গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার: যাঁর স্বরলিপি আঁকা ইন্দ্রধনুর রঙে

সর্বাধিক আলোচিত

বাংলা সিনেমার সাদা-কালো পর্দা। উত্তমকুমার-সুচিত্রা সেনের মুখের ওপর আলো এসে পড়েছে। নেপথ্যে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ। গানের প্রথম কয়েকটি শব্দেই যেন পর্দার ধূসরতার মধ্যে হঠাৎ রঙ দেখা দিল—‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু’। ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ছবির জন্য অনুপম ঘটকের সুরে এই গান লিখেছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। রেকর্ডে তাঁর নাম ছিল গীতিকার হিসেবে; কিন্তু শ্রোতার মনে তিনি যেন অন্য এক কাজও করছিলেন—শব্দ দিয়ে দৃশ্যের ভিতরে আরেকটি দৃশ্য আঁকছিলেন।

গৌরীপ্রসন্নের গান ফিরে শুনলে এই দৃশ্যমানতার কথা বারবার মনে হয়। তাঁর গানের প্রেম কেবল হৃদয়ের ব্যাপার নয়, সেখানে রাত আছে, মেঘ আছে, নদী আছে, বকুল আছে, স্বরলিপি আছে, মুছে যাওয়া দিনের রং আছে। অথচ ভাষা কখনও দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে না। তাঁর কলমের সবচেয়ে বড় রহস্য বোধ হয় এখানেই—কাব্যের আবরণ রেখেও কথাকে তিনি মানুষের মুখের কাছাকাছি রাখতে পারতেন।

তাই আজও বিস্ময় জাগে। বাঙালির স্মৃতিতে তাঁর লেখা এত গান, কিন্তু গানের আড়ালের মানুষটি কতখানি পরিচিত? আমরা হেমন্তের গলা চিনেছি, সন্ধ্যার কণ্ঠ চিনেছি, মান্না দের উচ্চারণ চিনেছি; উত্তম-সুচিত্রার পর্দার প্রেমও প্রায় পারিবারিক স্মৃতির মতো জেনে গেছি। অথচ যে মানুষটি তাঁদের বহু গানের জন্য প্রেমের, বিচ্ছেদের, বিষাদের, আশ্বাসের ভাষা লিখে দিয়েছিলেন, তিনি দীর্ঘকাল যেন আলো থেকে কয়েক হাত দূরেই দাঁড়িয়ে রইলেন।

৫ ডিসেম্বর ১৯২৫, অবিভক্ত বাংলার পাবনা জেলা

গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের জন্ম ৫ ডিসেম্বর ১৯২৫ সালে পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার গোপালনগর গ্রামে।

বাড়িতে তাঁর নাম ছিল ‘বাচ্চু’। বাবা গিরিজাপ্রসন্ন মজুমদার ছিলেন উদ্ভিদবিদ, কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক। মা সুধা মজুমদারও ছিলেন শিক্ষিতা এবং কবিতা-প্রবন্ধের প্রতি অণুরক্ত। বাড়িতে বাংলা, ইংরেজি ও সংস্কৃত সাহিত্যের চর্চা, গ্রামোফোনে আব্বাসউদ্দিন ও শচীন দেববর্মণের গান—শিশু গৌরীপ্রসন্নের বড় হয়ে ওঠার চারপাশে শব্দ ও সুর যেন আলাদা কোনো বিষয় ছিল না, ছিল ঘরেরই আবহাওয়া।

Gouriprasanna Majumdar Biography

বাবা উদ্ভিদবিদ। তিনি গাছের গঠন, পরিচয়, স্বভাবের দিকে তাকান। ছেলে পরে শব্দের ক্ষেত্রেও যেন তেমনই একটি দৃষ্টি অর্জন করেছিলেন। কোন শব্দটি কোন আবেগের পাশে বসলে অন্য অর্থ তৈরি হয়, কোন সাধারণ শব্দ গানের ভিতরে এসে হঠাৎ দীপ্ত হয়—এই বোধ তাঁর বহু রচনার গভীরে দেখা যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর পরিবার পাবনায় ফিরে আসে এবং সরকারি এডওয়ার্ড কলেজে তাঁর পড়াশোনার চলতে থাকে। পরে কলকাতা তাঁর উচ্চশিক্ষা ও শিল্পীজীবনের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

জীবনী এক নজরে

বিষয় তথ্য
জন্ম ৫ ডিসেম্বর ১৯২৫
জন্মস্থান গোপালনগর গ্রাম, ফরিদপুর উপজেলা, পাবনা; তৎকালীন অবিভক্ত বাংলা, বর্তমান বাংলাদেশ
বাবা গিরিজাপ্রসন্ন মজুমদার—বিশিষ্ট উদ্ভিদবিদ, প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক
মা সুধা মজুমদার—স্নাতক; সাহিত্যচর্চায় আগ্রহী ছিলেন বলে জীবনীসূত্রে উল্লেখ
ডাকনাম বাচ্চু
শিক্ষা পাবনায় স্কুল ও এডওয়ার্ড কলেজ; পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়; ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর, পরবর্তী সময়ে বাংলাতেও স্নাতকোত্তর
পরিবার বিবাহিত ছিলেন; সুপর্ণকান্তি ঘোষের স্মৃতিচারণে তাঁকে নিঃসন্তান বলা হয়েছে
মৃত্যু ২০ আগস্ট ১৯৮৬।

কলেজবেলার কলমে মেঘদূতের ছায়া

গৌরীপ্রসন্নের ছাত্রজীবনের গল্পে পড়াশোনা এবং সাহিত্য যেন পাশাপাশি হাঁটে। কৈশোর থেকেই কবিতা লিখতেন। ছাত্রাবস্থায় কালিদাসের মেঘদূত ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। যে তরুণ পরে বাংলা গানের এত সহজ পঙ্‌ক্তি লিখবেন, তাঁর সাহিত্যবোধের ভিত যে যথেষ্ট প্রশস্ত ছিল, তা সহজেই অনুমেয়।

প্রেসিডেন্সি কলেজের দিনগুলিতে তাঁর পরিচয়ের বৃত্তে ছিলেন কবি অরুণ মিত্র এবং নচিকেতা ঘোষ। নচিকেতা তখনও ভবিষ্যতের কিংবদন্তি সুরকার হয়ে ওঠেননি। দুজন তরুণের বন্ধুত্বের মধ্যে গান ঢুকে পড়ল একেবারে স্বাভাবিকভাবে—গৌরীপ্রসন্ন কথা লিখছেন, নচিকেতা তাতে সুর বসাচ্ছেন। পরবর্তী বাংলা গানের ইতিহাসে যে সম্পর্কটি এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তার শুরুতে ছিল কলেজবেলার বন্ধুত্ব, আড্ডা এবং সৃষ্টির আনন্দ।

পড়াশোনায় তাঁর আনুষ্ঠানিক যাত্রাও ছিল দীর্ঘ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন; পরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যেও স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করেন।

ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র হয়েও তিনি শেষ পর্যন্ত যে বাংলা গানের মানুষ হলেন, তাতে কোনো স্ববিরোধ নেই। বরং তাঁর শব্দভাণ্ডারের প্রসার, উপমার বৈচিত্র্য, কখনও কথ্য ভাষা, কখনও সাধুভাষার আভাস, কখনও আচমকা নাটকীয় চিত্রকল্প—সবকিছুর পেছনে নিশ্চিতভাবেই শিক্ষিত সাহিত্যরুচির একটি অদৃশ্য শৃঙ্খলা কাজ করেছে।

নচিকেতার সুরে খুলে গেল পথ

গান লেখায় প্রতিষ্ঠার গল্পটি অবশ্য নচিকেতা ঘোষের বন্ধুত্বেই সীমিত নয়। তরুণ গৌরীপ্রসন্নের জীবনে শচীন দেববর্মণের ভূমিকা ছিল গভীর। শচীনকর্তার গান শুনে মুগ্ধ তরুণ একদিন নিজের লেখা নিয়ে তাঁর কাছে গিয়েছিলেন। শচীন দেববর্মণ তাঁকে সুরের ওপর কথা বসিয়ে লেখার পরীক্ষা দিয়েছিলেন, তাঁর লেখা আকাশবাণীতে গেয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে রেকর্ডের জন্যও গান লিখিয়েছিলেন। সুরের গায়ে শব্দ এমনভাবে বসানো, যেন শব্দটির জন্মই হয়েছে ওই সুরের সঙ্গে—এই কঠিন কারিগরি শিক্ষার শুরু সেখানেই।

শচীন দেববর্মণের স্নেহের একটি গল্প গৌরীপ্রসন্নের জীবনীতে প্রায় কিংবদন্তি হয়ে আছে। বোম্বের এক রেস্তোরাঁয় সুরকার জয়কিষণের সঙ্গে দেখা। গৌরীপ্রসন্নকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিতে দেখে শচীনকর্তা তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন “কলকাতার মজরুহ সুলতানপুরী” বলে। প্রশংসাটি নিছক আদর ছিল না; হিন্দি গানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গীতিকার মজরুহের সঙ্গে তুলনা করে তিনি তরুণ সহযাত্রীর সম্ভাবনাটিও প্রকাশ করেছিলেন।

সেই সম্ভাবনা দ্রুতই বাস্তব হয়ে উঠল।

যখন কলকাতা গুনগুন করত তাঁর কথায়

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের বাংলা চলচ্চিত্রসংগীতকে ‘স্বর্ণযুগ’ বলা হয় প্রধানত তার শিল্পসমৃদ্ধির জন্য। সেই সমৃদ্ধির ভিতরে গৌরীপ্রসন্নের উপস্থিতি এত বিস্তৃত যে কেবল কয়েকটি জনপ্রিয় গান দিয়ে তাঁকে বোঝা অসম্ভব।

‘অগ্নিপরীক্ষা’-য় অনুপম ঘটকের সুর, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু’। ‘সাগরিকা’-য় রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে শ্যামল মিত্র গাইলেন ‘আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা’। ‘হারানো সুর’-এ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে গীতা দত্তের ‘ওগো তুমি যে আমার’। ‘পথে হল দেরি’-তে রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ‘এ শুধু গানের দিন’। ‘দীপ জ্বেলে যাই’-এ হেমন্তেরই সুর ও কণ্ঠে ‘এই রাত তোমার আমার’।

এর সাথে ‘দেয়া-নেয়া’-র ‘জীবন খাতার প্রতি পাতায়’, শ্যামল মিত্রের সুর ও কণ্ঠে। ‘লুকোচুরি’-র ‘মুছে যাওয়া দিনগুলি’, হেমন্তের সুরে ও কণ্ঠে। আবার চলচ্চিত্রের বাইরেও ‘আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে’, ‘অলির কথা শুনে বকুল হাসে’, ‘মেঘ কালো আঁধার কালো’—একটি দীর্ঘ সংগীতজীবনের আলাদা আলাদা রং।

গৌরীপ্রসন্ন প্রেমের গান লিখতে গিয়ে একই প্রেমের ভাষা পুনরাবৃত্তি করেননি। ‘রাজকন্যা’-র কল্পলোক এবং ‘এই রাত’-এর অন্তরঙ্গতা একই কলমে লেখা হলেও তাদের আবহ আলাদা। ‘জীবন খাতা’য় তিনি জীবনের হিসাবকে ছবিতে রূপ দেন, ‘মুছে যাওয়া দিনগুলি’-তে স্মৃতিকেই যেন একটি চলমান চরিত্র করে তোলেন। তাঁর গান দৃশ্যের অনুবাদ নয়; অনেক সময় দৃশ্যকে অতিক্রম করে স্বাধীন স্মৃতি হয়ে ওঠে।

তাঁর সুরকার-সহযোগীর পরিসরও ছিল বিস্ময়কর—নচিকেতা ঘোষ, রবীন চট্টোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, অনুপম ঘটক, সুধীরলাল চক্রবর্তী, সত্য চৌধুরী, ভক্তিময় দাশগুপ্ত, অপরেশ লাহিড়ী থেকে পরবর্তী সময়ে রাহুল দেববর্মণ। কণ্ঠ দিয়েছেন হেমন্ত, সন্ধ্যা, মান্না দে, শ্যামল মিত্র, আরতি মুখোপাধ্যায়, আশা ভোঁসলে, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আরও বহু শিল্পী। রাহুল দেববর্মণের সুরে আশা ভোঁসলের গাওয়া একাধিক বাংলা গানেও গৌরীপ্রসন্নের কথা রয়েছে।

এখানে একটি বহুলপ্রচারিত ভুল সংশোধন জরুরি। ‘হাজার টাকার ঝাড়বাতিটা’ ‘নিশিপদ্ম’-এর গান নয়। স্যারেগামার সংরক্ষিত রেকর্ড অনুযায়ী গানটি ‘স্ত্রী’ ছবির; নচিকেতা ঘোষের সুরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও মান্না দে গেয়েছিলেন। ‘নিশিপদ্ম’-এর সঙ্গে গানটির নাম জুড়ে যাওয়া পরবর্তী সময়ের তথ্যভ্রান্তি।

কর্মজীবন ও অর্জন এক নজরে

ক্ষেত্র নির্বাচিত তথ্য
উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের গান ‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু’—অগ্নিপরীক্ষা; ‘ওগো তুমি যে আমার’—হারানো সুর; ‘এ শুধু গানের দিন’—পথে হল দেরি; ‘এই রাত তোমার আমার’—দীপ জ্বেলে যাই; ‘আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা’—সাগরিকা; ‘জীবন খাতার প্রতি পাতায়’—দেয়া-নেয়া; ‘মুছে যাওয়া দিনগুলি’—লুকোচুরি; ‘হাজার টাকার ঝাড়বাতিটা’—স্ত্রী
বহুলপ্রিয় অন্যান্য গান ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’, ‘অলির কথা শুনে বকুল হাসে’, ‘আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে’, ‘মেঘ কালো আঁধার কালো’
প্রধান সুরকার-সহযোগী নচিকেতা ঘোষ, রবীন চট্টোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, অনুপম ঘটক, সুধীরলাল চক্রবর্তী, সত্য চৌধুরী, ভক্তিময় দাশগুপ্ত, অপরেশ লাহিড়ী, রাহুল দেববর্মণ প্রমুখ
উল্লেখযোগ্য কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, শ্যামল মিত্র, আরতি মুখোপাধ্যায়, আশা ভোঁসলে, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ
বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্টস’ অ্যাসোসিয়েশনের সেরা গীতিকার ১৯৬২—স্বরলিপি; ১৯৬৪—পলাতক (যৌথ); ১৯৬৮—অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি; ১৯৭৪—বনপলাশীর পদাবলী; ১৯৭৬—সন্ন্যাসী রাজা; ১৯৮৭—অনুরাগের ছোঁয়া, মরণোত্তর

 

আড্ডার টেবিলে সময়ের দীর্ঘ ছায়া

গৌরীপ্রসন্নের সমস্ত গানের মধ্যে ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ঘটনা। কারণ এখানে প্রেমিক-প্রেমিকা নেই, সিনেমার পরিস্থিতিও নেই। আছে বন্ধুদের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, সময়ের হাতে মানুষের ছড়িয়ে পড়া, একসঙ্গে কাটানো বিকেলগুলির আর ফিরে না-আসা।

গানটির জন্মও আড্ডা থেকেই। নচিকেতা ঘোষের ছেলে সুপর্ণকান্তি ঘোষের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, একদিন বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে তাঁর আড্ডা নিয়ে কথার খোঁচাখুঁচি থেকেই কফি হাউসকে বিষয় করে গান লেখার চ্যালেঞ্জ আসে। গৌরীপ্রসন্ন প্রথম কয়েকটি পঙ্‌ক্তি তখনই ভেবে ফেলেন; পরে পুরো গান সম্পূর্ণ হয়। শেষ স্তবকটি চিকিৎসার পথে হাওড়া স্টেশনে বসে লিখে সুপর্ণকান্তির কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার স্মৃতিও তিনি বর্ণনা করেছেন।

গানটির কৃতিত্বের বড় অংশ তার নির্দিষ্টতার মধ্যে। মঈদুল, নিখিলেশ, সুজাতা—মানুষগুলির নিজস্ব জীবন আছে; অথচ গান শেষ হওয়ার আগেই তারা শ্রোতার নিজের পরিচিত মানুষ হয়ে যায়। যে কোনো শহরের, যে কোনো প্রজন্মের হারিয়ে যাওয়া আড্ডা এই একটি কফি হাউসের মধ্যে আশ্রয় পায়।

বিবিসি বাংলা ২০০৬ সালে শ্রোতাদের ভোটে সর্বকালের সেরা ২০টি বাংলা গানের তালিকা তৈরি করেছিল; ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ সেখানে চতুর্থ স্থান পায়।

Gouriprasanna Majumdar Legacy

দুই বাংলার মাঝখানে একটি জন্মভূমি

গৌরীপ্রসন্নের জীবনকে ভারত ও বাংলাদেশের আধুনিক ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। তাঁর শিকড় পাবনায়, শিল্পীজীবনের কেন্দ্র কলকাতায়।

ভৌগোলিক দূরত্ব তাঁর পাবনার সাথে সম্পর্ক মুছে দেয়নি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সেই সম্পর্ককে নতুন অর্থ দেয়। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের দিনগুলিতে তিনি লেখেন ‘শোন একটি মুজিবরের থেকে’। অংশুমান রায়ের কণ্ঠে গানটি মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে; মুজিবনগরে অস্থায়ী সরকারের শপথ অনুষ্ঠানেও গানটি বাজানো হয়েছিল বলে একাধিক সূত্রে উল্লেখ আছে।

বাংলাদেশ বেতারের জন্য তাঁর লেখা ‘মাগো ভাবনা কেন’– জন্মভূমির সঙ্গে তাঁর আবেগগত যোগের সাক্ষ্য হয়ে আছে।

এখানে গৌরীপ্রসন্নের গান এক অন্য মাত্রা পায়। এত দিন প্রেমে মানুষকে কাছাকাছি এনেছে তাঁর শব্দ; এবার সেই শব্দ একটি জাতির সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হল। একজন শিল্পীর জন্মভূমি কেবল জন্মসনদের ঠিকানা নয়—কখনও বহু দূরে থেকেও তার ইতিহাস এসে শিল্পীর কলম ধরে।

অসুখের ভিতরেও কলমের আলো

জীবনের শেষ দশকটি গৌরীপ্রসন্নের জন্য ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠেছিল। প্রায় দশ বছর ক্যানসারের সঙ্গে তাঁর লড়াই করেছেন। শরীর ভেঙেছে, চিকিৎসা চলেছে, অথচ লেখা থামেনি। ১৯৮৬ সালের মে মাসেও শ্যামল মিত্রের জন্য গান লিখেছিলেন। ২৫ জুন চিকিৎসার জন্য তাঁকে বোম্বে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালেও তিনি গান লিখেছেন বলে জানা যায়।

২০ আগস্ট ১৯৮৬ তাঁর মৃত্যু হয়।

যাঁকে আড়াল করেছে নিজেরই গান

গৌরীপ্রসন্নের জীবন নিয়ে ভাবতে গেলে একটি পুরোনো সাংস্কৃতিক অবিচারের কথায় এসে পৌঁছতে হয়—বাংলা গান গীতিকারকে কতটা মনে রেখেছে?

এই প্রশ্ন তাঁর নিজের মনেও ছিল। জীবনের শেষ দিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন যে কাব্যসাহিত্যের ইতিহাসে গীতিকারদের যথাযথ স্থান দেওয়া হয় না; অজয় ভট্টাচার্য, শৈলেন রায়, মোহিনী চৌধুরীর মতো গীতিকবিদের সাহিত্যপ্রতিভার স্বীকৃতি নিয়েও তাঁর আক্ষেপ ছিল। সেই সাক্ষাৎকারের বক্তব্য আজ পড়লে মনে হয়, তিনি যেন নিজের ভবিষ্যৎ বিস্মৃতির কথাও বলে গিয়েছিলেন।

জনপ্রিয় গান কখনও কখনও তার লেখককেই ঢেকে দেয়। ‘অলির কথা শুনে বকুল হাসে’ এত সহজে প্রকৃতির নিজস্ব কথা বলে মনে হয় যে লেখকের উপস্থিতি চোখে পড়ে না। ‘আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে’ যেন বহুকাল ধরে বাংলা গানেরই আত্মকথা। ‘মেঘ কালো আঁধার কালো’ শুনলে শব্দগুলি আলাদা করে সাহিত্য হিসেবে নিজেদের দাবি জানায় না; তারা সুরের সঙ্গে মিশে যায়। আর এই মিশে যাওয়াটিই একজন বড় গীতিকারের সবচেয়ে আশ্চর্য সাফল্য—এবং কখনও তাঁর বিস্মৃতির কারণও।

তাঁর জন্মভূমিতেও সেই বিস্মৃতির ছাপ স্পষ্ট। পাবনার গোপালনগরে তাঁর পৈতৃক ভিটার কোনো যথাযথ স্মৃতিচিহ্ন আজ আর নেই। মজুমদার পরিবারের জমির একটি অংশে বর্তমানে ফরিদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স; স্থানীয় স্মৃতিতে তাঁর বাড়ির কথা থাকলেও সেখানে তাঁর নামে স্মৃতিফলক বা স্থায়ী সংগ্রহশালা নেই।

এই অনুপস্থিতি কেবল একজন শিল্পীর স্মৃতির প্রশ্ন নয়। এটি আমাদের সাংস্কৃতিক অভ্যাসেরও আয়না। গায়কের মুখ দৃশ্যমান, অভিনেতার মুখ দৃশ্যমান; গীতিকার শব্দের আড়ালে থাকেন। অথচ গান পুরোনো হলে প্রথমে দৃশ্য ঝাপসা হয়, বাদ্যযন্ত্রের বিন্যাসও যুগের চিহ্ন বহন করতে শুরু করে, শেষ পর্যন্ত অনেক সময় কথাই সবচেয়ে দীর্ঘ জীবন পায়।

গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার তাই বাংলা গানের অতীতের কোনো সোনালি ফ্রেমে আটকে থাকা নাম নন। বন্ধুত্ব হারানোর ভাষা যত দিন মানুষের দরকার হবে, ‘কফি হাউস’ নতুন শ্রোতা পাবে। প্রেমের কাছে মানুষ যত দিন নিজের ভাষাকে অপ্রতুল মনে করবে, তাঁর বহু গান ধার দেবে শব্দ। আর বাঙালি যত দিন নিজের সংগীত-ইতিহাস নতুন করে পড়বে, তত দিন আবিষ্কার করতে হবে—আমাদের বহুচেনা আবেগগুলির কতখানি এক নেপথ্যচারী কবির হাতে ভাষা পেয়েছিল।

গৌরীপ্রসন্ন নিজে একদিন আক্ষেপ করেছিলেন, গীতিকাররা সাহিত্যের ইতিহাসে যথেষ্ট জায়গা পান না। তাঁর মৃত্যুর চার দশক পরে সেই আক্ষেপের উত্তর দেওয়ার দায় এখন আমাদের। গানগুলি ইতিমধ্যেই নিজেদের জীবন অর্জন করেছে। বাকি আছে তাদের স্রষ্টাকে সেই জীবনের সমান মর্যাদায় ফিরিয়ে আনা—বাংলা গানের ইতিহাসে, বাংলা সাহিত্যের আলোচনায়।

এখন তাই কাজ কেবল তাঁর গান আবার বাজানো নয়। গীতিকারের নামটিও গানের সঙ্গে উচ্চারণ করতে শেখা দরকার। তাঁর পাণ্ডুলিপি, সাক্ষাৎকার, রেকর্ড, চলচ্চিত্রসংক্রান্ত দলিল, বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক—এসব যত্নে সংরক্ষণ করা দরকার। পাবনার জন্মভিটায় একটি স্মৃতিফলক বা সংগ্রহশালা তৈরি হওয়া কেবল শ্রদ্ধার আনুষ্ঠানিকতা হবে না; সেটি হবে সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ঋণস্বীকার।

সর্বশেষ