামের ২য় ডোজ |
হাম ও রুবেলা ভাইরাসের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষা । |
দশটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ এবং টিকার সুনির্দিষ্ট ভূমিকা
বাংলাদেশ সরকারের ইপিআই কার্যক্রমে যে টিকাগুলো সরবরাহ করা হয়, সেগুলো মূলত দশটি অতি-মারাত্মক এবং জীবনঘাতী সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ করে । চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই রোগগুলো যেকোনো শিশুর জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। এই রোগগুলো কীভাবে শরীরে ক্ষতিসাধন করে এবং নির্দিষ্ট টিকা কীভাবে তার বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করে, তা বিস্তারিত জানলে শিশুর সুরক্ষায় টিকা কেন দেবেন কখন দেবেন, সে সম্পর্কে পিতামাতাদের সচেতনতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
যক্ষ্মা, পোলিও এবং ডিপথেরিয়া
যক্ষ্মা বা টিবি (Tuberculosis) একটি ব্যাকটেরিয়াঘটিত সংক্রামক রোগ। শিশুদের ক্ষেত্রে যক্ষ্মার জীবাণু শুধু ফুসফুসেই নয়, বরং মস্তিষ্কের আবরণী (মেনিঞ্জাইটিস) এবং হাড়ের জয়েন্টেও মারাত্মক সংক্রমণ ঘটাতে পারে । জন্মের পরপরই দেওয়া বিসিজি (BCG) টিকা শিশুকে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করে । পোলিওমাইলাইটিস এমন একটি ভাইরাস যা শিশুর স্নায়ুতন্ত্রে আক্রমণ করে হাত-পা থলথলে ও স্থায়ীভাবে অবশ করে দেয় । ওপিভি (OPV) এবং আইপিভি (IPV) টিকার মাধ্যমে পোলিও ভাইরাসকে শরীর থেকে সম্পূর্ণরূপে বিতাড়িত করা সম্ভব । অন্যদিকে, ডিপথেরিয়া রোগে শ্বাসনালীতে ধূসর রঙের একটি পুরু পর্দার সৃষ্টি হয়, যার ফলে শ্বাসরোধ হয়ে শিশুর মৃত্যু হতে পারে । পেন্টাভ্যালেন্ট টিকার মাধ্যমে এই রোগ সফলভাবে প্রতিরোধ করা যায় ।
হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকার ও হেপাটাইটিস বি
হুপিং কাশি (Pertussis) হলো তীব্র ও একটানা কাশির একটি রোগ, যাতে শিশু কাশতে কাশতে নীল হয়ে যায় এবং শ্বাস নিতে চরম কষ্ট অনুভব করে । ধনুষ্টংকার (Tetanus) এমন একটি রোগ যা শরীরের পেশিতে তীব্র খিঁচুনি তৈরি করে এবং অনেক সময় মেরুদণ্ড ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে যায় । হেপাটাইটিস বি (Hepatitis B) একটি নীরব ঘাতক ভাইরাস, যা লিভারে আক্রমণ করে। ছোটবেলায় এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে ৯০% ক্ষেত্রেই তা দীর্ঘস্থায়ী বা ক্রনিক হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যানসারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধির জন্ম দেয় । পেন্টাভ্যালেন্ট ইনজেকশনটি একসঙ্গে হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকার এবং হেপাটাইটিস বি-এর বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে ।
নিউমোনিয়া এবং হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা বি
নিউমোকক্কাল নিউমোনিয়া (Pneumonia) পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। এই ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে শিশুর ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তীব্র শ্বাসকষ্ট হয় এবং শ্বাস নেওয়ার সময় বুকের খাঁচা ভেতরের দিকে দেবে যায় । পিসিভি (PCV) টিকা এই মারাত্মক নিউমোনিয়া থেকে ফুসফুসকে সরাসরি রক্ষা করে । অন্যদিকে হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ বি (Hib) ব্যাকটেরিয়া শিশুদের মস্তিষ্কে প্রদাহ (মেনিনজাইটিস) এবং রক্তে মারাত্মক সংক্রমণ তৈরি করে । পেন্টাভ্যালেন্ট টিকার পঞ্চম উপাদানটি এই হিব ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে শিশুকে সুস্থ রাখে ।
হাম ও রুবেলা
হাম (Measles) একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ। হাম হলে শুধুমাত্র তীব্র জ্বর বা ফুসকুড়িই হয় না, বরং এর থেকে মারাত্মক নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) হতে পারে, যা শিশুর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায় । রুবেলা (Rubella) ভাইরাস শিশুদের জন্য খুব বেশি প্রাণঘাতী না হলেও, কোনো গর্ভবতী নারী গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে রুবেলায় আক্রান্ত হলে নবজাতক জন্মগত অন্ধত্ব, বধিরতা বা হার্টের ছিদ্র নিয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারে (যাকে কনজেনিটাল রুবেলা সিনড্রোম বা CRS বলা হয়) । ৯ এবং ১৫ মাস বয়সে এমআর (MR) টিকার দুটি ডোজ শিশুকে এই দুটি ভাইরাস থেকে আজীবন সুরক্ষা প্রদান করে ।
| রোগের নাম | রোগের ভয়াবহতা ও প্রধান লক্ষণসমূহ | প্রতিরোধকারী টিকা |
|---|---|---|
| যক্ষ্মা (Tuberculosis) |
দীর্ঘস্থায়ী কাশি, ওজন হ্রাস, মস্তিষ্কের পর্দায় প্রদাহ, হাড়ের ক্ষয় । |
বিসিজি (BCG) |
| পোলিওমাইলাইটিস |
হাত-পা অবশ হয়ে যাওয়া, চিরস্থায়ী বিকলাঙ্গতা, শ্বাসপেশি অবশ হওয়া । |
ওপিভি (OPV) ও আইপিভি (IPV) |
| ডিপথেরিয়া ও হুপিং কাশি |
শ্বাসনালীতে পর্দা জমে শ্বাসরোধ হওয়া, তীব্র ও একটানা শ্বাসকষ্টজনক কাশি । |
পেন্টাভ্যালেন্ট (Pentavalent) |
| হেপাটাইটিস বি (Hep B) |
জন্ডিস, লিভার সিরোসিস, লিভার ফেইলিওর এবং লিভার ক্যানসার । |
পেন্টাভ্যালেন্ট |
| হাম ও রুবেলা (Measles/Rubella) |
অতি-সংক্রামক জ্বর, গায়ে দানা, নিউমোনিয়া, জন্মগত অন্ধত্ব ও বধিরতা (CRS) । |
এমআর (MR) ভ্যাকসিন |
সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাব (২০২৫-২০২৬): সংকট ও শিক্ষণীয় বিষয়
দীর্ঘদিন ধরে টিকাদানে সফলতার উদাহরণ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ সম্প্রতি এক অভূতপূর্ব স্বাস্থ্য সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। দেশব্যাপী হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। শিশুর সুরক্ষায় টিকা কেন দেবেন কখন দেবেন, তা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ রাখলেই চলে না, বরং তা মাঠপর্যায়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে বাস্তবায়ন করতে হয়। টিকাদানের শৃঙ্খল সামান্য সময়ের জন্য ভেঙে পড়লেও তা কীভাবে চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, ২০২৫-২০২৬ সালের হামের প্রাদুর্ভাব তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
টিকাদানে ধস এবং স্বাস্থ্য খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা
২০২৪ সালের শেষভাগে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পটপরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্য খাতের অনেকগুলো দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম বা সেক্টর প্রোগ্রাম হঠাৎ করে স্থগিত হয়ে যায় । এর ফলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং দাতা সংস্থাগুলোর মধ্যে টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয় । এমআর (MR) টিকা দেশে এসে পৌঁছালেও লজিস্টিক সাপোর্ট—যেমন সিরিঞ্জ এবং দক্ষ জনবলের অভাবে—তা যথাসময়ে উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ের টিকাদান কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছায়নি । ফলস্বরূপ, ২০২৫ সালে হামের টিকার প্রথম ডোজের কভারেজ নেমে আসে ৫৬.৫%-এ এবং দ্বিতীয় ডোজের কভারেজ হয় ৫৭.১%, যা বিগত আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন । হার্ড ইমিউনিটি বজায় রাখার জন্য যেখানে ৯৫% কভারেজ প্রয়োজন, সেখানে এই বিশাল ঘাটতি হামের জীবাণুকে সমাজে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দেয় ।
হামের দেশব্যাপী বিস্তার ও শিশুমৃত্যুর পরিসংখ্যান
নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হওয়ার এবং পূর্বনির্ধারিত ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন স্থগিত থাকার চরম মূল্য চোকাতে হয়েছে দেশের শিশুদের । স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে যেখানে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ছিল মাত্র ৯ জন, সেখানে ২০২৬ সালের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৭৬ জনে, অর্থাৎ সংক্রমণ প্রায় ৭৫ গুণ বৃদ্ধি পায় । আক্রান্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশুমৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোতে শয্যাসংকট দেখা দেয় এবং অন্তত ৩৪ থেকে ৫০ জন শিশুর মৃত্যু হয় বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে । সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মৃত ও আক্রান্তদের মধ্যে একটি বড় অংশ ছিল ৯ মাসের কম বয়সী শিশু, যাদের বয়স টিকা নেওয়ার উপযোগী হয়নি, কিন্তু সমাজে বড়দের মধ্যে ইমিউনিটি গ্যাপ থাকায় তারা সহজেই সংক্রামিত হয়েছে ।
জরুরি পদক্ষেপ: টিকার বয়সসীমা হ্রাস ও ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন
হামের এই বিপর্যয়কর বিস্তার ঠেকাতে বাংলাদেশ সরকার এবং ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি গ্রুপ (NITAG) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়মিত সময়সূচীর বাইরে গিয়ে একটি জরুরি দুর্যোগকালীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে । সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, একটি বিশেষ দেশব্যাপী ক্যাম্পেইনের আওতায় প্রায় ২ কোটি শিশুকে হামের টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় এবং সংক্রমণ দ্রুত নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে হামের প্রথম ডোজ প্রদানের বয়সসীমা ৯ মাস থেকে কমিয়ে ৬ মাসে নামিয়ে আনা হয় । বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন যে, ৬ মাস বয়সে টিকা দিলে কার্যকারিতা কিছুটা কম হলেও, চলমান মহামারীর মতো পরিস্থিতিতে শিশুমৃত্যু ঠেকাতে এই ‘ক্যাচ-আপ’ ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য ছিল ।
| হাম প্রাদুর্ভাবের পরিসংখ্যান | ২০২৪-২০২৫ পূর্ববর্তী অবস্থা | ২০২৫-২০২৬ সংকটকালীন অবস্থা |
|---|---|---|
| এমআর টিকার কভারেজ রেট |
প্রায় ৯০% এর কাছাকাছি । |
প্রথম ডোজ ৫৬.৫%, দ্বিতীয় ডোজ ৫৭.১% । |
| আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা (জানু-মার্চ) |
প্রথম প্রান্তিকে প্রায় ৯ থেকে ৬৮ জন । |
প্রথম প্রান্তিকে ৬৭৬ জনেরও বেশি আক্রান্ত । |
| হাসপাতালে মৃত্যু ও জটিলতা |
নিয়ন্ত্রিত ও অত্যন্ত নগণ্য । |
অন্তত ৩৪ থেকে ৫০ জন শিশুর মৃত্যু, আইসিইউ সংকট । |
| টিকা প্রদানের বয়সসীমা |
৯ মাস ও ১৫ মাসে দুটি নিয়মিত ডোজ । |
জরুরি ক্যাম্পেইনে প্রথম ডোজের বয়সসীমা কমিয়ে ৬ মাস নির্ধারণ । |
নতুন টিকার সংযোজন: টাইফয়েড (TCV) এবং জরায়ুমুখ ক্যানসার (HPV)
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) সময়ের সাথে সাথে নিজেকে আধুনিক এবং যুগোপযোগী করে তুলছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতির সুফল হিসেবে বেশ কিছু নতুন ও অত্যন্ত কার্যকর টিকা এখন বাংলাদেশের শিশুদের জন্য সহজলভ্য হয়েছে। সম্প্রতি জনস্বাস্থ্যের দুটি বড় হুমকি—টাইফয়েড জ্বর এবং জরায়ুমুখ ক্যানসার—প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকার গ্যাভি (Gavi) এবং ইউনিসেফের সহায়তায় দেশব্যাপী দুটি বিশাল টিকাদান ক্যাম্পেইন সফলভাবে সম্পন্ন করেছে।
দেশব্যাপী টিসিভি (TCV) টিকাদান ক্যাম্পেইন ও সাফল্য
বাংলাদেশে টাইফয়েড একটি মারাত্মক পানিবাহিত রোগ। গ্লোবাল বার্ডেন অফ ডিজিজ-এর তথ্যমতে, ২০২১ সালে বাংলাদেশে টাইফয়েড জ্বরে প্রায় ৮,০০০ মানুষ মৃত্যুবরণ করে, যার ৬৮ শতাংশই ছিল শিশু । এই প্রকোপ থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে সরকার ২০২৫ সালের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে দেশব্যাপী টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন বা টিসিভি (TCV) ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে । ৯ মাস থেকে ১৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ৫ কোটি শিশুকে এই এক ডোজ টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় । শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কমিউনিটি পর্যায়ে পরিচালিত এই ক্যাম্পেইনে অভূতপূর্ব সাড়া মেলে এবং প্রায় ৪২.৪৭ মিলিয়ন (৯৭%) শিশুকে সাফল্যের সাথে টিকা প্রদান করা হয় । বর্তমানে এটি ৯ মাস বয়সী শিশুদের নিয়মিত ইপিআই সময়সূচীর একটি অংশ ।
কিশোরীদের জন্য এইচপিভি (HPV) টিকার প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশে নারীদের ক্যানসারজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে জরায়ুমুখ ক্যানসার বা সারভাইক্যাল ক্যানসার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে । হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV) সংক্রমণের কারণে এই ক্যানসার হয়ে থাকে। এই ঘাতক ব্যাধি থেকে নারীদের রক্ষা করতে সরকার ২০২৪ সালে দেশব্যাপী এইচপিভি টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করে । এই ক্যাম্পেইনের আওতায় পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত এবং স্কুলবহির্ভূত ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৬.২ মিলিয়ন কিশোরীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এক ডোজ এইচপিভি টিকা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয় । তথ্য অনুযায়ী, এই কার্যক্রমে ৯৩% কভারেজ অর্জিত হয় এবং প্রায় ৫.৬ মিলিয়ন কিশোরীকে সফলভাবে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ক্যানসারের হাত থেকে রক্ষা করার এক অনন্য দৃষ্টান্ত ।
| নতুন টিকার নাম ও ধরন | লক্ষ্যভুক্ত নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী | কভারেজ ও জাতীয় পর্যায়ের সাফল্য |
|---|---|---|
| টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন (TCV) |
৯ মাস থেকে ১৫ বছরের কম বয়সী সকল শিশু |
প্রায় ৪২.৪৭ মিলিয়ন শিশু টিকা পেয়েছে, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৯৭% । |
| হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV) |
১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী এবং স্কুলবহির্ভূত কিশোরী |
প্রায় ৫.৬ মিলিয়ন কিশোরী টিকা পেয়েছে, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৯৩% । |
শিশুর জন্য ঐচ্ছিক বা অতিরিক্ত টিকার তালিকা ও প্রয়োজনীয়তা
সরকারি ইপিআই কর্মসূচির বাইরেও আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিকা রয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে শিশুদের সুরক্ষায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। যদিও আর্থিক এবং লজিস্টিক কারণে সরকার এখনও এগুলোকে রুটিন কর্মসূচিতে বিনামূল্যে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেনি, তবে শিশুর সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সামর্থ্য অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে এই টিকাগুলো বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক থেকে কিনে দেওয়া উচিত । শিশুর সুরক্ষায় টিকা কেন দেবেন কখন দেবেন, তা অনুধাবন করে এই অতিরিক্ত টিকাগুলোর খোঁজ রাখাও আধুনিক প্যারেন্টিং বা সন্তান প্রতিপালনের অংশ।
রোটাভাইরাস এবং ডায়রিয়া প্রতিরোধ
শিশুদের ডায়রিয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো রোটাভাইরাস। এই ভাইরাসের আক্রমণে শিশুর শরীর থেকে দ্রুত প্রচুর পরিমাণে পানি ও লবণ বেরিয়ে যায়, যার ফলে তীব্র পানিশূন্যতা দেখা দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে । ৬ সপ্তাহ বা দেড় মাস বয়স থেকে রোটাভাইরাস টিকার কোর্স শুরু করা যায় । এটি সাধারণত মুখে খাওয়ানোর টিকা এবং এর মাধ্যমে শিশুর মারাত্মক ডায়রিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব ।
চিকেন পক্স বা জলবসন্তের টিকা
চিকেন পক্স বা ভ্যারিসেলা (Varicella) একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ, যা শিশুদের শরীরে তীব্র চুলকানি, ফুসকুড়ি এবং জ্বরের সৃষ্টি করে । সাধারণত স্কুলগামী শিশুদের মধ্যে এটি বেশি ছড়ায় এবং দীর্ঘ সময় স্কুলে অনুপস্থিত থাকার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শিশুর বয়স ১২ থেকে ১৮ মাস পূর্ণ হলে চিকেন পক্সের প্রথম ডোজ এবং পরবর্তীতে এর বুস্টার ডোজ দেওয়া যায় । এই টিকার মাধ্যমে জলবসন্তের মতো যন্ত্রণাদায়ক রোগ সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
হেপাটাইটিস এ এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা
হেপাটাইটিস এ (Hep A) একটি পানিবাহিত ভাইরাস, যা শিশুর লিভারকে সংক্রমিত করে এবং জন্ডিসের সৃষ্টি করে । ২.৫ থেকে ৪ বছরের শিশুদের মধ্যে অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার কারণে এই ভাইরাসের প্রকোপ বেশি দেখা যায় । শিশুর বয়স ১ বছর পূর্ণ হলে এই টিকার প্রথম ডোজ এবং ৬ মাস পর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া যায় । অন্যদিকে ইনফ্লুয়েঞ্জা বা সিজনাল ফ্লু টিকা শিশুদের সাধারণ সর্দি-জ্বর এবং মারাত্মক শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ থেকে দূরে রাখে। এটি শিশুর ৬ মাস বয়স থেকে প্রতি বছর আবহাওয়া পরিবর্তনের আগে দেওয়া বাঞ্ছনীয় ।
| ঐচ্ছিক টিকার নাম | প্রতিরোধযোগ্য ব্যাধি ও রোগের ধরন | টিকা প্রদানের উপযুক্ত বয়স |
|---|---|---|
| রোটাভাইরাস (Rotavirus) |
তীব্র ডায়রিয়া এবং মারাত্মক পানিশূন্যতা । |
৬ সপ্তাহ বয়স থেকে শুরু (মুখে খাওয়ানোর টিকা) । |
| ভ্যারিসেলা (Varicella) |
চিকেন পক্স বা তীব্র জলবসন্ত এবং চর্মরোগ । |
১২ থেকে ১৮ মাস বয়স থেকে শুরু । |
| হেপাটাইটিস এ (Hepatitis A) |
পানিবাহিত জন্ডিস এবং লিভারের মারাত্মক সংক্রমণ । |
১২ মাস বয়স পূর্ণ হলে প্রথম ডোজ । |
| সিজনাল ইনফ্লুয়েঞ্জা (Influenza) |
সিজনাল ফ্লু, সর্দি-কাশি, শ্বাসতন্ত্রের তীব্র সংক্রমণ । |
৬ মাস বয়স থেকে প্রতি বছর একটি করে ডোজ । |
অপরিপক্ব বা প্রিম্যাচিউর শিশুদের টিকাদান নির্দেশিকা
যেসব শিশু মাতৃগর্ভে স্বাভাবিক ৩৯-৪০ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই ভূমিষ্ঠ হয়, তাদের প্রিম্যাচিউর (Premature) বা অপরিপক্ব শিশু বলা হয়। এই শিশুদের শারীরিক ওজন কম থাকে এবং তাদের ইমিউন সিস্টেম পূর্ণাঙ্গ শিশুদের তুলনায় অনেক বেশি দুর্বল হয় । এ কারণে তারা সংক্রামক ব্যাধিতে খুব দ্রুত এবং মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হতে পারে। অনেক পিতা-মাতা মনে করেন, শিশু যেহেতু সময়ের আগে জন্মেছে বা রুগ্ন, তাই তাকে হয়তো দেরিতে টিকা দেওয়া উচিত। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
প্রিম্যাচিউর শিশুদের টিকার সময়কাল নির্ধারণ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং শিশু বিশেষজ্ঞদের কঠোর নির্দেশিকা হলো, প্রিম্যাচিউর শিশুদেরও পূর্ণাঙ্গ শিশুদের মতো তাদের ‘ক্রোনোলজিক্যাল বয়স’ (জন্মের দিন থেকে হিসাব করা প্রকৃত বয়স) অনুযায়ী সময়মতো টিকা দিতে হবে । এক্ষেত্রে শিশুর ‘কারেক্টেড বয়স’ (যদি মাতৃগর্ভে পূর্ণ সময় থাকত, তবে যে বয়স হতো) হিসাব করে টিকা পিছিয়ে দেওয়া যাবে না । অর্থাৎ, শিশু যত অপরিপক্বই হোক না কেন, জন্মের ৬ সপ্তাহ পর তাকে পেন্টাভ্যালেন্ট বা পিসিভি টিকার ডোজগুলো অন্যান্য সুস্থ শিশুর মতোই প্রদান করতে হবে । এর কারণ হলো, তাদের ইমিউন সিস্টেমকে খুব দ্রুত বাইরের জীবাণুর সাথে লড়তে শেখাতে হয়।
ওজনভিত্তিক সতর্কতা এবং বিশেষ যত্ন
যদিও রুটিন টিকাগুলো সময়মতো দিতে হয়, তবে কিছু নির্দিষ্ট টিকার ক্ষেত্রে শিশুর ওজনের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসকরা বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করে থাকেন। যেমন, জন্মের পরপরই দেওয়া হেপাটাইটিস বি টিকার ক্ষেত্রে যদি শিশুর ওজন ২,০০০ গ্রাম (২ কেজি)-এর কম হয়, তবে তা শিশুর ওজন ২ কেজি না হওয়া পর্যন্ত বা হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র না পাওয়া পর্যন্ত বিলম্বিত করা যেতে পারে (তবে যদি মায়ের শরীরে হেপাটাইটিস বি পজিটিভ থাকে, তবে যেকোনো ওজনেই জন্মের ১২ ঘণ্টার মধ্যে টিকা দিতে হবে) । এছাড়া, ২ কেজির কম ওজনের শিশুদের বিসিজি (BCG) টিকাও ওজন বৃদ্ধি পর্যন্ত স্থগিত রাখা হতে পারে । যেসব প্রিম্যাচিউর শিশু এনআইসিইউ (NICU)-তে ভর্তি থাকে, তাদের টিকা দেওয়ার পর ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত শ্বাস-প্রশ্বাসের মাত্রা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হয় ।
| প্রিম্যাচিউর শিশুদের টিকার শর্ত | বৈজ্ঞানিক নির্দেশিকা ও সতর্কতা |
|---|---|
| বয়সের হিসাব পদ্ধতি |
‘কারেক্টেড বয়স’ নয়, বরং জন্মের দিন থেকে হিসাব করা প্রকৃত বা ক্রোনোলজিক্যাল বয়স অনুযায়ী টিকা দিতে হবে । |
| সাধারণ রুটিন টিকাদান |
পেন্টাভ্যালেন্ট, পিসিভি, পোলিও ইত্যাদি টিকা সুস্থ ও পূর্ণাঙ্গ শিশুদের মতোই ৬, ১০ ও ১৪ সপ্তাহে দিতে হবে । |
| ওজনভিত্তিক বিধিনিষেধ (হেপাটাইটিস বি/বিসিজি) |
শিশুর জন্মকালীন ওজন ২,০০০ গ্রামের কম হলে কিছু টিকা সাময়িকভাবে বিলম্বিত করা যেতে পারে । |
| হাসপাতালে বিশেষ পর্যবেক্ষণ |
এনআইসিইউ-তে থাকা অবস্থায় প্রথম টিকা (বিশেষত ডিপিটি) দেওয়ার পর ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত হৃদস্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাস মনিটর করতে হয় । |
টিকা বাদ পড়লে বা ক্যাচ-আপ টিকাদান (Catch-up Vaccination)
বাস্তব জীবনে নানা পারিপার্শ্বিক কারণে—যেমন শিশুর অসুস্থতা, গ্রামে যাতায়াত, বন্যা বা মহামারীর মতো দুর্যোগের ফলে—শিশুর নির্ধারিত টিকার তারিখ পার হয়ে যেতে পারে। অনেক অভিভাবক ভাবেন, তারিখ পার হয়ে গেলে হয়তো আর ওই টিকাটি দেওয়া যাবে না। এটি একটি ভুল ধারণা। টিকার কোনো ডোজ বাদ পড়লে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, তবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে তা পূরণ করতে হবে । এই প্রক্রিয়াকেই চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ক্যাচ-আপ’ (Catch-up) টিকাদান বলা হয় ।
টিকার ডোজ মিস হওয়ার ঝুঁকি
নির্ধারিত সময়ে টিকার সম্পূর্ণ ডোজ গ্রহণ না করলে শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত মেমরি সেল বা অ্যান্টিবডি তৈরি হয় না । এর ফলে শিশুর ইমিউনিটি গ্যাপ তৈরি হয় এবং ওই নির্দিষ্ট ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি থেকে যায়। বিশেষ করে হাম বা রুবেলার মতো অতি-সংক্রামক ব্যাধিগুলো অসমাপ্ত টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের দ্রুত আক্রমণ করে, যা সম্প্রতি বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে । মনে রাখতে হবে, দেরি হলেও টিকা না নেওয়ার চেয়ে ক্যাচ-আপ সূচী মেনে টিকা নেওয়া শতগুণ বেশি নিরাপদ ও উত্তম ।
বিলম্বিত টিকার নিয়ম এবং ন্যূনতম বিরতি
যদি কোনো টিকা বাদ পড়ে, তবে যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করে তা সম্পূর্ণ করতে হবে । এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, পূর্বের নেওয়া ডোজগুলো কখনোই বাতিল হয়ে যায় না বা প্রথম থেকে নতুন করে শুরু করার প্রয়োজন হয় না । তবে, দুটি ডোজের মাঝখানে একটি ন্যূনতম বিরতি (যেমন ৪ সপ্তাহ) অবশ্যই বজায় রাখতে হবে । চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী একটি নতুন ‘ক্যাচ-আপ’ শিডিউল তৈরি করে বাকি টিকাগুলো ক্রমানুসারে সম্পন্ন করতে হয় ।
জিরো-ডোজ শিশু এবং আরবান-রুরাল বৈষম্য
ইউনিসেফ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে এখনও প্রায় ৭০,০০০ ‘জিরো-ডোজ’ শিশু রয়েছে, যারা জীবনের একটি টিকাও পায়নি, এবং প্রায় ৪ লাখ শিশু আংশিক টিকা পেয়েছে । গ্রাম এলাকার তুলনায় শহর বা বস্তি অঞ্চলে এই পিছিয়ে পড়ার হার বেশি (শহরে কভারেজ ৭৯% এবং গ্রামে ৮৫%) । এই পিছিয়ে পড়া শিশুদের দ্রুততম সময়ে খুঁজে বের করে ক্যাচ-আপ টিকাদানের আওতায় আনার জন্য সরকার বিভিন্ন বিশেষ স্বাস্থ্য ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে থাকে ।
ই-ট্র্যাকার (E-Tracker) ও ডিজিটাল মনিটরিং
টিকা বাদ পড়ার সমস্যা দূর করতে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ডিএইচআইএস-২ (DHIS-2) সার্ভারের মাধ্যমে ‘ইপিআই ই-ট্র্যাকার’ (EPI E-Tracker) সিস্টেম চালু করা হয়েছে । এই মোবাইল অ্যাপস ও ওয়েবভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে প্রতিটি শিশুর ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে তার টিকার সম্পূর্ণ ইতিহাস সংরক্ষণ করা হচ্ছে । এর ফলে শিশু দেশের যে প্রান্তেই যাক না কেন, স্বাস্থ্যকর্মীরা অনলাইনেই দেখতে পারবেন শিশুটির কোন টিকাটি বাদ পড়েছে এবং সাথে সাথে তাকে ক্যাচ-আপ টিকার আওতায় আনতে পারবেন ।
| ক্যাচ-আপ টিকাদানের রূপরেখা | বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা |
|---|---|
| বাদ পড়া টিকা শনাক্তকরণ |
টিকাদান কার্ড, স্বাস্থ্যকর্মীর রেজিস্ট্রি বই অথবা ই-ট্র্যাকারের মাধ্যমে মিস হওয়া ডোজ চিহ্নিত করা । |
| নতুন সময়সূচী ও ন্যূনতম বিরতি |
পূর্বের ডোজ বাতিল না করে, টিকার ধরন অনুযায়ী ডোজগুলোর মাঝে ন্যূনতম ৪ সপ্তাহের বিরতি বজায় রেখে নতুন শিডিউল করা । |
| জিরো-ডোজ শিশুদের টার্গেট করা |
শহর, বস্তি বা দুর্গম এলাকার পিছিয়ে পড়া শিশুদের খুঁজে বের করে বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকাদানের আওতায় আনা । |
| ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণ (E-Tracker) |
DHIS-2 বা VaxEPI ডাটাবেসে ডিজিটালভাবে শিশুর টিকার ইতিহাস এবং বাদ পড়া টিকার অ্যালার্ট সংরক্ষণ করা । |
টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, ভ্রান্ত ধারণা এবং ঘরোয়া ব্যবস্থাপনা
টিকা শরীরে প্রবেশ করার পর শিশুর নিজস্ব ইমিউন সিস্টেম তাকে বহিরাগত অ্যান্টিজেন হিসেবে শনাক্ত করে এবং তার বিরুদ্ধে কাজ শুরু করে । এই বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে শিশুর শরীরে কিছু সাময়িক শারীরিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অনেক পিতা-মাতা এই উপসর্গগুলো দেখে ভয় পেয়ে যান এবং পরবর্তী টিকাগুলো দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। শিশুর সুরক্ষায় টিকা কেন দেবেন কখন দেবেন—এই বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান থাকলে এসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াকে ভয় না পেয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে মোকাবিলা করা সহজ হয়।
টিকা পরবর্তী সাধারণ শারীরিক প্রতিক্রিয়া
টিকা দেওয়ার পর প্রথম ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শিশুর হালকা বা মাঝারি জ্বর (৩৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কিছু বেশি) আসতে পারে, যা অত্যন্ত স্বাভাবিক । ইনজেকশন দেওয়ার স্থানে ব্যথা হওয়া, সামান্য ফুলে যাওয়া বা জায়গাটি লালচে হয়ে যাওয়া খুব সাধারণ ঘটনা । অনেক সময় ওই স্থানে একটি ছোট শক্ত দলার মতো তৈরি হতে পারে, যা কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে । এছাড়া শিশু কিছুটা কান্নাকাটি করতে পারে, অস্থির বা খিটখিটে আচরণ করতে পারে এবং খাবার খাওয়ায় সাময়িক অনীহা দেখাতে পারে । হাম-রুবেলা (MR) টিকার ক্ষেত্রে ৬ থেকে ১১ দিন পর শরীরে ছোট ছোট ফুসকুড়ি বের হতে পারে, তবে এগুলো ছোঁয়াচে নয় ।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া উপশমে পিতামাতার করণীয়
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে কখনোই চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত কোনো অ্যান্টিবায়োটিক বা ব্যথানাশক মলম ব্যবহার করা উচিত নয় । ইনজেকশনের স্থানে কোনোভাবেই ঘষাঘষি করা, মালিশ করা বা গরম/ঠান্ডা সেঁক দেওয়া যাবে না । জ্বর বা ব্যথা উপশমে নির্দিষ্ট মাত্রার প্যারাসিটামল সিরাপ (চিকিৎসকের নির্দেশিত ডোজে) খাওয়ানো যেতে পারে । টিকা দেওয়ার আগে এবং পরে শিশুকে বারবার বুকের দুধ খাওয়ালে তা একটি শক্তিশালী প্রাকৃতিক ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে এবং শিশুকে দ্রুত স্বস্তি দেয় । এছাড়া শিশুর মনোযোগ অন্যদিকে সরাতে তাকে খেলনা দেওয়া বা আদর করে কাছে আগলে রাখলে শিশু অনেক শান্ত থাকে ।
মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (AEFI) এবং জরুরি অবস্থা
টিকা প্রদানের পর মারাত্মক কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া বা AEFI (Adverse Events Following Immunization) ঘটার সম্ভাবনা অত্যন্ত বিরল । তবে যদি দেখা যায় শিশুর মাত্রাতিরিক্ত জ্বর এসেছে, সে একটানা দীর্ঘক্ষণ উচ্চস্বরে কান্নাকাটি করছে, শরীর নীল হয়ে যাচ্ছে, খিঁচুনি হচ্ছে বা তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দিচ্ছে, তবে এক মুহূর্ত দেরি না করে অনতিবিলম্বে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে ।
টিকা নিয়ে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা ও বিজ্ঞানভিত্তিক সত্য
সমাজে টিকা নিয়ে বেশ কিছু অবৈজ্ঞানিক ও ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন টিকার কারণে শিশুদের ‘অটিজম’ (Autism) হতে পারে। কিন্তু বহু বছরের বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এটি অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, টিকার সাথে অটিজমের দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই । আরেকটি ভ্রান্ত ধারণা হলো, শিশু স্তন্যপান করলে তার আর টিকার প্রয়োজন নেই। যদিও মায়ের বুকের দুধ কিছু সংক্রমণ থেকে বাঁচায়, কিন্তু তা কখনোই টিকার পরিপূরক নয় এবং মারাত্মক সংক্রামক রোগ ঠেকাতে পারে না । সামান্য সর্দি-কাশি থাকলে টিকা দেওয়া যাবে না—এটিও একটি ভুল ধারণা। শিশুর সাধারণ সর্দি থাকলে টিকা দিতে কোনো বাধা নেই, তবে যদি উচ্চ মাত্রার জ্বর নিয়ে শিশু শয্যাশায়ী থাকে, তবে জ্বর না কমা পর্যন্ত টিকা স্থগিত রাখা উচিত ।
| পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ধরন | সম্ভাব্য সাধারণ লক্ষণসমূহ | ঘরোয়া প্রতিকার ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা |
|---|---|---|
| সাধারণ ও মৃদু উপসর্গ |
ইনজেকশনের স্থানে তীব্র ব্যথা, চামড়া লাল হওয়া, হালকা শক্ত ফোঁড়া তৈরি হওয়া । |
স্থানটিতে কোনো ঘষাঘষি বা মালিশ না করা, পরিষ্কার রাখা এবং শিশুকে আরামদায়ক পরিবেশে রাখা । |
| মাঝারি শারীরিক প্রতিক্রিয়া |
হালকা থেকে মাঝারি জ্বর, অস্থিরতা, ক্রমাগত কান্নাকাটি, খাবারে অনীহা । |
চিকিৎসকের নির্দিষ্ট করে দেওয়া মাত্রায় প্যারাসিটামল খাওয়ানো, ঘন ঘন বুকের দুধ পান করানো এবং মনোযোগ সরানো । |
| গুরুতর জরুরি অবস্থা (অত্যন্ত বিরল) |
একটানা তীব্র খিঁচুনি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন বা শ্বাসকষ্ট । |
কোনো ধরনের ঘরোয়া চিকিৎসা না করে দ্রুততম সময়ে শিশুকে হাসপাতালে স্থানান্তর করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া । |
| ভ্রান্ত ধারণা (Myths) |
টিকার কারণে অটিজম হয়, সর্দি থাকলে টিকা দেওয়া যায় না, বুকের দুধ খেলে টিকার দরকার নেই । |
টিকার সাথে অটিজমের কোনো সম্পর্ক নেই; সামান্য সর্দিতে টিকা নিরাপদ; বুকের দুধ টিকার বিকল্প নয় । |
শেষ কথা
বিশ্বব্যাপী শিশু স্বাস্থ্যের উন্নয়নে এবং শিশুমৃত্যুর হার হ্রাসে টিকাদান একটি প্রমাণিত, পরীক্ষিত এবং অপরিবর্তনীয় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। শিশুর সুরক্ষায় টিকা কেন দেবেন কখন দেবেন, এই প্রশ্নের গভীরে নিহিত রয়েছে একটি রোগমুক্ত, সুস্থ ও কর্মক্ষম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুদৃঢ় রূপরেখা। বাংলাদেশ অতীতে টিকাদানের মাধ্যমে পোলিও নির্মূল এবং ধনুষ্টংকার নিয়ন্ত্রণের মতো অসামান্য জনস্বাস্থ্য সাফল্য অর্জন করেছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে। তবে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসনিক জটিলতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের ঘাটতির কারণে হামের যে মারাত্মক প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে টিকাদান কোনো এককালীন অর্জন নয়; এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন, চলমান এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রক্রিয়া। সামান্যতম অবহেলা বা রুটিন কর্মসূচিতে ছেদ পড়লে জনস্বাস্থ্যে কী ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে, তা আমরা ইতিমধ্যেই প্রত্যক্ষ করেছি। তাই প্রতিটি পরিবারের উচিত কোনো ধরনের ভ্রান্ত ধারণায় বিভ্রান্ত না হয়ে সরকারি ইপিআই সময়সূচী অনুযায়ী শিশুদের সবকটি টিকার কোর্স যথাসময়ে সম্পন্ন করা। কোনো কারণে কোনো ডোজ বাদ পড়লে দ্রুত ক্যাচ-আপ শিডিউল অনুসরণ করতে হবে। পাশাপাশি, সরকারের উচিত নতুন টিকাগুলোর (যেমন TCV ও HPV) সফল প্রয়োগ অব্যাহত রাখা এবং টিকা সরবরাহ ব্যবস্থাকে শতভাগ নিরবচ্ছিন্ন রাখা। উপযুক্ত সময়ে সঠিক টিকা প্রদানের মাধ্যমেই কেবল শিশুদের প্রাণঘাতী সংক্রামক ব্যাধি থেকে সুরক্ষিত রাখা এবং একটি সুস্থ ও বিকলাঙ্গমুক্ত আগামী গড়া সম্ভব।

