৫ নভেম্বর: ইতিহাসের এই দিনে – বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা, জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী

সর্বাধিক আলোচিত

ক্যালেন্ডারের প্রতিটি দিনই মানব সভ্যতার শত শত বছরের হাসি-কান্না, জয়-পরাজয় আর নিরলস প্রচেষ্টার গল্প বুকে ধারণ করে রাখে। তবে কিছু কিছু তারিখ যেন ইতিহাসের এক একটি জাদুকরী চুম্বক, যা দুনিয়া-কাঁপানো সব ঘটনাকে নিজের দিকে টেনে নিয়েছে। ৫ই নভেম্বর নিঃসন্দেহে তেমনই একটি অসাধারণ দিন। ষোড়শ শতাব্দীর ভারতের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শুরু করে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিচের অন্ধকার সুড়ঙ্গ, কিংবা আধুনিক সিলিকন ভ্যালির কর্পোরেট বোর্ডরুম—কোথায় নেই এই দিনটির পদচারণা? রাজনৈতিক বিপ্লব, নাগরিক অধিকারের লড়াই এবং প্রযুক্তিগত যুগান্তরের এক অনন্য সাক্ষী এই ৫ই নভেম্বর।

চলুন, এক বিস্তৃত এবং গভীর যাত্রায় বিশ্বের এপার-ওপার ঘুরে দেখি আজ ৫ই নভেম্বরে ঠিক কী কী ঘটেছিল। আমরা নজর দেব আমাদের চিরচেনা বাঙালি পরিমণ্ডল ও ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে, জানব আন্তর্জাতিক দিবসগুলো সম্পর্কে, ডুব দেব গ্লোবাল বিজনেস ও প্রযুক্তির দুনিয়ায়, আর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করব সেইসব কালজয়ী মানুষদের, যারা এই দিনে পৃথিবীতে এসেছিলেন অথবা চিরবিদায় নিয়েছিলেন।

আমাদের উপমহাদেশ ও বাঙালি পরিমণ্ডল

ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং জটিল। এখানে যেমন বহু সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন ঘটেছে, তেমনি দেখা গেছে অসাধারণ সব সাংস্কৃতিক রেনেসাঁ এবং আধুনিক প্রযুক্তির বিস্ময়কর উল্লম্ফন। মধ্যযুগের যুদ্ধবিগ্রহ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI)—৫ই নভেম্বর এই অঞ্চলের জন্য অবিশ্বাস্য রকমের তাৎপর্যপূর্ণ।

  • ১৫৫৬ সাল – পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ: এই দিনটিতে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র চিরতরে বদলে যায়। সদ্য দিল্লি জয় করা হিন্দু সম্রাট হিমু (হেমচন্দ্র বিক্রমাদিত্য)-এর বিশাল বাহিনীর সাথে এক ভয়াবহ সংঘর্ষ বাধে মোগল সেনাপতি বৈরাম খানের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর। যুদ্ধের চরম উত্তেজনার মুহূর্তে হিমুর চোখে একটি তীর বিদ্ধ হয়। সেনাপতির এই পতনে মুহূর্তের মধ্যে হিমুর বিশাল বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এই চূড়ান্ত বিজয়ের মাধ্যমেই তরুণ সম্রাট আকবরের সিংহাসন সুসংহত হয়। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ? কারণ, আকবরের এই শাসনকালই মোগল সাম্রাজ্যকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়, যা পরবর্তীতে সুবে বাংলাকে (আজকের বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ) মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে। বাংলার কৃষি প্রশাসন, বাণিজ্য নেটওয়ার্ক এবং বহু সংস্কৃতির যে মিশ্র রূপ আমরা আজ দেখি, তার বীজ বোনা হয়েছিল সেই মোগল আমলেই।

  • ১৮৭০ সাল – দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের জন্ম: আজকের এই দিনে কোলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, কিংবদন্তি আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ চিত্তরঞ্জন দাশ, যাকে মানুষ ভালোবেসে ডাকত ‘দেশবন্ধু’ (জাতির বন্ধু) নামে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে তিনি ছিলেন এক হিমালয়সম ব্যক্তিত্ব। বাংলায় ‘স্বরাজ পার্টি’ প্রতিষ্ঠা এবং নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর রাজনৈতিক গুরু হিসেবে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর আইনি প্রজ্ঞার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে যখন আলিপুর বোমা মামলায় তিনি শ্রী অরবিন্দ ঘোষকে বিনা পারিশ্রমিকে লড়াই করে মুক্ত করে আনেন। নিজের বিলাসবহুল জীবন ও বিপুল অর্থকড়ি দেশের জন্য বিলিয়ে দেওয়ার এমন নজির ইতিহাসে বিরল।

  • ২০১১ সাল – ড. ভূপেন হাজারিকার মহাপ্রয়াণ: এই দিনে উপমহাদেশ হারায় তার এক সুরের জাদুকরকে। আসামের সন্তান ড. ভূপেন হাজারিকা ছিলেন একাধারে গায়ক, সুরকার, গীতিকার এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা। তাঁর ব্যারিটোন কণ্ঠ আর গভীর মানবতাবাদী বাংলা ও অসমীয়া গানগুলো (“মানুষ মানুষের জন্যে”, “গঙ্গা আমার মা”) উত্তর-পূর্ব ভারতের লোকসংগীতকে মূলধারায় নিয়ে আসে। শিল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধন রচনার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে মরণোত্তর ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’ প্রদান করা হয়।

  • ২০২৬ সাল – বাংলাদেশ এআই (AI) বিজনেস সামিট: ইতিহাসের পাতা থেকে একেবারে আজকের দিনে ফিরে এলে আমরা দেখতে পাই, আজকের ৫ই নভেম্বর, ২০২৬ তারিখে পর্দা উঠছে “বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট”-এর। প্রযুক্তি এবং ব্যবসার এই বিশাল মিলনমেলার মূল ফোকাস হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিপ্লব, একাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রির মেলবন্ধন এবং আধুনিক কর্মক্ষেত্রে এআই এজেন্টদের ভূমিকা। দেশি-বিদেশি স্টার্টআপগুলোর ১৪২টিরও বেশি স্টল নিয়ে আয়োজিত এই সামিট প্রমাণ করে দিচ্ছে, প্রযুক্তি এবং স্টেম (STEM) সেক্টরে বাংলাদেশ কতটা আগ্রাসীভাবে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক দিবস ও উদযাপন

আন্তর্জাতিক দিবস ও বৈশ্বিক উদযাপন

বিশ্বজুড়ে ৫ই নভেম্বর বিভিন্ন সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন এবং ঐতিহাসিক জাতীয় উদযাপনের মাধ্যমে পালিত হয়, যা সম্প্রদায়গুলোকে একত্রিত করে।

  • বিশ্ব সুনামি সচেতনতা দিবস (জাতিসংঘ): জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দিবসটির লক্ষ্য হলো সুনামির ধ্বংসাত্মক প্রভাব সম্পর্কে বিশ্বজুড়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। ২০০৪ সালের ভারত মহাসাগরের ভয়াল সুনামির কথা আমাদের এখনো শিউরে তোলে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে এবং টেকটোনিক প্লেটগুলোর ক্রমাগত স্থানান্তরের কারণে, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের প্রস্তুতি, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের আধুনিক কৌশলগুলোর ওপর জোর দিতেই এই দিবসটি পালন করা হয়।

  • গাই ফকস নাইট বা বনফায়ার নাইট (যুক্তরাজ্য): “Remember, remember, the fifth of November.” (স্মরণ রেখো, স্মরণ রেখো, নভেম্বরের পাঁচ তারিখ)। বিখ্যাত এই ছড়াটি ১৬০৫ সালের ৫ই নভেম্বরের এক রোমহর্ষক ঘটনাকে মনে করিয়ে দেয়। সেদিন কয়েকজন ইংলিশ ক্যাথলিক ষড়যন্ত্রকারী হাউস অফ লর্ডস (ব্রিটিশ পার্লামেন্ট) উড়িয়ে দেওয়ার এবং প্রোটেস্ট্যান্ট রাজা প্রথম জেমসকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু মাটির নিচের সেলার বা সুড়ঙ্গে বিস্ফোরক পাহারা দেওয়া অবস্থায় গাই ফকস ধরা পড়ে যাওয়ায় সেই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়। রাজতন্ত্রের সেই বেঁচে যাওয়ার ঘটনাকে স্মরণ করে আজও প্রতি বছর যুক্তরাজ্যে বিশাল অগ্নিকুণ্ড (বনফায়ার) জ্বালিয়ে এবং চোখ ধাঁধানো আতশবাজির মাধ্যমে দিনটি উদযাপিত হয়, যা গত চার শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এক দারুণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।

বিশ্ব ইতিহাস: রাজনীতি ও নাগরিক অধিকার

উপমহাদেশের বাইরেও বৈশ্বিক রাজনীতি, নাগরিক অধিকার এবং বাণিজ্যিক উদ্যোগে এই দিনটির প্রভাব সুদূরপ্রসারী।

  • ১৮৬২ সাল – ডাকোটা ইন্ডিয়ানদের বিচার ও আমেরিকার গৃহযুদ্ধ: আমেরিকার ইতিহাসের একটি অন্ধকার অধ্যায় রচিত হয়েছিল এই দিনে। মিনেসোটায় যুক্তরাষ্ট্র-ডাকোটা যুদ্ধের পর ৩০০ জনেরও বেশি ডাকোটা আদিবাসী যোদ্ধাকে এই দিনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন পরবর্তীতে বেশিরভাগের শাস্তি মওকুফ করলেও, ৩৮ জনকে শেষ পর্যন্ত ফাঁসি দেওয়া হয়, যা আজও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণ-মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনা। কাকতালীয়ভাবে একই দিনে, প্রেসিডেন্ট লিংকন কনফেডারেট বাহিনীর বিরুদ্ধে অতি-সতর্কতা অবলম্বনের দায়ে জেনারেল জর্জ বি. ম্যাকক্লেলানকে দ্য আর্মি অফ দি পোটোম্যাকের কমান্ড থেকে সরিয়ে দেন।

  • ১৮৭২ সাল – সুসান বি. অ্যান্টনির দুঃসাহসিক ভোটদান: যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের সাংবিধানিক ভোটাধিকার পাওয়ার অনেক আগে, নাগরিক অধিকার কর্মী সুসান বি. অ্যান্টনি অত্যন্ত সাহসের সাথে একটি ভোটকেন্দ্রে ঢুকে পড়েন এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বেআইনিভাবে নিজের ভোটটি প্রদান করেন। এই ঘটনার পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তিনি জরিমানার অর্থ প্রদানেও অস্বীকৃতি জানান। তাঁর এই সাহসী প্রতিবাদ নারী ভোটাধিকার আন্দোলনকে জাতীয় মনোযোগের কেন্দ্রে নিয়ে আসে এবং প্রায় পাঁচ দশক পর ১৯তম সংশোধনীর মাধ্যমে নারীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার পথ প্রশস্ত করে।

  • ১৯৪০ সাল – ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের তৃতীয় মেয়াদে জয়: জর্জ ওয়াশিংটনের তৈরি করা দুই মেয়াদের অলিখিত নিয়ম ভেঙে ইতিহাস গড়েন ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট (FDR)। ১৯৪০ সালের ৫ই নভেম্বর তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভূতপূর্ব তৃতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হন। একদিকে মহামন্দা (Great Depression) থেকে দেশকে টেনে তোলা, অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালের ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মধ্যে রুজভেল্টের এই বিজয় আধুনিক মার্কিন রাজনৈতিক ইতিহাসের মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

প্রযুক্তি, ব্যবসা এবং শিল্পের মাইলফলক

‘এডিটোরিয়ালজি’-র পাঠকদের কাছে ৫ই নভেম্বরের ব্যবসা ও প্রযুক্তির ইতিহাস বিশেষভাবে আকর্ষণীয় মনে হবে।

  • ১৭৩৩ সাল – স্বাধীন গণমাধ্যমের লড়াই: প্রিন্টার ও সাংবাদিক জন পিটার জেঙ্গার এদিন ‘নিউ ইয়র্ক উইকলি জার্নাল’-এর প্রথম সংখ্যা প্রকাশ করেন। ঔপনিবেশিক গভর্নরের তীব্র সমালোচনা করার কারণে তাকে মানহানির মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। তবে পরবর্তীতে তার বেকসুর খালাস পাওয়ার ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য এক যুগান্তকারী বিজয় হিসেবে বিবেচিত হয়, যা আমেরিকা মহাদেশে মিডিয়া ব্যবসার স্বাধীনতার ভিত গড়ে দেয়।

  • ১৮৯৫ সাল – প্রথম অটোমোবাইল পেটেন্ট: উদ্ভাবনের জগত এক বিশাল লাফ দেয় যখন জর্জ বি. সেলডেন অটোমোবাইল বা মোটরগাড়ির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পেটেন্ট লাভ করেন। এই মেধা-স্বত্ব বা ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টির মাইলফলকটি আমেরিকান অটোমোটিভ ইন্ডাস্ট্রির যাত্রা শুরু করে দেয়, যা পরবর্তীতে হেনরি ফোর্ডের মতো দূরদর্শী মানুষদের হাতে পড়ে মাস-প্রোডাকশন বা গণ-উৎপাদন বিপ্লবের জন্ম দেয়।

  • ১৯৩৫ সাল – বাজারে এল ‘মনোপলি’ গেম: গ্রেট ডিপ্রেশন বা মহামন্দার চরম দুঃসময়ের মধ্যেই পার্কার ব্রাদার্স কোম্পানি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে তাদের বিশ্বখ্যাত বোর্ড গেম “মনোপলি” (Monopoly)। রিয়েল এস্টেট আর পুঁজিবাদের ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই গেমটি রাতারাতি অভাবনীয় বাণিজ্যিক সাফল্য লাভ করে এবং টেবিলটপ বিনোদনের ব্যবসাকে চিরতরে বদলে দেয়।

  • ২০০৭ সাল – গুগলের অ্যান্ড্রয়েড (Android) উন্মোচন: একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত ঘোষণাটি আসে ২০০৭ সালের ৫ই নভেম্বর। গুগল লিনাক্স-ভিত্তিক একটি ওপেন-সোর্স মোবাইল অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে অ্যান্ড্রয়েড প্ল্যাটফর্ম উন্মোচন করে। লক্ষ্য ছিল তখনকার দিনের প্রতিষ্ঠিত মোবাইল জায়ান্টদের চ্যালেঞ্জ করা। ঠিক একই বছর অ্যাপলের প্রথম আইফোন বাজারে এলেও, অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন প্রযুক্তিকে সবার জন্য উন্মুক্ত (democratize) করে দেয়। এর ফলে যেকোনো মোবাইল নির্মাতা কোম্পানি তাদের নিজস্ব ডিভাইসে এটি ব্যবহারের সুযোগ পায়। বর্তমানে অ্যান্ড্রয়েড হলো বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও আধিপত্যশীল অপারেটিং সিস্টেম, যা কোটি কোটি ডিভাইসকে সচল রেখেছে এবং অসংখ্য প্রযুক্তি স্টার্টআপের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে।

মহাকাশ ও বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ

  • ২০০৭ সাল – চাঁদের পানে চীনের বিশাল লাফ: ঠিক যেই দিনে গুগল অ্যান্ড্রয়েড উন্মোচন করেছিল, সেই একই দিনে চীন মহাকাশ গবেষণায় এক বিশাল মাইলফলক অর্জন করে। চীনের প্রথম লুনার স্যাটেলাইট বা চন্দ্রযান ‘চ্যাং’ই ১’ (Chang’e 1) সফলভাবে চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ করে। এর মাধ্যমে একটি অপ্রতিরোধ্য মহাকাশ পরাশক্তি হিসেবে চীনের দ্রুত উত্থানের আনুষ্ঠানিক বার্তা গোটা বিশ্বের কাছে পৌঁছে যায়।

বিখ্যাত জন্ম ও মৃত্যু

ইতিহাস মূলত তৈরি হয় অসাধারণ সব মানুষদের হাত ধরে। ৫ই নভেম্বর এমন অনেক প্রতিভাবান উদ্ভাবকের জন্ম এবং অনেক স্বপ্নদ্রষ্টার বিদায়বেলা দেখেছে।

৫ই নভেম্বরের বিখ্যাত জন্মদিনগুলো:

  • আলফোনস দেজারদাঁ (জন্ম ১৮৫৪): একজন অগ্রণী কানাডিয়ান সাংবাদিক এবং ব্যবসায়ী, যিনি দেজারদাঁ গ্রুপের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। উত্তর আমেরিকায় ক্রেডিট ইউনিয়ন বা সমবায় ঋণদান ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় তিনি বড় ভূমিকা রেখেছিলেন, যা শ্রমজীবী মানুষের জন্য আধুনিক কনজ্যুমার ব্যাংকিং এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ধারণাকে বদলে দিয়েছিল। (আমাদের দেশের গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ মডেলের সাথে এর বেশ মিল পাওয়া যায়)।

  • ইউজিন ভি. ডেবস (জন্ম ১৮৫৫): এক অক্লান্ত আমেরিকান শ্রমিক নেতা, রাজনীতিবিদ এবং ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’ (IWW)-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। শ্রমিক অধিকারের পক্ষে তাঁর আজীবন সংগ্রামের প্রভাব আজকের আধুনিক হিউম্যান রিসোর্স (HR) নীতি এবং শ্রম আইনে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।

  • ক্রিস জেনার (জন্ম ১৯৫৫): একজন আমেরিকান ট্যালেন্ট ম্যানেজার এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী নারী ব্যবসায়ী। আপনি তাঁকে পছন্দ করুন বা না-ই করুন, নিজের পরিবারের রিয়েলিটি টেলিভিশন সাম্রাজ্যকে সুকৌশলে পরিচালনা করে আধুনিক বিনোদন ব্যবসা, ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং এবং ডিজিটাল ব্র্যান্ডিংয়ের সংজ্ঞাই পাল্টে দিয়েছেন জেনার।

  • ব্রায়ান অ্যাডামস (জন্ম ১৯৫৯): বিশ্বখ্যাত কানাডিয়ান রক গায়ক, গীতিকার এবং গিটারিস্ট। “Summer of ’69” বা “(Everything I Do) I Do It for You”-এর মতো কালজয়ী সব হিট গান উপহার দিয়ে অ্যাডামস মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে এক চিরস্থায়ী আসনে বসে আছেন।

  • বিরাট কোহলি (জন্ম ১৯৮৮): ভারতের নয়া দিল্লিতে জন্মগ্রহণ করা কোহলি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় এবং পরিসংখ্যানের দিক থেকে অন্যতম সফল ক্রিকেটার। শুধু মাঠের ক্রিকেটেই নয়, খেলার বাইরেও তিনি নিজেকে একটি বিশাল বৈশ্বিক বিজনেস ব্র্যান্ড এবং ডিজিটাল আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

৫ই নভেম্বরের বিখ্যাত মৃত্যুগুলো:

  • জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল (মৃত্যু ১৮৭৯): প্রতিভাবান স্কটিশ পদার্থবিদ, যাঁর ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশনের (তড়িৎচৌম্বকীয় বিকিরণ) যুগান্তকারী তত্ত্ব প্রথমবারের মতো বিদ্যুৎ, চুম্বকত্ব এবং আলোকে একই সূত্রে গেঁথেছিল। আধুনিক কোয়ান্টাম ফিজিক্স, রেডিও, টেলিভিশন এবং যে ওয়্যারলেস ইন্টারনেট (Wi-Fi) ব্যবহার করে আপনি এই লেখাটি পড়ছেন—তার তাত্ত্বিক ভিত্তি তিনিই গড়ে দিয়ে গিয়েছিলেন।

  • জর্জ এম. কোহান (মৃত্যু ১৯৪২): কিংবদন্তি আমেরিকান বিনোদনকর্মী, নাট্যকার, সুরকার এবং থিয়েটার প্রযোজক। তিন ডজনেরও বেশি ব্রডওয়ে মিউজিক্যালের সাথে জড়িত থাকার কারণে তাঁকে আমেরিকান মিউজিক্যাল কমেডির জনক বলা হয়।

  • জ্যাক তাতি (মৃত্যু ১৯৮২): একজন প্রখ্যাত ফরাসি মাইম শিল্পী, চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনেতা এবং চিত্রনাট্যকার। আধুনিক ভোগবাদ ও প্রযুক্তির প্রতি অন্ধ আসক্তিকে তীব্র অথচ হাস্যাত্মকভাবে ব্যঙ্গ করে বানানো তার ফিচার ফিল্মগুলোর জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।

  • চার্লি ট্রটার (মৃত্যু ২০১৩): একজন প্রখ্যাত আমেরিকান শেফ এবং রেস্তোরাঁ মালিক। তার উদ্ভাবনী রন্ধনশৈলী তার শিকাগোর রেস্তোরাঁটিকে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রে ‘ফাইন-ডাইনিং’ বা অভিজাত ডাইনিং বিজনেস মডেলকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পেছনে তিনি ছিলেন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

  • মারিলিয়া মেন্ডোনসা (মৃত্যু ২০২১): ল্যাটিন গ্র্যামি-জয়ী গায়িকা এবং ব্রাজিলের ‘সার্তানেজো’ কান্ট্রি মিউজিক জগতের অন্যতম প্রাণপ্রিয় মুখ। মাত্র ২৬ বছর বয়সে এক মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর অকাল মৃত্যু গ্লোবাল মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে গভীর শোকের ছায়া নামিয়ে এনেছিল।

“জানেন কি?” – দারুণ কিছু ট্রিভিয়া বা অজানা তথ্য

খাওয়ার টেবিলে কিংবা আড্ডায় গল্প জমানোর জন্য ৫ই নভেম্বরের সাথে সম্পর্কিত চমৎকার কিছু তথ্য জেনে নিতে পারেন:

১. সেই অপরিশোধিত জরিমানার টাকা: ১৮৭২ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বেআইনিভাবে ভোট দেওয়ার অপরাধে সুসান বি. অ্যান্টনি যখন গ্রেপ্তার হন, তখন বিচারক তাকে ১০০ ডলার জরিমানা করেন। নিজের নীতির প্রতি অবিচল থেকে তিনি ভরা আদালতে সরাসরি বলে দিয়েছিলেন, “আমি আপনাদের এই অন্যায় জরিমানার এক ডলারও দেব না।” এবং তিনি নিজের কথা রেখেছিলেন—মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সেই জরিমানার অর্থ কখনোই পরিশোধ করেননি।

২. আইনস্টাইনের রেফ্রিজারেটর: অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের নাম শুনলেই আমাদের থিওরি অফ রিলেটিভিটি বা আপেক্ষিকতার তত্ত্বের কথা মনে পড়ে। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, ১৯৩০ সালের ৫ই নভেম্বর আইনস্টাইন এবং তার সাবেক ছাত্র লিও জিলার্দ একটি পরিবেশবান্ধব আবিষ্কারের জন্য ইউএস পেটেন্ট (নম্বর ১৭৮১৫৪১) লাভ করেছিলেন। সেটি ছিল একটি “আইনস্টাইন রেফ্রিজারেটর” বা ফ্রিজ! এটি এমন একটি অ্যাবজরপশন রেফ্রিজারেটর ছিল যার ভেতরে কোনো নড়াচড়া করা পার্টস (moving parts) ছিল না, আর এটি চালাতে শুধু একটু তাপের প্রয়োজন হতো। আজকের গ্রিন-টেকের ধারণার চেয়েও যেন তারা বহু বছর এগিয়ে ছিলেন!

৩. “ডিবাগিং” (Debugging) শব্দের জন্মকথা: যদিও এই নির্দিষ্ট ঘটনাটি ৫ই নভেম্বর ঘটেনি, তবে প্রযুক্তির ইতিহাসের সাথে এই মাসটি দারুণভাবে জড়িয়ে আছে। কম্পিউটারে সমস্যা হলে আমরা যে “বাগ” (Bug) বা সমস্যা সমাধানের জন্য “ডিবাগ” শব্দটি ব্যবহার করি, তার উৎপত্তি বেশ মজার। পুরোনো আমলের একটি বিশাল ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল কম্পিউটারের রিলে বা যন্ত্রাংশের ভেতর আক্ষরিক অর্থেই একটি সত্যিকারের মথ বা পোকা (Bug) ঢুকে গিয়ে মেশিনটিকে বিকল করে দিয়েছিল। তখন অপারেটরদের সেই মরা পোকাটিকে হাত দিয়ে টেনে বের করে মেশিনটি সচল করতে হয়েছিল, আর সেখান থেকেই “ডিবাগ” শব্দটির জন্ম!

শেষ কথা

পানিপথের প্রান্তরে সাম্রাজ্যের পটপরিবর্তন থেকে শুরু করে অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম উন্মোচনের মাধ্যমে সূচনা হওয়া ডিজিটাল বিপ্লব—৫ই নভেম্বর দিনটি মানবজাতির অগ্রগতি, টিকে থাকার সংগ্রাম এবং অসীম সৃজনশীলতার এক জীবন্ত প্রমাণ।

এই দিনের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে আমরা বুঝতে পারি যে, ইতিহাস কেবল ধুলোপড়া তারিখের সমষ্টি নয়। এটি বরং ব্যবসায়িক উদ্ভাবন, রাজনৈতিক অধিকারের লড়াই আর প্রতিভাবান মানুষদের অসম্ভবকে সম্ভব করার নিরন্তর প্রচেষ্টার এক অবিচ্ছিন্ন ক্যানভাস।

মৌলিক নাগরিক অধিকারের জন্য লড়াই হোক, নতুন কোনো প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের উদ্বোধন হোক, কিংবা ভূপেন হাজারিকার মতো কিংবদন্তিদের কালজয়ী সুর হোক—৫ই নভেম্বরে জন্ম নেওয়া বা গড়ে ওঠা এই লিগ্যাসিগুলো আজও আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে চলেছে। আজ যখন আমরা “বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট”-এর মতো আধুনিক মাইলফলকগুলো দেখছি, তখন মূলত আমরা আমাদের চোখের সামনেই আগামী দিনের ইতিহাস রচিত হতে দেখছি। অতীতের এই গল্পগুলোর চর্চা আমাদের চালিয়ে যেতেই হবে, কারণ ভবিষ্যতের অজানা পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য অতীতের এই শিক্ষাগুলোই হলো আমাদের সবচেয়ে নিখুঁত দিকনির্দেশক বা কম্পাস।

সর্বশেষ