চাকরির সাক্ষাৎকারে “নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন” প্রশ্নটি শুনে কেউ নিজের নাম ও শিক্ষাগত যোগ্যতা বলেই থেমে যান। কেউ আবার স্কুলজীবন থেকে শুরু করে আগের চাকরির প্রায় সব অভিজ্ঞতা বলতে থাকেন। অথচ নিয়োগকর্তা হয়তো জানতে চাইছেন, আবেদন করা পদটির জন্য আপনার কোন যোগ্যতাগুলো সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক।
এখানেই নিজের পরিচয় দেওয়ার আসল সমস্যা। বলার মতো তথ্যের অভাব সব সময় থাকে না। কোন তথ্য আগে বলবেন, কতটা বিস্তারিত জানাবেন এবং কোথায় থামবেন, তা ঠিক করাই কঠিন হয়ে পড়ে। ‘নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন’ প্রশ্নের একটি ভালো উত্তর তৈরি করতে নিজের বর্তমান কাজ বা পড়াশোনা, প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা এবং চাকরিটির প্রতি আগ্রহকে সংক্ষেপে তুলে ধরুন। শুরুতে এক মিনিটের মতো একটি উত্তর তৈরি করে অনুশীলন করতে পারেন। তবে নির্দিষ্ট সময় ধরে কথা বলার চেয়ে আপনার বক্তব্যে কী থাকছে, সেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকজনের সুন্দর করে লেখা পরিচয় আপনার ভালো লাগতেই পারে। কিন্তু সেটি মুখস্থ করার আগে ভাবুন, কথাগুলো আপনার নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে কতটা মেলে।
নিজের সম্পর্কে বলার অর্থ জীবনবৃত্তান্ত পড়ে শোনানো নয়
চাকরির সাক্ষাৎকারে নিজের পরিচয় দিতে বললে অনেক প্রার্থী শিক্ষাগত যোগ্যতা দিয়ে শুরু করেন। এরপর আগের চাকরি, প্রশিক্ষণ ও ব্যক্তিগত আগ্রহের কথা বলেন। এতে ভুল কিছু নেই। সমস্যা তৈরি হয় যখন সব তথ্যকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। ধরুন, একটি প্রতিষ্ঠানে বিপণন কর্মকর্তা পদে আবেদন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একটি অনুষ্ঠানের প্রচারণায় কাজ করেছিলেন। অনুষ্ঠানের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কী ধরনের লেখা বা ছবি দেওয়া হবে, কখন প্রকাশ করা হবে এবং প্রচারণার ফলাফল কেমন হচ্ছে, সেসব দেখার দায়িত্ব ছিল আপনার।
এই কাজের কথা সাক্ষাৎকারে বলা প্রাসঙ্গিক। কারণ নিয়োগকর্তা জানতে পারবেন, বিপণনের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু কাজের অভিজ্ঞতা আপনার রয়েছে। কিন্তু একই উত্তরে স্কুলের নাম, পরিবারের সদস্যসংখ্যা কিংবা ব্যক্তিগত শখের বিস্তারিত বিবরণ দিলে মূল কথাটি আড়ালে পড়ে যেতে পারে। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী সাধারণত আপনার পেশাগত পরিচয়, দক্ষতা এবং পদটির প্রতি আগ্রহ সম্পর্কে ধারণা নিতে চান। কেউ যোগাযোগের দক্ষতার দিকেও নজর দিতে পারেন। তবে সব নিয়োগকর্তা একই বিষয় মূল্যায়ন করেন, এমন নয়।
নিজের পরিচয় দেওয়ার আগে তাই একটি বিষয় ঠিক করে নিন। আপনার কোন অভিজ্ঞতাটি শুনলে নিয়োগকর্তা বুঝতে পারবেন, চাকরিটির দায়িত্ব সম্পর্কে আপনার কিছুটা ধারণা বা প্রস্তুতি রয়েছে? উত্তর সাজানোর শুরুটা সেখান থেকেই হতে পারে।
আরও পড়ুন: এটিএস (ATS) বান্ধব সিভি কী? মানুষ ও সফটওয়্যার দুজনের জন্য পড়তে সহজ সিভি
আগে চাকরির বিজ্ঞাপন পড়ুন, তারপর নিজের পরিচয় লিখুন

একই ব্যক্তির পরিচয় সব চাকরির সাক্ষাৎকারে হুবহু এক হওয়া জরুরি নয়। কারণ প্রতিষ্ঠানভেদে কাজের ধরন ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা বদলায়। আপনি যদি এমন দুটি পদে আবেদন করেন, যার একটিতে নিয়মিত প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে এবং অন্যটিতে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, তাহলে দুটি সাক্ষাৎকারে একই অভিজ্ঞতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া ঠিক নাও হতে পারে।
প্রথম পদটির জন্য তথ্য সংগ্রহ, এক্সেল ব্যবহার কিংবা প্রতিবেদন তৈরির কাজের কথা বলা প্রাসঙ্গিক হতে পারে। দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ বা সমস্যা সমাধানের অভিজ্ঞতা বেশি কাজে আসতে পারে। এ কারণে নিজের পরিচয় লেখার আগে বিজ্ঞাপনটি আবার পড়ুন। সেখানে কী দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে, তা দেখুন। তারপর নিজের পড়াশোনা ও কাজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
সব যোগ্যতা আপনার থাকতে হবে, এমন নয়। যেগুলো সত্যিই অর্জন করেছেন, সেগুলোই বলুন। কোনো কম্পিউটার সফটওয়্যার সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা থাকলে সেটিকে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের দক্ষতা হিসেবে দেখানোর প্রয়োজন নেই। একইভাবে কোনো প্রকল্পে দলের সদস্য হিসেবে কাজ করে থাকলে পুরো প্রকল্পের সাফল্য নিজের নামে দাবি করবেন না।
এই সতর্কতাগুলো ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু সাক্ষাৎকারে নিজের অভিজ্ঞতার বিস্তারিত জানতে চাইলে কথাগুলো ব্যাখ্যা করতে হবে।
উত্তর শুরু করবেন কীভাবে?
নিজের পরিচয় সাজানোর একটি পরিচিত উপায় হলো বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যৎ। অর্থাৎ এখন কী করছেন, আগে কী করেছেন এবং সামনে কী ধরনের কাজ করতে চান। এটি কোনো বাধ্যতামূলক নিয়ম নয়। তবে প্রথম খসড়া লিখতে গিয়ে কোথা থেকে শুরু করবেন, তা বুঝতে না পারলে পদ্ধতিটি কাজে লাগতে পারে। ধরা যাক, আপনি সম্প্রতি ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক শেষ করেছেন। এখন অনলাইন বিপণনের একটি পদে সাক্ষাৎকার দেবেন।
আপনি হয়তো প্রথমে এমন একটি উত্তর লিখলেন:
“আমার নাম রাহাত। আমি ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক শেষ করেছি। আমি একজন পরিশ্রমী, দায়িত্বশীল ও সময়নিষ্ঠ মানুষ। আমি নতুন কিছু শিখতে ভালোবাসি এবং একটি ভালো প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে চাই।” এই উত্তরে পরিচয় আছে, কিন্তু বিপণনের জন্য প্রার্থীর প্রস্তুতি সম্পর্কে তেমন কিছু বোঝা যাচ্ছে না। পরিশ্রমী বা দায়িত্বশীল হওয়ার দাবির পক্ষেও কোনো উদাহরণ নেই।
একই প্রার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিপণন প্রকল্পে কাজ করে থাকলে নিজের বক্তব্য এভাবে সাজাতে পারেন:
“আমি সম্প্রতি ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক শেষ করেছি। পড়াশোনার সময় অনলাইন বিপণনের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রকল্পে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের জন্য লেখা ও ছবি পরিকল্পনা এবং প্রকাশিত বিষয়বস্তুর ফলাফল পর্যবেক্ষণের কাজ করেছি। এখন একটি বিপণন দলে কাজ করে এই অভিজ্ঞতা আরও কাজে লাগাতে চাই।”
দ্বিতীয় উত্তরটি আগেরটির তুলনায় বেশি নির্দিষ্ট। কারণ এখানে একটি কাজের উদাহরণ রয়েছে। নিয়োগকর্তা চাইলে সেটি নিয়ে আরও প্রশ্ন করতে পারবেন।উদাহরণটি কাল্পনিক। আপনার নিজের কাজের সঙ্গে না মিললে কথাগুলো পরিবর্তন করতে হবে। খেয়াল রাখবেন, নিজের পরিচয় শুরু করার জন্য আলাদা করে কোনো আকর্ষণীয় উক্তি বা অসাধারণ অর্জন খুঁজতে হবে না। বর্তমানে কী করছেন, সেটি সরাসরি বলেও শুরু করা যায়।
চাকরির অভিজ্ঞতা না থাকলে প্রকল্পের কথা বলুন
সদ্য স্নাতক বা এখনো পড়াশোনা করছেন, এমন প্রার্থীদের জন্য নিজের পরিচয় তৈরি করা কিছুটা অস্বস্তিকর হতে পারে। বিশেষ করে আগে কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি না করলে মনে হতে পারে, বলার মতো অভিজ্ঞতা নেই। কিন্তু চাকরির অভিজ্ঞতা আর কাজের অভিজ্ঞতা পুরোপুরি এক বিষয় নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রকল্পে তথ্য সংগ্রহ করেছেন, গবেষণার কাজে সহায়তা করেছেন, দলের সঙ্গে একটি অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছেন কিংবা শিক্ষানবিশ হিসেবে নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব অভিজ্ঞতার মধ্যে কোনটি চাকরির সঙ্গে সম্পর্কিত, তা খুঁজে দেখুন।
যেমন, পরিসংখ্যান বিভাগের একজন শিক্ষার্থী তথ্য বিশ্লেষকের প্রাথমিক পর্যায়ের পদে আবেদন করছেন। তিনি আগে কোনো প্রতিষ্ঠানে এই পদে কাজ করেননি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রকল্পে জরিপের তথ্য সংগ্রহ ও এক্সেলে তথ্য সাজানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি সাক্ষাৎকারে সেই কাজের কথা বলতে পারেন। তথ্য সংগ্রহের সময় কী দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ফলাফল উপস্থাপনে কীভাবে যুক্ত ছিলেন, তাও সংক্ষেপে জানাতে পারেন।
এতে তাঁর প্রাথমিক দক্ষতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। এখানে নিজের অভিজ্ঞতাকে বড় করে দেখানোর দরকার নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রকল্পে এক্সেল ব্যবহার করেছেন মানেই নিজেকে অভিজ্ঞ তথ্য বিশ্লেষক হিসেবে পরিচয় দেওয়া ঠিক হবে না।
শিক্ষাগত ফলাফল খুব ভালো না হলেও একইভাবে প্রস্তুতি নিতে পারেন। নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিন। তবে পরিচয়ের পুরোটা ফলাফলের ব্যাখ্যায় ব্যয় করবেন না। প্রাসঙ্গিক কাজ, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার কথাও বলুন। অবশ্য ফলাফল সম্পর্কে সরাসরি জানতে চাইলে সেটি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না।
অভিজ্ঞ চাকরিপ্রার্থীদের সমস্যা একটু আলাদা
কয়েক বছর চাকরি করার পর নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে অনেক সময় উল্টো সমস্যায় পড়তে হয়। বলার মতো অভিজ্ঞতা বেশি থাকায় কোনটি বাদ দেবেন, তা ঠিক করা কঠিন হয়ে যায়।
মনে করুন, আপনি চার বছর ধরে একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালন কার্যক্রম বিভাগে কাজ করছেন। সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ, বিভিন্ন দলের কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, প্রতিবেদন তৈরি এবং দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান আপনার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
সাক্ষাৎকারে এসব কাজের প্রতিটির দীর্ঘ বিবরণ দিলে উত্তর অনেক বড় হয়ে যাবে।
এর চেয়ে নতুন পদের জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক দায়িত্বগুলো বেছে নিন। কোথায় কাজ করেছেন, এখন কী দায়িত্ব পালন করছেন এবং ভবিষ্যতে কী ধরনের দায়িত্ব নিতে চান, তা জানান।
উদাহরণ হিসেবে বলতে পারেন:
“গত চার বছর ধরে প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের কাজে যুক্ত আছি। বর্তমানে বিভিন্ন দলের কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্ব পালন করছি। এখন আরও বড় পরিসরে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনা ও কাজের প্রক্রিয়া উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত হতে চাই।”
তবে এ ধরনের উত্তরকে আরও নির্দিষ্ট করার সুযোগ রয়েছে।
আপনি যদি কোনো কাজের সময় কমিয়ে থাকেন, প্রতিবেদন তৈরির পদ্ধতি সহজ করে থাকেন কিংবা নতুন দায়িত্ব নিয়ে সফলভাবে কাজ শেষ করে থাকেন, তাহলে সেটি উল্লেখ করতে পারেন। অর্জনের কথা বলার সময় সংখ্যা দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকলে সংখ্যা ব্যবহার করুন। অন্যথায় কী পরিবর্তন করেছিলেন এবং সেখানে আপনার অবদান কী ছিল, তা ব্যাখ্যা করুন। পুরো দলের কাজকে নিজের ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখানোর প্রয়োজন নেই।
ক্যারিয়ার পরিবর্তনের কথা কীভাবে বলবেন?

ধরা যাক, আপনি কয়েক বছর শিক্ষকতা করেছেন। এখন একটি প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করতে চান। সাক্ষাৎকারে আগের পেশার সঙ্গে নতুন কাজের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন হতে পারে। কারণ শিক্ষকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের পরিবেশ আলাদা হলেও কিছু কাজের মধ্যে মিল রয়েছে। পাঠ পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণের উপকরণ তৈরি, শেখার অগ্রগতি মূল্যায়ন এবং অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিজ্ঞতা নতুন ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে।
তাই নিজের পরিচয়ে বলতে পারেন, শিক্ষকতার সময় প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা ও শেখার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের কাজে আপনার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এখন সেই অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে কর্মীদের প্রশিক্ষণসংক্রান্ত কাজে যুক্ত হতে চান। এ ধরনের দক্ষতাকে স্থানান্তরযোগ্য দক্ষতা বলা হয়। যোগাযোগ, পরিকল্পনা, সমস্যা সমাধান ও তথ্য বিশ্লেষণের মতো দক্ষতা বিভিন্ন পেশায় প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
তবে শুধু আগ্রহ থাকলেই নতুন পদের সব যোগ্যতা অর্জিত হয় না। নতুন ক্ষেত্রের জন্য কোনো প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বা প্রাসঙ্গিক প্রকল্পে কাজ করেছেন, এমন অভিজ্ঞতা থাকলে উল্লেখ করুন। আর কোথায় শেখার প্রয়োজন রয়েছে, সেটিও বুঝে নিন। আগের চাকরি ছাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পুরোনো প্রতিষ্ঠান বা সহকর্মীদের সমালোচনা করার দরকার নেই। বরং নতুন কাজের প্রতি আগ্রহের পেছনে যে পেশাগত কারণ রয়েছে, সেটি তুলে ধরুন।
ইংরেজিতে নিজের পরিচয় দেওয়ার সময়
অনেক চাকরিপ্রার্থী বাংলায় নিজের অভিজ্ঞতা ভালোভাবে বলতে পারলেও ইংরেজিতে আটকে যান। কখনো কারণ হয় শব্দভান্ডারের সীমাবদ্ধতা, কখনো আবার মুখস্থ করা বক্তব্য ঠিকভাবে মনে না থাকা। ইংরেজিতে উত্তর তৈরি করার সময় কঠিন শব্দ ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। পরিচিত শব্দ দিয়ে নিজের কাজের কথা পরিষ্কারভাবে বলার অনুশীলন করুন।
একজন সদ্য স্নাতকের জন্য একটি নমুনা উত্তরের বাংলা অর্থ হতে পারে:
“আমি সম্প্রতি ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক শেষ করেছি। পড়াশোনার সময় একটি বিপণন প্রকল্পে কাজ করেছি। সেখানে প্রচারণার বিষয়বস্তু পরিকল্পনা এবং ফলাফল পর্যালোচনায় সহায়তা করেছি। অনলাইন বিপণনের প্রতি আমার আগ্রহ রয়েছে। একটি পেশাদার দলের সঙ্গে কাজ করে নিজের দক্ষতা আরও বাড়াতে চাই।”
এটি কাল্পনিক নমুনা। নিজের বাস্তব তথ্য অনুযায়ী পরিবর্তন করতে হবে। ইংরেজিতে উত্তর লিখতে অসুবিধা হলে প্রথমে বাংলায় নিজের কথাগুলো লিখে নিতে পারেন। তারপর সহজ ইংরেজি বাক্যে সাজান। যে শব্দগুলো স্বাভাবিকভাবে বলতে পারেন না, সেগুলোর পরিবর্তে পরিচিত শব্দ ব্যবহার করুন।
কথা বলার সময় একটি বাক্য ভুল হলে পুরো পরিচয় আবার শুরু করার প্রয়োজন নেই। সম্ভব হলে সংশোধন করে এগিয়ে যান। তবে চাকরির জন্য ইংরেজিতে যোগাযোগের বিশেষ দক্ষতা প্রয়োজন হলে সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে হবে। সহজ ভাষায় পরিচয় দিতে পারা এবং পেশাগত কাজে প্রয়োজনীয় ইংরেজি দক্ষতা থাকা এক বিষয় নয়।
যে অভ্যাসগুলো নিজের পরিচয়কে দুর্বল করে
নিজের সম্পর্কে বলার সময় কিছু অভ্যাস অজান্তেই বক্তব্যের মান কমিয়ে দিতে পারে। একটি হলো অতিরিক্ত বিশেষণ ব্যবহার করা। যেমন, “আমি খুব পরিশ্রমী”, “আমি সব ধরনের পরিস্থিতিতে কাজ করতে পারি” কিংবা “আমি সব সময় নিখুঁতভাবে দায়িত্ব পালন করি।” এ ধরনের বক্তব্যের বদলে নিজের একটি কাজের উদাহরণ দিলে নিয়োগকর্তা দক্ষতা সম্পর্কে বেশি জানতে পারবেন।
আরেকটি হলো জীবনবৃত্তান্তের সব তথ্য ধারাবাহিকভাবে বলা। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশিক্ষণ ও চাকরির প্রতিটি ধাপের সমান গুরুত্ব নেই। আবেদন করা পদের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক তথ্যগুলোই অগ্রাধিকার দিন। কেউ কেউ নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও অনেক কথা বলেন। পরিবারের সদস্যসংখ্যা, বৈবাহিক অবস্থা বা ব্যক্তিগত শখ সাধারণত পেশাগত পরিচয়ের অপরিহার্য অংশ নয়। কোনো তথ্য সরাসরি চাকরির দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী উল্লেখ করতে পারেন।
মুখস্থ বক্তব্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করাও অসুবিধা তৈরি করতে পারে।
ধরুন, একটি সুন্দর ইংরেজি পরিচয় মুখস্থ করেছেন। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী মাঝখানে একটি প্রশ্ন করলেন। এরপর আবার আগের বক্তব্যে ফিরে যেতে গিয়ে কোথায় ছিলেন, সেটি মনে করতে পারছেন না। এমন পরিস্থিতি এড়াতে শব্দ ধরে মুখস্থ না করে মূল বিষয়গুলো মনে রাখুন। নিজের বর্তমান পরিচয়, প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা এবং চাকরিটির প্রতি আগ্রহ পরিষ্কার থাকলে পরিস্থিতি অনুযায়ী উত্তর কিছুটা বদলানো সহজ হয়।
উত্তর কতক্ষণ ধরে বলবেন?
নিজের পরিচয় দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সর্বজনীন সময়সীমা নেই। অনুশীলনের সময় ৬০ থেকে ৯০ সেকেন্ডের মধ্যে উত্তর বলার চেষ্টা করতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে প্রায় এক মিনিট যথেষ্ট হতে পারে। আবার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বা বিশেষ ধরনের পদের জন্য দুই মিনিটের কাছাকাছি সময় প্রয়োজন হতে পারে।
এখানে সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, আপনি প্রাসঙ্গিক কথা বলছেন কি না। এক মিনিটেই বক্তব্য পরিষ্কার হয়ে গেলে অকারণে আরও তথ্য যোগ করবেন না। আবার প্রয়োজনীয় কোনো অভিজ্ঞতা অসম্পূর্ণ রেখে শুধু সময় কমানোর জন্য দ্রুত কথা বলাও ঠিক নয়। নিজের বক্তব্য মুঠোফোনে ধারণ করে শুনতে পারেন। কোথায় অকারণে থামছেন, একই তথ্য বারবার বলছেন কি না কিংবা খুব দ্রুত কথা বলছেন কি না, তা বোঝার চেষ্টা করুন।
কাগজে লেখা অবস্থায় যে বাক্যটি ভালো মনে হয়েছিল, মুখে বলতে গিয়ে সেটি অস্বাভাবিক লাগতে পারে। এমন বাক্য সহজ করে নিন। পরিচিত কাউকে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর ভূমিকা নিতে বলেও অনুশীলন করতে পারেন। তিনি মাঝখানে প্রশ্ন করলে প্রস্তুত করা বক্তব্য শেষ করার জন্য জোর না করে নতুন প্রশ্নের উত্তর দিন। সাক্ষাৎকার একটি কথোপকথন। সব প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় দেওয়া সম্ভব নয়।
নিজের পরিচয়ের পর কী প্রশ্ন আসতে পারে?
আপনি যদি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রকল্পে দলের সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন, তাহলে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী জানতে চাইতে পারেন সেখানে আপনার নির্দিষ্ট কাজ কী ছিল। কোনো সমস্যা হয়েছিল কি না, কীভাবে কাজ ভাগ করেছিলেন কিংবা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে কী করেছিলেন, সেসব প্রশ্নও আসতে পারে।
একইভাবে আগের প্রতিষ্ঠানে কোনো প্রক্রিয়া উন্নত করার কথা বললে সেটি কীভাবে করেছেন, তা জানতে চাওয়া স্বাভাবিক। এ কারণে পরিচয়ে এমন তথ্য রাখুন, যার বিস্তারিত আপনি জানেন এবং ব্যাখ্যা করতে পারবেন।
দ্বিতীয় দফার সাক্ষাৎকারে নিজের পরিচয় দিতে বললেও মূল তথ্য একই রাখতে পারেন। তবে প্রথম সাক্ষাৎকারে পদটির দায়িত্ব সম্পর্কে নতুন কিছু জেনে থাকলে সেই অনুযায়ী প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। অনলাইনে সাক্ষাৎকার হলে ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন আগেই পরীক্ষা করে রাখুন। পাশে সংক্ষিপ্ত নোট রাখতে পারেন, কিন্তু পুরো বক্তব্য পড়ে শোনানোর পরিবর্তে স্বাভাবিকভাবে কথা বলার চেষ্টা করুন।
নিজের উত্তর তৈরি হয়ে গেলে আরেকবার দেখুন
‘নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন’ প্রশ্নের একটি উত্তর লিখে ফেলার পর প্রথমেই দেখুন, সেটি আসলে আপনার নিজের মতো শোনাচ্ছে কি না। আপনি বর্তমানে কী করছেন, কোন অভিজ্ঞতাটি চাকরির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং কেন পদটিতে আগ্রহী, তা বোঝা যাচ্ছে কি না, পরীক্ষা করুন।
এরপর অপ্রয়োজনীয় তথ্য বাদ দিন। যে বাক্যটি বলতে অস্বস্তি হয়, সেটি সহজ করে লিখুন। নিজের না করা কোনো কাজের কথা থাকলে সরিয়ে ফেলুন। অন্যের তৈরি নমুনা থেকে বক্তব্য সাজানোর ধারণা নেওয়া যায়। কিন্তু সেই নমুনার প্রতিটি বাক্য আপনার জীবনের সঙ্গে মিলে যাবে, এমন নয়। সাক্ষাৎকারে সবচেয়ে দীর্ঘ বা কঠিন শব্দে সাজানো পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের কাজ ও যোগ্যতা সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে বলতে পারা এবং প্রয়োজন হলে প্রতিটি কথার ব্যাখ্যা দিতে পারাই বেশি কাজে আসবে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
১. নিজের সম্পর্কে ৩০ সেকেন্ডে বলতে বলা হলে কীভাবে উত্তর দেবেন?
৩০ সেকেন্ডের মধ্যে পরিচয় দিতে হলে বর্তমান শিক্ষাগত বা পেশাগত অবস্থান, একটি প্রাসঙ্গিক দক্ষতা এবং চাকরিটির প্রতি আগ্রহ তুলে ধরুন। অতিরিক্ত ব্যাখ্যা এড়িয়ে চলুন। যেমন, “আমি সম্প্রতি ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক শেষ করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রকল্পে বাজার গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহের কাজ করেছি। এখন বিপণন বিভাগে কাজ করে এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চাই।” নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা অনুযায়ী উত্তরটি পরিবর্তন করবেন।
২. চাকরির অভিজ্ঞতা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রকল্প না থাকলে কী বলবেন?
আগে চাকরি বা প্রকল্পে কাজ না করলেও শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রাসঙ্গিক বিষয়ে শেখার চেষ্টা এবং পেশাগত আগ্রহের কথা বলতে পারেন। কোনো প্রশিক্ষণ বা কোর্স সম্পন্ন করে থাকলে সেটিও উল্লেখ করা যায়। তবে শুধু কোনো বিষয়ে আগ্রহ থাকাকে কাজের অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখাবেন না। কী শিখেছেন এবং কোন দক্ষতাগুলো আরও উন্নত করতে চান, তা পরিষ্কারভাবে জানান।
৩. চাকরির মাঝে দীর্ঘ বিরতি থাকলে নিজের পরিচয়ে কি তা উল্লেখ করতে হবে?
নিজের পরিচয়ের শুরুতেই চাকরির বিরতির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সাম্প্রতিক প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা ও বর্তমানে কোন ধরনের কাজ করতে আগ্রহী, সেদিকে গুরুত্ব দিন। তবে বিরতিটি আপনার কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলে সংক্ষেপে উল্লেখ করতে পারেন। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী সরাসরি জানতে চাইলে সত্য ও প্রাসঙ্গিক তথ্য দিয়ে উত্তর দিন। বিরতির সময় প্রশিক্ষণ বা দক্ষতা উন্নয়নের কাজ করে থাকলে সেটিও জানাতে পারেন।
৪. সাক্ষাৎকারে বাংলায় প্রশ্ন করলে ইংরেজিতে উত্তর দেওয়া উচিত কি?
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী বাংলায় প্রশ্ন করলে সাধারণত বাংলায় উত্তর দেওয়াই স্বাভাবিক। তবে তিনি ইংরেজিতে উত্তর দিতে বললে বা চাকরির জন্য ইংরেজি যোগাযোগের দক্ষতা যাচাই করা হলে ইংরেজিতে উত্তর দিতে হবে। ভাষা যেটিই হোক, নিজের অভিজ্ঞতা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করুন। কঠিন শব্দ ব্যবহার করার চেয়ে নির্ভুল ও সহজ বাক্যে কথা বলা বেশি উপযোগী।


