বাংলাদেশে আজকের সোনা ও রুপোর দাম: ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ – ভরি, গ্রাম, আনা ও রতি হিসাবে সম্পূর্ণ মূল্য তালিকা

সর্বাধিক আলোচিত

বাংলাদেশের বাজারে সোনা ও রুপোর দাম আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবে ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) এর সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম প্রতি ভরি ২ লাখ ১৭ হাজার ৬৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু করে স্বর্ণের দামে একাধিক বার বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে এই মূল্যে পৌঁছেছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে তেজাবি সোনার (পিওর গোল্ড) মূল্যবৃদ্ধির কারণে এই পরিবর্তন এসেছে। রুপোর দামও একই সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়ে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৪ হাজার ৫৭২ টাকায় স্থির হয়েছে।

২১ ডিসেম্বর ২০২৫: বাংলাদেশে সোনার বর্তমান দাম

বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ স্থায়ী কমিটির সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিভিন্ন ক্যারেটের স্বর্ণের দাম পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে স্বর্ণের দামে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা যায়, যা মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে ভরিপ্রতি ৩ হাজার ৪৫২ টাকা বেড়েছিল। তারপর ১৫ ডিসেম্বর আরও ১ হাজার ৪৭০ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমান মূল্যে স্থির হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মান, লন্ডন বুলিয়ন মার্কেট অ্যাসোসিয়েশন (LBMA) এর নির্ধারিত দর এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সোনার দামে প্রভাব ফেলে। বর্তমানে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং কেন্দ্রীয় বাংকগুলোর স্বর্ণ মজুদ বৃদ্ধির প্রবণতা সোনার দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। বাংলাদেশে সোনা সম্পূর্ণভাবে আমদানিকৃত পণ্য হওয়ায় এই বৈশ্বিক পরিবর্তন দেশীয় বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে।

ক্যারেট ভিত্তিক স্বর্ণের মূল্য তালিকা

বিভিন্ন ক্যারেটের স্বর্ণের বিশুদ্ধতা ও ব্যবহার ভিন্ন। ২২ ক্যারেট স্বর্ণে ৯১.৬৭% খাঁটি সোনা থাকে এবং এটি গহনা তৈরির জন্য সর্বাধিক জনপ্রিয়। ২১ ক্যারেট স্বর্ণে ৮৭.৫% এবং ১৮ ক্যারেটে ৭৫% খাঁটি সোনা মিশ্রিত থাকে। সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ হলো ঐতিহ্যবাহী পুরোনো পদ্ধতিতে তৈরি সোনা যার বিশুদ্ধতা তুলনামূলকভাবে কম।

ক্যারেট প্রতি গ্রাম (টাকা) প্রতি ভরি (টাকা) প্রতি আনা (টাকা) প্রতি রতি (টাকা)
২২ ক্যারেট ১৮,৬১০ ২,১৭,০৬৮ ১৩,৫৬৭ ১,৬৯৫
২১ ক্যারেট ১৭,৭৬৫ ২,০৭,২১১ ১২,৯৫১ ১,৬১৯
১৮ ক্যারেট ১৫,২৩০ ১,৭৭,৬৪৩ ১১,১০৩ ১,৩৮৮
সনাতন পদ্ধতি ১২,৬৮০ ১,৪৭,৯০০ ৯,২৪৪ ১,১৫৫

দ্রষ্টব্য: ১ ভরি = ১১.৬৬৪ গ্রাম; ১ ভরি = ১৬ আনা; ১ আনা = ৮ রতি; ১ ভরি = ১২৮ রতি। উপরের দাম বাজুস নির্ধারিত মূল দাম। ক্রেতাদের অতিরিক্ত সরকার-নির্ধারিত ৫% ভ্যাট এবং ন্যূনতম ৬% মেকিং চার্জ প্রদান করতে হবে।

বাংলাদেশে রুপোর বর্তমান মূল্য

স্বর্ণের পাশাপাশি রুপোর দামও বাজুস নিয়মিত নির্ধারণ করে থাকে। রুপো গহনা তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত হয় বলে এর চাহিদাও বাজারে উল্লেখযোগ্য। সর্বশেষ মূল্য সমন্বয়ে ১৫ ডিসেম্বর থেকে রুপোর দাম বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তা ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর রয়েছে।

ক্যারেট অনুযায়ী রুপোর মূল্য তালিকা

ক্যারেট প্রতি গ্রাম (টাকা) প্রতি ভরি (টাকা) প্রতি আনা (টাকা) প্রতি রতি (টাকা)
২২ ক্যারেট ৩৯২ ৪,৫৭২ ২৮৬ ৩৬
২১ ক্যারেট ৩৭৪ ৪,৩৬২ ২৭৩ ৩৪
১৮ ক্যারেট ৩২০ ৩,৭৩২ ২৩৩ ২৯
সনাতন পদ্ধতি ২৪০ ২,৮০০ ১৭৫ ২২

রুপোর গহনা ক্রয়ের ক্ষেত্রেও ৫% ভ্যাট এবং ডিজাইন ভেদে মেকিং চার্জ প্রযোজ্য হবে। সাধারণত রুপোর মেকিং চার্জ প্রতি গ্রাম ২৬ টাকা থেকে শুরু হয়, তবে জটিল ডিজাইনের ক্ষেত্রে এটি বেশি হতে পারে।

ডিসেম্বর মাসে সোনার দামের পরিবর্তনের ধারা

২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস সোনার বাজারে বেশ অস্থির সময় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। মাসের প্রথম সপ্তাহে ৫ ডিসেম্বর প্রতি ভরি সোনার দাম ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৯৫ টাকা। তারপর ১৪ ডিসেম্বর প্রথম দফায় ৩ হাজার ৪৫২ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে দাম দাঁড়ায় ২ লাখ ১৫ হাজার ৫৯৭ টাকায়। মাত্র একদিন পর ১৫ ডিসেম্বর আরও ১ হাজার ৪৭০ টাকা বৃদ্ধির মাধ্যমে দাম ২ লাখ ১৭ হাজার ৬৭ টাকায় পৌঁছায়।

এই ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি এবং স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিউর গোল্ড) সরবরাহ খরচ বৃদ্ধির কারণে হয়েছে। বিশেষত, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার নীতি সোনার দামে প্রভাব ফেলেছে।

মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণসমূহ

আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে বেশ কিছু অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নীতি পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করেছে। দ্বিতীয়ত, চীন ও ভারতসহ এশিয়ার প্রধান দেশগুলোতে উৎসবের মৌসুমে সোনার চাহিদা বৃদ্ধি পায়। তৃতীয়ত, বিশ্বের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের রিজার্ভে স্বর্ণের পরিমাণ বাড়িয়ে চলেছে, যা বাজারে চাপ সৃষ্টি করছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, স্বর্ণ সম্পূর্ণভাবে আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক মূল্য, পরিবহন খরচ, শুল্ক এবং বিনিময় হার সরাসরি প্রভাব ফেলে। মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন স্বর্ণের আমদানি খরচ বাড়িয়ে দেয়, যা স্থানীয় মূল্যে প্রতিফলিত হয়। এছাড়া, চোরাচালান রোধ এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতাও মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

গহনা ক্রয়ে অতিরিক্ত খরচ: ভ্যাট ও মেকিং চার্জ

বাজুসের নির্ধারিত মূল্য হলো স্বর্ণের মূল দাম, কিন্তু ক্রেতাদের অতিরিক্ত কিছু খরচ বহন করতে হয়। সরকার-নির্ধারিত ৫% ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) প্রতিটি স্বর্ণ ক্রয়ের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক। উদাহরণস্বরূপ, যদি ১ ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের মূল দাম ২,১৭,০৬৮ টাকা হয়, তাহলে ৫% ভ্যাট হবে ১০,৮৫৩ টাকা।

মেকিং চার্জ হলো গহনা তৈরিতে শ্রমিকের দক্ষতা, ডিজাইনের জটিলতা এবং সময়ের জন্য ধার্য করা খরচ। বাজুস ন্যূনতম ৬% মেকিং চার্জ নির্ধারণ করে দিয়েছে, তবে জটিল এবং আধুনিক ডিজাইনের গহনার ক্ষেত্রে এটি ১০% থেকে ২০% পর্যন্ত হতে পারে। প্রতি গ্রামের হিসাবে মেকিং চার্জ ৩০০ টাকা থেকে ১,০০০ টাকা বা তারও বেশি হতে পারে, যা সম্পূর্ণভাবে জুয়েলারি দোকান এবং ডিজাইনের উপর নির্ভর করে।

ক্রয়মূল্য গণনার উদাহরণ

ধরা যাক, একজন ক্রেতা ১ ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেট হলমার্ক স্বর্ণের গহনা ক্রয় করতে চান। তাহলে মোট খরচ হবে:

  • মূল দাম: ২,১৭,০৬৮ টাকা

  • ৫% ভ্যাট: ১০,৮৫৩ টাকা

  • ৬% মেকিং চার্জ (ন্যূনতম): ১৩,০২৪ টাকা

  • মোট আনুমানিক খরচ: ২,৪০,৯৪৫ টাকা

যদি গহনার ডিজাইন জটিল হয় এবং মেকিং চার্জ ১০% ধরা হয়, তাহলে মোট খরচ প্রায় ২,৪৯,৫০০ টাকা বা তারও বেশি হতে পারে।

হলমার্ক স্বর্ণ: বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের নিশ্চয়তা

হলমার্ক হলো স্বর্ণের বিশুদ্ধতা এবং মান নিশ্চিতকরণের একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত চিহ্ন। বাংলাদেশে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI) হলমার্ক প্রদান করে থাকে। ২২ ক্যারেট স্বর্ণের হলমার্ক কোড হলো ৯১৬, যা বোঝায় যে স্বর্ণে ৯১.৬৭% খাঁটি সোনা রয়েছে। একইভাবে, ২১ ক্যারেটের কোড ৮৭৫ এবং ১৮ ক্যারেটের কোড ৭৫০।

হলমার্ক স্বর্ণ ক্রয়ের সুবিধা হলো, ক্রেতা নিশ্চিত হতে পারেন যে তিনি সঠিক বিশুদ্ধতার স্বর্ণ পাচ্ছেন। এছাড়া, পুনঃবিক্রয়ের সময় হলমার্কযুক্ত স্বর্ণের মূল্য বেশি পাওয়া যায় এবং জুয়েলারি দোকানগুলো সহজেই গ্রহণ করে। হলমার্ক চিহ্নে সাধারণত BIS বা BSTI লোগো, বিশুদ্ধতার কোড, জুয়েলারের পরিচয় এবং হলমার্কিং সেন্টারের চিহ্ন থাকে।

হলমার্ক স্বর্ণ চেনার উপায়

হলমার্ক স্বর্ণ চেনার উপায়

স্বর্ণ ক্রয়ের আগে অবশ্যই গহনার গায়ে হলমার্ক চিহ্ন আছে কিনা তা যাচাই করতে হবে। হলমার্ক চিহ্ন সাধারণত ছোট এবং গহনার পেছনের দিকে বা ভেতরের অংশে খোদাই করা থাকে। একটি ম্যাগনিফাইং গ্লাস বা মোবাইল ফোনের ক্যামেরা জুম করে দেখা যেতে পারে। হলমার্কে অবশ্যই পরিষ্কারভাবে সংখ্যা (৯১৬, ৮৭৫, বা ৭৫০) এবং BSTI বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লোগো থাকবে।

ক্রেতাদের সবসময় বাজুস-অনুমোদিত এবং বিশ্বস্ত জুয়েলারি দোকান থেকে স্বর্ণ কেনা উচিত। ক্রয়ের সময় রসিদ বা ইনভয়েস সংরক্ষণ করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে প্রয়োজনে গহনার মান এবং মূল্য প্রমাণ করা যায়। অনেক জুয়েলারি দোকান এখন ডিজিটাল সার্টিফিকেট এবং QR কোড সুবিধা দিচ্ছে, যা দিয়ে অনলাইনে গহনার তথ্য যাচাই করা সম্ভব।

বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণ: সুবিধা ও কৌশল

বাংলাদেশে স্বর্ণ দীর্ঘদিন ধরে একটি নিরাপদ এবং লাভজনক বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। মুদ্রাস্ফীতির বিপরীতে স্বর্ণের মূল্য সাধারণত বৃদ্ধি পায়, যা বিনিয়োগকারীদের সম্পদ সংরক্ষণে সাহায্য করে। স্বর্ণ অত্যন্ত তরল সম্পদ, অর্থাৎ প্রয়োজনে দ্রুত নগদে রূপান্তরিত করা যায়। এছাড়া, ব্যাংক ঋণের জামানত হিসেবে স্বর্ণ ব্যবহার করা যায়, যা গোল্ড লোন নামে পরিচিত।

স্বর্ণে বিনিয়োগের জন্য বিশেষজ্ঞরা কিছু কৌশল সুপারিশ করেন। প্রথমত, গহনার পরিবর্তে স্বর্ণের বার বা কয়েন ক্রয় করা ভালো, কারণ এতে মেকিং চার্জ কম হয় এবং পুনঃবিক্রয়ে সুবিধা হয়। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা উচিত, কারণ স্বল্পমেয়াদে দামের ওঠানামা হতে পারে। তৃতীয়ত, বাজারের দাম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা এবং দাম তুলনামূলক কম থাকলে ক্রয় করা বুদ্ধিমানের কাজ।

ডিজিটাল গোল্ড: নতুন বিনিয়োগ মাধ্যম

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডিজিটাল গোল্ড একটি জনপ্রিয় বিনিয়োগ বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে। ডিজিটাল গোল্ডে বিনিয়োগ করলে ফিজিক্যাল স্বর্ণ ক্রয় বা সংরক্ষণের ঝামেলা থাকে না। বিনিয়োগকারীরা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যেকোনো পরিমাণ স্বর্ণ কিনতে পারেন, এমনকি ১ গ্রামেরও কম। কেনা স্বর্ণ নিরাপদ ভল্টে বিমার অধীনে সংরক্ষিত থাকে এবং প্রয়োজনে ফিজিক্যাল ডেলিভারি বা নগদে বিক্রয়ের সুবিধা রয়েছে।

বাংলাদেশে ডিজিটাল গোল্ড এখনও নতুন ধারণা, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এটি ব্যাপক জনপ্রিয়। বিশ্বস্ত ফিনটেক প্ল্যাটফর্ম এবং ব্যাংকগুলো এই সেবা প্রদান করে থাকে। ডিজিটাল গোল্ডের প্রধান সুবিধা হলো কম খরচে বিনিয়োগ, সহজ লেনদেন এবং নিরাপত্তা।

পুরাতন স্বর্ণ বিক্রয়: জানা জরুরি

অনেক সময় মানুষ পুরাতন স্বর্ণ বিক্রয় করে নতুন গহনা কিনতে চান বা আর্থিক প্রয়োজনে নগদ অর্থের ব্যবস্থা করতে চান। পুরাতন স্বর্ণ বিক্রয়ের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি। প্রথমত, পুরাতন স্বর্ণের দাম হলমার্ক স্বর্ণের চেয়ে প্রায় ১৫-২০% কম হয়। কারণ, জুয়েলার পুনঃগলন এবং বিশুদ্ধতা পরীক্ষার খরচ বিবেচনা করে। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন জুয়েলারি দোকানে দাম ভিন্ন হতে পারে, তাই একাধিক দোকানে যাচাই করে সর্বোচ্চ দাম নিশ্চিত করা উচিত।

পুরাতন স্বর্ণ বিক্রয়ের সময় অবশ্যই ডিজিটাল ওজন মেশিনে ওজন পরিমাপ করা এবং ক্যারেট টেস্টিং মেশিনে বিশুদ্ধতা যাচাই করা উচিত। অনেক জুয়েলার পুরাতন স্বর্ণের বিনিময়ে নতুন গহনা ক্রয়ে বিশেষ ছাড় দেন, যা এক্সচেঞ্জ অফার নামে পরিচিত। এক্ষেত্রে পুরাতন স্বর্ণের সঠিক মূল্য এবং নতুন গহনার দাম ভালোভাবে হিসাব করে নেওয়া প্রয়োজন।

বাজুসের ভূমিকা এবং দায়িত্ব

বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) ১৯৮৫ সাল থেকে দেশের স্বর্ণ ও রৌপ্য বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সারাদেশে প্রায় ৭,০০০-এর বেশি সদস্য নিয়ে বাজুস কাজ করে। সংগঠনটি আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণ, স্থানীয় সরবরাহ ও চাহিদা বিশ্লেষণ করে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে স্বর্ণ ও রুপোর দাম নির্ধারণ করে।

বাজুস শুধু মূল্য নির্ধারণেই নয়, হলমার্ক প্রচলন, জাল স্বর্ণ প্রতিরোধ, ক্রেতা সচেতনতা বৃদ্ধি এবং জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের নৈতিক আচরণ নিশ্চিত করতে কাজ করে। সংগঠনটি সরকারের সাথে সমন্বয় করে ভ্যাট, আমদানি শুল্ক এবং অন্যান্য নীতি প্রণয়নে পরামর্শ দেয়। বাজুসের ওয়েবসাইট এবং সামাজিক মাধ্যমে নিয়মিত মূল্য হালনাগাদ প্রকাশিত হয়।

মূল্য পরিবর্তনের প্রক্রিয়া

বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ স্থায়ী কমিটি নিয়মিত সভায় মিলিত হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের তথ্য পর্যালোচনা করে। লন্ডন বুলিয়ন মার্কেট অ্যাসোসিয়েশন (LBMA), দুবাই গোল্ড মার্কেট এবং ভারতীয় বাজারের মূল্য প্রধান রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়। স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিউর গোল্ড) আমদানি মূল্য, পরিবহন খরচ, বিনিময় হার এবং সরবরাহ ব্যবস্থা বিবেচনা করে চূড়ান্ত দাম নির্ধারণ করা হয়।

মূল্য পরিবর্তনের ঘোষণা সাধারণত শুক্রবার বা শনিবার প্রকাশিত হয় এবং পরবর্তী সপ্তাহ থেকে কার্যকর হয়। তবে, আন্তর্জাতিক বাজারে আকস্মিক বড় পরিবর্তন হলে জরুরি ভিত্তিতে দাম সমন্বয় করা হয়। বাজুসের সকল সদস্য জুয়েলারি দোকান এই নির্ধারিত দাম মেনে চলতে বাধ্য।

স্বর্ণ ক্রয়ের সঠিক সময় নির্ধারণ

স্বর্ণ একটি বাজার-চালিত পণ্য হওয়ায় এর দাম সবসময় একরকম থাকে না। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময়ে স্বর্ণের দাম তুলনামূলক কম থাকে। সাধারণত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি এবং জুলাই-আগস্ট মাসে চাহিদা কম থাকায় দাম সাময়িকভাবে কমতে পারে। অন্যদিকে, দুর্গাপূজা, ঈদ, বিবাহের মৌসুম (নভেম্বর-ডিসেম্বর এবং ফেব্রুয়ারি-এপ্রিল) এবং পহেলা বৈশাখের সময় চাহিদা বেশি থাকায় দাম বৃদ্ধি পায়।

যারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য বাজার বিশ্লেষণ এবং নিয়মিত ছোট ছোট পরিমাণে ক্রয় (SIP পদ্ধতি) উপকারী হতে পারে। এতে গড় মূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং বাজারের ঝুঁকি কমে। তবে মনে রাখা জরুরি যে, স্বর্ণের দাম পূর্বাভাস করা কঠিন এবং কোনো নিশ্চিত সময় নেই যখন দাম অবশ্যই কমবে বা বাড়বে।

ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস: ২০২৬ সালে স্বর্ণের দাম

আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, ২০২৬ সালে স্বর্ণের দাম আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ মজুদ বৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত থাকলে মূল্যবৃদ্ধি অনিবার্য। কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স ৩,০০০ মার্কিন ডলার অতিক্রম করতে পারে, যা বর্তমানে প্রায় ২,৬৫০ ডলারের আশেপাশে রয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, যদি আন্তর্জাতিক দাম বৃদ্ধি পায় এবং টাকার বিপরীতে ডলারের মান বাড়ে, তাহলে ২০২৬ সালে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ভরিপ্রতি ২ লাখ ৩০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তবে এটি একটি পূর্বাভাস মাত্র এবং প্রকৃত দাম বিভিন্ন অর্থনৈতিক কারণের উপর নির্ভর করবে।

শেষ কথা

২১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশের স্বর্ণ ও রুপোর বাজার আন্তর্জাতিক প্রভাবে উচ্চ মূল্যের মুখোমুখি রয়েছে। বাজুসের নির্ধারিত দাম অনুযায়ী ২২ ক্যারেট স্বর্ণের মূল্য প্রতি ভরি ২ লাখ ১৭ হাজার ৬৮ টাকায় স্থির রয়েছে, যা ডিসেম্বর মাসের শুরু থেকে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। রুপোর দামও সমানভাবে বেড়ে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৪ হাজার ৫৭২ টাকায় পৌঁছেছে। স্বর্ণ ক্রয়ের ক্ষেত্রে হলমার্ক যাচাই, বিশ্বস্ত জুয়েলার নির্বাচন এবং বাজার পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং বাজার বিশ্লেষণের মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। বাজুসের নিয়মিত মূল্য হালনাগাদ এবং সরকারি নীতি মেনে স্বর্ণ লেনদেন করলে ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়েই সুরক্ষিত থাকবেন। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে স্বর্ণ একটি নিরাপদ সম্পদ হিসেবে তার অবস্থান বজায় রেখেছে এবং ভবিষ্যতেও এর গুরুত্ব অটুট থাকবে বলে আশা করা যায়।

সর্বশেষ