আজ ৮ জুলাই, ২০২৬। ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম সেরা অধিনায়ক ও ওপেনার এবং বাঙালীর ‘দাদা’ খ্যাত সৌরভ গাঙ্গুলীর আজ ৫৫তম জন্মদিন (৫৪তম জন্মবার্ষিকী)। শুভ জন্মদিন দাদা!
ভারতীয় ক্রিকেট দলের বর্তমান যে আগ্রাসী বা ‘অ্যাটাকিং’ খেলার স্টাইল আমরা দেখি, তা কোথা থেকে এলো—এই নিয়ে ক্রিকেট ভক্তদের মনে প্রায়ই কৌতূহল জাগে। অনেকেই হয়তো জানেন না এই বিশাল পরিবর্তনের পেছনে মূল কারিগরটি কে ছিলেন। তিনি আর কেউ নন, সৌরভ গাঙ্গুলী—যিনি ভারতীয় ক্রিকেটকে চিরতরে বদলে দিয়েছিলেন। ২০০০ সালে যখন ম্যাচ-ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে ভারতীয় ক্রিকেট রীতিমতো কাঁপছিল, তখন দলের হাল ধরেন তিনি। তার নেতৃত্বেই ভারত দেশে এবং বিদেশের মাটিতে লড়াই করতে শেখে। চলুন, সৌরভ গাঙ্গুলীর বর্ণাঢ্য জীবন, তার উত্থান-পতন এবং ভারতীয় ক্রিকেটে তার অসামান্য অবদানের বিস্তারিত বিশ্লেষণ জেনে নিই।
সৌরভ গাঙ্গুলী: ফুটবলের শহর থেকে ক্রিকেটের রাজপুত্র

| বিবরণ | তথ্য |
| পুরো নাম | সৌরভ চণ্ডীদাস গাঙ্গুলী |
| ডাকনাম | দাদা, প্রিন্স অব ক্যালকাটা, গড অব দ্য অফ সাইড |
| জন্মতারিখ | ৮ জুলাই, ১৯৭২ |
| জন্মস্থান | কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত |
| ব্যাটিং স্টাইল | বাঁহাতি |
| বোলিং স্টাইল | ডানহাতি মিডিয়াম |
| উচ্চতা | ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি (১.৮০ মিটার) |
| ভূমিকা | ব্যাটসম্যান, বাঁহাতি মিডিয়াম বোলার |
| আন্তর্জাতিক অভিষেক | টেস্ট: ২০ জুন, ১৯৯৬ (ইংল্যান্ডের বিপক্ষে), ওয়ানডে: ১১ জানুয়ারি, ১৯৯২ (ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে) |
| শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ | টেস্ট: ৬-১০ নভেম্বর, ২০০৮ (অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে), ওয়ানডে: ১৫ নভেম্বর, ২০০৭ (পাকিস্তানের বিপক্ষে) |
| টেস্ট ক্যারিয়ার | ১১৩ ম্যাচ, ৭,২১২ রান (গড়: ৪২.১৭), ১৬টি সেঞ্চুরি, সর্বোচ্চ স্কোর: ২৩৯ |
| ওয়ানডে ক্যারিয়ার | ৩১১ ম্যাচ, ১১,৩৬৩ রান (গড়: ৪১.০২), ২২টি সেঞ্চুরি, সর্বোচ্চ স্কোর: ১৮৩ |
| অধিনায়কত্ব | টেস্ট অধিনায়ক: ২০০০-২০০৫, ওয়ানডে অধিনায়ক: ১৯৯৯-২০০৫ |
| প্রধান অর্জনসমূহ | ২০০৩ বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট, ২০০২ ন্যাটওয়েস্ট সিরিজ জয়ী, ২০০১ ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ জয় |
| ঘরোয়া দল | বাংলা, ল্যাঙ্কাশায়ার, গ্ল্যামরগন, নর্দাম্পটনশায়ার |
| আইপিএল দল | কলকাতা নাইট রাইডার্স (২০০৮-২০১০), পুনে ওয়ারিয়র্স ইন্ডিয়া (২০১১-২০১২) |
| খেলোয়াড়ি জীবন শেষের পর | সিএবি সভাপতি (২০১৫-২০১৯), বিসিসিআই সভাপতি (২০১৯-২০২২), ক্রিকেট ধারাভাষ্যকার এবং বিশ্লেষক |
| উল্লেখযোগ্য রেকর্ড | দ্রুততম ৯,০০০ ওয়ানডে রান, ওয়ানডেতে টানা চারটি ম্যান অব দ্য ম্যাচ পুরস্কার জয়ী একমাত্র খেলোয়াড় |
| ব্যক্তিগত জীবন | স্ত্রী: ডোনা গাঙ্গুলী (বিবাহ: ১৯৯৭), কন্যা: সানা গাঙ্গুলী (জন্ম: ২০০১) |
| শিক্ষাজীবন | সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ, কলকাতা |
| আত্মজীবনী | “অ্যা সেঞ্চুরি ইজ নট এনাফ” (২০১৮) |
| পুরস্কার | পদ্মশ্রী (২০০৪), বঙ্গবিভূষণ (২০১৩) |
সৌরভ গাঙ্গুলীর ক্রিকেট যাত্রা শুরু হয়েছিল কলকাতার রাস্তায়। বেহালার পাইকপাড়া ক্রিকেট ক্লাবে তিনি তার দক্ষতার বিকাশ ঘটান এবং নিজের সহজাত প্রতিভা দিয়ে স্থানীয় কোচদের নজর কাড়েন।
কলকাতার বেহালায় ১৯৭২ সালের ৮ জুলাই এক অত্যন্ত অবস্থাসম্পন্ন এবং অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সৌরভ চণ্ডীদাস গাঙ্গুলী। তার বাবা চণ্ডীদাস গাঙ্গুলী ছিলেন শহরের অন্যতম ধনী ব্যবসায়ীদের একজন। সৌরভের ডাকনাম রাখা হয়েছিল ‘মহারাজ’, আর বাস্তবেও তিনি রাজার মতোই বড় হয়েছেন।
মজার ব্যাপার হলো, কলকাতার আর দশটা সাধারণ ছেলের মতোই সৌরভের প্রথম প্রেম ছিল ফুটবল। কিন্তু তার বড় ভাই স্নেহাশীষ গাঙ্গুলী, যিনি নিজেও একজন প্রতিভাবান প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার ছিলেন, সৌরভকে ক্রিকেটের দিকে নিয়ে আসেন। সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তার প্রতিভা সবার নজর কাড়তে শুরু করে। একটি অদ্ভুত কারণে সৌরভ বাঁহাতি ব্যাটসম্যান হয়েছিলেন—ডানহাতি হয়েও শুধুমাত্র ভাইয়ের ক্রিকেট গিয়ার (ব্যাট-প্যাড) ব্যবহার করার সুবিধার জন্য তিনি বাঁহাতি ব্যাটিং শুরু করেন! পরিবার এতটাই ক্রিকেটপাগল ছিল যে, দুই ভাইয়ের অনুশীলনের জন্য বাড়িতেই একটি ইনডোর পিচ তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল।
ঘরোয়া ক্রিকেটে লড়াই এবং প্রথম ধাক্কা
মাত্র ১৮ বছর বয়সে, ১৯৮৯-৯০ সালের রঞ্জি ট্রফিতে বাংলার হয়ে তার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয় এবং ফাইনালে দিল্লি দলের বিপক্ষে একটি দুর্দান্ত ইনিংস খেলে তিনি নির্বাচকদের নজরে আসেন।
১৯৯২ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ব্রিসবেনে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার অভিষেক হয়। কিন্তু সেই ম্যাচে মাত্র ৩ রান করার পর তাকে দল থেকে বাদ দেওয়া হয়। সেসময় রটেছিল যে, সৌরভ নিজেকে ‘মহারাজ’ ভাবেন এবং সতীর্থদের পানি টানতে অস্বীকার করেছেন। যদিও পরবর্তীতে তিনি এটি ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন, তবে এই ঘটনা তাকে চার বছরের জন্য জাতীয় দলের বাইরে ছিটকে দেয়।
এই চার বছর সৌরভ দমে যাননি। তিনি ঘরোয়া ক্রিকেটে, বিশেষ করে দলীপ ট্রফি এবং দেওধর ট্রফিতে রানের বন্যা বইয়ে দেন। তার এই অদম্য জেদ এবং পারফরম্যান্স নির্বাচকদের বাধ্য করে ১৯৯৬ সালের ইংল্যান্ড সফরে তাকে দলে নিতে।
ঐতিহাসিক লর্ডস টেস্ট: ‘গড অফ দ্য অফ সাইড’-এর জন্ম
১৯৯৬ সালের ২০ জুন। ইংল্যান্ডের লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডে সৌরভের টেস্ট অভিষেক হয়। তিন নম্বরে ব্যাট করতে নেমে তিনি ১৩১ রানের এক রাজকীয় ইনিংস খেলেন, যা লর্ডসে কোনো অভিষিক্ত ক্রিকেটারের সর্বোচ্চ রান। তার কভার ড্রাইভ এবং স্কয়ার কাট দেখে ধারাভাষ্যকার জিওফ্রে বয়কট মুগ্ধ হয়ে তাকে ‘প্রিন্স অফ ক্যালকাটা’ উপাধি দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তার অফ সাইডের নান্দনিক শটগুলোর জন্য রাহুল দ্রাবিড় তাকে ‘গড অফ দ্য অফ সাইড’ (God of the off-side) বলে আখ্যায়িত করেন।
একই ম্যাচে আরেক কিংবদন্তি রাহুল দ্রাবিড়েরও অভিষেক হয়েছিল (তিনি ৯৫ রান করেছিলেন)। লর্ডসের ওই একটি ইনিংসই বুঝিয়ে দিয়েছিল, বিশ্ব ক্রিকেট এক নতুন তারকার জন্ম দেখতে চলেছে।
শচীন-সৌরভ: ওয়ানডে ক্রিকেটের সর্বকালের সেরা ওপেনিং জুটি

সৌরভ গাঙ্গুলীর ক্যারিয়ারের কথা উঠলে শচীন টেন্ডুলকারের সাথে তার জুটির কথা বলতেই হয়। নব্বইয়ের দশকে এবং ২০০০-এর দশকের শুরুতে ডানহাতি-বাঁহাতি এই কম্বিনেশন বিশ্বের যেকোনো বোলিং লাইনআপের জন্য একটি দুঃস্বপ্ন ছিল।
শচীন-সৌরভ জুটির পরিসংখ্যান একনজরে:
| রেকর্ডের বিবরণ | পরিসংখ্যান | বিশ্ব ক্রিকেটে অবস্থান |
| ওপেনিং জুটিতে মোট রান | ৬,৬০৯ রান | ১ম (বিশ্বরেকর্ড) |
| যেকোনো উইকেটে মোট রান | ৮,২২৭ রান (১৭৬ ইনিংস) | ১ম (বিশ্বরেকর্ড) |
| ১০০+ রানের পার্টনারশিপ | ২৬টি সেঞ্চুরি পার্টনারশিপ | ১ম (বিশ্বরেকর্ড) |
| ৫০+ রানের পার্টনারশিপ | ২৯টি হাফ-সেঞ্চুরি পার্টনারশিপ | শীর্ষস্থানীয় |
ম্যাচ-ফিক্সিংয়ের অন্ধকার এবং অধিনায়কের মুকুট
২০০০ সালে ভারতীয় ক্রিকেট এক গভীর খাদের কিনারায় এসে দাঁড়ায়। ম্যাচ-ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের মতো তারকারা নিষিদ্ধ হন, আর শচীন টেন্ডুলকার স্বেচ্ছায় অধিনায়কত্ব ছেড়ে দেন। দলের মনোবল তখন তলানিতে, ভক্তদের মনে চরম ক্ষোভ এবং অবিশ্বাস।
ঠিক এমন একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে দলের দায়িত্ব নেন সৌরভ। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এই দলকে শুধু ভালো খেললেই হবে না, তাদের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। তিনি দলের মধ্যে একটি ঐক্যবদ্ধতা এবং “বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র মেদিনী” মনোভাব তৈরি করেন।
সৌরভের অধীনে ঐতিহাসিক কিছু সিরিজ ও টুর্নামেন্ট
১. ২০০১ সালের বর্ডার-গাভাস্কার ট্রফি:
স্টিভ ওয়াহর অদম্য অস্ট্রেলিয়া দল টানা ১৫টি টেস্ট জিতে ভারতে এসেছিল। টসের সময় স্টিভ ওয়াহকে মাঠে অপেক্ষা করানো থেকে শুরু করে গাঙ্গুলীর সেই মানসিক লড়াই শুরু হয়। ইডেন গার্ডেন্সে ফলো-অনে পড়েও ভিভিএস লক্ষ্মণ (২৮১) এবং রাহুল দ্রাবিড়ের (১৮০) ঐতিহাসিক জুটিতে ভারত এক অবিশ্বাস্য জয় পায়। এই সিরিজ জয়টি ছিল ভারতীয় ক্রিকেটের টার্নিং পয়েন্ট।
২. ২০০২ সালের ন্যাটওয়েস্ট সিরিজ ফাইনাল:
ইংল্যান্ডের মাটিতে ৩২৫ রানের বিশাল টার্গেট তাড়া করে জেতাটা তখন অসম্ভব মনে হতো। কিন্তু মোহাম্মদ কাইফ এবং যুবরাজ সিংয়ের অসামান্য জুটিতে ভারত সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে। ম্যাচ শেষে লর্ডসের ব্যালকনিতে সৌরভ গাঙ্গুলীর সেই জার্সি খুলে ওড়ানোর দৃশ্য আজও ভারতীয় ক্রিকেটের আগ্রাসনের সবচেয়ে বড় প্রতীক।
৩. ২০০৩ সালের বিশ্বকাপ (দক্ষিণ আফ্রিকা):
সৌরভের নেতৃত্বে ২০০৩ বিশ্বকাপে ভারত ফাইনালে পৌঁছায়। যদিও ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হারতে হয়েছিল, কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টে দলের পারফরম্যান্স এবং দলের ভারসাম্য বজায় রাখতে রাহুল দ্রাবিড়কে উইকেটরক্ষক হিসেবে খেলানোর মতো সাহসী সিদ্ধান্তগুলো গাঙ্গুলীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে।
অধিনায়ক হিসেবে সৌরভ গাঙ্গুলীর রেকর্ড
সৌরভ গাঙ্গুলী ভারতের অন্যতম সফল অধিনায়ক। বিদেশের মাটিতে ভারতকে জিততে শেখানোর কৃতিত্ব সম্পূর্ণ তার।
| ফরম্যাট | ম্যাচ সংখ্যা | জয় | পরাজয় | ড্র/টাই/পরিত্যক্ত | জয়ের হার (%) |
| টেস্ট | ৪৯ | ২১ | ১৩ | ১৫ | ৪২.৮৫% |
| ওডিআই | ১৪৬ | ৭৬ | ৬৫ | ৫ | ৫৩.৯০% |
(বি.দ্র: টেস্টে তার ২১ জেলের মধ্যে ১১টি জয় এসেছিল বিদেশের মাটিতে, যা সেই সময়ে ভারতের জন্য একটি অভাবনীয় রেকর্ড ছিল।)
নতুন প্রজন্মের কারিগর: সৌরভ গাঙ্গুলীর হাতে গড়া দল
সৌরভ গাঙ্গুলীর অধিনায়কত্বের সবচেয়ে বড় দিক ছিল প্রতিভা অন্বেষণ এবং তরুণদের ওপর নিঃশর্ত সমর্থন। তিনি এমন একঝাঁক তরুণ ক্রিকেটার তৈরি করেছিলেন, যারা পরবর্তীতে মহেন্দ্র সিং ধোনির নেতৃত্বে ভারতকে ২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এবং ২০১১ ওয়ানডে বিশ্বকাপ জিততে সাহায্য করেছিল।
-
যুবরাজ সিং ও মোহাম্মদ কাইফ: ভারতের ফিল্ডিং এবং মিডল অর্ডারের মেরুদণ্ড।
-
বীরেন্দ্র শেবাগ: একজন মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানকে টেস্ট ক্রিকেটে ওপেনার হিসেবে প্রমোট করার সাহসী সিদ্ধান্ত সৌরভই নিয়েছিলেন।
-
জহির খান ও হরভজন সিং: দলের বোলিং অ্যাটাকের প্রধান দুই অস্ত্র, যাদের খারাপ সময়েও সৌরভ তাদের দলে রেখেছিলেন।
-
এম এস ধোনি: একজন তরুণ উইকেটকিপার ব্যাটসম্যানকে তিন নম্বরে ব্যাট করতে পাঠিয়ে তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন সৌরভ।
গ্রেগ চ্যাপেল অধ্যায় এবং ফিনিক্স পাখির মতো প্রত্যাবর্তন
দাদার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায় শুরু হয় ২০০৫ সালে, যখন গ্রেগ চ্যাপেল ভারতীয় দলের কোচ হয়ে আসেন। চ্যাপেলের সাথে তার কাজের ধরন ও মানসিকতা একেবারেই মেলেনি। চ্যাপেল গাঙ্গুলীর ফর্ম ও নেতৃত্ব নিয়ে প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তোলেন। একটি ফাঁস হওয়া ইমেইলের জেরে সৌরভকে অধিনায়কত্ব হারাতে হয় এবং পরবর্তীতে তাকে দল থেকেই বাদ দেওয়া হয়।
গোটা ভারত তখন দুই ভাগে বিভক্ত—সৌরভ সমর্থক এবং চ্যাপেল সমর্থক। অনেকেই ভেবেছিলেন সৌরভের ক্যারিয়ার এখানেই শেষ। কিন্তু দাদা তো হার মানার পাত্র নন! তিনি রঞ্জি ট্রফিতে প্রচুর রান করে ২০০৬ সালের শেষের দিকে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে জাতীয় দলে প্রত্যাবর্তন করেন। জোহানেসবার্গে কামব্যাক ম্যাচে দলের বিপর্যয়ের মুখে তিনি অপরাজিত ৫১ রানের এক দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন এবং ভারতকে ঐতিহাসিক এক জয় এনে দেন। এরপর ২০০৭ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে তিনি টেস্টে তার ক্যারিয়ার সেরা ২৩৯ রান করেন। এই প্রত্যাবর্তন বিশ্ব ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ‘কামব্যাক’ হিসেবে বিবেচিত হয়।
আইপিএল (IPL) এবং ক্রিকেটকে বিদায়
২০০৮ সালে যখন ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (IPL) শুরু হয়, তখন সৌরভ গাঙ্গুলীকে কলকাতা নাইট রাইডার্সের (KKR) আইকন প্লেয়ার এবং অধিনায়ক করা হয়। পরবর্তীতে তিনি পুনে ওয়ারিয়র্স ইন্ডিয়ার (PWI) হয়েও খেলেছেন এবং দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
অবশেষে ২০০৮ সালের নভেম্বরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নাগপুর টেস্টে তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানান। বিদায়বেলায় অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি শেষ সেশনে সৌরভকে দলের নেতৃত্ব দেওয়ার সম্মান জানান, যা ছিল ভারতীয় ক্রিকেটের এক অনন্য সুন্দর মুহূর্ত।
ক্রিকেট প্রশাসক হিসেবে দ্বিতীয় ইনিংস
মাঠের খেলা ছাড়লেও সৌরভ ক্রিকেট থেকে দূরে সরে যাননি। ২০১৫ সাল থেকে তিনি ক্রিকেট প্রশাসনে যুক্ত হন।
-
সিএবি ও বিসিসিআই সভাপতি: প্রথমে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গলের (CAB) সভাপতি এবং এরপর ২০১৯ সালে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআই-এর (BCCI) সভাপতি নির্বাচিত হন।
-
পিংক বল টেস্ট ও কাঠামো উন্নয়ন: তার আমলেই ভারতে প্রথমবারের মতো দিবা-রাত্রির (ডে-নাইট) টেস্ট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। তিনি ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামো পরিবর্তন করেন এবং খেলোয়াড়দের বেতন বৃদ্ধিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
-
রোহিত শর্মাকে অধিনায়কত্ব প্রদান: বিসিসিআই সভাপতি থাকাকালীন তিনি বিরাট কোহলির পর রোহিত শর্মাকে জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে নিযুক্ত করেন। এর দীর্ঘমেয়াদী সুফল হিসেবে ১১ বছরের খরা কাটিয়ে ভারত ২০২৪ সালের আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয় করে।
-
আইসিসি’র দায়িত্ব: বর্তমানে তিনি আইসিসি মেন্স ক্রিকেট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে বৈশ্বিক ক্রিকেটের নীতি নির্ধারণে কাজ করে যাচ্ছেন।
শেষ কথা
সৌরভ গাঙ্গুলী শুধু একজন পরিসংখ্যান-সর্বস্ব ক্রিকেটার ছিলেন না; তিনি ছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটের মানসিকতার এক যুগান্তকারী রূপকার। যখন ভারতীয় দল চরম সংকটময় সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি খাদের কিনারা থেকে দলকে টেনে তুলেছিলেন এবং প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে লড়াই করার সাহস যুগিয়েছিলেন। শচীন টেন্ডুলকারের মতো কিংবদন্তিরা যেখানে ব্যক্তিগত উৎকর্ষ এবং মূল্যবোধের চূড়ান্ত মাপকাঠি তৈরি করে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন, সেখানে সৌরভ গাঙ্গুলী সেই শ্রেষ্ঠত্বকে একটি অদম্য দলগত শক্তিতে রূপান্তর করেছিলেন।
তার দূরদর্শিতা, হার না মানা মানসিকতা এবং তরুণ প্রতিভাদের প্রতি অবিচল আস্থাই আজকের শক্তিশালী এবং আগ্রাসী ভারতীয় দলের মূল ভিত্তি। ২২ গজের লড়াকু খেলোয়াড় থেকে শুরু করে সফল অধিনায়ক এবং পরবর্তীতে একজন দক্ষ ক্রিকেট প্রশাসক হিসেবে তার এই বর্ণাঢ্য যাত্রা ক্রিকেট বিশ্ব তো বটেই, যেকোনো নেতৃত্বের জন্যই এক অনন্য অনুপ্রেরণার উৎস। ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে ‘দাদা’ তাই শুধু একটি নাম নয়, বরং একটি চিরস্মরণীয় বিপ্লব হয়ে থাকবেন।

