আমি যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি, তখন জীবনের প্রথমবার কোনো মঞ্চ থেকে উচ্চস্বরে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার আবৃত্তি শুনেছিলাম। স্কুলের আর দশটা সাধারণ কাজী নজরুল ইসলাম জয়ন্তীর আয়োজন যেমন হয়—মঞ্চে টানানো সাদা পর্দা, ফুলের মালা আর মাইকের মৃদু ভোঁ ভোঁ শব্দ—সেদিনও তেমনই এক পরিবেশ ছিল। একটি ছেলে মঞ্চে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে কবিতাটি আবৃত্তি করছিল। সেই বয়সে আমি শব্দগুলোর অর্ধেক অর্থও বুঝিনি; এর দর্শন বা ঔপনিবেশিক রাজনীতির জটিলতা বোঝা তো অনেক দূরের কথা। কিন্তু আমি এর ধ্বনি বুঝতে পেরেছিলাম। শব্দের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক তীব্র আদিম গর্জন আমার বুকে এসে লেগেছিল। সেই স্মৃতিটা বহু বছর আমার মনের কোণে নিঃশব্দে জমা হয়ে ছিল।
স্মৃতিটি তীব্রভাবে ফিরে আসে যখন আমি খেয়াল করলাম—১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থান এবং তার পরবর্তী প্রায় প্রতিটি ক্ষোভের ঋতুতে বাঙালি কীভাবে ঘুরেফিরে সেই একই কবিতার কাছে ফিরে গেছে।
আমার প্রথম ধারণা হয়েছিল, এটা হয়তো বাঙালির নিছক এক অভ্যাসবশত নস্টালজিয়া। বাঙালি কাজী নজরুল ইসলামকে ভালোবাসে, তাই স্লোগানের খোঁজে অবচেতনভাবেই কাজী নজরুল ইসলামের পঙ্ক্তি আওড়ায়। কিন্তু এই উত্তরটা বড্ড সরল, আর এখন আমি এতে পুরোপুরি বিশ্বাস করি না। কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রয়াণের এই মাইলফলকে দাঁড়িয়ে যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন স্পষ্ট বুঝতে পারি—এই কবিতা ও কবির বারবার ফিরে আসার পেছনে রয়েছে সাহিত্যের এক অনন্য নির্মাণশৈলী। আর একই সাথে আমরা যেভাবে তাঁকে ব্যবহার করি, তা আমাদের নিজেদের সম্পর্কেও এক অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
‘দুখু মিয়া’ থেকে রণাঙ্গন

কাজী নজরুল ইসলামের দ্রোহ কোনো আরামদায়ক লাইব্রেরির নরম চেয়ারে বসে তৈরি হওয়া রোমান্টিক বিলাসিতা ছিল না। এই দ্রোহের জন্ম হয়েছিল জীবনের নির্মমতম বাস্তবতা থেকে।
চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জন্ম নেওয়া সেই ছেলেটির নাম পরিবার রেখেছিল ‘দুখু মিয়া’। কিশোর বয়সেই জীবিকার তাগিদে তিনি যোগ দিয়েছিলেন গ্রামীণ লোকনাট্য ‘লেটো’র দলে। এই লেটোর আসরই তাঁর ভেতর ছন্দ, সুর, তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ এবং তাৎক্ষণিক কবিতা রচনার সহজাত ক্ষমতা বুনে দিয়েছিল। এরপর আসানসোলের রুটির দোকানে কাজ করা থেকে শুরু করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দিয়ে সুদূর করাচি যাওয়া—কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের প্রতিটি বাঁক তাঁকে সাধারণ মেহনতি মানুষের মাটির সবচেয়ে কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল।
তিনি মাটি ও প্রান্তিক মানুষের ভাষা জানতেন। এলিট সমাজের কৃত্রিম ভদ্রতা তাঁর কলমে ছিল না; তাঁর শব্দে ছিল ঘাম, রক্ত আর অন্নহীন মানুষের ক্ষুধার জ্বালা।
‘বিদ্রোহী’ কেন কখনো পুরোনো হয় না? কবিতার অভ্যন্তরীণ জ্যামিতি
১৯২১ সালের ডিসেম্বরের এক রাতে তেইশ বছরের এক তরুণ পেন্সিল হাতে লিখে ফেললেন এক অভাবনীয় সৃষ্টি—’বিদ্রোহী’। ১৯২২ সালের শুরুতে ‘বিজলী’ পত্রিকায় এটি ছাপা হওয়ার সাথে সাথে চারদিকে যেন বিস্ফোরণ ঘটল।
মঞ্চে যে ছেলেটি কবিতাটি পড়ছিল, সে কিন্তু পুরো কবিতাটি পড়েনি। সত্যি বলতে, কেউই সাধারণ আসরে পুরো কবিতাটি পড়ে না। সে হয়তো বড়জোর তিরিশটি লাইন পড়ে থেমে গিয়েছিল, অথচ মনে হচ্ছিল যেন পুরো কবিতাটিই সে শুনিয়ে গেল। পৃথিবীর অধিকাংশ বড় কবিতাই মাঝখান থেকে কেটে দিলে তাদের রস বা কাঠামো ভেঙে পড়ে। আপনি কোনো সনেটের মাঝের চার লাইন আবৃত্তি করে দাবি করতে পারেন না যে কাজটি সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু ‘বিদ্রোহী’কে প্রায় যেকোনো জায়গা থেকে কাটা যায়, যেকোনো স্তবক দিয়ে শুরু বা শেষ করা যায়—তবুও তা শ্রোতার বুকে তীরের মতো বিঁধবে।
এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এর পেছনে রয়েছে কবিতাটির তিনটি অনন্য নির্মাণকৌশল:
-
উত্তম পুরুষের সর্বনাম (“আমি”): কবিতাটি বলছে “আমি”। এটি এমন কোনো তাত্ত্বিক বক্তৃতা নয় যে “জনগণের জেগে ওঠা উচিত” বা “আমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।” এটি স্রেফ বলে—”আমি চির-উন্নত শির!” যে-ই এই কবিতাটি উচ্চকণ্ঠে পড়ে, পড়ার সেই মুহূর্তটুকুর জন্য সে নিজেই বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। একটি বিশাল জমায়েত যখন একসাথে এই কবিতা পড়ে, তখন তারা কোনো নেতার ভাষণ শোনা নিষ্ক্রিয় শ্রোতা থাকে না—তারা প্রত্যেকে রূপ নেয় একেকজন স্বশাসিত ব্যক্তিস্বত্বায়।
-
হাতে তৈরি ও ভারী শব্দের বিন্যাস: শব্দগুলো এমনভাবে গাঁথা যেন তা খোলা মাঠের তুমুল কোলাহল ভেদ করে বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। মোলায়েম ও দীর্ঘ ছন্দ মিছিলে হারিয়ে যায়, কিন্তু নজরুলের ছোট ও প্রবল ছন্দ গতির সঞ্চার করে।
-
নির্দিষ্ট শত্রুর অনুপস্থিতি: কবিতাটিতে কোনো নির্দিষ্ট ব্রিটিশ অফিসারের নাম নেই, কোনো রাজনৈতিক দলের নাম নেই, কোনো নির্দিষ্ট তারিখ বা ঔপনিবেশিক আইনের উল্লেখ নেই। এটি ক্ষমতার অন্যায্য আধিপত্যের প্রতি ক্ষুব্ধ, কিন্তু কোনো একক চেহারার প্রতি নয়। ১৯২২ সালে অনেকে একে কবিতার ত্রুটি মনে করেছিলেন; কিন্তু কালান্তরে দেখা গেল, এটাই এর সবচেয়ে বড় অমরত্ব।
সাংবাদিকতার বারুদ ও আদালতের কাঠগড়া
কাজী নজরুল ইসলাম কেবল কবিতার পাতায় আগুন জ্বালিয়ে ক্ষান্ত হননি; তিনি সাংবাদিকতাতেও হাজির হয়েছিলেন এক ধূমকেতুর মতো। তাঁর সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ ও পরবর্তীতে ‘লাঙ্গল’ পত্রিকা ব্রিটিশ রাজের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল।
‘ধূমকেতু’র পাতায় প্রকাশিত ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার কারণে যখন তাঁকে রাজদ্রোহের অভিযোগে বন্দি করা হলো, তখন প্রেসিডেন্সি জেল ও আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ অনশন চালিয়েছিলেন। আর আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি যে ঐতিহাসিক বক্তব্য দিয়েছিলেন—’রাজবন্দীর জবানবন্দী’—তা বিশ্বসাহিত্যের রাজনৈতিক গদ্যের এক অনন্য স্মারক। মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি ঔপনিবেশিক বিচারককে স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে, বিচারকের পেছনে রয়েছে রাজদণ্ড, আর কবির পেছনে স্বয়ং সত্যের আসন।
রাষ্ট্র, ইতিহাস ও সুরের রণধ্বনি: ১৯৫২ ও ১৯৭১
১৯৪৭-এর দেশভাগের পর পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামো নজরুলকে বাদ দেয়নি; বরং তারা এক ধূর্ত কৌশল নিয়েছিল। তারা নজরুলকে ‘মুসলিম কবি’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করে রবীন্দ্রনাথকে রাষ্ট্রীয় মাধ্যম থেকে দূরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু শাসকগোষ্ঠী বুঝতেই পারেনি যে, অনুগত প্রজা বানানোর উদ্দেশ্যে তারা এমন এক কবির সৃষ্টি তুলে দিচ্ছে, যাঁর প্রতিটি অক্ষর মসনদে বসে থাকা শাসকের গদি উল্টে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে নজরুল সরবরাহ করেছিলেন প্রতিবাদের এক অমোঘ নৈতিক ভাষা। আর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ তাঁর সৃষ্টিগুলোকে পরিণত করেছিল মুক্তিকামী মানুষের প্রধান অস্ত্র হিসেবে।
-
১৯৭১ সালের ২৫ মে, নজরুলের জন্মদিনে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কলকাতা পর্বের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
-
‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ এবং ‘চল চল চল’ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিদিনের উদ্দীপনা জুগিয়েছিল।
-
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি নবগঠিত বাংলাদেশ সরকারের প্রথম বৈঠকেই ‘চল চল চল’ গানটিকে জাতীয় রণসংগীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে কবিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ঢাকায় আনা হয় এবং ১৯৭৬ সালে দেওয়া হয় নাগরিকত্ব। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিক হলো—যে কবির বজ্রকণ্ঠের ওপর ভর করে একটি জাতি মুক্তির লড়াই লড়ল, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা যাকে সশরীরে পেল, তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নির্বাক। ১৯৪২ সালে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে ‘পিকস ডিজিজ’ (Pick’s disease) নামক দুরারোগ্য মস্তিষ্কের ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে তিনি চিরতরে ভাষা ও স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছিলেন। ধানমন্ডির বাসভবনে কাটানো জীবনের শেষ চারটি বছর তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ দেখে গেছেন ঠিকই, কিন্তু এ নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারেননি।
সুরের মহাসমুদ্র ও গভীর প্রেম

কাজী নজরুল ইসলাম কে শুধু দ্রোহের ফ্রেমে বাঁধলে তাঁর প্রতি ঘোর অবিচার করা হয়। মাত্র দুই দশকের সৃজনশীল সময়ে তিনি রচনা ও সুরারোপ করেছেন প্রায় চার হাজার গান—যা সংগীতির ইতিহাসে এক বিস্ময়কর রেকর্ড।
┌─── প্রেম ও বিরহ (গজল, আধুনিক গান)
│
├─── সাম্য ও দ্রোহ (রণসংগীত, গণসংগীত)
কাজী নজরুল ইসলাম ─┤
├─── আধ্যাত্মিক সুফি ধারা (হামদ, নাত, ইসলামিক গান)
│
└─── সনাতন আধ্যাত্মিক ধারা (শ্যামাসংগীত, কীর্তন, ভজন)
তিনিই প্রথম বাংলা সংগীতে পারস্যের ‘গজল’ আঙ্গিক সফলভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। রাগসংগীতে তাঁর দখল ছিল এতটাই প্রখর যে তিনি ‘বেণীমাধব’ ও ‘মীনাক্ষী’র মতো নতুন রাগেরও জন্ম দিয়েছিলেন। যে মানুষটি “কারার ঐ লৌহ কপাট” লিখে লৌহকপাট ভাঙার ডাক দিয়েছেন, সেই একই মানুষ লিখেছেন “মোর প্রিয়া হবে এসো রানী, দেব খোঁপায় তারার ফুল” কিংবা “শূন্য এ বুকে পাখি মোর আয়”-এর মতো অপার কোমল ও বিরহী গান।
তিনি এক হাতে লিখেছেন শ্যামাসংগীত ও ভজন, অন্য হাতে রচনা করেছেন কালজয়ী হামদ ও নাত। কোনো রকম ভণ্ডামি বা আপস ছাড়া এই দুই ভিন্ন ধারাকে নিজের আত্মায় ধারণ করার মতো অসাম্প্রদায়িক মনস্তত্ত্ব বাংলা সাহিত্যে বিরল।
বিশ্বসাহিত্য ও অনুবাদের সেতুবন্ধন
নজরুল কেবল মৌলিক সৃষ্টিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তিনি আন্তর্জাতিক সাহিত্যের অমূল্য রত্নগুলোকে বাঙালির কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন।
-
রুবাইয়াত অনুবাদ: ফারসি ভাষায় অগাধ পাণ্ডিত্যের কারণে তিনি হাফিজ ও ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াত সরাসরি মূল ফারসি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেন।
-
কাব্য আমপারা: তিনি পবিত্র কোরআনের ৩০তম পারার (আমপারা) সুমধুর কাব্যানুবাদ করেছিলেন, যা তাঁর আধ্যাত্মিক ও ভাষাগত দক্ষতার এক অনন্য নিদর্শন।
চলচ্চিত্র, নাটক ও সম্প্রচার মাধ্যম
বিদ্রোহী পরিচয়ের আড়ালে তাঁর এক অসাধারণ বহুমুখী সৃজনশীল সত্তা লুকিয়ে ছিল, যা সে যুগে বেশ অভাবনীয় ছিল।
-
পর্দায় নজরুল: ১৯৩৪ সালে ‘ধ্রুব’ চলচ্চিত্রে তিনি নারদের চরিত্রে অভিনয় করেন। চলচ্চিত্রটির সংগীত পরিচালনা এবং পরিচালনার দায়িত্বেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
-
সুরকার ও কাহিনিকার: ‘বিদ্যাপতি’, ‘গোরা’ এবং ‘সাপুড়ে’র মতো সাড়া জাগানো চলচ্চিত্রে তিনি কাহিনিকার, গীতিকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন।
-
গ্রামোফোন কোম্পানি: হিজ মাস্টার্স ভয়েস (HMV) এবং মেগাফোন রেকর্ডসে কাজ করার সময় তিনি বাংলার সংগীত জগৎকে প্রায় একক হাতে আধুনিকায়ন ও মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
শিশুসাহিত্য ও বৈশ্বিক চেতনা
-
শিশুদের জন্য নির্মল আনন্দ: যিনি ‘বিদ্রোহী’ বা ‘প্রলয়োল্লাস’-এর মতো আগ্নেয়গিরি সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আবার শিশুদের জন্য লিখেছেন ‘খুকী ও কাঠবিড়ালী’, ‘লিচু-চোর’ বা ‘ঝিঙে ফুল’-এর মতো অনবদ্য, ছন্দোবদ্ধ ও কৌতুকপূর্ণ কবিতা।
-
আন্তর্জাতিকতাবাদ: তাঁর রাজনৈতিক চেতনা কেবল ভারতবর্ষের ব্রিটিশ-বিরোধী লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। ‘কামাল পাশা’ বা ‘আনোয়ার পাশা’ কবিতায় তিনি বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইকে সমর্থন জানিয়েছিলেন এবং নিপীড়িত মানুষের পক্ষে আন্তর্জাতিক সংহতি প্রকাশ করেছিলেন।
আবৃত্তির মঞ্চ বনাম অস্বস্তিকর সত্য: আমরা কী এড়িয়ে যাচ্ছি?
এখানেই আমাদের একটি বড় আত্মসমালোচনার জায়গা রয়েছে। আমরা নজরুলকে একটি বাৎসরিক আবৃত্তি প্রতিযোগিতার উপাদানে রূপান্তর করেছি—ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবি, চকচকে মেডেল আর হাততালির ভেতর আমরা ‘বিদ্রোহী’কে কেবল একটি সুর ও ধ্বনির খেলা বানিয়ে রেখেছি।
অথচ নজরুলের যে সৃষ্টিগুলো আমাদের নিজেদের সমাজ, ধর্ম ও ব্যক্তিজীবনের মুখোশ টেনে খুলে দেয়, সেগুলোকে আমরা খুব সন্তর্পণে দূরে সরিয়ে রাখি:
-
‘নারী’ কবিতা: ১৯২০-এর দশকে দাঁড়িয়ে তিনি লিখেছিলেন—”বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।” পিতৃতান্ত্রিক সমাজের সুবিধাবাদকে এর চেয়ে সরাসরি আর কে চ্যালেঞ্জ করেছে?
-
‘কুলি-মজুর’: যারা সভ্যতার বোঝা টানে তাদের ঘামের ওপর দাঁড়িয়ে আরামপ্রিয় ধনিক শ্রেণির মুনাফালোভী চরিত্রকে তিনি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন।
-
‘মানুষ’: উপাসনালয়ের দরজায় যখন ক্ষুধার্ত মানুষ ফিরে যায়, তখন মোল্লা ও পুরোহিতের ধর্মীয় ভণ্ডামিকে তিনি সমান তীব্রতায় আক্রমণ করেছেন।
আমরা খুব সহজে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা বেছে নিই, কারণ এটি দিয়ে যেকোনো রাষ্ট্র বা সরকারের বিরুদ্ধে আঙুল তোলা সহজ। কিন্তু ‘মানুষ’, ‘নারী’ বা ‘কুলি-মজুর’ আবৃত্তি করতে গেলে আঙুলটা নিজের পরিবার, নিজের ধর্মীয় গোঁড়ামি আর নিজের সামাজিক আরামের দিকে তুলতে হয়। সেই অস্বস্তি নেওয়ার সাহস আমাদের থাকে না।
শেষ কথা
কাজী নজরুল ইসলামের প্রয়াণের এই সুদীর্ঘ সময় পরেও তিনি বাংলা ভাষার সবচেয়ে জীবন্ত ও প্রয়োজনীয় কণ্ঠস্বর। প্রতিটি নতুন প্রতিরোধে বাঙালি আবার তাঁর কাছেই ফিরবে, এবং এই ফেরাটাই স্বাভাবিক।
তবে নজরুলকে ফিরে পাওয়ার একটা আত্মিক মূল্য থাকা উচিত। আমরা যদি মিছিলে বা মঞ্চে দাঁড়িয়ে ‘বিদ্রোহী’র পঙ্ক্তি উচ্চারণ করি, তবে একই সাথে আমাদের নজরুলের সাম্যবাদী দর্শনকেও নিজেদের জীবনে ধারণ করার সাহস রাখতে হবে। নজরুলকে কেবল মঞ্চের সুসজ্জিত আবৃত্তির অংশ বানিয়ে রাখা তাঁর প্রতি সুবিচার নয়; তাঁর সেই লেখাগুলোও আমাদের পড়া দরকার, যা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয় এবং আমাদের ভেতর লুকিয়ে থাকা অন্যায়কে প্রশ্নবিদ্ধ করে।


