২৩ জানুয়ারি – ইতিহাসের এই দিনে – বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা, জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী

সর্বাধিক আলোচিত

২৩ জানুয়ারি ক্যালেন্ডারের আর পাঁচটা দিনের মতোই দেখায়, কিন্তু একটু গভীরভাবে তাকালে বোঝা যায়—এই তারিখের ভেতরে লুকিয়ে আছে যুদ্ধ-শান্তির সমাপ্তি, ভূমিকম্পের ধ্বংস, ভোটাধিকার অর্জনের সংগ্রাম, এক বীর নেতার জন্ম আর সরস্বতী পুজোর হলুদ আলো। এই একদিনেই যেমন দক্ষিণ এশিয়ার মাটি মনে রাখে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মকে, তেমনি পৃথিবীর অন্য প্রান্তে মনে রাখা হয় ভোট কর নিষিদ্ধ হওয়া, চিকিৎসা পেশায় নারীর প্রথম প্রবেশ, কিংবা ভীষণ এক ভূমিকম্পে লাখো প্রাণহানি।

আর সাংস্কৃতিক দিক থেকে, বাংলা ও উত্তর ভারতের বিশাল অংশে ২৩ জানুয়ারিকে অনেক বছরেই মনে রাখা হয় বসন্ত পঞ্চমী বা সরস্বতী পুজোর দিন হিসেবে—যেদিন বিদ্যা, সংগীত আর সৃজনশীলতার দেবীকে আহ্বান করে নতুন শুরুর প্রার্থনা করা হয়।

এক নজরে: ২৩ জানুয়ারির ইতিহাস

সাল স্থান কী ঘটেছিল কেন এখনো গুরুত্বপূর্ণ
1556 চীন (শানসি অঞ্চল) ভয়াবহ শানসি ভূমিকম্প মানব ইতিহাসের সর্বাধিক প্রাণহানিকর প্রাকৃতিক দুর্যোগ
1368 চীন জু ইউয়ানঝাং “হংউ” নামে মিং রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন চীনের রাষ্ট্রগঠন ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি
1719 ইউরোপ (লিশটেনস্টেইন) লিশটেনস্টেইন প্রিন্সিপালিটি গঠিত আধুনিক ইউরোপে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের ধারণা
1849 যুক্তরাষ্ট্র এলিজাবেথ ব্ল্যাকওয়েল প্রথম নারী হিসেবে এম.ডি. ডিগ্রি অর্জন করেন নারীর শিক্ষাধিকার ও পেশাগত সমতার ইতিহাস
1964 যুক্তরাষ্ট্র ২৪তম সংবিধান সংশোধনী: ভোট কর নিষিদ্ধ নাগরিক অধিকার আন্দোলনের বড় জয়
1968 কোরিয়া/যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়া মার্কিন জাহাজ USS Pueblo দখল করে ঠান্ডা যুদ্ধ ও গোয়েন্দা উত্তেজনা
1973 যুক্তরাষ্ট্র/ভিয়েতনাম নিক্সন ভিয়েতনাম যুদ্ধাবসানের ঘোষণা দেন যুদ্ধের সমাপ্তি ও শান্তি প্রক্রিয়া
2020 চীন (উহান) উহানে লকডাউন শুরু আধুনিক মহামারী নিয়ন্ত্রণের মডেল ও চ্যালেঞ্জ

বঙ্গীয় প্রেক্ষাপট: বীরত্ব, সাহিত্য ও সংস্কৃতির তারিখ

নেতাজির জন্মদিন: বীরত্ব ও দর্শনের উত্তরাধিকার

নেতাজির জন্মদিন

২৩ জানুয়ারি—ভারত ও সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী সমাজের কাছে এটি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মবার্ষিকী (১৮৯৭)। ভারতের সরকার ২০২১ সাল থেকে এই দিনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পরাক্রম দিবস (Parakram Diwas)’ হিসেবে ঘোষণা করে—বীরত্ব, সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে।

নেতাজি শুধু স্বাধীনতার যোদ্ধা ছিলেন না; তিনি এক প্রশ্নচিহ্ন, যিনি বারবার আমাদের মনে করিয়ে দেন স্বাধীনতার পথ আসলে কী দিয়ে গড়া—নিরস্ত্র আন্দোলন, না কি সশস্ত্র সংগ্রাম?

তাঁর জীবন আমাদের শেখায়:

  • কোনও সমাজ যদি পরাধীনতার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তবে তাকে তার ন্যায্যতার সংজ্ঞা নিজেরাই লিখতে হয়।

  • মুক্তি আন্দোলন কখনও শুধু দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক দরকষাকষির অংশ।

  • আর নেতৃত্বের নৈতিকতা সব সময় স্পষ্ট নয়—তবু ইতিহাস কেবল ফলাফলের নয়, সংকল্পেরও সাক্ষী হয়ে থাকে।

এই কারণে আজও নেতাজির জীবন আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়: স্বাধীনতার সংগ্রামে আদর্শ, রাজনীতি ও বাস্তবতার ভারসাম্য কীভাবে খুঁজে পাওয়া যায়।

সরস্বতী পুজো ও বসন্ত পঞ্চমী

২৩ জানুয়ারির সঙ্গে আরেকটি বড় সাংস্কৃতিক স্রোত জড়িয়ে থাকে, যখন এই দিনে হয় বসন্ত পঞ্চমী—বিশেষত বাংলা, আসাম, বিহার, ও উত্তর ভারতের বহু অংশে এই দিনেই পালন করা হয় সরস্বতী পুজো।

দেবী সরস্বতী: জ্ঞান ও সৃজনশীলতার প্রতীক

পুরাণকথা ও সংস্কৃতিতে সরস্বতীকে দেখা হয় সাদা পোশাক পরা, বীণা হাতে, বই ও পদ্মসহ এক শান্ত রূপে—যেখানে জ্ঞান, স্বচ্ছতা, সৃজনশীলতা ও নির্লোভতার এক মিশ্র অভিব্যক্তি থাকে।

  • তিনি ভাষার দেবী—অর্থাৎ কথার শক্তি, উচ্চারণের সৌন্দর্য আর যুক্তির ধার সবই তাঁর আশীর্বাদের অংশ।

  • তিনি সুরের দেবী—শাস্ত্রীয় সংগীত থেকে শুরু করে লোকসংগীত, মন্ত্রপাঠ থেকে আবৃত্তি—সবকিছুর পেছনে এক অদৃশ্য অনুপ্রেরণা।

  • তিনি শিক্ষার দেবী—শিশুর হাতে প্রথম অক্ষর লেখা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার সাফল্য, গবেষণা, আবিষ্কার—সবকিছুকে এই দিনে তাঁর চরণে সমর্পণ করা হয়।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের মৃত্যু (১৮৫৯): বাংলা সাংবাদিকতার প্রারম্ভে এক নাম

১৮৫৯ সালের ২৩ জানুয়ারি প্রয়াত হন কবি ও সাংবাদিক ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত—বাংলা সাহিত্য ও সাংবাদিকতার এক সেতুবন্ধন-পুরুষ। তিনি ছিলেন এমন এক সময়ে যখন বাংলা সংবাদপত্র সমাজ গঠনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছিল।

তিনি শুধু সংবাদ লিখতেন না; তাঁর রম্যরচনা ও ব্যঙ্গ সমাজের ভেতরের অন্ধকার, ভণ্ডামি ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্নগুলোকে আলোতে আনত।

আজকের দিনে যখন আমরা অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ব্লগ বা সোশ্যাল মিডিয়ায় “জনমত” তৈরি করি, তখন মনে রাখা জরুরি—ঈশ্বরচন্দ্রের সেই ১৯ শতকের সংবাদঘরেই এই জনআলোচনার সংস্কৃতি জন্ম নিয়েছিল।

নবীনচন্দ্র সেনের মৃত্যু (১৯০৯): মহাকাব্যে জাতির আত্মপ্রতিকৃতি

২৩ জানুয়ারি ১৯০৯ সালে প্রয়াত হন কবি নবীনচন্দ্র সেন—চট্টগ্রামের সন্তান, যিনি মহাকাব্যকে জাতীয় চেতনার বাহনে পরিণত করেছিলেন।

যেখানে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সংবাদপত্রে সমাজকে নতুন চোখে দেখতে শেখালেন, সেখানে নবীনচন্দ্র সেন দেখালেন কাব্যে কীভাবে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও ইতিহাসের গর্ব একসঙ্গে ধ্বনিত হতে পারে।

তাঁর রচনা ইতিহাসের সঙ্গে আবেগের মেলবন্ধন ঘটায়—যা আজও বাংলা সাহিত্য ও জাতীয়তাবাদের আলোচনায় অপরিহার্য।

আন্তর্জাতিক দিবস ও জনপ্রিয় পালা

জাতীয় হস্তলিপি দিবস (National Handwriting Day, যুক্তরাষ্ট্র)

এই দিনটি জন হ্যানককের জন্মতিথির সঙ্গে যুক্ত। দিনে দিনে প্রযুক্তি আমাদের লেখার অভ্যাস বদলে দিচ্ছে, কিন্তু হাতের লেখা এখনও অনুভূতির ভাষা—চিঠি, স্বাক্ষর, ডায়েরি কিংবা কবিতার খসড়া আজও হৃদয়ের স্থান দখল করে আছে।

ন্যাশনাল পাই ডে (National Pie Day, যুক্তরাষ্ট্র)

হালকা মেজাজে বললে, ২৩ জানুয়ারি আমেরিকার ‘পাই খাওয়ার’ উৎসবের দিন! কিন্তু সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় — খাবারভিত্তিক উৎসব আসলে জাতীয় পরিচয়ের প্রতিফলন; নস্টালজিয়া আর একাত্মতার প্রতীক।

বৈশ্বিক ঘটনায় নজর

চীন

১৫৫৬ সালের মহাভূমিকম্প: শানসি ট্র্যাজেডি

চীনের শানসি প্রদেশে ঘটে মানব ইতিহাসের ভয়াবহতম ভূমিকম্প, যেখানে প্রায় ৮,৩০,০০০ মানুষ নিহত বা আহত হয়। এটি প্রমাণ করে—মানবিক বিপর্যয় শুধু প্রাকৃতিক নয়; স্থাপত্য, নগর পরিকল্পনা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি সম্পর্কেও শেখার প্রয়োজনীয়তা আছে।

১৩৬৮ সালে: মিং রাজবংশের সূচনা

জু ইউয়ানঝাং তাঁর “হংউ” উপাধি নিয়ে মিং যুগের সূচনা করেন—চীনের ইতিহাসে রাষ্ট্রব্যবস্থা, প্রশাসন ও সংস্কৃতির এক স্থায়ী উত্তরাধিকার এর মধ্যেই গড়ে ওঠে।

২০২০: উহান লকডাউন

২৩ জানুয়ারি ২০২০ সালে উহান শহরকে লকডাউন ঘোষণা করা হয়—জনগণের স্বাধীনতা ও সরকারি কর্তৃত্বের ভারসাম্য পুনর্বিবেচনার সূচনা করে এই ঘটনার মধ্য দিয়ে। “লকডাউন”, “ফ্ল্যাটেন দ্য কার্ভ” বা “এসেনশিয়াল ওয়ার্ক”—এই সব শব্দ তখনই বৈশ্বিক অভিধানে প্রবেশ করে।

যুক্তরাষ্ট্র

১৯৬৪: ২৪তম সংবিধান সংশোধনী

এই দিনে ভোট কর নিষিদ্ধ করা হয়—যা দরিদ্র ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের প্রতি বৈষম্যের একটি কাঠামোগত অবসান ঘটায়।

আজও এই ঘটনা মনে করায়—আইনি বাধা সরালে হয়তো সমস্যা কমে, কিন্তু নতুন প্রতিবন্ধকতা জন্ম নেয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বা সামাজিক কাঠামোয়।

১৮৪৯: এলিজাবেথ ব্ল্যাকওয়েল

তিনি প্রথম নারী যিনি যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করেন। এটি শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি প্রমাণ করে, এক নারীর প্রবেশদ্বারই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পথ উন্মুক্ত করতে পারে।

১৯৬৮: USS Pueblo ঘটনা

উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা জাহাজ দখল করে নেয়, যা ঠান্ডা যুদ্ধের উত্তেজনা আরও বাড়ায়। ইতিহাস আমাদের শেখায়—গোয়েন্দা তৎপরতা এক মুহূর্তেই আন্তর্জাতিক সংকটে পরিণত হতে পারে।

ইউরোপ

১৭১৯: লিশটেনস্টেইনের জন্ম

মাইক্রো-স্টেটদের টিকে থাকা আসলে কূটনীতি, আইন ও কৌশলগত নিরপেক্ষতার এক নিদর্শন। আজকের ইউরোপেও ছোট রাষ্ট্রগুলো কীভাবে নিজস্ব পরিচয় ধরে রাখে, তা লিশটেনস্টেইন শেখায়।

বিখ্যাত জন্ম (আন্তর্জাতিক)

  • জন হ্যানকক (১৭৩৭, আমেরিকান) – মার্কিন বিপ্লবী রাজনীতিক

  • এডুয়ার ম্যানেট (১৮৩২, ফরাসি) – আধুনিক শিল্পকলার অগ্রদূত

  • জ্যাঙ্গো রেইনহার্ট (১৯১০, ফরাসি জিপসি-জ্যাজ সঙ্গীতজ্ঞ)

  • সুভাষচন্দ্র বসু (১৮৯৭, ভারতীয়)

  • আব্দুর রাজ্জাক (১৯৪২, বাংলাদেশি চলচ্চিত্র তারকা)

মৃত্যুবরণ

  • সালভাদোর দালি (১৯৮৯, স্প্যানিশ) – অতিবাস্তব শিল্পের রূপকার

  • পল রোবসন (১৯৭৬, আমেরিকান) – অভিনেতা, গায়ক ও নাগরিক অধিকার কর্মী

  • এডভার্ড মুঙ্ক (১৯৪৪, নরওয়েজিয়ান) – ‘দ্য স্ক্রিম’-এর স্রষ্টা

  • ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (১৮৫৯, বাঙালি কবি-সাংবাদিক)

  • নবীনচন্দ্র সেন (১৯০৯, বাঙালি কবি)

দিনের উক্তি

“আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাকে স্বাধীনতা দেব।”
— নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু (১৯৪৪)

শেষকথা

যখন আমরা ২৩ জানুয়ারি পড়ি, এটি কেবল একগুচ্ছ তারিখ আর ঘটনা নয়। এটি এক মানব ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি—যেখানে রয়েছে সাহস, বিপর্যয়, বুদ্ধিমত্তা, সংস্কৃতি ও স্মৃতির মিশ্রণ।

এই তারিখ আমাদের শেখায় কীভাবে জাতি নিজেদের পুনর্নির্মাণ করে—দুর্যোগের পর, পরাজয়ের পর, বা বিদ্রোহের পরেও। আর এজন্যই ইতিহাসে ২৩ জানুয়ারি যেন এক অদৃশ্য সেতু—যা অতীত ও বর্তমানকে যুক্ত করে আমাদের সংগ্রামের গল্পে।

সর্বশেষ