ভ্রমণে কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানোর উপায়: দেশের ভেতরে ইকো-ফ্রেন্ডলি ট্যুর

সর্বাধিক আলোচিত

ছুটি পেলেই আমরা ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ি পাহাড়, সমুদ্র কিংবা গহীন জঙ্গলের টানে। বন্ধুদের সাথে হইচই, পরিবারের সাথে নিরিবিলি কিছুটা সময় কাটানো কিংবা নিজের সাথে নিজের বোঝাপড়া—সবকিছুর জন্যই ভ্রমণ আমাদের প্রথম পছন্দ। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, আমাদের এই আনন্দের ভ্রমণ প্রকৃতির ওপর কতটা চাপ ফেলছে? প্রতিবার বেড়াতে গিয়ে আমরা অজান্তেই বাতাসে ছেড়ে আসছি প্রচুর কার্বন ডাই-অক্সাইড, ফেলে আসছি প্লাস্টিকের স্তূপ আর ক্ষতি করছি স্থানীয় ইকোসিস্টেমের। আমরা জানি, বেঁচে থাকার জন্য বা মানসিক প্রশান্তির জন্য ভ্রমণ বন্ধ করার কোনো সুযোগ নেই।

তবে আমরা চাইলে ভ্রমণের ধরণে কিছুটা পরিবর্তন এনে প্রকৃতির ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারি। একটু সচেতন হলেই পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে ঘুরে বেড়ানো সম্ভব। আজ আমরা আলোচনা করব দেশের ভেতরে ভ্রমণের সময় কীভাবে আপনি একজন দায়িত্বশীল পর্যটক হয়ে উঠতে পারেন এবং জেনে নেব ভ্রমণে কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানোর উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত।

দেশীয় পর্যটনে পরিবেশের ওপর প্রভাব ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

Eco-Friendly Travel in bangladesh

বর্তমানে দেশের ভেতরে পর্যটকদের আনাগোনা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার কারণে কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, সুন্দরবন, সাজেক বা সিলেটের মতো পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে সারা বছরই উপচে পড়া ভিড় থাকে। কিন্তু এই অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ সামলাতে গিয়ে আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদগুলো দিন দিন হুমকির মুখে পড়ছে। হোটেল-রিসোর্ট বানাতে গিয়ে কাটা পড়ছে পাহাড় ও বন, আর পর্যটকদের ফেলে যাওয়া বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে নদী ও সমুদ্রের পানি। যদি এখনই আমরা সচেতন না হই এবং কার্বন নিঃসরণ বা দূষণ কমানোর দিকে নজর না দিই, তবে অদূর ভবিষ্যতে দেশের এই সুন্দর জায়গাগুলো তাদের স্বাভাবিক রূপ ও সৌন্দর্য হারাবে।

পর্যটন খাত কার্বন নিঃসরণ ও ক্ষতির ধরণ পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব বিকল্প বা ইতিবাচক পদক্ষেপ
যাতায়াত জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো ও ধোঁয়া বাতাসে গ্রিনহাউস গ্যাস বৃদ্ধি গণপরিবহন বা ট্রেনের ব্যবহার
আবাসন অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ও পানির অপচয় ভূগর্ভস্থ পানির সংকট ও শক্তি ক্ষয় ইকো-রিসোর্ট বা হোমস্টে নির্বাচন
খাবার ও কেনাকাটা প্যাকেটজাত খাবার ও প্লাস্টিক ব্যবহার মাটি ও জলাশয় দূষণ, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস স্থানীয় খাবার ও পণ্যের ব্যবহার

কেন আমরা অজান্তেই পরিবেশের ক্ষতি করছি?

ঘুরতে গিয়ে আমরা মূলত আরাম এবং দ্রুততাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিই। দ্রুত পৌঁছানোর জন্য আমরা গণপরিবহনের বদলে ব্যক্তিগত গাড়ি বা অভ্যন্তরীণ বিমান বেছে নিই, যা সবচেয়ে বেশি কার্বন পোড়ায়। এছাড়া ভ্রমণের সময় আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসে কিছুটা ঢিলেঢালা ভাব চলে আসে। যেমন—হোটেল রুমে অপ্রয়োজনে এসি বা বাতি চালিয়ে রাখা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে পানি অপচয় করা এবং হাতের কাছে পাওয়া ওয়ান-টাইম প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করা। এই ছোট ছোট অসচেতন কাজগুলো একত্র হয়ে পরিবেশের ওপর বিশাল নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোর বাস্তব চিত্র

একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, দেশের জনপ্রিয় পর্যটন স্পটগুলোর প্রাকৃতিক ভারসাম্য এখন চরম সংকটে। সেন্টমার্টিন দ্বীপে অতিরিক্ত পর্যটক এবং জেনারেটরের ধোঁয়ায় প্রবাল বা কোরাল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ের ঢাল কেটে অপরিকল্পিত রিসোর্ট বানানোর ফলে বর্ষাকালে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে। সুন্দরবনের ভেতরে উচ্চশব্দে স্পিডবোট বা লঞ্চ চালানোর ফলে বন্যপ্রাণীরা তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল ছেড়ে গহীন বনে পালিয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তব চিত্র আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, আমাদের ভ্রমণের ধরণে পরিবর্তন আনা এখন সময়ের দাবি।

যাতায়াত ব্যবস্থা নির্বাচনে ভ্রমণে কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানোর উপায়

ভ্রমণের সময় কার্বন ফুটপ্রিন্টের সবচেয়ে বড় অংশটি আসে আমাদের যাতায়াত বা পরিবহন ব্যবস্থা থেকে। গবেষণায় দেখা গেছে, একজন পর্যটকের মোট কার্বন নিঃসরণের প্রায় ৭০% ঘটে শুধু যাতায়াতের কারণে। দেশের ভেতরে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার সময় আমরা কোন মাধ্যমটি বেছে নিচ্ছি, তার ওপর নির্ভর করে প্রকৃতি কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একটু সময় নিয়ে পরিকল্পনা করলে এবং সঠিক বাহন নির্বাচন করলে যাতায়াত খাত থেকেই কার্বন নিঃসরণ অর্ধেকের বেশি কমিয়ে আনা সম্ভব। এটিই মূলত ভ্রমণে কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানোর উপায়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে কার্যকরী এবং প্রধান পদক্ষেপ।

যাতায়াতের মাধ্যম প্রতি কিলোমিটারে আনুমানিক কার্বন নিঃসরণ (জনপ্রতি) পরিবেশের ওপর প্রভাবের মাত্রা মন্তব্য ও পরামর্শ
অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট (বিমান) ২৫০ – ৩০০ গ্রাম অত্যন্ত বেশি খুব জরুরি না হলে এড়িয়ে চলুন
ব্যক্তিগত গাড়ি বা এসইউভি ১৭০ – ২০০ গ্রাম বেশি একাধিক মানুষ একসাথে ভ্রমণ করুন
দূরপাল্লার বাস (এসি/নন-এসি) ৬০ – ৮০ গ্রাম মাঝারি সাশ্রয়ী এবং পরিবেশের জন্য ভালো
আন্তঃনগর ট্রেন ৩৫ – ৫০ গ্রাম সবচেয়ে কম দেশের ভেতরে ভ্রমণের সেরা মাধ্যম

বিমান ও ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে ট্রেন বা বাসের ব্যবহার

ঢাকা থেকে কক্সবাজার বা সিলেট যাওয়ার জন্য অনেকে এখন সময় বাঁচাতে ৩০-৪০ মিনিটের ফ্লাইট বেছে নেন। কিন্তু স্বল্প দূরত্বের এই অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটগুলো সবচেয়ে বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে ছাড়ে। একই কথা প্রযোজ্য ২-৩ জনের জন্য একটি বড় এসইউভি বা ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে দূরপাল্লার পথে বেরিয়ে পড়ার ক্ষেত্রে। এর বদলে আপনি যদি বাংলাদেশ রেলওয়ের আন্তঃনগর ট্রেন বা দূরপাল্লার বাস বেছে নেন, তবে জনপ্রতি কার্বন নিঃসরণ কয়েক গুণ কমে যায়। ট্রেনে ভ্রমণ শুধু পরিবেশবান্ধবই নয়, বরং জানালার পাশ দিয়ে বাংলার রূপ দেখতে দেখতে যাওয়ার আনন্দও একদম আলাদা।

গন্তব্যে পৌঁছে হাঁটা ও সাইকেলিংয়ের অভ্যাস

মূল গন্তব্যে পৌঁছানোর পর আশপাশের স্পটগুলো ঘুরে দেখার জন্য আমরা প্রায়ই সিএনজি, মোটরবাইক বা ব্যক্তিগত গাড়ি ভাড়া করি। অথচ একটু কাছাকাছি দূরত্বের জায়গাগুলো হেঁটে ঘুরে দেখলে পরিবেশের কোনো ক্ষতিই হয় না, উল্টো স্বাস্থ্যের জন্য ভালো হয়। পাহাড়ের ট্রেইল বা সমুদ্র সৈকতের আশেপাশের এলাকা ঘুরে দেখার জন্য এখন অনেক জায়গায় ভাড়ায় সাইকেল পাওয়া যায়। এছাড়া স্থানীয় রিকশা বা ব্যাটারিচালিত ইকো-ভ্যান ব্যবহার করলেও জীবাশ্ম জ্বালানির পোড়ানো রোধ করা যায় এবং স্থানীয় চালকদের কর্মসংস্থানেও সাহায্য করা হয়।

লোকাল বোট ও নৌপথের সঠিক ব্যবহার

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল যেমন—বরিশাল, সুন্দরবন, টাঙ্গুয়ার হাওর বা কাপ্তাই লেকে ভ্রমণের মূল মাধ্যম হলো নৌপথ। এখানেও ডিজেলচালিত দ্রুতগতির ও উচ্চশব্দের স্পিডবোটের বদলে ইঞ্জিনবিহীন দেশীয় নৌকা, কায়াক (Kayak) কিংবা ধীরগতির পালতোলা নৌকা ব্যবহার করা সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব। হাওরে ঘুরতে গিয়ে হাউসবোট বা বজরা নৌকাগুলোতে থাকার সময় খেয়াল রাখুন যেন জেনারেটরের বদলে সোলার প্যানেলের বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়। এতে জলের জীববৈচিত্র্য শব্দের তীব্রতা থেকে রক্ষা পায় এবং পানির দূষণও কমে।

পরিবেশবান্ধব ও ইকো-ফ্রেন্ডলি থাকার জায়গা নির্বাচন

কোথায় থাকছেন এবং সেই থাকার জায়গাটি কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা আপনার ট্যুরের কার্বন হিসাব-নিকাশে বড় ভূমিকা রাখে। বড় বড় বিলাসবহুল হোটেলগুলোতে ২৪ ঘণ্টা জেনারেটর চালানো, সুইমিং পুলের পানি প্রতিদিন পরিবর্তন করা এবং অতিরিক্ত লন্ড্রি সার্ভিসের কারণে প্রচুর শক্তি ও পানির অপচয় হয়। আপনি যদি একজন সচেতন ভ্রমণকারী হতে চান, তবে থাকার জায়গা নির্বাচনের সময় তাদের পরিবেশগত নীতি বা সাসটেইনেবিলিটি প্র্যাকটিস সম্পর্কে জেনে নেওয়া উচিত। প্রকৃতির কাছাকাছি থেকে প্রকৃতির ক্ষতি না করে রাত কাটানোর মাঝেই রয়েছে আসল রোমাঞ্চ।

আবাসনের ধরণ শক্তি ও পানির ব্যবহার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মান স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান
পাঁচতারকা বা বিলাসবহুল হোটেল অত্যন্ত বেশি (অপচয় বেশি হয়) আধুনিক কিন্তু বর্জ্যের পরিমাণ বেশি মাঝারি (মুনাফার বড় অংশ বাইরে যায়)
ইকো-রিসোর্ট বা গ্রিন লজ কম (সৌরশক্তি ও রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং) পরিবেশবান্ধব ও জৈব সার তৈরি বেশি (স্থানীয় কর্মীদের নিয়োগ দেয়)
স্থানীয় হোমস্টে সবচেয়ে কম (স্বাভাবিক জীবনযাত্রা) প্রাকৃতিক ও কম বর্জ্য তৈরি হয় সরাসরি ১০০% স্থানীয় পরিবারের কাছে যায়

গ্রিন সার্টিফাইড বা স্থানীয় হোমস্টে বেছে নেওয়া

বর্তমানে দেশের শ্রীমঙ্গল, রাঙ্গামাটি বা বান্দরবানের মতো জায়গাগুলোতে অনেক চমৎকার ‘ইকো-রিসোর্ট‘ গড়ে উঠেছে। এরা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে এবং প্লাস্টিক একেবারেই ব্যবহার করে না। বুকিং দেওয়ার আগে জেনে নিন তারা পরিবেশ সুরক্ষায় কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর চেয়েও ভালো বিকল্প হলো পাহাড়ি বা গ্রাম্য এলাকার ‘হোমস্টে’ (Homestay)-তে থাকা। এতে আপনি স্থানীয় মানুষের ঘরের তৈরি খাবার খাওয়ার সুযোগ পাবেন, তাদের সংস্কৃতি কাছ থেকে দেখতে পাবেন এবং আপনার খরচ করা টাকার পুরোটা সরাসরি সেই পরিবারের উপার্জনে যোগ হবে।

রিসোর্ট বা হোটেলে শক্তি ও পানি সাশ্রয়ের কৌশল

আপনি যেখানেই থাকুন না কেন, নিজের অভ্যাসে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আনলেই শক্তির অপচয় রোধ করা যায়। রুমে না থাকার সময় বাতি, ফ্যান ও এসি বন্ধ রাখুন। এসির তাপমাত্রা ২২-২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখলে বিদ্যুৎ খরচ অনেকটাই কমে যায়। হোটেলে প্রতিদিন বিছানার চাদর ও তোয়ালে বদলানোর প্রয়োজন নেই; রিসেপশনে বলে দিন যে আপনি ২-৩ দিন একই তোয়ালে ব্যবহার করবেন। এছাড়া গোসলের সময় অপ্রয়োজনে কল ছেড়ে না রেখে কম সময়ে শাওয়ার শেষ করার চেষ্টা করুন।

প্লাস্টিক বর্জন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সচেতনতা

ভ্রমণে গিয়ে আমরা সবচেয়ে বড় যে অপরাধটি করি, তা হলো যত্রতত্র প্লাস্টিক আবর্জনা ফেলে আসা। পাহাড়ি ঝর্ণার জলে চিপসের প্যাকেট ভাসতে দেখা কিংবা সমুদ্র সৈকতে ডাবের ভেতর প্লাস্টিকের স্ট্র বা খড়কুটো পড়ে থাকা এখন নিত্যদিনের দৃশ্য। এই প্লাস্টিক বর্জ্যগুলো শত শত বছর ধরে মাটিতে বা পানিতে অবিকৃত অবস্থায় থেকে যায়। সামুদ্রিক কচ্ছপ, মাছ ও বন্যপ্রাণীরা এগুলোকে খাবার মনে করে খেয়ে মারা যায়। ভ্রমণকে পুরোপুরি অপূরণীয় ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে হলে প্লাস্টিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে আমাদের কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

প্লাস্টিক বর্জ্যের নাম পচে মাটিতে মিশে যাওয়ার সময় ক্ষতির ধরণ সহজ ও টেকসই বিকল্প
ওয়ান-টাইম প্লাস্টিক পানির বোতল ৪৫০ বছর জলাশয় দূষণ ও মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরি নিজের সাথে রিইউজেবল মেটাল বোতল রাখা
প্লাস্টিকের স্ট্র (খড়কে) ২০০ বছর সামুদ্রিক প্রাণীর গলায় বা পেটে আটকে যাওয়া বাঁশ, স্টিল বা কাগজের স্ট্র ব্যবহার
পলিথিন বা প্লাস্টিক শপিং ব্যাগ ৫০০ বছর বা তার বেশি ড্রেন বন্ধ হওয়া ও মাটির উর্বরতা নষ্ট কাপড়ের বা পাটের টোট ব্যাগ সাথে রাখা
চিপস ও মিনিপ্যাকের প্যাকেট প্রায় ১০০ বছর পাহাড় ও বনাঞ্চলের সৌন্দর্য ও মাটি নষ্ট বড় প্যাকেট কেনা বা স্থানীয় ফলমূল খাওয়া

ওয়ান-টাইম প্লাস্টিকের বিকল্প ব্যবহার

ভ্রমণে বের হওয়ার আগে নিজের ব্যাকপ্যাকে কয়েকটি অপরিহার্য জিনিস রেখে দিন। একটি ভালো মানের স্টেইনলেস স্টিল বা তামার পানির বোতল সাথে রাখুন। হোটেল বা রেস্তোরাঁ থেকে বের হওয়ার সময় বোতলটি ভরে নিন; এতে বারবার প্লাস্টিকের বোতল কেনার প্রয়োজন হবে না। কেনাকাটার জন্য একটি ছোট ভাঁজ করা যায় এমন কাপড়ের ব্যাগ সাথে রাখুন। পাহাড়ি রাস্তায় চা বা কফি খাওয়ার জন্য নিজের একটি ছোট রিইউজেবল মগ সাথে বহন করতে পারেন। এই ছোট্ট প্রস্তুতিগুলো আপনার ট্যুরের প্লাস্টিক বর্জ্য প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনবে।

নিজের বর্জ্য নিজের সাথে ফেরত আনা

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি চমৎকার ভ্রমণ দর্শন হলো ‘লিভ নো ট্রেস’ (Leave No Trace)—অর্থাৎ আপনার পায়ের ছাপ ছাড়া আর কিছুই প্রকৃতিতে ফেলে আসবেন না। দুর্গম পাহাড়, ঝর্ণা বা বনের ভেতর ঘুরতে গেলে সেখানে ডাস্টবিন নাও থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে চিপসের প্যাকেট, বিস্কুটের খোসা বা ক্যানের মতো আবর্জনাগুলো একটি আলাদা পলিথিনে করে নিজের ব্যাগে রেখে দিন। পরবর্তীতে শহরে বা হোটেলে ফিরে কোনো নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে সেগুলো ফেলে দিন। মনে রাখবেন, প্রকৃতি আমাদের ময়লা ফেলার জায়গা নয়।

Ways to Eco-Friendly Travel

স্থানীয় খাবার ও সংস্কৃতির সাথে সংযুক্ত হওয়া

খাবারের সাথেও কিন্তু কার্বন ফুটপ্রিন্টের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আপনি যখন ভ্রমণের সময় কোনো ইম্পোর্টেড বা অনেক দূর থেকে আনা প্যাকেটজাত খাবার খান, তখন সেই খাবারটি পরিবহন করে আনতে প্রচুর জ্বালানি খরচ হয়েছে এবং কার্বন নিঃসরণ হয়েছে। একে বলা হয় ‘ফুড মাইলস’ (Food Miles)। এর চেয়ে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত তাজা খাবার খেলে ফুড মাইলস কমে যায় এবং কার্বন নিঃসরণও হ্রাস পায়। পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সম্মান জানানোও একজন ভালো পর্যটকের অন্যতম প্রধান গুণ।

খাবারের ধরণ ফুড মাইলস ও কার্বন নিঃসরণ পুষ্টিগুণ ও স্বাদ অর্থনৈতিক প্রভাব
ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবার অত্যন্ত বেশি (প্যাকেজিং ও পরিবহনের কারণে) কম এবং শরীরে ক্লান্তি আনে বড় কর্পোরেট কোম্পানির পকেটে যায়
আমদানি করা ফল ও পানীয় বেশি (কোল্ড চেইন ও কার্গো বিমানের কারণে) কৃত্রিম প্রিজারভেটিভ থাকতে পারে দেশের টাকা বাইরে চলে যায়
স্থানীয় কৃষকের তাজা ফল ও খাবার একদম কম (জিরো ফুড মাইলস) টাটকা, পুষ্টিকর এবং আসল স্বাদ পাওয়া যায় স্থানীয় কৃষকেরা সরাসরি লাভবান হন

লোকাল ফুড বনাম ইম্পোর্টেড বা প্যাকেটজাত খাবার

কক্সবাজারে গিয়ে বার্গার বা পিৎজা না খেয়ে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী মেজবানি মাংস কিংবা তাজা সামুদ্রিক মাছের বারবিকিউ খাওয়ার চেষ্টা করুন। সিলেটে গেলে সেখানকার বিখ্যাত সাত রঙের চা এবং স্থানীয় হাওরের মাছ চেখে দেখুন। পাহাড়ে গেলে আদিবাসীদের বাঁশের ভেতর রান্না করা ‘বড়ং’ বা স্থানীয় জুম চাষের সবজি খেতে পারেন। স্থানীয় বাজার থেকে মৌসুমী ফল যেমন—পেয়ারা, আনারস, ডাব বা কলা কিনে খান। এতে শরীর চাঙ্গা থাকবে এবং আপনি কম কার্বন খরচ করে সেরা স্বাদের অভিজ্ঞতা পাবেন।

স্থানীয় উদ্যোক্তা ও কারুশিল্পীদের সহায়তা

কোনো জায়গা থেকে স্মৃতিচিহ্ন বা স্যুভেনির কেনার সময় চীনা প্লাস্টিকের খেলনা বা শো-পিস না কিনে স্থানীয় কারুশিল্পীদের তৈরি হস্তশিল্প কিনুন। রাঙ্গামাটির চাকমা বা মারমা নারীদের বোনা কোমর তাঁতের কাপড়, সিলেটের শীতল পাটি কিংবা মৃৎশিল্পীদের তৈরি মাটির জিনিসপত্র কিনতে পারেন। স্থানীয় ট্যুর গাইড বা মাঝিদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ করুন এবং সুযোগ থাকলে কিছুটা টিপস দিন। আপনার এই অর্থ স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে এবং এলাকার মানুষকে পরিবেশ রক্ষায় আরও উৎসাহিত করবে।

ভ্রমণের প্যাকিং ও প্রস্তুতিতে কার্বন নিঃসরণ কমানো

শুরুতেই যদি প্যাকিংটা গুছিয়ে করা যায়, তবে ভ্রমণের অনেক ঝামেলা যেমন কমে, তেমনি কার্বন ফুটপ্রিন্টও হ্রাস পায়। শুনলে হয়তো অবাক হবেন, আপনার লাগেজের ওজনের সাথেও কার্বন নিঃসরণের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে! বাস, ট্রেন বা বিমানে যত বেশি ওজন বহন করা হবে, সেই যানটি চালাতে তত বেশি জ্বালানি পোড়াতে হবে। তাই হালকা প্যাকিং বা ‘লাইট প্যাকিং’ শুধু নিজের কাঁধের আরামের জন্যই নয়, পরিবেশের সুরক্ষার জন্যও অত্যন্ত জরুরি।

প্যাকিংয়ের উপাদান ভারী প্যাকিংয়ের অসুবিধা হালকা ও স্মার্ট প্যাকিংয়ের সুবিধা ইকো-ফ্রেন্ডলি প্যাকিং টিপস
পোশাক ও জুতো বহনে কষ্ট, যাতায়াতে বেশি জ্বালানি খরচ সহজে বহনযোগ্য, দ্রুত চলনশীলতা বহুমুখী বা মাল্টি-পারপাস পোশাক নিন
টয়লেট্রিজ (সাবান/শ্যাম্পু) প্লাস্টিকের মিনি-প্যাক থেকে প্রচুর বর্জ্য হয় ব্যাগে জায়গা কম নেয় এবং সাশ্রয়ী রিফিলযোগ্য ছোট সিলিকন বোতল ব্যবহার করুন
গ্যাজেট ও ইলেকট্রনিক্স একাধিক চার্জার ও ভারী পাওয়ার ব্যাংকের ঝামেলা কম বিদ্যুতে বেশি সময় ব্যাকআপ সোলার পাওয়ার ব্যাংক সাথে রাখতে পারেন

হালকা লাগেজ বা লাইট প্যাকিংয়ের বিজ্ঞান

ভ্রমণে যাওয়ার সময় আমরা অনেকেই ‘হয়তো লাগতে পারে’ ভেবে অপ্রয়োজনীয় অনেক কাপড় ও জিনিসপত্র ব্যাগে ভরে ফেলি। এই অভ্যাস বদলে ফেলুন। এমন পোশাক বেছে নিন যা দ্রুত শুকায় এবং একাধিকবার পরা যায় (যেমন—কটনের বদলে লিনেন বা ড্রাই-ফিট কাপড়)। ভারী জিন্সের বদলে হালকা ট্রাউজার নিন। জুতোর ক্ষেত্রে এমন একটি স্নিকার্স বা স্যান্ডেল বেছে নিন যা হাঁটা, হাইকিং এবং সাধারণ ঘোরাঘুরি—সব কাজেই ব্যবহার করা যায়। লাগেজ হালকা হলে আপনার চলাফেরা যেমন সহজ হবে, তেমনি পরিবহনের কার্বন খরচও কমে আসবে।

পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও সোলার গ্যাজেটের ব্যবহার

পাহাড়ে বা ক্যাম্পিংয়ে যাওয়ার সময় অনেকেই ব্যাটারিচালিত টর্চ বা ওয়ান-টাইম ব্যাটারি ব্যবহার করেন, যা ব্যবহারের পর যেখানে-সেখানে ফেলে দেওয়া হয়। এর বদলে রিচার্জেবল বা সোলার পাওয়ার্ড টর্চ এবং লণ্ঠন ব্যবহার করুন। আজকাল বাজারে খুব ভালো মানের ছোট সোলার পাওয়ার ব্যাংক পাওয়া যায়, যা দিনের বেলায় রোদে রেখে চার্জ করে নেওয়া যায় এবং রাতে মোবাইল চার্জ দেওয়া যায়। এছাড়া টিস্যু পেপারের অতিরিক্ত ব্যবহারের বদলে সাথে দুই-তিনটি সুতি কাপড়ের রুমাল রাখুন, যা ধুয়ে বারবার ব্যবহার করা সম্ভব।

ইকো-ফ্রেন্ডলি টয়লেট্রিজ কিট তৈরি

ভ্রমণে আমরা যে শ্যাম্পু, সাবান বা বডি ওয়াশ ব্যবহার করি, তার রাসায়নিক ফেনা পাহাড়ি ঝর্ণা বা হাওরের পানিতে মিশে মাছ ও জলজ উদ্ভিদের মারাত্মক ক্ষতি করে। তাই প্যারাবেন ও সালফেট-মুক্ত ভেষজ সাবান (Herbal Soap) বা অর্গানিক শ্যাম্পু বার ব্যবহার করুন। লিকুইড শ্যাম্পুর বদলে ‘শ্যাম্পু বার’ (Shampoo Bar) ব্যবহার করলে প্লাস্টিক বোতলের ঝামেলা থাকে না এবং জায়গা বাঁচে। টুথব্রাশের ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের বদলে বাঁশের তৈরি টুথব্রাশ (Bamboo Toothbrush) বেছে নেওয়া একটি চমৎকার পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ।

প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে পর্যটকের দায়িত্ব

আমরা যখন কোনো বনাঞ্চল, পাহাড়ি ঝর্ণা বা সামুদ্রিক দ্বীপে যাই, তখন আমরা মূলত বন্যপ্রাণীদের ঘরে অতিথি হয়ে যাই। অতিথির যেমন গৃহকর্তার প্রতি সম্মান দেখাতে হয়, তেমনি প্রকৃতিতে গেলে আমাদেরও কিছু নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে। অতিরিক্ত শব্দ করা, বন্যপ্রাণীকে বিরক্ত করা বা তাদের খাবার দেওয়া—এই কাজগুলো ইকোসিস্টেমের মারাত্মক ক্ষতি করে। প্রকৃত পর্যটক তিনি, যিনি প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করেন কিন্তু তার কোনো ক্ষতি করেন না।

পর্যটকের ভুল আচরণ বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতির ওপর প্রভাব সঠিক ও দায়িত্বশীল আচরণ
বন্যপ্রাণীকে মানুষের খাবার দেওয়া প্রাণীদের হজমে সমস্যা ও প্রাকৃতিক শিকারের অভ্যাস নষ্ট প্রাণীদের নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে শুধু পর্যবেক্ষণ করা
বনে বা পাহাড়ে উচ্চশব্দে গান বাজানো পাখিদের বাসা ছাড়তে বাধ্য হওয়া ও প্রাণীদের আতঙ্ক প্রকৃতির নিজস্ব শব্দ (বাতাস, পাখির ডাক) উপভোগ করা
প্রবাল বা বন্য ফুল-গাছ ছিঁড়ে আনা প্রজনন ব্যাহত হওয়া ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট কোনো কিছু না ছুঁয়ে শুধু ছবি তুলে স্মৃতি ধরে রাখা

সংবেদনশীল ইকোসিস্টেমে করণীয় (যেমন: সেন্টমার্টিন বা সুন্দরবন)

সেন্টমার্টিন বা সুন্দরবনের মতো জায়গাগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল (Sensitive Ecosystem)। সেন্টমার্টিনে গিয়ে রাতের বেলায় সৈকতে বারবিকিউ পার্টি করা বা জোরালো আলো জ্বালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হওয়া উচিত, কারণ এতে সামুদ্রিক কচ্ছপ ডিম পাড়তে আসতে পারে না। সুন্দরবনে ভ্রমণের সময় লঞ্চের ডেকে দাঁড়িয়ে উচ্চশব্দে সাউন্ড বক্সে গান বাজাবেন না। বনের ভেতর ঢোকার সময় উজ্জ্বল রঙের (লাল, হলুদ) কাপড়ের বদলে প্রকৃতির সাথে মিশে যায় এমন রঙের (জলপাই সবুজ, বাদামি) পোশাক পরুন, যাতে বন্যপ্রাণীরা ভয় না পায়।

বন্যপ্রাণীকে বিরক্ত না করার নিয়ম

বান্দরবান বা লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে বানর বা হনুমান দেখলে অনেকেই তাদের চিপস, বিস্কুট বা বাদাম ছুঁড়ে দেন। এটি মারাত্মক অপরাধ। মানুষের খাবার খেয়ে এই প্রাণীরা অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং তাদের বন্য স্বভাব হারিয়ে মানুষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যায়, যা পরবর্তীতে সংঘাতের সৃষ্টি করে। এছাড়া ছবি তোলার জন্য পাখির বাসা বা প্রাণীর খুব কাছে চলে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন। ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালিয়ে কোনো বন্যপ্রাণীর ছবি তুলবেন না। মনে রাখবেন, তারা প্রদর্শনীর বস্তু নয়, তারা প্রকৃতির অংশ।

ভ্রমণ শেষে কার্বন অফসেট ও কমিউনিটি ভলান্টিয়ারিং

ভ্রমণ শেষ করে বাড়ি ফিরে আসার পরও একজন সচেতন পর্যটকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। আপনি যত সাবধানতাই অবলম্বন করুন না কেন, যাতায়াত ও থাকার কারণে কিছু কার্বন নিঃসরণ হবেই। এই অবশিষ্ট কার্বন ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চমৎকার কিছু উপায় রয়েছে। নিজের ভ্রমণের হিসাব মিলিয়ে পরিবেশের জন্য ইতিবাচক কিছু করার মাধ্যমে আপনার ট্যুরটি সম্পূর্ণভাবে ‘কার্বন নিউট্রাল’ করে তোলা সম্ভব।

কাজের ধরণ কীভাবে কাজ করে পরিবেশ ও সমাজে প্রভাব কীভাবে শুরু করবেন
বৃক্ষরোপণ (Tree Planting) বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নেয় দীর্ঘমেয়াদে কার্বন হ্রাস ও ছায়া প্রদান প্রতি ট্যুর শেষে অন্তত ১-২টি গাছ লাগান
পরিবেশবাদী তহবিলে অনুদান বনায়ন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় অর্থায়ন প্রাতিষ্ঠানিক ও বড় পরিসরে পরিবেশ রক্ষা স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সংস্থায় অনুদান দিন
বিচ ও ট্রেইল ক্লিনআপ পর্যটন স্পট থেকে প্লাস্টিক আবর্জনা অপসারণ জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও দূষণ রোধ ভ্রমণের সময় ১ ঘণ্টা সময় ক্লিনআপে দিন

ভ্রমণের কার্বন হিসাব ও গাছ লাগানো

অনলাইনে এখন অনেক ফ্রি ‘কার্বন ক্যালকুলেটর’ (Carbon Footprint Calculator) পাওয়া যায়। সেখানে আপনি কত কিলোমিটার ভ্রমণ করেছেন এবং কিসে যাতায়াত করেছেন তা ইনপুট দিলে আপনার মোট কার্বন খরচের হিসাব বেরিয়ে আসবে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক গাছ বছরে গড়ে প্রায় ২২ কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নিতে পারে। তাই আপনার ভ্রমণের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বাড়ি ফিরে বাড়ির আঙিনায়, ছাদে বা গ্রামে ফলজ ও বনজ গাছ রোপণ করুন। বন্ধুদের সাথে ট্যুরে গেলে সবাই মিলে একটি ছোট ‘ট্রি প্ল্যান্টেশন ড্রাইভ’ আয়োজন করতে পারেন।

ভ্রমণে ভলান্টিয়ারিং বা ইকো-ট্যুরিজম উদ্যোগে অংশ নেওয়া

ঘুরতে যাওয়ার সময় শুধু বিনোদনে সীমাবদ্ধ না থেকে স্থানীয় পরিবেশ রক্ষায় কিছুটা সময় দিন। একে বলা হয় ‘ভলান্টিয়ার ট্যুরিজম’ বা ‘ভলানট্যুরিজম’ (Voluntourism)। যেমন—কক্সবাজার বা সেন্টমার্টিনে গেলে সকালবেলা বন্ধুদের সাথে নিয়ে সৈকত থেকে প্লাস্টিকের বোতল ও চিপসের প্যাকেট কুড়ানোর (Beach Cleanup) উদ্যোগ নিতে পারেন। পাহাড়ি ট্রেইলে ট্রেকিং করার সময় পথে পড়ে থাকা আবর্জনা কুড়িয়ে এনে শহরে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে পারেন। আপনার এই ১ ঘণ্টার স্বেচ্ছাশ্রম স্থানীয় মানুষের মনেও সচেতনতা তৈরি করবে।

ঘুরে দেখার সময় কিছু সাধারণ সতর্কতা ও টিপস

  • গ্রুপ ট্যুরকে প্রাধান্য দিন: একা একা বা ২ জন আলাদা গাড়ি নিয়ে ঘোরার চেয়ে ৮-১০ জনের একটি গ্রুপ করে বড় গাড়িতে বা বাসে ভ্রমণ করলে মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণ অনেক কমে যায়।
  • ডিজিটাল টিকিট ব্যবহার করুন: বাস, ট্রেন বা হোটেলের বুকিংয়ের জন্য কাগজ প্রিন্ট না করে মোবাইলে ই-টিকিট বা পিডিএফ কপি প্রদর্শন করুন। এতে কাগজের অপচয় ও গাছ কাটা কমবে।
  • ক্যাম্পফায়ার বা আগুন জ্বালানোয় সতর্কতা: পাহাড়ে বা বনে ক্যাম্পিংয়ের সময় অপ্রয়োজনে বড় ক্যাম্পফায়ার করবেন না। কাঠ পোড়ালে কার্বন নিঃসরণ হয় এবং ছোট একটি স্ফুলিঙ্গ থেকে মারাত্মক দাবানল বা বনভূমি পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
  • স্থানীয় নিয়ম মেনে চলুন: প্রতিটি এলাকার নিজস্ব কিছু সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত নিয়ম থাকে। স্থানীয় গাইডদের পরামর্শ শুনুন এবং তাদের নির্দেশিকা মেনে চলুন।
  • স্লো ট্রাভেল অনুশীলন করুন: অল্প সময়ে ৪-৫টি স্পটে দৌড়াদৌড়ি না করে কোনো একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বেশি দিন থাকুন। এতে বারবার যাতায়াতের কার্বন খরচ কমে এবং জায়গাটিকে গভীরভাবে অনুভব করা যায়।

আপনার পরবর্তী পদক্ষেপ

ভ্রমণ আমাদের মনকে উদার করে এবং পৃথিবীকে নতুন করে চিনতে শেখায়। কিন্তু আমাদের আনন্দ যেন প্রকৃতির কান্নার কারণ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। দিনশেষে, ভ্রমণে কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানোর উপায়গুলো মেনে চলা খুব বেশি কঠিন কোনো কাজ নয়। শুধু প্রয়োজন আমাদের মানসিকতার সামান্য পরিবর্তন আর একটু সচেতনতা। ট্রেনের জানালা দিয়ে ভোরের আলো দেখা, পাহাড়ি ঝর্ণার পাশে বসে প্লাস্টিকের বোতল না ফেলে নিজের বোতলে জল ভরে নেওয়া, কিংবা কোনো গ্রাম্য হোমস্টেতে বসে স্থানীয় মানুষের হাসিমুখ দেখার আনন্দ কোনো পাঁচতারকা হোটেলের কৃত্রিম বিলাসে পাওয়া সম্ভব নয়।

আসুন, পরবর্তী ট্যুর থেকেই আমরা প্রত্যেকে একজন সচেতন ও দায়িত্বশীল পর্যটক হওয়ার প্রতিশ্রুতি নিই। আমরা যেন প্রকৃতির সৌন্দর্য শুধু নিজেরা উপভোগ করেই ক্ষান্ত না হই, বরং আগামী প্রজন্মের জন্যও একটি সুন্দর, সবুজ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ রেখে যেতে পারি। আপনার পরবর্তী ভ্রমণের পরিকল্পনা কেমন হচ্ছে? প্রকৃতির ক্ষতি না করে ঘুরে আসার এই যাত্রায় আপনি প্রস্তুত তো? হ্যাপি অ্যান্ড গ্রিন ট্রাভেলিং!

সাধারণ প্রশ্নের উত্তর

১. কার্বন অফসেটিং (Carbon Offsetting) কী এবং বাংলাদেশের ভ্রমণে এটি কীভাবে করা সম্ভব?

উত্তর: ভ্রমণের সময় যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড আপনি বাতাসে ছেড়েছেন, তা পুষিয়ে দেওয়ার জন্য পরিবেশ রক্ষামূলক কোনো কাজে অবদান রাখাকেই ‘কার্বন অফসেটিং’ বলে। বাংলাদেশে এটি করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো—প্রতিবার কোনো বড় ট্যুর শেষ করে আসার পর নিজের বাড়ির ছাদে, আঙিনায় বা কোনো ফাঁকা জায়গায় অন্তত ১টি বা ২টি গাছ লাগানো। এছাড়া দেশের নির্ভরযোগ্য কোনো বৃক্ষরোপণ সংস্থা বা পরিবেশবাদী সংগঠনের তহবিলে ছোট একটি অনুদান দিয়েও আপনি আপনার ভ্রমণের কার্বন পুষিয়ে নিতে পারেন।

২. ইকো-ফ্রেন্ডলি বা পরিবেশবান্ধব ভ্রমণ কি সাধারণ ভ্রমণের চেয়ে বেশি ব্যয়বহুল?

উত্তর: মোটেও না! বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি সাধারণ ভ্রমণের চেয়ে অনেক বেশি সাশ্রয়ী। আপনি যখন বিমানের বদলে ট্রেনে যাতায়াত করবেন, বিলাসবহুল হোটেলের বদলে স্থানীয় হোমস্টেতে থাকবেন এবং দামি রেস্তোরাঁর বদলে স্থানীয় কৃষকের তাজা খাবার খাবেন, তখন আপনার ভ্রমণ খরচ স্বাভাবিকভাবেই ২৫-৩০% কমে যাবে। ইকো-ট্যুরিজম মানেই বেশি টাকা খরচ নয়, বরং অপচয় কম করা।

৩. পাহাড়ি ট্রেইলে বা ট্রেকিংয়ের সময় টয়লেট বা মানব বর্জ্য কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা উচিত?

উত্তর: পাহাড়ি বা দুর্গম ট্রেইলে ট্রেকিংয়ের সময় পানির উৎস (ঝর্ণা বা নদী) এবং মূল হাঁটার পথ থেকে অন্তত ২০০ ফুট দূরে যেতে হবে। সেখানে একটি ছোট গর্ত (Cat Hole) খুঁড়ে কাজ সেরে মাটি ও পাতা দিয়ে তা ভালো করে ঢেকে দিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই পানির উৎসের কাছে বা খোলা জায়গায় বর্জ্য ত্যাগ করা যাবে না, কারণ এতে পাহাড়ি মানুষের খাওয়ার পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়।

৪. দেশের ভেতরে ভ্রমণের সময় কোন সিজনটি পরিবেশের জন্য সবচেয়ে কম ক্ষতিকর?

উত্তর: পর্যটনের ভাষায় যাকে ‘অফ-পিক সিজন’ (Off-peak Season) বা বর্ষা ও শরৎকাল বলা হয়, সেই সময়ে ভ্রমণ করা পরিবেশের জন্য ভালো। শীতকালে বা ঈদের ছুটিতে লাখ লাখ মানুষ একসাথে নির্দিষ্ট কিছু স্পটে ঝাঁপিয়ে পড়ে, যার ফলে সেখানকার ইকোসিস্টেম ভেঙে পড়ে। অফ-পিক সিজনে গেলে ভিড় কম থাকে, প্রকৃতির ওপর চাপ কম পড়ে এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও সারা বছর আয় করার সুযোগ পান।

৫. একটি ইকো-রিসোর্ট আসল কিনা তা চেনার সহজ উপায় কী?

উত্তর: সত্যিকারের ইকো-রিসোর্ট চিনতে তাদের প্রতিদিনের কাজের দিকে খেয়াল করুন। যদি দেখেন তারা প্লাস্টিক বোতলের বদলে কাচের বোতল বা ফিল্টারের পানি দিচ্ছে, গরম পানির জন্য সোলার হিটার ব্যবহার করছে, খাবারের উচ্ছিষ্ট দিয়ে জৈব সার তৈরি করছে এবং তাদের স্থাপনায় গাছপালা না কেটে কাঠ ও বাঁশের মতো প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে—তবে বুঝবেন সেটি সত্যিই পরিবেশবান্ধব।

৬. ভ্রমণের সময় এয়ার কন্ডিশনার (AC) ব্যবহার না করে কীভাবে ঘর ঠান্ডা রাখা যায়?

উত্তর: পাহাড়ি বা সবুজ এলাকায় রাতের বেলায় এসির প্রয়োজন হয় না। ঘরের জানালা খুলে রাখুন এবং ক্রস-ভেন্টিলেশন (Cross-ventilation) হতে দিন। দিনের বেলায় ঘরের পর্দা টেনে রাখুন যাতে সরাসরি রোদ না ঢোকে। সিলিং ফ্যানের পাশাপাশি সুতি বা লিনেনের মতো হালকা পোশাক পরলে সহজেই এসির ব্যবহার এড়িয়ে কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব।

 

সর্বশেষ