আজকাল আমাদের পড়াশোনার পুরো ধরনটাই বদলে গেছে। ক্লাসরুমের সেই চেনা ব্ল্যাকবোর্ডটা এখন ছোট একটা মোবাইল বা ল্যাপটপের স্ক্রিনে এসে ঠেকেছে। সত্যি বলতে, ঘরে বসে ক্লাস করার যেমন সুবিধা আছে, তেমনি আছে রাজ্যের ঝুটঝামেলা। বিছানায় বসে ক্লাস করতে গেলেই ঘুম চলে আসে, একটু পর পরই ফেসবুক-ইউটিউবের নোটিফিকেশন মনটা টেনে নিয়ে যায় অন্যদিকে। মায়ের হাতের রান্নার গন্ধ কিংবা পাশের ঘরের টিভির আওয়াজ তো আছেই!
অধিকাংশ শিক্ষার্থীরই এখন একটাই কমপ্লেন—”ভাইয়া, ক্লাস শুরু করার ১০ মিনিট পরেই আর মাথায় কিছু ঢোকে না।” এই সমস্যা কিন্তু শুধু আপনার একার নয়। তবে মাথা খাটিয়ে চললে এই যন্ত্রণার সহজ সমাধান সম্ভব। চলুন আজকে একদম খোলামেলা আলোচনা করি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে দীর্ঘ ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখার কার্যকরী উপায় নিয়ে, যা আপনার পড়ার টেবিলকে সত্যিকারের ক্লাসরুম বানিয়ে দেবে।
১. পড়ার জন্য একদম আলাদা একটা কোণ বেছে নিন
অনলাইন ক্লাসের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, যেখানে ইচ্ছা সেখানে বসেই ক্লাস করা যায়। কিন্তু এই সুবিধাই আসলে আমাদের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা করে। বিছানায় শুয়ে-বসে বা সোফায় আরাম করে ক্লাস করতে গেলে শরীর অলস হবেই। তাই পড়ার জন্য ঘরের একটা নির্দিষ্ট জায়গা ঠিক করে ফেলা খুব দরকার।
পড়ার টেবিলটা একটু সাফ রাখুন
আপনার পড়ার টেবিলে যেন কোনো জটলা না থাকে। খাতা, কলম, প্রয়োজনীয় বই আর একটা পানির বোতল—ব্যস, টেবিলে এর বাইরে কিচ্ছু রাখবেন না। চোখের সামনে উল্টোপাল্টা জিনিস থাকলে মন এমনিতেই ওদিকে চলে যাবে।
আলোর দিকে নজর দিন
যেখানে বসছেন, সেখানে যেন পর্যাপ্ত আলো-বাতাস থাকে। অন্ধকার বা টিমটিমে আলোতে ক্লাস করলে চোখে জলদি ক্লান্তি চলে আসে, মাথা ঝিমঝিম করে। সম্ভব হলে দিনের বেলা জানালার কাছের টেবিলটা ব্যবহার করুন।
চেয়ার-টেবিলের কমফোর্ট
সোজা হয়ে বসাটা খুব জরুরি। কুঁজো হয়ে বসলে একটু পরেই পিঠে ব্যথা শুরু হবে এবং আপনার মন ক্লাস থেকে উঠে যাবে। পায়ের নিচে একটা ছোট পিঁড়ি বা টুল দিতে পারেন, এতে বসতে আরাম পাবেন।
গ্যাজেট রাখার সঠিক দূরত্ব
ল্যাপটপ বা মনিটরটি আপনার চোখ থেকে অন্তত ২০ থেকে ২৬ ইঞ্চি দূরে রাখুন। স্ক্রিনের ওপরের অংশ যেন আপনার চোখের লেভেলে বা সামান্য নিচে থাকে। এতে ঘাড় বাঁকাতে হয় না এবং দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকা যায়।
| বিষয়ের নাম | কী করবেন? | আসল লাভ |
| বসার জায়গা | বিছানা ছেড়ে সোজা পড়ার টেবিলে বসুন | অলসতা দূর হয়, ঘুম আসে না |
| পরিবেশ | ঘরের শান্ত আর নিরিবিলি কোণ বেছে নিন | বাইরের চিল্লামিলিতে মন নষ্ট হয় না |
| আলো-বাতাস | জানালার পাশে বা পর্যাপ্ত আলোতে বসুন | চোখ ভালো থাকে, এনার্জি পাওয়া যায় |
২. গ্যাজেট আর ইন্টারনেট আগে থেকেই রেডি রাখুন
ক্লাস শুরু হওয়ার ঠিক দুই মিনিট আগে ল্যাপটপ অন করা বা জুম অ্যাপ খোঁজা একটা মহা ভুল কাজ। দেখা গেল ক্লাস শুরু হয়ে গেছে, অথচ আপনার হেডফোন কানেক্ট হচ্ছে না কিংবা নেটওয়ার্ক স্লো দেখাচ্ছে। এই শেষ মুহূর্তের দৌড়াদৌড়িতে মুডটাই নষ্ট হয়ে যায়।
১০ মিনিট আগেই লগইন করুন
ক্লাস শুরুর অন্তত ১০ মিনিট আগে ডিভাইস অন করে বসুন। দরকারি অ্যাপ বা সফটওয়্যার আপডেট করা আছে কি না, একটু দেখে নিন। রাউটারটা ঠিকঠাক কাজ করছে কি না, তাও একবার চেক করে নেওয়া ভালো।
ভালো একটা হেডফোন জুটিয়ে নিন
মোবাইল বা ল্যাপটপের স্পিকারে ক্লাস না শুনে একটা ভালো ইয়ারফোন বা হেডফোন ব্যবহার করুন। এতে বাইরের হাবিজাবি আওয়াজ কানে আসবে না। শিক্ষকের গলার আওয়াজ পরিষ্কার শুনলে পড়া বুঝতেও সুবিধা হয়।
নেটের একটা ব্যাকআপ রাখুন
ওয়াইফাই কখন চলে যাবে তার কোনো গ্যারান্টি নেই। তাই মোবাইলে সবসময় কিছুটা ডেটা বা একটা হটস্পট ব্যাকআপ রেডি রাখুন। নেট চলে গেলেই যেন এক ক্লিকে আবার ক্লাসে ঢুকে পড়া যায়।
চার্জিং ক্যাবল হাতের কাছে রাখা
ক্লাসের মাঝখানে লো-ব্যাটারির ওয়ার্নিং দেখালে আমরা হুড়োহুড়ি শুরু করি। তাই ক্লাস শুরুর আগেই চার্জারটি বোর্ডের সাথে প্লাগ-ইন করে রাখুন। এতে ডিভাইস বন্ধ হয়ে ক্লাস মিস হওয়ার ঝুঁকি একদম থাকে না।
| ডিভাইসের যত্ন | কী করতে হবে? | কেন করবেন? |
| ইন্টারনেট ব্যাকআপ | মোবাইলে ডেটা প্যাক সচল রাখা | ওয়াইফাই চলে গেলেও ক্লাস মিস হবে না |
| অডিও গিয়ার | ভালো মানের ইয়ারফোন ব্যবহার | শিক্ষকের কথা স্পষ্ট শোনা যায় |
| চার্জের অবস্থা | ল্যাপটপ-মোবাইল ফুল চার্জ রাখা | ক্লাসের মাঝপথে বন্ধ হওয়ার ভয় থাকে না |
৩. দীর্ঘ অনলাইন ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখার কার্যকরী উপায়: পোমোডোরো টেকনিক
একটানা এক-দেড় ঘণ্টা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে যে কারও মগজ জ্যাম হয়ে যাবে। বিজ্ঞানীরা বলেন, আমাদের মন একটানা সর্বোচ্চ ২৫ থেকে ৩০ মিনিট একটা জিনিসে পুরোপুরি আটকে থাকতে পারে। এরপর ব্রেনকে একটু জিরিয়ে নিতে দিতে হয়। আর এখানেই ম্যাজিকের মতো কাজ করে পোমোডোরো টেকনিক।
এই টেকনিকটা আসলে কী?
খুব সহজ হিসাব। আপনি ২৫ মিনিট ঘড়ি ধরে একদম মন দিয়ে ক্লাস করবেন বা পড়বেন। এরপর মাত্র ৫ মিনিটের একটা ছোট ব্রেক নেবেন। এভাবে পরপর ৪ বার করার পর একটা লম্বা ব্রেক (১৫-২০ মিনিট) নেবেন। এই নিয়মে পড়লে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ার পরও ক্লান্তি ছুঁতে পারবে না।
৫ মিনিটের ব্রেকে কী করবেন?
এই ছোট ব্রেকে ভুলেও আবার মোবাইল হাতে নিয়ে ফেসবুক স্ক্রোল করতে বসবেন না। বরং একটু সিট ছেড়ে উঠুন, চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দিন বা এক গ্লাস পানি খেয়ে নিন। এতে ব্রেন আবার নতুন করে কাজ করার বুস্ট পাবে।
বুক ভরে শ্বাস নিন
ব্রেকের সময় চোখ বন্ধ করে কয়েকবার জোরে জোরে শ্বাস নিন আর ছাড়ুন। এটা করলে মগজে অক্সিজেনের চলাচল বাড়ে। নিমিষেই আপনার শরীরের অলসতা কেটে যাবে।
ব্রেনকে রিফ্রেশ করতে একটু হাঁটাচলা
৫ মিনিটের ব্রেকে ঘরের মধ্যেই একটু পায়চারি করুন বা হাত-পা টানটান (স্ট্রেচিং) করে নিন। একটানা বসে থাকলে শরীরের পেশিগুলো শক্ত হয়ে যায়, একটু নড়াচড়া করলে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হয় এবং অলসতা দূর হয়।
| ধাপ | সময় | আসল কাজ |
| ফোকাস সেশন | ২৫ মিনিট | দুনিয়াদারী ভুলে শুধু ক্লাস করা ও নোট নেওয়া |
| ছোট ব্রেক | ৫ মিনিট | সিট ছেড়ে উঠে চোখকে আরাম দেওয়া |
| লম্বা ব্রেক | ২০ মিনিট | ৪টি সেশন শেষে হালকা একটু হেঁটে আসা বা নাস্তা করা |
৪. অনলাইনের দুনিয়াবী আকর্ষণ থেকে দূরে থাকুন
অনলাইন ক্লাসের সবচেয়ে বড় বাঁশ হলো সোশ্যাল মিডিয়ার নোটিফিকেশন। ক্লাস করছেন, এমন সময় স্ক্রিনের ওপর টুং করে একটা মেসেঞ্জারের পপ-আপ ভেসে উঠল। আমরা ভাবি—”আরে জাস্ট এক সেকেন্ড দেখে নিই।” ব্যস! ওই এক সেকেন্ড কখন যে আধঘণ্টা কেড়ে নেয়, আমরা টেরই পাই না।
নোটিফিকেশন একদম অফ
ক্লাস চালু করার আগেই ফোনের সব সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ করে দিন। সবচেয়ে ভালো হয় ফোনটা সাইলেন্ট বা ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ মোডে রেখে একটু দূরে সরিয়ে রাখলে।
বাড়তি ট্যাব সব কেটে দিন
ল্যাপটপে ক্লাস করার সময় ব্যাকগ্রাউন্ডে ইউটিউব, ফেসবুক বা কোনো গেমসের ট্যাব খুলে রাখবেন না। চোখের সামনে ওগুলো থাকলে বারবার হাত নিশপিশ করবেই। শুধু ক্লাসের উইন্ডোটা ওপেন রাখুন।
অ্যাপ ব্লকারের সাহায্য নিন
যদি নিজের ওপর একদমই ভরসা না পান, তবে প্লে-স্টোর বা ব্রাউজার এক্সটেনশন থেকে ‘StayFocusd’ বা ‘Freedom’ এর মতো অ্যাপ ব্যবহার করুন। এগুলো ক্লাসের সময়ে ফালতু সব ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে লক করে রেখে দেয়।
ক্লাসের জন্য আলাদা ব্রাউজার প্রোফাইল
ল্যাপটপে পড়াশোনার জন্য একদম আলাদা একটি ব্রাউজার প্রোফাইল তৈরি করতে পারেন। সেখানে কোনো সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট লগইন থাকবে না। এতে ইচ্ছা করলেও চট করে অন্য অ্যাকাউন্টে ঢোকা কঠিন হবে।
| ডিস্ট্রাকশনের উৎস | কীভাবে বাঁচবেন? | লাভ কী? |
| স্মার্টফোন | সাইলেন্ট করে অন্য টেবিলে রাখুন | ঘনঘন ফোন চেক করার বালাই থাকে না |
| সোশ্যাল মিডিয়া | অ্যাপ ব্লকার চালু রাখুন | ক্লাসের সময় চ্যাটিং করার ইচ্ছা জাগে না |
| ঘরের মানুষ | আগে থেকেই বলে রাখুন ক্লাস আছে | মাঝপথে মা এসে বলবে না—”বাজার থেকে আয়” |
৫. পুতুলের মতো বসে না থেকে ক্লাসে খাটুন
শুধু চুপচাপ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে স্যারের লেকচার শুনলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে হাই উঠবেই। অনলাইন ক্লাসকে জমজমাট করতে হলে আপনাকেও সমান তালে অংশ নিতে হবে। হাত-পা আর মুখ সচল রাখলে ঘুম পাল পালাবে।
খসখস করে নোট নিন
স্যার যা বলছেন, ইম্পর্ট্যান্ট পয়েন্টগুলো খাতায় নোট করতে থাকুন। সাল, সূত্র কিংবা ছোট কোনো উদাহরণ—টুক করে লিখে ফেলুন। হাত আর চোখ ব্যস্ত থাকলে মগজ অলস বসে থাকার সুযোগ পায় না।
ধুমধাম প্রশ্ন করুন
কোনো line বুঝতে সমস্যা হলে লজ্জা না পেয়ে চ্যাট বক্সে লিখুন। অথবা মাইক অন করে স্যারকে জিজ্ঞেস করুন। আপনি যখন মনে মনে ভাববেন যে স্যারকে একটা প্রশ্ন করতে হবে, আপনার মন এমনিতেই ক্লাসে একশো ভাগ ডুবে থাকবে।
স্লাইড বা পিডিএফে দাগাদাগি করুন
স্যার যদি কোনো পিডিএফ বা পাওয়ার পয়েন্ট স্লাইড শেয়ার করেন, সেটা নিজের ফোনেও নামিয়ে নিন। পড়ার সময় ডিজিটাল হাইলাইটার দিয়ে মেইন লাইনগুলো মার্ক করে রাখলে পড়াটা বোরিং লাগে না।
মাইন্ড ম্যাপিং বা ফ্লো-চার্ট তৈরি
লম্বা লেকচারগুলোকে সহজে মনে রাখার জন্য কায়দা করে ছোট ছোট ডায়াগ্রাম বা ফ্লো-চার্ট আঁকুন। তীরের চিহ্ন দিয়ে একটি টপিকের সাথে আরেকটি টপিক মিলিয়ে রাখলে পড়াটা একটা গেমের মতো মনে হবে।
| কী করবেন? | কীভাবে করবেন? | আসল ফায়দা |
| রানিং নোট | কলম-খাতা নিয়ে মেইন মেইন শব্দ লেখা | পড়া দ্রুত মুখস্থ হয়, মনোযোগ বাড়ে |
| প্রশ্ন ও উত্তর | চ্যাট বক্স বা সরাসরি ভয়েসে কথা বলা | ক্লাসের একঘেয়েমি কেটে যায় |
| রেসপন্স করা | স্যারের জিজ্ঞাসায় হ্যাঁ/না বলা | নিজের মনোযোগ কতটা আছে বোঝা যায় |
৬. শরীরের যত্ন আর চোখের আরাম
কম্পিউটার বা মোবাইলের স্ক্রিন থেকে যে নীল আলো বের হয়, তা চোখের বারোটা বাজানোর জন্য যথেষ্ট। একটানা তাকিয়ে থাকলে চোখ শুকিয়ে যায়, মাথা ধরে আর ঘাড় জাম হয়ে থাকে। শরীর যদি ঠিক না থাকে, তবে জোর করে মনোযোগ আনা অসম্ভব।
২০-২০-২০ নিয়মটা মেনে চলুন
চোখের ডাক্তাররা এই চমৎকার বুদ্ধিটা দেন। প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিনের দিকে তাকানোর পর, অন্তত ২০ ফুট দূরের কোনো গাছের দিকে বা অন্য কিছুর দিকে ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকুন। এতে চোখের পেশিগুলো রিল্যাক্স হয়।
পানি খান ঘনঘন
পড়ার টেবিলে পানির বোতল রাখুন। একটু পর পর এক-দুই চুমুক পানি খেলে শরীরে অক্সিজেনের কমতি হয় না। ফলে ঝিমুনি ভাব কেটে যায় আর শরীর চাঙ্গা থাকে।
নাইট মোড অন রাখুন
ডিভাইসের ব্রাইটনেস বা আলো কখনোই খুব বেশি বা একদম কম রাখবেন না। স্ক্রিনে সবসময় ‘রিডিং মোড’ বা ‘নাইট লাইট’ অন করে রাখুন। এতে ক্ষতিকর নীল আলোর তীব্রতা কমে চোখ আরাম পায়।
মাঝে মাঝে চোখের পলক ফেলা
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে আমরা সাধারণত চোখের পলক ফেলতে ভুলে যাই। এর ফলে চোখ শুকিয়ে লাল হয়ে যায়। তাই সচেতনভাবে ঘনঘন চোখের পলক ফেলুন, এতে চোখে আর্দ্রতা বজায় থাকে।
| শারীরিক সমস্যা | চটজলদি সমাধান | শেষমেশ কী হবে? |
| চোখের ক্লান্তি | ২০-২০-২০ নিয়ম মানা এবং ঘনঘন পলক ফেলা | চোখ জ্বলা আর মাথা ব্যথা করা কমবে |
| শরীরে ঝিমুনি | আধা ঘণ্টা পর পর পানি খাওয়া | ক্লান্তি কেটে যাবে, এনার্জি পাবেন |
| পিঠ-কোমর ব্যথা | সোজা হয়ে বসা, কুঁজো না হওয়া | দীর্ঘ সময় বসে ক্লাস করা সহজ হবে |
৭. ক্লাসের আগের ও পরের রুটিন ঠিক রাখুন
অনেকের অভ্যাস আছে—ঘুম থেকে উঠেই চোখ ডলতে ডলতে ল্যাপটপ খুলে ক্লাসে বসে যাওয়া। এটা চরম একটা বাজে অভ্যাস। ঘুম থেকে ওঠার সাথে সাথেই আমাদের ব্রেন পুরোপুরি জাগে না। ফলে ক্লাসের প্রথমার্ধের কিছুই মাথায় ঢোকে না।
সকালটা সুন্দর হোক
ক্লাস শুরু হওয়ার অন্তত আধা ঘণ্টা আগে বিছানা ছাড়ুন। হাত-মুখ ধুয়ে, হালকা কিছু মুখে দিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিন। একটু ফ্রেশ হয়ে নিলে শরীর ও মন দুটোই চনমনে থাকে, যা দীর্ঘ অনলাইন ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখার কার্যকরী উপায় হিসেবে এক নম্বরে কাজ করে।
ক্লাস শেষেই বই বন্ধ করবেন না
ক্লাস শেষ হওয়া মাত্রই ল্যাপটপ ধপাস করে বন্ধ করে উঠে যাবেন না। মাত্র ৫টা মিনিট সময় নিন। পুরো ক্লাসে স্যার কী কী পড়ালেন, খাতার নোটগুলোয় জাস্ট একবার চোখ বুলিয়ে নিন। এতে পড়াটা মাথায় পাকাপোক্তভাবে গেঁথে যায়।
নিজেকে ছোট উপহার দিন
টানা কয়েকটা ক্লাস মন দিয়ে করার পর নিজেকে ছোটখাটো কোনো ট্রিট দিন। হতে পারে পছন্দের একটা গান শোনা, একটু চা খাওয়া বা ১০ মিনিট পছন্দের কোনো গেম খেলা। এতে পরের ক্লাসের এনার্জি দ্বিগুণ হয়ে যায়।
পড়ার রিদম ধরে রাখতে প্ল্যানার ব্যবহার
আজকের ক্লাসে কী কী হোমওয়ার্ক বা অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হলো, তা ডায়েরিতে বা ফোনের টু-ডু লিস্টে লিখে রাখুন। ডেডলাইন মাথায় থাকলে পরবর্তী ক্লাসে বসার জন্য ভেতরে একটা তাগিদ কাজ করে।
| সময় | কী করা উচিত? | কেন করা উচিত? |
| ক্লাসের আগে | ফ্রেশ হওয়া ও হালকা নাস্তা করা | অলসতা কাটিয়ে ব্রেনকে সজাগ করে |
| ক্লাসের মাঝে | একটু হাত-পা টানটান করা | শরীরে রক্ত চলাচল ঠিক থাকে |
| ক্লাসের পরে | ৫ মিনিটের একটা কুইক রিভিশন | পড়া ভুলে যাওয়ার প্রাঞ্জলতা কমে যায় |
৮. বন্ধুদের সাথে ভার্চুয়াল আড্ডা ও গ্রুপ স্টাডি
অফলাইন ক্লাসের সবচেয়ে মজার পার্ট হলো বন্ধুদের সাথে আড্ডা আর পড়া নিয়ে খুনসুটি। অনলাইনে একা একা ঘরে বসে ক্লাস করতে করতে অনেকেই একাকীত্বে ভোগেন। এই বোরিংনেস কাটানোর দারুণ উপায় হলো নিজেদের একটা স্টাডি গ্রুপ বানানো।
জুম বা গুগল মিটে গ্রুপ স্টাডি
ক্লাস তো শেষ হলো, এবার বিকেলে বন্ধুরা মিলে জুম বা মেসেঞ্জারে আধঘণ্টার জন্য বসুন। যে টপিকটা কঠিন লেগেছে, তা নিয়ে আলোচনা করুন। একজন আরেকজনকে পড়া বুঝিয়ে দিলে পড়াটা একদম পানির মতো সহজ হয়ে যায়।
নোট আদান-প্রদান
নিজে যে নোটটা করেছেন, সেটা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। আবার ওদের নোটটাও আপনি দেখুন। এতে সহজেই ধরা পড়বে আপনার কোনো ইম্পর্ট্যান্ট পয়েন্ট বাদ পড়ে গেছে কি না। দল বেঁধে পড়লে পড়ার আগ্রহ অনেক বেড়ে যায়।
পিয়ার রিভিউ বা একে অপরের খাতা দেখা
গ্রুপের বন্ধুরা মিলে একে অপরকে ছোট ছোট অ্যাসাইনমেন্ট বা প্রশ্ন দিন। এরপর সেই উত্তরগুলো নিজেরা চেক করে দিন। শিক্ষক ছাড়া বন্ধুদের কাছ থেকে ফিডব্যাক পেলে পড়াশোনার ভয়টা কেটে যায় এবং ভুলগুলো সহজে শুধরানো যায়।
| গ্রুপ অ্যাক্টিভিটি | কীভাবে করবেন? | আসল লাভ |
| ভার্চুয়াল স্টাডি | মেসেঞ্জার বা ডিসকর্ড গ্রুপ খোলা | একাকীত্ব কাটে, পড়ার জোশ আসে |
| ছোটখাটো কুইজ | সপ্তাহে একদিন বন্ধুদের মাঝে কুইজ টেস্ট | কে কতটুকু পারল তা যাচাই করা যায় |
| প্রবলেম সলভিং | কঠিন প্রশ্নগুলো সবাই মিলে সলভ করা | কঠিন বিষয়গুলো সহজ হয়ে যায় |
টেকসই শিক্ষার জন্য অনলাইন ক্লাসের গুরুত্ব
আজকের দিনে অনলাইন ক্লাস কিন্তু স্রেফ একটা জোড়াতালির মাধ্যম নয়, এটা শিক্ষার ভবিষ্যৎ। ঘরে বসেই আপনি এখন দেশের বা বিদেশের নামী-দামী শিক্ষকদের লেকচার শোনার সুযোগ পাচ্ছেন। যাতায়াতের ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় বেঁচে যাচ্ছে, যা আপনি অন্য কোনো স্কিল শেখায় লাগাতে পারেন।
তবে এই বিশাল সুযোগের সঠিক ব্যবহার করতে না পারলে পুরো সময়টাই লস। ইন্টারনেটে জ্ঞানের অভাব নেই, অভাব শুধু আমাদের ইচ্ছার। তাই নিজেকে একটু নিয়মের মধ্যে আনার চেষ্টা করুন। আপনি নিজে থেকে সিরিয়াস না হলে দুনিয়ার কোনো স্যার বা কোনো গ্যাজেট আপনাকে ভালো রেজাল্ট এনে দিতে পারবে না।
শেষ কথা
আজকের এই ডিজিটাল যুগে পড়াশোনা করা যেমন সহজ, মনোযোগ ধরে রাখাটা ঠিক ততটাই কঠিন। তবে কঠিন বলেই যে হাল ছেড়ে দেবেন, তা কিন্তু নয়। উপরে যে টিপসগুলো দিলাম, সেগুলো কাল সকাল থেকেই যে আপনার লাইফ বদলে দেবে, এমনটা ভাববেন না। একটু সময় দিন, ধৈর্য ধরুন।
মোদ্দা কথা হলো, পড়ার টেবিল গুছিয়ে রাখা, পোমোডোরো টেকনিক মেনে চলা আর ডিস্ট্রাকশন থেকে দূরে থাকার মাধ্যমেই দীর্ঘ অনলাইন ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখার কার্যকরী উপায় বের করা সম্ভব। আজ থেকেই ছোট একটা নিয়ম দিয়ে শুরু করে দিন, নিজেই নিজের পরিবর্তন দেখে অবাক হয়ে যাবেন!
সাধারণ কিছু প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন ১: একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখ জ্বলে আর মাথা ব্যথা করে, কী করব?
উত্তর: একটা ভালো ‘ব্লু লাইট ফিল্টার’ চশমা ব্যবহার করতে পারেন। এটা স্ক্রিনের ক্ষতিকর আলো চোখে ঢুকতে দেয় না। আর স্ক্রিনের ব্রাইটনেস ঘরের আলোর সমান রাখুন। সবচেয়ে বড় কথা, প্রতি ২০ মিনিট পর পর স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে দূরের কিছুর দিকে তাকান।
প্রশ্ন ২: ক্লাস করার সময় বাড়ির লোকজন চিল্লামিল্লি করলে মনোযোগ দেব কেমনে?
উত্তর: ক্লাস শুরুর আগেই বাড়ির সবাইকে ভালো করে রিকোয়েস্ট করে রাখুন যে এই সময়ে যেন রুমে কেউ না আসে বা জোরে কথা না বলে। আর সাউন্ড পুরোপুরি ব্লক করতে একটা ভালো নয়েজ-ক্যানসেলিং হেডফোন ব্যবহার করুন, ঝামেলা মিটে যাবে।
প্রশ্ন ৩: সামনে শিক্ষক না থাকলে অলসতা লাগে, নিজেকে কীভাবে লাইনে রাখব?
উত্তর: অনলাইন ক্লাসকে একদম রিয়েল ক্লাসের মতো ভাবুন। লুঙ্গি বা ঘরের খাপছাড়া পোশাক পরে ক্লাসে বসবেন না। প্রপার শার্ট-প্যান্ট বা জামা পরে টেবিলে বসুন। আর স্যারের সাথে চ্যাটে বা ভয়েসে মাঝেমধ্যে কথা বলুন, অলসতা উধাও হয়ে যাবে।
প্রশ্ন ৪: মোবাইল নাকি ল্যাপটপ—কোনটায় ক্লাস করা বেশি ভালো?
উত্তর: ল্যাপটপ বা কম্পিউটার সবসময় বেস্ট। কারণ বড় স্ক্রিনে স্যারের স্লাইড বা বোর্ডের লেখা সহজে দেখা যায়। তাছাড়া মোবাইলের মতো ল্যাপটপে হুটহাট নোটিফিকেশন এসে ডিস্টার্ব করার ঝামেলা কম থাকে।
প্রশ্ন ৫: লাইভ ক্লাস না করে পরে রেকর্ড করা ভিডিও দেখলে কি কোনো সমস্যা আছে?
উত্তর: লাইভ ক্লাসের মজাই আলাদা। কারণ সেখানে সরাসরি প্রশ্ন করার সুযোগ থাকে এবং একটা ডিসিপ্লিন থাকে। রেকর্ডেড ভিডিও পরে দেখব বলে রেখে দিলে অলসতা বাড়ে এবং অধিকাংশ সময়ই ওই ভিডিও আর দেখা হয় না।
প্রশ্ন ৬: অনলাইন ক্লাসের একঘেয়েমি কাটাতে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক কি শোনা যাবে?
উত্তর: ক্লাস চলাকালীন কোনো লিরিক্স বা কথার গান শোনা একদমই উচিত নয়, এতে মনোযোগ আরও ভাগ হয়ে যায়। তবে আপনি যদি নিজে নিজে সেলফ-স্টাডি বা অ্যাসাইনমেন্ট করেন, তখন ব্রেনের ফোকাস বাড়াতে হালকা ইন্সট্রুমেন্টাল বা লো-ফাই (Lo-Fi) ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক শুনতে পারেন।



