দেশভাগ, ট্রমা ও ঐতিহাসিক সংযোগ: ট্রিলজির বাইরে ঋত্বিকের সার্বিক চলচ্চিত্রে বাস্তুচ্যুতির মনস্তত্ত্ব

সর্বাধিক আলোচিত

ঋত্বিক ঘটকের সিনেমায় বাস্তুচ্যুতি শুধু সীমান্ত পেরিয়ে নতুন দেশে আশ্রয় নেওয়ার অভিজ্ঞতা নয়। কাজ হারিয়ে শহরে টিকে থাকার লড়াই, পরিচিত জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাওয়া, শৈশবের নিরাপত্তাবোধে ফাটল, নদীর সঙ্গে একটি জনগোষ্ঠীর বন্ধন হারানো কিংবা রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভিত নড়ে যাওয়া—তাঁর চলচ্চিত্রে ঘর হারানোর অনুভূতি এমন সব ভিন্ন রূপে ফিরে আসে। এই বিস্তার বুঝতে ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’ ও ‘সুবর্ণরেখা’র পরিচিত দেশভাগের ট্রিলজি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু যথেষ্ট নয়।

উদাহরণ হিসেবে ‘নাগরিক’-এর রামুকে দেখা যায় চাকরি ও স্থিতিশীল জীবনের খোঁজে অস্থির কলকাতায়; ‘অযান্ত্রিক’-এর বিমল মানুষের বদলে আঁকড়ে ধরে তার পুরোনো গাড়ি জগদ্দলকে; ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’র কাঞ্চন স্বপ্নের শহরে এসে আবিষ্কার করে অনিরাপদ জীবন; ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এ নদী শুকিয়ে গেলে জেলেসমাজ হারায় জীবিকার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব; আর ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’তে ব্যক্তিগত ভাঙন মিশে যায় ১৯৭১-পরবর্তী ইতিহাসের সঙ্গে। এরা একই ধরনের উদ্বাস্তু নয়। তবু প্রত্যেকের অভিজ্ঞতায় ফিরে আসে একটি প্রশ্ন: পরিচিত জগত ভেঙে গেলে মানুষ নিজেকে কোথায় স্থাপন করবে?

দেশভাগের ট্রিলজি কেন তাঁর গোটা চলচ্চিত্রজগৎকে ধরে না

‘মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০), ‘কোমল গান্ধার’ (১৯৬১) ও ‘সুবর্ণরেখা’ (১৯৬৫ সালে মুক্তি) সাধারণভাবে ঋত্বিক ঘটকের দেশভাগের ট্রিলজি হিসেবে পরিচিত। প্রথম ছবিতে উদ্বাস্তু পরিবারের ভার বইতে গিয়ে নীতার ব্যক্তিসত্তা ক্ষয়ে যায়। দ্বিতীয়টিতে ভেঙে যাওয়া গণনাট্যদল, প্রেম এবং দুই বাংলার বিচ্ছিন্নতা একে অন্যের প্রতিবিম্ব হয়ে ওঠে। তৃতীয়টিতে নতুন ঠিকানাও সামাজিক বৈষম্য, জাতপাত ও সম্পর্কের সংকট মেটাতে পারে না। ট্রিলজির শক্তি এখানেই—রাজনৈতিক মানচিত্রের ভাঙন ঘরের ভেতরের সম্পর্কে ছড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু ট্রিলজি নামটি চলচ্চিত্র-ইতিহাসের একটি সুবিধাজনক শ্রেণিবিভাগ, ঋত্বিকের বিষয়জগতের শেষ সীমানা নয়। চলচ্চিত্র-গবেষক ইরা ভাস্কর ‘নাগরিক’কে এই তিনটির সঙ্গে মিলিয়ে ‘পার্টিশন কোয়ার্টেট’ বা দেশভাগের চার চলচ্চিত্রের সমষ্টি হিসেবে পড়ার প্রস্তাব করেছেন। ২০১৯ সালে দ্য ক্রাইটেরিয়ন কালেকশনে প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ এবং ‘নাগরিক’-এর প্রকাশিত চিত্রনাট্যের ভূমিকায় এই ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। গবেষণাগতভাবে এর গুরুত্ব বড়: দেশভাগের নাম সরাসরি উচ্চারিত না হলেও তার সামাজিক অভিঘাত কোনো চলচ্চিত্রের প্রধান অনুপস্থিত উপস্থিতি হতে পারে।

ঋত্বিকের জীবন, চলচ্চিত্রভাষা ও ট্রিলজি নিয়ে Editorialge বাংলার পূর্বপ্রকাশিত আলোচনাটি এই পটভূমি বুঝতে সাহায্য করে। এখানে প্রশ্নটি একটু আলাদা—ট্রিলজির বাইরের চলচ্চিত্রগুলো তাঁর বাস্তুচ্যুতির ধারণাকে কীভাবে প্রসারিত করে?

‘নাগরিক’: শহরে থেকেও নিজের ঠিকানা না-পাওয়া

১৯৫২ সালে নির্মিত ‘নাগরিক’ ঋত্বিকের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র; তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৭৭ সালে এটি মুক্তি পায়। রামু কাজ খুঁজছে। তার পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট বাড়ছে, আর কলকাতা ক্রমেই এমন এক নগর হয়ে উঠছে যেখানে আশ্রয় মানে নিশ্চিত জীবন নয়। শহর রয়েছে, বাসার চার দেয়ালও রয়েছে, কিন্তু ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থা নেই।

ইরা ভাস্করের বিশ্লেষণে ‘নাগরিক’-এ দেশভাগ সরাসরি উল্লিখিত না হয়েও কাহিনির কাঠামোকে নিয়ন্ত্রণ করে। কর্মহীনতা, অতীতের হারানো স্থিতির স্মৃতি, ক্ষুধা ও বারবার অস্থির হয়ে পড়া জীবন মিলে এক ধরনের স্থানচ্যুত নাগরিকত্ব তৈরি করে। এখানে মানুষ শারীরিকভাবে শহরে উপস্থিত, কিন্তু নগর অর্থনীতি তাকে স্থায়ীভাবে নিজের বলে গ্রহণ করছে না।

এই চলচ্চিত্রের সংকীর্ণ ঘর, ছায়াচ্ছন্ন অভ্যন্তর ও আটকে থাকা চলাচলকে শুধু দারিদ্র্যের দৃশ্য হিসেবে নয়, মানসিক পরিসরের সংকোচন হিসেবেও পড়া যায়। রামুর অনিশ্চয়তা উদ্বাস্তু পরিবারের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত, তবে ছবিটি সব বেকার মানুষকে দেশভাগের শরণার্থী বলে না। বরং দেখায়, ইতিহাসের একটি বড় আঘাত মানুষের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক জীবনে কত দীর্ঘ ছায়া ফেলতে পারে।

ঋত্বিকের সিনেমায় বাস্তুচ্যুতির পাঁচ রূপ

‘অযান্ত্রিক’: জগদ্দলকে আঁকড়ে ধরা কি অন্য এক শিকড়ের সন্ধান?

‘অযান্ত্রিক’ (১৯৫৮) আপাতদৃষ্টিতে দেশভাগের চলচ্চিত্র নয়। ট্যাক্সিচালক বিমল তার পুরোনো শেভ্রলে গাড়ি ‘জগদ্দল’-এর সঙ্গে এমন সম্পর্ক গড়ে তোলে, যা নিছক মালিক ও যন্ত্রের সম্পর্কের বাইরে। গাড়িটি তার উপার্জনের উৎস, সঙ্গী এবং দীর্ঘদিনের পরিচিত জগতের অংশ। শিল্পায়নের বদলে যাওয়া পরিবেশে বিমলের এই সংযোগ একই সঙ্গে হাস্যরসাত্মক ও গভীর বেদনাময়।

এখানে দেশান্তর ঘটছে না বলে ছবির অস্থিরতাকে ১৯৪৭ সালের শরণার্থী অভিজ্ঞতার সরাসরি প্রতিরূপ ধরা ভুল হবে। কিন্তু ‘অযান্ত্রিক’ দেখায়, আধুনিকতার দ্রুত পরিবর্তনে একটি মানুষ কীভাবে পরিচিত সামাজিক সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। জগদ্দলের প্রতি বিমলের অনুরাগকে তাই প্রযুক্তিপ্রীতি বলার চেয়ে স্থায়িত্ব হারানোর ভয় ও সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা হিসেবে পড়লে বেশি কিছু বোঝা যায়।

এই পাঠের পক্ষে Film at Lincoln Center-এর চলচ্চিত্র-পরিচিতিও গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে বিমলকে পরিবর্তিত শিল্পসমাজে নিজেকে মানিয়ে নিতে সংগ্রাম করা এক মানুষ হিসেবে দেখা হয়েছে। তাঁর গাড়ির সঙ্গে কথোপকথনের মতো আচরণ কেবল অদ্ভুত অভ্যাস নয়; এক ক্রমবদলমান জগতে সম্পর্ক ধরে রাখার বিকল্প পথ। তা অবশ্যই ছবির একটি ব্যাখ্যা, কোনো চরিত্রের মনোরোগ নির্ণয় নয়।

‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’: ঘর ছেড়ে যাওয়ার স্বাধীনতা ও ঘর না-পাওয়ার ভয়

কাঞ্চন স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় আসে। ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ (১৯৫৯) তাই বাধ্যতামূলক দেশান্তরের গল্প নয়—এই পার্থক্যটি জরুরি। কাঞ্চনের চোখে কলকাতা শুরুতে স্বাধীনতা ও বিস্ময়ের সম্ভাবনা। কিন্তু সেখানে সে এমন মানুষদের দেখে, যাঁদের জীবন অনিশ্চিত কাজ, দারিদ্র্য ও প্রতারণার সঙ্গে জড়ানো।

Film at Lincoln Center-এর বিবরণে দেখা যায়, কাঞ্চন একসময় এমন একজন শিক্ষকের দেখা পায় যিনি জীবিকার তাগিদে রাস্তায় ফেরি করেন; তার সামনে আসে আরও নানা বিপন্ন নগরজীবন। শিশুর কৌতূহল ও দর্শকের সমাজ-অভিজ্ঞতার মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়, সেটিই ছবির রাজনৈতিক ও আবেগগত শক্তি।

এখানে একটি অভিনব বিপরীত সম্পর্ক রয়েছে: কাঞ্চন নিজের ঘর থেকে পালাতে পারে, কারণ তার ফিরে যাওয়ার ধারণাটি এখনও সম্ভব। অন্যদিকে যাঁরা জীবিকা বা ইতিহাসের চাপে ঠিকানা হারিয়েছেন, তাঁদের সবার জন্য সেই ফিরে যাওয়ার পথ খোলা নয়। ফলে কাঞ্চনের শহরভ্রমণ বাস্তুচ্যুতির দুটি ভিন্ন অভিজ্ঞতাকে পাশাপাশি রাখে—ইচ্ছাকৃত যাত্রা এবং বাধ্যতামূলক বিচ্ছেদ। দুটিকে এক করে না ফেলেই তাদের মধ্যে একটি সামাজিক সংযোগ দেখা যায়।

‘তিতাস একটি নদীর নাম’: একটি ভূগোল মারা গেলে মানুষের স্মৃতির কী হয়

স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে নির্মিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ (১৯৭৩) ঋত্বিকের চলচ্চিত্রজীবনে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাস থেকে নির্মিত চলচ্চিত্রটির কাহিনি দেশভাগ-পূর্ব পূর্ববঙ্গের নদীতীরবর্তী জেলেসমাজকে কেন্দ্র করে। অথচ ছবিটি তৈরি হয়েছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরে, যখন ঋত্বিক আবার তাঁর হারানো জন্মভূমির ভূগোলে কাজ করার সুযোগ পান। কাহিনির ঐতিহাসিক সময় এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের সময় আলাদা—এই দুই স্তর মিলিয়েই ছবিটির গভীরতা বোঝা যায়।

তিতাসের সঙ্গে মালো জেলেদের সম্পর্ক শুধু নদী থেকে মাছ আহরণের নয়। নদীর পানি, যাতায়াত, শ্রম, উৎসব, আত্মীয়তা ও বসতি মিলে তাদের জীবনব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। নদী যখন বদলে যায় এবং শুকিয়ে আসে, তখন বিপন্ন হয় একটি গোটা সমাজের পরিচয়। একটি জনগোষ্ঠী হয়তো একই অঞ্চলে রয়ে গেল, কিন্তু যে পরিবেশ তাকে ‘নিজের জায়গা’ বলে চিনিয়েছিল, সেটি আর আগের মতো নেই।

Criterion Channel ছবিটিকে ক্রমশ বিলুপ্ত হতে থাকা এক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মহাকাব্য হিসেবে বর্ণনা করেছে। BFI-এর আলোচনায় ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের সঙ্গে নদী-নির্ভর বাস্তুসংস্থানের ভঙ্গুরতা যুক্ত হয়েছে। বর্তমান জলবায়ু-বাস্তুচ্যুতির আলোচনার সঙ্গে এ চলচ্চিত্রের একটি ধারণাগত সংযোগ অবশ্যই আছে; কিন্তু সেই আধুনিক শব্দবন্ধকে ছবির চরিত্রদের মুখে বা পরিচালকের প্রত্যক্ষ ঘোষণায় বসিয়ে দেওয়া ইতিহাসসম্মত হবে না।

‘তিতাস’-এ স্মৃতি কোনো এক ব্যক্তির মাথায় বন্দি নয়; তা নদীর গতিপথ, জাল, নৌকা, কথ্যভাষা এবং মানুষের পারস্পরিক নির্ভরতার মধ্যে বেঁচে থাকে। তাই এখানে হারিয়ে যাওয়া বাড়ির চেয়েও বড় ক্ষতি হলো একটি সম্মিলিত পৃথিবীর হারিয়ে যাওয়া।

‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’: বাস্তুচ্যুতি যখন রাজনৈতিক আত্মজিজ্ঞাসা

১৯৭৪ সালে নির্মিত এবং ১৯৭৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ ঋত্বিকের শেষ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। এখানে পরিচালক নিজেই নীলকণ্ঠ বাগচী চরিত্রে অভিনয় করেন—একজন বিপর্যস্ত বুদ্ধিজীবী, যার ব্যক্তিজীবনের সংকট বৃহত্তর রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে জড়িয়ে যায়। পথে তার সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশের এক তরুণী শরণার্থী বঙ্গবালা এবং আরও কয়েকজন বিচিত্র সহযাত্রী।

এই ছবিতে ১৯৪৭ সালের ক্ষত একা কাজ করছে না। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ, ভারতে নকশাল আন্দোলন, রাজনৈতিক মতবিরোধ এবং একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধা পরস্পরকে ছেদ করে। BFI চলচ্চিত্রটিকে আত্মজৈবনিক কল্পকাহিনি বা auto-fiction-এর রূপে ব্যাখ্যা করেছে; ব্যক্তিগত ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক সংকট একই যাত্রায় মুখোমুখি হয়।

বঙ্গবালার উপস্থিতি দেশত্যাগের বাস্তব ইতিহাসকে ছবিতে নিয়ে আসে। নীলকণ্ঠের ক্ষেত্রে ভাঙন অন্য ধরনের—বিশ্বাস, পরিবার, কাজ ও রাজনৈতিক অবস্থানের বিচ্যুতি। এই দুই ক্ষতি সমান নয়। ছবিটি বরং তাদের মুখোমুখি বসিয়ে জিজ্ঞেস করে, ইতিহাসের প্রতি দায় কীভাবে নেওয়া সম্ভব, যখন নিজের জীবনও বিধ্বস্ত। এখানে বাস্তুচ্যুতি শুধু ভৌগোলিক নয়; নৈতিক ও আদর্শিক অবস্থান হারানোর অভিজ্ঞতাও।

শব্দ, নদী, রেললাইন: স্মৃতি কীভাবে চলচ্চিত্রের ভাষা হয়ে ওঠে

ঋত্বিকের ছবিতে ক্ষতকে বোঝানোর জন্য প্রতিবার কোনো চরিত্রের মুখে দেশভাগের ইতিহাস বলাতে হয় না। রেলের চলাচল, অসমাপ্ত রাস্তা, দূর থেকে ভেসে আসা গান, যন্ত্রের শব্দ, নদীর ফাঁকা বিস্তার কিংবা ঘরের অস্বস্তিকর সংকীর্ণতা গল্পের সমান্তরালে কথা বলে।

‘মেঘে ঢাকা তারা’য় নীতার অপমান ও অসহায়তার মুহূর্তে ব্যবহৃত আকস্মিক তীক্ষ্ণ শব্দ কেবল বাস্তব পরিবেশের আওয়াজ নয়; দর্শককে চরিত্রের অনুভূতির ধাক্কা শোনায়। ইরা ভাস্করের Criterion-এ প্রকাশিত বিশ্লেষণে দৃশ্যের স্বাভাবিক শব্দ এবং দৃশ্যের বাইরে যুক্ত শব্দের এই বিন্যাসের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে। ‘কোমল গান্ধার’-এ গান, গণনাট্যের মহড়া এবং বিভক্ত দলের সম্পর্ক সাংস্কৃতিক বিচ্ছেদের এক ভাষা গড়ে তোলে।

‘অযান্ত্রিক’-এ জগদ্দলের কণ্ঠস্বরের মতো ইঞ্জিনের আওয়াজ বিমলের সম্পর্কের ভাষা; ‘তিতাস’-এ নদী ও জনপদের ছন্দ স্মৃতির বাহন; ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’য় সংলাপ ও তর্ক ইতিহাসের সঙ্গে অসহমতের শব্দ। নানা ছবির এই আলাদা পদ্ধতি মিলিয়ে বোঝা যায়, ঋত্বিকের চলচ্চিত্রে ট্রমা শুধু কাহিনির বিষয় নয়, ছবির ছন্দ, শব্দ ও নির্মাণশৈলীরও বিষয়। এটি একটি নন্দনতাত্ত্বিক পাঠ, চিকিৎসাবিজ্ঞানের রোগনির্ণয় নয়।

১৯৪৭, ১৯৭১ ও তার আগের নদীজীবন: তিনটি সময় এক নয়

ঋত্বিকের চলচ্চিত্রকে একটিমাত্র ঐতিহাসিক তারিখে আটকে দিলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হারিয়ে যায়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ছিল রাষ্ট্রসীমা বদল ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত এক ব্যাপক জনবিচ্ছেদ; ‘নাগরিক’ ও পরিচিত ট্রিলজি তার পরবর্তী সামাজিক জীবনকে অনুসরণ করে। ‘তিতাস’-এর কাহিনি তারও আগের নদীতীরবর্তী সমাজে স্থাপিত, কিন্তু চলচ্চিত্র নির্মাণের ঐতিহাসিক পটভূমি স্বাধীন বাংলাদেশ। আর ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’য় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধোত্তর টানাপোড়েন সরাসরি রাজনৈতিক সংলাপের অংশ।

এই সময়গুলো পাশাপাশি পড়লে একটি সংযোগ ধরা পড়ে: ঘর কেবল সম্পত্তি বা ঠিকানা নয়। রাষ্ট্র, অর্থনীতি, নদী, পরিবার ও সংস্কৃতি মিলে মানুষের একটি ‘বাড়ি’ তৈরি করে। তার যে কোনো স্তর ভেঙে গেলে মানুষ একই জায়গায় বসবাস করেও বিচ্ছিন্ন বোধ করতে পারে। কিন্তু ইতিহাসের নির্দিষ্ট কারণগুলো—দেশভাগ, দারিদ্র্য, শিল্পায়ন, পরিবেশগত ক্ষয়, যুদ্ধ—আলাদা করে চিহ্নিত না করলে এই তুলনা অতিরিক্ত সরল হয়ে যায়।

ঋত্বিকের সিনেমায় বাস্তুচ্যুতির স্বরূপ

 

কার ক্ষতি দৃশ্যমান, কার ক্ষতি অদৃশ্য

এই আটটি চলচ্চিত্রকে একসঙ্গে পড়ার আরেকটি মূল্য আছে। ঋত্বিকের উদ্বাস্তু-জগতে সব মানুষের কষ্ট সমানভাবে স্বীকৃতি পায় না। ‘মেঘে ঢাকা তারা’র নীতা সংসারের অর্থনৈতিক বোঝা বহন করতে গিয়ে নিজের আকাঙ্ক্ষার জায়গা হারায়; ‘সুবর্ণরেখা’র সীতার জীবন সামাজিক শ্রেণি ও জাতপাতের নিষেধে ক্রমেই সংকুচিত হয়। ‘তিতাস’-এ জেলেসমাজের ভাঙন একটি জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা, যা শহুরে মধ্যবিত্তের ইতিহাসে প্রায়ই অনুপস্থিত থেকে যায়।

এই বৈচিত্র্যই ‘ট্রমা’ শব্দটি সতর্কভাবে ব্যবহারের কারণ। চরিত্রদের কোনো ক্লিনিক্যাল মানসিক রোগ আছে—এমন দাবি করার প্রমাণ নেই এবং তা চলচ্চিত্র-বিশ্লেষণের উদ্দেশ্যও নয়। এখানে ট্রমা বলতে ইতিহাসের অভিঘাতে স্মৃতি, নিরাপত্তাবোধ, সম্পর্ক ও নিজের জায়গা সম্পর্কে বিশ্বাসের ক্ষত বোঝানো হচ্ছে। একই শব্দ দিয়ে সব ঘটনার কারণ, গভীরতা বা নৈতিক গুরুত্ব সমান ঘোষণা করা হচ্ছে না।

ঋত্বিককে নতুন করে পড়ার প্রশ্ন

ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে কেবল ‘হারানো দেশ’ নয়, হারানোর পর মানুষ কী নিয়ে বাঁচে—সে প্রশ্ন। ‘নাগরিক’-এ কাজের আশা, ‘অযান্ত্রিক’-এ সঙ্গের আকাঙ্ক্ষা, ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’তে শিশুর শেখা, ‘তিতাস’-এ সামষ্টিক স্মৃতি, ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’য় তর্ক করার অধিকার—সব কিছুর মধ্যে টিকে থাকার একেকটি চেষ্টা দেখা যায়।

দেশভাগের ট্রিলজি তাই ঋত্বিককে বোঝার প্রবেশদ্বার; তাঁর সমগ্র চলচ্চিত্রজগৎ নয়। ট্রিলজির বাইরে তাকালেই স্পষ্ট হয়, তাঁর সিনেমার সবচেয়ে স্থায়ী প্রশ্নটি সীমান্তের অবস্থান নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হলো: যে জগৎ মানুষকে পরিচয় দিয়েছিল, সেটি ভেঙে গেলে সে কীভাবে আবার অন্য মানুষ, অন্য ভূগোল এবং নিজের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে?

সর্বশেষ