২৮ অক্টোবর: ইতিহাসের এই দিনে – বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা, জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী

সর্বাধিক আলোচিত

মানব ইতিহাসের সুবিশাল টাইমলাইন বা সময়রেখাকে যদি ২৮শে অক্টোবরের ঠিক এই দিনটিতে এসে ব্যবচ্ছেদ করা হয়, তবে আমরা মানুষের অবিস্মরণীয় বিজয়, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, গভীর ট্র্যাজেডি এবং পৃথিবী-পরিবর্তনকারী উদ্ভাবনের এক রোমাঞ্চকর বুনন দেখতে পাব। ক্যালেন্ডারের পাতায় এমন অনেক দিন আসে যা নীরবে পার হয়ে যায়, কিন্তু ২৮শে অক্টোবর বারবার এমন এক ঐতিহাসিক মোড় হিসেবে কাজ করেছে যার ওপর ভিত্তি করে সাম্রাজ্য, জাতি এবং মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়েছে।

রোমান সাম্রাজ্যের প্রাচীন যুদ্ধক্ষেত্র—যা ইউরোপের ধর্মীয় রূপরেখা চিরতরে পাল্টে দিয়েছিল, সেখান থেকে শুরু করে ১৯৬২ সালের এক রুদ্ধশ্বাস হেমন্তের দিন—যেদিন মানবজাতি পারমাণবিক ধ্বংসের হাত থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছিল, ২৮শে অক্টোবর সবসময়ই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। এই দিনটি যুক্তরাষ্ট্রকে তার স্বাধীনতার সবচেয়ে আইকনিক প্রতীক উপহার দিয়েছিল এবং প্রযুক্তি জগতের পথিকৃৎ, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ত্রাণকর্তা ও হলিউডের কিংবদন্তিদের জন্ম দেখেছিল।

এই বিস্তৃত ও বিস্তারিত স্মৃতিকথায়, আমরা সময়ের পাতা উল্টে সেই ঐতিহাসিক ঘটনাবলি, স্মরণীয় জন্ম, হৃদয়বিদারক বিদায় এবং বৈশ্বিক পালনীয় দিবসগুলো অন্বেষণ করব যা ২৮শে অক্টোবরকে স্মরণীয় করে রেখেছে।

এক নজরে ২৮শে অক্টোবর

বিভাগ দিনের হাইলাইট প্রভাব
বৈশ্বিক ইতিহাস কিউবান মিসাইল ক্রাইসিসের সমাপ্তি (১৯৬২) যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে বৈশ্বিক পারমাণবিক যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয়েছিল।
বাংলা ও উপমহাদেশ ২৮শে অক্টোবরের রাজনৈতিক সংকট, ঢাকা (২০০৬) বাংলাদেশের আধুনিক রাজনীতির গতিপথ আমূল পাল্টে দিয়েছিল।
বিখ্যাত জন্ম জোনাস সল্ক (১৯১৪) ও বিল গেটস (১৯৫৫) বিশ্ব স্বাস্থ্য এবং পার্সোনাল কম্পিউটিংয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন।
বিখ্যাত মৃত্যু জন লক (১৭০৪) আধুনিক গণতন্ত্রের দার্শনিক ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।
বৈশ্বিক দিবস আন্তর্জাতিক অ্যানিমেশন দিবস ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিং বা দৃশ্যমান গল্প বলার এবং চলচ্চিত্রের পথিকৃৎদের উদ্‌যাপন।

বৈশ্বিক ইতিহাস

বৈশ্বিক ইতিহাস

এই দিনে সারা বিশ্বের সীমানা নতুন করে আঁকা হয়েছে, নতুন মতাদর্শ গড়ে উঠেছে এবং বিশাল সব স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি হয়েছে। ২৮শে অক্টোবরে ঘটে যাওয়া বিশ্বের প্রধান ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর দিকে চলুন গভীরভাবে নজর দেওয়া যাক।

৩১২ খ্রিস্টাব্দ: মিলভিয়ান ব্রিজের যুদ্ধ ৩১২ খ্রিস্টাব্দের ২৮শে অক্টোবরের আগে রোমান সাম্রাজ্য ছিল বিভক্ত, এবং খ্রিস্টধর্ম ছিল চরম নির্যাতনের শিকার একটি সংখ্যালঘু ধর্ম। এই দিনে, সম্রাট প্রথম কনস্ট্যান্টাইন রোমের টাইবার নদীর উপর অবস্থিত মিলভিয়ান ব্রিজে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ম্যাক্সেনটিয়াসকে পরাজিত করেন। ঐতিহাসিক কিংবদন্তি অনুসারে, কনস্ট্যান্টাইন যুদ্ধের আগে সূর্যের দিকে তাকিয়ে আলোর একটি ক্রুশ দেখতে পান, যেখানে গ্রিক ভাষায় লেখা ছিল “In hoc signo vinces” (এই চিহ্নে, তুমি জয়লাভ করবে)। এই বিশাল বিজয়ের পর, কনস্ট্যান্টাইন পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের অবিসংবাদিত শাসক হন। এই বিজয় সরাসরি ৩১৩ খ্রিস্টাব্দে ‘এডিক্ট অফ মিলান’-এর পথ প্রশস্ত করে, যা খ্রিস্টধর্মকে বৈধতা দেয় এবং শেষ পর্যন্ত এটিকে পশ্চিমা বিশ্বের প্রধান ধর্মে পরিণত হতে সাহায্য করে।

১৬৩৬: আমেরিকায় উচ্চশিক্ষার জন্ম (হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়) যুক্তরাষ্ট্র একটি স্বাধীন জাতিতে পরিণত হওয়ার এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে, ম্যাসাচুসেটস বে কলোনির দ্য গ্রেট অ্যান্ড জেনারেল কোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে: তাদের অত্যন্ত শিক্ষিত যাজক প্রয়োজন। ১৬৩৬ সালের ২৮শে অক্টোবর, তারা আমেরিকার উপনিবেশগুলোতে প্রথম কলেজ প্রতিষ্ঠার পক্ষে ভোট দেয়। প্রথমে এর নাম ছিল শুধু “নিউ কলেজ”, কিন্তু জন হার্ভার্ড নামের এক তরুণ যাজক তার মৃত্যুর পর তার বিশাল লাইব্রেরি এবং সম্পদের অর্ধেক এই প্রতিষ্ঠানের নামে উইল করে যাওয়ার পর এর নামকরণ হয় ‘হার্ভার্ড কলেজ’। আজ, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় পৃথিবীর অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ একাডেমিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে, যেখান থেকে বহু রাষ্ট্রপ্রধান, নোবেল বিজয়ী এবং বিলিয়নেয়ার তৈরি হয়েছেন।

১৮৮৬: স্ট্যাচু অফ লিবার্টি উদ্বোধন “তোমাদের ক্লান্ত, তোমাদের দরিদ্র, তোমাদের দলবদ্ধ জনতা যারা মুক্তভাবে শ্বাস নেওয়ার জন্য ব্যাকুল, তাদের আমার কাছে দাও।” ১৮৮৬ সালের ২৮শে অক্টোবর, প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড ‘লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর উদ্বোধন করেন, যা আজ বিশ্বব্যাপী ‘স্ট্যাচু অফ লিবার্টি’ নামে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ফ্রান্সের মানুষের বন্ধুত্বের উপহার হিসেবে এই বিশাল তামার কাঠামোটির নকশা করেছিলেন ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক-অগাস্ট বার্থোল্ডি। এর ভেতরের স্টিলের কাঠামো তৈরি করেছিলেন গুস্তাভ আইফেল (যিনি পরবর্তীতে বিখ্যাত আইফেল টাওয়ার নির্মাণ করেন)। এই দিনের উদ্বোধনটি ছিল বছরের পর বছর ধরে চলা আটলান্টিক পাড়ের দুই দেশের বিশাল প্রচেষ্টার চূড়ান্ত রূপ। এর পেডেস্টাল বা বেদী নির্মাণের জন্য সংবাদপত্র প্রকাশক জোসেফ পুলিৎজারের নেতৃত্বে একটি বিশাল গণ-তহবিল সংগ্রহ অভিযানও পরিচালিত হয়েছিল। এটি খুব দ্রুত আশা, গণতন্ত্র এবং অভিবাসীদের স্বপ্নের চূড়ান্ত বৈশ্বিক প্রতীকে পরিণত হয়।

১৯২২: মুসোলিনির ‘মার্চ অন রোম’ বিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ১৯২২ সালের ২৮শে অক্টোবর একটি অন্ধকার এবং নাটকীয় মোড় নেয়। ইতালির ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টির নেতা বেনিতো মুসোলিনি ‘মার্চ অন রোম’ বা রোম অভিমুখে যাত্রার আয়োজন করেন। হাজার হাজার কালো পোশাক পরা ফ্যাসিস্ট আধা-সামরিক বাহিনী ইতালির রাজধানীর দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। বিদ্রোহ দমনের জন্য সামরিক বাহিনী মোতায়েন করার বদলে রাজা ভিক্টর এমানুয়েল তৃতীয় একটি রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের আশঙ্কায় আত্মসমর্পণ করেন। তিনি সরকারের ক্ষমতা মুসোলিনির হাতে তুলে দেন এবং আইনত তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করেন। এই তারিখটি ইতালিতে ফ্যাসিবাদী শাসনের সূচনা করে, যা এমন এক বিপজ্জনক নজির স্থাপন করেছিল যা পরে জার্মানিতে অ্যাডলফ হিটলারকে অনুপ্রাণিত করে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে।

১৯৬২: কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের (মিসাইল ক্রাইসিস) অবসান ১৯৬২ সালের অক্টোবরে টানা তেরো দিন ধরে পুরো বিশ্ব দম আটকে ছিল, কারণ পৃথিবী তখন সম্পূর্ণ পারমাণবিক ধ্বংসের খাদের কিনারায় যতটা কাছাকাছি দাঁড়িয়েছিল, ততটা আগে বা পরে কখনোই হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র আবিষ্কার করেছিল যে সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবায় পারমাণবিক অস্ত্রবাহী ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন করছে, যা ফ্লোরিডা থেকে মাত্র ৯০ মাইল দূরে। নৌ অবরোধ এবং টানা কয়েক দিনের চরম উত্তেজনাকর গোপন আলোচনার পর ২৮শে অক্টোবর অবশেষে একটি সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়। সোভিয়েত প্রিমিয়ার নিকিতা ক্রুশ্চেভ প্রকাশ্যে সোভিয়েত জাহাজগুলোকে ফিরে যাওয়ার এবং কিউবায় রাখা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ভেঙে ফেলার নির্দেশ সম্প্রচার করেন। বিনিময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি তুরস্ক থেকে আমেরিকার জুপিটার মিসাইল সরিয়ে নিতে গোপনে রাজি হন। এই দিনে হওয়া এই সমঝোতার ফলেই সারা বিশ্বের আতঙ্কিত মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পেরেছিল।

১৯৬৫: দ্য গেটওয়ে টু দ্য ওয়েস্ট-এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন আধুনিক প্রকৌশলের জগতে ১৯৬৬ সালের ২৮শে অক্টোবর একটি যুগান্তকারী দিন। এদিন মিসৌরির সেন্ট লুইসে অবস্থিত ‘গেটওয়ে আর্চ’-এর সর্বশেষ ১০ টনের খণ্ডটি তার জায়গায় বসানো হয়েছিল। ফিনিশ-আমেরিকান স্থপতি ইরো সারিনেন-এর নকশা করা ৬৩০ ফুট উঁচু স্টেইনলেস স্টিলের এই স্মৃতিস্তম্ভটি যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমমুখী সম্প্রসারণের প্রতি এক বিশাল শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। আজও এটি পশ্চিম গোলার্ধের সবচেয়ে উঁচু মানবসৃষ্ট স্মৃতিস্তম্ভ এবং স্থাপত্য জ্যামিতির এক বিস্ময় হয়ে আছে।

বাংলা ও ভারতীয় উপমহাদেশ

ভারতীয় উপমহাদেশ এবং বিশেষ করে বাংলা অঞ্চলের ইতিহাসও এই দিনে ঘটা সাংস্কৃতিক নবজাগরণ, সাম্রাজ্যের পটপরিবর্তন এবং তীব্র রাজনৈতিক আন্দোলনে সমৃদ্ধ।

১৬২৭: মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের ইন্তেকাল ১৬২৭ সালের ২৮শে অক্টোবর চতুর্থ মুঘল সম্রাট নূর-উদ-দীন মুহাম্মদ সেলিম—যিনি ইতিহাসে জাহাঙ্গীর নামে পরিচিত—মৃত্যুবরণ করেন। জাহাঙ্গীর ১৬০৫ সাল থেকে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিশাল মুঘল সাম্রাজ্য শাসন করেন। তার শাসনকাল ছিল মূলত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শক্তিশালী অর্থনীতি এবং শিল্পের প্রতি গভীর ও আবেগপূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতার এক যুগ। মুঘল চিত্রকলা তার শাসনামলে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল, যেখানে অভূতপূর্ব বাস্তবতাবাদ এবং প্রকৃতির অধ্যয়ন ফুটে ওঠে। তবে, এই দিনে তার মৃত্যু তার পুত্রদের মধ্যে উত্তরাধিকার নিয়ে এক দ্রুত ও নিষ্ঠুর যুদ্ধের সূচনা করে। শেষ পর্যন্ত শাহজাহান (যিনি পরে তাজমহল নির্মাণ করেন) রক্তাক্ত পথ পেরিয়ে সিংহাসন দখল করেন।

১৮৬৭: ভগিনী নিবেদিতার জন্ম ১৮৬৭ সালের ২৮শে অক্টোবর আয়ারল্যান্ডে মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল হিসেবে জন্মগ্রহণকারী এই নারী পরবর্তীতে বাংলার নবজাগরণের অন্যতম প্রিয় এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। লন্ডনে স্বামী বিবেকানন্দের সাথে সাক্ষাতের পর, ১৮৯৮ সালে তিনি কলকাতায় (তৎকালীন ক্যালকাটা) চলে আসেন এবং তাকে “নিবেদিতা” (যার অর্থ ‘ঈশ্বরের প্রতি উৎসর্গীকৃত’) নাম দেওয়া হয়। সিস্টার নিবেদিতা নিজেকে ভারতীয় সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে ফেলেন। তিনি কলকাতায় মেয়েদের জন্য স্কুল খোলেন, ১৮৯৯ সালের প্লেগ মহামারীর সময় অক্লান্ত পরিশ্রম করেন এবং ভারতের স্বাধীনতার এক তীব্র প্রবক্তা হয়ে ওঠেন। তিনি ভারতীয় বিজ্ঞানেরও এক গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, যিনি যুগান্তকারী পদার্থবিদ ও উদ্ভিদবিদ জগদীশ চন্দ্র বসুকে তার পাণ্ডুলিপি গুছিয়ে রাখতে এবং তহবিলের ব্যবস্থা করতে প্রবলভাবে সাহায্য করেছিলেন।

২০০৬: ঢাকায় ২৮শে অক্টোবরের রাজনৈতিক সংকট বাংলাদেশের আধুনিক ইতিহাসে ২০০৬ সালের ২৮শে অক্টোবর রাজনৈতিক সহিংসতার একটি কলঙ্কজনক এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে স্মরণ করা হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক মুহূর্তে, আইন অনুযায়ী আসন্ন সাধারণ নির্বাচন পরিচালনার জন্য একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার কথা ছিল। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন তা নিয়ে বিরোধের জেরে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল তীব্র গণ-আন্দোলনের ডাক দেয়, যা ‘লগি-বইঠা আন্দোলন’ নামে পরিচিতি পায়।

২৮শে অক্টোবর ঢাকার রাস্তায়, বিশেষ করে পল্টন এলাকায় তীব্র ও প্রাণঘাতী সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এতে বেশ কয়েকজন নিহত হন এবং সারা দেশে ব্যাপক অরাজকতা সৃষ্টি হয়। রাস্তায় চরম সহিংসতার এই একটি দিন মূলত দেশের রাজনৈতিক সংলাপ ও আস্থার জায়গাকে পুরোপুরি ভেঙে দেয়। এই দিনের ধারাবাহিক প্রভাবে শেষ পর্যন্ত ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয় (যা ১/১১ নামে পরিচিত) এবং একটি সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে, যারা পরবর্তী দুই বছর দেশ শাসন করে।

২৮শে অক্টোবরে জন্ম নেওয়া কিংবদন্তিরা

চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ব্যবসা এবং বিনোদন জগতে পরিবর্তন আনবেন—এমন অনেক অসাধারণ মানুষের জন্ম হয়েছে ২৮শে অক্টোবরে।

এক নজরে বিখ্যাত জন্ম:

নাম জন্মের বছর জাতীয়তা পরিচিতি
জোনাস সল্ক ১৯১৪ আমেরিকান ভাইরোলজিস্ট; পোলিওর প্রথম সফল টিকা আবিষ্কারক।
বিল গেটস ১৯৫৫ আমেরিকান মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা; প্রযুক্তি পথিকৃৎ ও সমাজসেবক।
ইন্দ্রা নুয়ি ১৯৫৫ ভারতীয়-আমেরিকান পেপসিকোর প্রাক্তন সিইও; যুগান্তকারী নারী ব্যবসায়িক নির্বাহী।
জুলিয়া রবার্টস ১৯৬৭ আমেরিকান অস্কার বিজয়ী অভিনেত্রী (প্রিটি ওম্যান, এরিন ব্রোকোভিচ)।
জোয়াকিন ফিনিক্স ১৯৭৪ আমেরিকান অস্কার বিজয়ী অভিনেতা (জোকার, গ্ল্যাডিয়েটর)।

জোনাস সল্ক (১৯১৪) ১৯৫০-এর দশকের আগে, পোলিও ছিল পৃথিবীর অন্যতম ভয়ংকর একটি রোগ, যা প্রতি বছর হাজার হাজার শিশুকে পঙ্গু করে দিত বা মেরে ফেলত। ১৯১৪ সালের ২৮শে অক্টোবর নিউইয়র্ক সিটিতে জন্মগ্রহণকারী ড. জোনাস সল্ক এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। ১৯৫৫ সালে তার দল একটি নিরাপদ এবং কার্যকরী পোলিও ভ্যাকসিনের সফল আবিষ্কারের কথা ঘোষণা করে। এক অবিশ্বাস্য মানবতার নিদর্শন স্বরূপ, সল্ক এই ভ্যাকসিনের কোনো প্যাটেন্ট বা স্বত্বাধিকার না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যাতে এটি সস্তায় উৎপাদন এবং বিশ্বব্যাপী বিতরণ করা যায়। যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয় যে প্যাটেন্টের মালিক কে, তিনি বিখ্যাত সেই উত্তরটি দিয়েছিলেন: “আমি মানব, এটি সাধারণ মানুষের। এর কোনো প্যাটেন্ট নেই। আপনি কি সূর্যকে পেটেন্ট করতে পারবেন?”

বিল গেটস এবং ইন্দ্রা নুয়ি (১৯৫৫) আশ্চর্যজনকভাবে, আধুনিক বৈশ্বিক ব্যবসার দুজন বিশাল মাপের কিংবদন্তি ১৯৫৫ সালের ঠিক একই দিনে জন্মগ্রহণ করেন।

  • বিল গেটস: ওয়াশিংটনের সিয়াটলে জন্মগ্রহণকারী বিল গেটস হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ড্রপআউট হয়ে ‘মাইক্রোসফট’ সহ-প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এমন এক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিলেন যেখানে “প্রতিটি ডেস্কে এবং প্রতিটি ঘরে একটি করে কম্পিউটার থাকবে।” তিনি পার্সোনাল কম্পিউটিং বিপ্লবের মূল কারিগর ছিলেন। ইতিহাসের অন্যতম মূল্যবান কোম্পানি গড়ে তোলার পর, তিনি ‘বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম প্রধান সমাজসেবকে পরিণত হন।

  • ইন্দ্রা নুয়ি: ভারতের মাদ্রাজে (বর্তমান চেন্নাই) জন্মগ্রহণকারী ইন্দ্রা নুয়ি কর্পোরেট জগতের বহু অদৃশ্য বাধা (গ্লাস সিলিং) ভেঙে পেপসিকোর (PepsiCo) সিইও হন। ২০০৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তার নেতৃত্বে, তিনি বিশাল এই খাদ্য ও পানীয় কর্পোরেশনকে স্বাস্থ্যকর পণ্য এবং টেকসই ব্যবসায়িক অনুশীলনের দিকে পরিচালিত করেন। তিনি কর্পোরেট বিশ্বে নারীদের নেতৃত্বের এক বৈশ্বিক আইকনে পরিণত হন।

হলিউডের তারকারা বিনোদন জগৎও ২৮শে অক্টোবরের কাছে অনেক ঋণী। জুলিয়া রবার্টস (জন্ম ১৯৬৭) ১৯৯০-এর দশকে রোমান্টিক কমেডি ধারাকে নতুন রূপ দেন এবং পরবর্তীতে তার অসাধারণ অভিনয়ের প্রমাণ দিয়ে একাডেমি অ্যাওয়ার্ড (অস্কার) জিতে নেন। জোয়াকিন ফিনিক্স (জন্ম ১৯৭৪), যিনি চরিত্রের গভীরে নিমজ্জিত তীব্র অভিনয়ের জন্য পরিচিত, তার প্রজন্মের অন্যতম সবচেয়ে সম্মানিত অভিনেতায় পরিণত হয়েছেন। এছাড়া, সায়েন্স ফিকশন ভক্তরা ম্যাট স্মিথের (জন্ম ১৯৮২) জন্মদিন উদযাপন করেন, যিনি ‘ডক্টর হু’ সিরিজের একাদশ ডক্টর এবং ‘দ্য ক্রাউন’ সিরিজে প্রিন্স ফিলিপের চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন।

২৮শে অক্টোবরে চিরবিদায় (বিখ্যাত মৃত্যু)

জন্ম উদযাপনের পাশাপাশি, এই দিনে পৃথিবী এমন কয়েকজন ব্যক্তিত্বকে হারিয়েছে যাদের রেখে যাওয়া কাজ আজও আমাদের আধুনিক সমাজকে রূপ দিচ্ছে।

এক নজরে বিখ্যাত মৃত্যু:

নাম মৃত্যুর বছর জাতীয়তা উত্তরাধিকার / মৃত্যুর কারণ
জন লক ১৭০৪ ইংলিশ “ফাদার অফ লিবারেলিজম”; গণতন্ত্রের দার্শনিক ভিত্তি প্রস্তুতকারী।
অ্যাবিগেইল অ্যাডামস ১৮১৮ আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় ফার্স্ট লেডি; নারী অধিকারের প্রাথমিক প্রবক্তা।
জেরি লি লুইস ২০২২ আমেরিকান রক অ্যান্ড রোল-এর পথিকৃৎ (“গ্রেট বলস অফ ফায়ার”); বার্ধক্যজনিত মৃত্যু।
ম্যাথু পেরি ২০২৩ আমেরিকান-কানাডিয়ান তুমুল জনপ্রিয় কমেডিক অভিনেতা (ফ্রেন্ডস); আসক্তি থেকে মুক্তির সমর্থক।

জন লক (১৭০৪) ৭২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করা জন লক ছিলেন একজন ইংরেজ দার্শনিক এবং চিকিৎসক, যার লেখা আধুনিক পশ্চিমা গণতন্ত্রের একদম মূল ভিত্তি তৈরি করেছে। তিনি এই বৈপ্লবিক ধারণাটি প্রস্তাব করেছিলেন যে জন্মের সময় মানুষের মন থাকে ‘ট্যাবুলা রাস’ (tabula rasa – একটি সাদা ক্যানভাস বা স্লেট), এবং সমস্ত জ্ঞান অভিজ্ঞতা থেকেই অর্জিত হয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, “সামাজিক চুক্তি” (social contract) এবং মানুষের “জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির” স্বাভাবিক অধিকার সংক্রান্ত তার রাজনৈতিক তত্ত্ব যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাদের (Founding Fathers) গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। জন লক ছাড়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম হতো।

অ্যাবিগেইল অ্যাডামস (১৮১৮) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট জন অ্যাডামসের স্ত্রী অ্যাবিগেইল অ্যাডামস শুধু একজন স্ত্রী ছিলেন না; তিনি ছিলেন তার সবচেয়ে কাছের রাজনৈতিক উপদেষ্টা। ১৭৭৬ সালে যখন আমেরিকার নতুন আইনি ব্যবস্থার খসড়া তৈরি হচ্ছিল, তিনি বিখ্যাতভাবে তার স্বামীকে চিঠি লিখে অনুরোধ করেছিলেন, “নারীদের কথা মনে রাখবেন, এবং আপনাদের পূর্বপুরুষদের চেয়ে তাদের প্রতি আরও বেশি উদার এবং অনুকূল হবেন।” ১৮১৮ সালের ২৮শে অক্টোবর তিনি মারা যান। তাকে নারী অধিকার এবং নারী শিক্ষার পক্ষে একজন অত্যন্ত বুদ্ধিমতী ও দূরদর্শী প্রবক্তা হিসেবে আজও স্মরণ করা হয়।

ম্যাথু পেরি (২০২৩) সাম্প্রতিক ইতিহাসে, ২০২৩ সালের ২৮শে অক্টোবর অভিনেতা ম্যাথু পেরির আকস্মিক মৃত্যু পুরো বিশ্বকে শোকে স্তব্ধ করে দেয়। জনপ্রিয় সিটকম ‘ফ্রেন্ডস’-এ ‘চ্যান্ডলার বিং’ চরিত্রে তার দুর্দান্ত কমেডিক টাইমিংয়ের জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত পেরি টানা এক দশক ধরে কোটি কোটি ঘরে হাসি ফুটিয়েছেন। অভিনয়ের বাইরেও, পেরি মাদকাসক্তিতে ভোগা মানুষদের সাহায্য করার জন্য গভীরভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। তিনি আসক্তদের সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য ‘সোবার লিভিং ফেসিলিটি’ খুলেছিলেন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রচুর তদবির করেছিলেন। তার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার হলো—মানুষকে সাহায্য করার আশায় নিজের বিশাল ব্যক্তিগত লড়াইয়ের মাঝেও সারা বিশ্বকে আনন্দ দিয়ে যাওয়া।

আন্তর্জাতিক দিবস এবং বৈশ্বিক পালনীয়

২৮শে অক্টোবর কেবল অতীতের বিষয় নয়; এটি বিভিন্ন সংস্কৃতিতে সক্রিয় বৈশ্বিক উদযাপন ও পালনের একটি দিন।

  • ওহি দিবস (গ্রিস, সাইপ্রাস এবং গ্রিক প্রবাসীরা): এটি “নো ডে” (No Day) বা ‘না-দিবস’ নামেও পরিচিত। ১৯৪০ সালের ২৮শে অক্টোবর, ইতালির স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনি গ্রিক প্রধানমন্ত্রী আইওনিস মেটাক্সাসকে আল্টিমেটাম দেন এবং গ্রিক ভূখণ্ডে অক্ষশক্তির (Axis forces) প্রবেশের দাবি জানান। মেটাক্সাস সহজভাবে ফরাসি ভাষায় উত্তর দিয়েছিলেন, “Alors, c’est la guerre” (তাহলে যুদ্ধই হোক), যাকে গ্রিক জনগণ সংক্ষিপ্তভাবে একটি প্রতিরক্ষামূলক “Ohi!” (না!) বলে গ্রহণ করেছিল। গ্রিকরা ইতালির আক্রমণ তীব্রভাবে প্রতিহত করে, যা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির প্রথম বড় ধাক্কা। আজ এটি একটি বিশাল জাতীয় ছুটি হিসেবে পালিত হয়, যেখানে সামরিক ও ছাত্র প্যারেড হয়।

  • আন্তর্জাতিক অ্যানিমেশন দিবস: ২০০২ সালে ASIFA (ইন্টারন্যাশনাল অ্যানিমেটেড ফিল্ম অ্যাসোসিয়েশন) দ্বারা শুরু হওয়া এই দিনটি অ্যানিমেশন শিল্পকে উদযাপন করে। এটি ১৮৯২ সালের ২৮শে অক্টোবরকে স্মরণ করে, যেদিন চার্লস-এমিল রেনড প্যারিসের মুসে গ্রেভিনে সাধারণ মানুষের সামনে তার ‘থিয়েটার অপটিক’ (Optical Theatre) প্রজেক্ট করেছিলেন—যা ছিল চলচ্চিত্রের আবিষ্কারের আগে প্রজেক্ট করা চলন্ত ছবির প্রথম পাবলিক প্রদর্শনী।

  • স্বাধীন চেকোস্লোভাক রাষ্ট্র দিবস: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর ১৯১৮ সালে চেকোস্লোভাকিয়া সৃষ্টির স্মরণে এটি চেক প্রজাতন্ত্রে একটি সরকারি ছুটির দিন।

  • ন্যাশনাল ফার্স্ট রেসপন্ডার ডে (যুক্তরাষ্ট্র): এটি একটি নির্ধারিত দিন যা ফায়ারফাইটার, পুলিশ অফিসার, ইএমটি (EMT) এবং প্যারামেডিকদের মতো সেই সব সাহসী নারী ও পুরুষদের সম্মান জানায়—যারা নিজেদের সম্প্রদায়কে নিরাপদ রাখতে বিপদের দিকে ছুটে যান।

শেষ কথা

২৮শে অক্টোবরের ঐতিহাসিক ক্যানভাসটি চরম বৈপরীত্যে বোনা। এটি এমন একটি তারিখ যা ১৯২২ সালে ইতালিতে ফ্যাসিবাদের অন্ধকার উত্থান দেখেছিল, আবার ১৯৬২ সালে পারমাণবিক উত্তেজনার সফল অবসানও দেখেছিল। এটি এমন একটি দিন যা আমাদের জন লকের বৌদ্ধিক উজ্জ্বলতা, ইন্দ্রা নুয়ির যুগান্তকারী নেতৃত্ব এবং বিল গেটসের প্রযুক্তিগত দূরদর্শিতা উপহার দিয়েছে। ২০০৬ সালের রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত ঢাকার কোলাহলপূর্ণ রাস্তা থেকে শুরু করে ১৮৮৬ সালে নিউইয়র্ক হার্বারের অভিবাসী-স্বাগত জানানো তীর পর্যন্ত—২৮শে অক্টোবর প্রমাণ করে যে ইতিহাস কখনোই স্থির নয়।

“এই দিনে” কী ঘটেছিল তা বোঝা আমাদের বর্তমানকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করে। আমরা আজ যে স্বাধীনতা ভোগ করছি, যে ভ্যাকসিনগুলো আমাদের নিরাপদ রাখছে, যে কম্পিউটারগুলো ব্যবহার করে আমরা এই নিবন্ধটি পড়ছি—এসব কিছুরই গভীর, অনস্বীকার্য শিকড় ২৮শে অক্টোবরে পোঁতা রয়েছে। এই যুগান্তকারী পরিবর্তনগুলো, বিখ্যাত মানুষদের জন্ম এবং হৃদয়স্পর্শী মৃত্যুগুলোর দিকে ফিরে তাকালে, আমরা ক্রমাগত চলতে থাকা মানব সভ্যতার এই চির-পরিবর্তনশীল গল্পের প্রতি এক গভীর উপলব্ধি অর্জন করতে পারি।

সর্বশেষ