মাটির গন্ধ মাখা সিনেমাওয়ালা — তারেক মাসুদ

সর্বাধিক আলোচিত

সন্ধ্যা নামছে। গ্রামীণজীবনের দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততা স্তিমিত হয়ে আসছে। এমন সময় খোলা মাঠে দুই বাঁশের খুঁটির মাঝে টাঙানো হচ্ছে একটা সাদা পর্দা। এরপর জ্বলে ওঠে প্রজেক্টরের আলো, সাদা পর্দা ঘিরে কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ মাটিতে বসে, কেউবা দূরে গাছে হেলান দিয়ে পর্দায় দেখছে তাদেরই মুখ, তাদেরই ভাষা, তাদেরই ইতিহাস। একপাশে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মানুষ, একজন চলচ্চিত্রকার। সেই মানুষটি তারেক মাসুদ—আমাদের সিনেমার ফেরিওয়ালা, যিনি সিনেমাকে শহরের প্রেক্ষাগৃহ থেকে তুলে নিয়ে গেছেন মানুষের উঠোনে।

১৩ আগস্ট এলে এই দৃশ্যের সঙ্গে আরেকটি স্মৃতি অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে যায়। মানিকগঞ্জের একটি সড়ক, থেমে যাওয়া একটি যাত্রা, আর অসমাপ্ত থেকে যাওয়া একটি চলচ্চিত্রের পরিকল্পনা। ২০১১ সালের এই দিনে তারেক মাসুদ চলে গিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীর। তাঁরা ফিরছিলেন একটি লোকেশন দেখে—‘কাগজের ফুল’-এর জন্য। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যে চলচ্চিত্রটি আর শেষ করা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু তারেক মাসুদকে মনে করতে গেলে সেই দুর্ঘটনার দৃশ্যেই আটকে থাকা যায় না। বরং ফিরে যেতে হয় সেই খোলা মাঠেই, যেখানে প্রজেক্টরের আলোয় তিনি দেশটাকে নতুন করে চিনিয়েছিলেন তারই মানুষদের।

মাদ্রাসার বালক থেকে ক্যামেরার পেছনের মানুষ

আবু তারেক মাসুদের জন্ম ১৯৫৬ সালের ৬ ডিসেম্বর, ফরিদপুরের ভাঙ্গায়। তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের একটি ধর্মপ্রাণ পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা। বাবার ইচ্ছায় শৈশবেই তাঁকে পাঠানো হয় মাদ্রাসায়। এই মাদ্রাসা-জীবনের স্মৃতি অনেক বছর পরে তাঁর চলচ্চিত্রে ফিরে আসবে—কখনো সরাসরি, কখনো প্রতীক হয়ে, কখনো একটি শিশুর চোখের ভেতর জমে থাকা প্রশ্ন হয়ে।

১৯৭১ সবকিছু বদলে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের কারণে তাঁর মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যাহত হয়। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তিনি অন্য ধারার শিক্ষায় ফিরে আসেন। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিষয় ছিল ইতিহাস।

এই ইতিহাসপাঠ শুধুই পাঠ্যক্রমে আটকে থাকেনি। পরবর্তী জীবনে তাঁর চলচ্চিত্রগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়—ইতিহাস তাঁর কাছে অতীতের মৃত তথ্য নয়; বরং স্মৃতি, সংঘাত, মানুষের মুখ, ব্যক্তিগত ক্ষত এবং জাতীয় আত্মপরিচয়ের চলমান প্রশ্ন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়েই তিনি চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। তখন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রচর্চায় বিকল্প ধারার একটি নতুন পরিসর তৈরি হচ্ছিল। তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলামের মতো নির্মাতারা এই সময়ে বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নিয়ে কাজ করছিলেন। প্রেক্ষাগৃহের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের বাইরে সিনেমাকে শিল্প, দলিল ও রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ভাষা হিসেবেও ভাবার চেষ্টা করছিলেন একদল তরুণ। তারেক মাসুদ সেই প্রবাহের অংশ হয়ে ওঠেন।

তিনি কোনো প্রতিষ্ঠিত চলচ্চিত্র বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন না। সিনেমা শিখেছেন কাজ করতে করতে, দেখতে দেখতে, আলোচনা করতে করতে, তৈরি করতে করতে। এই স্বশিক্ষিত পথই পরে তাঁর চলচ্চিত্র-ভাবনার গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়।

তিনি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন ছিলেন। ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য ও প্রামাণ্যচিত্র উৎসব আয়োজনে তিনি ভূমিকা রাখেন। সেই উৎসব পরবর্তীকালে দ্বিবার্ষিকভাবে চলতে থাকে। অর্থাৎ তাঁর কাজ কেবল নিজের চলচ্চিত্র নির্মাণে সীমাবদ্ধ ছিল না; বিকল্প চলচ্চিত্রের জন্য একটি সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করাও ছিল তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের অংশ।

Tareque Masud at A Glance

এক নজরে তারেক মাসুদ

বিষয় প্রধান তথ্য
পূর্ণ নাম আবু তারেক মাসুদ
জন্ম ৬ ডিসেম্বর ১৯৫৬
জন্মস্থান ভাঙ্গা, ফরিদপুর
মৃত্যু ১৩ আগস্ট ২০১১
মৃত্যুর স্থান ঘিওর উপজেলা, মানিকগঞ্জ
শিক্ষা মাদ্রাসায় প্রাথমিক শিক্ষা; আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে স্নাতক
জীবনসঙ্গী ও প্রধান সহযোগী ক্যাথরিন মাসুদ—সম্পাদক, প্রযোজক ও সহপরিচালক
বিশেষ পরিচিতি স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্রকার; ‘সিনেমা ফেরিওয়ালা’
সংগঠক পরিচয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য; ১৯৮৮ সালের প্রথম আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য ও প্রামাণ্যচিত্র উৎসবের অন্যতম সংগঠক
উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ‘মাটির ময়না’ ২০০২ সালে Cannes-এ FIPRESCI আন্তর্জাতিক সমালোচক পুরস্কার লাভ করে
মরণোত্তর সম্মান একুশে পদক, ২০১২
মৃত্যুর কারণ ‘কাগজের ফুল’-এর লোকেশন দেখে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনা; একই দুর্ঘটনায় চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীরও নিহত হন

সিনেমা বানানোই নয়, সিনেমাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া

তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রচর্চার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল নির্মাণ ও প্রদর্শনের মধ্যকার দূরত্ব তিনি খুব বেশি মানতেন না। তাঁর কাছে চলচ্চিত্র তৈরি করলেই কাজ শেষ নয়। কে দেখবে? কোথায় দেখবে? দেশের গ্রামের মানুষ কি এই চলচ্চিত্রের দর্শক হতে পারবে?—এই প্রশ্নগুলোও নির্মাণের অংশ।

এই কারণেই তাঁর চলচ্চিত্রচর্চাকে এক ধরনের ‘সমগ্র চলচ্চিত্রচর্চা’ বলা যায়। তিনি বিষয় খুঁজেছেন, চিত্রনাট্য লিখেছেন, পরিচালনা করেছেন, প্রযোজনার সঙ্গে থেকেছেন, সম্পাদনার কাজে অংশ নিয়েছেন, আবার চলচ্চিত্র নিয়ে নিজেই বেরিয়ে পড়েছেন দেশের শহর-মফস্বল-গ্রামে।

একটি চলমান প্রজেক্টর যেন তাঁর চলচ্চিত্র আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

দূরবর্তী অঞ্চলে তিনি চলচ্চিত্র নিয়ে যেতেন, পর্দা টাঙিয়ে প্রদর্শনী করতেন। সিনেমা দেখার জন্য দর্শককে রাজধানীর কোনো নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে আসতে হবে—এই ধারণাটিকে তিনি উল্টে দিয়েছিলেন। চলচ্চিত্রই গেছে মানুষের কাছে।

এই পথচলা থেকেই তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে যায় ‘সিনেমা ফেরিওয়ালা’ পরিচয়টি।

শব্দটির মধ্যে এক ধরনের স্নেহ আছে। আবার গভীর রাজনৈতিক অর্থও আছে। ফেরিওয়ালা নিজের পণ্য নিয়ে মানুষের দরজায় যায়। তারেক মাসুদও যেন ইতিহাস, প্রশ্ন, স্মৃতি ও চলচ্চিত্র নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের দরজায় পৌঁছে গিয়েছিলেন।

তাঁর কাজের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল প্রামাণ্যচিত্রের সত্যনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ এবং কাহিনিচিত্রের আবেগময় নির্মাণকে কাছাকাছি নিয়ে আসা। তাঁর কাহিনিচিত্রে বাস্তবের কাঁটা থাকে। আবার প্রামাণ্যচিত্রেও থাকে গল্পের ছন্দ, মানুষের মুখ, অপেক্ষা, নীরবতা ও নাটকীয়তার নিজস্ব বিন্যাস।

তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রসম্ভার

চলচ্চিত্র ধরন সাল সংক্ষিপ্ত বিবরণ
সোনার বেড়ি [Shonar Beri / Chains of Gold] প্রামাণ্যচিত্র ১৯৮৭ ২৫ মিনিটের পরিচালনায় অভিষেক; বাংলাদেশের নারীদের নিপীড়িত অবস্থান ও লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে নির্মিত। বাংলাদেশের প্রথম ভিডিও প্রামাণ্যচিত্র হিসেবেও বিবেচিত।
আদম সুরত [Adam Surat / The Inner Strength] প্রামাণ্যচিত্র ১৯৮৯ ১৯৮২ সালে কাজ শুরু; ৫৪ মিনিটের চলচ্চিত্রটি শিল্পী এস. এম. সুলতানকে নিয়ে। এখান থেকেই তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদের যৌথ কাজের শুরু।
মুক্তির গান [Muktir Gaan / Song of Freedom] প্রামাণ্যচিত্র ১৯৯৫ মার্কিন চলচ্চিত্রকার লিয়ার লেভিনের ধারণ করা ১৯৭১ সালের ফুটেজ থেকে নির্মিত। গ্রামীণ ও মুক্তমঞ্চের প্রদর্শনীর মাধ্যমে অসাধারণ জনপ্রিয়তা পায়।
মুক্তির কথা [Muktir Kotha / Words of Freedom] প্রামাণ্যচিত্র ১৯৯৯ ৮০ মিনিট; ‘মুক্তির গান’-এর প্রদর্শনী ঘিরে সাধারণ মানুষের যুদ্ধস্মৃতি, প্রতিক্রিয়া ও মৌখিক সাক্ষ্য ধারণ করে।
নারীর কথা [Narir Kotha / Women and War] প্রামাণ্যচিত্র ২০০০ মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মাটির ময়না [Matir Moina / The Clay Bird] কাহিনিচিত্র ২০০২ ৯৮ মিনিট; তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র। মাদ্রাসা-জীবনের ব্যক্তিগত স্মৃতি ও ষাটের দশকের পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতার পটভূমি।
A Kind of Childhood প্রামাণ্যচিত্র, আন্তর্জাতিক সহপ্রযোজনা ২০০২ ৫২ মিনিট; ছয় বছর ধরে ধারণ করা শ্রমজীবী শিশুদের জীবন নিয়ে নির্মিত।
অন্তর্যাত্রা [Ontarjatra / Homeward Journey] কাহিনিচিত্র/টেলিফিল্ম ২০০৬ ৮৫ মিনিট; এক মা ও ছেলের বাংলাদেশে ফিরে আসার যাত্রাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
কানসাটের পথে [Kansater Pothey / The Road to Kansat] প্রামাণ্যচিত্র ২০০৮ ৪০ মিনিট; বিদ্যুতের অধিকারের দাবিতে গড়ে ওঠা তৃণমূল গণআন্দোলন নিয়ে নির্মিত।
নরসুন্দর [Naroshundor / The Barbershop] স্বল্পদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র ২০০৯ ১৫ মিনিট; ১৯৭১ সালের প্রেক্ষাপটে নির্মিত রাজনৈতিক রোমাঞ্চধর্মী কাহিনি।
রানওয়ে [Runway] কাহিনিচিত্র ২০১০ ৯০ মিনিট; তাঁর শেষ সম্পূর্ণ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। এক তরুণের ধর্মীয় উগ্রবাদের দিকে ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়ার কাহিনি।
কাগজের ফুল [Kagojer Phool] অসমাপ্ত প্রকল্প ২০১১ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে পরিকল্পিত চলচ্চিত্র; নির্মাণের প্রস্তুতিকালেই তারেক মাসুদের মৃত্যু হয়।

এক বিদেশি ক্যামেরায় ধরা যুদ্ধ, এক বাঙালি চলচ্চিত্রকারের পুনরাবিষ্কার

‘মুক্তির গান’ তারেক মাসুদের জীবনেরই শুধু নয়, বাংলাদেশের প্রামাণ্যচিত্র ইতিহাসেরও একটি মোড়।

১৯৭১ সালে মার্কিন চলচ্চিত্রকার লিয়ার লেভিন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ফুটেজ ধারণ করেছিলেন। বহু বছর পর সেই ফুটেজের অস্তিত্ব আবার সামনে আসে। তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ সেই উপাদান খুঁজে বের করেন, অনুসরণ করেন, উদ্ধার করেন এবং নতুনভাবে সংগঠিত করেন।

এই জায়গাটিই গুরুত্বপূর্ণ। ফুটেজ ছিল অতীতের। কিন্তু তারেক মাসুদের কাছে সেটি কেবল পুরোনো দৃশ্যের সংগ্রহ হয়ে থাকেনি। তিনি তাকে বর্তমানের সঙ্গে কথা বলিয়েছেন।

১৯৯৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মুক্তির গান’-এ যুদ্ধকে আমরা প্রধানত রণক্ষেত্রের সামরিক মানচিত্র হিসেবে দেখি না। দেখি গান, মানুষের মুখ, আশ্রয়, যাত্রা, অপেক্ষা এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। যুদ্ধ এখানে কেবল অস্ত্রের সংঘাত নয়; সংস্কৃতিরও যুদ্ধ।

সম্ভবত এ কারণেই চলচ্চিত্রটি মানুষের সঙ্গে এত দ্রুত আত্মীয়তা গড়ে তুলেছিল।

তারেক মাসুদ ‘মুক্তির গান’ নিয়ে ঘুরেছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। গ্রাম, ছোট শহর, উন্মুক্ত মাঠ—যেখানে সাধারণ মানুষ একসঙ্গে বসে চলচ্চিত্রটি দেখেছেন। অনেকের কাছে এটি হয়ে উঠেছিল নিজের স্মৃতিতে ফিরে যাওয়ার উপলক্ষ। কেউ হয়তো নিজের দেখা যুদ্ধের সঙ্গে পর্দার ছবিকে মিলিয়েছেন। কেউ প্রথমবার বাবা-মায়ের বলা ইতিহাসের দৃশ্যমান রূপ দেখেছেন।

একজন প্রজন্ম কি কেবল সিনেমা দিয়েই ইতিহাস মনে রাখে? পুরোপুরি হয়তো নয়। কিন্তু কোনো কোনো সিনেমা ইতিহাসের স্মৃতি বহনের মাধ্যম হয়ে ওঠে। ‘মুক্তির গান’ তেমনই।

মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র দলিলের প্রসঙ্গে জহির রায়হানের ‘স্টপ জেনোসাইড’-এর পাশে ‘মুক্তির গান’ আলাদা গুরুত্বে অবস্থান করে। দুটি চলচ্চিত্রের ভাষা ও নির্মাণকাল ভিন্ন, কিন্তু দুটিই যুদ্ধের স্মৃতিকে দৃশ্যমান রাখার কাজ করেছে।

আর ‘মুক্তির গান’-এর প্রভাবেই তৈরি হয় ‘মুক্তির কথা’। কারণ প্রদর্শনী চলাকালে তারেক মাসুদ দেখেছিলেন, পর্দার চলচ্চিত্র শেষ হলেও মানুষের কথা শেষ হয় না।

কেউ নিজের যুদ্ধের স্মৃতি বলতে চান। কেউ ভুলে থাকা গল্প স্মরণ করেন। কেউ প্রশ্ন করেন। সেই প্রতিক্রিয়া, স্মৃতি ও মৌখিক সাক্ষ্য থেকে ১৯৯৯ সালে তৈরি হয় ‘মুক্তির কথা’।

এ যেন একটি চলচ্চিত্র আরেকটি চলচ্চিত্রকে জন্ম দিল।

মাদ্রাসার স্মৃতি যখন হয়ে উঠল ‘মাটির ময়না’

তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রজীবনে ‘মাটির ময়না’ এমন একটি কাজ, যেখানে ব্যক্তিগত স্মৃতি, পারিবারিক টানাপোড়েন, ধর্মীয় অনুশাসন এবং জাতীয় ইতিহাস একই ফ্রেমে এসে দাঁড়ায়।

ছবিটির মূলে তাঁর নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতা আছে। ধর্মপ্রাণ বাবার সিদ্ধান্তে মাদ্রাসায় পাঠানো এক শিশুর স্মৃতি তিনি বহন করেছিলেন দীর্ঘদিন। সেই স্মৃতি চলচ্চিত্রে ফিরে আসে, কিন্তু নিছক আত্মজীবনী হিসেবে নয়।

ছবির কেন্দ্রে এক বালক। তাকে পাঠানো হয় একটি কঠোর মাদ্রাসায়। অন্যদিকে তার পরিবারে চলছে টানাপোড়েন। দেশের রাজনীতিও দ্রুত বদলাচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তানের জমিন ক্রমে এগিয়ে যাচ্ছে ১৯৭১-এর সংঘাতের দিকে।

শিশুটির চোখে ধর্ম, পরিবার, আনুগত্য, ভয় আর স্বাধীনতার প্রশ্ন পাশাপাশি জন্ম নিতে থাকে।

এখানে তারেক মাসুদের ব্যক্তিজীবনের একটি গভীর দ্বন্দ্বও ধরা পড়ে। যে মানুষ নিজে মাদ্রাসায় পড়েছেন, তিনিই পরে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সংকীর্ণতার প্রশ্নকে চলচ্চিত্রে এত সংবেদনশীলভাবে ধরেছেন। কিন্তু তাঁর ক্যামেরা কেবল আক্রমণ করে না। সে পর্যবেক্ষণ করে। মানুষের বিশ্বাসকে একরঙা করে দেখার বদলে বিশ্বাসের ভেতরের দ্বন্দ্ব, কোমলতা, অনমনীয়তা ও ভয়ের দিকে তাকায়।

এই সংযমই ‘মাটির ময়না’-কে কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যে আটকে থাকতে দেয়নি।

২০০২ সালে Cannes-এর আনুষ্ঠানিক নির্বাচনে স্থান পাওয়া প্রথম বাংলাদেশি চলচ্চিত্র ছিল ‘মাটির ময়না’। সেখানে এটি FIPRESCI আন্তর্জাতিক সমালোচক পুরস্কার লাভ করে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক যাত্রায় ঘটনাটি ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

আরও একটি ইতিহাস তৈরি হয়েছিল। ‘মাটির ময়না’ই ছিল অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসে জমা দেওয়া প্রথম বাংলাদেশি চলচ্চিত্র।

কিন্তু পুরস্কারের বাইরেও ছবিটির শক্তি অন্যত্র। নিজের শৈশবকে পুনর্নির্মাণ করতে গিয়ে তারেক মাসুদ আসলে একটি দেশের কৈশোরকে ধারণ করেছিলেন—যে দেশ তখনও জন্মায়নি, কিন্তু জন্মের ব্যথা শুরু হয়ে গেছে।

Best Movies of Tareque Masud

সুলতান থেকে শ্রমজীবী শিশু, কানসাট থেকে রানওয়ে

তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রগুলো পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—তিনি একই গল্প বারবার বলেননি। তবে তাঁর প্রশ্নগুলো একে অন্যের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল।

‘সোনার বেড়ি’তে তিনি বাংলাদেশের নারীদের ওপর সামাজিক নিপীড়ন ও বৈষম্যের দিকে তাকিয়েছিলেন। তাঁর পরিচালনায় অভিষেকই ছিল এমন এক বিষয় দিয়ে, যেটি সমাজের প্রচলিত ক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্ন করে।

‘আদম সুরত’-এ তিনি দীর্ঘ সময় ধরে অনুসরণ করেন শিল্পী এস. এম. সুলতানকে। এই কাজ থেকেই ক্যাথরিন মাসুদের সঙ্গে তাঁর সৃজনশীল সহযোগিতা শুরু। পরে সেই সহযোগিতা তাঁদের চলচ্চিত্রজীবনের কেন্দ্রীয় শক্তি হয়ে ওঠে।

‘নারীর কথা’ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নারীদের অভিজ্ঞতার দিকে ফিরে যায়। যুদ্ধের স্মৃতি যে কেবল যোদ্ধাদের স্মৃতি নয়, তারেক মাসুদ সেই বিস্তৃত ক্ষেত্রটির প্রতিও সচেতন ছিলেন।

‘A Kind of Childhood’-এ ছয় বছর ধরে শ্রমজীবী শিশুদের জীবন অনুসরণ করা হয়। এই দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ তাঁর প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের ধৈর্যের পরিচয় বহন করে।

‘অন্তর্যাত্রা’য় কেন্দ্র হয়ে ওঠে ফিরে আসা—এক মা ও ছেলের বাংলাদেশে ফেরার ভেতর দিয়ে দেশ, শিকড় ও পরিচয়ের সম্পর্ক।

‘কানসাটের পথে’ চলে যায় সরাসরি তৃণমূল মানুষের আন্দোলনের কাছে। বিদ্যুতের অধিকারের দাবিতে মানুষের সংগ্রাম তাঁর ক্যামেরায় স্থান পায় জাতীয় রাজনীতির বড় বক্তৃতার বাইরে থেকে।

‘নরসুন্দর’ ছোট দৈর্ঘ্যের হলেও ১৯৭১-এর রাজনৈতিক আতঙ্ককে ঘন করে তোলে।

আর ‘রানওয়ে’ যেন তাঁর আগের অনেক প্রশ্নকে নতুন সময়ে এনে দাঁড় করায়। ধর্মীয় উগ্রবাদের দিকে এক তরুণের ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়ার গল্পের মধ্য দিয়ে তিনি আবারও তাকান বিশ্বাস, হতাশা, সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার জটিল সম্পর্কের দিকে।

মাদ্রাসায় পড়া সেই শিশুটি অনেক বছর পরও যেন প্রশ্ন করে যাচ্ছে—বিশ্বাস কোথায় শেষ হয়, আর অন্ধতা কোথা থেকে শুরু হয়?

যে যাত্রা লোকেশন দেখে ফেরার পথে থেমে গেল

২০১১ সালে তারেক মাসুদ কাজ করছিলেন ‘কাগজের ফুল’ নিয়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত এই চলচ্চিত্রের জন্য চলছিল প্রস্তুতি ও লোকেশন অনুসন্ধান।

১৩ আগস্ট তিনি একটি লোকেশন দেখে ফিরছিলেন। মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। একই দুর্ঘটনায় মারা যান চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীর।

‘কাগজের ফুল’ তাই তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রপঞ্জিতে কেবল একটি অসমাপ্ত প্রকল্প নয়। এটি যেন তাঁর থেমে যাওয়া সৃজনযাত্রার একটি প্রতীক।

জীবনের শেষ দিনেও তিনি চলচ্চিত্রের কাজেই ছিলেন।

তারেক ও ক্যাথরিন: একসঙ্গে তৈরি হওয়া এক চলচ্চিত্রভাষা

তারেক মাসুদের কাজের কথা বললে ক্যাথরিন মাসুদের কথা আলাদা করে না বলার উপায় নেই। ‘আদম সুরত’ থেকে তাঁদের যৌথ কাজের শুরু। পরে তাঁরা বিবাহিত জীবনেও যুক্ত হন। কিন্তু তাঁদের সম্পর্কের চলচ্চিত্রিক দিকটি শুধু জীবনসঙ্গীর পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়।

ক্যাথরিন ছিলেন সম্পাদক, প্রযোজক, সহপরিচালক এবং সৃজনশীল সহযোগী। তারেক মাসুদের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ কাজের নির্মাণভাষা গড়ে উঠেছে তাঁদের দীর্ঘ সহযোগিতায়।

তারেক মাসুদের মৃত্যুর পরও এই সম্পর্কের আরেকটি অধ্যায় চলেছে। ক্যাথরিন তাঁর চলচ্চিত্র সংরক্ষণ, পুনঃপ্রকাশ এবং আর্কাইভ রক্ষার কাজ করে চলেছেন। ফলে তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রগুলো কেবল স্মৃতির বস্তু হয়ে যায়নি; নতুন দর্শকের কাছেও ফিরে যাওয়ার পথ পেয়েছে।

২০১২ সালে তারেক মাসুদকে মরণোত্তর একুশে পদক দেওয়া হয়। রাষ্ট্রের এই স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাঁর উত্তরাধিকার বোঝার জন্য পুরস্কারের তালিকা যথেষ্ট নয়।

বড় উত্তরাধিকারটি দেখা যায় বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্রচর্চায়।

প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার বাইরে থেকেও গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব—তিনি তা দেখিয়েছেন। শহরের ছোট সাংস্কৃতিক বলয়ের বাইরে চলচ্চিত্রের দর্শক আছে—তিনি তা প্রমাণ করেছেন। একটি চলচ্চিত্র নির্মাতা নিজের চলচ্চিত্রের পরিবেশকও হতে পারেন—তিনি তা বাস্তবে করে দেখিয়েছেন।

সবচেয়ে বড় কথা, তিনি দেখিয়েছেন বাংলাদেশের গল্প বলতে গেলে বাংলাদেশের মাটির খুব কাছে দাঁড়াতে হয়।

যে সিনেমাওয়ালা এখনও গ্রামের পথে হাঁটেন

১৩ আগস্ট আবার আসে। বর্ষার আকাশও ফিরে আসে। রাস্তার ওপর জমে থাকা পানি, দূরের ধানক্ষেত, কোনো গ্রামের স্কুলের মাঠে সন্ধ্যার আলো—এই সব সাধারণ দৃশ্যের মধ্যেই তারেক মাসুদের চলচ্চিত্র যেন এখনও কোথাও ঘুরে বেড়ায়।

আমরা যখন ‘মুক্তির গান’ দেখি, তখন শুধু একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখি না; দেখি ইতিহাসকে মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার এক প্রচেষ্টা। ‘মাটির ময়না’ দেখলে কেবল এক শিশুর মাদ্রাসাজীবন দেখি না; দেখি একটি সমাজ নিজের বিশ্বাস, ভয় ও স্বাধীনতার প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছে। ‘রানওয়ে’ দেখলে মনে হয়, তাঁর প্রশ্নগুলো এখনও শেষ হয়নি।

হয়তো এভাবেই একজন চলচ্চিত্রকার বেঁচে থাকেন।

নিজের ছবির ভেতর।

নিজের রেখে যাওয়া প্রশ্নের ভেতর।

আর কোনো এক বর্ষার সন্ধ্যায়, কাল্পনিক কিংবা সত্যিকার কোনো গ্রামের মাঠে, যখন সাদা পর্দায় আবার আলো জ্বলে ওঠে—মনে হয় সিনেমা ফেরিওয়ালাটি খুব দূরে যাননি। তিনি এখনও বাংলাদেশের পথ ধরে হাঁটছেন। কাঁধে তাঁর সিনেমা। পর্দায় আমাদেরই মুখ।

সর্বশেষ