বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মহাযজ্ঞ, ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর উন্মাদনা এখন থেকেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এবারের আসরটি আগের যেকোনো আসরের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এবং ঐতিহাসিক হতে যাচ্ছে। প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো যৌথভাবে এই বিশাল টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪৮-এ উন্নীত করা হয়েছে। এই নতুন কাঠামোর কারণে টুর্নামেন্টে মোট ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে, যা প্রতিযোগিতার ধরন ও শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষাকে পুরোপুরি পাল্টে দিচ্ছে। এতগুলো দল, বিস্তৃত ভৌগোলিক অবস্থান এবং নতুন নিয়মের কারণে শিরোপার মূল দাবিদার কারা, সেই হিসাব-নিকাশও আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে।
খেলার মাঠে আবেগ আর অনিশ্চয়তা থাকলেও, আধুনিক ফুটবল অনেকটাই পরিসংখ্যান নির্ভর। তাই এবারের বিশ্বকাপের ফেভারিটদের তালিকা তৈরি করার জন্য আমরা বেশ কয়েকটি নির্ভরযোগ্য এবং বিজ্ঞানভিত্তিক উৎসের ওপর নির্ভর করেছি। প্রথমত, অপ্টা (Opta)-এর মতো সুপারকম্পিউটার এবং ডেটা-চালিত মডেলগুলোর বিশ্লেষণ নেওয়া হয়েছে, যা দলের আক্রমণ, রক্ষণ এবং পূর্ববর্তী পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বুকমেকার বা বেটিং বাজারগুলোর দেওয়া জয়ের সম্ভাবনার শতকরা হার বিবেচনা করা হয়েছে। সর্বশেষ, ফুটবল বিশেষজ্ঞদের ট্যাকটিকাল বিশ্লেষণ এবং দলগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি গভীরভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এই তিনটি বিষয়ের সমন্বয়ে আমরা ২০২৬ বিশ্বকাপের সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়নদের একটি অত্যন্ত পরিষ্কার এবং বাস্তবসম্মত চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার: কেন স্পেন সবার শীর্ষে?
ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ বা ইউরো ২০২৪ জয়ের পর থেকে স্পেন যেন নিজেদের অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। পরিসংখ্যান এবং ডেটা মডেলগুলোর মতে, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে তারাই শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার। বর্তমান ফর্ম এবং খেলোয়াড়দের অসাধারণ মান তাদের এই তালিকার একেবারে শীর্ষে তুলে এনেছে।
স্পেন বর্তমানে প্রায় ১৮.২ শতাংশ জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে ফেভারিটদের তালিকার এক নম্বরে অবস্থান করছে। পেদ্রি, গাভি, লামিন ইয়ামাল এবং নিকো উইলিয়ামসদের মতো তরুণ প্রতিভাদের সাথে রদ্রি এবং দানি কারভাহালদের মতো অভিজ্ঞদের এক দারুণ সমন্বয় ঘটেছে এই দলে। তাদের মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং পাসিং ফুটবলের গতি যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্য ভয়ের কারণ। তাছাড়া কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে দলটি প্রথাগত টিকি-টাকা থেকে বেরিয়ে এসে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক এবং সরাসরি বা ভার্টিকাল ফুটবল খেলছে।
যাদের জন্য সেরা: যারা নান্দনিক পাসিং, দ্রুতগতির উইং প্লে এবং বল নিয়ন্ত্রণের জাদুকরী ফুটবল দেখতে ভালোবাসেন।
কেন আমরা এটি বেছে নিয়েছি: ইউরো জয়ের বিশাল আত্মবিশ্বাস, বুকমেকারদের পরিসংখ্যানে শীর্ষ অবস্থান এবং তরুণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের নিখুঁত ট্যাকটিকাল ভারসাম্য।
যে বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে: বড় টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বে অতিরিক্ত চাপের মুখে তরুণ ডিফেন্ডারদের মানসিক দৃঢ়তা এবং অনেক সময় ফিনিশিংয়ে ধারাবাহিকতার অভাব।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের ফেভারিট: ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ড
স্পেনের ঠিক পরেই ইউরোপের আরও দুটি শক্তিশালী দল শিরোপার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছে। ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডের স্কোয়াড ডেপথ এবং সাম্প্রতিক টুর্নামেন্টগুলোর রেকর্ড তাদের টুর্নামেন্টের অন্যতম শীর্ষ ফেভারিট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ফ্রান্স: এমবাপ্পের জাদুতে আরও একবার?
ফ্রান্স মানেই যেন আন্তর্জাতিক ফুটবলের এক অসীম শক্তির আধার। প্রায় ১৪.৩ শতাংশ জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে তারা বুকমেকারদের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। দিদিয়ের দেশমের অধীনে দলটি গত দুটি বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলেছে, যার একটিতে তারা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো বিশ্বের অন্যতম সেরা এবং গতিশীল ফরোয়ার্ড তাদের আক্রমণের মূল অস্ত্র। পাশাপাশি অহেলিয়াঁ চুয়ামেনি, এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গা এবং উইলিয়াম সালিবাদের মতো তারকারা দলকে প্রতিটি বিভাগেই প্রায় অজেয় করে তুলেছে।
যাদের জন্য সেরা: যারা শারীরিক শক্তির পাশাপাশি দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাক এবং জমাট রক্ষণভাগ দেখতে পছন্দ করেন।
কেন আমরা এটি বেছে নিয়েছি: গত এক দশক ধরে বড় টুর্নামেন্টগুলোতে তাদের অসামান্য ধারাবাহিকতা এবং প্রায় প্রতিটি পজিশনে বিশ্বমানের বিকল্প খেলোয়াড়ের উপস্থিতি।
যে বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে: খেলোয়াড়দের মধ্যে মাঝে মাঝে মাঠের বাইরের বিতর্ক এবং মাঝমাঠের সৃজনশীলতায় অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে বল পজেশন ধরে রাখতে সমস্যা।
ইংল্যান্ড: এবার কি শিরোপার খরা ঘুচবে?
১৯৬৬ সালের পর থেকে বড় কোনো শিরোপা জিততে না পারার দীর্ঘ আক্ষেপ ঘোচাতে ইংল্যান্ড এবার মরিয়া হয়ে মাঠে নামবে। প্রায় ১৩.৩ শতাংশ জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে তারা অন্যতম বড় দাবিদার হিসেবে টুর্নামেন্ট শুরু করবে। টমাস টুখেলের মতো অভিজ্ঞ এবং ট্যাকটিকাল কোচের অধীনে দলটি নতুন রূপ পেয়েছে। হ্যারি কেন, জুড বেলিংহাম, ফিল ফোডেন এবং বুকায়ো সাকাদের মতো আক্রমণভাগের তারকারা যেকোনো দলের রক্ষণভাগ গুড়িয়ে দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন।
যাদের জন্য সেরা: যারা তারকায় ঠাসা শক্তিশালী স্কোয়াড এবং সরাসরি আক্রমণাত্মক ঘরানার ফুটবলের একনিষ্ঠ সমর্থক।
কেন আমরা এটি বেছে নিয়েছি: দলের অবিশ্বাস্য বেঞ্চের গভীরতা, দুর্দান্ত ফর্মে থাকা আক্রমণভাগ এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নকআউট পর্বে টানা খেলার অভিজ্ঞতা।
যে বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে: গণমাধ্যম ও সমর্থকদের প্রত্যাশার বিশাল মানসিক চাপ এবং নকআউট পর্বের একদম শেষ ধাপে গিয়ে স্নায়ুচাপে ভোগার পুরনো অভ্যাস।
ল্যাটিন আমেরিকার দুই পরাশক্তি: আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল
ইউরোপিয়ান দলগুলোর আধিপত্যের মাঝে ল্যাটিন আমেরিকার এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী সব সময়ই বিশ্বকাপের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং আবেগের জায়গা থেকে তারা সব সময়ই ফেভারিটদের তালিকায় ওপরের দিকে থাকে।
আর্জেন্টিনা: শিরোপা ধরে রাখার মিশন
বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা তাদের মুকুট ধরে রাখার কঠিন লক্ষ্যে ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পা রাখবে। সুপারকম্পিউটার এবং ডেটা মডেলগুলো তাদের প্রায় ১০.৫ শতাংশ জয়ের সম্ভাবনা দিচ্ছে। লিওনেল মেসির সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ হওয়ায় পুরো দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে আলাদা একটি প্রেরণা এবং আবেগ কাজ করবে। এমিলিয়ানো মার্টিনেজ, এনজো ফার্নান্দেজ এবং অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারদের নিয়ে গড়া এই দলটির মাঠের ভেতরের দলগত বোঝাপড়া চমৎকার। কাতার বিশ্বকাপে এবং কোপা আমেরিকায় তারা বারবার প্রমাণ করেছে যে, তারা যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে জানে।
যাদের জন্য সেরা: যারা আবেগপূর্ণ ফুটবল, দৃঢ় দলগত একতা এবং লিওনেল মেসির শেষ জাদুকরী মুহূর্তগুলোর সাক্ষী হতে চান।
কেন আমরা এটি বেছে নিয়েছি: বর্তমান চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিশাল আত্মবিশ্বাস এবং কোচ লিওনেল স্কালোনির অধীনে দলের ট্যাকটিকাল ধারাবাহিকতা।
যে বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে: অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার মতো অভিজ্ঞদের বিদায়, বেশ কয়েকজন মূল খেলোয়াড়ের বয়স বেড়ে যাওয়া এবং ট্রানজিশন পিরিয়ডের চ্যালেঞ্জ।
ব্রাজিল: ষষ্ঠ শিরোপার খোঁজে
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল সব সময়ই শিরোপার অন্যতম বড় দাবিদার হিসেবে গণ্য হয়। তাদের জয়ের সম্ভাবনাও প্রায় ১০.৫ শতাংশের কাছাকাছি ধরা হচ্ছে। ভিনিসিয়াস জুনিয়র, রদ্রিগো এবং রাফিনহাদের মতো ফরোয়ার্ডরা ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলে অবিশ্বাস্য দাপট দেখাচ্ছেন। তবে দলটি বর্তমানে কোচ দরিভাল জুনিয়রের অধীনে একটি ট্যাকটিকাল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং বাছাইপর্বে খুব একটা ছন্দে ছিল না। তবুও, ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের সহজাত প্রতিভা এবং ব্যক্তিগত জাদুকরী সামর্থ্য তাদের যেকোনো মুহূর্তে ভয়ঙ্কর করে তুলতে পারে।
যাদের জন্য সেরা: যারা ঐতিহ্যবাহী সুন্দর ফুটবল, সৃষ্টিশীল ড্রিবলিং এবং উইং নির্ভর আক্রমণ দেখতে ভালোবাসেন।
কেন আমরা এটি বেছে নিয়েছি: আক্রমণভাগে বিশ্বমানের তরুণ প্রতিভার ছড়াছড়ি এবং ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে তাদের সফলতম চ্যাম্পিয়ন হওয়ার রেকর্ড।
যে বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে: মাঝমাঠে আগের মতো খেলা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা, রক্ষণভাগের ধারাবাহিকতার চরম অভাব এবং দলগত বোঝাপড়ার সংকট।
অন্যান্য শক্তিশালী দল এবং সম্ভাব্য ডার্ক হর্স
শীর্ষ ফেভারিটদের বাইরেও বেশ কয়েকটি শক্তিশালী দল রয়েছে, যারা নিজেদের দিনে যেকোনো হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিতে পারে। এই দলগুলো হয়তো সবার আগে আলোচনায় আসে না, কিন্তু তাদের সামর্থ্য নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ নেই।
ইউরোপ এবং অন্যান্য অঞ্চলের বেশ কয়েকটি শক্তিশালী দলের বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনার তুলনামূলক পরিসংখ্যান নিচে দেওয়া হলো। এই ডেটাগুলো মূলত বুকমেকারদের ইমপ্লাইড প্রোবাবিলিটির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।
| দলের নাম | মূল শক্তির জায়গা | জয়ের আনুমানিক সম্ভাবনা |
| পর্তুগাল | প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের বিশাল স্কোয়াড ডেপথ এবং অভিজ্ঞতার মিশ্রণ | ৭.৭% |
| জার্মানি | সুশৃঙ্খল রক্ষণভাগ এবং তরুণ প্লেমেকারদের সৃষ্টিশীলতা | ৬.৭% |
| নেদারল্যান্ডস | শক্তিশালি সেন্টার-ব্যাক জুটি এবং দ্রুতগতির উইং আক্রমণ | ৪.৩% |
| ক্রোয়েশিয়া | অদম্য মানসিকতা এবং মাঝমাঠের দুর্দান্ত নিয়ন্ত্রণ | ১.০% |
এই দলগুলোর প্রত্যেকটিরই নিজস্ব ট্যাকটিকাল দর্শন রয়েছে। জার্মানি বর্তমানে কোচ হুলিয়ান নাগলসম্যানের অধীনে নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের নিয়ে দুর্দান্ত খেলছে। জামাল মুসিয়ালা এবং ফ্লোরিয়ান রির্টজদের মতো তরুণরা তাদের আক্রমণভাগে সম্পূর্ণ নতুন এক গতি এনেছে। অন্যদিকে, পর্তুগালের স্কোয়াড যেকোনো শীর্ষ দলের সাথে পাল্লা দেওয়ার মতো শক্তিশালী। রবার্তো মার্টিনেজের অধীনে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সম্ভাব্য শেষ টুর্নামেন্ট হিসেবে রাফায়েল লেয়াও এবং ব্রুনো ফার্নান্দেজরা নিজেদের সেরাটা দিতে চাইবেন। নেদারল্যান্ডসের রক্ষণভাগ ভার্জিল ফন ডাইকদের মতো খেলোয়াড়দের উপস্থিতিতে টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সম্ভাব্য চমক জাগানো দল
বিশ্বকাপের অন্যতম বড় সৌন্দর্য হলো আন্ডারডগ বা ছোট দলগুলোর চমক দেখানো। ২০২৬ সালেও এর কোনো ব্যতিক্রম হবে না। উরুগুয়ে কোচ মার্সেলো বিয়েলসার অধীনে দুর্দান্ত হাই-প্রেসিং এবং আগ্রাসী ফুটবল খেলছে, যা বড় দলগুলোকে বিপদে ফেলতে পারে। এছাড়া কলম্বিয়ার সাম্প্রতিক অপরাজিত যাত্রা এবং সেনেগালের মতো আফ্রিকান দলগুলোর অদম্য শারীরিক শক্তি ও গতি তাদের সম্ভাব্য কোয়ার্টার ফাইনালিস্ট হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনোর অধীনে ঘরের মাঠে বাড়তি সুবিধা পাবে। এই দলগুলো হয়তো শিরোপা জিতবে না, তবে ফেভারিটদের স্বপ্ন ভেঙে দিতে তাদের জুড়ি নেই।
গত বিশ্বকাপ ও ২০২৬-এর প্রেডিকশনের পার্থক্য
কাতার বিশ্বকাপ ২০২২ এবং আসন্ন ২০২৬ বিশ্বকাপের দলগুলোর শক্তিমত্তার মূল্যায়নে বেশ কিছু লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সুপারকম্পিউটার এবং প্রেডিকশন মডেলগুলো এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ব্রাজিল এবং ফ্রান্সকে সবচেয়ে বড় ফেভারিট হিসেবে ধরা হয়েছিল এবং ল্যাটিন আমেরিকার দলগুলোর প্রতি কিছুটা বাড়তি প্রত্যাশা ছিল।
কিন্তু ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে ইউরোপিয়ান দলগুলো, বিশেষ করে স্পেন এবং ইংল্যান্ড, ডেটা মডেলগুলোতে অনেক বেশি শক্তিশালী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর মূল কারণ হলো তাদের স্কোয়াড ডেপথ বা বেঞ্চের গভীরতা। ৪৮ দলের এই দীর্ঘ টুর্নামেন্টে ফাইনালে পৌঁছাতে এবং চ্যাম্পিয়ন হতে হলে একটি দলকে আগের চেয়ে বেশি, অর্থাৎ মোট ৮টি ম্যাচ খেলতে হবে। ইউরোপিয়ান দলগুলোর বেঞ্চ অনেক বেশি মানসম্মত, যা এই দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর টুর্নামেন্টে তাদের বিশাল ট্যাকটিকাল সুবিধা দেবে। তাছাড়া, এবারের বিশ্বকাপ হবে উত্তর আমেরিকার গ্রীষ্মকালে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন টাইম জোন এবং দূরপাল্লার ভ্রমণের কারণে খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতা একটি বড় পরীক্ষা দিতে হবে, যেখানে বড় স্কোয়াডগুলো সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে।
টুর্নামেন্টের গতিপথ বদলে দিতে পারে যেসব বিষয়
ডেটা, পরিসংখ্যান এবং সম্ভাবনার শতকরা হার যাই বলুক না কেন, মাঠের ফুটবল সব সময়ই চরম মাত্রায় অনিশ্চিত। টুর্নামেন্টের মাঝে এমন অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে যা ফেভারিটদের সব হিসাব-নিকাশ মুহূর্তের মধ্যে পুরোপুরি উল্টে দিতে পারে।
এবারের বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ছোট দলগুলোর চমক বা আপসেট টুর্নামেন্টের সামগ্রিক চিত্র বদলে দিতে পারে। ৪৮ দলের টুর্নামেন্ট হওয়ায় এবার নকআউট পর্বে ৩২টি দল খেলবে, যার মানে হলো রাউন্ড অব ৩২ নামে একটি অতিরিক্ত নকআউট ধাপ পার হতে হবে। এই বাড়তি ম্যাচটি খেলোয়াড়দের ক্লান্তি এবং ইনজুরির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। কোনো শীর্ষ দলের মূল খেলোয়াড় বা তারকা ফরোয়ার্ড ইনজুরিতে পড়লে, অথবা লাল কার্ডের কারণে নিষিদ্ধ হলে, দলের পারফরম্যান্সে তার বিশাল নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এছাড়া নকআউট পর্বের প্রচণ্ড মানসিক চাপ অনেক সময় শীর্ষ ফেভারিট দলগুলোকে ভেঙে পড়তে বাধ্য করে। ট্যাকটিকাল চমক বা প্রতিপক্ষের অপ্রত্যাশিত হাই-প্রেসিং ফর্ম্যাশনের কারণে অনেক সময় শক্তিশালী দলগুলোও টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায়। আবহাওয়ার পরিবর্তন, এক শহর থেকে অন্য শহরে দীর্ঘ বিমান ভ্রমণের ক্লান্তি এবং ভিএআর (VAR) বা রেফারিংয়ের ছোটখাটো সিদ্ধান্তও অনেক সময় বড় ম্যাচগুলোর ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।
চূড়ান্ত পরিসংখ্যান: শেষ হাসি হাসবে কে?
সব ট্যাকটিকাল বিশ্লেষণ, প্রেডিকশন মডেল এবং বর্তমান ফর্ম একত্রিত করলে ২০২৬ বিশ্বকাপের শিরোপার লড়াইয়ের একটি মোটামুটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যায়। তবে ফুটবলের আসল সৌন্দর্যই লুকিয়ে আছে তার রোমাঞ্চকর অনিশ্চয়তার মাঝে।
তথ্য-উপাত্ত এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী, স্পেন, ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ড এই মুহূর্তে শিরোপা জয়ের সবচেয়ে বড় দাবিদার। তাদের কৌশলগত পরিপক্কতা, তরুণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের মান এবং বেঞ্চের অসাধারণ গভীরতা তাদের বাকিদের চেয়ে অন্তত এক ধাপ এগিয়ে রেখেছে। তবে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে কোনোভাবেই হিসাবের বাইরে রাখা যাবে না। ল্যাটিন আমেরিকার এই দুই পরাশক্তি তাদের সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত প্রতিভার জোরে যেকোনো মুহূর্তে টুর্নামেন্টের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
ফুটবল কখনোই শুধু সুপারকম্পিউটারের পরিসংখ্যান কিংবা বুকমেকারদের ডেটা দিয়ে খেলা হয় না। মাঠের ৯০ মিনিটের আবেগ, দলের ঐকবদ্ধতা এবং সামান্য একটু ভাগ্যের ছোঁয়া অনেক সময় ডেটা মডেলের সব নিখুঁত হিসাব ভুল প্রমাণ করে দেয়। তবে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ফুটবল ভক্তরা এটুকু নিশ্চিত থাকতে পারেন যে, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর মাটিতে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে জমজমাট, বিস্তৃত এবং তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি আসর হতে যাচ্ছে। শিরোপা যে দলের হাতেই উঠুক না কেন, চূড়ান্ত জয় হবে এই সুন্দর খেলাটিরই।


