রক্তে HDL কোলেস্টেরল বাড়ানোর ১০টি সেরা উপায়: প্রাকৃতিক ও মেডিসিনাল গাইড

সর্বাধিক আলোচিত

কোলেস্টেরল শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে ভয়ের সঞ্চার হয়। আমরা মনে করি সব ধরণের কোলেস্টেরলই বুঝি শরীরের জন্য খারাপ। কিন্তু এই ধারণাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। আমাদের শরীরে এমন এক ধরণের কোলেস্টেরল আছে যা আমাদের হৃদপিণ্ডের পরম বন্ধু। একে বলা হয় হাই-ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন বা সংক্ষেপে এইচডিএল। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে গুড কোলেস্টেরল বলা হয়। হৃদরোগ এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টেরল কমানোর চেয়েও বেশি জরুরি হলো এইচডিএল বাড়ানো।

দুর্ভাগ্যবশত, দক্ষিণ এশীয় বা বাঙালিদের মধ্যে জিনগত কারণে এবং খাদ্যাভ্যাসের প্রভাবে এই ভালো কোলেস্টেরল কম থাকার প্রবণতা দেখা যায়। আপনার লিপিড প্রোফাইল রিপোর্টে যদি দেখেন এইচডিএল কম এবং ট্রাইগ্লিসারাইড বেশি, তবে এখনই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। এই বিস্তারিত গাইডে আমরা আলোচনা করব কীভাবে জীবনযাত্রার পরিবর্তন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং প্রয়োজনে চিকিৎসার মাধ্যমে আপনি আপনার হার্টকে সুরক্ষিত রাখতে পারেন। চলুন জেনে নেওয়া যাক রক্তে HDL কোলেস্টেরল বাড়ানোর উপায় এবং এর পেছনের বিজ্ঞান।

সুস্থ হার্টের ‘নীরব প্রহরী’ HDL

আমাদের রক্তনালীগুলোকে যদি একটি হাইওয়ের সাথে তুলনা করা হয়, তবে এলডিএল কোলেস্টেরল হলো সেই আবর্জনা যা রাস্তায় জ্যাম বা ব্লক তৈরি করে। অন্যদিকে, এইচডিএল কোলেস্টেরল কাজ করে পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা ঝাড়ুদার হিসেবে। এটি রক্তনালী থেকে বাড়তি চর্বি এবং আবর্জনা সংগ্রহ করে লিভারে নিয়ে যায়, যাতে লিভার সেগুলোকে শরীর থেকে বের করে দিতে পারে। এই প্রক্রিয়াটিকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় রিভার্স কোলেস্টেরল ট্রান্সপোর্ট।

সমস্যা হলো, অধিকাংশ মানুষ শুধু চর্বি কমানোর দিকে মনোযোগ দেন, কিন্তু ভালো কোলেস্টেরল বাড়ানোর কথা ভাবেন না। গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তে এইচডিএল-এর মাত্রা প্রতি ১ মিগ্রা/ডেসিলিটার বাড়লে হৃদরোগের ঝুঁকি ২-৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। তাই সুস্থ থাকতে হলে HDL কোলেস্টেরল বাড়ানোর উপায় জানা এবং তা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।

HDL কোলেস্টেরল কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে?

এইচডিএল বা হাই-ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন হলো প্রোটিন এবং চর্বির একটি জটিল সংমিশ্রণ। এর ঘনত্ব বেশি হওয়ার কারণে এটি রক্তের মাধ্যমে খুব সহজেই চলাচল করতে পারে। এটি মূলত ধমনীর দেয়ালে জমে থাকা প্লাক বা চর্বির স্তর ভেঙে ফেলতে সাহায্য করে। এছাড়া এইচডিএল-এর অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বা প্রদাহবিরোধী গুণাগুণ রয়েছে, যা রক্তনালীর ভেতরের জ্বালাপোড়া কমায় এবং হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ করে।

নিচের ছকটি দেখলে আপনি এলডিএল এবং এইচডিএল-এর কাজের পার্থক্য বুঝতে পারবেন:

ভালো বনাম খারাপ কোলেস্টেরলের পার্থক্য

বৈশিষ্ট্য এলডিএল (LDL) – খারাপ কোলেস্টেরল এইচডিএল (HDL) – ভালো কোলেস্টেরল
মূল কাজ কোলেস্টেরলকে লিভার থেকে কোষে নিয়ে যায়। কোষ থেকে বাড়তি কোলেস্টেরল লিভারে ফেরত আনে।
প্রভাব ধমনীতে চর্বি জমিয়ে ব্লক তৈরি করে। ধমনী পরিষ্কার রাখে এবং ব্লক প্রতিরোধ করে।
হৃদরোগের ঝুঁকি এর মাত্রা বাড়লে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে। এর মাত্রা বাড়লে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমে।
গঠন এতে চর্বি বেশি এবং প্রোটিন কম থাকে। এতে প্রোটিন বেশি এবং চর্বি কম থাকে।

আপনার HDL এর মাত্রা কি ঝুঁকিপূর্ণ?

অনেকেই লিপিড প্রোফাইল রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর বুঝতে পারেন না যে তাদের অবস্থান কোথায়। এইচডিএল-এর মাত্রা নারী এবং পুরুষের জন্য কিছুটা ভিন্ন হয়। সাধারণত নারীদের শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের কারণে এইচডিএল-এর মাত্রা পুরুষদের তুলনায় স্বাভাবিকভাবেই একটু বেশি থাকে। তবে মেনোপজের পর নারীদেরও এইচডিএল কমতে শুরু করে।

নিচের তালিকা থেকে মিলিয়ে নিন আপনার রিপোর্টের অবস্থা:

নারী ও পুরুষের জন্য HDL-এর আদর্শ মাত্রা

ঝুঁকির ধরণ পুরুষের মাত্রা (mg/dL) নারীর মাত্রা (mg/dL) মন্তব্য
বিপদসীমা (উচ্চ ঝুঁকি) ৪০ এর নিচে ৫০ এর নিচে হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের প্রবল ঝুঁকি রয়েছে।
মাঝারি বা বর্ডারলাইন ৪০ – ৫৯ ৫০ – ৫৯ জীবনযাত্রা পরিবর্তন করা জরুরি।
আদর্শ বা সুরক্ষিত ৬০ বা তার বেশি ৬০ বা তার বেশি হার্টের জন্য অত্যন্ত ভালো।

কেন বাঙালিদের মধ্যে HDL কম থাকার প্রবণতা বেশি?

বিশ্বজুড়ে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের কাছে এটি একটি বড় গবেষণার বিষয় যে, কেন দক্ষিণ এশীয় বিশেষ করে বাঙালিদের মধ্যে এইচডিএল কম থাকে। এর পেছনে প্রধান তিনটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রথমত, আমাদের জিনগত গঠন। আমাদের ধমনীগুলো ইউরোপীয়দের তুলনায় সরু হয় এবং বংশগতভাবেই আমাদের শরীর কম এইচডিএল উৎপাদন করে। দ্বিতীয়ত, আমাদের প্রধান খাদ্য ভাত। অতিরিক্ত শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট খাওয়ার ফলে শরীরে ট্রাইগ্লিসারাইড বেড়ে যায়, যা সরাসরি এইচডিএল কমিয়ে দেয়। তৃতীয়ত, পেটের চর্বি বা ভিসেরা ফ্যাট। বাঙালিদের শরীরের অন্যান্য অংশ স্লিম হলেও পেটে চর্বি জমার প্রবণতা বেশি, যা মেটাবলিক সিনড্রোম তৈরি করে এবং ভালো কোলেস্টেরল ধ্বংস করে।

HDL কমে যাওয়ার প্রধান কারণসমূহ

কারণ বিস্তারিত প্রভাব
অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস উচ্চ রক্ত শর্করা এইচডিএল-কে ভেঙে ফেলে এবং অকার্যকর করে দেয়।
ধূমপান তামাকের রাসায়নিক উপাদান সরাসরি এইচডিএল সংশ্লেষণ কমিয়ে দেয়।
শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ব্যায়াম না করলে লিভার পর্যাপ্ত এইচডিএল তৈরি করতে পারে না।
ট্রাইগ্লিসারাইড বৃদ্ধি রক্তে চর্বি বা ট্রাইগ্লিসারাইড বাড়লে এইচডিএল কমে যায়।

প্রাকৃতিকভাবে HDL বাড়ানোর ৭টি শক্তিশালী উপায়

প্রাকৃতিকভাবে HDL বাড়ানোর ৭টি শক্তিশালী উপায়

ঔষধের ওপর নির্ভর না করে খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন এনে আপনি প্রাকৃতিকভাবেই আপনার ভালো কোলেস্টেরল বাড়াতে পারেন। নিচে পরীক্ষিত ৭টি উপায় বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

১. স্বাস্থ্যকর চর্বি নির্বাচন: তেল নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করুন

আমরা অনেকেই মনে করি চর্বি বা তেল মানেই খারাপ। কিন্তু এইচডিএল বাড়ানোর জন্য আপনাকে সঠিক ফ্যাট বা চর্বি খেতে হবে। মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং পলি-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট হার্টের জন্য উপকারী।

আপনার রান্নাঘর থেকে সয়াবিন তেল, পাম অয়েল এবং বনস্পতি বা ডালডা সরিয়ে ফেলুন। এগুলোতে ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড এবং ট্রান্স ফ্যাট থাকে, যা শরীরে প্রদাহ তৈরি করে এবং এইচডিএল কমায়। এর পরিবর্তে এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল, অ্যাভোকাডো অয়েল বা খাঁটি সরিষার তেল ব্যবহার করুন। বিশেষ করে অলিভ অয়েলে থাকা পলিফেনল সরাসরি এইচডিএল বাড়াতে সাহায্য করে।

২. লো-কার্ব ডায়েট ও ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং

বাঙালিদের জন্য HDL কোলেস্টেরল বাড়ানোর উপায় হিসেবে এটি সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। আমাদের খাবারে শর্করার পরিমাণ প্রায় ৭০-৮০ ভাগ। সাদা ভাত, রুটি, চিনি এবং মিষ্টি জাতীয় খাবার রক্তে ইনসুলিন এবং ট্রাইগ্লিসারাইড বাড়িয়ে দেয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা লো-কার্ব ডায়েট (Low-Carb Diet) মেনে চলেন, তাদের এইচডিএল দ্রুত বাড়ে। এছাড়া ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বা ১৬ ঘণ্টা না খেয়ে থাকার পদ্ধতিটি মেটাবলিক সুইচ অন করে, যা চর্বি বার্ন করতে এবং ভালো কোলেস্টেরল বাড়াতে সাহায্য করে। চেষ্টা করুন রাতে ৮টার মধ্যে খেয়ে নিতে এবং পরদিন দুপুরে খেতে।

৩. ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড: মাছ ও উদ্ভিজ্জ উৎস

ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড হলো হার্টের মহৌষধ। এটি সরাসরি এইচডিএল বাড়াতে খুব বেশি ভূমিকা না রাখলেও, এটি ট্রাইগ্লিসারাইড কমায় এবং রক্তনালীর স্বাস্থ্য ভালো রাখে, যা পরোক্ষভাবে এইচডিএল বাড়াতে সাহায্য করে।

সামুদ্রিক মাছ যেমন স্যামন, ম্যাকারেল, সার্ডিন এবং আমাদের দেশের ইলিশ বা পাঙাস মাছে প্রচুর ওমেগা-৩ থাকে। সপ্তাহে অন্তত দুই দিন চর্বিযুক্ত মাছ খাওয়া উচিত। যারা মাছ খান না, তারা ফ্ল্যাক্স সিড বা তিসি, চিয়া সিড এবং আখরোট খেতে পারেন। এগুলো উদ্ভিজ্জ ওমেগা-৩ এর দারুণ উৎস।

৪. বেগুনি ও গাঢ় রঙের সবজি (অ্যান্থোসায়ানিন)

খাবারের রঙ যত গাঢ় হবে, তা হার্টের জন্য তত ভালো। বেগুনি বা লাল রঙের ফল ও সবজিতে অ্যান্থোসায়ানিন নামক এক ধরণের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এটি এইচডিএল কোলেস্টেরলের কার্যক্ষমতা বাড়ায় এবং একে ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা করে।

আপনার প্রতিদিনের খাবারে বেগুন, লাল বাঁধাকপি, বিটরুট, কালো জাম, স্ট্রবেরি বা লাল শাক রাখার চেষ্টা করুন। এই খাবারগুলো ধমনীর প্রদাহ কমাতেও সাহায্য করে।

৫. দ্রবণীয় ফাইবার (Soluble Fiber) যুক্ত খাবার

ফাইবার বা আঁশ দুই ধরণের হয়। এর মধ্যে দ্রবণীয় ফাইবার পানির সাথে মিশে জেলের মতো পদার্থ তৈরি করে, যা অন্ত্র থেকে খারাপ কোলেস্টেরল শুষে নিয়ে শরীর থেকে বের করে দেয়। যখন খারাপ কোলেস্টেরল কমে যায়, তখন ভালো কোলেস্টেরল কাজ করার সুযোগ পায়।

ওটস, ইসবগুলের ভুসি, মটরশুটি, আপেল এবং সাইট্রাস ফল (লেবু, কমলা) দ্রবণীয় ফাইবারের চমৎকার উৎস। প্রতিদিন সকালে এক বাটি ওটস বা রাতে ইসবগুলের ভুসি খাওয়ার অভ্যাস এইচডিএল বাড়াতে সহায়ক।

৬. ব্যায়ামের সঠিক নিয়ম: শুধু হাঁটলেই হবে না

ব্যায়ামের সঠিক নিয়ম

অনেকে মনে করেন প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটলেই হার্ট ভালো থাকবে। হাঁটা অবশ্যই ভালো, কিন্তু এইচডিএল বাড়ানোর জন্য আপনাকে একটু বেশি পরিশ্রম করতে হবে। হাই-ইনটেনসিটি ইন্টারভাল ট্রেনিং বা HIIT ব্যায়াম এইচডিএল বাড়াতে সবচেয়ে কার্যকর।

দৌড়ানো, সাঁতার কাটা বা দ্রুত সাইক্লিং-এর মতো অ্যারোবিক ব্যায়ামের পাশাপাশি সপ্তাহে ২-৩ দিন ওজন তোলা বা রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং করুন। পেশি বা মাসল বাড়লে শরীরের ফ্যাট মেটাবলিজম উন্নত হয়, যা ভালো কোলেস্টেরল বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

৭. জীবনযাত্রার পরিবর্তন: ধূমপান ত্যাগ ও ওজন নিয়ন্ত্রণ

ধূমপান এইচডিএল-এর সবচেয়ে বড় শত্রু। ধূমপানের ফলে রক্তে অ্যাক্রোলিন নামক বিষাক্ত পদার্থ ঢোকে, যা এইচডিএল-এর প্রোটিন গঠন ভেঙে দেয়। ধূমপান ছাড়ার মাত্র ৬০ দিনের মধ্যে এইচডিএল লেভেল প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

পাশাপাশি ওজন নিয়ন্ত্রণ জরুরি। শরীরের ওজন মাত্র ৫-১০ শতাংশ কমাতে পারলে রক্তে এইচডিএল-এর মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। বিশেষ করে কোমরের মাপ কমানো বা পেটের চর্বি কমানো এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি জরুরি।

প্রাকৃতিকভাবে HDL বাড়ানোর উপায়সমূহের সারসংক্ষেপ

পদ্ধতি কী করবেন কেন করবেন
তেল পরিবর্তন অলিভ অয়েল বা সরিষার তেল ব্যবহার। স্বাস্থ্যকর ফ্যাট এইচডিএল বাড়ায়।
কার্বোহাইড্রেট ভাত ও চিনি কমানো। ট্রাইগ্লিসারাইড কমে, এইচডিএল বাড়ে।
ব্যায়াম HIIT ও ওয়েট লিফটিং। ফ্যাট বার্ন করে ও ভালো কোলেস্টেরল তৈরি করে।
রঙিন খাবার বেগুনি সবজি ও ফল। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এইচডিএল রক্ষা করে।

মেডিসিন ও সাপ্লিমেন্ট: কখন প্রয়োজন?

অনেক সময় দেখা যায় জীবনযাত্রা পরিবর্তনের পরেও এইচডিএল বাড়ছে না, বিশেষ করে যাদের জিনগত সমস্যা আছে। সেক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শে কিছু ঔষধ বা সাপ্লিমেন্ট নেওয়া যেতে পারে। মনে রাখবেন, নিজের ইচ্ছায় কখনোই ঔষধ সেবন করবেন না।

৮. নায়াসিন (Vitamin B3): সবচেয়ে শক্তিশালী সাপ্লিমেন্ট?

মেডিসিনাল বা চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এইচডিএল বাড়ানোর সবচেয়ে শক্তিশালী ঔষধ হলো নায়াসিন বা ভিটামিন বি-৩। এটি প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত এইচডিএল বাড়াতে পারে। তবে এর কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে, যেমন মুখ ও শরীর গরম হয়ে যাওয়া বা ফ্লাশিং, এবং লিভারের ওপর প্রভাব। তাই এটি সবসময় ডাক্তারের কড়া নজরদারিতে গ্রহণ করতে হয়।

৯. ফাইব্রেটস (Fibrates) ও ওমেগা-৩ প্রেসক্রিপশন

যাদের ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা ৫০০-এর উপরে এবং এইচডিএল খুব কম, তাদের জন্য ডাক্তাররা জেমফাইব্রোজিল বা ফেনোফাইব্রোজিল জাতীয় ঔষধ দেন। এটি মূলত ট্রাইগ্লিসারাইড কমায় এবং পরোক্ষভাবে এইচডিএল বাড়ায়। এছাড়া উচ্চ মাত্রার প্রেসক্রিপশন ওমেগা-৩ ক্যাপসুলও দেওয়া হতে পারে।

১০. স্ট্যাটিন থেরাপি: একটি ভুল ধারণা

অনেকে মনে করেন স্ট্যাটিন (যেমন- রোসুভাস্ট্যাটিন বা অ্যাটোরভাস্ট্যাটিন) সব ধরণের কোলেস্টেরল ঠিক করে। বাস্তবতা হলো, স্ট্যাটিন মূলত এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টেরল কমানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। এটি এইচডিএল বাড়াতে খুব সামান্য ভূমিকা রাখে (৫-১০%)। তাই শুধু স্ট্যাটিনের ওপর ভরসা করে এইচডিএল বাড়ানোর আশা করা ঠিক নয়।

প্রচলিত ঔষধ ও সাপ্লিমেন্ট

ঔষধ/সাপ্লিমেন্ট কার্যকারিতা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
নায়াসিন এইচডিএল বৃদ্ধিতে সেরা (৩০% পর্যন্ত)। স্কিন ফ্লাশিং, সুগার বেড়ে যাওয়া।
ফাইব্রেটস ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতে সেরা। পেশি ব্যথা, পেটের সমস্যা।
স্ট্যাটিন এলডিএল কমাতে সেরা। এইচডিএল বৃদ্ধিতে ভূমিকা কম।

ট্রাইগ্লিসারাইড ও HDL-এর গোপন সম্পর্ক (TG/HDL Ratio)

আপনার হৃদরোগের ঝুঁকি কতটুকু, তা বোঝার জন্য টোটাল কোলেস্টেরলের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ট্রাইগ্লিসারাইড এবং এইচডিএল-এর অনুপাত। একে বলা হয় TG/HDL Ratio।

এটি বের করার নিয়ম সহজ: আপনার ট্রাইগ্লিসারাইড রিপোর্টকে এইচডিএল রিপোর্ট দিয়ে ভাগ করুন। উদাহরণস্বরূপ:

  • আপনার ট্রাইগ্লিসারাইড: ২৪৮ mg/dL
  • আপনার এইচডিএল: ২৯.৮ mg/dL
  • অনুপাত: ৮.৩১

চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী, এই অনুপাত ২.০ এর নিচে থাকা সবচেয়ে নিরাপদ। ৩.৫ এর উপরে গেলে তা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং মেটাবলিক সিনড্রোম নির্দেশ করে। আপনার ক্ষেত্রে এটি ৮ এর উপরে, যা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। তাই আপনার জন্য HDL কোলেস্টেরল বাড়ানোর উপায় খোঁজার চেয়েও ট্রাইগ্লিসারাইড কমানো বেশি জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাইগ্লিসারাইড কমলে এইচডিএল আপনাআপনি বাড়বে।

অনুপাত বা রেশিও বোঝার চার্ট

TG/HDL রেশিও ঝুঁকির মাত্রা
২.০ এর নিচে আদর্শ বা লো রিস্ক।
২.০ – ৩.৫ মাঝারি ঝুঁকি।
৩.৫ – ৬.০ উচ্চ ঝুঁকি (ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স)।
৬.০ এর উপরে অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকি (মেটাবলিক সিনড্রোম)।

এক নজরে: HDL বাড়ানোর ৭ দিনের স্যাম্পল ডায়েট প্ল্যান

বাঙালি খাদ্যাভ্যাসের সাথে মিল রেখে নিচে একটি সাধারণ ডায়েট চার্ট দেওয়া হলো যা শর্করা কমিয়ে এইচডিএল বাড়াতে সাহায্য করবে।

সাপ্তাহিক ডায়েট প্ল্যান (নমুনা)

সময় খাবার
সকাল ওটস বা চিনি ছাড়া কর্নফ্লেক্স + কাঠবাদাম + ১টি সেদ্ধ ডিম (কুসুমসহ)।
মধ্য সকাল গ্রিন টি + ১টি আপেল বা পেয়ারা।
দুপুর ১ কাপ লাল চালের ভাত + প্রচুর শাক-সবজি + ১ টুকরো বড় মাছ বা মুরগির মাংস (চামড়া ছাড়া)।
বিকেল এক মুঠো বাদাম (চীনা বাদাম বা আখরোট) অথবা ছোলা সেদ্ধ।
রাত রুটি বা ভাত এড়িয়ে চলুন। গ্রিলড চিকেন বা ফিশ + সালাদ অথবা সবজির স্যুপ।

 

কী খাবেন আর কী বর্জন করবেন?

এইচডিএল বাড়ানোর যাত্রা সহজ করতে নিচে বন্ধু এবং শত্রু খাবারের একটি তালিকা দেওয়া হলো।

খাদ্য তালিকা

বন্ধু খাবার (বেশি খাবেন) শত্রু খাবার (বাদ দেবেন)
সামুদ্রিক মাছ, ছোট মাছ। গরুর মাংস, খাসির মাংস (চর্বিযুক্ত)।
অলিভ অয়েল, সরিষার তেল। সয়াবিন তেল, ডালডা, পাম অয়েল।
বাদাম, বীজ (ফ্ল্যাক্স/চিয়া)। বিস্কুট, চানাচুর, পেস্ট্রি, কেক।
অ্যাভোকাডো, বেরি, টক ফল। সফট ড্রিংকস, এনার্জি ড্রিংকস, আইসক্রিম।
ডার্ক চকলেট (৭০%+ কোকো)। ফাস্ট ফুড (বার্গার, পিজা)।

শেষ কথা

পরিশেষে বলা যায়, রক্তে এইচডিএল বা ভালো কোলেস্টেরল বাড়ানো কোনো জাদুর বিষয় নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। আপনি যদি আজ থেকে জীবনযাত্রা পরিবর্তন শুরু করেন, তবে ৬ সপ্তাহ থেকে ৩ মাসের মধ্যে আপনার রক্ত পরীক্ষায় পরিবর্তন দেখতে পাবেন। মনে রাখবেন, HDL কোলেস্টেরল বাড়ানোর উপায় হিসেবে শর্করার লাগাম টেনে ধরা এবং নিয়মিত শরীরচর্চা করার কোনো বিকল্প নেই।

হার্ট অ্যাটাক থেকে বাঁচতে শুধু কোলেস্টেরল কমানোর চিন্তা না করে, ভালো কোলেস্টেরল বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিন। বছরে অন্তত দুবার লিপিড প্রোফাইল চেক করুন এবং নিজের হার্টের যত্ন নিন। সুস্থ হার্টই সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১. ডিমের কুসুম কি সত্যিই কোলেস্টেরলের শত্রু?

না। আধুনিক গবেষণা বলছে, ডিমের কুসুমে থাকা ডায়েটারি কোলেস্টেরল রক্তে খুব একটা প্রভাব ফেলে না। বরং এতে থাকা লেসিথিন এইচডিএল বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। তবে ডায়াবেটিস থাকলে দিনে ১টির বেশি কুসুম না খাওয়াই ভালো।

২. কত দিনের মধ্যে HDL কোলেস্টেরল বাড়ানো সম্ভব?

সঠিক ডায়েট এবং ব্যায়াম শুরু করার সাধারণত ৬ সপ্তাহ থেকে ৩ মাসের মধ্যে রক্ত পরীক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়।

৩. শুধু কি হাঁটাচলা করে HDL বাড়ানো যায়?

হাঁটাচলা হার্টের জন্য ভালো, তবে এইচডিএল বা ভালো কোলেস্টেরল বাড়াতে হলে একটু বেশি তীব্রতার ব্যায়াম যেমন জোরে হাঁটা, দৌড়ান বা ওজন তোলা বেশি কার্যকর।

৪. কোন ফলগুলো HDL বাড়াতে সবচেয়ে বেশি কাজ করে?

অ্যাভোকাডো হলো এইচডিএল বাড়ানোর জন্য সেরা ফল। এছাড়া বেরি জাতীয় ফল (স্ট্রবেরি, কালো জাম), পেয়ারা এবং সাইট্রাস ফলগুলো বেশ উপকারী।

৫. ফিশ অয়েল সাপ্লিমেন্ট কি সবার জন্য জরুরি?

যারা সপ্তাহে ২ দিন মাছ খেতে পারেন না, তাদের জন্য ওমেগা-৩ বা ফিশ অয়েল সাপ্লিমেন্ট নেওয়া ভালো। এটি সরাসরি এইচডিএল না বাড়ালেও ট্রাইগ্লিসারাইড কমিয়ে হার্টকে সুস্থ রাখে।

সর্বশেষ