যুক্তি, ভাষা ও বিদ্রোহ: হুমায়ুন আজাদের সাহিত্যভুবন

সর্বাধিক আলোচিত

শ্রাবণের দুপুরে পুরোনো বইয়ের পাতা খুললে একধরনের গন্ধ ওঠে—কাগজ, কালি আর সামান্য স্যাঁতসেঁতে সময়ের গন্ধ। বাইরে বৃষ্টি পড়ে। জানালার কাচে জলের রেখা নামে। এমন একটি দুপুরে হুমায়ুন আজাদের বই খুললে মনে হয়, পাতার ভেতরে বৃষ্টির শান্ত শব্দ নেই; আছে তীক্ষ্ণ কোনো প্রশ্নের শব্দ। শব্দটি কখনো ভাষা নিয়ে, কখনো কবিতা নিয়ে, কখনো আমাদের বহুদিনের অভ্যাস নিয়ে। তিনি যেন পাঠকের সামনে একটি বাক্য রেখে জানতে চান—এভাবেই কেন? অন্যভাবে ভাবা যাবে না কেন?

হুমায়ুন আজাদকে কেবল কবি বললে তাঁর একটি অংশ দেখা হয়। ঔপন্যাসিক বললেও অসম্পূর্ণ থেকে যান। ভাষাবিজ্ঞানী, গবেষক, অধ্যাপক, সমালোচক—প্রতিটি পরিচয়ই সত্য, অথচ একা কোনো পরিচয় তাঁকে ধারণ করতে পারে না। তাঁর সাহিত্যভুবনের কেন্দ্রে ছিল ভাষা; আর সেই ভাষার পেছনে ছিল প্রশ্ন করার এক প্রবল অভ্যাস। ব্যাকরণের বাক্য থেকে কবিতার পঙ্‌ক্তি পর্যন্ত তিনি যেন বারবার দেখতে চেয়েছেন—প্রচলিত কাঠামোর নিচে আরেকটি কাঠামো লুকিয়ে আছে কি না।

আমার কাছে তাঁর সবচেয়ে আকর্ষণীয় পরিচয় সম্ভবত এখানেই। তিনি ভাষাকে ভালোবেসেছেন, কিন্তু ভাষার সামনে নতজানু হননি। সাহিত্যকে ভালোবেসেছেন, কিন্তু সাহিত্যের প্রতিষ্ঠিত ভঙ্গিকেও প্রশ্ন করতে দ্বিধা করেননি।

এক নজরে হুমায়ুন আজাদ

হুমায়ুন আজাদের জীবনপথটি একই সঙ্গে সাহিত্য ও উচ্চতর ভাষাগবেষণার পথ। বিক্রমপুরের গ্রাম থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সেখান থেকে এডিনবরা—তারপর আবার বাংলাদেশের শ্রেণিকক্ষ ও লেখার টেবিল।

বিষয় তথ্য
জন্ম ২৮ এপ্রিল ১৯৪৭
জন্মস্থান রাড়িখাল, বিক্রমপুর; বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলা
জন্মনাম হুমায়ুন কবির; ১৯৮৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর আইনগতভাবে হুমায়ুন আজাদ নাম গ্রহণ করেন
মাধ্যমিক শিক্ষা স্যার জগদীশচন্দ্র বসু ইনস্টিটিউশন; মাধ্যমিক পরীক্ষা ১৯৬২
উচ্চমাধ্যমিক ঢাকা কলেজ; ১৯৬৪
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য; স্নাতক সম্মান ১৯৬৭, স্নাতকোত্তর ১৯৬৮
পিএইচডি এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়, ভাষাবিজ্ঞান, ১৯৭৬; অভিসন্দর্ভ Pronominalization in Bengali
শিক্ষকতার শুরু চট্টগ্রাম কলেজ, ১৯৬৯
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭০; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭২
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান ১ নভেম্বর ১৯৭৮; অধ্যাপক ১৯৮৬
উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ১৯৮৬; মরণোত্তর একুশে পদক ২০১২
শেষ গবেষণা-পর্ব ২০০৪ সালে জার্মান পেনের গবেষণা-বৃত্তি নিয়ে হাইনরিখ হাইনের জীবন ও কবিতা নিয়ে কাজের জন্য জার্মানি যান
মৃত্যু ১২ আগস্ট ২০০৪, মিউনিখ, জার্মানি

রাড়িখাল থেকে ভাষার গভীরে

Humayun Azad at A Glance

১৯৪৭ সালের ২৮ এপ্রিল বিক্রমপুরের রাড়িখালে তাঁর জন্ম। বাবা আবদুর রশিদ ছিলেন শিক্ষক, মা জোবেদা খাতুন গৃহিণী। গ্রামের সেই পরিবেশ থেকে শুরু হওয়া শিক্ষাজীবন তাঁকে প্রথমে স্যার জগদীশচন্দ্র বসু ইনস্টিটিউশন, পরে ঢাকা কলেজ এবং শেষ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে নিয়ে যায়। ১৯৬৭ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক সম্মান এবং পরের বছর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিভিন্ন জীবনীসূত্রে দুটি পরীক্ষাতেই তাঁর কৃতিত্বের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

এই সময়ের হুমায়ুন আজাদকে কল্পনা করলে একটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়ে। যে মানুষ পরে বাংলা ভাষার বাক্যগঠন নিয়ে অত্যন্ত কারিগরি গবেষণা করবেন, তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু সাহিত্য পড়ে। অর্থাৎ তাঁর কাছে ভাষা প্রথমে কেবল ধ্বনি, রূপ কিংবা বাক্যতত্ত্বের বিষয় ছিল না; ভাষা ছিল কবিতারও উপাদান। সম্ভবত এ কারণেই পরবর্তী সময়ে তাঁর ভাষাবিজ্ঞানের বইয়েও কোথাও কোথাও দেখা যায় ব্যাখ্যার স্বচ্ছতা, আর সাহিত্যবিষয়ক গদ্যে দেখা যায় বিশ্লেষকের শৃঙ্খলা।

১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম কলেজে শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন, পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। ১৯৭৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেওয়া এবং ১৯৮৬ সালে অধ্যাপক হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর দীর্ঘ বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের কেন্দ্রে এসে দাঁড়ায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য।

কিন্তু এর মাঝখানে ঘটে যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধিক যাত্রা—এডিনবরা।

এডিনবরায় একটি বাংলা বাক্যের অনুসন্ধান

১৯৭৬ সালে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভের নাম ছিল Pronominalization in Bengali। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা-আর্কাইভে এটি আজও তাঁর জন্মনাম ‘H. Kabir’-এর অধীনে সংরক্ষিত। গবেষণাটি ছিল ভাষাবিজ্ঞানের; বিশেষ করে বাংলা সর্বনাম ও বাক্যগঠনের বিশ্লেষণ এর কেন্দ্রে ছিল। ১৯৮৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অভিসন্দর্ভটির সংশোধিত বইরূপ প্রকাশিত হয়। গ্রন্থাগারিক নথিতে বইটির বিষয় হিসেবে বাংলা সর্বনাম, বাক্যতত্ত্ব এবং সৃষ্টিশীল ব্যাকরণের উল্লেখ রয়েছে।

এই কাজটির গুরুত্ব বুঝতে গেলে বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে আমাদের পরিচিত অভিজ্ঞতার কথা ভাবা যায়। দীর্ঘকাল সাধারণ শিক্ষায় ব্যাকরণ মানেই ছিল পদ, কারক, বিভক্তি, সন্ধি, সমাস কিংবা ‘শুদ্ধ’ বাক্যের নিয়ম। কিন্তু আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান আরেকটি প্রশ্ন তোলে—মানুষ কীভাবে অসংখ্য নতুন বাক্য তৈরি করতে পারে? একটি বাক্যের দৃশ্যমান শব্দগুলোর নিচে কী ধরনের কাঠামো কাজ করে? শব্দের অবস্থান বদলালে অর্থ ও ব্যাকরণগত সম্পর্ক কেন বদলে যায়?

হুমায়ুন আজাদের গবেষণা বাংলা ভাষাকে এই আধুনিক বাক্যতাত্ত্বিক আলোচনার ভেতরে স্থাপন করার প্রচেষ্টার অংশ। তাঁর কাজকে ঘিরে রূপান্তরমূলক-সৃষ্টিশীল ব্যাকরণের প্রভাব স্পষ্ট; Pronominalization in Bengali-এর বিষয়বিন্যাসেও সেই আধুনিক বাক্যতাত্ত্বিক কাঠামোর উপস্থিতি নথিভুক্ত।

এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত হয় বাক্যতত্ত্ব। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস প্রশাসন একাডেমির গ্রন্থাগার-তালিকায় প্রথম প্রকাশের বছর ১৯৮৪ এবং বিষয় হিসেবে বাংলা ব্যাকরণের উল্লেখ রয়েছে। বইটি বাংলা বাক্যকে কেবল শুদ্ধ-অশুদ্ধের বিচারে না দেখে তার গঠন ও অন্তর্নিহিত নিয়ম বিশ্লেষণের দিকে পাঠককে নিয়ে যায়।

ভাবা যায়, একজন কবি দিনের এক সময়ে কবিতার পঙ্‌ক্তির ভেতর সৌন্দর্য খুঁজছেন, আর অন্য সময়ে একই ভাষার একটি সর্বনাম ঠিক কোন নিয়মে বাক্যের অন্য অংশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ছে, তা বিশ্লেষণ করছেন। এই দুই কাজ কি সত্যিই এত দূরের?

হুমায়ুন আজাদের ক্ষেত্রে সম্ভবত নয়।

বাংলা ভাষাকে গবেষণাগার থেকে পাঠকের টেবিলে

তাঁর ভাষাবিজ্ঞানের কাজ Pronominalization in Bengali বা বাক্যতত্ত্ব-এ থেমে থাকেনি। বাংলা ভাষার শত্রুমিত্র প্রকাশিত হয় ১৯৮৩ সালে। তিনি সম্পাদনা করেন দুই খণ্ডের বাংলা ভাষা—প্রথম খণ্ড ১৯৮৪ এবং দ্বিতীয় খণ্ড ১৯৮৫। পরে আসে তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান ১৯৮৮ সালে এবং অর্থবিজ্ঞান ১৯৯৯ সালে। বাংলা পিডিয়ার জীবনীতে এসব গ্রন্থ তাঁর ভাষাবিজ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে নথিভুক্ত।

কিন্তু তাঁর আরেকটি কাজ ছিল কঠিন বিষয়কে সাধারণ পাঠকের কাছে নিয়ে যাওয়া। কতো নদী সরোবর বা বাংলা ভাষার জীবনী সেই প্রচেষ্টার সুন্দর উদাহরণ। সেখানে ভাষার ইতিহাস নিছক সাল-তারিখের সারি হয়ে থাকে না; শব্দেরও যেন জীবন আছে, যাত্রা আছে, পরিবর্তন আছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি পুনর্মূল্যায়নেও বইটির এই গল্পবলিয়ে ব্যাখ্যাভঙ্গির কথা তুলে ধরা হয়েছে—ধ্বনি ও শব্দের পরিবর্তনের মতো বিষয়কেও তিনি পাঠযোগ্য বর্ণনায় রূপ দিয়েছেন।

অর্থাৎ তাঁর ভাষাবিজ্ঞানচর্চার দুটি মুখ ছিল। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারের—পরিভাষা, তত্ত্ব, বাক্যগঠন ও বিশ্লেষণের। অন্যটি সাধারণ পাঠকের—যেখানে বাংলা ভাষার দীর্ঘ জীবনকে গল্পের মতো করে বোঝানো যায়।

এই দুটির মাঝখানেই সম্ভবত হুমায়ুন আজাদের ভাষাচিন্তার বিশেষত্ব।

কবিতা যখন মসৃণ পথে হাঁটতে চায় না

ভাষাবিজ্ঞানী হুমায়ুন আজাদের পাশেই খুব অল্প বয়স থেকে ছিলেন কবি হুমায়ুন আজাদ। প্রথম কাব্যগ্রন্থ অলৌকিক ইস্টিমার প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে। এরপর জ্বলো চিতাবাঘ, সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে, যতোই গভীরে যাই মধু যতোই উপরে যাই নীল, আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে—ক্রমে তাঁর কাব্যজগতের পরিচিত মানচিত্র তৈরি করে।

তাঁর কবিতা পড়লে প্রথমেই বোঝা যায়, তিনি কেবল কোমলতার কবি হতে চাননি। বাংলা কবিতার পরিচিত সৌন্দর্য, প্রেম, প্রকৃতি কিংবা বিষণ্নতার পাশে তিনি বসিয়েছেন ক্ষোভ, ব্যঙ্গ, হতাশা, নগরজীবন, সামাজিক অবক্ষয় এবং ব্যক্তিমানুষের অসহায়তা। কখনো বাক্য দীর্ঘ, কখনো ঘোষণার মতো সরাসরি। কখনো কাব্যিক ছবির মধ্যে হঠাৎ এসে পড়ে এমন একটি শব্দ, যা পাঠকের আরামের জায়গাটি ভেঙে দেয়।

সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণগুলোর একটি। ১৯৮৫ সালের এই কাব্যগ্রন্থের নামকবিতার শিরোনাম সময়ের সঙ্গে বাংলা জনপরিসরেও একটি বহুল ব্যবহৃত অভিব্যক্তিতে পরিণত হয়েছে বলে সমকালীন মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে।

কেন এমন হয়?

সম্ভবত কারণ, তাঁর কবিতায় বক্তব্য ও চিত্রকল্প পরস্পরকে আড়াল করে না। তিনি অনেক সময় কবিতাকে এতটা সরাসরি করেন যে সেটি প্রায় উচ্চারণে পরিণত হয়। আবার সেই সরাসরি বাক্যের পাশেই থাকে চাঁদ, বৃষ্টি, ধানক্ষেত, শরীর, শহর কিংবা কোনো আকস্মিক ব্যক্তিগত স্মৃতি। সুন্দর ও অস্বস্তিকর—দুটিকে পাশাপাশি রাখার এই প্রবণতা তাঁর কবিতাকে প্রচলিত সুশোভিত কাব্যভাষা থেকে আলাদা করেছে।

তাঁর কবিতায় তাই বিদ্রোহ বলতে শুধু কোনো বিষয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো বোঝায় না। কবিতাকে কী বলা যাবে, কোন শব্দ কবিতায় ঢুকতে পারবে, সৌন্দর্যের সঙ্গে কতটা কঠিন বাস্তবতা পাশাপাশি থাকতে পারে—এসব নিয়েও তাঁর পরীক্ষা চলেছে।

সাহিত্যকর্ম এক নজরে

গ্রন্থ ধরন প্রথম প্রকাশ
অলৌকিক ইস্টিমার কাব্যগ্রন্থ ১৯৭৩
জ্বলো চিতাবাঘ কাব্যগ্রন্থ ১৯৮০*
সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে কাব্যগ্রন্থ ১৯৮৫
যতোই গভীরে যাই মধু যতোই ওপরে যাই নীল কাব্যগ্রন্থ ১৯৮৭
আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে কাব্যগ্রন্থ ১৯৯০
কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু কাব্যগ্রন্থ ১৯৯৮
পেরোনোর কিছু নেই কাব্যগ্রন্থ ২০০৪
ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল উপন্যাস ১৯৯৪
সব কিছু ভেঙে পড়ে উপন্যাস ১৯৯৫
মানুষ হিশেবে আমার অপরাধসমূহ উপন্যাস ১৯৯৬
শুভব্রত, তার সম্পর্কিত সুসমাচার উপন্যাস ১৯৯৭
রাজনীতিবিদগণ উপন্যাস ১৯৯৮
কবি অথবা দণ্ডিত অপুরুষ উপন্যাস ১৯৯৯
নিজের সঙ্গে নিজের জীবনের মধু উপন্যাস ২০০০
ফালি ফালি ক’রে কাটা চাঁদ উপন্যাস ২০০১
শ্রাবণের বৃষ্টিতে রক্তজবা উপন্যাস ২০০২
১০,০০০, এবং আরো ১টি ধর্ষণ উপন্যাস ২০০৩
একটি খুনের স্বপ্ন উপন্যাস ২০০৪
যাদুকরের মৃত্যু গল্পগ্রন্থ ১৯৯৬
রবীন্দ্রপ্রবন্ধ: রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তা সাহিত্য-সমালোচনা/প্রবন্ধ ১৯৭৩
শামসুর রাহমান/নিঃসঙ্গ শেরপা সাহিত্য-সমালোচনা ১৯৮৩
শিল্পকলার বিমানবিকীকরণ ও অন্যান্য প্রবন্ধ প্রবন্ধ ১৯৮৮
ভাষা-আন্দোলন: সাহিত্যিক পটভূমি গবেষণা/প্রবন্ধ ১৯৯০
নারী গবেষণা ও প্রবন্ধ ১৯৯২
হুমায়ুন আজাদের প্রবচনগুচ্ছ প্রবচন/মননশীল গদ্য ১৯৯২
নরকে অনন্ত ঋতু প্রবন্ধ ১৯৯২
সীমাবদ্ধতার সূত্র প্রবন্ধ ১৯৯৩
আধার ও আধেয় প্রবন্ধ ও সমালোচনা ১৯৯৩
নির্বাচিত প্রবন্ধ প্রবন্ধসংকলন ১৯৯৯
Pronominalization in Bengali ভাষাবিজ্ঞান; পিএইচডি গবেষণার সংশোধিত গ্রন্থরূপ ১৯৮৩
বাঙলা ভাষার শত্রুমিত্র ভাষাবিজ্ঞান ১৯৮৩
বাক্যতত্ত্ব ভাষাবিজ্ঞান ১৯৮৪
বাঙলা ভাষা—প্রথম খণ্ড সম্পাদিত ভাষাবিজ্ঞান গ্রন্থ ১৯৮৪
বাঙলা ভাষা—দ্বিতীয় খণ্ড সম্পাদিত ভাষাবিজ্ঞান গ্রন্থ ১৯৮৫
তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান ভাষাবিজ্ঞান ১৯৮৮
অর্থবিজ্ঞান ভাষাবিজ্ঞান ১৯৯৯
লাল নীল দীপাবলি বা বাঙলা সাহিত্যের জীবনী কিশোরসাহিত্য/সাহিত্যের ইতিহাস ১৯৭৬
ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না কিশোরসাহিত্য ১৯৮৫
কতো নদী সরোবর বা বাঙলা ভাষার জীবনী কিশোরসাহিত্য/ভাষার ইতিহাস ১৯৮৭
আব্বুকে মনে পড়ে কিশোরসাহিত্য ১৯৮৯
বুকপকেটে জোনাকিপোকা কিশোরসাহিত্য ১৯৯৩
আমাদের শহরে একদল দেবদূত কিশোরসাহিত্য ১৯৯৬
অন্ধকারে গন্ধরাজ কিশোরসাহিত্য ২০০৩
আধুনিক বাঙলা কবিতা সম্পাদিত কাব্যসংকলন ১৯৯৪
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রধান কবিতা সম্পাদিত কাব্যসংকলন ১৯৯৭

কবিতা থেকে উপন্যাস: একই প্রশ্নের ভিন্ন শরীর

হুমায়ুন আজাদ উপন্যাস লেখা শুরু করেন তুলনামূলকভাবে পরে। ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল তাঁর প্রথম উপন্যাস হিসেবে নথিভুক্ত। পরের বছর আসে সব কিছু ভেঙে পড়ে। পরে মানুষ হিশেবে আমার অপরাধসমূহ, যাদুকরের মৃত্যু, কবি অথবা দণ্ডিত অপুরুষ, নিজের সঙ্গে নিজের জীবনের মধু, ফালি ফালি করে কাটা চাঁদসহ একের পর এক কথাসাহিত্য প্রকাশিত হয়।

তাঁর উপন্যাসেও একটি পরিচিত প্রবণতা ফিরে আসে—প্রচলিত সামাজিক ভাষার আড়ালে ব্যক্তিমানুষের অসঙ্গতি খুঁজে দেখা। অনেক সময় তাঁর চরিত্রের চেয়েও জোরালো হয়ে ওঠে বর্ণনাকারীর বিশ্লেষণী মন। ফলে উপন্যাস নিছক ঘটনা বলার জায়গা থাকে না; হয়ে ওঠে ধারণা, সম্পর্ক ও সামাজিক আচরণ পরীক্ষার ক্ষেত্র।

এই বৈশিষ্ট্য নিয়ে পাঠকের পছন্দ-অপছন্দ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু তাঁর স্বাতন্ত্র্য অস্বীকার করা কঠিন। তিনি বাজারের পরিচিত ছাঁচ মেনে নিজেকে তৈরি করেননি—সমকালীন সহকর্মীদের মূল্যায়নেও তাঁর আপসহীন ও প্রথাবহির্ভূত লেখকসত্তার কথা বারবার এসেছে।

Humayun Azad Legacy

প্রথাবিরোধিতা আসলে কী?

‘প্রথাবিরোধী’ শব্দটি হুমায়ুন আজাদের নামের সঙ্গে এতবার ব্যবহৃত হয়েছে যে শব্দটি প্রায় তাঁর পরিচয়ের অংশ হয়ে গেছে। কিন্তু সাহিত্যিক অর্থে প্রথাবিরোধিতা কী?

সবকিছুকে অস্বীকার করা?

সম্ভবত না।

বরং কোনো ধারণা বহুদিন ধরে প্রচলিত বলেই তাকে বিনা প্রশ্নে মেনে না নেওয়া। একটি ব্যাকরণের নিয়মকে আবার পরীক্ষা করা। প্রতিষ্ঠিত কোনো কবির মূল্যায়ন নতুন চোখে দেখা। কবিতায় ‘সুন্দর’ শব্দের পাশে অস্বস্তিকর বাস্তবতা বসানো। উপন্যাসের চরিত্রকে নৈতিকভাবে নিখুঁত না বানানো। কিংবা ভাষা সম্পর্কে জনপ্রিয় কোনো ধারণা তথ্যের আলোয় পুনর্বিবেচনা করা।

বাংলা পিডিয়া তাঁকে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ‘non-traditional’ বা প্রথাবহির্ভূত ও বহুমাত্রিক লেখকদের একজন হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং তাঁর সচেতনভাবে ছকবাঁধা চিন্তা এড়িয়ে চলার কথা উল্লেখ করেছে।

তাঁর সাহিত্যিক সাহসের আলোচনাটিকে এই জায়গাতেই রাখা যায়। তিনি প্রশ্নের অধিকারকে সাহিত্যের একটি মৌলিক শক্তি হিসেবে দেখিয়েছেন। তাঁর প্রশ্ন সব সময় পাঠককে স্বস্তি দেয় না। বরং অনেক সময় অস্বস্তিই তৈরি করে। কিন্তু সাহিত্য কি কেবল স্বস্তির জন্য?

নিষিদ্ধ গ্রন্থ: নথিভুক্ত তথ্য

  • নারীনিষিদ্ধ: ১৯ নভেম্বর ১৯৯৫। সরকারি আদেশে ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৯ক ধারার ক্ষমতা প্রয়োগ করে বইটি বাজেয়াপ্ত করা হয়; আদেশে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতি ও মৌলিক বিশ্বাসের পরিপন্থী বলে বিবেচিত কিছু বক্তব্য প্রকাশের কথা কারণ হিসেবে উল্লেখ ছিল। হুমায়ুন আজাদ নিষেধাজ্ঞাটি আদালতে চ্যালেঞ্জ করেন এবং ২০০০ সালে উচ্চ আদালত নিষেধাজ্ঞার আদেশ অবৈধ ঘোষণা করেন।

বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়ের অনলাইন সংগ্রহে ১৯৯৫ সালের অতিরিক্ত গেজেটের মাসভিত্তিক নথিও সংরক্ষিত রয়েছে।

একজন ভাষাবিজ্ঞানীর গদ্য কেন এত ধারালো

হুমায়ুন আজাদের গদ্যের শক্তির পেছনে তাঁর ভাষাবিজ্ঞানচর্চার কোনো ভূমিকা ছিল কি না—এটি নিশ্চিতভাবে পরিমাপ করা কঠিন। তবু তাঁর লেখা পড়লে একটি মিল চোখে পড়ে। ভাষাবিজ্ঞানী যেমন বাক্যের অপ্রয়োজনীয় অস্পষ্টতা সরিয়ে কাঠামো দেখতে চান, তাঁর বহু প্রবন্ধের গদ্যও তেমনি দ্রুত মূল বক্তব্যের দিকে এগিয়ে যায়।

বাক্য অনেক সময় ছোট নয়, কিন্তু উদ্দেশ্য পরিষ্কার। বিশেষণ আছে, ব্যঙ্গ আছে, কখনো প্রবল আবেগও আছে; তবু যুক্তির রেখাটি হারিয়ে যায় না। তাঁর বহুল আলোচিত প্রবচনগুচ্ছ সম্পর্কে অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম হুমায়ুন আজাদের রসবোধ ও ব্যঙ্গের শক্তির কথাও উল্লেখ করেছেন।

এখানে ভাষাবিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক যেন একই টেবিলে বসেন। একজন শব্দের গঠন পরীক্ষা করেন, আরেকজন শব্দের আঘাত।

বাংলা ভাষার ইতিহাস নিয়ে লিখতে গেলে তিনি গল্পকার হতে পারেন। কবিতায় যুক্তি হঠাৎ ছবিতে পরিণত হয়। আবার সাহিত্যসমালোচনায় কবির আবেগ সরিয়ে বিশ্লেষকের কণ্ঠ সামনে চলে আসে। একজন লেখকের মধ্যে এতগুলো স্বর থাকা সহজ নয়। আরও কঠিন হলো—স্বরগুলোকে আলাদা রেখেও তাদের একটি স্বাক্ষরের অধীনে রাখা।

হুমায়ুন আজাদ তা পেরেছিলেন।

শিক্ষক, গবেষক, লেখক—একই মানুষের তিনটি টেবিল

তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ—শিক্ষকতা তাঁর পেশা ছিল, কিন্তু গবেষণাও ছিল সেই পেশার স্বাভাবিক সম্প্রসারণ। তাঁর পিএইচডি, বাংলা ভাষার দুই খণ্ড সম্পাদনা, বাক্যতত্ত্ব ও অর্থবিজ্ঞানবিষয়ক কাজ এই বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক গবেষণাজীবনেরই সাক্ষ্য।

আবার একই মানুষ কিশোর পাঠকের জন্য লিখেছেন লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবনী, ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, কতো নদী সরোবর বা বাংলা ভাষার জীবনী, আব্বুকে মনে পড়ে, বুকপকেটে জোনাকিপোকা। বাংলা পিডিয়ায় তাঁর কিশোরসাহিত্যের এই ধারাটিরও বিশেষ উল্লেখ রয়েছে।

এখানে একটি আশ্চর্য ব্যাপার আছে। যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে জটিল বাক্যতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেছেন, তিনিই কিশোরের জন্য ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস সহজ করে লিখতে চেয়েছেন। জ্ঞান তাঁর কাছে সম্ভবত কেবল বিশেষজ্ঞের ঘরে আটকে থাকার জিনিস ছিল না। কঠিন বিষয়কে সহজ করা মানে তাকে হালকা করা নয়—বরং পাঠকের সামনে তার দরজাটি খুলে দেওয়া।

পুরস্কারের চেয়ে বড় যে উত্তরাধিকার

১৯৮৬ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান। ২০১২ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে সম্মানিত করা হয়। তাঁর ভাষা ও সাহিত্যচর্চার প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির গুরুত্বপূর্ণ দুটি চিহ্ন এগুলো।

কিন্তু একজন লেখকের উত্তরাধিকার কি পুরস্কারের তালিকায় ধরা যায়?

হুমায়ুন আজাদের ক্ষেত্রে সম্ভবত আরও কম।

তাঁর বড় উত্তরাধিকার একটি বিশেষ ভঙ্গি—ভাষাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা, প্রচলিত ধারণাকে পরীক্ষা করা, সাহিত্যকে প্রশ্নহীন ভক্তির বিষয় না বানানো। তিনি বাংলা ভাষার বাক্য ভেঙে তার নিয়ম খুঁজেছেন, আবার কবিতার প্রচলিত আরামও ভেঙেছেন। গবেষণায় যুক্তির শৃঙ্খলা আর কবিতায় স্বাধীনতার তাগিদ—এই দুই বিপরীত শক্তি তাঁর ভেতরে পাশাপাশি ছিল।

২০০৪ সালে জার্মান পেনের গবেষণা-বৃত্তি নিয়ে তিনি মিউনিখে যান জার্মান কবি হাইনরিখ হাইনের জীবন ও কবিতার বাংলা অনুবাদ নিয়ে কাজ করার উদ্দেশ্যে। সেখানেই ১২ আগস্ট তাঁর জীবনাবসান হয়। একটি অসমাপ্ত গবেষণার পাশে তখন থেমে যায় তাঁর ব্যক্তিগত সময়; কিন্তু বাংলা ভাষার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ কথোপকথন থেমে যায়নি।

শ্রাবণের বৃষ্টি আবারও জানালায় নামে। পুরোনো বইয়ের পাতায় কালি একটু বিবর্ণ হয়, কাগজ হলুদ হয়ে আসে। কিন্তু কিছু বাক্য সময়ের সঙ্গে মলিন না হয়ে বরং আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হুমায়ুন আজাদের সাহিত্যভুবনে ঢুকলে তাই শুধু একজন লেখককে পাওয়া যায় না; পাওয়া যায় ভাষাকে প্রশ্ন করার একটি পদ্ধতি। কবিতায় তিনি সৌন্দর্যের পাশে অস্বস্তি রেখেছেন, ভাষাবিজ্ঞানে অভ্যাসের পাশে বিশ্লেষণ, আর গদ্যে প্রতিষ্ঠিত উত্তরের পাশে একটি নতুন প্রশ্ন।

শেষ পর্যন্ত হয়তো তাঁর বিদ্রোহের সবচেয়ে স্থায়ী চিহ্ন সেখানেই—উচ্চকণ্ঠে নয়, একটি বাক্যের গভীরে। শব্দগুলো পরিচিত, ভাষাটিও আমাদেরই। শুধু তিনি বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, পরিচিত ভাষার ভেতরেও অচেনা চিন্তার জন্য অশেষ জায়গা রয়ে গেছে।

সর্বশেষ