সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে শিশুদের মাঝে হামের (Measles) সংক্রমণ এক উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এবং বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরু থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে হামের প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে এই সংক্রমণ একটি ভয়াবহ রূপ নেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফ (UNICEF)-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও এই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনা, চট্টগ্রাম, যশোর এবং নাটোরের মতো জেলাগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। শুধুমাত্র ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেই ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে সাড়ে চারশোর বেশি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ শিশুই মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে, যাদের একটি বড় অংশের বয়স নয় মাসের কম অথবা যারা নিয়মিত টিকা গ্রহণ করেনি। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে পরিসংখ্যানের দিকে নজর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
নিচের ডাটা টেবিলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক হাম পরিস্থিতির একটি চিত্র তুলে ধরা হলো।
২০২৬ সালে বাংলাদেশে হাম সংক্রমণের একনজর পরিসংখ্যান
| সূচক | তথ্য ও উপাত্ত (২০২৬) | তথ্যের উৎস |
| সর্বাধিক আক্রান্ত জেলাসমূহ | ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, পাবনা, যশোর, নাটোর | স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) |
| সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী | ৯ মাসের কম বয়সী এবং টিকা না নেওয়া শিশুরা | WHO এবং ইউনিসেফ |
| আক্রান্তের তীব্রতা | একটি হাসপাতালেই ৪৫০+ সন্দেহভাজন রোগী ভর্তি | সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, ঢাকা |
| সংক্রমণের মূল কারণ | রুটিন টিকাদানে ঘাটতি ও জনসচেতনতার অভাব | জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা |
এই উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান আমাদের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগায়, আসলে এই হাম রোগটি কী এবং এটি এত দ্রুত কীভাবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে?
হাম কী ও কীভাবে ছড়ায়

হাম বা Measles হলো এক প্রকার অত্যন্ত সংক্রামক এবং মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ, যা ‘মোরবিলিভাইরাস’ (Morbillivirus) নামক একটি ভাইরাসের কারণে হয়ে থাকে। এটি মূলত শিশুদের শ্বাসতন্ত্রকে আক্রমণ করে এবং পরবর্তীতে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, হাম পৃথিবীর অন্যতম দ্রুত ছড়াতে সক্ষম একটি রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, হামের ‘বেসিক রিপ্রোডাকশন নাম্বার’ বা R০ (আর-নট) হলো ১৫ থেকে ১৮। এর মানে হলো, হামে আক্রান্ত একজন ব্যক্তি সম্পূর্ণ সুস্থ এবং টিকা না নেওয়া গড়ে ১৫ থেকে ১৮ জন সুস্থ মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে।
হাম মূলত বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তি যখন হাঁচি বা কাশি দেয়, তখন ভাইরাসে পূর্ণ ক্ষুদ্র জলকণা বাতাসে মিশে যায়। এই জলকণাগুলো বাতাসে বা কোনো পৃষ্ঠের ওপর অন্তত দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। যদি কোনো সুস্থ শিশু সেই বাতাস সেবন করে বা ভাইরাসযুক্ত পৃষ্ঠ স্পর্শ করে হাত মুখে দেয়, তবে সেও হামে সংক্রমিত হয়ে পড়ে। এ কারণেই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই রোগ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
হামের বিস্তার এবং এর ভাইরাসের প্রকৃতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পেতে নিচের টেবিলটি লক্ষ্য করুন।
হামের সংক্রমণ প্রক্রিয়া ও ভাইরাসের ধরন
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য | তথ্যের উৎস |
| ভাইরাসের নাম | মোরবিলিভাইরাস (Morbillivirus) | বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) |
| সংক্রমণের মাধ্যম | বাতাস (হাঁচি, কাশি ও শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে) | স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) |
| সংক্রমণ ক্ষমতা (R০) | ১৫ থেকে ১৮ জন (একজন থেকে) | বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) |
| ভাইরাসের স্থায়িত্ব | বাতাসে বা পৃষ্ঠে প্রায় ২ ঘণ্টা পর্যন্ত জীবিত থাকে | রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদন |
হামের এই ভয়ংকর সংক্রমণ ক্ষমতার কারণেই সম্প্রতি আমাদের দেশে এর প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে।
হাম কেন বাড়ছে
বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে হাম নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সম্প্রতি এর প্রকোপ আবার বেড়ে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। প্রথমত এবং প্রধানত, শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ইউনিসেফ (UNICEF) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশে হামের টিকার কভারেজ বেশ ভালো (প্রায় ৯৬%), কিন্তু যে ৪ শতাংশ শিশু টিকা থেকে বাদ পড়ছে, তারাই ভাইরাসের প্রধান বাহক হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের শূন্যপদ এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর দেশব্যাপী যে বিশেষ ‘হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন’ পরিচালিত হতো, তাতে দীর্ঘসূত্রিতা সৃষ্টি হয়েছে। অনেক অভিভাবক করোনা মহামারীর পর থেকে শিশুদের হাসপাতালে নিয়ে টিকা দেওয়ার বিষয়ে উদাসীনতা দেখাচ্ছেন। এছাড়া শহরের বস্তি এলাকা এবং ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে স্বাস্থ্যবিধির অভাব এই ভাইরাসকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করছে।
হাম বৃদ্ধির পেছনের মূল কারণগুলো স্পষ্টভাবে বুঝতে নিচের ডাটা টেবিলটি সহায়ক হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে হাম বৃদ্ধির প্রধান কারণসমূহ
| কারণ | প্রভাব ও ঝুঁকি | তথ্যের উৎস |
| টিকাদানে ঘাটতি | রুটিন টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের মাধ্যমে রোগ ছড়ানো | ইউনিসেফ (UNICEF) |
| ক্যাম্পেইনে বিলম্ব | বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি নিয়মিত না হওয়া | জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদন |
| জনবল সংকট | মাঠ পর্যায়ে ৩০-৩৫% স্বাস্থ্যকর্মীর পদ শূন্য থাকা | জাতীয় স্বাস্থ্য প্রতিবেদন |
| উদাসীনতা | সঠিক সময়ে টিকা না নেওয়া বা একটি ডোজ নিয়ে ছেড়ে দেওয়া | স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) |
এই কারণগুলোর জন্য হামের প্রকোপ যেমন বাড়ছে, তেমনি এই রোগটি শিশুদের জন্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা প্রত্যেক বাবা-মায়ের জানা অত্যন্ত জরুরি।
হাম কতটা ভয়ংকর
হামকে অনেকেই সাধারণ জ্বর বা র্যাশ হিসেবে অবহেলা করেন, যা একটি মারাত্মক ভুল। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে হাম শিশুর জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হাম নিজে যতটা না ক্ষতিকর, তার চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর হলো এর পরবর্তী জটিলতাগুলো। হাম শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে একেবারেই দুর্বল করে দেয়।
হাম থেকে সাধারণত যে মারাত্মক জটিলতাগুলো তৈরি হয় তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হলো নিউমোনিয়া। হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণই হলো এই নিউমোনিয়া। এছাড়া মস্তিষ্কে মারাত্মক সংক্রমণ বা এনসেফালাইটিস (Encephalitis), তীব্র ডায়রিয়া ও এর ফলে পানিশূন্যতা, এবং চোখের কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অন্ধত্বের মতো ভয়াবহ ঘটনাও ঘটতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা এবং ভিটামিন-এ এর অভাব থাকা শিশুদের জন্য হাম সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
হাম থেকে সৃষ্ট শারীরিক জটিলতা এবং ঝুঁকির মাত্রা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে নিচের টেবিলটি লক্ষ্য করুন।
হামের মারাত্মক জটিলতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
| জটিলতা | ক্ষতিকর প্রভাব | তথ্যের উৎস |
| নিউমোনিয়া | ফুসফুসে তীব্র সংক্রমণ, হামে মৃত্যুর প্রধান কারণ | বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) |
| এনসেফালাইটিস | মস্তিষ্কে প্রদাহ, যা থেকে স্থায়ী স্নায়বিক ক্ষতি হতে পারে | শিশু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ (DGHS) |
| তীব্র ডায়রিয়া | মারাত্মক পানিশূন্যতা ও শারীরিক দুর্বলতা | ইউনিসেফ (UNICEF) |
| অন্ধত্ব | ভিটামিন-এ এর অভাবে চোখের কর্নিয়া স্থায়ীভাবে নষ্ট হওয়া | বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) |
হামের এই মারাত্মক জটিলতাগুলো থেকে শিশুকে রক্ষা করার প্রথম এবং প্রধান ধাপ হলো সঠিক সময়ে রোগের লক্ষণগুলো চিহ্নিত করা।
হামের লক্ষণ

শিশুর শরীরে হামের ভাইরাস প্রবেশের পর লক্ষণ প্রকাশ পেতে সাধারণত ১০ থেকে ১৪ দিন সময় লাগে। এর লক্ষণগুলো কয়েকটি ধাপে প্রকাশ পায়, তাই শুরুতেই রোগটি শনাক্ত করা কিছুটা কঠিন হতে পারে। প্রথম ধাপে শিশুর প্রচণ্ড জ্বর আসে (অনেক সময় ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত)। এর সাথে থাকে তীব্র কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল হয়ে যাওয়া।
জ্বর শুরুর দুই থেকে তিন দিন পর শিশুর মুখের ভেতরে, বিশেষ করে গালের ভেতরের দিকে ছোট ছোট সাদা দাগ দেখা যায়, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘কপলিক স্পট’ (Koplik spots) বলা হয়। এটি হামের একটি নিশ্চিত লক্ষণ। এর ঠিক এক বা দুই দিন পর শিশুর কানের পেছন থেকে এবং মুখমণ্ডল থেকে লালচে র্যাশ বা ফুসকুড়ি বের হতে শুরু করে, যা পরবর্তীতে ঘাড়, বুক, পেট এবং সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এই র্যাশগুলো সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় দিন স্থায়ী হয়।
শিশুর শরীরে হামের লক্ষণগুলোর পর্যায়ক্রমিক প্রকাশ বুঝতে নিচের ডাটা টেবিলটি দেখুন।
ধাপে ধাপে হামের লক্ষণ প্রকাশ
| সময়কাল | দৃশ্যমান লক্ষণসমূহ | অবস্থা |
| ১ম থেকে ৩য় দিন | তীব্র জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া ও পানি পড়া | প্রাথমিক পর্যায় |
| ৩য় থেকে ৪র্থ দিন | মুখের ভেতরে গালের অংশে ছোট সাদা দাগ (Koplik spots) | নিশ্চিতকরণ পর্যায় |
| ৪র্থ থেকে ৬ষ্ঠ দিন | কানের পেছন ও মুখমণ্ডলে লালচে র্যাশ বা ফুসকুড়ি শুরু হওয়া | বিস্তার পর্যায় |
| ৬ষ্ঠ দিনের পর | র্যাশ সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়া এবং আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাওয়া | চূড়ান্ত পর্যায় |
লক্ষণগুলো সম্পর্কে জানার পর, কোনো শিশুর মাঝে এসব উপসর্গ দেখা দিলে অভিভাবক হিসেবে তাৎক্ষণিকভাবে কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, তা জানা অপরিহার্য।
অভিভাবকদের করণীয়
আপনার শিশুর মধ্যে হামের কোনো উপসর্গ দেখা দিলে আতঙ্কিত না হয়ে শান্তভাবে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমেই আক্রান্ত শিশুকে পরিবারের অন্য সুস্থ শিশুদের কাছ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা (Isolate) করে ফেলতে হবে। যেহেতু এটি বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়, তাই শিশুর ঘরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
লক্ষণ দেখা দেওয়ার সাথে সাথেই একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো অবস্থাতেই অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া যাবে না। হাম হলে শিশুর শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয়, তাই প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার, ডাবের পানি, ওরস্যালাইন এবং বুকের দুধ (শিশুর বয়স অনুযায়ী) খাওয়াতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে, যা হামের মারাত্মক জটিলতা এবং অন্ধত্বের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।
হাম আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসায় অভিভাবকদের প্রাথমিক দায়িত্বগুলো নিচের টেবিলে তুলে ধরা হলো।
উপসর্গ দেখা দিলে অভিভাবকদের তাৎক্ষণিক করণীয়
| করণীয় পদক্ষেপ | বিস্তারিত কাজ | গুরুত্ব |
| আইসোলেশন বা আলাদা রাখা | আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখা | সংক্রমণ রোধে অত্যাবশ্যক |
| চিকিৎসকের পরামর্শ | দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতাল বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া | সঠিক রোগ নির্ণয় |
| তরল খাবার প্রদান | ওরস্যালাইন, পানি ও পুষ্টিকর তরল খাবার বেশি করে দেওয়া | পানিশূন্যতা রোধ |
| ভিটামিন-এ ক্যাপসুল | চিকিৎসকের পরামর্শে বয়স অনুযায়ী ভিটামিন-এ খাওয়ানো | জটিলতা ও অন্ধত্ব রোধ |
রোগ হওয়ার পর চিকিৎসা করার চেয়ে, রোগটি যেন হতেই না পারে সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা সব থেকে বেশি বুদ্ধিমানের কাজ।
প্রতিরোধের উপায়
হাম প্রতিরোধের একমাত্র এবং সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সঠিক সময়ে শিশুকে টিকা দেওয়া। বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (EPI) অধীনে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে হাম-রুবেলা (MR) টিকা প্রদান করা হয়। এই টিকা সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত।
নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি শিশুকে হাম ও রুবেলার হাত থেকে বাঁচাতে দুই ডোজ টিকা দিতে হয়। শিশুর বয়স ঠিক ৯ মাস পূর্ণ হলে এমআর টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস পূর্ণ হলে দ্বিতীয় ডোজ দিতে হয়। কোনো কারণে নির্দিষ্ট সময়ে টিকা দিতে ভুলে গেলে বা দেরি হলে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করে বাদ পড়া টিকাটি দিয়ে নিতে হবে। মনে রাখবেন, একটি টিকা আপনার শিশুর জীবন বাঁচাতে পারে।
বাংলাদেশে শিশুদের জন্য নির্ধারিত হামের টিকার সময়সূচি নিচের ডাটা টেবিলে দেওয়া হলো।
বাংলাদেশে হাম প্রতিরোধের টিকা সময়সূচি (EPI)
| টিকার ডোজ | শিশুর বয়স | টিকার নাম | প্রাপ্তিস্থান |
| প্রথম ডোজ | ৯ মাস পূর্ণ হলে | হাম-রুবেলা (MR) টিকা | যেকোনো সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র/হাসপাতাল |
| দ্বিতীয় ডোজ | ১৫ মাস পূর্ণ হলে | হাম-রুবেলা (MR) টিকা | ইপিআই (EPI) টিকাদান কেন্দ্র |
| বিশেষ ডোজ | ক্যাম্পেইন চলাকালীন | সরকার নির্ধারিত সময়ে | সরকার ঘোষিত টিকাদান কেন্দ্র |
| ভিটামিন-এ | ৬-৫৯ মাস বয়সীদের | ভিটামিন-এ ক্যাপসুল | জাতীয় ভিটামিন-এ প্লাস ক্যাম্পেইন |
টিকা দেওয়ার পাশাপাশি এই রোগ সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করতে সমাজের প্রতিটি স্তরে ব্যাপক সচেতনতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
সচেতনতার গুরুত্ব
হামের মতো সংক্রামক ব্যাধি শুধু স্বাস্থ্য খাতের প্রচেষ্টায় দূর করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সর্বস্তরের মানুষের সচেতনতা। সমাজে টিকা নিয়ে এখনো কিছু ভ্রান্ত ধারণা বা গুজব প্রচলিত রয়েছে, যা হাম ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম বড় কারণ। আমাদের মনে রাখতে হবে, আপনার শিশু টিকা না নিলে সে শুধু নিজেই ঝুঁকিতে থাকছে না, বরং আপনার এলাকার অন্যান্য শিশুদেরও বিপদে ফেলছে।
স্কুল, মাদ্রাসা বা ডে-কেয়ার সেন্টারগুলোতে যদি কোনো শিশুর হাম হয়, তবে তাকে সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত বাড়িতে বিশ্রামে রাখতে হবে। শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকে একসাথে কাজ করতে হবে যাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে হামের ভয়াবহতা এবং টিকার প্রয়োজনীয়তার বার্তা পৌঁছে দেওয়া যায়।
সচেতনতা বৃদ্ধির মূল ক্ষেত্রগুলো সম্পর্কে সংক্ষেপে জানতে নিচের টেবিলটি দেখুন।
হাম প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতার রূপরেখা
| সচেতনতার ক্ষেত্র | প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ | ফলাফল |
| গুজব প্রতিরোধ | টিকা সংক্রান্ত যেকোনো বিভ্রান্তি ও ভ্রান্ত ধারণা দূর করা | টিকাদানের হার বৃদ্ধি |
| স্কুল ও ডে-কেয়ার | অসুস্থ শিশুকে স্কুলে না পাঠানো নিশ্চিত করা | গোষ্ঠীগত সংক্রমণ রোধ |
| কমিউনিটি সম্পৃক্ততা | উঠান বৈঠক ও স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে প্রচার চালানো | প্রান্তিক পর্যায়ে সচেতনতা |
| মিডিয়া প্রচারণা | গণমাধ্যমে সঠিক তথ্য ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ তুলে ধরা | জাতীয় পর্যায়ে সতর্কতা |
আমাদের এই সম্মিলিত সচেতনতা এবং সঠিক পদক্ষেপই পারে আগামী দিনে আমাদের শিশুদের একটি সুস্থ ও নিরাপদ জীবন উপহার দিতে।
শিশুর সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিতে আমাদের অঙ্গীকার
বাচ্চাদের হাসি এবং তাদের সুস্থতা একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ। সাম্প্রতিক সময়ে হামের এই অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাদুর্ভাব আমাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। অতীত ইতিহাস প্রমাণ করে, সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ এবং শতভাগ টিকাদানের মাধ্যমে আমরা পোলিও, গুটিবসন্তের মতো অনেক ভয়ংকর রোগকে পরাজিত করেছি। হামকেও পরাজিত করা সম্ভব, যদি আমরা আজই সচেতন হই।
আপনার শিশুর টিকাদান কার্ডটি আজই একবার পরীক্ষা করে দেখুন। যদি কোনো টিকা বাদ পড়ে থাকে, তবে কালক্ষেপণ না করে আজই তাকে নিকটস্থ টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে যান। সামান্য অবহেলা যেন সারা জীবনের কান্নার কারণ না হয়। সঠিক জ্ঞান, সচেতনতা এবং সময়োপযোগী চিকিৎসার মাধ্যমেই আমরা নিশ্চিত করতে পারি আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য এক সুস্থ, সুন্দর ও হাম-মুক্ত বাংলাদেশ।
স্বাস্থ্য সতর্কীকরণ
এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র জনসচেতনতার উদ্দেশ্যে লেখা। এটি কোনোভাবেই চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। শিশুর মধ্যে হামের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

