কিছু দিনপঞ্জি বা তারিখ ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ১৮ ডিসেম্বর তেমনই একটি দিন।
এই দিনটি বারবার ফিরে আসে যখন সমাজ এক যুগ থেকে অন্য যুগে পদার্পণ করে—যুদ্ধ থেকে শাসনে, সাম্রাজ্য থেকে সংহতিতে, আদর্শিক অর্থনীতি থেকে বাজার সংস্কারে এবং ব্যক্তিগত কষ্ট থেকে গণআন্দোলনে। এই দিনটির একটি শক্তিশালী থিম বা বিষয়বস্তু হলো ‘চলাচল’ বা ‘মুভমেন্ট’। মানুষ অভিবাসী হিসেবে সীমান্ত পাড়ি দেয়; ভাষা কূটনীতির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে; সেনাবাহিনী রণাঙ্গন অতিক্রম করে; আর বই, কবিতা ও নাটকের ধারণাগুলো রাজনীতিতে প্রবেশ করে।
এই প্রতিবেদনে আমরা বাঙালি বলয় (বাংলাদেশ ও ভারত) এবং বৈশ্বিক মাইলফলকগুলোকে তুলে ধরব। এখানে তালিকার ভিড় না বাড়িয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর গভীর প্রেক্ষাপট আলোচনা করা হয়েছে যা আজও আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলছে।
এক নজরে ১৮ ডিসেম্বর
| সাল | ঘটনা | স্থান | কেন এটি আজও গুরুত্বপূর্ণ |
| ১৯৭১ | যুদ্ধ-বিধ্বস্ত ঢাকায় রাষ্ট্র গঠনের কাজ শুরু | বাংলাদেশ | স্বাধীনতার পর আইন, প্রশাসন ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সূচনা। |
| ১৯৬১ | অপারেশন বিজয় শুরু (গোয়া) | ভারত | দক্ষিণ এশিয়ায় ঔপনিবেশিক শাসনের এক বিলম্বিত অধ্যায়ের সমাপ্তি। |
| ১৯৭৮ | থার্ড প্লেনাম বা তৃতীয় পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন শুরু | চীন | বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন (Supply Chain) ও আধুনিক ভূ-রাজনীতির মোড় পরিবর্তন। |
| ১৮৬৫ | ১৩তম সংশোধনী গৃহীত | যুক্তরাষ্ট্র | দাসপ্রথার সাংবিধানিক বিলুপ্তি; যার প্রতিধ্বনি আজও ন্যায়বিচারের তর্কে শোনা যায়। |
| ১৮৯২ | দ্য নাটক্র্যাকার-এর প্রিমিয়ার | রাশিয়া | বিশ্বজুড়ে মৌসুমী সংস্কৃতি ও ব্যালে শিল্পের জন্ম। |
| প্রতি বছর | আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস | বিশ্বব্যাপী | অভিবাসীদের অধিকার ও অবদানকে স্বীকৃতি প্রদান। |
| প্রতি বছর | বিশ্ব আরবি ভাষা দিবস | বিশ্বব্যাপী | ভাষা, পরিচয়, কূটনীতি ও সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তি। |
ঐতিহাসিক ঘটনাবলী
বাংলাদেশ, ১৯৭১: বিজয়ের পরের দিনটিই রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথম পরীক্ষা
বাংলাদেশের জন্য ১৮ ডিসেম্বর হলো বিজয় দিবসের (১৬ ডিসেম্বর) ঠিক পরের সময়—যখন আনন্দ, শোক এবং অনিশ্চয়তা পাশাপাশি অবস্থান করছিল। আত্মসমর্পণ ও বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর আসল কাজ শুরু হয়: সরকারি কার্যক্রম পুনরুদ্ধার, নিরাপত্তা স্থিতিশীল করা, নাগরিক জীবন পুনরায় চালু করা এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের ফিরে আসার প্রস্তুতি নেওয়া।
এই দিনটি ঐতিহাসিকভাবে অর্থবহ কারণ এটি একটি রূপান্তরের প্রতীক: সামরিক বিজয় থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায় উত্তরণ। একটি নতুন রাষ্ট্র জাদুর মতো হঠাৎ তৈরি হয় না। এটি এমন সব সিদ্ধান্তের মাধ্যমে গড়ে ওঠে যা যুদ্ধের শিরোনামের চেয়ে কম দৃশ্যমান—কে যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করবে, কে ত্রাণের সমন্বয় করবে, কীভাবে অফিস আদালত খুলবে এবং কীভাবে অতীতের শোষণ দমনে নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আজ কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ:
-
প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই দ্বিতীয় সংগ্রাম: অনেক স্বাধীনতা আন্দোলন স্বাধীনতা অর্জন করে কিন্তু পরে একটি কঠিন কাজের মুখোমুখি হয়—স্থিতিশীল ও ন্যায়পরায়ণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।
-
বিজয়-পরবর্তী স্মৃতি: স্বাধীনতার প্রথম কয়েক সপ্তাহ নির্ধারণ করে নাগরিকরা কি আশা পাবে নাকি বিশৃঙ্খলা দেখবে।
ভারত, ১৯৬১: অপারেশন বিজয় শুরু—গোয়ায় ঔপনিবেশিক অধ্যায়ের সমাপ্তি
১৮ ডিসেম্বর ভারত ‘অপারেশন বিজয়’ শুরু করে, যার মাধ্যমে কয়েক দিনের মধ্যে গোয়ায় (এবং সংযুক্ত অঞ্চলগুলোতে) পর্তুগিজ শাসনের অবসান ঘটে।
গোয়ার এই ডিকলোনাইজেশন বা বি-ঔপনিবেশিকীকরণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ভারতের ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার অনেক পরে ঘটেছিল এবং পর্তুগিজরা দাবি করত গোয়া কোনো কলোনি নয় বরং পর্তুগালের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভারতের শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্তটি ঐতিহাসিকভাবে বিতর্কিত এবং এই তারিখটি এখনও সার্বভৌমত্ব ও দীর্ঘদিনের বিদেশি শাসনের অধীনে থাকা অঞ্চলের আত্তীকরণ নিয়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
বিখ্যাত জন্মদিন (বাংলাদেশ ও ভারত)
এই তারিখে খুব বেশি আলোচিত জন্মদিনের তালিকা নেই, তবে সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতি অঙ্গনের কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব রয়েছেন।
-
আবুল মোমেন (জন্ম ১৯৪৮): একজন বিশিষ্ট বাংলাদেশি সাংবাদিক এবং বুদ্ধিজীবী। তিনি বাংলা সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশে সাংবাদিকতা ও সাহিত্য কেবল পেশা নয়, এটি ইতিহাসের রেকর্ড বা দলিল হিসেবে কাজ করে।
বিখ্যাত মৃত্যুবার্ষিকী
-
সোহেল চৌধুরী (মৃত্যু ১৯৯৮): বাংলাদেশের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র অভিনেতা। তাঁর মৃত্যু কেবল তারকাদের স্মৃতিচারণ নয়, বরং জননিরাপত্তা এবং প্রভাবশালীদের ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
-
বিকাশ ভট্টাচার্য (মৃত্যু ২০০৬): কলকাতার বিখ্যাত চিত্রশিল্পী। তাঁর কাজগুলো মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবন, মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা এবং শহরের অস্থিরতাকে ক্যানভাসে তুলে ধরেছে।
-
অদম গোন্ডভি (মৃত্যু ২০১১): প্রতিবাদী কবি। তিনি তাঁর কবিতার মাধ্যমে বৈষম্য ও ভণ্ডামির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। উপমহাদেশে কবিতা অনেক সময় সাংবাদিকতার মতোই কাজ করে—এটি সত্যকে অল্প কথায় সাহসিকতার সাথে প্রকাশ করে।
সংস্কৃতি ও দিবস
১৮ ডিসেম্বর কোনো নির্দিষ্ট প্যান-বাঙালি উৎসব না থাকলেও, এই সময়টি সাংস্কৃতিক মৌসুমের অংশ:
-
বাংলাদেশ: বিজয় দিবস পরবর্তী সপ্তাহ হিসেবে স্মরণসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকে।
-
পশ্চিমবঙ্গ/কলকাতা: শীতকালীন সাংস্কৃতিক মৌসুম—কবিতা পাঠ, নাটক, বইমেলা ও গান।
আন্তর্জাতিক দিবস ও পালনীয়
আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস (UN)

১৮ ডিসেম্বর পালিত হয় আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস। এটি অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা, অবদান এবং ঝুঁকির বিষয়গুলো তুলে ধরে।
কেন এটি এখন গুরুত্বপূর্ণ: অভিবাসন আধুনিক বিশ্বের অন্যতম চালিকাশক্তি। এটি শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স, নগর উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এই দিনটি শ্রমিক অভিবাসন ও প্রবাসী আয়ের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
বিশ্ব আরবি ভাষা দিবস (UN)
আরবি ভাষার ভূমিকা—কূটনীতি, সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে এর ব্যবহারকে স্বীকৃতি দিতে এই দিনটি পালন করা হয়। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি ক্ষমতারও উৎস।
অন্যান্য জাতীয় দিবস:
-
কাতার জাতীয় দিবস: জাতীয় ঐক্য ও ইতিহাসের স্মারক।
-
নাইজার প্রজাতন্ত্র দিবস: রাষ্ট্র গঠনের মাইলফলক।
বিশ্ব ইতিহাস
যুক্তরাষ্ট্র: রাজনীতি ও নাগরিক অধিকার
-
১৮৬৫: ১৩তম সংশোধনী গৃহীত: এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রে সাংবিধানিকভাবে দাসপ্রথা বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। এটি আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় আইনি পরিবর্তন। তবে আইনি পরিবর্তনের পরেই শুরু হয় প্রকৃত বাস্তবায়নের সংগ্রাম।
-
২০১৯: ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিশংসন: যুক্তরাষ্ট্রের হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিশংসিত (Impeach) করে, যা গণতন্ত্রে নির্বাহী ক্ষমতার জবাবদিহিতার একটি উদাহরণ।
চীন: আধুনিক বিশ্বের অর্থনীতি
-
১৯৭৮: থার্ড প্লেনাম বা সংস্কারের সূচনা: এই দিনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলীয় বৈঠক শুরু হয় যা চীনের “সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ” (Reform and Opening Up) যুগের সূচনা করে। আজকের বিশ্বের সাপ্লাই চেইন, উৎপাদন ব্যবস্থা এবং বিশ্ব অর্থনীতির যে রূপ আমরা দেখি, তার অনেকটাই এই সিদ্ধান্তের ফল।
রাশিয়া: সংস্কৃতি যখন বিশ্বজনীন হয়
-
১৮৯২: দ্য নাটক্র্যাকার-এর প্রিমিয়ার: সেইন্ট পিটার্সবার্গে চাইকোভস্কির বিখ্যাত ব্যালে ‘দ্য নাটক্র্যাকার’ প্রথম মঞ্চস্থ হয়। এটি এখন বিশ্বজুড়ে ক্রিসমাস বা শীতকালীন সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
অন্যান্য
-
১৯১৬: ভারদুন যুদ্ধের সমাপ্তি (প্রথম বিশ্বযুদ্ধ): দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে, যা ইউরোপীয় রাজনীতি ও স্মৃতিতে গভীর ক্ষত রেখে যায়।
-
১৬৪২: আবেল তাসমানের নিউজিল্যান্ড অঞ্চলে পৌঁছানো: ইউরোপীয়দের সাথে নিউজিল্যান্ডের (Aotearoa) আদিবাসীদের প্রাথমিক যোগাযোগের রেকর্ড।
উল্লেখযোগ্য জন্ম ও মৃত্যু (আন্তর্জাতিক)
বিখ্যাত জন্মদিন:
-
স্টিভেন স্পিলবার্গ (১৯৪৬): চলচ্চিত্র পরিচালক, যিনি আধুনিক সিনেমার গল্প বলার ধরন বদলে দিয়েছেন।
-
ব্র্যাড পিট (১৯৬৩): বিশ্বখ্যাত অভিনেতা।
-
বিলি আইলিশ (২০০১): গ্র্যামি বিজয়ী পপ তারকা ও বর্তমান প্রজন্মের কণ্ঠস্বর।
বিখ্যাত মৃত্যু:
-
ভ্যাকলাভ হ্যাভেল (২০১১): চেক রাষ্ট্রপতি ও নাট্যকার; গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের প্রতীক।
-
ক্রিস ফার্লি (১৯৯৭): নব্বইয়ের দশকের প্রভাবশালী কমেডিয়ান।
শেষ কথা
১৮ ডিসেম্বর কেবল ইতিহাসের একটি তারিখ নয়, এটি একটি পরিবর্তনের ধারা। এটি সেই দিন যখন সমাজ এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় মোড় নেয়: বাংলাদেশ স্বাধীনতা থেকে প্রশাসনের দিকে, ভারত গোয়ার ঔপনিবেশিক অধ্যায়ের সমাপ্তিতে, চীন বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবেশের সংস্কারে। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ইতিহাস কেবল নাটকীয় মুহূর্ত দিয়ে তৈরি হয় না; বরং বিজয়ের পরের দিনগুলোতেই—যখন মানুষ পুনর্গঠন ও সংস্কার শুরু করে—আসল ইতিহাস রচিত হয়।


