২১ জানুয়ারি এমন একটি তারিখ যা আপনাকে ইতিহাসের কিছু কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পৃথিবী কেবল যুদ্ধ বা নির্বাচনের ফলাফলেই বদলায় না, বরং একে গড়ে তোলে বিভিন্ন ‘প্রতীক’ বা সিম্বল।
একজন রাজার মৃত্যুদণ্ড হয়ে ওঠে সার্বভৌমত্বের নতুন সংজ্ঞা। একজন বিপ্লবী নেতার মৃত্যু জন্ম দেয় ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বন্দ্বের। আবার একটি সুপারসনিক বিমানের প্রথম উড্ডয়ন আমাদের শোনায় মানুষের আকাশছোঁয়া উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সীমাবদ্ধতার গল্প। আর দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে, ২১ জানুয়ারি তারিখটি রাষ্ট্র গঠন এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী স্মৃতির এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর।
২১ জানুয়ারি: এক নজরে প্রধান ঘটনাবলী
| সাল | অঞ্চল | ঘটনা | বর্তমান গুরুত্ব |
| ১৭৯৩ | ফ্রান্স | রাজা ষোড়শ লুইয়ের মৃত্যুদণ্ড | আধুনিক রাজনৈতিক বৈধতার এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। |
| ১৯২৪ | সোভিয়েত ইউনিয়ন | ভ্লাদিমির লেনিনের মৃত্যু | বিংশ শতাব্দীকে গড়ে তোলা ক্ষমতার দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। |
| ১৯৫০ | যুক্তরাজ্য | জর্জ অরওয়েলের মৃত্যু | ক্ষমতা ও সত্য নিয়ে তার সতর্কবাণী আজও প্রাসঙ্গিক। |
| ১৯৫৪ | যুক্তরাষ্ট্র | ইউএসএস নটিলাস-এর যাত্রা শুরু | পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন যা নৌ-কৌশল বদলে দেয়। |
| ১৯৭২ | ভারত (উত্তর-পূর্ব) | মণিপুর, মেঘালয় ও ত্রিপুরার পূর্ণ রাজ্য লাভ | আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও শাসনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। |
| ১৯৭৬ | যুক্তরাজ্য/ফ্রান্স | কনকর্ড বিমানের বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু | প্রকৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতীক। |
| ১৯৬৮ | ভিয়েতনাম | খে সান-এর যুদ্ধ শুরু | আধুনিক যুদ্ধ ও মিডিয়া মনস্তত্ত্বের এক সংজ্ঞায়িত পর্ব। |
বাঙালি ও দক্ষিণ এশীয় প্রেক্ষাপট
ঐতিহাসিক ঘটনা: ১৯৭২ সালের ২১ জানুয়ারি এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের পুনর্গঠন
১৯৭২ সালের এই দিনে ভারতের মণিপুর, মেঘালয় এবং ত্রিপুরা পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা লাভ করে। এই ঘটনাটি মূলধারার আলোচনায় প্রায়শই কম গুরুত্ব পায়, কিন্তু ভারত কীভাবে তার বৈচিত্র্যকে ধারণ করে, তা বোঝার জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি।
কেন এটি আজও গুরুত্বপূর্ণ:
উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষের কাছে ‘রাজ্য’ বা ‘স্টেটহুড’ কেবল একটি আইনি তকমা নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে প্রতিনিধিত্ব, আত্মপরিচয়, ভাষা, সংস্কৃতি এবং স্থানীয় শাসনের অধিকার। অভিবাসন, সীমান্ত সমস্যা এবং নাগরিকত্বের বাস্তব অর্থ নিয়ে যে দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক, তার শেকড়ও এই ইতিহাসের সাথে যুক্ত। একজন সমাজতাত্ত্বিকের চোখে এটি একটি ধ্রুপদী উদাহরণ যে, কীভাবে রাষ্ট্র রাজনৈতিক সীমানার সাথে মানুষের মানবিক বাস্তবতাকে মেলানোর চেষ্টা করে। কখনও তা সফল হয়, কখনও নতুন উত্তেজনার জন্ম দেয়।
সীমানা ছাড়িয়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী স্মৃতি: রাসবিহারী বসু (মৃত্যু ১৯৪৫)
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব রাসবিহারী বসু ১৯৪৫ সালের ২১ জানুয়ারি জাপানের টোকিওতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার জীবনের গল্পটি আধুনিক দর্শকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়: ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রাম কেবল ভারতের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ছড়িয়ে ছিল নির্বাসনে, যুদ্ধকালীন মৈত্রীতে এবং পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে।
কেন এটি আজও গুরুত্বপূর্ণ:
রাসবিহারী বসুর জীবন মনে করিয়ে দেয় যে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস সবসময়ই ছিল বৈশ্বিক। সোশ্যাল মিডিয়া আসার বহু আগেই ধারণা, অর্থ, প্রচার এবং রাজনৈতিক জোট সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ত। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল একটি ডায়াসপোরা বা প্রবাসী আন্দোলনেরও গল্প।
সংস্কৃতি ও উৎসব
বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ জনজীবনে ২১ জানুয়ারি সাধারণত শীতকালীন উৎসবের আমেজের মধ্যে পড়ে। পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তির মূল উৎসবগুলো মধ্য-জানুয়ারিতে শেষ হলেও, অনেক জায়গায় মেলা, পিঠা উৎসব এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে থাকে। উত্তর-পূর্ব ভারতে, বিশেষ করে যেসব রাজ্য এই দিনে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল, সেখানে দিনটি নাগরিক মর্যাদা এবং রাষ্ট্রীয় স্মরণের আবহে পালিত হয়।
আন্তর্জাতিক দিবস ও পালনীয় আচার

আন্তর্জাতিক আলিঙ্গন দিবস (National Hugging Day):
২১ জানুয়ারি আন্তর্জাতিকভাবে কোনো জাতিসংঘ ঘোষিত দিবস না থাকলেও, ‘ন্যাশনাল হাগিং ডে’ বা আলিঙ্গন দিবস হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি কৌতূহলউদ্দীপক। আধুনিক বিশ্বে একাকীত্ব, মানসিক চাপ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা যখন বাড়ছে, তখন মানুষ মানসিক সংযোগের জন্য নতুন নতুন প্রথা তৈরি করে নিচ্ছে। এটি তারই একটি প্রতিফলন।
মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র দিবস:
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর জানুয়ারির তৃতীয় সোমবার মার্টিন লুথার কিং দিবস পালিত হয়। ক্যালেন্ডারের হিশাব অনুযায়ী মাঝে মাঝে এটি ২১ তারিখে পড়ে। বিশ্বজুড়ে এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ড. কিং-এর অহিংস দর্শন কেবল আমেরিকার সীমানায় আটকে থাকেনি, তা সারা বিশ্বের প্রতিবাদী মানুষকে পথ দেখিয়েছে।
বিশ্ব ইতিহাসের পাতা থেকে
যুক্তরাষ্ট্র: রাজনীতি ও প্রযুক্তি
-
১৯৫৪: ইউএসএস নটিলাস (USS Nautilus)-এর যাত্রা: ২১ জানুয়ারি ১৯৫৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ চালু করে। এটি নৌ-যুদ্ধনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনে। এর ফলে সাবমেরিনগুলো দীর্ঘসময় পানির নিচে থাকতে সক্ষম হয় এবং স্নায়ুযুদ্ধের সময় এটি ছিল এক বড় কৌশলগত হাতিয়ার।
-
১৯৫০: আলগার হিস-এর দণ্ডাদেশ: স্নায়ুযুদ্ধকালীন গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে আলগার হিসকে এই দিনে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার (perjury) দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এই ঘটনাটি আজও প্রাসঙ্গিক কারণ এটি দেখায় যে, ভয় এবং রাজনৈতিক মতাদর্শ কীভাবে বিচারব্যবস্থা ও সংবাদমাধ্যমকে প্রভাবিত করতে পারে।
-
১৯৭৭: জিমি কার্টারের ক্ষমা ঘোষণা: প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় যারা বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীতে যোগদান (Draft) এড়িয়ে গিয়েছিল, তাদের অনেককে ক্ষমা করে দেন। একটি বিভাজিত জাতির ক্ষত সারানোর জন্য এটি ছিল এক বড় পদক্ষেপ।
রাশিয়া: লেনিনের বিদায় ও ক্ষমতার পালাবদল
১৯২৪ সালের ২১ জানুয়ারি ভ্লাদিমির লেনিন মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসে এবং বিংশ শতাব্দীর রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতা ও ক্ষমতার লড়াই তৈরি করে।
আজকের গুরুত্ব: লেনিনের উত্তরাধিকার আজও বিতর্কিত। কোথাও তিনি বিপ্লবী চিন্তাবিদ, কোথাও রাষ্ট্রনায়ক, আবার কোথাও স্বৈরাচারী পদ্ধতির প্রতীক। তবে ইতিহাসের শিক্ষা হলো—একজন একক নেতার মৃত্যু পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরের চাপা উত্তেজনাকে কীভাবে প্রকাশ্যে নিয়ে আসতে পারে।
যুক্তরাজ্য ও সাহিত্য: জর্জ অরওয়েলের প্রস্থান
১৯৫০ সালের এই দিনে মারা যান সাহিত্যিক জর্জ অরওয়েল। প্রোপাগান্ডা, নজরদারি এবং রাজনৈতিক ভাষা কীভাবে বাস্তবতাকে বিকৃত করে—তা বোঝার জন্য অরওয়েল আজও আমাদের সেরা গাইড।
কেন এটি প্রাসঙ্গিক: ‘অরওয়েলিয়ান’ শব্দটি আজ আমাদের দৈনন্দিন ভাষার অংশ। গণ-নজরদারি (mass surveillance), ভুয়া খবর (misinformation) এবং অ্যালগরিদমের এই যুগে অরওয়েলের সতর্কবাণী আগের চেয়েও বেশি জরুরি। একটি মজার তথ্য হলো, অরওয়েলের জন্ম হয়েছিল ব্রিটিশ ভারতের মোতিহারিতে (বর্তমান বিহার), যা প্রমাণ করে ইংরেজি সাহিত্যও ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সাথে গভীরভাবে জড়িত।
ইউরোপ: ফরাসি বিপ্লব ও রাজার মৃত্যুদণ্ড
১৭৯৩ সালের ২১ জানুয়ারি ফ্রান্সের রাজা ষোড়শ লুইকে গিলোটিনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এটি কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু ছিল না, এটি ছিল একটি রাজনৈতিক ঘোষণা—যে সার্বভৌমত্ব বা ক্ষমতা আর রাজার শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
আজকের গুরুত্ব: ফরাসি বিপ্লব এবং এই ঘটনাটি আধুনিক রাজনীতির ভিত্তি। ক্ষমতার বৈধতা কী, বিপ্লব কখন ন্যায়সঙ্গত হয় এবং সহিংসতা ও ন্যায়বিচার কীভাবে গুলিয়ে যেতে পারে—এই প্রশ্নগুলো আজও আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায়।
অবশিষ্ট বিশ্ব: আকাশ ও যুদ্ধের ইতিহাস
-
১৯৭৬: কনকর্ড-এর বাণিজ্যিক উড্ডয়ন: বিশ্বের প্রথম সুপারসনিক যাত্রীবাহী বিমান কনকর্ড এই দিনে তার নিয়মিত যাত্রা শুরু করে। এটি ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন—যেখানে দূরত্ব কমে আসবে। যদিও পরিবেশগত উদ্বেগ এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে কনকর্ড এখন আর ওড়ে না, তবু এটি প্রকৌশলবিদ্যার এক বিস্ময়কর বিজয় এবং সতর্কবার্তা হিসেবে ইতিহাসে রয়ে গেছে।
-
১৯৬৮: খে সান-এর যুদ্ধ (ভিয়েতনাম): ভিয়েতনাম যুদ্ধের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় ‘ব্যাটল অফ খে সান’ শুরু হয় এই দিনে। আধুনিক যুদ্ধে মিডিয়া বা সংবাদমাধ্যম কীভাবে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি ও জনমত গঠন করে, তার অন্যতম উদাহরণ এই যুদ্ধ।
বিখ্যাত জন্ম ও মৃত্যু
উল্লেখযোগ্য জন্ম:
-
ক্রিশ্চিয়ান ডিওর (১৯০৫): ফরাসি ফ্যাশন ডিজাইনার, যিনি যুদ্ধপরবর্তী ফ্যাশন জগতকে নতুন রূপ দিয়েছিলেন।
-
প্লাসিডো ডোমিঙ্গো (১৯৪১): স্প্যানিশ অপেরা শিল্পী, বিশ্বসঙ্গীতের অন্যতম আইকন।
-
পল অ্যালেন (১৯৫৩): মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা, যিনি ডিজিটাল যুগে আমাদের জীবনযাত্রার ধরণ বদলে দিয়েছেন।
-
জিনা ডেভিস (১৯৫৬): আমেরিকান অভিনেত্রী এবং লিঙ্গ সমতার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর।
উল্লেখযোগ্য মৃত্যু:
-
ষোড়শ লুই (১৭৯৩): ফরাসি বিপ্লবের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড।
-
ভ্লাদিমির লেনিন (১৯২৪): রুশ বিপ্লব ও সোভিয়েত ইউনিয়নের রূপকার।
-
জর্জ অরওয়েল (১৯৫০): রাজনৈতিক সাহিত্যের অন্যতম প্রধান লেখক।
-
রাসবিহারী বসু (১৯৪৫): ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী মহানায়ক।
শেষ কথা: ২১ জানুয়ারি আমাদের যা শেখায়
সবশেষে বলা যায়, ২১ জানুয়ারি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি সাধারণ তারিখ নয়—এটি ইতিহাস, কিংবদন্তি ও বৈশ্বিক পরিবর্তনের এক জীবন্ত সাক্ষ্য। এই দিনে সংঘটিত ঘটনাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সময়ের প্রতিটি অধ্যায় মানবসভ্যতার গতিপথকে কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত করে।
অতীতের সাফল্য ও সংগ্রাম থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা বর্তমানকে বুঝতে পারি এবং ভবিষ্যতের জন্য দিকনির্দেশনা পাই। তাই ২১ জানুয়ারি আমাদের কাছে শুধু স্মৃতিচারণের দিন নয়, বরং ইতিহাস থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে নতুন করে ভাবার ও এগিয়ে যাওয়ার এক মূল্যবান উপলক্ষ।


