একই অর্ডারের তথ্য তিন জায়গায় লিখতে হচ্ছে। গ্রাহক টাকা দিয়েছেন, কিন্তু হিসাবের ফাইলে সেটি যোগ হয়নি। বিক্রয়কর্মী ছুটিতে থাকায় অন্য কেউ জানেন না, কোন গ্রাহকের সঙ্গে আবার যোগাযোগ করার কথা ছিল। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সফটওয়্যার কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ। কঠিন হলো, কোন সফটওয়্যার কিনলে সমস্যাটি সত্যিই মিটবে, তা বোঝা।
ছোট ব্যবসায় এই জায়গাতেই ভুল হওয়ার আশঙ্কা বেশি। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অ্যাপ কেনা হয়, কিন্তু সেগুলো একসঙ্গে কাজ করে না। কর্মীরা পুরোনো পদ্ধতিতেই তথ্য রাখতে থাকেন। মাস শেষে দেখা যায়, সফটওয়্যারের বিল বেড়েছে, কাজের জটিলতা কমেনি।
ছোট ব্যবসার সফটওয়্যার সমন্বয় পরিকল্পনার উদ্দেশ্য এই পরিস্থিতি এড়ানো। হিসাবরক্ষণ, গ্রাহকের তথ্য, কর্মীদের দায়িত্ব ও যোগাযোগের জন্য এমন ব্যবস্থা বেছে নিতে হবে, যা ব্যবসার দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে মানানসই। বড় প্রতিষ্ঠানের ব্যবহৃত সব সফটওয়্যার ছোট প্রতিষ্ঠানেরও লাগবে, এমন কোনো নিয়ম নেই।
বরং ভালো শুরু হতে পারে অল্প কয়েকটি সফটওয়্যার দিয়ে। কোন কাজটি আগে গুছিয়ে নেওয়া দরকার, কোথায় বিনামূল্যের ব্যবস্থা যথেষ্ট এবং কোন সুবিধার জন্য নিয়মিত টাকা দেওয়া যুক্তিসংগত—সেই সিদ্ধান্তগুলোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সফটওয়্যার কেনার আগে কাজের হিসাব মিলিয়ে নিন
ব্যবসার সমস্যাটি যদি পরিষ্কার না হয়, তাহলে সফটওয়্যারের তালিকা যত বড়ই হোক, সঠিক সমাধান খুঁজে পাওয়া কঠিন। একটি অনলাইন দোকানের কথাই বিবেচনা করা যাক। ফেসবুক ও ওয়েবসাইট থেকে অর্ডার আসছে। কর্মীরা গ্রাহকের ঠিকানা আলাদা ফাইলে রাখছেন। বিক্রির হিসাব অন্য জায়গায়, পণ্যের মজুতের তথ্য আরেক জায়গায়। এখানে একটি নতুন দলীয় যোগাযোগের অ্যাপের চেয়ে অর্ডার ও মজুতের হিসাব সমন্বয় করার ব্যবস্থা বেশি জরুরি হতে পারে।
অন্যদিকে পাঁচ-ছয়জন কর্মী নিয়ে চলা একটি বিপণন সংস্থার সমস্যা আলাদা। সেখানে হয়তো হিসাব ঠিকই আছে, কিন্তু কোন নকশা অনুমোদিত হয়েছে, কোন লেখা প্রকাশের অপেক্ষায় কিংবা কোন কাজের দায়িত্ব কার কাছে, তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
প্রথম প্রতিষ্ঠানটির দরকার বিক্রয় ও মজুত ব্যবস্থাপনায় উন্নতি। দ্বিতীয়টির প্রয়োজন হতে পারে কাজ পরিচালনার একটি পরিষ্কার ব্যবস্থা। কয়েক কার্যদিবস ধরে প্রতিষ্ঠানের কাজ দেখলে এসব পার্থক্য বোঝা যায়। কোথায় একই তথ্য বারবার লিখতে হচ্ছে, কোথায় ভুল হচ্ছে এবং কোন কাজ শেষ হতে অযথা সময় লাগছে, তা চিহ্নিত করুন।
আরেকটি বিষয়ও দেখুন। সমস্যাটি কি সফটওয়্যার না থাকার কারণে, নাকি বিদ্যমান সফটওয়্যার ঠিকভাবে ব্যবহার না করার কারণে? আগে থেকেই কোনো অ্যাপে কাজের তালিকা রাখা থাকলে সেটি ব্যবহার না করে আরেকটি অ্যাপ কেনার যুক্তি নেই। কর্মীদের কাজের পদ্ধতি না বদলালে নতুন সফটওয়্যারেও একই বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।
হিসাবরক্ষণ ও বিক্রয়ের কাজ আগে গুছিয়ে নেওয়া ভালো
কোনো ব্যবসায় নিয়মিত লেনদেন হলে আয়-ব্যয়, পাওনা ও সরবরাহকারীর বিলের হিসাব ঠিক রাখা জরুরি। সব প্রতিষ্ঠানের জন্য অবশ্য শুরুতেই বিশেষায়িত হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যার প্রয়োজন হয় না। লেনদেন কম থাকলে সাধারণ হিসাবের সারণি দিয়েও কাজ চালানো সম্ভব। কিন্তু একাধিক কর্মী হিসাব পরিচালনা করলে, বিক্রির পরিমাণ বাড়লে কিংবা নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রয়োজন হলে এই পদ্ধতি সামলানো কঠিন হতে পারে।
এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্য জোহো বুকস একটি বিকল্প। এতে চালান তৈরি, খরচের হিসাব রাখা, গ্রাহকের লেনদেন দেখা এবং আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির সুবিধা রয়েছে। এর ভারতীয় সংস্করণে পণ্য ও সেবা করের (জিএসটি) হিসাব, করসংক্রান্ত প্রতিবেদন ও বৈদ্যুতিন চালান ব্যবস্থাপনার সুবিধাও পাওয়া যায়। তবে সব সুবিধা প্রতিটি মূল্য পরিকল্পনায় নেই। দেশভেদে ব্যাংক সংযোগ ও অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থারও পার্থক্য রয়েছে।
এখানে একটি বিষয় উপেক্ষা করা ঠিক হবে না। বিদেশি সফটওয়্যারে করের হিসাব করার সুবিধা আছে মানেই সেটি বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠানের মূল্য সংযোজন কর ও চালানসংক্রান্ত প্রয়োজন পূরণ করবে না। স্থানীয় বিধি অনুযায়ী হিসাব রাখা যাচ্ছে কি না, তা হিসাবরক্ষকের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া ভালো। হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যার কেনার সময় আকর্ষণীয় তথ্য প্রদর্শনের চেয়ে প্রয়োজনীয় চালান, প্রতিবেদন ও তথ্য অন্য ব্যবস্থায় নেওয়ার সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
গ্রাহকের তথ্য রাখার জন্য কতটা ব্যবস্থা দরকার

অনেক ছোট ব্যবসায় গ্রাহকের নাম, ফোন নম্বর ও অর্ডারের তথ্য রাখলেই প্রাথমিক কাজ চলে। কিন্তু বিক্রির প্রস্তাব পাঠানো, পরবর্তী যোগাযোগের সময় মনে রাখা এবং কোন গ্রাহক কেনার সিদ্ধান্তের কাছাকাছি রয়েছেন, তা বুঝতে হলে আলাদা গ্রাহক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার কাজে আসতে পারে। হাবস্পটের গ্রাহক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারের বিনামূল্যের পরিকল্পনায় যোগাযোগের তথ্য, সম্ভাব্য বিক্রয় ও সংশ্লিষ্ট কাজ পরিচালনা করা যায়। এতে সর্বোচ্চ দুজন ব্যবহারকারী কাজ করতে পারেন।
তুলনামূলক সরল বিক্রয়প্রক্রিয়ার জন্য তৈরি জোহো বিগিনের বিনামূল্যের পরিকল্পনায় একজন ব্যবহারকারী ও সর্বোচ্চ ৫০০টি তথ্যসংক্রান্ত রেকর্ড সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে। এই ৫০০ রেকর্ডের সীমাকে শুধু ৫০০ জন গ্রাহকের তথ্য রাখার সুযোগ হিসেবে ভাবা ঠিক হবে না। যোগাযোগ, প্রতিষ্ঠান ও বিক্রয়সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের রেকর্ডও সীমার মধ্যে গণনা হতে পারে।
ফলে ব্যবসার কাজের ধরন অনুযায়ী বিনামূল্যের সুবিধা দ্রুত অপ্রতুল হয়ে পড়তে পারে। গ্রাহক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যার বাছাইয়ের ক্ষেত্রে উন্নত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার দীর্ঘ তালিকা দেখার চেয়ে সাধারণ কাজগুলো পরীক্ষা করা ভালো। নতুন গ্রাহকের তথ্য যোগ করা, বিক্রির পর্যায় পরিবর্তন করা কিংবা পরবর্তী যোগাযোগের দায়িত্ব দেওয়া সহজ হচ্ছে কি না দেখুন। যদি কয়েকজন কর্মী নিয়ে চলা প্রতিষ্ঠানে এসব কাজই জটিল হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য তৈরি উন্নত সুবিধাগুলো কেনার প্রয়োজন নেই।
কর্মীদের কাজ পরিচালনায় একটি ভালো পদ্ধতিই যথেষ্ট হতে পারে
প্রকল্প পরিচালনার সফটওয়্যারের প্রয়োজন সাধারণত তখন বেশি বোঝা যায়, যখন একটি কাজের সঙ্গে একাধিক কর্মী যুক্ত থাকেন। একজনের কাজ শেষ হওয়ার পর অন্যজনকে দায়িত্ব নিতে হয়। মাঝখানে অনুমোদন বা সংশোধনের প্রয়োজনও থাকতে পারে।
এ ক্ষেত্রে ট্রেলো ব্যবহার করা যায়। বোর্ড ও কার্ডের মাধ্যমে কাজ সাজানোর সুবিধা রয়েছে এতে। বিনামূল্যের পরিকল্পনায় প্রতিটি সম্মিলিত কর্মপরিসরে সর্বোচ্চ ১০ জন সহযোগী ও ১০টি বোর্ড ব্যবহার করা যায়। আসানা সফটওয়্যারেও কাজের তালিকা, বোর্ড ও ক্যালেন্ডারের সুবিধা রয়েছে। তবে এর ব্যক্তিগত বিনামূল্যের পরিকল্পনায় সর্বোচ্চ দুজন ব্যবহারকারী একসঙ্গে কাজ করতে পারেন।
কোনটি ভালো, তার উত্তর কর্মীদের কাজের ধরনেই রয়েছে। কয়েকজন কর্মী শুধু কাজের দায়িত্ব, সময়সীমা ও অগ্রগতি দেখতে চাইলে একটি সাধারণ বোর্ডভিত্তিক ব্যবস্থাই যথেষ্ট হতে পারে। কিন্তু একাধিক প্রকল্পের পারস্পরিক নির্ভরতা, অনুমোদনের ধাপ ও কর্মীদের কাজের চাপ পরিচালনা করতে হলে উন্নত সুবিধার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
এখানে আরও একটি বাস্তব সমস্যা রয়েছে। কর্মীরা যদি নতুন সফটওয়্যারে কাজের অগ্রগতি না লেখেন, তাহলে সেটি পরিচালনা করা কঠিন হবে। নির্দেশনা ইমেইলে, সংশোধন মেসেজে আর কাজের তালিকা অন্য অ্যাপে থাকলে আগের বিভ্রান্তিই থেকে যাবে। তাই অ্যাপ নির্বাচনের পাশাপাশি ঠিক করতে হবে, কাজের নির্দেশনা কোথায় দেওয়া হবে এবং অগ্রগতি কে হালনাগাদ করবেন।
ইমেইল, ফাইল ও যোগাযোগের জন্য আলাদা কত খরচ করবেন
ছোট ব্যবসায় যোগাযোগের জন্য নতুন সফটওয়্যার কেনার আগে প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত অফিস অ্যাপগুলো পরীক্ষা করা উচিত। গুগল ওয়ার্কস্পেস ব্যবসায়িক ইমেইল, নথি, অনলাইনে তথ্য সংরক্ষণ, ক্যালেন্ডার ও অনলাইন বৈঠকের সুবিধা দেয়। অন্যদিকে মাইক্রোসফট ৩৬৫-এ ব্যবসায়িক ইমেইল, ফাইল সংরক্ষণ ও যৌথভাবে কাজ করার ব্যবস্থা রয়েছে।
মাইক্রোসফট ৩৬৫-এর নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় মাইক্রোসফট টিমস অন্তর্ভুক্ত থাকে। তবে অঞ্চল ও পরিকল্পনাভেদে টিমস ছাড়া সংস্করণও পাওয়া যায়। যে প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা আগে থেকেই মাইক্রোসফট ওয়ার্ড, এক্সেল ও মাইক্রোসফটের অন্যান্য সেবা ব্যবহার করেন, সেখানে মাইক্রোসফট ৩৬৫ বিবেচনা করা যুক্তিসংগত। গুগল ডকস, শিটস ও ড্রাইভনির্ভর প্রতিষ্ঠানের জন্য গুগল ওয়ার্কস্পেস প্রয়োজন মেটাতে পারে।
আলাদা দলীয় যোগাযোগের ব্যবস্থা চাইলে স্ল্যাক একটি বিকল্প। তবে এর বিনামূল্যের পরিকল্পনায় সাম্প্রতিক ৯০ দিনের মেসেজ ও ফাইলের ইতিহাস দেখা এবং অনুসন্ধান করা যায়। ৯০ দিনের বেশি পুরোনো তথ্য বিনামূল্যের পরিকল্পনায় আড়ালে থাকতে পারে। সংরক্ষণ সেটিং অনুযায়ী ৯০ দিন পর তথ্য মুছে যেতে পারে। বিনামূল্যের সম্মিলিত কর্মপরিসরে এক বছরের বেশি পুরোনো তথ্য স্থায়ীভাবে মুছে ফেলা হয়।
যেসব প্রতিষ্ঠানে পুরোনো সিদ্ধান্ত ও আলোচনা নিয়মিত খুঁজতে হয়, তাদের জন্য এই সীমা গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যমান অফিস সফটওয়্যার দিয়ে যোগাযোগের কাজ ঠিকমতো চললে আলাদা স্ল্যাকের সাবস্ক্রিপশন নেওয়ার দরকার নেই।
সফটওয়্যার কেনার পরও একই তথ্য বারবার লিখতে হচ্ছে?
সফটওয়্যার সমন্বয় পরিকল্পনায় এই প্রশ্নটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আলাদা আলাদা ভালো সফটওয়্যার কিনলেও সেগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদান না হলে কাজের ঝামেলা কমবে না। ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া গ্রাহকের তথ্য গ্রাহক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যারে নেওয়া, কাজের অনুমোদনের পর নতুন প্রকল্প তৈরি করা কিংবা কাজ শেষে চালান পাঠানোর মতো প্রক্রিয়ায় একাধিক সফটওয়্যার যুক্ত থাকতে পারে।
এই কাজগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে করা যাবে কি না, তা সফটওয়্যার নির্বাচনের সময়ই দেখতে হবে। কোনো সফটওয়্যারের ওয়েবসাইটে অন্য অ্যাপের সঙ্গে সংযোগের কথা লেখা থাকলেই সব সুবিধা একসঙ্গে কাজ করবে না। কিছু সংযোগ শুধু নির্দিষ্ট তথ্য পাঠায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (এপিআই) বা উন্নত সংযোগ ব্যবহারের জন্য অর্থ দিতে হয়।
পরীক্ষার সময় একটি গ্রাহকের তথ্য এক সফটওয়্যার থেকে অন্যটিতে পাঠিয়ে দেখুন। পরে তথ্য সংশোধন করলে সেটিও পরিবর্তিত হচ্ছে কি না পরীক্ষা করুন। একই গ্রাহকের একাধিক রেকর্ড তৈরি হচ্ছে কি না এবং সংযোগে ভুল হলে তা শনাক্ত করার উপায় রয়েছে কি না, সেটিও দেখতে হবে।
বাংলা নাম, ফোন নম্বর ও তারিখের বিন্যাস নিয়ে সমস্যা হচ্ছে কি না পরীক্ষা করা ভালো। এ কাজে নমুনা তথ্য ব্যবহার করুন। প্রকৃত গ্রাহকের সংবেদনশীল তথ্য দিয়ে নতুন সংযোগ পরীক্ষা করবেন না। আর ভবিষ্যতে সফটওয়্যার বদলানোর প্রয়োজন হলে কমা দিয়ে তথ্য আলাদা করা সিএসভি ফাইল বা অন্য ব্যবহারযোগ্য বিন্যাসে তথ্য রপ্তানির সুযোগ আছে কি না, তা আগেই জেনে রাখুন।
বিনামূল্যের সফটওয়্যার আসলে কতটা সাশ্রয়ী

বিনামূল্যের পরিকল্পনা ছোট ব্যবসার জন্য ভালো সূচনা হতে পারে। কিন্তু ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ কাজ একটি বিনামূল্যের সেবায় নিয়ে যাওয়ার আগে এর ব্যবহারসীমা বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমদিকে একজন বিক্রয়কর্মীর জন্য কোনো গ্রাহক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যার যথেষ্ট হতে পারে। কয়েক মাস পর আরও কর্মী যুক্ত হলে একই পরিকল্পনায় সবাইকে কাজের সুযোগ দেওয়া নাও যেতে পারে।
প্রকল্প পরিচালনার সফটওয়্যারের ক্ষেত্রেও সাধারণ কাজের সুবিধা বিনামূল্যে থাকলেও উন্নত অনুমোদন, প্রতিবেদন বা অন্য অ্যাপের সঙ্গে সংযোগের জন্য অর্থ দিতে হতে পারে।
সমস্যা হলো, এসব সীমাবদ্ধতা অনেক সময় ব্যবসার কাজ বাড়ার পর সামনে আসে। তখন সফটওয়্যার পরিবর্তন করা সহজ নাও হতে পারে, বিশেষ করে প্রয়োজনীয় তথ্য অন্যত্র নেওয়ার সুবিধা সীমিত থাকলে। এ কারণে বিনামূল্যের পরিকল্পনা নির্বাচনের সময় পরবর্তী অর্থের বিনিময়ের পরিকল্পনার খরচও দেখে রাখা উচিত।
মাসিক বিলের বাইরেও খরচ আছে
সফটওয়্যারের বিজ্ঞাপনে যে মাসিক মূল্য দেখানো হয়, সেটিই প্রতিষ্ঠানের মোট খরচ নয়। কিছু সফটওয়্যারে ব্যবহারকারীপ্রতি অর্থ দিতে হয়। পাঁচজন কর্মী যুক্ত হলে পাঁচটি ব্যবহারের অনুমতিপত্রের খরচ লাগতে পারে। পাশাপাশি অতিরিক্ত তথ্য সংরক্ষণ, সফটওয়্যার সংযোগ ও প্রযোজ্য করের ব্যয় থাকতে পারে।
পুরোনো ব্যবস্থা থেকে তথ্য স্থানান্তর, নতুন সফটওয়্যার চালু করা এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণের খরচও বিবেচনায় রাখতে হবে। একটি সাধারণ হিসাবের মধ্যে ব্যবহারকারীর অনুমতিপত্রের খরচ, অন্যান্য সাবস্ক্রিপশন, অতিরিক্ত সেবা এবং প্রযোজ্য কর ও ফি রাখা উচিত। এককালীন চালুর খরচ আলাদা করে হিসাব করুন।
বার্ষিক পরিকল্পনায় ছাড় পাওয়া গেলেও নতুন সফটওয়্যার শুরুতেই পুরো বছরের জন্য কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নাও হতে পারে। আগে কাজের উপযোগিতা পরীক্ষা করুন। টাকা ফেরত, চুক্তি বাতিল ও স্বয়ংক্রিয় নবায়নের শর্তও পড়ে নিন।
বাংলাদেশ ও ভারতের ব্যবসায় বিদেশি সফটওয়্যার ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা
আন্তর্জাতিক সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারা আর সেটি স্থানীয় ব্যবসার সব প্রয়োজন মেটাতে পারা এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানে বিদেশি অনলাইন সফটওয়্যার সেবা কেনার আগে আন্তর্জাতিক অর্থ পরিশোধের উপযুক্ত ব্যবস্থা রয়েছে কি না দেখতে হবে। বিদেশি মুদ্রায় মূল্য দেখানো হলে ব্যাংক চার্জ, স্থানীয় মুদ্রায় প্রকৃত ব্যয় এবং প্রযোজ্য কর বিবেচনা করতে হবে।
হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে স্থানীয় বিধিমালার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্ধারিত মূসক-৬.৩ চালান এবং প্রয়োজনীয় হিসাব সংরক্ষণের নিয়ম বিবেচনা করতে হবে। ভারতে পণ্য ও সেবা করের আওতায় নিবন্ধিত ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য চালানের তথ্য, করের হিসাব ও প্রয়োজন অনুযায়ী বৈদ্যুতিন চালানের বিধান যাচাই করা দরকার।
সব ব্যবসার করসংক্রান্ত দায়িত্ব একই নয়। প্রতিষ্ঠান কোথায় নিবন্ধিত এবং কী ধরনের পণ্য বা সেবা বিক্রি করে, তার ভিত্তিতে প্রয়োজন বদলাবে। সফটওয়্যার ব্যবহারেও স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচ্য। দোকান বা মাঠপর্যায়ের কর্মীরা মোবাইল ফোনে কাজ করলে অ্যাপটি তাঁদের যন্ত্রে ঠিকমতো চলছে কি না দেখা প্রয়োজন। ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে তথ্য দেখা বা পরে সমন্বয়ের সুবিধা আছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করতে হবে।
অনলাইনভিত্তিক সফটওয়্যার মানেই ইন্টারনেট ছাড়া সব কাজ করা সম্ভব নয়। কর্মীরা সফটওয়্যারের ভাষা বুঝতে পারছেন কি না এবং সমস্যা হলে প্রযুক্তিগত সহায়তা পাওয়া যাবে কি না, তা দেখুন। বিশেষ করে দোকানভিত্তিক ব্যবসায় স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি বিক্রয় ও মজুত ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যার কখনো বিদেশি সাধারণ সমাধানের চেয়ে বেশি উপযোগী হতে পারে।
ব্যবসার তথ্যের নিরাপত্তা কার দায়িত্বে থাকবে
নতুন সফটওয়্যার চালুর সময় সাধারণত কর্মীদের অ্যাকাউন্ট তৈরি করা হয়। কিন্তু কে কোন তথ্য দেখতে পারবেন, কে পরিবর্তন করতে পারবেন এবং কর্মী প্রতিষ্ঠান ছাড়লে তাঁর প্রবেশাধিকার কীভাবে বন্ধ হবে, তা শুরুতেই ঠিক করা প্রয়োজন।
সব কর্মীকে প্রশাসনিক অনুমতি দেওয়ার দরকার নেই। হিসাব বিভাগের কর্মী আর্থিক তথ্য পরিচালনা করতে পারেন। অন্য বিভাগের কর্মীর সেই তথ্য পরিবর্তনের প্রয়োজন নাও থাকতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে যেখানে সম্ভব একাধিক উপায়ে পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা (এমএফএ) চালু রাখুন। এতে পরিচয় যাচাইয়ের অতিরিক্ত ধাপ যুক্ত হয়। পাসওয়ার্ড চুরি হলেও অননুমোদিত প্রবেশের ঝুঁকি কমাতে এটি সাহায্য করতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের নিয়মিত নিরাপত্তামূলক অনুলিপি রাখা দরকার। সেই অনুলিপি থেকে তথ্য ফেরত আনা যাচ্ছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা উচিত। সম্ভব হলে মূল সফটওয়্যার থেকে আলাদা সুরক্ষিত ব্যবস্থায় অনুলিপি সংরক্ষণ করুন।
একাধিক সফটওয়্যারে ব্যবসার তথ্য রাখা হলে এসব নিয়ম আরও গুরুত্ব পায়। কোনো কর্মী প্রতিষ্ঠান ছাড়লে তাঁর অ্যাকাউন্টের অনুমতি দ্রুত বন্ধ করতে হবে। ভবিষ্যতে কোনো সফটওয়্যার ব্যবহার বন্ধ করলে প্রয়োজনীয় তথ্য কীভাবে উদ্ধার করা যাবে, সে ব্যবস্থাও আগে থেকে জানা থাকা ভালো।
আরও পড়ুন: ইমেইল ট্র্যাকিং ব্যবহার করলে গোপনীয়তা ও আস্থা কীভাবে বজায় রাখবেন
নতুন সফটওয়্যারের জন্য টাকা ছাড়ার আগে ছোট পরীক্ষা করুন
একবারে পুরো প্রতিষ্ঠানের কাজ নতুন সফটওয়্যারে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। একটি বিভাগ কিংবা সীমিতসংখ্যক কর্মী নিয়ে শুরু করলে সমস্যাগুলো আগে বোঝা যায়। পরীক্ষার জন্য এক মাসের একটি সময়সীমা রাখা যেতে পারে। তবে এটি কোনো বাধ্যতামূলক নিয়ম নয়; প্রতিষ্ঠানের কাজ জটিল হলে আরও সময় লাগবে।
শুরুতে বর্তমান কাজের পদ্ধতি লিখে রাখুন। কোন কাজ শেষ হতে কত সময় লাগছে এবং কোথায় ভুল হচ্ছে, তা বোঝার চেষ্টা করুন। এরপর প্রয়োজনীয় সুবিধাসম্পন্ন সফটওয়্যার বেছে সীমিত পরিসরে ব্যবহার শুরু করুন। বাস্তব গ্রাহকের সংবেদনশীল তথ্যের বদলে নমুনা তথ্য দিয়ে সফটওয়্যারের সংযোগ ও কাজের ধাপ পরীক্ষা করা ভালো।
পরীক্ষার সময় কর্মীদের মতামত শুনুন। সফটওয়্যারটি ব্যবহার করতে তাঁদের অসুবিধা হচ্ছে কি না, কাজের তথ্য সহজে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে কি না এবং আগের তুলনায় অতিরিক্ত কোনো ধাপ তৈরি হয়েছে কি না, সেগুলো দেখুন।
মাস শেষে শুধু সুবিধার তালিকা দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না। কাজের সময়, ভুলের সংখ্যা, কর্মীদের ব্যবহার এবং নিয়মিত খরচের তুলনা করুন। যে সফটওয়্যার ব্যবহারের পরও একই তথ্য বারবার লিখতে হচ্ছে কিংবা কর্মীরা আগের পদ্ধতিতেই ফিরে যাচ্ছেন, সেটি প্রতিষ্ঠানের জন্য উপযুক্ত কি না আবার ভাবতে হবে।
কোথা থেকে শুরু করবেন
ছোট ব্যবসার জন্য সফটওয়্যার সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের পণ্যের তালিকা অনুসরণ করা জরুরি নয়। ব্যবসার ধরন অনুযায়ী প্রথম প্রয়োজনটিই বদলে যায়। অনলাইন দোকানে আগে অর্ডার ও মজুতের হিসাব গুছিয়ে নেওয়া দরকার হতে পারে। সেবাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে কাজের দায়িত্ব, সময়সীমা ও চালান পরিচালনা বেশি জরুরি হতে পারে। প্রযুক্তিনির্ভর নতুন প্রতিষ্ঠানে প্রকল্প, প্রোগ্রামের নির্দেশনা ও দলীয় যোগাযোগের ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিতে হতে পারে।
তবে একটি সিদ্ধান্ত প্রায় সব ক্ষেত্রেই কাজে আসে। প্রতিষ্ঠানে আগে থেকে যেসব সফটওয়্যার রয়েছে, সেগুলো দিয়ে প্রয়োজনীয় কাজ করা সম্ভব কি না পরীক্ষা না করে নতুন সাবস্ক্রিপশন কিনবেন না। নতুন সফটওয়্যার কেনার প্রয়োজন হলে আগে একটি নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করুন। কাজ সহজ হচ্ছে কি না দেখুন। কর্মীরা সেটি নিয়মিত ব্যবহার করতে পারলে এবং খরচ গ্রহণযোগ্য হলে পরবর্তী প্রয়োজনের দিকে যান।
ব্যবসা বড় হওয়ার সঙ্গে সফটওয়্যার ব্যবস্থাও বদলাবে। সেই পরিবর্তনের সুযোগ রেখে শুরুতে ছোট, পরিচালনাযোগ্য এবং ব্যবসার কাজে সত্যিই প্রয়োজনীয় একটি ব্যবস্থা তৈরি করাই যুক্তিসংগত।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
ছোট ব্যবসার সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কার হাতে থাকা উচিত?
প্রতিষ্ঠানে সফটওয়্যারের সংখ্যা কম হলেও একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি থাকা ভালো। তিনি ব্যবহারকারীর অনুমতি, সাবস্ক্রিপশন নবায়ন, তথ্য সংরক্ষণ এবং সফটওয়্যারসংক্রান্ত সমস্যার বিষয়গুলো দেখবেন। খুব ছোট প্রতিষ্ঠানে মালিক নিজেই এই দায়িত্ব নিতে পারেন। কর্মী বাড়লে সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কাজ ভাগ করে দেওয়া যায়।
সফটওয়্যার পরিবর্তনের সময় পুরোনো তথ্য হারানো কীভাবে এড়াবেন?
পুরোনো সফটওয়্যার বন্ধ করার আগে প্রয়োজনীয় তথ্যের নিরাপত্তামূলক অনুলিপি সংরক্ষণ করুন। এরপর তথ্য নতুন সফটওয়্যারে নেওয়ার সুযোগ আছে কি না যাচাই করুন। প্রথমে সীমিত পরিমাণ নমুনা তথ্য স্থানান্তর করে নাম, তারিখ, লেনদেন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ঠিক আছে কি না দেখুন। নতুন ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় তথ্য সঠিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে নিশ্চিত হওয়ার আগে পুরোনো তথ্য মুছে ফেলবেন না।
ছোট ব্যবসার সফটওয়্যার ব্যবস্থা কত দিন পরপর পর্যালোচনা করা উচিত?
ব্যবসার কাজ বা কর্মীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বদলালে সফটওয়্যার ব্যবস্থাও পর্যালোচনা করা দরকার। সাধারণভাবে প্রতি তিন থেকে ছয় মাস অন্তর ব্যবহৃত সফটওয়্যার, সাবস্ক্রিপশনের খরচ এবং কর্মীদের প্রয়োজন মিলিয়ে দেখা যেতে পারে। এটি বাধ্যতামূলক সময়সীমা নয়। কোনো সফটওয়্যার নিয়মিত ব্যবহার না হলে কিংবা একই কাজ একাধিক অ্যাপে করা হলে পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে কি না বিবেচনা করুন।
একটি সফটওয়্যারের ওপর পুরো ব্যবসা নির্ভরশীল হলে কী সমস্যা হতে পারে?
একটি সফটওয়্যারে একাধিক কাজ পরিচালনা করা সুবিধাজনক হলেও সেই সেবায় সমস্যা হলে ব্যবসার বিভিন্ন কাজ একসঙ্গে ব্যাহত হতে পারে। সফটওয়্যারটির মূল্য পরিবর্তন, ব্যবহারসীমা বা তথ্য স্থানান্তরের শর্তও প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের আলাদা নিরাপত্তামূলক অনুলিপি রাখা এবং প্রয়োজনে অন্য ব্যবস্থায় তথ্য নেওয়ার সুযোগ যাচাই করা উচিত।

