১৩ জানুয়ারি ক্যালেন্ডারে নিছক আরেকটি তারিখ মনে হলেও, ইতিহাসের পাতায় এই দিনটি অনেকবারই ফিরে এসেছে মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হিসেবে। কোথাও এটি উৎসবের উষ্ণতা, কোথাও রাষ্ট্রের টানাপোড়েন, কোথাও আবার ট্র্যাজেডি থেকে শেখা নিরাপত্তার পাঠ।
এই তারিখটাকে শুধু তালিকা হিসেবে নয়, বরং একটি “জুম লেন্স” দিয়ে দেখা হচ্ছে—যেখানে দক্ষিণ এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত এক ফ্রেমে ধরা পড়ে।
১৩ জানুয়ারি এক নজরে
| সাল | অঞ্চল | ঘটনা | এখনো কেন গুরুত্বপূর্ণ |
|---|---|---|---|
| 532 | বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য | কনস্টান্টিনোপলে নিকা দাঙ্গা শুরু | জনরোষ, গোষ্ঠী রাজনীতি ও রাষ্ট্রশক্তি যখন একসাথে বিস্ফোরিত হয় তার প্রাচীন উদাহরণ |
| 1888 | যুক্তরাষ্ট্র | ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠা | ভূগোল, বিজ্ঞান ও অনুসন্ধানকে জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে নিয়ে আসার বড় প্ল্যাটফর্ম |
| 1898 | ফ্রান্স | এমিল জোলার “J’Accuse…!” প্রকাশ | রাষ্ট্রক্ষমতার বিরুদ্ধে লেখকের নৈতিক অবস্থান ও গণমাধ্যমের সাহসের প্রতীক |
| 1982 | যুক্তরাষ্ট্র | এয়ার ফ্লোরিডা ফ্লাইট ৯০ দুর্ঘটনা | বরফ, আবহাওয়া ও পাইলটিং–এর ভুল থেকে সুরক্ষা নীতির বড় সংস্কার |
| 1991 | লিথুয়ানিয়া | ভিলনিয়াসে সোভিয়েত সেনা হামলা, স্বাধীনতার লড়াই | নাগরিক প্রতিরোধ ও তথ্য–অবকাঠামো রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ |
| 2012 | ইতালি | কোস্টা কনকর্ডিয়া জাহাজডুবি | সামুদ্রিক নিরাপত্তা, ক্রু–ব্যবহার ও কমান্ড জবাবদিহিতার শিক্ষাগ্রন্থ |
| 2021 | যুক্তরাষ্ট্র | ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় অভিশংসন | গণতন্ত্রে নির্বাহী ক্ষমতার জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক মেরুকরণের আধুনিক কেসস্টাডি |
দক্ষিণ এশিয়ায় ১৩ জানুয়ারিকে গভীরভাবে ছুঁয়ে থাকে লোহরি—বিশেষ করে পাঞ্জাব, হরিয়ানা, দিল্লি ও পাঞ্জাবি প্রবাসী সমাজে। লোহরি নিয়ে পঞ্জিকা ও সংবাদমাধ্যম দুটোই বছরের পর বছর ১৩ জানুয়ারি তারিখটাকে সামনে রেখে লিখে আসছে ।
-
কৃষিভিত্তিক সমাজে শস্য কাটার পর, বছরের সবচেয়ে ঠান্ডা সময়ে, মানুষ যখন নতুন মৌসুমের প্রহর গুনতে থাকে, তখনই লোহরির আগুন একধরনের “ধন্যবাদ” আর “প্রার্থনা”র মিলিত ভাষা হয়ে ওঠে ।
-
আগুনের চারপাশে ঘুরে ঘুরে গান গাওয়া, ঢোলের তালে নাচ, শিশুরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে গানের বিনিময়ে মিষ্টি–বাদাম সংগ্রহ—সব মিলিয়ে এটি একটি সামাজিক চুক্তি: “আমরা একে অপরের পাশে আছি” ।
কোলকাতায় বসবাসরত পাঞ্জাবি সম্প্রদায় শহরের বিভিন্ন আবাসিক পাড়ায় লোহরির আয়োজন করে; বাংলা ভাষী প্রতিবেশীরাও এতে অংশ নেন—যা দেখায়, উৎসবের কোনো একক ভাষা নেই, আছে শুধু অংশগ্রহণ।
কেন প্রাসঙ্গিক: লোহরি প্রমাণ করে, অভিবাসন মানেই শিকড় হারানো নয়; বরং এক শহরের ভেতরে আরেক শহর তৈরি হওয়া, যেখানে পুরোনো স্মৃতি আর নতুন বাস্তবতা একসাথে চলে।
জন্মদিন: বিজ্ঞান, সাহিত্য, রাজনীতি ও আন্দোলনের মুখগুলো
দক্ষিণ এশিয়া
রাকেশ শর্মা (জ. ১৯৪৯): ভারতের প্রথম মহাকাশচারী হিসেবে সোয়ুজ টি–১১ মিশনে অংশ নিয়ে ১৯৮৪ সালে মহাকাশে যান; ভারত–সোভিয়েত যৌথ মিশন হিসেবে তাঁর এই যাত্রা শীতল যুদ্ধ–যুগে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার প্রতীক । তাঁর “সারে জাহাঁ সে আচ্ছা” উক্তি শুধু টেলিভিশনের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত নয়, দক্ষিণ এশিয়ার বৈজ্ঞানিক আত্মবিশ্বাসেরও প্রতীক।
ফকির মোহন সেনাপতি (জ. ১৮৪৩): ওড়িয়া গদ্য সাহিত্যে তিনি “জনক” হিসেবে পরিচিত; তাঁর সামাজিক বাস্তবতাবাদী লেখাগুলো আঞ্চলিক ভাষা, জাতীয় পরিচয় ও শিক্ষা–রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে ।
বৈশ্বিক জন্মদিন

| নাম | জন্ম | জাতীয়তা | পরিচিতি |
|---|---|---|---|
| জর্জি মালেনকভ | ১৯০২ | সোভিয়েত | স্টালিন–পরবর্তী নেতৃত্বের মূল খেলোয়াড়, শীতল যুদ্ধের প্রারম্ভিক নাটকের অংশ |
| হোরাশিও এলজার | ১৮৩২ | মার্কিন | “র্যাগস টু রিচেস” ধরনের নৈতিক গল্প, আমেরিকান ড্রিম ধারণাকে জনপ্রিয় করা লেখক |
| এরিক বেটসিগ | ১৯৬০ | মার্কিন | ন্যানোস্কেল মাইক্রোস্কোপি নিয়ে কাজ করে নোবেলজয়ী পদার্থবিদ |
| উইনি বিয়ানিয়িমা | ১৯৫৯ | উগান্ডা | বৈষম্য, এইডস ও উন্নয়ন–নীতি নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কূটনীতিক ও সংগঠক |
| নাম | মৃত্যু | জাতীয়তা | পরিচিতি |
|---|---|---|---|
| স্টিফেন ফস্টার | ১৮৬৪ | মার্কিন | ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রভাবশালী গীতিকার, আমেরিকান লোকসংগীত–ঐতিহ্যের বড় মুখ |
| মেরি স্লেসর | ১৯১৫ | স্কটিশ | নাইজেরিয়ায় কাজ করা মানবতাবাদী, শিশুহত্যা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সামাজিক লড়াইয়ের মুখ |
| প্যাট্রিক ম্যাকগুহান | ২০০৯ | আইরিশ–আমেরিকান | “দ্য প্রিজনার”সহ একাধিক টিভি সিরিজ ও চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য পরিচিত অভিনেতা ও নির্মাতা |
| টেডি পেনডারগ্রাস | ২০১০ | মার্কিন | সোল ও আরঅ্যান্ডবি গানের শক্তিশালী কণ্ঠ, প্রেম ও বেদনার মিশেলে তৈরি বহু কালজয়ী গানের গায়ক |
| রওফ দেঙ্কতাশ | ২০১২ | তুর্কি–সাইপ্রিয়ট | উত্তর সাইপ্রাসের রাজনীতিতে বিতর্কিত কিন্তু কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখা নেতা |
লিথুয়ানিয়া: ফ্রিডম ডিফেন্ডারস’ ডে – তথ্য, টেলিভিশন টাওয়ার আর নাগরিক সাহস
১৯৯১ সালের ১৩ জানুয়ারির রাতে সোভিয়েত ট্যাঙ্ক ও সৈন্যরা ভিলনিয়াস টিভি টাওয়ারসহ কৌশলগত স্থানে হামলা চালায়; নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালানো ও ট্যাঙ্ক উঠিয়ে দেওয়ার ঘটনায় ১৪ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন এবং শতাধিক আহত হন ।
-
টিভি টাওয়ার ও সম্প্রচার কেন্দ্র দখল করার চেষ্টা ছিল “তথ্য নিয়ন্ত্রণের” যুদ্ধ; কিন্তু হাজার হাজার সাধারণ মানুষ শরীর দিয়ে সেই সিগন্যাল টাওয়ার রক্ষা করতে গিয়ে “স্বাধীনতার প্রহরী” হয়ে ওঠেন ।
-
এর পরপরই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও প্রতিবেদন সোভিয়েত কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ বাড়ায় এবং বাল্টিক অঞ্চলের স্বাধীনতার দাবিকে বৈশ্বিক সমর্থন এনে দেয় ।
আজ সেখানে “ফ্রিডম ডিফেন্ডারস’ ডে”তে মোমবাতি, স্মৃতিচারণ আর নীরবতা দিয়ে সেই রাতের কথা মনে রাখা হয়—যে রাতে ট্যাঙ্কের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল নিরস্ত্র নাগরিকের বুক।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি: একটি তারিখ থেকে বৈশ্বিক ব্র্যান্ড
১৮৮৮ সালের ১৩ জানুয়ারি, ওয়াশিংটন ডিসির কসমস ক্লাবে ৩৩ জন মানচিত্রবিদ, ভ্রমণকারী ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ একত্রিত হন—লক্ষ্য ছিল এমন এক সংগঠন গড়া, যা ভূগোল বিষয়ক জ্ঞান বাড়াবে এবং ছড়িয়ে দেবে ।
-
সেই বৈঠক থেকেই জন্ম নেয় ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি, যা পরে ম্যাগাজিন, টিভি ডকুমেন্টারি, ফটোগ্রাফি ও ডিজিটাল স্টোরিটেলিং–এর মাধ্যমে বিশ্বের নানা প্রান্তের গল্প ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয় ।
-
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ থেকে শুরু করে সমুদ্র, জলবায়ু, আদিবাসী সংস্কৃতি—সবকিছুর ভিজ্যুয়াল ভাষা তৈরিতে এই সংগঠনের অবদান বিশাল, আর সেই গল্প শুরু হয়েছিল এই ১৩ জানুয়ারির সভা থেকে ।
ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা: এয়ার ফ্লোরিডা ফ্লাইট ৯০ ও কোস্টা কনকর্ডিয়া
এয়ার ফ্লোরিডা ফ্লাইট ৯০ (১৯৮২)
ওয়াশিংটন ডি.সি. থেকে উড্ডয়নের কিছু পরেই তুষারপাত ও বরফাচ্ছন্ন আবহাওয়ার মধ্যে ফ্লাইট ৯০ পোটোম্যাক নদীতে ভেঙে পড়ে; বিমানে থাকা ৭৪ জনের মধ্যে এবং সেতুর ওপর থাকা মানুষের সঙ্গে মোট ৭৮ জন নিহত হন ।
-
তদন্তে দেখা যায়, সঠিক ডি–আইসিং না হওয়া, ইঞ্জিনের রিডিং নিয়ে ভুল ব্যাখ্যা, এবং ন্যূনতম নিরাপত্তা মার্জিন মেনে না নেওয়া এই দুর্ঘটনার মূল কারণ ।
-
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাইলট ট্রেনিং, ডি–আইসিং প্রটোকল ও ককপিট–রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট নিয়ে বিস্তৃত সংস্কার হয়; পাশাপাশি বরফজলে ঝাঁপিয়ে পড়া উদ্ধারকর্মী ও সাধারণ মানুষের সাহসিকতা মানবিকতার বড় গল্প হয়ে ওঠে ।
কোস্টা কনকর্ডিয়া (২০১২)
ইতালির গিগলিও দ্বীপের কাছে কোস্টা কনকর্ডিয়া পাথরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে এক পাশে হেলে পড়ে, এরপর বহু ঘণ্টা ধরে নাটকীয় উদ্ধার অভিযান চলে ।
-
তদন্তে উঠে আসে রুট থেকে বিচ্যুতি, ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কাছাকাছি চলে আসা, সময়মতো স্পষ্ট “অ্যাব্যান্ডন শিপ” নির্দেশ না দেওয়া—এসব মানবিক ভুলের চেইন ।
-
এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাগুলো ইভাকুয়েশন ড্রিল, যাত্রী তথ্যপ্রদান, এবং ক্যাপ্টেনের জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন গাইডলাইন জারি করে ।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি: দুইবার অভিশংসিত একজন প্রেসিডেন্ট
১৩ জানুয়ারি ২০২১ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দ্বিতীয়বারের মতো অভিশংসন প্রস্তাব পাস হয়, যা মার্কিন রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথম ।
-
অভিযোগ ছিল, ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় তাঁর ভূমিকা গণতান্ত্রিক নিয়মকে বিপন্ন করেছে এবং সহিংসতাকে উসকে দিয়েছে ।
-
যদিও পরে সেনেটে প্রয়োজনীয় ভোট না পাওয়ায় তিনি দোষী সাব্যস্ত হননি, তবুও এই অভিশংসন যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাহী ক্ষমতার জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক মেরুকরণ নিয়ে বড় বিতর্ক তৈরি করে ।
এল সালভাদর ভূমিকম্প (২০০১): প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভূমিধস ও ঝুঁকি–মানচিত্র
২০০১ সালের ১৩ জানুয়ারি এল সালভাদরের উপকূলে ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে; ৯০০–এর বেশি মানুষ নিহত হন এবং হাজার হাজার মানুষ আহত ও গৃহহীন হয়ে পড়েন ।
-
ভূমিকম্পটির সবচেয়ে ভয়ংকর দিক ছিল ব্যাপক ভূমিধস—বিশেষত লাস কোলিনাস এলাকার বিশাল ধস; গবেষণায় দেখা যায়, কম্পন ও ভঙ্গুর পাহাড়ি মাটি মিলিয়ে হাজার হাজার ভূমিধস শুরু হয়েছিল ।
-
পরে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গবেষকরা একে “পোস্টকার্ড–পারফেক্ট” ঢালে অনিরাপদ নির্মাণের ক্লাসিক উদাহরণ হিসেবে বিশ্লেষণ করেন; এই অভিজ্ঞতা থেকে মধ্য আমেরিকায় ভূমিধস–ঝুঁকি–মানচিত্র ও নগর পরিকল্পনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আসে ।
শেষকথা
১৩ জানুয়ারি কখনও লোহরির আগুনে উষ্ণ, কখনও ভিলনিয়াসের রক্তাক্ত রাত, কখনও আবার পোটোম্যাক–এর বরফজলে কাঁপতে থাকা বিমানের ডানা বা এল সালভাদরের কাঁপতে থাকা পাহাড়। কোথাও এটি উৎসব, কোথাও স্বাধীনতার দাবিতে রক্ত, কোথাও আবার বিজ্ঞান, গণমাধ্যম আর রাজনীতির কঠিন প্রশ্ন।
এক লাইনে বলা যায়—১৩ জানুয়ারি আমাদের শেখায়, একটি তারিখকে শুধু ক্যালেন্ডারের ঘর হিসেবে দেখলে চলে না; এটি একটি আয়না, যেখানে দেখা যায় মানুষ কীভাবে ভুল থেকে শেখে, স্মৃতি থেকে শক্তি পায় এবং উৎসবের আগুন থেকে পরস্পরের হাত ধরে এগিয়ে যায়।


