বাজেটে কুলাবে তো? দেখুন ২৬ ডিসেম্বরে বাংলাদেশে আজকের সোনা ও রুপোর দাম

সর্বাধিক আলোচিত

বাংলাদেশে সোনার দাম ক্রমাগত নতুন রেকর্ড তৈরি করে চলেছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) এর সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২২ ক্যারেট সোনার দাম প্রতি ভরিতে ২,১৮,১১৭ টাকায় পৌঁছেছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ । আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বৃদ্ধির কারণে দেশীয় বাজারেও এই মূল্য বৃদ্ধি ঘটেছে । ডিসেম্বর ২০২৫ এর শেষ সপ্তাহে এই দাম কার্যকর রয়েছে এবং ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ এ এই একই মূল্য প্রযোজ্য হবে ।

বর্তমান সোনার দাম বিস্তারিত

বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সভায় এই নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে । কমিটির চেয়ারম্যান দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয় ।

ভরি অনুযায়ী সোনার দাম

ক্যারেট প্রতি ভরি দাম (টাকা) প্রতি গ্রাম দাম (টাকা)
২২ ক্যারেট ২,১৮,১১৭ ১৮,৭০০
২১ ক্যারেট ২,০৮,২২৪ ১৭,৮৫০
১৮ ক্যারেট ১,৭৮,৪৫৯ ১৫,৩০০
ঐতিহ্যবাহী সোনা ১,৪৮,৬০২ ১২,৭৪০

আনা ও রতি অনুযায়ী সোনার দাম

১ ভরি = ১৬ আনা এবং ১ ভরি = ৯৬ রতি হিসাবে গণনা করা হয়।

২২ ক্যারেট সোনার জন্য:

  • প্রতি আনা: ১৩,৬৩২ টাকা (২,১৮,১১৭ ÷ ১৬)

  • প্রতি রতি: ২,২৭২ টাকা (২,১৮,১১৭ ÷ ৯৬)

২১ ক্যারেট সোনার জন্য:

  • প্রতি আনা: ১৩,০১৪ টাকা

  • প্রতি রতি: ২,১৬৯ টাকা

১৮ ক্যারেট সোনার জন্য:

  • প্রতি আনা: ১১,১৫৪ টাকা

  • প্রতি রতি: ১,৮৫৯ টাকা

ঐতিহ্যবাহী সোনার জন্য:

  • প্রতি আনা: ৯,২৮৮ টাকা

  • প্রতি রতি: ১,৫৪৮ টাকা

রুপোর বর্তমান বাজার মূল্য

রুপোর দাম অপরিবর্তিত রয়েছে বলে বাজুস জানিয়েছে । বর্তমানে বাজারে রুপোর দাম স্থিতিশীল রয়েছে এবং বিভিন্ন ক্যারেটের রুপো বিভিন্ন মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে।

ক্যারেট প্রতি গ্রাম দাম (টাকা) প্রতি ভরি দাম (টাকা)
২২ ক্যারেট ৩৯২ ৪,৫৭২
২১ ক্যারেট ৩৭৪ ৪,৩৬২
১৮ ক্যারেট ৩২০ ৩,৭৩২
ঐতিহ্যবাহী রুপা ২৪০ ২,৭৯৯

রুপোর আনা ও রতি অনুযায়ী দাম

২২ ক্যারেট রুপোর জন্য:

  • প্রতি আনা: ২৮৬ টাকা (৪,৫৭২ ÷ ১৬)

  • প্রতি রতি: ৪৮ টাকা (৪,৫৭২ ÷ ৯৬)

২১ ক্যারেট রুপোর জন্য:

  • প্রতি আনা: ২৭৩ টাকা

  • প্রতি রতি: ৪৫ টাকা

১৮ ক্যারেট রুপোর জন্য:

  • প্রতি আনা: ২৩৩ টাকা

  • প্রতি রতি: ৩৯ টাকা

দাম বৃদ্ধির কারণ ও প্রভাব

আন্তর্জাতিক বাজারে খাঁটি সোনার দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশেও সোনার দাম বেড়েছে । বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, মুদ্রাস্ফীতির চাপ এবং বিভিন্ন দেশে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা সোনার মূল্য বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অক্টোবর ২০২৫ সালে সোনার দাম প্রথমবারের মতো প্রতি ভরিতে ২,১৭,৩৮২ টাকায় পৌঁছেছিল । তারপর থেকে দাম ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী থাকছে।

বাজুস প্রতি ভরিতে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১,০৫০ টাকা দাম বৃদ্ধি করেছে । এই দ্রুত মূল্য বৃদ্ধি ভোক্তাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে, বিশেষত যারা বিবাহ বা অন্যান্য অনুষ্ঠানের জন্য সোনার গহনা কিনতে চান। দেশীয় বাজারে ডলারের বিপরীতে টাকার দুর্বলতাও এই মূল্য বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

অতিরিক্ত খরচ যা মাথায় রাখতে হবে

সোনা বা রুপো ক্রয়ের সময় শুধুমাত্র ধাতুর মূল্যই নয়, আরও কিছু অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয় । ক্রেতাদের এই বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা উচিত।

অতিরিক্ত চার্জসমূহ

  • ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর): সরকার নির্ধারিত ৫ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য হবে

  • মেকিং চার্জ: বাজুস নির্ধারিত ন্যূনতম ৬ শতাংশ মেকিং চার্জ যুক্ত হবে

  • ডিজাইন চার্জ: জটিল ডিজাইন এবং গুণমানের উপর নির্ভর করে মেকিং চার্জ আরও বেশি হতে পারে

উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ ১ ভরি ২২ ক্যারেট সোনা কিনতে চান যার মূল্য ২,১৮,১১৭ টাকা:

  • ৫% ভ্যাট = ১০,৯০৬ টাকা

  • ৬% মেকিং চার্জ = ১৩,০৮৭ টাকা

  • মোট খরচ = ২,৪২,১১০ টাকা (প্রায়)

সোনা-রুপা কেনার সময় যা মনে রাখবেন

সোনা বা রুপার গহনা ক্রয়ের সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখা উচিত যাতে সঠিক মূল্যে ভালো মানের পণ্য কিনতে পারেন।

ক্রয়ের সময় সতর্কতা

  • হলমার্ক যাচাই করুন: বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI) এর হলমার্ক আছে কিনা নিশ্চিত করুন

  • ওজন পরিমাপ: গহনা কেনার আগে এবং পরে ইলেকট্রনিক ওজনে পরিমাপ করে নিন

  • চালান সংরক্ষণ: সব ধরনের চালান এবং ওয়ারেন্টি কার্ড সংরক্ষণ করুন

  • বাজুস সদস্য দোকান: শুধুমাত্র বাজুসের সদস্য দোকান থেকে কিনুন

  • মেকিং চার্জ তুলনা: বিভিন্ন দোকানের মেকিং চার্জ তুলনা করে দেখুন

  • বিশুদ্ধতা পরীক্ষা: ক্যারেট মান সঠিক আছে কিনা নিশ্চিত করুন

আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব

আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে। লাইভ গোল্ড প্রাইস ডেটা অনুযায়ী, ডিসেম্বর ২৩, ২০২৫ তারিখে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম প্রতি গ্রামে ১৭,৬৩০.২৪ টাকায় ছিল, যা আগের দিনের তুলনায় ১৫২.৭৬ টাকা (০.৮৭%) বেশি ।

সাম্প্রতিক মূল্য প্রবণতা

ডিসেম্বর মাসে সোনার দামের প্রবণতা দেখলে বোঝা যায় যে ক্রমাগত দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে:

  • ডিসেম্বর ১৮, ২০২৫: প্রতি গ্রাম ১৭,০১৬.৮৮ টাকা

  • ডিসেম্বর ১৯, ২০২৫: প্রতি গ্রাম ১৭,০৪০.৪৪ টাকা (০.১৪% বৃদ্ধি)

  • ডিসেম্বর ২২, ২০২৫: প্রতি গ্রাম ১৭,৪৭৭.৪৮ টাকা (২.৫৬% বৃদ্ধি)

  • ডিসেম্বর ২৩, ২০২৫: প্রতি গ্রাম ১৭,৬৩০.২৪ টাকা (০.৮৭% বৃদ্ধি)

রুপোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ডিসেম্বর ১৯, ২০২৫ তারিখে রুপোর দাম প্রতি আউন্সে ৮,২১৬.২০ টাকায় পৌঁছেছিল যা ২০২৫ সালের সর্বোচ্চ । গোল্ডেন চেন্নাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে রুপোর দাম প্রতি গ্রামে ২৫৮.৬০ টাকা রয়েছে ।

বিনিয়োগ হিসেবে সোনা ও রুপো

বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেকে সোনা ও রুপোকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করছেন। মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে হেজ হিসেবে এবং সম্পদ সংরক্ষণের উপায় হিসেবে মূল্যবান ধাতুর চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিনিয়োগের সুবিধা

  • মূল্য সংরক্ষণ: মুদ্রাস্ফীতির সময় সোনা মূল্য ধরে রাখে

  • তারল্য: প্রয়োজনের সময় সহজেই নগদে রূপান্তর করা যায়

  • দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা: দীর্ঘমেয়াদে সোনার মূল্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকে

  • পোর্টফোলিও বৈচিত্র্য: বিনিয়োগ পোর্টফোলিওতে বৈচিত্র্য আনে

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা

  • বিনিয়োগের আগে বাজার গবেষণা করুন

  • শুধুমাত্র অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে বিনিয়োগ করুন

  • দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গি রাখুন

  • ভৌত সোনা কেনার চেয়ে গোল্ড সেভিংস অ্যাকাউন্ট বিবেচনা করতে পারেন

  • মেকিং চার্জ কম এমন আইটেম বেছে নিন

ভবিষ্যৎ মূল্য প্রবণতা

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে আগামী কয়েক মাসে সোনার দাম আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, কেন্দ্রীয় বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এই মূল্য প্রবণতা নির্ধারণ করবে।

প্রভাবশালী কারণসমূহ

  • মার্কিন ডলারের শক্তি: ডলার শক্তিশালী হলে সোনার দাম কমতে পারে

  • মুদ্রাস্ফীতি: উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি সোনার চাহিদা বাড়ায়

  • ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা: আন্তর্জাতিক সংকট সোনার দাম বাড়ায়

  • কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি: সুদের হার পরিবর্তন সোনার মূল্যকে প্রভাবিত করে

  • স্থানীয় চাহিদা: বিবাহ মৌসুম এবং উৎসবে চাহিদা বাড়ে

বাজুসের ভূমিকা

বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) দেশে সোনা ও রুপোর মূল্য নির্ধারণ এবং নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণ করে এবং স্থানীয় অবস্থা বিবেচনা করে মূল্য নির্ধারণ করে।

বাজুসের মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ এবং নিয়মিত সভার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় । প্রতিষ্ঠানটি নিশ্চিত করে যে সকল সদস্য দোকানে একই মূল্যে সোনা ও রুপো বিক্রয় হয়, যা ভোক্তাদের জন্য সুরক্ষা প্রদান করে। বাজুস সদস্য দোকান থেকে কেনাকাটা করলে হলমার্ক সার্টিফিকেট এবং যথাযথ বিল পাওয়া নিশ্চিত হয়।

ডিজিটাল সোনা বিনিয়োগ

ভৌত সোনা ছাড়াও বর্তমানে ডিজিটাল সোনা বিনিয়োগের বিকল্প রয়েছে। বাংলাদেশে কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যাংক ডিজিটাল গোল্ড সেভিংস স্কিম চালু করেছে।

ডিজিটাল সোনার সুবিধা

  • মেকিং চার্জ বা ভ্যাট নেই

  • নিরাপদ সংরক্ষণ

  • সহজে ক্রয়-বিক্রয়

  • ছোট পরিমাণে বিনিয়োগ সম্ভব

  • চুরি বা হারানোর ঝুঁকি নেই

শেষ কথা

বাংলাদেশে সোনা ও রুপোর দাম ক্রমাগত রেকর্ড ভাঙছে এবং ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ২২ ক্যারেট সোনার দাম প্রতি ভরি ২,১৮,১১৭ টাকায় স্থির রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এই উচ্চ মূল্য বজায় রয়েছে। ক্রেতাদের সচেতন থাকা এবং শুধুমাত্র বাজুস সদস্য দোকান থেকে হলমার্কযুক্ত গহনা কেনা উচিত যাতে সঠিক মূল্যে খাঁটি পণ্য পাওয়া যায়। রুপোর দাম বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে এবং ২২ ক্যারেট রুপো প্রতি গ্রাম ৩৯২ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করা এবং বাজার পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখা উচিত কারণ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন আগামী মাসগুলোতে সোনার দাম আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

সর্বশেষ