সোনা বা স্বর্ণ—বাঙালি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিয়েশাদি থেকে শুরু করে যেকোনো শুভ অনুষ্ঠানে সোনার গহনা উপহার দেওয়া বা কেনা আমাদের ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে। পাশাপাশি, বিপদের দিনে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও সোনার জুড়ি মেলা ভার। আপনি যদি আজ বা আগামীকাল সোনা কেনার পরিকল্পনা করে থাকেন, তবে বাংলাদেশে আজকের সোনা ও রুপার দাম জানা আপনার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্ববাজারে সোনার দামের অস্থিরতা এবং ডলারের মানের ওঠানামার কারণে দেশের বাজারেও নিয়মিত সোনার দামে পরিবর্তন আসছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) নিয়মিতভাবে এই দাম সমন্বয় করে থাকে। ২০২৬ সালের শুরুতেই সোনার বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা ০৫/০১/২০২৬ (৫ জানুয়ারি ২০২৬) তারিখের জন্য প্রযোজ্য সোনা ও রুপার সর্বশেষ দাম, ভরি ও গ্রাম প্রতি বিস্তারিত হিসাব এবং সোনা কেনার সময় আপনার করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।
চলুন, জেনে নেওয়া যাক আজকের বাজারের সর্বশেষ পরিস্থিতি।
বাংলাদেশে আজকের সোনার দাম (ক্যালকুুলেটর ও চার্ট)
বাজুসের সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী, দেশের বাজারে সোনার দামে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। নিচে আমরা ভরি এবং গ্রাম প্রতি সোনার দামের বিস্তারিত তালিকা তুলে ধরলাম। এই দামগুলো ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের জন্য প্রযোজ্য।
ক্যারেট অনুযায়ী সোনার দাম (প্রতি ভরি)
সোনার মানের ওপর ভিত্তি করে এর দাম নির্ধারিত হয়। সাধারণত ২২ ক্যারেট সোনা দিয়ে গহনা তৈরি করা সবচেয়ে ভালো, কারণ এতে সোনার বিশুদ্ধতা থাকে ৯১.৬ শতাংশ। নিচে বিভিন্ন ক্যারেটের এক ভরি সোনার দামের তালিকা দেওয়া হলো:
| সোনার মান (ক্যারেট) | প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) দাম (টাকা) | পূর্বের দামের সাথে পার্থক্য |
| ২২ ক্যারেট (হলমার্ককৃত) | ২,২২,৭২৪ টাকা | কমেছে |
| ২১ ক্যারেট (হলমার্ককৃত) | ২,১২,৬৩৫ টাকা | কমেছে |
| ১৮ ক্যারেট (হলমার্ককৃত) | ১,৮২,২৫০ টাকা | কমেছে |
| সনাতন পদ্ধতি | ১,৫১,৮০৭ টাকা | কমেছে |
দ্রষ্টব্য: উপরের তালিকাটি বাজুসের সর্বশেষ প্রেস রিলিজ (কার্যকর ০২ জানুয়ারি ২০২৬) অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে, যা ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত বহাল রয়েছে।
গ্রাম প্রতি সোনার দাম
অনেকেই এখন ভরি না কিনে গ্রাম হিসেবে সোনা কিনতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। বিশেষ করে ছোট গহনা বা উপহারের জন্য গ্রাম হিসেবে কেনা সুবিধাজনক।
| সোনার মান | ১ গ্রামের দাম (টাকা) | ৮ গ্রামের দাম (টাকা) |
| ২২ ক্যারেট | ১৯,০৯৫ টাকা | ১,৫২,৭৬০ টাকা |
| ২১ ক্যারেট | ১৮,২৩০ টাকা | ১,৪৫,৮৪০ টাকা |
| ১৮ ক্যারেট | ১৫,৬২৫ টাকা | ১,২৫,০০০ টাকা |
| সনাতন পদ্ধতি | ১৩,০১৫ টাকা | ১,০৪,১২০ টাকা |
বাংলাদেশে আজকের রুপার দাম
সোনার পাশাপাশি রুপার গহনা এবং তৈজসপত্রের চাহিদাও বাংলাদেশে প্রচুর। সোনার দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় অনেকেই বিনিয়োগ বা ব্যবহারের জন্য রুপাকে বেছে নিচ্ছেন। বাজুসের সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী বাংলাদেশে আজকের সোনা ও রুপার দাম এর মধ্যে রুপার দামে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
নিচে ক্যাটাগরি অনুযায়ী রুপার দামের তালিকা দেওয়া হলো:
| রুপার মান (ক্যারেট) | প্রতি ভরি (টাকা) | প্রতি গ্রাম (টাকা) |
| ২২ ক্যারেট | ৫,৫৪০ টাকা | ৪৭৫ টাকা |
| ২১ ক্যারেট | ৫,৩০৭ টাকা | ৪৫৫ টাকা |
| ১৮ ক্যারেট | ৪,৫৪৯ টাকা | ৩৯০ টাকা |
| সনাতন পদ্ধতি | ৩,৩৮৩ টাকা | ২৯০ টাকা |
গুরুত্বপূর্ণ নোট: সোনা বা রুপার গহনা কেনার সময় উল্লিখিত দামের সাথে ৫% ভ্যাট এবং দোকানভেদে মজুরি (Making Charge) যুক্ত হবে।1 তাই বাজেট করার সময় এই অতিরিক্ত খরচের কথা মাথায় রাখবেন।
সোনার দাম নির্ধারণের পদ্ধতি ও এককসমূহ
সোনা কেনার সময় আমরা প্রায়ই ভরি, আনা, রতি বা গ্রামের হিসেবে গুলিয়ে ফেলি। সঠিক দাম বুঝতে হলে এই পরিমাপের এককগুলো সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা প্রয়োজন।
সোনা মাপার এককসমূহ
বাংলাদেশে সনাতন পদ্ধতি এবং আন্তর্জাতিক মেট্রিক পদ্ধতি—উভয়ই প্রচলিত। তবে জুয়েলারি শপগুলোতে সাধারণত “ভরি” শব্দটিই বেশি ব্যবহৃত হয়।
-
১ ভরি = ১১.৬৬৪ গ্রাম
-
১ ভরি = ১৬ আনা
-
১ আনা = ৬ রতি (প্রায়)
-
১ ভরি = ৯৬ রতি
নিচে একটি সহজ রূপান্তর সারণী দেওয়া হলো যা আপনাকে হিসাব করতে সাহায্য করবে:
| একক | গ্রামের পরিমাণ |
| ১ ভরি | ১১.৬৬৪ গ্রাম |
| ১ আনা | ০.৭২৯ গ্রাম |
| ১ রতি | ০.১২১ গ্রাম |
ক্যারেট বলতে কী বোঝায়?
সোনা কতটা খাঁটি, তা মাপা হয় ক্যারেট দিয়ে।
-
২৪ ক্যারেট: ৯৯.৯% খাঁটি সোনা। এটি দিয়ে সাধারণত গহনা তৈরি হয় না কারণ এটি খুব নরম হয়। এটি বার বা কয়েন হিসেবে বিনিয়োগের জন্য কেনা হয়।
-
২২ ক্যারেট: ৯১.৬% সোনা এবং বাকিটা অন্য ধাতু (তামা, দস্তা, নিকেল)। গহনা তৈরির জন্য এটি সবচেয়ে উপযোগী এবং টেকসই।
-
২১ ক্যারেট: ৮৭.৫% সোনা। মধ্যপ্রাচ্য বা দুবাইয়ের গহনায় এটি বেশি দেখা যায়।
-
১৮ ক্যারেট: ৭৫% সোনা। হীরা বা পাথরের গহনায় পাথর শক্তভাবে ধরে রাখার জন্য ১৮ ক্যারেট সোনা ব্যবহৃত হয়।
কেন বাড়ছে বা কমছে সোনার দাম? (বাজার বিশ্লেষণ)
বাংলাদেশে আজকের সোনা ও রুপার দাম কেন ওঠানামা করছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে অনেক প্রশ্ন থাকে। ২০২৬ সালের শুরুতেই আমরা দেখেছি সোনার দাম রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে আবার কিছুটা কমেছে। এর পেছনে প্রধানত আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় কিছু কারণ দায়ী।
১. বিশ্ববাজারে অস্থিরতা
আন্তর্জাতিক বাজারে (International Spot Market) সোনার দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের বাজারে। মার্কিন ডলারের মান কমে গেলে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনা কেনা বাড়িয়ে দেন, ফলে দাম বেড়ে যায়। ২০২৫-এর শেষে এবং ২০২৬-এর শুরুতে বিশ্ববাজারে সোনার আউন্স প্রতি দাম ৪,৩০০ ডলারের বেশিতে ওঠানামা করছে।
২. টাকার বিপরীতে ডলারের মান
বাংলাদেশ সোনা আমদানি নির্ভর দেশ। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সোনা বা কাঁচামাল কিনতে ডলার খরচ করতে হয়। টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বাড়লে সোনা আমদানির খরচ বেড়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে স্থানীয় বাজারে।
৩. উৎসব ও চাহিদা
বিয়ের মৌসুম বা উৎসবের সময় (যেমন ঈদ, পূজা) সোনার চাহিদা বেড়ে যায়। চাহিদা বাড়লে স্থানীয় বুলিয়ন মার্কেটে সোনার দাম বাড়ে, যা জুয়েলারি সমিতি (বাজুস) সমন্বয় করে।
সোনা কেনার আগে যা অবশ্যই যাচাই করবেন
সোনা কেনা একটি বড় বিনিয়োগ। তাই ঠকে যাওয়া থেকে বাঁচতে কিছু বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখা জরুরি।
১. হলমার্ক (Hallmark) যাচাই
বর্তমানে ২২ ক্যারেট সোনায় হলমার্ক থাকা বাধ্যতামূলক। গহনার গায়ে একটি ছোট সিল থাকে যেখানে ক্যারেট এবং বিশুদ্ধতা লেখা থাকে (যেমন: 22K916)। আতশ কাঁচ দিয়ে এই সিল দেখে নিন। হলমার্ক ছাড়া সোনা কিনলে পরবর্তীতে বিক্রি করার সময় সঠিক দাম পাওয়া যায় না।
২. পাকা রসিদ (Cash Memo)
সোনা কেনার সময় অবশ্যই পাকা রসিদ বা ক্যাশ মেমো সংগ্রহ করবেন। মেমোতে নিচের তথ্যগুলো আছে কি না দেখে নিন:
-
সোনার ওজন (ভরি, আনা, রতি ও গ্রামে)।
-
সোনার ক্যারেট (২২, ২১ বা ১৮)।
-
মজুরি এবং ভ্যাটের পরিমাণ আলাদাভাবে উল্লেখ।
-
দোকানের সিল ও স্বাক্ষর।
৩. মজুরি বা মেকিং চার্জ
জুয়েলারি শপগুলো সোনার মূল দামের সাথে গহনা তৈরির খরচ বা মজুরি যোগ করে। ডিজাইনের জটিলতার ওপর ভিত্তি করে এই মজুরি কম-বেশি হতে পারে। অনেক সময় দোকানদারের সাথে আলোচনা করে মজুরি কিছুটা কমানো সম্ভব হয়।
৪. পুরাতন সোনা বদলানোর নিয়ম
আপনার যদি পুরাতন সোনা থাকে এবং সেটি দিয়ে নতুন গহনা বানাতে চান, তবে জেনে নিন দোকানটি পুরাতন সোনা কত শতাংশ দামে কিনবে। সাধারণত বাজুসের নিয়ম অনুযায়ী, পুরাতন সোনা বদলানোর ক্ষেত্রে বর্তমান বাজার দর থেকে ১০-২০ শতাংশ টাকা বাদ দেওয়া হয় (শর্ত সাপেক্ষে)।
২০২৬ সালে সোনার বাজারে বিনিয়োগের সম্ভাবনা
অর্থনীতিবিদদের মতে, ২০২৬ সালটি সোনার বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার কদর বাড়ছে।
বিনিয়োগের সুবিধা:
-
মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে রক্ষা কবচ।
-
জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত নগদ টাকায় রূপান্তরযোগ্য।
-
দীর্ঘমেয়াদে দাম বাড়ার প্রবণতা।
তবে গহনা হিসেবে না কিনে বিনিয়োগের জন্য বার বা কয়েন কেনা বুদ্ধিমানের কাজ, কারণ এতে মজুরির খরচ বাঁচে এবং বিক্রির সময় লোকসান কম হয়।
শেষ কথা
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে আজকের সোনা ও রুপার দাম জানা থাকলে আপনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। ০৫ জানুয়ারি ২০২৬-এর আপডেট অনুযায়ী, ২২ ক্যারেট সোনার ভরি ২,২২,৭২৪ টাকা এবং রুপার ভরি ৫,৫৪০ টাকা। বাজার প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল, তাই কেনাকাটার আগে সবসময় বিশ্বস্ত জুয়েলারি শপ বা বাজুসের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে সর্বশেষ দাম যাচাই করে নেওয়া উচিত।
আশা করি, এই আর্টিকেলটি আপনাকে সোনার বর্তমান বাজার দর এবং কেনাকাটার খুঁটিনাটি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দিতে পেরেছে। পরবর্তী আপডেটের জন্য আমাদের সাথেই থাকুন।


