নতুন বছরের শুরুতেই বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের ২ তারিখে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (BAJUS) কর্তৃক নির্ধারিত নতুন দাম কার্যকর রয়েছে। যারা বিয়ে, জন্মদিন বা বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানের জন্য গহনা তৈরির পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য আজকের এই বাজার দর জানা অত্যন্ত জরুরি।
সোনার দাম কেবল একটি সংখ্যা নয়; এর সাথে জড়িয়ে থাকে মজুরি, ভ্যাট এবং সোনার মানের বিষয়গুলো। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা ‘বাংলাদেশে আজকের সোনা ও রুপার দাম’ নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করব, যেখানে থাকবে ভরি, গ্রাম ও আনা ভিত্তিক দামের হিসাব, এবং সোনা কেনার সময় ঠকে না যাওয়ার গোপন টিপস।
১. আজকের সোনার দামের বিস্তারিত তালিকা (২/০১/২০২৬)
বাজুসের সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী, স্থানীয় বাজারে তেজাবী স্বর্ণের দাম কমার কারণে সোনার দামে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। নিচে ক্যারেট ভেদে প্রতি ভরি, প্রতি গ্রাম এবং প্রতি আনার বিস্তারিত মূল্য তালিকা দেওয়া হলো। এটি আপনাকে আপনার বাজেট অনুযায়ী সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।
সোনার বিস্তারিত মূল্য তালিকা (২ জানুয়ারি ২০২৬)
| সোনার মান (Karat) | প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) | প্রতি গ্রাম | প্রতি আনা (০.৭২৯ গ্রাম) | প্রতি রতি (০.১২১ গ্রাম) |
| ২২ ক্যারেট (হলমার্ককৃত) | ২,২৪,১৮২ টাকা | ১৯,২২০ টাকা | ১৪,০১১ টাকা | ২,৩৩৫ টাকা |
| ২১ ক্যারেট (হলমার্ককৃত) | ২,১৪,০৩৪ টাকা | ১৮,৩৫০ টাকা | ১৩,৩৭৭ টাকা | ২,২২৯ টাকা |
| ১৮ ক্যারেট (হলমার্ককৃত) | ১,৮৩,৪১৬ টাকা | ১৫,৭২৫ টাকা | ১১,৪৬৩ টাকা | ১,৯১০ টাকা |
| সনাতন পদ্ধতি (Traditional) | ১,৫২,৮৫৭ টাকা | ১৩,১০৫ টাকা | ৯,৫৫৩ টাকা | ১,৫৯২ টাকা |
বিশ্লেষণ: আপনি যদি দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারের জন্য মজবুত গহনা চান, তবে ২২ ক্যারেট সেরা। আর যদি বাজেট কিছুটা কম থাকে কিন্তু চকচকে ভাব চান, তবে ২১ ক্যারেট বেছে নিতে পারেন।
আজকের রুপার বাজার দর (বিস্তারিত)
সোনার পাশাপাশি রুপার কদরও কম নয়। বিশেষ করে শিশুদের অলংকার, পায়ের নূপুর এবং উপহার সামগ্রী তৈরিতে রুপার ব্যবহার ব্যাপক। সোনার দামের সাথে রুপার দাম সবসময় ওঠানামা করে না, এটি অনেকটা স্থিতিশীল থাকে। নিচে আজকের রুপার সঠিক দাম তুলে ধরা হলো।
রুপার ক্যাটাগরি ভিত্তিক মূল্য তালিকা
| রুপার ক্যাটাগরি | প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) | প্রতি গ্রাম | মান ও ব্যবহার |
| ২২ ক্যারেট | ৬,০৬৫ টাকা | ৫২০ টাকা | খুব উন্নতমানের, সাধারণত দামী গিফট আইটেমে ব্যবহৃত হয়। |
| ২১ ক্যারেট | ৫,৭৭৪ টাকা | ৪৯৫ টাকা | সাধারণ ব্যবহারের গহনা তৈরির জন্য উপযুক্ত। |
| ১৮ ক্যারেট | ৪,৯৫৭ টাকা | ৪২৫ টাকা | বাজেট সাশ্রয়ী গহনার জন্য। |
| সনাতন পদ্ধতি | ৩,৭৩২ টাকা | ৩২০ টাকা | পুরনো দিনের রুপা, বিশুদ্ধতা কিছুটা কম হতে পারে। |
৩. সোনা কেনার মোট খরচ বা ‘লুকানো খরচ’ হিসাব করবেন যেভাবে
অনেকেই দোকানে গিয়ে বিপাকে পড়েন যখন দেখেন সোনার ভরির দামের চেয়ে বিলের অঙ্কটা অনেক বেশি। এর কারণ হলো ‘মেকিং চার্জ’ বা মজুরি এবং সরকারি ভ্যাট। বাজুসের নিয়ম অনুযায়ী, সোনার মূল দামের সাথে ৫% ভ্যাট এবং একটি নির্দিষ্ট ন্যূনতম মজুরি যুক্ত করতে হয়।
নিচে একটি উদাহরণের মাধ্যমে ১ ভরি ২২ ক্যারেট গহনা কেনার মোট খরচের হিসাব দেখানো হলো।
১ ভরি গহনা কেনার মোট খরচের নমুনা হিসাব
| খরচের খাত | টাকার পরিমাণ (আনুমানিক) | মন্তব্য |
| সোনার দাম (২২ ক্যারেট) | ২,২৪,১৮২ টাকা | বাজার দর অনুযায়ী (ফিক্সড) |
| মজুরি (Making Charge) | ১০,০০০ – ১৫,০০০ টাকা | ডিজাইনের ওপর ভিত্তি করে কম-বেশি হয় (ন্যূনতম ৬%)। |
| ভ্যাট (VAT) | ১১,৭০৯ টাকা (প্রায়) | মোট মূল্যের ওপর ৫% সরকারি কর। |
| সর্বমোট খরচ | ২,৪৫,৮৯১ টাকা (প্রায়) | ১ ভরি গহনা কিনতে আপনাকে এই পরিমাণ টাকা গুনতে হবে। |
পরামর্শ: গহনা কেনার সময় জুয়েলার্সের সাথে মজুরির বিষয়ে দরদাম করার সুযোগ থাকে। অনেক সময় উৎসব উপলক্ষে তারা মজুরিতে ছাড় দিয়ে থাকে।
ক্যারেট ও বিশুদ্ধতা চেনার উপায়
সোনা কতটা খাঁটি, তা নির্ধারণ করা হয় ‘ক্যারেট’ দিয়ে। ২৪ ক্যারেট হলো সবচেয়ে খাঁটি, কিন্তু এটি দিয়ে গহনা তৈরি সম্ভব নয় কারণ এটি খুব নরম হয়। অন্য ধাতুর মিশ্রণের ওপর ভিত্তি করে ক্যারেট নির্ধারণ করা হয়। নিচের টেবিলে বিষয়টি সহজ করে বোঝানো হলো।
সোনার ক্যারেট ও বিশুদ্ধতার গাইড
| ক্যারেট | সোনার বিশুদ্ধতা (%) | মিশ্র ধাতু | ব্যবহার ও বৈশিষ্ট্য |
| ২৪ ক্যারেট (24K) | ৯৯.৯% | নেই | স্বর্ণের বার বা কয়েন। বিনিয়োগের জন্য সেরা। |
| ২২ ক্যারেট (22K) | ৯১.৬% | ৮.৪% (তামা/জিংক) | গহনা তৈরির জন্য সেরা মান। টেকসই ও উজ্জ্বল। |
| ২১ ক্যারেট (21K) | ৮৭.৫% | ১২.৫% | মধ্যপ্রাচ্যের গহনায় বেশি দেখা যায়। |
| ১৮ ক্যারেট (18K) | ৭৫.০% | ২৫.০% | ডায়মন্ড বা পাথর বসানো গহনার জন্য আদর্শ। |
৫. সোনা ও রুপার পরিমাপ পদ্ধতি (ইউনিট কনভারশন)
আমাদের দেশে এখনো ‘ভরি’ বা ‘আনা’র হিসাব বেশ প্রচলিত। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হলো ‘গ্রাম’। জুয়েলারি শপে ডিজিটাল মিটারে গ্রামে ওজন করা হয়, যা পরে ভরিতে কনভার্ট করা হয়। হিসাবের গরমিল এড়াতে নিচের রূপান্তর তালিকাটি মনে রাখা জরুরি।
ওজন পরিমাপের রূপান্তর তালিকা
| প্রচলিত একক | মেট্রিক একক (গ্রাম) | ক্ষুদ্রতম একক |
| ১ ভরি | ১১.৬৬৪ গ্রাম | ১৬ আনা |
| ১ আনা | ০.৭২৯ গ্রাম | ৬ রতি (প্রায়) |
| ১ রতি | ০.১২১ গ্রাম | ১০ পয়েন্ট |
| ১ গ্রাম | ০.০৮৫৭ ভরি | — |
৬. পুরাতন সোনা বদল বা বিক্রির নিয়ম (Exchange Policy)
নতুন গহনা কেনার সময় অনেকেই পুরনো সোনা বদল করতে চান। অথবা টাকার প্রয়োজনে সোনা বিক্রি করতে চান। এক্ষেত্রে বাজুসের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। পুরাতন সোনা বিক্রির সময় সাধারণত ২০% থেকে ১৫% দাম কেটে রাখা হয়।
পুরাতন সোনা বিক্রির বা পরিবর্তনের নিয়ম
| পরিস্থিতি | কর্তন বা লস (Loss Percentage) | বিস্তারিত নিয়ম |
| সোনা বিক্রি (ক্যাশ মেমো আছে) | ২০% কর্তন | বর্তমান বাজার দর থেকে ২০% বাদ দিয়ে দাম পাবেন। |
| সোনা বিক্রি (ক্যাশ মেমো নেই) | ভেরিফিকেশন সাপেক্ষে | বিশুদ্ধতা যাচাই করে এবং দোকানদারের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। |
| সোনা বদল (Exchange) | ১০% – ১৫% কর্তন | পুরনো সোনা দিয়ে নতুন গহনা বানালে কর্তন কিছুটা কম হয়। |
| সনাতন সোনা বিক্রি | ২৫% – ৩০% কর্তন | সনাতন সোনায় খাদ বেশি থাকে বলে কর্তনের পরিমাণ বেশি। |
৭. সোনার দাম কেন বাড়ে বা কমে?
সোনার দাম কোনো একক কারণে নির্ধারিত হয় না। এর পেছনে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অনেক কারণ কাজ করে। ২০২৬ সালেও এই কারণগুলো বাজারকে প্রভাবিত করছে।
সোনার দাম প্রভাবিত করার মূল কারণসমূহ
| কারণ (Factors) | প্রভাব (Impact) | ব্যাখ্যা |
| আন্তর্জাতিক বাজার | অত্যন্ত বেশি | বিশ্ববাজারে (Spot Gold) দাম বাড়লে দেশেও বাড়ে। |
| ডলারের দাম | সরাসরি সমানুপাতিক | ডলার শক্তিশালী হলে সোনার দাম বাড়ে (আমদানি খরচ বাড়ে বলে)। |
| তেজাবী স্বর্ণের যোগান | স্থানীয় প্রভাব | স্থানীয় বাজারে পিওর গোল্ডের সংকট থাকলে দাম বাড়ে। |
| ভূ-রাজনীতি | পরোক্ষ প্রভাব | যুদ্ধ বা অস্থিরতায় মানুষ নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনা কেনে, ফলে দাম বাড়ে। |
৮. সোনা কেনার আগে সতর্কতা ও চেকলিস্ট
সোনা কেনা একটি বড় বিনিয়োগ। তাই তাড়াহুড়ো না করে কিছু বিষয় নিশ্চিত হয়ে নেওয়া উচিত। আপনার কেনাকাটা নিরাপদ করতে নিচের চেকলিস্টটি অনুসরণ করুন।
ক্রেতার জন্য গাইডলাইন (Do’s and Don’ts)
| কি করবেন (Do’s) | কি করবেন না (Don’ts) |
| অবশ্যই হ্যালমার্ক (Hallmark) দেখে কিনবেন। | হ্যালমার্ক ছাড়া বা হাতে খোদাই করা সিল বিশ্বাস করবেন না। |
| ডিজিটাল স্কেলে ওজন নিজের চোখে দেখে নিন। | পুরনো দাঁড়িপাল্লায় মাপা ওজন গ্রহণ করবেন না। |
| পাকা মেমো বা রসিদ সংগ্রহ করুন। | হাতে লেখা সাধারণ কাগজে বা মেমো ছাড়া কিনবেন না। |
| মেমোতে ক্যারেট, ওজন ও মজুরি আলাদাভাবে লিখিয়ে নিন। | বিস্তারিত বিবরণ ছাড়া এককালীন বিল পরিশোধ করবেন না। |
| পুরাতন সোনা বিক্রির পলিসি আগেই জেনে নিন। | পলিসি না জেনে কিনলে পরে বিক্রি করতে গেলে বিপদে পড়বেন। |
পরিশেষে, বাংলাদেশে আজকের সোনা ও রুপার দাম (২ জানুয়ারি ২০২৬) পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাজার বর্তমানে ক্রেতাদের জন্য কিছুটা অনুকূলে রয়েছে। ২২ ক্যারেট সোনার ভরি ২,২৪,১৮২ টাকা এবং রুপার ভরি ৬,০৬৫ টাকা। যদিও দাম ওঠানামা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, তবুও সঠিক ওজন এবং হ্যালমার্ক যাচাই করে কেনাকাটা করলে আপনি আপনার বিনিয়োগের সঠিক মূল্য পাবেন।
যেকোনো গহনা কেনার সময় অবশ্যই বিশ্বাসযোগ্য ও বাজুস নিবন্ধিত জুয়েলারি শোরুম থেকে কিনুন। নিয়মিত সোনার বাজারের আপডেট পেতে আমাদের সাথেই থাকুন।
ডিসক্লেইমার: উপরে উল্লেখিত সোনার দাম বাজুস নির্ধারিত। তবে জুয়েলারি শপ ভেদে এবং ডিজাইনের ভিন্নতার কারণে মজুরি ও মোট দামে সামান্য তারতম্য হতে পারে। কেনার আগে আপনার নিকটস্থ শোরুমে আজকের রেট যাচাই করে নিন।


