মানব ইতিহাসের অন্যতম রূপান্তরকারী ও ঘটনাবহুল একটি দিন হলো ৯ আগস্ট। শত শত বছর ধরে এবং বিভিন্ন মহাদেশ জুড়ে, ক্যালেন্ডারের এই একটিমাত্র তারিখ বহু যুগান্তকারী সামরিক মোড়, আমূল রাজনৈতিক রদবদল, হৃদয়বিদারক মানবিক সংকট এবং অসাধারণ শৈল্পিক ও বৈজ্ঞানিক অর্জনের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে।
১৯৪৫ সালে জাপানের নাগাসাকির আকাশে সেই ভয়ংকর পারমাণবিক ঝলকানি থেকে শুরু করে ওয়াশিংটনে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির রাজনৈতিক পতন, ভারতীয় উপমহাদেশে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের অগ্নিগর্ভ সূচনা কিংবা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে সিঙ্গাপুরের স্বাধীনতা লাভ—সব মিলিয়ে ৯ আগস্ট দিনটি যেন রোমাঞ্চকর ও বৈচিত্র্যময় এক গল্পের বিশাল ক্যানভাস।
আপনার জন্য নিচে ৯ আগস্টের বিস্তারিত, বহুমুখী এবং বিস্তৃত একটি বিবরণ তুলে ধরা হলো, যেখানে বিশ্বব্যাপী ঘটনাবলি, গুরুত্বপূর্ণ জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী এবং এই দিনটিকে সংজ্ঞায়িত করে এমন সাংস্কৃতিক পালনীয় বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এক নজরে ৯ আগস্ট
| ক্যাটাগরি | মূল হাইলাইট ও মাইলফলক |
| বিশ্বের প্রধান ঘটনাবলি | নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলা (১৯৪৫), নিক্সনের পদত্যাগ (১৯৭৪), সিঙ্গাপুরের বহিষ্কার/স্বাধীনতা (১৯৬৫) |
| দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস | ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু (১৯৪২), ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর (১৯৭১), শহীদ মিনার নামকরণ (১৯৬৯) |
| উল্লেখযোগ্য জন্মবার্ষিকী | অ্যামেদেও অ্যাভোগাড্রো (১৭৭৬), জঁ পিয়াজে (১৮৯৬), টোভ জ্যানসন (১৯১৪), হুইটনি হিউস্টন (১৯৬৩) |
| উল্লেখযোগ্য মৃত্যুবার্ষিকী | রোমান সম্রাট ট্রাজান (১১৭), হারমান হেস (১৯৬২), দিমিত্রি শোস্তাকোভিচ (১৯৭৫), মাহমুদ দারবিশ (২০০৮) |
| আন্তর্জাতিক দিবস | বিশ্ব আদিবাসী দিবস (জাতিসংঘ), সিঙ্গাপুরের জাতীয় দিবস, দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় নারী দিবস |
বাঙালি পরিমণ্ডল ও দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস
উপমহাদেশ, বিশেষ করে বঙ্গভঙ্গ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু বাংলা, ৯ আগস্টে অনেক গভীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে। এই ঘটনাগুলো ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের গতিপথ এবং বিংশ শতাব্দীর শেষভাগের ভূ-রাজনৈতিক কূটনীতিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল।
এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক মাইলফলক
১৯৪২: ভারত ছাড়ো আন্দোলন (অগাস্ট ক্রান্তি)-এর সূচনা
৯ আগস্ট, ১৯৪২ সালের সকালে, আগের দিন সন্ধ্যায় বোম্বেতে সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটির “ভারত ছাড়ো” প্রস্তাব গ্রহণের পরপরই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসন কঠোর দমনপীড়ন শুরু করে। মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু সহ কংগ্রেসের প্রায় পুরো শীর্ষ নেতৃত্বকে গ্রেপ্তার করে বিনা বিচারে কারাগারে পাঠানো হয়।
তবে, এই ব্যাপক ধরপাকড় মানুষের সংকল্পকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার বদলে পুরো দেশজুড়ে এক ভয়ংকর, নেতৃত্বহীন গণজাগরণের জন্ম দেয়। বাংলায় এর প্রতিক্রিয়া ছিল তাৎক্ষণিক এবং তীব্র। স্বাধীনতা সংগ্রামীরা ধর্মঘট ডাকে, রেল ও টেলিগ্রাফ লাইন ধ্বংস করে এবং সমান্তরাল জাতীয়তাবাদী সরকার প্রতিষ্ঠা করে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল মেদিনীপুর জেলার “তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার”। ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত এটি নিজস্ব পুলিশ বাহিনী, কর ব্যবস্থা এবং ত্রাণ কর্মসূচির মাধ্যমে একটি স্বাধীন স্থানীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করেছিল।
১৯৬৯: অক্টারলোনি মনুমেন্টের নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ মিনার’ রাখা
কলকাতায় অবস্থিত ১৫৭ ফুট উঁচু আইকনিক স্মৃতিস্তম্ভটি মূলত ১৮২৮ সালে মেজর জেনারেল স্যার ডেভিড অক্টারলোনিকে সম্মান জানাতে নির্মিত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৬৯ সালের ৯ আগস্ট, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে যে সকল স্বাধীনতা সংগ্রামী নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য এর সরকারি নামকরণ করা হয় “শহীদ মিনার”। বর্তমানে এটি রাজনৈতিক সমাবেশ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের একটি অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত।
১৯৭১: ভারত-সোভিয়েত শান্তি, বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের চরম উত্তেজনাকর সময়ে, ১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট নয়াদিল্লিতে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং এবং সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই গ্রোমিকো একটি ঐতিহাসিক ২০ বছর মেয়াদী মৈত্রী চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
এই কূটনৈতিক জোট ভারতকে এমন একটি সময়ে একটি বৈশ্বিক পরাশক্তির কাছ থেকে রাজনৈতিক এবং সামরিক সমর্থন এনে দেয়, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন সরাসরি পশ্চিম পাকিস্তানকে সমর্থন করছিল। এই চুক্তিটি বহিরাগত হস্তক্ষেপ রোধ করতে একটি નિર્ણায়ক ভূমিকা পালন করে, যা শেষ পর্যন্ত সেই বছরের ডিসেম্বরে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে নিশ্চিত করেছিল।
দক্ষিণ এশিয়ার বিশিষ্ট জন্ম ও মৃত্যু
জন্ম:
-
রামেন্দু মজুমদার (জন্ম ১৯৪১): বাংলাদেশের প্রখ্যাত অভিনেতা, থিয়েটার পরিচালক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে আধুনিক থিয়েটারের ভিত্তি স্থাপনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট (ITI)-এর বিশ্ব সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দ্বিতীয় এশীয় হিসেবে এই সম্মান অর্জন করেন। তিনি একুশে পদকপ্রাপ্ত।
-
ঋকসুন্দর ব্যানার্জি (জন্ম ১৯৮৭): সমসাময়িক পশ্চিমবঙ্গের লেখক, গবেষক এবং শিক্ষাবিদ। বাংলা সাহিত্যে ভূতত্ত্ব, লোকবিশ্বাস এবং অতিপ্রাকৃত কল্পকাহিনী নিয়ে তাঁর সাহিত্যিক গবেষণার জন্য তিনি পরিচিত।
মৃত্যু:
-
ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী (মৃত্যু ১৯৭০): অনুশীজন সমিতির এই কিংবদন্তি বাঙালি বিপ্লবী সবার কাছে ‘মহারাজ’ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি তাঁর জীবনের ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কুখ্যাত সেলুলার জেলসহ বিভিন্ন ঔপনিবেশিক কারাগারে কাটিয়েছেন। ভারতীয় পার্লামেন্ট কর্তৃক সম্মানিত হওয়ার পরপরই নয়াদিল্লিতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
বৈশ্বিক ইতিহাসের মোড় ঘোরানো ঘটনাবলি

উপমহাদেশের বাইরে, ৯ আগস্টে প্রাচীন যুগের সংঘাত থেকে শুরু করে আধুনিক সামরিক ইতিহাস এবং বিশাল রাজনৈতিক পরিবর্তনের মতো ঘটনা ঘটেছে।
প্রাচীন ও মধ্যযুগ
-
৪৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ – ফারসালুসের যুদ্ধ: মধ্য গ্রিসে, বিশাল সৈন্যবাহিনীর বিপক্ষে সংখ্যায় অনেক পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও জুলিয়াস সিজার পম্পেই দ্য গ্রেটের বিরুদ্ধে এক নির্ণায়ক বিজয় অর্জন করেন। পম্পেই মিশরে পালিয়ে যান, যেখানে তাকে হত্যা করা হয়। এর ফলে রোমান প্রজাতন্ত্রের সাংবিধানিক ভারসাম্যের অবসান ঘটে এবং রোমের উপর সিজারের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
-
৩৭৮ খ্রি. – আদ্রিয়ানোপলের যুদ্ধ: বর্তমান তুরস্কে, ফ্রিটিগার্নের নেতৃত্বাধীন একটি বিশাল গথিক সেনাবাহিনী সম্রাট ভ্যালেন্সের নেতৃত্বাধীন রোমান বাহিনীকে পরাজিত করে। সম্রাট ভ্যালেন্স এই যুদ্ধে নিহত হন। ঐতিহাসিকরা এই ঘটনাটিকে পশ্চিমা রোমান সাম্রাজ্যের পতন এবং চূড়ান্ত ধ্বংসের একটি অন্যতম প্রধান মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করেন।
-
১১৭৩ – পিসার হেলানো মিনারের নির্মাণকাজ শুরু: ইতালির পিসায় ক্যাথেড্রাল কমপ্লেক্সের জন্য ঘণ্টা বাজানোর টাওয়ার (ক্যাম্পানাইল)-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। বালি, কাদামাটি এবং পলি দ্বারা গঠিত নরম মাটির ভিত্তির কারণে, পাঁচ বছর পর তৃতীয় তলার নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই কাঠামোটি হেলে পড়তে শুরু করে।
আধুনিক রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাস
১৯৪৫: নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলা
হিরোশিমা ধ্বংসের ঠিক তিন দিন পর, ইউনাইটেড স্টেটস আর্মি এয়ার ফোর্সেস-এর বোমারু বিমান বকসকার (পাইলট: মেজর চার্লস সুইনি) স্থানীয় সময় সকাল ১১:০২ মিনিটে জাপানের বন্দর নগরী নাগাসাকির ওপর “ফ্যাট ম্যান” নামক একটি ২১-কিলো টন প্লুটোনিয়াম ইমপ্লোশন ডিভাইস ফেলে।
প্রকৃতপক্ষে নাগাসাকি ছিল বিকল্প লক্ষ্যবস্তু; মেঘের আচ্ছাদন এবং কারখানার ধোঁয়ার কারণে মূল লক্ষ্যবস্তু কোকুরা দৃশ্যমান ছিল না। বোমার বিস্ফোরণে শহরের প্রায় ৩০% অংশ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে ৩৫,০০০ থেকে ৪০,০০০ মানুষ নিহত হয় এবং বিকিরণের বিষক্রিয়া ও মারাত্মক পোড়া ক্ষতের কারণে ১৯৪৫ সালের শেষ নাগাদ মোট মৃতের সংখ্যা ৭০,০০০ ছাড়িয়ে যায়। এর ঠিক ছয় দিন পর, ১৫ আগস্ট জাপান নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেয়, যার মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।
১৯৬৫: সিঙ্গাপুরের সার্বভৌম স্বাধীনতা লাভ
ইতিহাসের এক অদ্ভুত পটপরিবর্তনে, সিঙ্গাপুর সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে নয়, বরং জোরপূর্বক বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে একটি স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। জাতিগত প্রতিনিধিত্ব এবং অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে লি কুয়ান ইউ-এর নেতৃত্বাধীন সিঙ্গাপুরের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব এবং মালয়েশিয়ার ফেডারেল সরকারের মধ্যে উত্তেজনা কুয়ালালামপুরের পার্লামেন্টারি ভোটে চূড়ান্ত রূপ নেয়।
৯ আগস্ট, ১৯৬৫ সালে মালয়েশিয়ার পার্লামেন্ট ১২৬-০ ভোটে সিঙ্গাপুরকে ফেডারেশন থেকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নেয়। একটি সরাসরি সম্প্রচারিত টেলিভিশন ভাষণে অশ্রুসজল লি কুয়ান ইউ একটি স্বাধীন সিঙ্গাপুরের জন্ম ঘোষণা করেন। প্রাকৃতিক সম্পদহীন একটি ক্ষুদ্র দ্বীপকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান আর্থিক কেন্দ্রে পরিণত করার এক বিশাল চ্যালেঞ্জ তিনি কাঁধে তুলে নেন।
১৯৭৪: মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের পদত্যাগ
ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির ভয়াবহ পরিণতি এবং মার্কিন কংগ্রেসের দ্বারা নিশ্চিত ইমপিচমেন্ট (অভিশংসন)-এর মুখোমুখি হয়ে, রিচার্ড এম. নিক্সন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৭তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন। দুপুর ১২টায় তাঁর পদত্যাগ কার্যকর হয় এবং তিনি ইতিহাসের প্রথম ও একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে পদত্যাগ করার নজির স্থাপন করেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড আর. ফোর্ড এর পরপরই শপথ নেন এবং জাতির উদ্দেশ্যে ঘোষণা করেন যে “আমাদের দীর্ঘ জাতীয় দুঃস্বপ্নের অবসান ঘটেছে।”
প্রধান আন্তর্জাতিক ও জাতীয় দিবসসমূহ
৯ আগস্ট বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং জাতীয় উদযাপনের দিন হিসেবে চিহ্নিত।
-
বিশ্ব আদিবাসী দিবস (জাতিসংঘ): ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে এই দিবসটি প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৮২ সালে জাতিসংঘের আদিবাসী জনসংখ্যা বিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম বৈঠককে স্মরণ করে এটি পালিত হয়। বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ৪৭৬ মিলিয়ন আদিবাসী মানুষের অধিকার, মানবিক মর্যাদা, পরিবেশগত ভূমিকা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষাই এর মূল উদ্দেশ্য।
-
সিঙ্গাপুর – জাতীয় দিবস: ১৯৬৫ সালে মালয়েশিয়া থেকে সিঙ্গাপুরের আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদকে স্মরণ করে এই দিনটি পালিত হয়। সামরিক কুচকাওয়াজ, ফ্লাইপাস্ট এবং সমগ্র দ্বীপরাষ্ট্র জুড়ে বর্ণাঢ্য উদযাপনের মাধ্যমে দিনটি মুখরিত থাকে।
-
দক্ষিণ আফ্রিকা – জাতীয় নারী দিবস: ১৯৫৬ সালে প্রিটোরিয়ার ইউনিয়ন বিল্ডিং অভিমুখে প্রায় ২০,০০০ নারীর ঐতিহাসিক পদযাত্রাকে সম্মান জানাতে এটি পালিত হয়। ফেডারেশন অফ সাউথ আফ্রিকান উইমেন-এর আয়োজনে এই প্রতিবাদটি বর্ণবাদী সরকারের ‘পাস আইন’-এর বিরুদ্ধে ছিল, যা কৃষ্ণাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানদের অভ্যন্তরীণ পাসপোর্ট বহন করতে বাধ্য করেছিল।
-
জাপান – নাগাসাকি পারমাণবিক বোমা শিকারী স্মরণ দিবস: একটি গম্ভীর জাতীয় পালনীয় দিন। সকাল ১১:০২ মিনিটে নাগাসাকি পিস পার্কে এক মিনিট নীরবতা পালনের পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের বিরুদ্ধে আহ্বান জানানো হয়।
উল্লেখযোগ্য জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী
বিজ্ঞান, সাহিত্য, রাজনীতি, খেলাধুলা এবং শিল্পকলায় অবদান রাখা বহু প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের জন্ম ও মৃত্যু এই দিনে ঘটেছে।
বিখ্যাত জন্মদিন
| নাম | বছর | জাতীয়তা | প্রধান ক্ষেত্র / পেশা | তাৎপর্য ও অর্জন |
| আইজ্যাক ওয়ালটন | ১৫৯৩ | ইংরেজ | লেখক / জীবনীকার | ‘দ্য কমপ্লিট অ্যাঙ্গলার’ রচয়িতা, যা মাছ ধরা এবং প্রকৃতির এক কালজয়ী উদযাপন। |
| অ্যামেদেও অ্যাভোগাড্রো | ১৭৭৬ | ইতালীয় | পদার্থবিদ ও রসায়নবিদ | অ্যাভোগাড্রোর সূত্র প্রণয়ন করেন; মৌলিক অ্যাভোগাড্রো ধ্রুবকের ($6.022 \times 10^{23}$) নাম তাঁর নামেই রাখা হয়েছে। |
| উইলিয়াম হাওয়ে | ১৭২৯ | ব্রিটিশ | সামরিক কমান্ডার | আমেরিকান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ। |
| জঁ পিয়াজে | ১৮৯৬ | সুইস | মনোবিজ্ঞানী | শিশু বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা; জ্ঞানীয় বিকাশের পর্যায় তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। |
| টোভ জ্যানসন | ১৯১৪ | ফিনিশ | লেখক ও চিত্রকর | বিশ্ববিখ্যাত মুমিনস (Moomins) ফ্র্যাঞ্চাইজির স্রষ্টা, যা শিশুদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়। |
| মারিও সোফিসি | ১৯০০ | আর্জেন্টাইন | চলচ্চিত্র পরিচালক | আর্জেন্টাইন সিনেমার সোনালী যুগের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব (প্রিসিওনেরোস দে লা টিয়েরা)। |
| ডেভিড লি | ১৯৩১ | আমেরিকান | পদার্থবিদ | হিলিয়াম-৩ এ সুপারফ্লুইডিটি আবিষ্কারের জন্য ১৯৯৬ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। |
| রড লেভার | ১৯৩৮ | অস্ট্রেলিয়ান | টেনিস খেলোয়াড় | দু’বার ক্যালেন্ডার-ইয়ার গ্র্যান্ড স্লাম অর্জনকারী গ্র্যান্ড স্লাম চ্যাম্পিয়ন (১৯৬২, ১৯৬৯)। |
| হুইটনি হিউস্টন | ১৯৬৩ | আমেরিকান | গায়িকা ও অভিনেত্রী | আইকনিক পপ/আরঅ্যান্ডবি গায়িকা; ইতিহাসের অন্যতম সর্বোচ্চ বিক্রিত শিল্পী (২০০ কোটিরও বেশি রেকর্ড)। |
| ডিয়ন স্যান্ডার্স | ১৯৬৭ | আমেরিকান | ক্রীড়াবিদ ও কোচ | এনএফএল হল অফ ফেমার এবং এমএলবি খেলোয়াড়; একমাত্র ক্রীড়াবিদ যিনি সুপার বোল এবং ওয়ার্ল্ড সিরিজ উভয়ই খেলেছেন। |
| গিলিয়ান অ্যান্ডারসন | ১৯৬৮ | ব্রিটিশ-আমেরিকান | অভিনেত্রী | ‘দ্য এক্স-ফাইলস’-এ ডানা স্কালি চরিত্রে অভিনয়ের জন্য এমি এবং গোল্ডেন গ্লোব বিজয়ী। |
| ফিলিপ্পো ইনজাঘি | ১৯৭৩ | ইতালীয় | ফুটবলার ও ম্যানেজার | ইতালির হয়ে বিশ্বকাপ বিজয়ী স্ট্রাইকার এবং এসি মিলানের হয়ে দু’বারের উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ বিজয়ী। |
| অড্রে তাতু | ১৯৭৬ | ফরাসি | অভিনেত্রী | ‘অ্যামেলি’ (২০০১) চলচ্চিত্রে অভিনয় করে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। |
| উইলিয়ান | ১৯৮৮ | ব্রাজিলিয়ান | পেশাদার ফুটবলার | চেলসি এফসি-এর হয়ে প্রিমিয়ার লিগ বিজয়ী এবং ব্রাজিলের অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক উইঙ্গার। |
বিখ্যাত মৃত্যু
| নাম | বছর | জাতীয়তা | প্রধান ক্ষেত্র / পেশা | উত্তরাধিকার ও মৃত্যুর কারণ |
| ট্রাজান | ১১৭ | রোমান | সম্রাট | রোমান সাম্রাজ্যকে এর সর্বোচ্চ আঞ্চলিক সীমানায় সম্প্রসারিত করেছিলেন; স্ট্রোক/এডিমা রোগে মারা যান। |
| স্যার থমাস ফেয়ারফ্যাক্স | ১৬৭১ | ইংরেজ | সংসদীয় জেনারেল | ইংলিশ সিভিল ওয়ারের সময় নিউ মডেল আর্মির অন্যতম প্রধান কমান্ডার। |
| থমাস টেলফোর্ড | ১৮৩৪ | স্কটিশ | সিভিল ইঞ্জিনিয়ার | “কলোসাস অফ রোডস” নামে পরিচিত; ব্রিটেনে প্রধান খাল, সেতু এবং মহাসড়ক নির্মাণ করেন। |
| আর্নস্ট হেকেল | ১৯১৯ | জার্মান | জীববিজ্ঞানী ও শিল্পী | ‘ইকোলজি’ এবং ‘ফাইলাম’-এর মতো পরিবেশগত শব্দ উদ্ভাবন করেন; ইউরোপে ডারউইনবাদ প্রচার করেন। |
| রুগিরো লিওনকাভালো | ১৯১৯ | ইতালীয় | অপেরা সুরকার | ক্লাসিক্যাল রেপার্টরির সবচেয়ে স্থায়ী ভেরিস্তো অপেরাগুলোর একটি, ‘পাগলিয়াচি’-এর সুরকার। |
| চাইম সাউটিন | ১৯৪৩ | বেলারুশিয়ান-ফরাসি | এক্সপ্রেশনিস্ট চিত্রশিল্পী | স্কুল অফ প্যারিসের অন্যতম প্রধান অবদানকারী; নাৎসি বাহিনীর হাত থেকে লুকিয়ে থাকার সময় আলসারে মারা যান। |
| হারমান হেস | ১৯৬২ | জার্মান-সুইস | লেখক ও কবি | সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী (১৯৪৬); ‘সিদ্ধার্থ’ এবং ‘স্টেপেনউল্ফ’ ক্লাসিকগুলোর রচয়িতা। |
| শ্যারন টেট | ১৯৬৯ | আমেরিকান | অভিনেত্রী ও মডেল | উদীয়মান হলিউড তারকা; ম্যানসন ফ্যামিলি কাল্টের সদস্যদের দ্বারা নির্মমভাবে খুন হন। |
| দিমিত্রি শোস্তাকোভিচ | ১৯৭৫ | সোভিয়েত-রাশিয়ান | শাস্ত্রীয় সুরকার | প্রখ্যাত ২০ শতকের সুরকার, যাঁর সিম্ফনিগুলো স্ট্যালিনবাদের অধীনে শৈল্পিক অভিব্যক্তির পথ দেখিয়েছিল। |
| বার্নি ম্যাক | ২০০৮ | আমেরিকান | কমেডিয়ান ও অভিনেতা | বিখ্যাত স্ট্যান্ড-আপ কমিক এবং দ্য বার্নি ম্যাক শো ও ওশানস ইলেভেন-এর তারকা। |
| মাহমুদ দারবিশ | ২০০৮ | ফিলিস্তিনি | কবি ও লেখক | ফিলিস্তিনি জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃত; সমগ্র আরব বিশ্বে তাঁর মহাকাব্যিক কবিতার জন্য উদযাপিত। |
| মাইক ওয়ালেস | ২০১২ | আমেরিকান | ব্রডকাস্ট সাংবাদিক | সিবিএস নিউজের ফ্ল্যাগশিপ প্রোগ্রাম ‘সিক্সটি মিনিটস’-এর কিংবদন্তি সংবাদদাতা এবং ঘোষক। |
“আপনি কি জানতেন?” মজার কিছু তথ্য
১. সিঙ্গাপুরের অনাকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা:
আধুনিক বিশ্বের একমাত্র দেশ হিসেবে সিঙ্গাপুর সম্পূর্ণ নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বাধীনতা লাভ করেছিল। ১৯৬৫ সালের ৯ আগস্ট যখন মালয়েশিয়ার সংসদ সিঙ্গাপুরকে বাদ দেওয়ার পক্ষে ভোট দেয়, তখন সিঙ্গাপুরের নেতারা আসলে বিচ্ছিন্নতার পরিবর্তে ফেডারেল একীকরণের জন্য আলোচনা করার চেষ্টা করছিলেন। লি কুয়ান ইউ এই বিচ্ছেদকে একটি ভয়াবহ সংকট হিসেবে দেখেছিলেন, কারণ সেই সময় দ্বীপটিতে প্রাকৃতিক সম্পদ এবং পানীয় জলের পরিকাঠামোর চরম অভাব ছিল।
২. মেঘের আচ্ছাদন যা কোকুরাকে বাঁচিয়েছিল:
১৯৪৫ সালের ৯ আগস্ট যে পারমাণবিক বোমাটি ফেলা হয়েছিল, তা আদতে নাগাসাকির জন্য তৈরি হয়নি। বি-২৯ বোমারু বিমান ‘বকসকার’ তার প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তু কোকুরার ওপর তিনবার চক্কর দিতে ৫০ মিনিট ব্যয় করে। কিন্তু কাছাকাছি একটি শহরে আগুন লাগার ফলে সৃষ্ট প্রচণ্ড ধোঁয়া এবং মেঘের কারণে ক্রুরা লক্ষ্যবস্তু স্পষ্টভাবে দেখতে পায়নি। জ্বালানি কমে আসায় বাধ্য হয়ে তারা বিমানটিকে বিকল্প লক্ষ্যবস্তু নাগাসাকির দিকে ঘুরিয়ে নেয়।
৩. পিসার মিনারের তাৎক্ষণিক হেলে পড়া:
পিসার হেলানো মিনার শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ধীরে ধীরে দেবে যায়নি; বরং ১১৭৮ সালে এর নির্মাণকাজ দ্বিতীয় তলায় পৌঁছানোর প্রায় পরপরই এটি হেলে পড়তে শুরু করে। “পিসা” (Pisa) নামটি মূলত একটি গ্রীক শব্দ থেকে এসেছে যার অর্থ “জলাভূমি”। এটি সেই অস্থির মাটির ভিত্তিকে নির্দেশ করে, যা মূলত এই প্রকৌশলগত বিস্ময়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
শেষ কথা
৯ আগস্ট দিনটি আমাদেরকে খুব স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেয় যে বিভিন্ন অঞ্চল, যুগ এবং সংস্কৃতির জুড়ে মানব ইতিহাস কতটা গভীরভাবে একে অপরের সাথে সংযুক্ত। এটি এমন একটি তারিখ যা একদিকে যেমন নাগাসাকির পারমাণবিক বোমা হামলা এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনের গণগ্রেপ্তারের মতো চরম ট্র্যাজেডি ও গভীর পরিণতির চিহ্ন বহন করে, ঠিক তেমনি অন্যদিকে এটি সার্বভৌমত্ব, নাগরিক সাহস এবং যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের চমৎকার সব মাইলফলকও তুলে ধরে।
৯ আগস্টের এই সকল ঘটনা, জন্ম এবং মৃত্যুর দিকে ফিরে তাকালে, আমরা সেইসব রাজনৈতিক পটভূমি, শৈল্পিক ঐতিহ্য এবং সামাজিক আন্দোলন সম্পর্কে আরও পরিষ্কার একটি ধারণা পাই—যা আজও আমাদের এই পৃথিবীকে প্রতিনিয়ত রূপ দিয়ে চলেছে।

