বাংলাদেশে সোনার দাম আবারও রেকর্ড ভাঙছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) সম্প্রতি ভরি প্রতি সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৪৫২ টাকা পর্যন্ত দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে। ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে কার্যকর এই নতুন দামে ২২ ক্যারেট সোনা বর্তমানে ভরি প্রতি ২ লাখ ১৫ হাজার ৫৯৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বাজুস।
বাংলাদেশে সোনার বর্তমান দাম
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন শনিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, রোববার ১৪ ডিসেম্বর থেকে নতুন মূল্য তালিকা কার্যকর হয়েছে। স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের কারণেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত যেখানে ২২ ক্যারেট সোনার দাম ছিল ২ লাখ ১২ হাজার ১৪৫ টাকা, সেখানে নতুন দামে তা ৩ হাজার ৪৫২ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার ৫৯৭ টাকায়।
সোনার দাম (প্রতি ভরি হিসাবে)
| ক্যারেট | প্রতি ভরি দাম (টাকা) |
|---|---|
| ২২ ক্যারেট | ২,১৫,৫৯৭ |
| ২১ ক্যারেট | ২,০৫,৮০০ |
| ১৮ ক্যারেট | ১,৭৬,৩৯৫ |
| সনাতন পদ্ধতি | ১,৪৬,৮৩৮ |
সোনার দাম (গ্রাম, আনা ও রতি হিসাবে)
১ ভরি সমান ১১.৬৬৪ গ্রাম, ১ আনা সমান ১/১৬ ভরি এবং ১ রতি সমান ১/৯৬ ভরি হিসাবে বর্তমান বাজারে সোনার দাম নিম্নরূপ:
২২ ক্যারেট সোনার বিস্তারিত মূল্য
| একক | দাম (টাকা) |
|---|---|
| প্রতি ভরি | ২,১৫,৫৯৭ |
| প্রতি গ্রাম | ১৮,৪৮৩ (আনুমানিক) |
| প্রতি আনা | ১৩,৪৭৫ (আনুমানিক) |
| প্রতি রতি | ২,২৪৬ (আনুমানিক) |
২১ ক্যারেট সোনার বিস্তারিত মূল্য
| একক | দাম (টাকা) |
|---|---|
| প্রতি ভরি | ২,০৫,৮০০ |
| প্রতি গ্রাম | ১৭,৬৪৪ (আনুমানিক) |
| প্রতি আনা | ১২,৮৬৩ (আনুমানিক) |
| প্রতি রতি | ২,১৪৪ (আনুমানিক) |
১৮ ক্যারেট সোনার বিস্তারিত মূল্য
| একক | দাম (টাকা) |
|---|---|
| প্রতি ভরি | ১,৭৬,৩৯৫ |
| প্রতি গ্রাম | ১৫,১২০ (আনুমানিক) |
| প্রতি আনা | ১১,০২৫ (আনুমানিক) |
| প্রতি রতি | ১,৮৩৭ (আনুমানিক) |
রুপার বর্তমান দাম বাংলাদেশে
সোনার দাম বৃদ্ধি পেলেও দেশের বাজারে রুপার দামে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বাজুসের তথ্য অনুযায়ী, রুপার মূল্য স্থিতিশীল রয়েছে এবং বিভিন্ন ক্যারেটের রুপার দাম একই রয়েছে।
রুপার দাম (প্রতি ভরি হিসাবে)
| ক্যারেট | প্রতি ভরি দাম (টাকা) |
|---|---|
| ২২ ক্যারেট | ৪,৫৭২ |
| ২১ ক্যারেট | ৪,৩৬২ |
| ১৮ ক্যারেট | ৩,৭৩২ |
| সনাতন পদ্ধতি | ২,৭৯৯ |
রুপার দাম (গ্রাম, আনা ও রতি হিসাবে)
২২ ক্যারেট রুপার বিস্তারিত মূল্য
| একক | দাম (টাকা) |
|---|---|
| প্রতি ভরি | ৪,৫৭২ |
| প্রতি গ্রাম | ৩৯২ (আনুমানিক) |
| প্রতি আনা | ২৮৬ (আনুমানিক) |
| প্রতি রতি | ৪৮ (আনুমানিক) |
২১ ক্যারেট রুপার বিস্তারিত মূল্য
| একক | দাম (টাকা) |
|---|---|
| প্রতি ভরি | ৪,৩৬২ |
| প্রতি গ্রাম | ৩৭৪ (আনুমানিক) |
| প্রতি আনা | ২৭৩ (আনুমানিক) |
| প্রতি রতি | ৪৫ (আনুমানিক) |
সোনার দাম বৃদ্ধির কারণ
আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমেরিকান ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি টাকার মূল্য হ্রাস, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ সম্পদ হিসাবে সোনার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি এর প্রধান কারণ। স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজুস নিয়মিত মূল্য সমন্বয় করছে।
ডিসেম্বর মাসে এটি দ্বিতীয়বারের মতো স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি পেল। ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২ ক্যারেট সোনার দাম ছিল ২ লাখ ১২ হাজার ১৪৫ টাকা, যা ১ হাজার ৫০ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। এর মাত্র কয়েকদিন পরই আরও ৩ হাজার ৪৫২ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
ভ্যাট ও মজুরি সংক্রান্ত তথ্য
বাজুসের নির্দেশনা অনুযায়ী, সোনা ও রুপার নির্ধারিত বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে সরকার আরোপিত ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং বাজুস নির্ধারিত ন্যূনতম ৬ শতাংশ মজুরি যোগ হবে। তবে গয়নার নকশা ও মানের ভিন্নতার কারণে মজুরির হার কমবেশি হতে পারে। এর ফলে ক্রেতাদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত দামের চেয়ে ১১ শতাংশ বেশি হবে, যা গহনার জটিলতা অনুযায়ী আরও বাড়তে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, ২২ ক্যারেট ১ ভরি সোনার প্রকৃত মূল্য দাঁড়াবে: ২,১৫,৫৯৭ + (৫% ভ্যাট) + (৬% ন্যূনতম মজুরি) = প্রায় ২,৩৯,৩১৩ টাকা।
গত কয়েক মাসে সোনার দাম পরিবর্তন
চলতি বছরে বাংলাদেশে সোনার দাম ক্রমাগত উর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখিয়েছে। নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে ২২ ক্যারেট সোনার দাম ছিল ২ লাখ ৮ হাজার টাকা, যেখানে এক দফা ৫ হাজার ৪৪৭ টাকা পর্যন্ত কমানো হয়েছিল। কিন্তু ডিসেম্বরে এসে আবার দাম বাড়তে শুরু করে এবং বর্তমানে তা ২ লাখ ১৫ হাজার ৫৯৭ টাকায় পৌঁছেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সোনার দাম ৬ সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছিল, যা স্থানীয় বাজারেও প্রতিফলিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী দিনগুলোতেও সোনার দাম বৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।
ক্রেতাদের জন্য পরামর্শ
সোনার ক্রমবর্ধমান মূল্যের কারণে সাধারণ ক্রেতারা চাপের মুখে পড়ছেন। বিশেষ করে বিবাহ ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের জন্য সোনা কেনার ক্ষেত্রে এই মূল্যবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে। বাজার বিশ্লেষকরা পরামর্শ দিচ্ছেন যে, জরুরি প্রয়োজন না থাকলে বর্তমান সময়ে বড় পরিমাণে সোনা কেনা থেকে বিরত থাকা উচিত।
তবে যারা বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে সোনা কিনতে আগ্রহী, তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো উচিত। সোনা ঐতিহ্যগতভাবে মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে একটি নিরাপদ সম্পদ হিসাবে বিবেচিত হয়। তবে যেকোনো ক্রয়ের আগে বাজুস অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে সঠিক ক্যারেট ও ওজন যাচাই করে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রুপা বিনিয়োগের বিকল্প
যারা সোনার উচ্চমূল্যে চিন্তিত, তাদের জন্য রুপা একটি ভালো বিকল্প হতে পারে। বর্তমানে রুপার দাম স্থিতিশীল রয়েছে এবং ২২ ক্যারেট রুপা ভরি প্রতি ৪ হাজার ৫৭২ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। রুপার গহনাও জনপ্রিয় এবং অনেকে এটি দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য পছন্দ করেন।
আন্তর্জাতিক বাজারেও রুপার দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে, যা স্থানীয় বাজারে প্রতিফলিত হয়েছে। তবে রুপা কেনার ক্ষেত্রেও বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান থেকে যথাযথ বিল ও গুণমান সনদপত্র নিয়ে কেনা উচিত।
সোনা ক্রয়ের সময় সতর্কতা
সোনা কেনার সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা উচিত:
-
সর্বদা বাজুস অনুমোদিত বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান থেকে সোনা কিনুন
-
ক্যারেট ও ওজন যাচাই করে নিন এবং যথাযথ বিল সংরক্ষণ করুন
-
হলমার্ক যুক্ত সোনা কেনা নিরাপদ, যা গুণমানের নিশ্চয়তা দেয়
-
বর্তমান বাজারদর সম্পর্কে আগে থেকেই জেনে নিন
-
অতিরিক্ত মজুরি চার্জ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নিন
-
পুরনো সোনা বিনিময়ের ক্ষেত্রে সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করুন
ভবিষ্যৎ প্রবণতা
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক মাসে বাংলাদেশে সোনার দাম আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারের প্রবণতা, মুদ্রার বিনিময় হার এবং স্থানীয় চাহিদা এর প্রধান নির্ধারক হবে। বিশেষ করে বিবাহ মৌসুমে সোনার চাহিদা বৃদ্ধি পায়, যা দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে সরকার যদি সোনা আমদানিতে শুল্ক কমানো বা অন্য কোনো নীতি গ্রহণ করে, তাহলে দাম নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে।
শেষ কথা
বাংলাদেশে সোনা ও রুপার দাম বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ২২ ক্যারেট সোনার দাম ভরি প্রতি ২ লাখ ১৫ হাজার ৫৯৭ টাকায় পৌঁছেছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের প্রবণতা এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। ক্রেতাদের উচিত সঠিক তথ্য জেনে এবং বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান থেকে ক্রয় করা। রুপার দাম স্থিতিশীল থাকায় এটি বিকল্প হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। বাজুসের নিয়মিত মূল্য হালনাগাদ এবং সরকারের নজরদারি এই খাতে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সাহায্য করছে। ভবিষ্যতে দামের পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা এবং সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।


