ইতিহাস কখনো এক মুহূর্তে বা জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় তৈরি হয় না। বরং, সাধারণ মানুষ, বিশ্বনেতা, শিল্পী, এবং বিপ্লবীদের দৈনন্দিন কাজ, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে স্তরে স্তরে গড়ে ওঠে এই ইতিহাস। আমরা যখন ‘আজকের এই দিন: ১৭ই আগস্ট’-এর দিকে ফিরে তাকাই, তখন মানবজাতির জয়, চরম ট্র্যাজেডি এবং যুগান্তকারী পরিবর্তনের এক চিত্তাকর্ষক টাইমলাইন আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
ভারতীয় উপমহাদেশে ভূ-রাজনৈতিক সীমানার রদবদল থেকে শুরু করে বিশ্বসাহিত্যের মাস্টারপিস প্রকাশ, আবার কিংবদন্তি অভিনেতাদের জন্ম থেকে ডিজিটাল মিউজিকে পদার্পণ—সব মিলিয়ে ১৭ই আগস্ট বিশ্ব ক্যালেন্ডারে এক অমোঘ এবং চিরস্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।
আপনি যদি সাধারণ জ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হন, ইতিহাসের একনিষ্ঠ ছাত্র হন, অথবা নিছকই অতীতের পাতা উল্টাতে ভালোবাসেন, তবে এই বিস্তৃত নিবন্ধটি আপনাকে ১৭ই আগস্টের ঘটে যাওয়া স্মরণীয় ঘটনা, বিখ্যাত মানুষদের জন্ম-মৃত্যু এবং বিশ্বব্যাপী পালিত দিবসগুলোর এক চমৎকার সফরে নিয়ে যাবে। চলুন, ইতিহাসের আর্কাইভ থেকে ঘুরে আসি।
বাঙালি বলয় এবং আমাদের ইতিহাস
আধুনিক বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে গঠিত বাংলার ইতিহাস একাধারে সাংস্কৃতিক জাগরণ, ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী প্রতিরোধ এবং হৃদয়বিদারক দেশভাগের এক করুণ আখ্যানে সমৃদ্ধ। এই অঞ্চলের জন্য ১৭ই আগস্ট দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, বিশেষ করে দেশভাগ এবং এর সাহিত্যিক ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপটে।
ঐতিহাসিক ঘটনাবলি: যে রেখা একটি জাতিকে বিভক্ত করেছিল
১৯৪৭ – র্যাডক্লিফ লাইনের প্রকাশ
ভারত ও পাকিস্তান ১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ই আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা লাভ করলেও, সদ্য গঠিত এই দুটি দেশের মাঝের সীমানা নির্ধারণকারী রেখা ১৭ই আগস্ট পর্যন্ত অপ্রকাশিত ছিল। ব্রিটিশ আইনজীবী স্যার সিরিল র্যাডক্লিফ, যিনি এই দায়িত্ব পাওয়ার আগে কখনো উপমহাদেশে পা-ই রাখেননি, তার আঁকা এই সীমানা বাংলা ও পাঞ্জাব প্রদেশকে নির্মমভাবে দ্বিখণ্ডিত করেছিল।
তাৎপর্য: সীমানা প্রকাশে এই বিলম্বের অর্থ হলো, স্বাধীনতার পর পুরো দু’দিন লক্ষ লক্ষ মানুষ জানতই না যে তারা আসলে কোন দেশের নাগরিক! নদীয়া এবং মালদহের মতো সীমান্তবর্তী শহরগুলো এক অদ্ভুত ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। তড়িঘড়ি করে টানা এই সীমানা স্থানীয় অবকাঠামো, নদী, সম্প্রদায় এবং এমনকি ব্যক্তিগত বসতবাড়িকেও বিভক্ত করেছিল। এর ফলে মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম গণদেশান্তরের ঘটনা ঘটে, যা দক্ষিণ এশিয়ার আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে চিরতরে বদলে দেয়। অবাক করা বিষয় হলো, নদীয়ার কিছু অঞ্চলে এখনো ১৮ই আগস্ট স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন করা হয়, কারণ ভারতে তাদের অন্তর্ভুক্তির খবর সেখানে একদিন দেরিতে পৌঁছেছিল।
২০০৫ – দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা (বাংলাদেশ): নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামায়াত-উল-মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার মাধ্যমে সকাল ১১:০০ থেকে ১১:৩০ মিনিটের মধ্যে দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬৩টিতেই একযোগে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। তাৎপর্য: আদালত প্রাঙ্গণ, প্রেসক্লাব এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো এই হামলা ছিল ধর্মীয় চরমপন্থার উত্থান সম্পর্কে একটি ভয়াবহ সতর্কবার্তা। এই ঘটনা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতিকে স্থায়ীভাবে বদলে দেয়। এর পরপরই সন্ত্রাসবিরোধী এলিট ফোর্স গঠন করা হয় এবং জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে দেশব্যাপী কঠোর অভিযান চালানো হয়, যা পরবর্তী দশকে দেশের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
বিখ্যাত জন্ম
-
উইলিয়াম কেরি (জন্ম: ১৭৬১): বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যাকে “আধুনিক বাংলার জনক” হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন, সেই উইলিয়াম কেরি ছিলেন একজন ইংরেজ ব্যাপটিস্ট মিশনারি। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর তার প্রভাব ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। ব্রিটিশ ভারতে এসে তিনি শ্রীরামপুর মিশন প্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বাইবেল এবং বহু ভারতীয় ধ্রুপদী সাহিত্য বাংলায় অনুবাদ করেন, প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা ব্যাকরণ বই রচনা করেন এবং আধুনিক বাংলা গদ্যের রূপরেখা তৈরিতে এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন।
বিখ্যাত মৃত্যু
-
শামসুর রাহমান (মৃত্যু: ২০০৬): আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রভাবশালী কবি। যাকে প্রায়ই বাংলাদেশের “অঘোষিত পোয়েট লরিয়েট” বা জাতীয় কবি-সমতুল্য মর্যাদা দেওয়া হয়। তিনি ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতা, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের এক অকুতোভয় প্রবক্তা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তার আইকনিক কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’ আপামর বাঙালির জন্য এক তুমুল অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিল। ২০০৬ সালের ১৭ই আগস্ট ৭৭ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নগরজীবনের বাস্তবতাকে নিপুণভাবে তুলে ধরে তিনি ‘নাগরিক কবি’ উপাধি পেয়েছিলেন এবং ৬০টিরও বেশি কাব্যগ্রন্থের এক বিশাল ও কালজয়ী উত্তরাধিকার রেখে গেছেন।
-
মদন লাল ধিংড়া (মৃত্যু: ১৯০৯): পাঞ্জাবি ছাত্র মদন লাল ধিংড়া ১৯০৯ সালের ১৭ই আগস্ট ব্রিটিশ কর্মকর্তা কার্জন উইলিকে গুপ্তহত্যা করেন। পরবর্তীতে পেন্টনভিল কারাগারে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। এই ঘটনাটি পুরো উপমহাদেশে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তার এই আত্মত্যাগ যুগান্তর এবং অনুশীলন সমিতির মতো বাংলার বিপ্লবী দলগুলোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল এবং সমগ্র বাংলা জুড়ে সশস্ত্র ঔপনিবেশিক বিরোধী প্রতিরোধের আগুনকে আরও প্রজ্জ্বলিত করেছিল।
আন্তর্জাতিক দিবস ও ছুটির দিনসমূহ

বিশ্বজুড়ে ১৭ই আগস্ট নানা বর্ণাঢ্য জাতীয় উৎসব এবং ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ দিবস পালনের মাধ্যমে স্মরণ করা হয়।
-
সর্বজনীন প্যান-আফ্রিকান পতাকা দিবস: জ্যামাইকান স্বপ্নদ্রষ্টা মার্কাস গার্ভের (জন্ম ১৭ই আগস্ট, ১৮৮৭) জন্মদিনকে সম্মান জানাতে এই দিনটি পালিত হয়। গার্ভে আইকনিক লাল, কালো এবং সবুজ প্যান-আফ্রিকান পতাকাকে জনপ্রিয় করেছিলেন, যা আজ বিশ্বব্যাপী কৃষ্ণাঙ্গদের মুক্তি, ঐক্য এবং গর্বের এক সার্বজনীন প্রতীক।
-
হারি কেমেরদেকান (ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা দিবস): ইন্দোনেশিয়া জুড়ে এটি এক বিশাল ও আনন্দমুখর উদযাপনের দিন। ১৯৪৫ সালের ১৭ই আগস্ট, জাতীয়তাবাদী নেতা সুকর্ণ এবং মোহাম্মদ হাত্তা ডাচ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। বর্তমানে দিনটি পতাকা উত্তোলন, ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা (যেমন- পিচ্ছিল খুঁটি বেয়ে ওঠার খেলা ‘পাঞ্জাত পিনাং’) এবং মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক কুচকাওয়াজের মাধ্যমে মহাসমারোহে পালিত হয়।
-
গ্যাবনের স্বাধীনতা দিবস: ১৯৬০ সালের ১৭ই আগস্ট গ্যাবন ফ্রান্সের কাছ থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে। রাজধানী লিব্রেভিলে সামরিক কুচকাওয়াজ এবং দেশের বৈচিত্র্যময় জাতিগত ঐতিহ্য তুলে ধরার মাধ্যমে দিনটি পালিত হয়।
-
জাতীয় অলাভজনক দিবস (যুক্তরাষ্ট্র): স্থানীয় সম্প্রদায় এবং বৈশ্বিক কল্যাণে দাতব্য সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী এবং অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো যে ইতিবাচক প্রভাব রাখছে, তার স্বীকৃতিস্বরূপ আমেরিকায় এই দিনটি পালিত হয়।
বিশ্ব ইতিহাস
ইতিহাস মূলত রাজনীতি, যুদ্ধ, শিল্পের মাইলফলক এবং বিজ্ঞানের যুগান্তকারী আবিষ্কারের সুতোয় বোনা এক বিশাল ক্যানভাস। আসুন দেখি বিভিন্ন মহাদেশে ১৭ই আগস্ট কীভাবে ছাপ রেখে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র
-
১৯৯৮ – ক্লিনটনের সাক্ষ্যদান: প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে গ্র্যান্ড জুরির সামনে তদন্তের বিষয়ে সাক্ষ্য দেন। সেদিন সন্ধ্যায় তিনি সরাসরি সম্প্রচারিত টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন এবং হোয়াইট হাউসের ইন্টার্ন মনিকা লিউইনস্কির সাথে তার “অনুপযুক্ত শারীরিক সম্পর্কের” কথা স্বীকার করেন। এই কেলেঙ্কারি আমেরিকার রাজনৈতিক সাংবাদিকতাকে নতুন রূপ দেয় এবং শেষ পর্যন্ত তার অভিশংসন (Impeachment) প্রক্রিয়ার দিকে গড়ায়।
-
১৮৫৯ – প্রথম এয়ারমেইল বা আকাশপথে ডাক বিলি: রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের আকাশে ওড়ার বহু আগে, জন ওয়াইজ নামের একজন অ্যারোনট ‘জুপিটার’ নামের একটি হট এয়ার বেলুন চালিয়ে ইন্ডিয়ানার লাফায়েট থেকে ক্রফোর্ডসভিলে ১২৩টি চিঠি নিয়ে যান। মার্কিন ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথম আনুষ্ঠানিক এয়ারমেইল ফ্লাইট।
রাশিয়া
-
১৯৯৮ – রুবল সংকট: রুশ সরকার তাদের মুদ্রা রুবলের মান অবমূল্যায়ন করে, অভ্যন্তরীণ ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা প্রকাশ করে এবং বিদেশি ঋণ পরিশোধ স্থগিত ঘোষণা করে বৈশ্বিক বাজারে এক বিশাল ধাক্কা দেয়। এই বিপর্যয়কর আর্থিক ধসের ফলে লক্ষ লক্ষ সাধারণ রাশিয়ানের সঞ্চয় নিমেষে শূন্য হয়ে যায় এবং একটি রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে ভ্লাদিমির পুতিনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসার পথ প্রশস্ত করেছিল।
চীন
-
১৯৮২ – ১৭ই আগস্টের ইশতেহার: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চীন একটি যৌথ ইশতেহার প্রকাশ করে, যা তাদের আধুনিক কূটনীতির তিনটি মৌলিক দলিলের অন্যতম। এতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি কমানোর প্রতিশ্রুতি দেয়—যা বর্তমানের উত্তেজনাপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং বিতর্কের বিষয়।
যুক্তরাজ্য
-
১৯৪৫ – অ্যানিমেল ফার্ম প্রকাশ: জর্জ অরওয়েল তার তীক্ষ্ণ রূপক উপন্যাসের মাস্টারপিস ‘অ্যানিমেল ফার্ম’ (Animal Farm) প্রকাশ করেন। এটি ছিল মূলত রুশ বিপ্লব এবং সোভিয়েত সাম্যবাদের স্টালিনবাদী একনায়কতন্ত্রে পতনের এক অনবদ্য সমালোচনা। এই বইটি বিশ্ববাসীর শব্দভাণ্ডারে “সব প্রাণীই সমান, কিন্তু কিছু প্রাণী অন্যদের চেয়ে বেশি সমান” (All animals are equal, but some animals are more equal than others)-এর মতো অমর বাক্য যোগ করে।
ইউরোপ
-
১৯৬২ – বার্লিন প্রাচীরে ট্র্যাজেডি: স্নায়ুযুদ্ধের অন্যতম হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে এদিন। ১৮ বছর বয়সী পিটার ফেখটার পূর্ব জার্মানি থেকে পশ্চিম বার্লিনে পালিয়ে যাওয়ার সময় সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে বিদ্ধ হন। তিনি দুই দেয়ালের মাঝের “ডেথ স্ট্রিপ”-এ পড়ে যান এবং পশ্চিমা গণমাধ্যম, সৈন্য ও সাধারণ মানুষের সামনে প্রায় এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে রক্তক্ষরণে ভুগে মারা যান। তার এই করুণ মৃত্যু ছিল আয়রন কার্টেনের (Iron Curtain) নির্মমতার এক ভয়ংকর আন্তর্জাতিক প্রতীক।
অস্ট্রেলিয়া
-
১৯৮০ – আজারিয়া চেম্বারলেইন মামলা: উলুরুর কাছের একটি ক্যাম্পসাইট থেকে দুই মাস বয়সী শিশু আজারিয়া চেম্বারলেইন নিখোঁজ হয়ে যায়। তার মা লিন্ডি দাবি করেন যে, একটি ডিঙ্গো (বুনো কুকুর) তার সন্তানকে নিয়ে গেছে। এরপরের বিচার প্রক্রিয়াটি রীতিমতো মিডিয়া সার্কাসে পরিণত হয়, যার ফলে খুনের দায়ে লিন্ডিকে ভুলভাবে সাজা দেওয়া হয়। বহু বছর পর তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন। এই মামলাটি অস্ট্রেলিয়ার আইনি ব্যবস্থা এবং মিডিয়া এথিক্সকে গভীরভাবে পরিবর্তন করেছিল।
কানাডা
-
১৮৯৬ – ক্লনডাইক গোল্ড রাশ শুরু: প্রসপেক্টর জর্জ কারম্যাক, কেট কারম্যাক এবং স্কুকুম জিম ইউকনের বোনাঞ্জা ক্রিকে সোনার সন্ধান পান। এই খবর বহির্বিশ্বে পৌঁছালে শুরু হয় কিংবদন্তি ‘ক্লনডাইক গোল্ড রাশ’। সোনার খোঁজে এক লাখেরও বেশি মানুষ বরফঢাকা উত্তরের দিকে ছুটে যায়। এর ফলে অঞ্চলটির দ্রুত উন্নয়ন হলেও, স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায় এবং বাস্তুতন্ত্রের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়, তা আজও দৃশ্যমান।
বিশ্বের অন্যান্য প্রান্ত (মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া এবং দক্ষিণ আমেরিকা)
-
১৯৯৯ – ইজমিত ভূমিকম্প (তুরস্ক): উত্তর-পশ্চিম তুরস্কে এদিন ৭.৬ মাত্রার এক প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প আঘাত হানে। মাত্র ৩৭ সেকেন্ড স্থায়ী এই ভূমিকম্পে ১৭,০০০-এরও বেশি মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয় এবং প্রায় ৫ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। এই বিপর্যয় ওই অঞ্চলের নির্মাণ বিধিমালার মারাত্মক ত্রুটিগুলো বিশ্বের সামনে উন্মোচিত করেছিল।
-
১৯৮৮ – জেনারেল জিয়া-উল-হকের বিমান দুর্ঘটনা (পাকিস্তান): পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়া-উল-হক, মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্নল্ড র্যাফেল এবং শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের বহনকারী সি-১৩০ হারকিউলিস বিমানটি বাহাওয়ালপুর থেকে উড্ডয়নের পরপরই রহস্যজনকভাবে বিধ্বস্ত হয়। এই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে আজও এক অমীমাংসিত রহস্য হয়ে রয়ে গেছে।
উল্লেখযোগ্য জন্ম ও মৃত্যু (বিশ্বজুড়ে)
১৭ই আগস্ট বহু প্রতিভাবান মানুষের জন্ম যেমন দেখেছে, তেমনি বিদায় জানিয়েছে অসাধারণ কিছু ব্যক্তিত্বকে। এখানে রইল এই দিনে জন্মগ্রহণকারী বা মৃত্যুবরণকারী উল্লেখযোগ্য বৈশ্বিক ব্যক্তিত্বদের কথা।
বিখ্যাত জন্ম
-
পিয়েরে দ্য ফের্মা (১৬০১ বা ১৬০৭, ফরাসি): একজন অত্যন্ত প্রতিভাবান গণিতবিদ। তার “লাস্ট থিওরেম” বা শেষ উপপাদ্যটি ৩৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে গণিত বিশ্বের সেরা সব মস্তিষ্ককে বিভ্রান্ত করে রেখেছিল, যা শেষমেশ ১৯৯৪ সালে এসে প্রমাণিত হয়।
-
মার্কাস গার্ভে (১৮৮৭, জ্যামাইকান): রাজনৈতিক সক্রিয়তার এক অবিসংবাদিত নেতা এবং ইউনিভার্সাল নিগ্রো ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (UNIA)-এর প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ জাতীয়তাবাদ এবং প্যান-আফ্রিকান আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর।
-
মে ওয়েস্ট (১৮৯৩, আমেরিকান): প্রারম্ভিক হলিউডের এক আইকনিক অভিনেত্রী, নাট্যকার এবং সেক্স সিম্বল। পুরুষশাসিত এক যুগে তিনি তার তীক্ষ্ণ রসবোধ, দ্ব্যর্থবোধক সংলাপ এবং আপসহীন স্বাধীনতার জন্য তুমুল জনপ্রিয় ছিলেন।
-
ভি.এস. নাইপল (১৯৩২, ত্রিনিদাদিয়ান-ব্রিটিশ): নোবেল বিজয়ী লেখক। তিনি তার ক্ষুরধার লেখনী এবং উপন্যাসের (যেমন- এ হাউস ফর মিস্টার বিশ্বাস) জন্য বিখ্যাত, যেখানে তিনি উপনিবেশবাদের দীর্ঘস্থায়ী মানসিক আঘাত, বাস্তুচ্যুতি এবং জটিলতাগুলোকে গভীরভাবে অন্বেষণ করেছেন।
-
রবার্ট ডি নিরো (১৯৪৩, আমেরিকান): দুইবারের অস্কারজয়ী শক্তিমান অভিনেতা ও প্রযোজক। ট্যাক্সি ড্রাইভার, রেজিং বুল এবং দ্য গডফাদার পার্ট টু-এর মতো সিনেমাগুলোতে তার মেথড-অ্যাক্টিংয়ের জাদুকরী প্রদর্শনী তাকে কিংবদন্তির আসনে বসিয়েছে।
-
শন পেন (১৯৬০, আমেরিকান): অত্যন্ত প্রশংসিত অভিনেতা, পরিচালক এবং রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্ট। তিনি মিস্টিক রিভার এবং মিল্ক সিনেমার জন্য দু’বার সেরা অভিনেতার একাডেমি পুরস্কার জিতেছেন।
-
থিয়েরি অঁরি (১৯৭৭, ফরাসি): ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার। আর্সেনাল এফসিতে তার রেকর্ড ভাঙা বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার এবং ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের বিশ্বকাপ জয়ে অনবদ্য ভূমিকার জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
বিখ্যাত মৃত্যু
-
হোসে দে সান মার্টিন (১৮৫০, আর্জেন্টাইন): মহান বিপ্লবী জেনারেল যিনি আন্দিজ পর্বতমালা জুড়ে দুর্ধর্ষ সামরিক অভিযান পরিচালনা করে স্পেনীয় সাম্রাজ্যের কবল থেকে আর্জেন্টিনা, চিলি এবং পেরুকে মুক্ত করেছিলেন। ক্ষমতার প্রতি নির্মোহ থেকে নেতৃত্ব ছেড়ে দেওয়ার মানসিকতা তাকে একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক হিসেবে অমর করে রেখেছে।
-
অটো স্টার্ন (১৯৬৯, জার্মান-আমেরিকান): পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী। পরীক্ষামূলক কোয়ান্টাম মেকানিক্সে তার যুগান্তকারী কাজ এবং প্রোটনের ম্যাগনেটিক মোমেন্টাম আবিষ্কারের জন্য তিনি বিজ্ঞান জগতে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
-
আইরা গারশউইন (১৯৮৩, আমেরিকান): কিংবদন্তি ব্রডওয়ে গীতিকার। সুরকার ভাই জর্জ গারশউইনের সাথে কাজ করে তিনি বিংশ শতাব্দীর বেশ কিছু অমর সঙ্গীতের সুর ও কথা রচনা করেছেন, যার মধ্যে বিখ্যাত অপেরা পোর্গি অ্যান্ড বেস অন্যতম।
-
রুডলফ হেস (১৯৮৭, জার্মান): অ্যাডলফ হিটলারের প্রাক্তন ডেপুটি ফুয়েরার। ১৯৪১ সালে তিনি একটি অদ্ভুত এবং অননুমোদিত শান্তি মিশনে স্কটল্যান্ডে উড়ে যান। জীবনের বাকি সময়টুকু তাকে কারাগারেই কাটাতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত স্প্যান্ডাউ কারাগারে ৯৩ বছর বয়সে তিনি আত্মহত্যা করেন।
আপনি কি জানতেন? কিছু অজানা তথ্য
ইতিহাস কেবল চুক্তি আর যুদ্ধের নিরস ধারাবিবরণী নয়; এটি মজাদার এবং অদ্ভুত সব চমকে ভরপুর। আগামী আড্ডায় বন্ধুদের তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো ১৭ই আগস্টের তিনটি অজানা তথ্য জেনে নিন:
-
সিডি যুগের সূচনা: আপনি যদি কখনো অডিও সিডি (CD) সংগ্রহ করে থাকেন, তবে আজকের দিনটির কাছে আপনার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। ১৯৮২ সালের এই দিনে জার্মানির ল্যাঙ্গেনহাগেনে ফিলিপসের একটি কারখানায় বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক কম্প্যাক্ট ডিস্ক (সিডি) তৈরি করা হয়েছিল। এই নতুন চকচকে প্রযুক্তিতে অমর হওয়া প্রথম অ্যালবামটি কার ছিল জানেন? জনপ্রিয় ব্যান্ড অ্যাবা (ABBA)-র দ্য ভিজিটরস!
-
পতাকা বিভ্রাট: ভারত ও পাকিস্তানকে বিভক্তকারী র্যাডক্লিফ লাইনটি ১৭ই আগস্ট (১৯৪৭) পর্যন্ত গোপন রাখার কারণে সীমান্ত এলাকাগুলোতে এক ভয়াবহ বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছিল। স্বাধীনতার পর টানা ৪৮ ঘণ্টা বাংলা ও পাঞ্জাবের বেশ কয়েকটি জেলা ভুলবশত “অন্য” দেশের পতাকা উড়িয়েছিল! কারণ সরকারি মানচিত্র পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত তারা টেরই পায়নি যে তারা আসলে কোন দেশের অংশ।
-
কালো বিড়ালের দিন: পশ্চিমা সংস্কৃতিতে এক অদ্ভুত কুসংস্কার রয়েছে কালো বিড়াল নিয়ে। সেই কুসংস্কার ভাঙতে ইন্টারনেটের একটি বড় অংশ এবং পশু আশ্রয়কেন্দ্রগুলো ১৭ই আগস্টকে ‘কালো বিড়াল প্রশংসা দিবস’ (Black Cat Appreciation Day) হিসেবে উদ্যাপন করে। কালো বিড়াল দুর্ভাগ্য বয়ে আনে—শতক শতক ধরে চলা এই মিথ ভাঙতেই এবং মানুষ যেন তাদের আপন করে নেয়, সেই উদ্দেশ্যে দিনটির প্রচলন।
শেষ কথা
সাম্রাজ্যের সীমানা পরিবর্তন থেকে শুরু করে বিশ্বসাহিত্যের যুগান্তকারী রচনার প্রকাশ—সব দিক দিয়েই ১৭ই আগস্ট ইতিহাসের পাতায় এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, র্যাডক্লিফ লাইনের মতো ভূ-রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে প্রভাবিত করে। একই সাথে এটি ইন্দোনেশিয়া বা গ্যাবনের মতো দেশগুলোর স্বাধীনতা আদায়ের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মানুষের অদম্য স্পৃহার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।
“আজকের এই দিনে” কী ঘটেছিল, তা ফিরে দেখার মাধ্যমে আমরা আসলে আমাদের নিজেদের শেকড়কেই নতুন করে চিনতে পারি। আমাদের বর্তমান সমাজের কাঠামো কীভাবে গড়ে উঠেছে তা অনুধাবন করতে পারি এবং সেই সব শিল্পী, বিজ্ঞানী ও বিপ্লবীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারি, যারা তিল তিল করে আমাদের আজকের এই বিশ্বকে রূপ দিয়েছেন। ইতিহাস আসলে কখনোই কেবল অতীতের খাতায় বন্দি থাকে না; এর প্রতিধ্বনি আমরা শুনতে পাই আমাদের পার হওয়া প্রতিটি সীমানায়, আমাদের পড়া প্রতিটি বইয়ে এবং আজ আমরা যে স্বাধীনতা ভোগ করছি, তার প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসে।

