ইতিহাসের প্রতিটি তারিখের ভেতরে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য মানুষের গল্প। কোথাও যুদ্ধ, কোথাও বিজ্ঞান, কোথাও রাজনীতি, কোথাও শিল্প, আবার কোথাও এমন এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যা আজও মানুষকে বিস্মিত করে। ২১ আগস্ট এমনই একটি দিন, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্ব ইতিহাসের বহু আলোচিত ও বেদনাদায়ক ঘটনা।
এই দিনেই প্যারিসের ল্যুভর জাদুঘর থেকে চুরি হয়েছিল মোনালিসা। বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০০৪ সালের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার স্মৃতিও বহন করে ২১ আগস্ট। এই তারিখে প্রয়াত হন সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর ও ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খানের মতো কিংবদন্তি। আবার ২১ আগস্টেই জন্মেছিলেন উসাইন বোল্ট, উইল্ট চেম্বারলেইন এবং সের্গেই ব্রিন।
চলুন, সময়ের সিঁড়ি ধরে ফিরে দেখা যাক ইতিহাসে ২১ আগস্টের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, বিখ্যাত জন্মদিন, উল্লেখযোগ্য মৃত্যু এবং আন্তর্জাতিক দিবসগুলো।
বাংলাদেশে ২১ আগস্ট: ২০০৪ সালের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২১ আগস্ট ২০০৪ গভীর শোক ও আতঙ্কের দিন।
সেদিন ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক সহিংসতার প্রতিবাদে আয়োজিত সেই সমাবেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ উপস্থিত ছিলেন। একটি ট্রাককে অস্থায়ী মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি শেখ হাসিনা বক্তব্য শেষ করার পরপরই পরিস্থিতি বদলে যায়। জনসমাগমের দিকে একের পর এক গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাবেশ পরিণত হয় ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞে।
বিস্ফোরণের শব্দ, ধোঁয়া, আহত মানুষের আর্তনাদ এবং চারদিকে ছুটোছুটি—পুরো এলাকা যেন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। শেখ হাসিনাকে তাঁর আশপাশের নেতাকর্মীরা ঘিরে ফেলেন এবং মানবঢাল তৈরি করেন। তিনি প্রাণে বেঁচে যান, যদিও বিস্ফোরণের অভিঘাতে তাঁর শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা পরবর্তী সময়ে উল্লেখ করা হয়।
হামলায় ২৪ জন নিহত হন এবং কয়েকশ মানুষ আহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমান। গুরুতর আহত হওয়ার পর কয়েক দিন চিকিৎসাধীন থেকে তিনি মারা যান।
অনেক আহত মানুষ বছরের পর বছর শরীরে স্প্লিন্টার নিয়ে বেঁচে ছিলেন। কারও জীবন স্থায়ীভাবে বদলে যায়, কেউ হারান স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা।
আজও ২১ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সংগঠিত সহিংসতার অন্যতম ভয়াবহ উদাহরণ হিসেবে স্মরণ করা হয়।
সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর: যে তরুণ নক্ষত্রের মৃত্যুর রহস্য বদলে দিয়েছিলেন
২১ আগস্টের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর।
১৯৩০ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে ভারত থেকে ইংল্যান্ডে যাওয়ার পথে জাহাজে বসেই তিনি নক্ষত্রের শেষ পরিণতি নিয়ে হিসাব শুরু করেছিলেন। তাঁর প্রশ্ন ছিল সরল, কিন্তু উত্তর ছিল মহাবিশ্বের অন্যতম বড় রহস্যের সঙ্গে যুক্ত।
একটি নক্ষত্র যখন তার জ্বালানি শেষ করে, তখন কী হয়?
চন্দ্রশেখর দেখান, মৃত নক্ষত্রের ভর যদি একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে থাকে, তাহলে সেটি শ্বেত বামন বা হোয়াইট ডোয়ার্ফ হিসেবে স্থিতিশীল থাকতে পারে। কিন্তু ভর যদি সূর্যের ভরের প্রায় ১.৪৪ গুণের বেশি হয়, তাহলে সেটি আর সেই অবস্থায় স্থিতিশীল থাকতে পারে না।
এই সীমাই পরে পরিচিত হয় চন্দ্রশেখর সীমা নামে।
পরবর্তী জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞান দেখায়, বেশি ভরের নক্ষত্রের শেষ পরিণতি নিউট্রন তারা বা ব্ল্যাক হোল হতে পারে।
শুরুতে তাঁর তত্ত্ব সহজে গ্রহণ করা হয়নি। তৎকালীন কয়েকজন বিখ্যাত বিজ্ঞানী তাঁর বক্তব্যের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু সময় ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ শেষ পর্যন্ত তাঁর কাজের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
১৯৮৩ সালে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।
২১ আগস্ট ১৯৯৫ তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
একজন তরুণের জাহাজযাত্রার সময় করা গণনা যে মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের ধারণাই বদলে দিতে পারে, চন্দ্রশেখরের জীবন তার অসাধারণ উদাহরণ।
ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান: শেহনাইয়ের অনন্য সাধক
২১ আগস্ট ২০০৬ ভারতীয় সংগীতের জগৎ হারায় কিংবদন্তি শেহনাইবাদক ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খানকে।
শেহনাই বহুদিন ধরে ভারতীয় বিয়ে, মন্দির এবং বিভিন্ন উৎসবের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু বিসমিল্লাহ খান এই বাদ্যযন্ত্রকে শাস্ত্রীয় সংগীতের পূর্ণাঙ্গ মঞ্চে প্রতিষ্ঠা করেন।
তাঁর জন্ম বিহারের দুমরাঁওয়ে হলেও শিল্পীজীবনের সঙ্গে সবচেয়ে গভীরভাবে যুক্ত ছিল বারাণসী।
গঙ্গার ঘাট, পুরোনো শহরের পরিবেশ এবং মন্দিরের আঙিনায় নিয়মিত অনুশীলনের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের স্বতন্ত্র সংগীতভাষা তৈরি করেন।
বিসমিল্লাহ খান ছিলেন মুসলমান, কিন্তু কাশীর হিন্দু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গেও তাঁর ছিল গভীর সম্পর্ক। তাই তাঁকে প্রায়ই ভারতের মিলিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বা গঙ্গা-যমুনা তেহজিবের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা উদ্যাপনের ঐতিহাসিক মুহূর্তেও তাঁর শেহনাই বেজেছিল।
ভারত সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ভারতরত্ন প্রদান করে।
তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব সম্ভবত এখানেই—একটি লোকজ ও অনুষ্ঠানভিত্তিক বাদ্যযন্ত্রকে তিনি বিশ্বমানের শাস্ত্রীয় সংগীতের মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছিলেন।
১৯১১: যেদিন ল্যুভর থেকে হারিয়ে গেল মোনালিসা
আজ মোনালিসা বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত চিত্রকর্মগুলোর একটি। প্যারিসের ল্যুভর জাদুঘরে ছবিটির সামনে প্রায় সব সময়ই ভিড় দেখা যায়।
কিন্তু একসময় এটি এতটা বিশ্ববিখ্যাত ছিল না।
ছবিটির জনপ্রিয়তা বিস্ফোরকভাবে বেড়ে যায় একটি অবিশ্বাস্য ঘটনার পর।
তারিখটি ছিল ২১ আগস্ট ১৯১১।
সেদিন ল্যুভর সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ ছিল। ইতালীয় কর্মী ভিনচেঞ্জো পেরুজিয়া, যিনি আগে জাদুঘরে কাজ করেছিলেন, সুযোগ বুঝে মোনালিসা দেয়াল থেকে নামিয়ে ফেলেন।
ছবিটি ফ্রেম থেকে আলাদা করে নিজের কর্মীদের পোশাকের নিচে লুকিয়ে তিনি জাদুঘর থেকে বেরিয়ে যান।
আরও আশ্চর্যের বিষয়, ছবিটি সঙ্গে সঙ্গে নিখোঁজ হিসেবে ধরা পড়েনি। প্রথমে মনে করা হয়েছিল, হয়তো আলোকচিত্র তোলার জন্য কোথাও সরানো হয়েছে।
পরে যখন নিশ্চিত হওয়া গেল যে মোনালিসা সত্যিই চুরি হয়েছে, তখন শুরু হয় আন্তর্জাতিক তোলপাড়।
পত্রিকাগুলো ছবিটির মুখ প্রথম পাতায় ছাপতে থাকে। বিশ্বজুড়ে মানুষ মোনালিসার রহস্যময় হাসি চিনতে শুরু করে।
ফরাসি পুলিশ কবি গিয়োম আপোলিনেরকে আটক করে এবং শিল্পী পাবলো পিকাসোকেও জিজ্ঞাসাবাদ করে।
অথচ প্রকৃত চোর তখন ছবিটি নিজের কাছেই লুকিয়ে রেখেছিল।
প্রায় দুই বছর পর পেরুজিয়া ইতালির ফ্লোরেন্সে ছবিটি হস্তান্তর বা বিক্রির চেষ্টা করলে ধরা পড়ে।
তিনি দাবি করেছিলেন, ইতালীয় দেশপ্রেম থেকেই তিনি ছবিটি ইতালিতে ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন।
পরে মোনালিসা আবার ফ্রান্সে ফিরে আসে।
কিন্তু তখন আর এটি শুধু একটি বিখ্যাত রেনেসাঁ চিত্রকর্ম ছিল না।
চুরির সংবাদ, রহস্য এবং আন্তর্জাতিক প্রচারণা ছবিটিকে বিশ্ব সংস্কৃতির এক অমর প্রতীকে পরিণত করে।
১৮৩১: ন্যাট টার্নারের বিদ্রোহ
২১ আগস্ট ১৮৩১ যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় শুরু হয় দাসপ্রথার ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত বিদ্রোহ।
এর নেতৃত্বে ছিলেন ন্যাট টার্নার, একজন দাসত্বের শিকার আফ্রিকান-আমেরিকান ধর্মপ্রচারক।
টার্নার বিশ্বাস করতেন, তিনি ঈশ্বরের কাছ থেকে বিশেষ নির্দেশ পাচ্ছেন। সূর্যগ্রহণসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনাকে তিনি বিদ্রোহের সংকেত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন।
২১ আগস্ট রাতে তিনি সহযোগীদের নিয়ে বিদ্রোহ শুরু করেন।
কয়েক ডজন দাস ও মুক্ত কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ এতে যোগ দেন। বিদ্রোহের সময় প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ জন শ্বেতাঙ্গ নিহত হন।
কয়েক দিনের মধ্যেই স্থানীয় বাহিনী বিদ্রোহ দমন করে।
এরপর শুরু হয় প্রতিশোধমূলক সহিংসতা। বিদ্রোহে অংশ না নেওয়া বহু কৃষ্ণাঙ্গ মানুষও হামলার শিকার হন।
ন্যাট টার্নার কিছুদিন আত্মগোপনে থাকার পর আটক হন এবং পরে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
এই বিদ্রোহের পর দক্ষিণের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে দাসদের শিক্ষা, চলাচল ও ধর্মীয় সমাবেশের ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
অল্প সময়ের বিদ্রোহ হলেও এটি আমেরিকার দাসপ্রথা ও পরবর্তী গৃহযুদ্ধের ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলে।
১৯৬৮: প্রাগ স্প্রিং থামাতে সোভিয়েত ট্যাংক
১৯৬৮ সালে চেকোস্লোভাকিয়ায় রাজনৈতিক সংস্কারের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল।
দেশটির নেতা আলেকজান্ডার দুবচেক এমন এক সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়তে চেয়েছিলেন, যেখানে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাড়বে এবং সেন্সরশিপ কমবে।
এই সময়কে বলা হয় প্রাগ স্প্রিং।
দুবচেক তাঁর নীতিকে বর্ণনা করেছিলেন “মানবিক মুখের সমাজতন্ত্র” হিসেবে।
কিন্তু সোভিয়েত নেতৃত্ব আশঙ্কা করেছিল, চেকোস্লোভাকিয়ার এই পরিবর্তন পূর্ব ইউরোপের অন্য দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ফলে ২০ আগস্ট রাত থেকে ২১ আগস্ট ১৯৬৮-এর ভোরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ওয়ারশ চুক্তিভুক্ত কয়েকটি দেশের সেনাবাহিনী চেকোস্লোভাকিয়ায় প্রবেশ করে।
প্রাগের রাস্তায় ট্যাংক নামে।
সাধারণ মানুষ সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে ব্যাপক সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলেও অভিনব অহিংস প্রতিবাদ শুরু করে। অনেক জায়গায় রাস্তার সাইনবোর্ড ঘুরিয়ে দেওয়া হয়, যাতে সৈন্যরা বিভ্রান্ত হয়।
শেষ পর্যন্ত সামরিক আগ্রাসনের মুখে প্রাগ স্প্রিং থেমে যায়।
তবে ঘটনাটি পূর্ব ইউরোপে স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক সংস্কারের প্রতীকে পরিণত হয়।
১৯৮৩: নিনয় অ্যাকুইনোর হত্যাকাণ্ড
২১ আগস্ট ১৯৮৩ ফিলিপাইনের বিরোধী নেতা বেনিগনো “নিনয়” অ্যাকুইনো জুনিয়র দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরছিলেন।
তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোসের কর্তৃত্ববাদী সরকারের অন্যতম প্রধান বিরোধী নেতা ছিলেন তিনি।
ম্যানিলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান থেকে নামানোর পরপরই তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এই হত্যাকাণ্ড ফিলিপাইনের রাজনীতিতে বিশাল পরিবর্তন আনে।
অ্যাকুইনোর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেয়। তাঁর মৃত্যু ধীরে ধীরে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়।
১৯৮৬ সালে People Power Revolution-এর মাধ্যমে মার্কোস ক্ষমতাচ্যুত হন। পরে রাষ্ট্রপতি হন নিনয় অ্যাকুইনোর স্ত্রী কোরাজন অ্যাকুইনো।
আজও ফিলিপাইনে ২১ আগস্ট Ninoy Aquino Day হিসেবে স্মরণ করা হয়।
১৯৮৬: লেক নিয়োসের অদৃশ্য মৃত্যুমেঘ
২১ আগস্ট ১৯৮৬ ক্যামেরুনের লেক নিয়োসে ঘটে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে অস্বাভাবিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলোর একটি।
লেক নিয়োস একটি আগ্নেয়গিরির ক্রেটার হ্রদ।
দীর্ঘ সময় ধরে ভূগর্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড হ্রদের গভীর পানিতে জমা হচ্ছিল। গভীরে পানির চাপ বেশি থাকায় গ্যাসটি আটকে ছিল।
হঠাৎ কোনো প্রাকৃতিক অস্থিরতায় সেই ভারসাম্য ভেঙে যায়।
বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড দ্রুত হ্রদ থেকে বেরিয়ে আসে। ঘটনাটিকে বলা হয় লিমনিক ইরাপশন।
কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসের চেয়ে ভারী হওয়ায় গ্যাসটি নিচু এলাকা ধরে আশপাশের গ্রামগুলোর দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
অদৃশ্য এই গ্যাসের মেঘ বাতাসের অক্সিজেন সরিয়ে দেয়।
ফলে ১,৭০০-এর বেশি মানুষ এবং হাজার হাজার গবাদিপশু মারা যায়।
ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটেছিল যে অনেক মানুষ ঘুমের মধ্যেই প্রাণ হারান।
পরবর্তী সময়ে হ্রদে বিশেষ পাইপ বসিয়ে গভীর পানিতে জমা গ্যাস ধীরে ধীরে বের করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
২১ আগস্টের আন্তর্জাতিক দিবস

বিশ্ব প্রবীণ নাগরিক দিবস
২১ আগস্ট বিভিন্ন দেশে World Senior Citizen’s Day পালন করা হয়।
১৯৮৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান প্রবীণ নাগরিকদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্দেশ্যে একটি ঘোষণা জারি করেন।
বর্তমানে দিনটি প্রবীণ মানুষের স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং সমাজে তাঁদের অবদান নিয়ে সচেতনতা তৈরির উপলক্ষ হিসেবে দেখা হয়।
সন্ত্রাসবাদের শিকার মানুষদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস
জাতিসংঘ ২০১৭ সালে ২১ আগস্টকে International Day of Remembrance of and Tribute to the Victims of Terrorism হিসেবে ঘোষণা করে।
এই দিনে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ও আহত মানুষদের স্মরণ করা হয় এবং বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা ও অধিকার নিয়ে আলোচনা করা হয়।
বাংলাদেশের জন্য দিনটির তাৎপর্য আরও গভীর, কারণ একই তারিখে ২০০৪ সালের ঢাকার গ্রেনেড হামলার স্মৃতিও ফিরে আসে।
নিনয় অ্যাকুইনো দিবস
ফিলিপাইনে ২১ আগস্ট Ninoy Aquino Day হিসেবে পালিত হয়।
দিনটি বেনিগনো অ্যাকুইনো জুনিয়রের হত্যাকাণ্ড এবং দেশটির গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা স্মরণ করে।
২১ আগস্টে জন্ম নেওয়া বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব
উসাইন বোল্ট
২১ আগস্ট ১৯৮৬ জ্যামাইকায় জন্মেছিলেন উসাইন বোল্ট।
তিনি শুধু একজন সফল স্প্রিন্টার নন, দৌড়ের ইতিহাসে মানবগতির নতুন মানদণ্ড স্থাপনকারী অ্যাথলেট।
২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিকে তিনি ১০০ ও ২০০ মিটারে বিশ্বরেকর্ড করেন।
২০০৯ সালের বার্লিন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি ১০০ মিটার দৌড় শেষ করেন মাত্র ৯.৫৮ সেকেন্ডে এবং ২০০ মিটার দৌড় শেষ করেন ১৯.১৯ সেকেন্ডে।
তাঁর উঁচু গড়ন, বিশাল স্ট্রাইড এবং অবিশ্বাস্য গতি তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছিল।
তবে বোল্টের জনপ্রিয়তার আরেকটি কারণ ছিল তাঁর ব্যক্তিত্ব। প্রতিযোগিতার চাপের মধ্যেও হাসি, আত্মবিশ্বাস এবং পরিচিত “লাইটনিং বোল্ট” ভঙ্গি তাঁকে বিশ্ব ক্রীড়ার এক অনন্য চরিত্রে পরিণত করে।
উইল্ট চেম্বারলেইন
২১ আগস্ট ১৯৩৬ জন্মেছিলেন এনবিএ ইতিহাসের কিংবদন্তি উইল্ট চেম্বারলেইন।
৭ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার এই খেলোয়াড় ছিলেন শক্তি, গতি ও দক্ষতার বিরল সমন্বয়।
১৯৬২ সালে একটি এনবিএ ম্যাচে তিনি একাই ১০০ পয়েন্ট করেন। আজও সেই রেকর্ড ভাঙেনি।
চেম্বারলেইন এতটাই প্রভাবশালী ছিলেন যে তাঁর আধিপত্য সামাল দিতে বাস্কেটবলের কিছু নিয়মও পরিবর্তন করা হয়েছিল।
সের্গেই ব্রিন
২১ আগস্ট ১৯৭৩ মস্কোয় জন্মেছিলেন সের্গেই ব্রিন।
শৈশবে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান তিনি। পরে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর পরিচয় হয় ল্যারি পেজের সঙ্গে।
দুজন মিলে তৈরি করেন PageRank অ্যালগরিদম, যা ওয়েবসাইটের গুরুত্ব নির্ধারণে নতুন পদ্ধতি দেয়।
১৯৯৮ সালে তাঁরা প্রতিষ্ঠা করেন Google।
আজ তথ্য খোঁজা, সংবাদ পড়া, মানচিত্র দেখা কিংবা অনলাইনে গবেষণা করার যে অভ্যাস আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ, তার পেছনে ব্রিন ও পেজের প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের বিশাল ভূমিকা রয়েছে।
২১ আগস্টে প্রয়াত উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব
লিওন ট্রটস্কি
রুশ বিপ্লবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা লিওন ট্রটস্কি মারা যান ২১ আগস্ট ১৯৪০।
স্টালিনের সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে পরাজিত হয়ে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে নির্বাসিত হন এবং পরে মেক্সিকোতে বসবাস শুরু করেন।
২০ আগস্ট একজন সোভিয়েত এজেন্ট তাঁর মাথায় বরফ কাটার সরঞ্জাম দিয়ে আঘাত করেন। গুরুতর আহত ট্রটস্কি পরদিন মারা যান।
রবার্ট মুগ
ইলেকট্রনিক সংগীতের ইতিহাসে রবার্ট মুগ একটি কিংবদন্তি নাম।
তাঁর তৈরি Moog synthesizer সংগীতশিল্পীদের সম্পূর্ণ নতুন ধরনের শব্দ তৈরির সুযোগ করে দেয়।
রক, পপ, চলচ্চিত্রের সংগীত ও আধুনিক ইলেকট্রনিক মিউজিকের বিকাশে তাঁর অবদান গভীর।
তিনি মৃত্যুবরণ করেন ২১ আগস্ট ২০০৫।
স্টেফান কার্ল স্টেফানসন
আইসল্যান্ডের অভিনেতা স্টেফান কার্ল স্টেফানসন শিশুতোষ অনুষ্ঠান LazyTown-এর “Robbie Rotten” চরিত্রে অভিনয় করে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হন।
পরবর্তী সময়ে চরিত্রটির বিভিন্ন দৃশ্য ও গান ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়ে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছেও তাঁকে জনপ্রিয় করে তোলে।
ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের পর তিনি ২১ আগস্ট ২০১৮ মারা যান।
শেষ কথা
ইতিহাসে ২১ আগস্ট এমন একটি দিন, যেখানে মানুষের নিষ্ঠুরতা, সাহস, সৃজনশীলতা এবং মেধা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।
এই দিনে আমরা দেখি ১৮৩১ সালের দাসবিদ্রোহ, ১৯৬৮ সালের প্রাগে সোভিয়েত ট্যাংক, ১৯৮৩ সালের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং ২০০৪ সালের ঢাকার গ্রেনেড হামলা।
আবার একই দিনে আমরা স্মরণ করি এমন একজন বিজ্ঞানীকে, যিনি তারার মৃত্যুর নিয়ম বুঝতে সাহায্য করেছিলেন; এমন একজন সংগীতশিল্পীকে, যিনি শেহনাইকে বিশ্বমঞ্চে তুলে দিয়েছিলেন; এবং এমন একজন দৌড়বিদকে, যিনি মানুষের গতির সীমা নতুন করে লিখেছিলেন।
একটি চুরি মোনালিসাকে বিশ্বজোড়া খ্যাতির নতুন স্তরে নিয়ে যায়। একটি হ্রদ থেকে বেরিয়ে আসা অদৃশ্য গ্যাসের মেঘ কয়েক মুহূর্তে শত শত পরিবার নিশ্চিহ্ন করে দেয়। একটি গুলির ঘটনা ফিলিপাইনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে নতুন শক্তি দেয়।
এই ঘটনাগুলো মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস কখনও একরঙা নয়।
একই দিন আনন্দ ও শোক, সৃষ্টি ও ধ্বংস, বিজ্ঞান ও রাজনীতি, শিল্প ও বিপর্যয়—সবকিছুর সাক্ষী হতে পারে।
তাই ২১ আগস্ট ক্যালেন্ডারের শুধু আরেকটি তারিখ নয়। এটি মানব ইতিহাসের বহু বিপরীতধর্মী অভিজ্ঞতার একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিচ্ছবি। আর সেই কারণেই প্রতিটি “On This Day” আমাদের শুধু অতীত জানায় না, বর্তমানকে বুঝতেও সাহায্য করে।

