ক্যালেন্ডারের প্রতিটি দিনই শত শত বছরের পুরোনো স্মৃতির ভার বহন করে চলে। এমন সব মুহূর্ত আসে, যখন কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার আমাদের মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি চিরতরে বদলে দেয়, কোনো রাজনৈতিক সংঘাত নতুন করে আঁকে জাতীয় সীমানা, আবার কোনো প্রতিভাবান শিল্পী পৃথিবীতে আসেন বা চিরবিদায় নেন। ইতিহাসের পাতায় ২২ অক্টোবর ঠিক তেমনই একটি বিশেষ দিন। আধুনিক ভূ-রাজনীতি, বিজ্ঞান, এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে এই দিনটির প্রভাব সত্যিই সুদূরপ্রসারী।
ভারতের যুগান্তকারী চন্দ্রযান-১ এর উৎক্ষেপণ থেকে শুরু করে স্নায়ুযুদ্ধের চরম উত্তেজনায় ঘেরা কিউবার মিসাইল সংকট, কিংবা বাংলার রূপকার কবি জীবনানন্দ দাশের মর্মান্তিক বিদায় থেকে মাও সে তুং-এর ঐতিহাসিক ‘লং মার্চ’-এর সমাপ্তি—মানব সভ্যতার গতিপথ নির্ধারণে ২২ অক্টোবরের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
নিম্নে আমাদের বাংলা, বৃহত্তর ভারতীয় উপমহাদেশ এবং বিশ্বমঞ্চে ২২ অক্টোবরের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর এক বিশদ ও বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরা হলো।
বাংলা ও দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশ
সাংস্কৃতিক পালাবদল, বৈজ্ঞানিক অর্জন এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাংলা অঞ্চল এবং বৃহত্তর ভারতীয় উপমহাদেশ ২২ অক্টোবরে বেশ কিছু যুগান্তকারী ঘটনার সাক্ষী হয়েছে।
ঐতিহাসিক মাইলফলক ও সংঘাত
২০০৮ – চন্দ্রযান-১ এর উৎক্ষেপণ: ভারতের প্রথম চন্দ্রাভিযান
২০০৮ সালের ২২ অক্টোবর, সকাল ০৬:২২ মিনিটে ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ISRO) অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার থেকে PSLV-C11 রকেটের মাধ্যমে ‘চন্দ্রযান-১’ মহাকাশে উৎক্ষেপণ করে। ১,৩৮০ কেজি ওজনের এই মহাকাশযানে মোট ১১টি বৈজ্ঞানিক পে-লোড ছিল, যার মধ্যে ৫টি ভারতের নিজস্ব এবং ৬টি নাসা (NASA) ও ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির (ESA) মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার তৈরি।
এই অভিযানের সবচেয়ে ঐতিহাসিক মুহূর্তটি আসে যখন চন্দ্রযান-১ থেকে মুন ইমপ্যাক্ট প্রোব (MIP) চাঁদের দক্ষিণ মেরুর শ্যাকলটন ক্রেটারের কাছে অবতরণ করে। মহাকাশযানে থাকা নাসার মুন মিনারেলজি ম্যাপার চাঁদের মেরু অঞ্চলের মাটিতে পানির অণু (H₂O) এবং হাইড্রোক্সিল (OH) এর উপস্থিতি নিশ্চিত করে। এই যুগান্তকারী আবিষ্কার বিশ্বব্যাপী চন্দ্র-গবেষণার মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং প্রমাণ করে যে, ভবিষ্যতে চাঁদে মানুষের বসতি স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদের অস্তিত্ব সেখানে রয়েছে। এই সাফল্যের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়া গভীর মহাকাশ গবেষণায় একটি পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
১৯৪৭ – কাশ্মীরে আক্রমণ (অপারেশন গুলমার্গ)
১৯৪৭ সালের ২২ অক্টোবর, পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ থেকে সশস্ত্র পশতুন উপজাতিরা ‘অপারেশন গুলমার্গ’-এর অধীনে তৎকালীন দেশীয় রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীরে সীমান্ত অতিক্রম করে আক্রমণ চালায়। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর মদদপুষ্ট এই বাহিনী ঝিলম নদীর উপত্যকা ধরে মুজাফফরাবাদ এবং বারামুলার দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে থাকে।
তীব্র সামরিক হুমকির মুখে পড়ে মহারাজা হরি সিং অবিলম্বে ভারত সরকারের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন এবং ২৬ অক্টোবর ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন বা অন্তর্ভুক্তির চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এই ঘটনাটি প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়, যার ফলে কাশ্মীর ‘লাইন অফ কন্ট্রোল’ (LoC) বরাবর বিভক্ত হয়ে যায়। এই ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত আজও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান একটি উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু।
বাংলার প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বদের জন্ম
মাসুম আজিজ (১৯৫৩ – ২০২২)
পাবনায় জন্মগ্রহণকারী মাসুম আজিজ ছিলেন বাংলাদেশের একজন অত্যন্ত নন্দিত মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অভিনেতা এবং নাট্যকার। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ‘গণ নাট্য দল’-এর মাধ্যমে তার অভিনয়ের হাতেখড়ি। চার দশকের দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ৪০০টিরও বেশি টেলিভিশন নাটক এবং ‘ঘানি’ (২০০৬)-এর মতো প্রশংসিত চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। গ্রামীণ জীবন, সামাজিক অবিচার এবং মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামকে তিনি নিখুঁতভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলতেন। বাংলাদেশি সংস্কৃতিতে তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২২ সালে তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’ প্রদান করা হয়।
আলম খান (১৯৪৩ – ২০২২)
আলম খান ছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সঙ্গীতের এক অবিসংবাদিত কিংবদন্তি। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি সুরের মায়াজালে শ্রোতাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছিলেন। ১৯৭০ সালে ‘কাঁচ কাটা হীরা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে স্বাধীন সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ ঘটে। ‘ওরে নীল দরিয়া’, ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’, এবং ‘ডাকিয়াছেন দয়াল আমারে’-এর মতো কালজয়ী গানগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে। অর্কেস্ট্রার সাথে লোকজ সুরের অসাধারণ মিশ্রণ ঘটানোর জাদুকর এই মানুষটি শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে সাতবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছিলেন।
স্বামী রাম তীর্থ (১৮৭৩ – ১৯০৬)
গুজরাওয়ালায় জন্মগ্রহণকারী স্বামী রাম তীর্থ ছিলেন ব্যবহারিক বেদান্ত দর্শনের একজন প্রখ্যাত শিক্ষক এবং দার্শনিক। ফরম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজে গণিতের মেধাবী অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও, পরবর্তীতে তিনি বিশ্বব্যাপী বেদান্ত দর্শন প্রচারের উদ্দেশ্যে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। ১৯০২ থেকে ১৯০৪ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান সফরকালে তিনি আত্মোপলব্ধির সাথে সমাজ সংস্কার, দেশপ্রেম ও শিক্ষার গভীর সম্পর্ক নিয়ে বক্তৃতা দেন, যা বিংশ শতাব্দীর শুরুতে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক উপনিবেশবিরোধী চিন্তাবিদকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
বাংলার নক্ষত্রপতন ও যুগাবসান
জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯ – ১৯৫৪)
১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর বাংলা সাহিত্য জগত তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নক্ষত্রকে হারায়। কলকাতার দেশপ্রিয় পার্কের কাছে ট্রাম দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার আট দিন পর শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন কবি, ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক জীবনানন্দ দাশ।
‘রূপসী বাংলার কবি’ হিসেবে পরিচিত জীবনানন্দ তার জীবদ্দশায় বরিশাল, দিল্লি এবং কলকাতায় শিক্ষকতা করলেও সেভাবে প্রাপ্য স্বীকৃতি পাননি। তবে মৃত্যুর পর তার কবিতা বাংলা সাহিত্যে এক অসীম মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়। বনলতা সেন, ধূসর পাণ্ডুলিপি, মহাপৃথিবী, এবং রূপসী বাংলা-এর মতো কালজয়ী সৃষ্টিগুলো বাংলা সাহিত্যে পরাবাস্তবতা, পরিবেশগত চিত্রকল্প, জটিল ছন্দকাঠামো এবং গভীর অস্তিত্ববাদী দর্শনের সূচনা করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলামের পর তাকে বাংলা কবিতার সবচেয়ে প্রভাবশালী আধুনিক কণ্ঠস্বর হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
খাজা নাজিমুদ্দিন (১৮৯৪ – ১৯৬৪)
ঢাকার নবাব পরিবারের সন্তান খাজা নাজিমুদ্দিন ছিলেন ব্রিটিশ ভারত ও পাকিস্তানের একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি বাংলার প্রধানমন্ত্রী (১৯৪৩–১৯৪৫), ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পূর্ব বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী, পাকিস্তানের দ্বিতীয় গভর্নর-জেনারেল (১৯৪৮–১৯ ৫১), এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী (১৯৫১–১৯৫৩) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসভায় নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করেন যে, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। তার এই ঘোষণায় পূর্ব বাংলার ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী সমাজ তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ে, যা ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করে এবং ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির রক্তক্ষয়ী ঘটনার জন্ম দেয়। এই আন্দোলনই পরবর্তীতে বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল।
মহারাজা দুলীপ সিং (১৮৩৮ – ১৮৯৩)
মহারাজা রঞ্জিত সিংয়ের কনিষ্ঠ পুত্র দুলীপ সিং ১৮৪৩ সালে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে শিখ সাম্রাজ্যের মহারাজা হিসেবে ঘোষিত হন। ১৮৪৯ সালে দ্বিতীয় ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধে শিখ রাজ্যের পতনের পর, দশ বছর বয়সী এই রাজাকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ক্ষমতাচ্যুত করে। তাকে বিখ্যাত ‘কোহিনূর’ হীরা রানী ভিক্টোরিয়ার হাতে তুলে দিতে বাধ্য করা হয় এবং ইংল্যান্ডে নির্বাসনে পাঠানো হয়। জীবনের শেষভাগে এসে তিনি নিজের সার্বভৌম অধিকার ফিরে পেতে ভারতে ফেরার ব্যর্থ চেষ্টা করেন। অবশেষে ১৮৯৩ সালের ২২ অক্টোবর প্যারিসের একটি হোটেলে সম্পূর্ণ নিঃস্ব অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
আন্তর্জাতিক দিবস ও উদযাপন

বিশ্বজুড়ে ২২ অক্টোবর স্বাস্থ্য সচেতনতা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর জন্য পালিত হয়:
-
আন্তর্জাতিক তোতলামি সচেতনতা দিবস (ISAD): ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই দিবসটি বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭ কোটি মানুষের কথা বলার স্বাভাবিক সাবলীলতার সমস্যা (স্টাটারিং বা তোতলামি) সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করে। এটি সমাজে বৈষম্য কমানো এবং সহায়তার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে প্রতি বছর পালিত হয়।
-
লাওসের স্বাধীনতা দিবস (১৯৫৩): ১৯৫৩ সালের এই দিনে ফ্রান্স প্যারিসে ফ্রাঙ্কো-লাও চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার মাধ্যমে ছয় দশকের ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে এবং লাওস একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
-
ক্লিন আপ দ্য আর্থ ডে: এটি একটি বৈশ্বিক পরিবেশগত উদ্যোগ, যা স্থানীয় পর্যায়ে বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, নদী পরিষ্কার এবং প্লাস্টিক দূষণ কমানোর জন্য মানুষকে উৎসাহিত করে।
-
আন্তর্জাতিক ক্যাপস লক দিবস: ২০০০ সালে সফটওয়্যার ডেভেলপার ডেরেক আর্নল্ড সম্পূর্ণ মজার ছলে এই দিবসের প্রচলন করেন, যা ইন্টারনেটে সব সময় বড় হাতের অক্ষরে (CAPS LOCK) লেখার অদ্ভুত অভ্যাসকে ব্যঙ্গ করে।
বিশ্ব ইতিহাসের পাতা থেকে
দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের প্রতিটি মহাদেশেই ২২ অক্টোবর এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে যা মানব ইতিহাসের ধারা বদলে দিয়েছে।
আমেরিকা
১৯৬২ – কিউবার মিসাইল সংকট: জাতির উদ্দেশে কেনেডির ভাষণ
১৯৬২ সালের ২২ অক্টোবর, সন্ধ্যা ৭টায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি টেলিভিশনে দেশবাসীর উদ্দেশে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তিনি প্রকাশ করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের U-2 নজরদারি বিমান কিউবায় সোভিয়েত ইউনিয়নের পারমাণবিক মিসাইল ঘাঁটির সন্ধান পেয়েছে। কেনেডি অবিলম্বে কিউবার চারপাশে নৌ-অবরোধ বা ‘কোয়ারেন্টাইন’ ঘোষণা করেন।
এই ভাষণের মাধ্যমেই বিশ্ববাসী প্রথমবারের মতো ১৩ দিন ব্যাপী কিউবার মিসাইল সংকটের কথা জানতে পারে। এই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সরাসরি পারমাণবিক যুদ্ধের একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। ছয় দিন পর সোভিয়েত প্রিমিয়ার নিকিতা ক্রুশ্চেভ কিউবা থেকে মিসাইল সরিয়ে নিতে সম্মত হলে বিশ্ব এক চরম ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা পায়।
১৮৭৯ – এডিসনের বৈদ্যুতিক বাতির সফল পরীক্ষা
নিউ জার্সির মেনলো পার্কে উদ্ভাবক টমাস আলভা এডিসন প্রথমবারের মতো একটি কার্বনাইজড সুতির সুতোর ফিলামেন্ট ব্যবহার করে ইনক্যান্ডেসেন্ট বৈদ্যুতিক বাতির একটি সফল পরীক্ষা চালান। উচ্চ-ভ্যাকুয়াম কাঁচের বাল্বের ভেতরের এই ফিলামেন্টটি পুড়ে যাওয়ার আগে একটানা সাড়ে ১৩ ঘণ্টা আলো দিয়েছিল। এই যুগান্তকারী পরীক্ষা প্রমাণ করে যে বৈদ্যুতিক বাতি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য এবং এটি আধুনিক শহরগুলোতে বিদ্যুৎ গ্রিড স্থাপনের পথ প্রশস্ত করে।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য মার্কিন ঘটনা:
-
১৭৪৬: কলেজ অফ নিউ জার্সি রাজকীয় চার্টার লাভ করে, যা পরবর্তীতে বিশ্ববিখ্যাত ‘প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে পরিচিতি পায়।
-
১৮৩৬: মেক্সিকো থেকে আলাদা হওয়ার পর স্যাম হিউস্টন স্বাধীন টেক্সাস প্রজাতন্ত্রের প্রথম সাংবিধানিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন।
-
১৯৭৯: ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছালে তেহরানে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, যা ৪ নভেম্বরের ঐতিহাসিক ‘ইরান জিম্মি সংকট’-এর জন্ম দেয়।
রাশিয়া ও ইউরেশিয়া
১৭২১ – রুশ সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা
গ্রেট নর্দান ওয়ার (১৭০০–১৭২১) যুদ্ধে সুইডিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিজয়ের পর জারের গভর্নিং সেনেট প্রথম পিটারকে (পিটার দ্য গ্রেট) ‘সমগ্র রাশিয়ার সম্রাট’ হিসেবে ঘোষণা করে। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে একটি আঞ্চলিক জারশাসিত রাজ্য থেকে ইউরোপের অন্যতম প্রধান পরাশক্তিতে পরিণত হয়।
১৯৭৫ – ভেনেরা ৯ কর্তৃক শুক্র গ্রহের প্রথম পৃষ্ঠচিত্র প্রেরণ
সোভিয়েত ইউনিয়নের মানববিহীন মহাকাশযান ‘ভেনেরা ৯’ শুক্র গ্রহের কক্ষপথে প্রবেশ করে এবং এর ল্যান্ডার গ্রহটির অত্যন্ত বৈরী পৃষ্ঠে সফলভাবে অবতরণ করে। শুক্রের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ছিল ৪৮৫° সেলসিয়াস এবং বায়ুমণ্ডলীয় চাপ ছিল পৃথিবীর চেয়ে ৯০ গুণ বেশি! এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ভেনেরা ৯ প্রথমবারের মতো অন্য কোনো গ্রহের পৃষ্ঠ থেকে সরাসরি সাদা-কালো ছবি এবং বৈজ্ঞানিক তথ্য পাঠাতে সক্ষম হয়।
এশিয়া
১৯৩৬ – মাও সে তুং-এর ‘লং মার্চ’-এর সমাপ্তি
চিয়াং কাই-শেক-এর নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (CCP) রেড আর্মি প্রায় ৯,৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এক দুর্গম ও বিপজ্জনক পথ পাড়ি দেয়। পর্বত, জলাভূমি আর নদী পেরিয়ে এই ঐতিহাসিক পিছু হটার নাম ছিল ‘লং মার্চ’। ১৯৩৬ সালের ২২ অক্টোবর শানসি প্রদেশে বিভিন্ন ফ্রন্ট আর্মির মিলনের মাধ্যমে এই মহা-যাত্রার সমাপ্তি ঘটে। এটি মাও সে তুং-কে দলের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
১৬৩৩ – লিয়াওলুও উপসাগরের যুদ্ধ
অ্যাডমিরাল ঝেং ঝিলং-এর নেতৃত্বে মিং রাজবংশের নৌবহর ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (VOC) এবং জলদস্যুদের একটি বিশাল যৌথ বহরকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে। এই জয়ের ফলে তাইওয়ান প্রণালী এবং দক্ষিণ চীন সাগরের বাণিজ্য রুটগুলোতে চীনের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
যুক্তরাজ্য ও ইউরোপ
১৮৮৪ – গ্রিনিচ মানমন্দিরকে ‘প্রাইম মেরিডিয়ান’ হিসেবে স্বীকৃতি
ওয়াশিংটন ডি.সি.-তে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মেরিডিয়ান সম্মেলনে ২৫টি দেশের প্রতিনিধিরা লন্ডনের গ্রিনিচ মানমন্দিরকে বিশ্বের প্রাইম মেরিডিয়ান (০° দ্রাঘিমাংশ) হিসেবে গ্রহণ করার পক্ষে ভোট দেন। এর মাধ্যমেই গ্লোবাল টাইম জোন বা গ্রিনিচ মান সময়ের (GMT) আধুনিক মানদণ্ড স্থাপিত হয়।
১৭৯৭ – বিশ্বের প্রথম হাই-অ্যালটিটিউড প্যারাসুট জাম্প
ফরাসি বেলুনবিদ আন্দ্রে-জ্যাক গার্নেরিন প্যারিসের প্রায় ৩,২০০ ফুট ওপর থেকে হাইড্রোজেন বেলুন থেকে লাফ দিয়ে বিশ্বের প্রথম সফল প্যারাসুট জাম্প সম্পন্ন করেন।
১৯৮১ – ফরাসি TGV ট্রেনের আত্মপ্রকাশ
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁ প্যারিস থেকে লিয়নের মধ্যে ২৬০ কিমি/ঘন্টা বেগে চলতে সক্ষম ‘টিজিভি’ (Train à Grande Vitesse) ট্রেনের উদ্বোধন করেন, যা গোটা ইউরোপের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে।
বিখ্যাত জন্ম ও মৃত্যু
এই দিনে জন্ম ও মৃত্যু হয়েছে শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান এবং রাজনীতির বহু কিংবদন্তির।
স্মরণীয় জন্মদিন
-
ফ্রাঞ্জ লিজট (১৮১১ – ১৮৮৬): হাঙ্গেরিয়ান রোমান্টিক সুরকার এবং সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পিয়ানোবাদক।
-
ইভান বুনিন (১৮৭০ – ১৯৫৩): সাহিত্যে প্রথম রুশ নোবেল বিজয়ী (১৯৩৩)। ‘দ্য ভিলেজ’ এবং ‘ডার্ক অ্যাভিনিউস’ এর মতো ক্ল্যাসিকের স্রষ্টা।
-
ক্লিনটন ডেভিসন (১৮৮১ – ১৯৫৮): মার্কিন পদার্থবিদ, যিনি ইলেকট্রনের তরঙ্গ ধর্ম প্রমাণ করার জন্য ১৯৩৭ সালে নোবেল পুরস্কার পান, যা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ভিত্তি মজবুত করে।
-
রবার্ট কাপা (১৯১৩ – ১৯৫৪): কিংবদন্তি যুদ্ধ-আলোকচিত্রী যিনি স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধ থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (নরম্যান্ডি ল্যান্ডিং) ছবি তুলেছেন। তিনি ম্যাগনাম ফটোজ-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা।
-
আর্সেন ওয়েঙ্গার (১৯৪৯ – বর্তমান): ফরাসি ফুটবল ম্যানেজার, যিনি আর্সেনাল ক্লাবকে ২০০৩-০৪ সালের সেই বিখ্যাত অপরাজিত “ইনভিন্সিবলস” সিজনসহ আধুনিক ইংলিশ ফুটবলের শীর্ষে নিয়ে গিয়েছিলেন।
প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বদের মৃত্যু
-
চার্লস মার্টেল (৬৮৬ – ৭৪১): ফ্রাঙ্কিশ সেনাপতি, যিনি ৭৩২ সালে ট্যুরসের যুদ্ধে উমাইয়া খিলাফতের বাহিনীকে পরাজিত করে পশ্চিম ইউরোপে মুসলিম সাম্রাজ্যের বিস্তার ঠেকিয়েছিলেন।
-
পল সেজান (১৮৩৯ – ১৯০৬): ফরাসি পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্ট চিত্রশিল্পী, যার কাজ আধুনিক কিউবিজম শিল্পের ভিত্তি তৈরি করেছিল।
-
পাবলো কাসালস (১৮৭৬ – ১৯৭৩): বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ সেলোবাদক (Cellist), যিনি জোহান সেবাস্তিয়ান বাখের হারিয়ে যাওয়া সেলো স্যুটগুলোকে নতুন করে প্রাণ দিয়েছিলেন।
“আপনি কি জানেন?” — ঐতিহাসিক ট্রিভিয়া
-
মেরিডিয়ানের ভোটে সবাই রাজি ছিল না! ১৮৮৪ সালে গ্রিনিচকে যখন প্রাইম মেরিডিয়ান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়, তখন ডোমিনিকান রিপাবলিক এর বিপক্ষে ভোট দেয় এবং ফ্রান্স ও ব্রাজিল ভোটদানে বিরত থাকে। ফ্রান্স ১৯১১ সাল পর্যন্ত তাদের মানচিত্রে নিজেদের ‘প্যারিস মেরিডিয়ান’ ব্যবহার চালিয়ে গিয়েছিল।
-
প্রথম প্যারাসুটে কোনো ‘সেফটি ভেন্ট’ ছিল না! আন্দ্রে-জ্যাক গার্নেরিন যখন ৩,২০০ ফুট থেকে প্যারাসুটে লাফ দেন, তখন ছাতার মতো সেই ক্যানভাসের ওপরে বাতাস বের হওয়ার কোনো ছিদ্র ছিল না। ফলে প্যারাসুটটি বিপজ্জনকভাবে এপাশ-ওপাশ দুলতে থাকে এবং নামার আগে তিনি প্রচণ্ড মোশন সিকনেসে ভুগেছিলেন।
-
দ্য গ্রেট ডিসঅ্যাপয়েন্টমেন্ট: ১৮৪৪ সালের ২২ অক্টোবর, দশ হাজারেরও বেশি মিলারাইট (মার্কিন ধর্মপ্রচারক উইলিয়াম মিলারের অনুসারী) যিশু খ্রিস্টের দ্বিতীয় আগমনের অপেক্ষায় পাহাড়ের চূড়ায় জড়ো হয়েছিল। পরের দিন ভোর পর্যন্ত কিছুই না ঘটায় ইতিহাসে দিনটি “দ্য গ্রেট ডিসঅ্যাপয়েন্টমেন্ট” বা চরম হতাশার দিন হিসেবে পরিচিতি পায়।
শেষ কথা
ইতিহাসের এক বিস্ময়কর আয়না হলো ২২ অক্টোবর। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের অদম্য উচ্চাকাঙ্ক্ষা, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে এই দিনটিতে। চন্দ্রযান-১ এর চাঁদে পানির সন্ধান পাওয়া, গ্রিনিচ মান সময়কে বৈশ্বিক মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, কিউবার মিসাইল সংকটের সেই শ্বাসরুদ্ধকর পারমাণবিক কূটনীতি, কিংবা বাংলার রূপসী কবি জীবনানন্দ দাশের অনন্তলোকে যাত্রা—সবকিছু মিলিয়ে এই তারিখটি মানব সভ্যতার পাতায় এক অমোচনীয় ছাপ রেখে গেছে। এই অতীতের দিকে ফিরে তাকালে আমরা বুঝতে পারি, বিশ্বের ইতিহাস আসলে কতটা গভীরভাবে একে অপরের সাথে সংযুক্ত, যা আজও আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতকে প্রতিনিয়ত রূপ দিয়ে চলেছে।

