আপনার পরিচিত কোনো বন্ধু বা আত্মীয়ের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে হঠাৎ একটি মেসেজ এল—”আমি বিপদে পড়েছি, জরুরি কিছু টাকা পাঠাতে পারবি?” অথবা, “ভুল করে তোর নম্বরে একটি ৬-ডিজিটের কোড চলে গেছে, ওটা একটু দে তো।”
আপনি হয়তো সরল বিশ্বাসে কোডটি দিয়ে দিলেন বা টাকা পাঠিয়েও দিলেন। কিছুক্ষণ পর জানতে পারলেন, আপনার সেই আত্মীয়ের হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টটি আর তার নিয়ন্ত্রণে নেই। স্ক্যামাররা তার অ্যাকাউন্টের দখল নিয়ে পরিচিতদের কাছে এমন ফাঁদ পাতছে।
বর্তমানে এটি অত্যন্ত পরিচিত একটি সাইবার প্রতারণা। অনেকেই বুঝতে পারেন না, ফোন নিজের হাতে থাকা সত্ত্বেও কীভাবে অন্য কেউ হোয়াটসঅ্যাপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিচ্ছে। অ্যাকাউন্টের এমন অননুমোদিত ব্যবহার ঠেকানো এবং সামগ্রিক WhatsApp security নিশ্চিত করা আসলে কঠিন কিছু নয়। কীভাবে ভেরিফিকেশন কোড ও লিংকড ডিভাইস ফিচারের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেকে নিরাপদ রাখবেন, চলুন তা জেনে নিই।
স্ক্যামাররা কীভাবে আপনার WhatsApp-এর নিয়ন্ত্রণ নেয়?
প্রযুক্তিগত হ্যাকিংয়ের চেয়ে স্ক্যামাররা মূলত ব্যবহারকারীদের সাধারণ ভুলের সুযোগ বেশি নেয়। তারা প্রধানত দুটি উপায়ে অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নেয়:
১. ভেরিফিকেশন কোড হাতিয়ে নেওয়া
স্ক্যামাররা অন্য কোনো ফোনে আপনার নম্বর দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ খোলার চেষ্টা করে। নিয়ম অনুযায়ী, তখন আপনার ফোন নম্বরে একটি ৬-ডিজিটের এসএমএস কোড বা কল আসে। এরপর স্ক্যামাররা পরিচিত কারও ছদ্মবেশে বা কাস্টমার কেয়ারের ভুয়া পরিচয়ে আপনার কাছ থেকে সেই কোডটি চেয়ে নেয়। আপনি কোডটি বলা মাত্রই আপনার ফোন থেকে হোয়াটসঅ্যাপ লগআউট হয়ে যায় এবং অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে চলে যায়।
২. লিংকড ডিভাইসের অপব্যবহার
হোয়াটসঅ্যাপের ‘লিংকড ডিভাইস’ ফিচারের মাধ্যমে মূল ফোনের ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়াই কম্পিউটার বা অন্য ফোনে হোয়াটসঅ্যাপ চালানো যায়। স্ক্যামাররা কোনোভাবে কয়েক সেকেন্ডের জন্য আপনার আনলক করা ফোন হাতে পেলে, কিউআর কোড স্ক্যান করে তাদের ডিভাইসে আপনার অ্যাকাউন্ট যুক্ত করে নেয়। এরপর থেকে আপনার সব ব্যক্তিগত মেসেজ তারা নীরবে পড়তে পারে এবং আপনার নাম ব্যবহার করে অন্যদের মেসেজও পাঠাতে পারে।
আরও পড়ুন: Phishing Message চেনার ১২টি লক্ষণ: SMS, Email ও Messenger-এর উদাহরণ
অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত রাখতে ৩টি জরুরি পদক্ষেপ
কোনো বাড়তি অ্যাপ বা সফটওয়্যার ছাড়াই হোয়াটসঅ্যাপের ভেতরের সেটিংস পরিবর্তন করে অ্যাকাউন্ট সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখা সম্ভব।
১. Two-Step Verification চালু করুন

এটি হোয়াটসঅ্যাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা স্তর। এটি চালু থাকলে, নতুন কোনো ডিভাইসে আপনার নম্বর দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ লগইন করতে চাইলে শুধু এসএমএস কোড দিলেই হবে না, একটি নিজস্ব ৬-ডিজিটের পিন নম্বরও দিতে হবে।
লগইন পিন সেট করতে হোয়াটসঅ্যাপের ডানদিকের ওপরের থ্রি-ডট মেনু থেকে Settings-এ যান (আইফোনের ক্ষেত্রে নিচের ডানদিকের Settings আইকনে ট্যাপ করুন)। এরপর Account থেকে Two-step verification নির্বাচন করে তা Turn On বা Enable করুন। এখানে আপনার পছন্দমতো একটি ৬-ডিজিটের পিন দিন।
পিন দেওয়ার পর অবশ্যই একটি সচল ইমেইল ঠিকানা যুক্ত করবেন। ভবিষ্যতে পিন ভুলে গেলে এই ইমেইলের মাধ্যমেই অ্যাকাউন্ট উদ্ধার করতে হবে, তাই এই ধাপটি এড়িয়ে যাবেন না। পিনটি যাতে ভুলে না যান, সেজন্য হোয়াটসঅ্যাপ মাঝে মাঝেই অ্যাপ খোলার সময় আপনার কাছে এই পিন জানতে চাইবে।
২. Linked Devices নিয়মিত পরীক্ষা করুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ অন্য কোনো কম্পিউটার বা ফোনে গোপনে কেউ দেখছে কি না, তা এক নিমিষেই যাচাই করা যায়।
হোয়াটসঅ্যাপের থ্রি-ডট মেনু বা সেটিংস থেকে Linked devices অপশনে যান। এখানে একটি তালিকা দেখতে পাবেন। যদি সেখানে এমন কোনো ব্রাউজার (যেমন: Google Chrome) বা ডিভাইসের নাম থাকে যা আপনি নিজে যুক্ত করেননি, তবে বুঝতে হবে অন্য কেউ আপনার অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছে। সাথে সাথে অপরিচিত সেই ডিভাইসটির নামের ওপর ট্যাপ করে Log Out করে দিন। এতে অননুমোদিত ডিভাইস থেকে আপনার অ্যাকাউন্টটি তাৎক্ষণিক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
৩. ভেরিফিকেশন কোড কাউকে দেবেন না
আপনার সিমে আসা হোয়াটসঅ্যাপের ৬-ডিজিটের ভেরিফিকেশন কোডটি ঘরের চাবির মতো। হোয়াটসঅ্যাপ কর্তৃপক্ষ বা কাস্টমার সাপোর্ট কখনোই আপনার কাছে এই কোড জানতে চাইবে না। পরিবারের সদস্য বা ঘনিষ্ঠ বন্ধু যে কেউই মেসেজ করে কোড চাক না কেন, কোনো অবস্থাতেই তা শেয়ার করবেন না। প্রয়োজনে সরাসরি ফোন করে নিশ্চিত হোন তিনি আসলেই মেসেজ দিয়েছেন কি না।
হোয়াটসঅ্যাপ নিয়ন্ত্রণ হারালে যা করবেন
দুর্ঘটনাবশত যদি আপনি স্ক্যামারদের ফাঁদে পড়ে যান এবং অ্যাকাউন্ট থেকে লগআউট হয়ে যান, তবে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত দুটি কাজ করুন:
প্রথমত, আপনার স্মার্টফোনে হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাপটি খুলে নম্বর দিন। আপনার সিমে নতুন করে একটি এসএমএস কোড আসবে। সেই কোডটি দিয়ে লগইন করুন। আপনি লগইন করা মাত্রই স্ক্যামারের ডিভাইস থেকে আপনার অ্যাকাউন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে লগআউট হয়ে যাবে।
দ্বিতীয়ত, লগইন করার সময় যদি দেখেন হোয়াটসঅ্যাপ একটি ‘টু-স্টেপ ভেরিফিকেশন’ পিন চাইছে যা আপনি সেট করেননি (অর্থাৎ স্ক্যামার দখল নেওয়ার পর নিজের পিন সেট করে দিয়েছে), তবে অ্যাকাউন্ট উদ্ধারে আপনাকে ৭ দিন অপেক্ষা করতে হবে। চিন্তার কিছু নেই, আপনি এসএমএস কোড দিয়ে লগইন করার চেষ্টা করায় স্ক্যামারও অ্যাকাউন্ট থেকে লগআউট হয়ে গেছে। অর্থাৎ, এই ৭ দিন কেউই অ্যাকাউন্টটি ব্যবহার করতে পারবে না। ৭ দিন পর পিন ছাড়াই আপনি অ্যাকাউন্টে পুনরায় প্রবেশ করতে পারবেন।
নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ ভুল ধারণা
অনেকেই মনে করেন, ফোনে অ্যাপলক বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেওয়া থাকলে হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাক হবে না। বাস্তবে ফিঙ্গারপ্রিন্ট শুধু আপনার হাতের ফোনটিতে হোয়াটসঅ্যাপ খোলা থেকে অন্যকে বিরত রাখে। কেউ যদি আপনার নম্বরে আসা কোড পেয়ে যায়, তবে সে যেকোনো প্রান্ত থেকে নিজের ডিভাইসে আপনার হোয়াটসঅ্যাপ চালু করতে পারবে।
আরেকটি সাধারণ ভয় হলো, স্ক্যামাররা পুরোনো সব মেসেজ বা ছবি পড়ে ফেলবে। হোয়াটসঅ্যাপ যেহেতু ‘এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপ্টেড’, তাই কেউ অন্য ফোনে আপনার নম্বর দিয়ে নতুন করে লগইন করলে সে শুধু নতুন মেসেজগুলোই দেখতে পাবে। তবে, কেউ যদি আপনার ফোন হাতে নিয়ে ‘লিংকড ডিভাইস’-এর মাধ্যমে যুক্ত হয়, কেবল তখনই তারা আপনার সাম্প্রতিক চ্যাট হিস্ট্রি দেখতে পায়।
আজকের করণীয়
পড়া শেষে এখনই আপনার হোয়াটসঅ্যাপ খুলুন। ‘Two-step verification’ চালু আছে কি না তা নিশ্চিত করুন। এরপর ‘Linked devices’ অপশনে গিয়ে চেক করুন কোনো অচেনা ডিভাইস যুক্ত আছে কি না। আপনার ডিজিটাল জীবনের নিরাপত্তা অনেকাংশেই নির্ভর করে এই ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাসগুলোর ওপর।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
হোয়াটসঅ্যাপ কি নিজে থেকে কখনো ভেরিফিকেশন কোড বা পিন পাঠায়?
না। আপনি নিজে থেকে নতুন কোনো ডিভাইসে লগইন করার চেষ্টা না করলে হোয়াটসঅ্যাপ কখনো নিজে থেকে ভেরিফিকেশন কোড পাঠায় না। আপনি চেষ্টা না করার পরও যদি হঠাৎ কোনো কোড আসে, তবে তা সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলুন এবং কাউকে জানাবেন না।
ফোন হারিয়ে গেলে হোয়াটসঅ্যাপ কীভাবে নিরাপদ রাখব?
ফোন হারিয়ে গেলে দ্রুত আপনার মোবাইল অপারেটরের (সিম কোম্পানির) সাথে যোগাযোগ করে সিমটি ব্লক করুন এবং একই নম্বরে নতুন সিম তুলে নিন। নতুন সিমে হোয়াটসঅ্যাপ লগইন করলে হারানো ফোনের হোয়াটসঅ্যাপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।
কেউ ব্লক করার পরও কি আমার হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাক করতে পারে?
কাউকে ব্লক করলে সে শুধু আপনাকে মেসেজ বা কল করতে পারবে না। কিন্তু অ্যাকাউন্টের দখল নেওয়া হয় অন্য ডিভাইসে নম্বর দিয়ে লগইন করার মাধ্যমে। তাই কাউকে ব্লক করার সাথে অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়া বা না হওয়ার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।

