৯ মে: ইতিহাসের এই দিনে – বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা, জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী

সর্বাধিক আলোচিত

৯ মে তারিখটি ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য ও স্বতন্ত্র স্থান দখল করে আছে। এটি একদিকে যেমন দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশের গভীর সাংস্কৃতিক উদযাপনের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনেরও সাক্ষী। এই নির্দিষ্ট দিনে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে আমরা সমাজের বিবর্তন বিভিন্ন সাম্রাজ্যের উত্থান পতন এবং বিজ্ঞান শিল্পকলা ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে মানুষের অবিশ্বাস্য অগ্রগতির এক পরিষ্কার চিত্র দেখতে পাই। এই তারিখটি কেবল কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমষ্টি নয় বরং এটি মানুষের নিরন্তর প্রচেষ্টার এমন এক ধারাবাহিক ক্যানভাস যেখানে ব্যক্তিবিশেষের কর্মকাণ্ড আমাদের আধুনিক বিশ্বে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। এই ঘটনাবলিকে সত্যিকার অর্থে উপলব্ধি করতে হলে আমাদের বাঙালি পরিমণ্ডল এবং বিস্তৃত আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট উভয় দিকেই একটি সামগ্রিক দৃষ্টিপাত করতে হবে।

ভারতীয় উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ৯ মে ঘটে যাওয়া নানা যুগান্তকারী মুহূর্তে সমৃদ্ধ।

বাঙালি পরিমণ্ডল ও ভারতের ঐতিহাসিক বিবর্তন

১৫৪০ সালের ৯ মে জন্মগ্রহণ করেছিলেন মেওয়ারের কিংবদন্তি রাজপুত রাজা মহারাণা প্রতাপ। তিনি ছিলেন প্রতিরোধ ও দেশপ্রেমের এক জ্বলন্ত প্রতীক। মুঘল সাম্রাজ্যের বিস্তারের বিরুদ্ধে তাঁর অবিরাম সামরিক অভিযান বিশেষ করে হলদিঘাটের যুদ্ধে তাঁর বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্ব আঞ্চলিক স্বাধীনতা রক্ষার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। তাঁর জীবনকাহিনী আজও উপমহাদেশের সেইসব প্রজন্মকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে যারা যেকোনো প্রতিকূলতার মাঝেও অদম্য সাহস ও দৃঢ়তা বজায় রাখতে বিশ্বাসী। এই মহান নেতার আদর্শ আজও এই অঞ্চলে জাতীয়তাবাদের একটি শক্তিশালী স্তম্ভ।

অন্যদিকে ১৮৬৬ সালের এই দিনেই মহারাষ্ট্রের রত্নাগিরি জেলায় জন্মগ্রহণ করেন গোপাল কৃষ্ণ গোখলে। তিনি ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা এবং বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উন্নয়ন এবং শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে তিনি সার্ভেন্টস অব ইন্ডিয়া সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে সোচ্চার গোখলে ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর আদি রাজনৈতিক গুরু। তাঁর মেধাভিত্তিক রাজনৈতিক দর্শন বাংলা অঞ্চলসহ সমগ্র ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের গতিপথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তাঁর দেখানো পথ ধরেই পরবর্তীতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম একটি সুসংগঠিত রূপ লাভ করে।

অবকাঠামো এবং নগর উন্নয়নের ক্ষেত্রেও ৯ মে এক বিরাট মাইলফলক। ১৮৭৪ সালের এই দিনে মুম্বাইয়ে প্রথমবারের মতো ঘোড়ায় টানা ট্রামগাড়ি চলাচল শুরু হয়। এটি ছিল এই অঞ্চলের গণপরিবহনের ক্ষেত্রে এক বিশাল উল্লম্ফন যা ভারত ও বাংলাদেশের আধুনিক ট্রানজিট নেটওয়ার্কের প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপন করেছিল। ট্রাম ব্যবস্থার প্রচলন শহরের মানুষের যাতায়াতকে শুধু সহজই করেনি বরং অর্থনৈতিক সমন্বয় এবং শহরের সীমানা দ্রুত সম্প্রসারণে বিশাল ভূমিকা রেখেছিল। এই যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সে সময়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল।

বাঙালি পরিমণ্ডলের সাংস্কৃতিক বুননও ৯ মে এর আশেপাশের দিনগুলোর সাথে গভীরভাবে যুক্ত। যদিও ঐতিহ্যবাহী বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী এর গ্রেগরীয় তারিখ প্রতি বছর কিছুটা পরিবর্তিত হয় তবুও এই সময়টি প্রায়শই পঁচিশে বৈশাখ এর সাথে মিলে যায়। এই দিনটি পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে এক বিশাল এবং ঐক্যবদ্ধ সাংস্কৃতিক উৎসবের দিন যা নোবেলজয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম তাঁর সাহিত্য রবীন্দ্রসংগীত এবং মানবতাবাদী আদর্শকে স্মরণ করে। বাংলা সাহিত্য দর্শন এবং জাতীয় পরিচয়ে তাঁর গভীর প্রভাব বলে শেষ করার মতো নয় এবং এই সময়ের উদযাপনগুলো বাঙালি জাতির অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক শক্তিশালী স্মারক হিসেবে কাজ করে।

দক্ষিণ এশিয়ার সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারের দিকে তাকালেও ৯ মে তারিখটিতে বেশ কয়েকটি গভীরভাবে প্রভাব বিস্তারকারী স্মরণীয় দিবসের দেখা মেলে।

৯ মে আন্তর্জাতিক দিবস ও ছুটির দিন

আন্তর্জাতিক দিবস ও ছুটির দিনসমূহ

রাজনৈতিক দিক থেকে ইউরোপ দিবস সম্ভবত এই তারিখের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ আয়োজন। এটি ১৯৫০ সালের ঐতিহাসিক শুমান ঘোষণা কে স্মরণ করে পালিত হয়। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট শুমান ইউরোপের কয়লা ও ইস্পাত শিল্পকে একত্রিত করার এক যুগান্তকারী প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এই অর্থনৈতিক একীকরণের পদক্ষেপটিই মূলত আধুনিক ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল। ফ্রান্স এবং জার্মানির মতো প্রতিষ্ঠাতা দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থকে একে অপরের সাথে যুক্ত করার মাধ্যমে শুমান নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন যেন ভবিষ্যতে তাদের মধ্যে কোনো যুদ্ধ কেবল অকল্পনীয়ই নয় বরং বস্তুগতভাবে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। আজ ইউরোপ দিবসকে শান্তি ঐক্য এবং সফল আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক অনন্য প্রতীক হিসেবে উদযাপন করা হয়।

ইউরোপ দিবসের এই কূটনৈতিক সূচনার ঠিক বিপরীতে ৯ মে তারিখটি রাশিয়া এবং পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রে বিজয় দিবস হিসেবেও গভীরভাবে স্বীকৃত। এই বৃহৎ জাতীয় ছুটির দিনটি ১৯৪৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে নাৎসি জার্মানির আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের স্মৃতি বহন করে যার মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটেছিল ভয়াবহ গ্রেট প্যাট্রিয়টিক ওয়ার এর। পশ্চিমা মিত্রশক্তি ৮ মে ইউরোপে বিজয় দিবস উদযাপন করলেও সময়ের পার্থক্যের কারণে মস্কোতে এই আত্মসমর্পণ ৯ মে কার্যকর হয়েছিল। বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজ যুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভগুলোতে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং ইমমর্টাল রেজিমেন্ট মার্চের মতো আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটি স্মরণ করা হয় যেখানে সাধারণ মানুষ সেই ভয়াবহ সংঘাতে প্রাণ হারানো তাদের আত্মীয়দের ছবি বহন করে আনেন।

একটু ভিন্ন এবং আনন্দদায়ক সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ৯ মে বিশ্বজুড়ে পিটার প্যান দিবস হিসেবেও পালিত হয়। এই সাহিত্যিক ছুটির দিনটি স্কটিশ ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার জে.এম. ব্যারির জন্মবার্ষিকীকে সম্মান জানায় যিনি এমন এক বালকের কিংবদন্তি চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন যে কখনো বড় হতে চায়নি। নেভারল্যান্ডের সেই জাদুকরী জগৎ যেখানে পরী জলদস্যু এবং অন্তহীন দুঃসাহসিক অভিযান রয়েছে তা গত এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্কদের কল্পনাকে একইভাবে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছে। দিনটি তারুণ্যের বিস্ময় এবং গল্প বলার চিরন্তন শক্তির এক সুন্দর উদযাপন।

বিশ্বের ইতিহাসের টাইমলাইনও এই ৯ মে তারিখে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার রাজনৈতিক উত্থান পতন এবং কূটনৈতিক চুক্তিতে পরিপূর্ণ।

বিশ্ব ইতিহাসের টাইমলাইন ৯ মে

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৯ মে ১৯৬০ নাগরিক অধিকার এবং প্রজনন স্বায়ত্তশাসনের জন্য একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এই দিনে ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন আনুষ্ঠানিকভাবে এনোভিড এর অনুমোদন দেয় যা ছিল বাণিজ্যিকভাবে সহজলভ্য প্রথম জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল। এই চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি সমাজের কাঠামোকে আমূল বদলে দিয়েছিল যা মহিলাদের তাদের প্রজনন পছন্দের ওপর অভূতপূর্ব নিয়ন্ত্রণ প্রদান করে এবং কর্মক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ ও পরিবার পরিকল্পনার গতিশীলতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনে। পরবর্তীতে এই সিদ্ধান্ত সারা বিশ্বের নারী অধিকার আন্দোলনে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। এছাড়াও ৯ মে ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী মহামারীর অর্থনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে যখন মার্কিন বেকারত্বের হার ১৪.৯ শতাংশে পৌঁছায়। এটি ছিল মহামন্দার পর থেকে রেকর্ড করা সর্বোচ্চ স্তর যা একটি চরম জাতীয় দুর্বলতার মুহূর্তকে তুলে ধরেছিল।

১৯৪৫ সালের বিজয় দিবসের ঐতিহাসিক তাৎপর্যের বাইরে ৯ মে আধুনিক রাশিয়ার জন্য একটি মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিরও দিন। ২০১২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়ায় উৎপাদিত প্রথম একেবারে নতুন যাত্রীবাহী বিমান সুখোই সুপারজেট ১০০ ইন্দোনেশিয়ায় একটি প্রচারণামূলক প্রদর্শনীর সময় মাউন্ট সালাকে বিধ্বস্ত হয়। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বোর্ডে থাকা ৪৫ জনের সবাই প্রাণ হারান। তদন্তে পরে জানা যায় যে দুর্ঘটনাটি মূলত পাইলটের ত্রুটি এবং ভূখণ্ডের সতর্কতা উপেক্ষা করার কারণে ঘটেছিল যা রাশিয়ার মহাকাশ ও বিমান শিল্পের জন্য একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও শিক্ষণীয় মুহূর্ত হিসেবে কাজ করেছিল। এই ঘটনা এভিয়েশন শিল্পে সুরক্ষার মানদণ্ড নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দেয়।

চীনের জন্য ৯ মে ঐতিহাসিকভাবে এক গভীর বিষাদের সাথে স্মরণ করা হয়। ১৯১৫ সালে ইউয়ান শিকাই এর সরকার জাপান সাম্রাজ্যের উপস্থাপিত একুশ দফা দাবি এর একটি সংশোধিত সংস্করণ মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। এই আত্মসমর্পণ চীনের সার্বভৌমত্বকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছিল এবং বিশাল অভ্যন্তরীণ ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল যার ফলে ব্যাপক বিক্ষোভ এবং চীনা জাতীয়তাবাদের প্রবল উত্থান ঘটে। বহু বছর ধরে ৯ মে তারিখটিকে চীনে জাতীয় অপমান দিবস হিসেবে পালন করা হতো যা ভবিষ্যতে বিদেশি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলন ও প্রতিরোধের জন্য একটি শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল।

১৩৮৬ সালের ৯ মে যুক্তরাজ্য একটি উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক বিজয় লাভ করে। এই দিনে ইংল্যান্ড এবং পর্তুগালের মধ্যে উইন্ডসর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এটি পারস্পরিক সমর্থন এবং বন্ধুত্বের এমন এক চুক্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল যা বিস্ময়করভাবে আজও বিশ্বের প্রাচীনতম সক্রিয় কূটনৈতিক জোট হিসেবে টিকে আছে। বহু শতাব্দী পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্ধকার দিনগুলোতে রয়্যাল নেভি ৯ মে ১৯৪১ সালে একটি বিশাল গোয়েন্দা সাফল্য অর্জন করে। ব্রিটিশ বাহিনী সমুদ্রে জার্মান সাবমেরিন U-110 সফলভাবে দখল করে যার মাধ্যমে তারা একটি অক্ষত এনিগমা সাইফার মেশিন এবং এর কোডবুকগুলো হস্তগত করতে সক্ষম হয়। এই দুঃসাহসিক অভিযান ব্লেচলি পার্কের মিত্রবাহিনীর ক্রিপ্টোগ্রাফারদের জন্য পরম অপরিহার্য প্রমাণিত হয়েছিল যার ফলে তারা জার্মান নৌবাহিনীর গোপন যোগাযোগগুলো আটকে দিতে এবং ডিকোড করতে পেরেছিল।

এই তারিখে ইউরোপীয় ইতিহাস সামরিক বিজয়ের দ্বারাও চিহ্নিত। ৯ মে ১৪২৯ তারিখে কিংবদন্তি ফরাসি বীরাঙ্গনা জোয়ান অফ আর্ক অরলিন্স শহর অবরোধকারী ইংরেজ সৈন্যদের আনুষ্ঠানিকভাবে পরাজিত করে একটি বিশাল বিজয় অর্জন করেন। এই বিজয় শতবর্ষের যুদ্ধে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল যা ফরাসি বাহিনীর মনোবলকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং সপ্তম চার্লসের রাজ্যাভিষেকের পথ সুগম করেছিল।

দক্ষিণ গোলার্ধে অস্ট্রেলিয়া ৯ মে ১৯০১ তারিখে একটি প্রধান রাজনৈতিক মাইলফলক অর্জন করে। উপনিবেশগুলোর সফল ফেডারেশনের পর অস্ট্রেলিয়া গর্বের সাথে মেলবোর্ন শহরে তার একেবারে প্রথম জাতীয় সংসদ উন্মুক্ত করে। এই ঘটনাটি একটি ঐক্যবদ্ধ অস্ট্রেলিয়ান জাতির জন্মকে চিহ্নিত করে যা নিজেদের বিষয়াবলি নিজেরাই পরিচালনা করতে সক্ষম। অন্যদিকে কানাডায় ৯ মে স্মরিত হয় একটি মর্মান্তিক শিল্প বিপর্যয়ের জন্য। ১৯৯২ সালের এই দিনে নোভা স্কটিয়ায় ওয়েস্ট্রে মাইন বিপর্যয় ঘটেছিল। মাটির নিচে একটি বিধ্বংসী মিথেন গ্যাস বিস্ফোরণে ২৬ জন খনি শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয় যা কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়ে কানাডিয়ান শ্রম আইন এবং কর্পোরেট জবাবদিহিতায় গভীর ও যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে বাধ্য করেছিল।

বৃহত্তর বিশ্ব মঞ্চও ৯ মে তারিখে তার নিজস্ব কিছু স্মরণীয় ঘটনার সাক্ষী হয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকায় ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৫০২ সালে স্পেনের ক্যাডিজ থেকে নিউ ওয়ার্ল্ডের উদ্দেশ্যে তার চতুর্থ এবং চূড়ান্ত যাত্রায় রওনা হন এমন একটি অভিযান যা বিশ্ব ইতিহাস এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর গতিপথকে আরও পরিবর্তিত করবে। মধ্যপ্রাচ্যে ১৯৭৯ সালের ৯ মে ইরানের বিপ্লব একটি অন্ধকার মোড় নেয় যখন বিপ্লবী ট্রাইব্যুনাল দ্বারা ইহুদি ব্যবসায়ী এবং সম্প্রদায়ের নেতা হাবিব এলঘানিয়ানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁর এই অন্যায্য মৃত্যু ব্যাপক আতঙ্কের সৃষ্টি করে এবং এর সরাসরি ফলস্বরূপ ইরান থেকে এক সময়ের শক্তিশালী ইহুদি সম্প্রদায়ের বিশাল প্রস্থান ঘটে।

এই দিনে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিবর্গ সাহিত্য রাজনীতি অনুসন্ধান এবং শিল্পকলায় তাদের অসাধারণ অবদানের মাধ্যমে আমাদের বিশ্বকে উল্লেখযোগ্যভাবে রূপ দিয়েছেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে জন্মগ্রহণকারী এমন কয়েকজন যুগান্তকারী মানুষের পরিচিতি নিচে দেওয়া হলো।

৯ মে জন্মগ্রহণকারী বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব

বিশ্বজুড়ে ৯ মে জন্মগ্রহণকারী কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তির বিস্তারিত চিত্র নিচে সারণি আকারে তুলে ধরা হলো।

জন্ম তারিখ নাম জাতীয়তা পেশা এবং কীর্তি
৯ মে ১৫৪০ মহারাণা প্রতাপ ভারতীয় মেওয়ারের কিংবদন্তি রাজপুত রাজা মুঘল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধের জন্য পরিচিত।
৯ মে ১৮০০ জন ব্রাউন আমেরিকান কট্টর দাসপ্রথাবিরোধী হার্পারস ফেরিতে যাঁর সশস্ত্র অভ্যুত্থান আমেরিকান গৃহযুদ্ধের উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছিল।
৯ মে ১৮৬০ জে.এম. ব্যারি স্কটিশ প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার যিনি সর্বজনীন প্রিয় চরিত্র পিটার প্যান তৈরি করেছেন।
৯ মে ১৮৬৬ গোপাল কৃষ্ণ গোখলে ভারতীয় বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা সমাজ সংস্কারক এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল পথপ্রদর্শক।
৯ মে ১৮৭৪ হাওয়ার্ড কার্টার ব্রিটিশ বিশ্ববিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক যিনি মিশরীয় ফারাও তুতেনখামেনের প্রায় অক্ষত সমাধি আবিষ্কার করেছিলেন।
৯ মে ১৯২১ সোফি শল জার্মান সাহসী ছাত্রী এবং নাৎসি বিরোধী কর্মী যিনি হোয়াইট রোজ গ্রুপের সাথে শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধের স্থায়ী প্রতীক হয়ে ওঠেন।
৯ মে ১৯৩৬ অ্যালবার্ট ফিনি ব্রিটিশ প্রশংসিত অভিনেতা থিয়েটার এবং আন্তর্জাতিক সিনেমায় বহুমুখী অভিনয়ের জন্য পরিচিত।
৯ মে ১৯৪৬ ক্যান্ডিস বার্গেন আমেরিকান উদযাপিত অভিনেত্রী এবং লেখিকা মারফি ব্রাউন টেলিভিশন সিরিজে তাঁর প্রধান ভূমিকার জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত।
৯ মে ১৯৪৯ বিলি জোয়েল আমেরিকান আইকনিক সুরকার গায়ক এবং গীতিকার যিনি বিশ্বব্যাপী পিয়ানো ম্যান হিসেবে পরিচিত।
৯ মে ১৯৭৯ রোজারিও ডসন আমেরিকান বিশিষ্ট অভিনেত্রী প্রযোজক এবং রাজনৈতিক কর্মী চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশনে তাঁর বৈচিত্র্যময় ভূমিকার জন্য স্বীকৃত।

ঠিক যেমন এই তারিখটি মহান ব্যক্তিত্বদের আগমন দেখেছে তেমনি এটি বহু উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের বিদায়কেও চিহ্নিত করেছে। এই মহৎ প্রাণ মানুষেরা তাদের কাজের মধ্য দিয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

৯ মে মৃত্যুবরণকারী স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব

নিচের টেবিলে সেইসব স্মরণীয় ব্যক্তিদের তুলে ধরা হলো যাঁদের জীবনাবসান ঘটেছিল ৯ মে তারিখে।

মৃত্যুর তারিখ নাম জাতীয়তা পেশা এবং কীর্তি
৯ মে ১৮০৫ ফ্রিডরিখ শিলার জার্মান প্রখ্যাত কবি দার্শনিক এবং নাট্যকার যাঁর কাজ ইউরোপীয় রোমান্টিসিজমকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল।
৯ মে ১৯৫৯ কর্মবীর ভাওরাও পাটিল ভারতীয় নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী এবং শিক্ষাবিদ যিনি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে রায়ত এডুকেশনাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
৯ মে ১৯৮১ দুর্গাবাই দেশমুখ ভারতীয় সম্মানিত সমাজ সংস্কারক স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং সংসদ সদস্য যিনি নিপীড়িতদের উন্নতির জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন।
৯ মে ১৯৮৬ তেনজিং নোরগে নেপালি ভারতীয় প্রশংসিত শেরপা পর্বতারোহী যিনি এডমন্ড হিলারির সাথে মাউন্ট এভারেস্ট জয়ী প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন।
৯ মে ১৯৯৮ তালাত মাহমুদ ভারতীয় প্রিয় প্লেব্যাক গায়ক যাঁর মখমলী কণ্ঠস্বর ক্লাসিক ভারতীয় সিনেমার একটি যুগের সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছিল।
৯ মে ২০১২ ভিদাল সাসুন ব্রিটিশ আমেরিকান উদ্ভাবনী হেয়ারড্রেসার এবং ব্যবসায়ী যিনি জ্যামিতিক কাটের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সৌন্দর্য শিল্পকে সম্পূর্ণ আধুনিকীকরণ করেছিলেন।
৯ মে ২০১৭ রবার্ট মাইলস সুইস ইতালীয় প্রভাবশালী রেকর্ড প্রযোজক এবং সুরকার যিনি ইলেকট্রনিক সঙ্গীতে ড্রিম ট্রান্স ঘরানার পথপ্রদর্শক ছিলেন।

ঐতিহাসিক টাইমলাইনগুলো প্রায়শই সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক এবং অদ্ভুত কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা লুকিয়ে রাখে যা আলোচনার চমৎকার খোরাক জোগায়। এই ধরনের ঘটনা আমাদের ইতিহাসের চমকপ্রদ দিকগুলো নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।

আপনি কি জানতেন ৯ মে এর চমকপ্রদ কিছু তথ্য

ইতিহাসের অন্যতম দুঃসাহসিক অপরাধটি ঘটেছিল ১৬৭১ সালের ৯ মে। কর্নেল থমাস ব্লাড নামের এক ব্যক্তি দিনের আলোতে লন্ডনের কঠোর নিরাপত্তায় মোড়া টাওয়ার অফ লন্ডন থেকে ব্রিটিশ রাজমুকুট এবং রত্নভাণ্ডার ডাকাতির এক অবিশ্বাস্য চেষ্টা চালান। ব্লাড এবং তার সহযোগীরা ছদ্মবেশ ধারণ করে প্রহরীদের পরাভূত করে এবং অমূল্য রাজমুকুটটি পাচার করার জন্য সেটিকে রীতিমতো চ্যাপ্টা করার চেষ্টা করেছিল। যদিও অমূল্য নিদর্শনগুলো নিয়ে পালানোর সময় তিনি হাতেনাতে ধরা পড়েছিলেন তবুও রাজা দ্বিতীয় চার্লস তার এই চরম ধৃষ্টতা এবং মনোভাবে এতটাই আমোদিত হয়েছিলেন যে তিনি ব্লাডকে পুরোপুরি ক্ষমা করে দেন। রাজা এমনকি এই চোরকে আয়ারল্যান্ডে একটি সম্পত্তি এবং নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন যা রাজকীয় ইতিহাসের অন্যতম অদ্ভুত এক আইনি সমাপ্তি। এটি শুধু একটি অপরাধের গল্প নয় বরং ক্ষমতার অদ্ভুত খামখেয়ালিপনারও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

মহাকাশ অনুসন্ধান এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে ৯ মে অবিশ্বাস্য এক প্রযুক্তিগত প্রথমকে চিহ্নিত করে। আধুনিক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক এবং ফাইবার অপটিক্স স্বাভাবিক হওয়ার অনেক আগে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি এর স্বপ্নদর্শী বিজ্ঞানীরা ১৯৬২ সালের ৯ মে সফলভাবে চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে একটি লেজার রশ্মি বাউন্স করাতে সক্ষম হন। এই যুগান্তকারী পরীক্ষাটি মহাকাশের বিশাল শূন্যতায় দীর্ঘ দূরত্বের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ এবং যোগাযোগের জন্য ফোকাসড আলোর ব্যবহারকে বাস্তবায়িত করেছিল যা আজও মহাকাশ সংস্থাগুলোর দ্বারা ব্যবহৃত উন্নত লেজার রেঞ্জফাইন্ডিং প্রযুক্তির পথ সুগম করে। এই পরীক্ষাটি প্রমাণ করেছিল যে মানুষের মেধা ও প্রযুক্তির কোনো নির্দিষ্ট সীমানা নেই।

অবশেষে এভিয়েশন এবং পরিবহনের বিশ্ব ৯ মে ১৯০৪ তারিখে একটি অসাধারণ গতির অর্জন প্রত্যক্ষ করে। গ্রেট ওয়েস্টার্ন রেলওয়ের বাষ্পীয় লোকোমোটিভ যা সিটি অফ ট্রুরো নামে পরিচিত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম রেলওয়ে ইঞ্জিন হিসেবে ঘণ্টায় ১০০ মাইলেরও বেশি বেগে সফলভাবে ছুটে চলার রেকর্ড গড়ে। যদিও আধুনিক ইতিহাসবিদদের দ্বারা সেই দিনের সঠিক গতির রিডিং নিয়ে বিতর্ক রয়েছে তবুও এই ঘটনাটি স্বয়ং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জন্য একটি বিশাল মনস্তাত্ত্বিক অগ্রগতি হিসেবে দাঁড়িয়েছিল। এটি প্রমাণ করেছিল যে দ্রুত শিল্পায়নের দিকে এগিয়ে চলা বিশ্বের জন্য উচ্চ গতির স্থল ভ্রমণ একটি অর্জনযোগ্য বাস্তবে পরিণত হয়েছে যা পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে দ্রুততর করেছিল।

এই ঐতিহাসিক জ্ঞান আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগের মাধ্যমে আমরা ভবিষ্যতের জন্য আরও ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারি। অতীত ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করে আমরা আমাদের সামনের পথ আরও সুগম করতে পারি।

ইতিহাসের পাতা থেকে প্রাপ্ত ভবিষ্যৎ নির্দেশনা

৯ মে তারিখটি বৈশ্বিক ইতিহাসে এক অনন্য এবং অর্থবহ স্থান দখল করে আছে। এটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা অসাধারণ অর্জন এবং এমন সব প্রভাবশালী ব্যক্তিদের স্মৃতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ যাঁদের অসামান্য অবদান আমাদের এই আধুনিক বিশ্বকে রূপ দিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে এই দিনটি অসংখ্য রাজনৈতিক রূপান্তর বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি সাংস্কৃতিক মাইলফলক ঐতিহাসিক সংঘাত এবং মানুষের প্রেরণাদায়ক সাফল্যের সাক্ষী হয়েছে যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে চলেছে।

এই দিনে আমরা যে বিখ্যাত জন্মদিনগুলো স্মরণ করি তা দূরদর্শী নেতা লেখক শিল্পী বিজ্ঞানী ক্রীড়াবিদ এবং উদ্ভাবকদের উদযাপন করে যাঁদের প্রতিভা এবং একাগ্রতা ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। এই মহান ব্যক্তিত্বরা আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে স্বপ্ন দেখতে হয় এবং কীভাবে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হয়। একই সাথে ৯ মে পালিত মৃত্যুবার্ষিকীগুলো আমাদের সেই সব অসাধারণ মানুষের উত্তরাধিকারকে সম্মান জানানো এবং প্রতিফলিত করার সুযোগ দেয় যাঁদের কাজ ধারণা এবং ত্যাগ আজও বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে। তাঁদের প্রয়াণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী হলেও তার সৎকর্ম চিরস্থায়ী।

সর্বশেষ