ঋত্বিক কুমার ঘটক: মৃত্যুর ৫০ বছর পরেও কেন তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের অবিসংবাদিত ‘দ্রষ্টা’? [৫০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে অজর শ্রদ্ধার্ঘ্য]

সর্বাধিক আলোচিত

আজ, ২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি। বাংলা চলচ্চিত্রের ক্যালেন্ডারে আজকের দিনটি একটি বিশেষ শোকের, একইসাথে নতুন করে জেগে ওঠার দিন। ঠিক ৫০ বছর আগে, ১৯৭৬ সালের এই দিনে, কলকাতার পিজি হাসপাতালের এক মলিন বিছানায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন বাংলা সিনেমার ‘ত্রাস’ এবং ‘বিস্ময়’—ঋত্বিক কুমার ঘটক। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল মাত্র ৫১ বছর। 

কিন্তু ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে ৫০ বছর পার হয়ে গেলেও, ঋত্বিক ঘটক আজও বিস্মৃত হননি; বরং সময়ের সাথে সাথে তার প্রাসঙ্গিকতা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

কেন আজও পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটের ছাত্র থেকে শুরু করে ঢাকার শাহবাগের আড্ডায় ঋত্বিক ঘটক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু? কেন মার্টিন স্করসেসি বা স্লাভয় জিজেকের মতো বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্বরা তার কাজকে ‘মাস্টারপিস’ বলে আখ্যায়িত করেন? উত্তরটি লুকিয়ে আছে তার সৃষ্টির মূল দর্শনে—যেখানে তিনি নিছক গল্প বলেননি, তিনি তুলে ধরেছেন এক ছিন্নমূল সময়ের দলিল। ঋত্বিক ঘটক কেবল একজন পরিচালক ছিলেন না; তিনি ছিলেন দেশভাগের যন্ত্রণায় দগ্ধ এক ঋষি, যিনি সেলুলয়েডের ফিতায় গেঁথে দিয়ে গেছেন বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংকট।

ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট (BFI) এবং ক্রাইটেরিয়ন কালেকশনের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি আজ তার কাজকে বিশ্ব চলচ্চিত্রের সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণ করছে, যা প্রমাণ করে তার প্রাসঙ্গিকতা কাঁটাতারের বেড়া বা সময়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়।

১. দেশভাগ ও ঋত্বিক: এক অবিচ্ছেদ্য সত্তা এবং মানসিক মানচিত্র

ঋত্বিক ঘটকের নাম উচ্চারিত হলেই যে শব্দটি অবধারিতভাবে চলে আসে, তা হলো—দেশভাগ (Partition of 1947)। কিন্তু ঋত্বিকের কাছে দেশভাগ কেবল একটি রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক বিভাজন ছিল না; এটি ছিল লক্ষ লক্ষ মানুষের মানসিক মৃত্যু এবং একটি সমৃদ্ধ সংস্কৃতির দ্বিখণ্ডায়ন।

ঋত্বিক নিজে ছিলেন পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) সন্তান। নিজের জন্মভূমি ত্যাগ করে পশ্চিমবঙ্গে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেওয়ার যন্ত্রণা তিনি আজীবন বয়ে বেড়িয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাংলা ভাগ হলেও বাঙালির সংস্কৃতি ভাগ করা সম্ভব নয়। তার সিনেমায় বারবার উঠে এসেছে রিফিউজি কলোনি, দারিদ্র্য, এবং মধ্যবিত্তের অবক্ষয়।

২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও ঋত্বিক

আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ঋত্বিক ঘটক কেন প্রাসঙ্গিক? কারণ, পৃথিবী আজও ‘উদ্বাস্তু’ সমস্যার সমাধান করতে পারেনি।

  • জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (UNHCR)-এর ২০২৫ সালের গ্লোবাল ট্রেন্ডস রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে বর্তমানে ১১ কোটিরও বেশি মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত (Forcibly Displaced)।
  • ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংঘাত বা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট বাস্তুচ্যুতির দিকে তাকালে আজ ঋত্বিক ঘটকের সেই ছিন্নমূল মানুষের হাহাকারই যেন প্রতিধ্বনিত হয়। ঋত্বিক দেখিয়েছিলেন, রিফিউজি হওয়া মানে কেবল মাথার ছাদ হারানো নয়, বরং নিজের ‘ইতিহাস’ এবং ‘শিকর’ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া। এই ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’ বা আত্মপরিচয়ের সংকট আজকের গ্লোবাল ভিলেজে আরও প্রকট।

২. প্রথাগত চলচ্চিত্রের বাইরে: ঋত্বিকের বৈপ্লবিক সিনেমাটিক ভাষা

ঋত্বিকের বৈপ্লবিক সিনেমাটিক ভাষা

ঋত্বিক ঘটক ভারতীয় চলচ্চিত্রের গতানুগতিক ধারাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিলেন। তিনি হলিউডি ধাঁচের মসৃণ গল্প বলার রীতিতে (Classic Narrative Structure) বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি বলতেন, “Cinema is not an art, it is a means to serve my people.” (সিনেমা কোনো শিল্প নয়, এটি আমার মানুষের সেবা করার মাধ্যম)।

তার নির্মাণশৈলী ছিল একাধারে ব্রেখটীয় (Brechtian), মহাকাব্যিক এবং মিথলজিক্যাল। নিচে তার টেকনিক্যাল দক্ষতার কিছু দিক তুলে ধরা হলো:

ক. লেন্সের চরম ব্যবহার ও কম্পোজিশন

তিনি তার সিনেমায় ১৮ মিমি এবং ২৪ মিমি ওয়াইড-অ্যাঙ্গেল লেন্সের (Wide Angle Lens) প্রচুর ব্যবহার করতেন।

  • কেন এই ব্যবহার? ‘মেঘে ঢাকা তারা’ বা ‘সুবর্ণরেখা’ ছবিতে চরিত্রদের ক্লোজ-আপ শটগুলোতে তিনি এমনভাবে লেন্স ব্যবহার করেছেন, যাতে চরিত্রগুলো অদ্ভুতভাবে বিকৃত দেখায়। এটি কোনো কারিগরি ত্রুটি ছিল না। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন, পারিপার্শ্বিক সমাজ এবং পরিস্থিতির চাপে মানুষ কীভাবে ভেতর থেকে দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে।
  • ডিপ ফোকাস (Deep Focus): তিনি প্রায়ই ফ্রেমে সামনের চরিত্র এবং পেছনের দিগন্তকে একই সাথে ফোকাসে রাখতেন, যা বুঝিয়ে দিত ব্যক্তি তার পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং পরিবেশের দাস।

খ. ব্রেখটীয় এলিয়েনেশন (Alienation Effect)

জার্মান নাট্যকার বের্টোল্ট ব্রেখটের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি দর্শকদের সিনেমায় পুরোপুরি মজে থাকতে দিতেন না। তিনি চাইতেন দর্শক সচেতন থাকুক।

  • ‘কোমল গান্ধার’-এ হঠাৎ করে ক্যামেরা লেন্সের দিকে তাকিয়ে চরিত্রের কথা বলা বা ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’-তে চরিত্রের সরাসরি দর্শকদের উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়া—এগুলো দর্শককে ধাক্কা দেয় এবং ভাবতে বাধ্য করে।

গ. সাউন্ডস্কেপ: শব্দের জাদুকরী ব্যবহার

শব্দ ব্যবহারে ঋত্বিক ছিলেন বিপ্লবাত্মক। তিনি কেবল আবহসংগীত ব্যবহার করতেন না, বরং প্রাকৃতিক শব্দকে প্রতীকে পরিণত করতেন।

  • চাবুকের শব্দ: ‘মেঘে ঢাকা তারা’-য় নীতার যন্ত্রণার মুহূর্তগুলোতে চাবুকের সপাং সপাং শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যা সমাজের অদৃশ্য আঘাতের প্রতীক।
  • ফুটন্ত ভাতের শব্দ: ভাতের হাড়ির টগবগ শব্দ দিয়ে তিনি ক্ষুধা এবং অভাবকে মূর্ত করে তুলেছিলেন।
  • যান্ত্রিক শব্দ: ‘অযান্ত্রিক’ ছবিতে গাড়ির শব্দকে তিনি জীবন্ত করে তুলেছিলেন।

৩. মিথ ও আর্কিটাইপ: পুরাণের আধুনিক ব্যবহার (Mythological Realism)

ঋত্বিক ঘটক কার্ল জংয়ের (Carl Jung) কালেক্টিভ আনকনশাস’ বা সামষ্টিক অবচেতনের তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি জানতেন, বাঙালির অবচেতনে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের পুরাণ। তাই তিনি আধুনিক সমস্যার সমাধানে বা বর্ণনায় মিথের ব্যবহার করতেন অসামান্য দক্ষতায়।

চলচ্চিত্র ব্যবহৃত মিথ/প্রতীক বিস্তারিত ব্যাখ্যা
মেঘে ঢাকা তারা দেবী দুর্গা/জগদ্ধাত্রী নীতা কেবল একজন সাধারণ নারী নয়। সে পুরো সংসারের ভার বহনকারী ‘জগদ্ধাত্রী’। ছবির শেষে তার পাহাড়ে মিলিয়ে যাওয়া যেন উমার কৈলাসে ফেরার প্রতীক।
সুবর্ণরেখা মা কালী বহুরূপী যখন কালীর বেশে আসে, তখন তা ধ্বংস ও বিনাশের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। সীতার মৃত্যু যেন এক বলিদানের ইঙ্গিত।
তিতাস একটি নদীর নাম ভগবতী বাসন্তী চরিত্রটি যেন স্বয়ং নদী বা প্রকৃতি, যে সবকিছু নীরবে সহ্য করে এবং লালন করে।
যুক্তি তক্কো আর গপ্পো নীলকণ্ঠ (শিব) ঋত্বিক নিজে এখানে ‘নীলকণ্ঠ’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যিনি সমাজের সব বিষ পান করেও বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন।

৪. দেশভাগ ট্রিলজি: বাঙালির মহাকাব্যিক দলিল

ঋত্বিক ঘটকের তিনটি চলচ্চিত্রকে একত্রে ‘পার্টিশন ট্রিলজি’ বা দেশভাগ ত্রয়ী বলা হয়। এই তিনটি ছবি ছাড়া বাংলা সিনেমার ইতিহাস অসম্পূর্ণ।

ক. মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০): ত্যাগের আখ্যান

এই ছবিটি ঋত্বিকের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং আবেগঘন সৃষ্টি। শক্তিপদ রাজগুরুর উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই ছবিতে নীতা (সুপ্রিয়া দেবী) চরিত্রটি শোষণের এক চিরন্তন প্রতীক।

  • বিশ্লেষণ: নীতা সবার জন্য সব কিছু ত্যাগ করে, কিন্তু বিনিময়ে পায় কেবল বঞ্চনা। ছবির শেষ দৃশ্যে নীতার সেই বিখ্যাত উক্তি, “দাদা, আমি বাঁচতে চাই”—পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে। এটি কেবল একটি সংলাপ নয়, এটি ছিল তৎকালীন লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর বাঁচার আর্তি। ফরাসি সমালোচকরা একে ‘মেলোড্রামা ও আধুনিকতার শ্রেষ্ঠ সংমিশ্রণ’ বলেছেন।

খ. কোমল গান্ধার (১৯৬১): বিভাজন ও মিলনের স্বপ্ন

এখানে ঋত্বিক দেখিয়েছেন দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ঐক্যের স্বপ্ন। ‘গণনাট্য সংঘ’ (IPTA)-এর প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই ছবিতে তিনি দেখিয়েছেন, রাজনীতি দেশ ভাগ করতে পারে, কিন্তু সংস্কৃতিকে নয়।

  • আইকনিক দৃশ্য: রেললাইনের সমান্তরাল পথ এবং মাঝখানে ভেঙে যাওয়া বাফারের (Buffer Stop) দৃশ্যটি বিচ্ছেদের এক অসামান্য প্রতীক। ক্যামেরা যখন ধাবমান ট্রেনের সামনে এসে হঠাৎ থেমে যায়, তখন মনে হয় ইতিহাস যেন থমকে গেছে।

গ. সুবর্ণরেখা (১৯৬২/৬৫): অন্ধকারের দলিল

এটি সম্ভবত ঋত্বিকের সবচেয়ে অন্ধকার এবং নিষ্ঠুর ছবি। এখানে তিনি দেখিয়েছেন দেশভাগের ফলে কীভাবে নৈতিক অবক্ষয় ঘটে।

  • বিশ্লেষণ: সীতা এবং তার দাদা ঈশ্বরের সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং শেষ পর্যন্ত এক মর্মান্তিক পরিণতির মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, নতুন আবাসে (New Home) আশ্রয় পেলেও পুরোনো পাপ এবং অতীত মানুষকে ছাড়ে না। ‘সুবর্ণরেখা’ নদীটি এখানে জীবনের প্রবাহ নয়, বরং মৃত্যুর সাক্ষী।

৫. অযান্ত্রিক: মানুষ, যন্ত্র ও আজকের এআই (AI)

১৯৫৮ সালে মুক্তি পাওয়া অযান্ত্রিক’ ছবিটি বিশ্ব চলচ্চিত্রে একটি মাইলফলক। সুবোধ ঘোষের গল্প অবলম্বনে নির্মিত এই ছবিতে ট্যাক্সি ড্রাইভার বিমল এবং তার জরাজীর্ণ গাড়ি ‘জগদ্দল’-এর সম্পর্ক দেখানো হয়েছে।

  • আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা: ২০২৬ সালে আমরা যখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) এবং মানুষের সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে কথা বলছি, ঋত্বিক ১৯৫৮ সালেই দেখিয়েছিলেন যে মানুষ যন্ত্রের মধ্যে ‘প্রাণ’ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। বিমল যখন তার গাড়িটিকে মানুষের মতো ভালোবাসে, তখন তা আজকের প্রযুক্তিনির্ভর একাকীত্বেরই পূর্বভাস দেয়। এটি প্রমাণ করে ঋত্বিক কতটা দূরদর্শী ছিলেন।

৬. তিতাস একটি নদীর নাম: শিকড়ের সন্ধানে

১৯৭৩ সালে অদ্বৈত মল্লবর্মণের কালজয়ী উপন্যাস অবলম্বনে স্বাধীন বাংলাদেশে ঋত্বিক ঘটক তৈরি করেন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’।

  • বিষয়বস্তু: এই ছবিতে কোনো একক নায়ক নেই; এখানে ‘নদী’ এবং ‘মালো সম্প্রদায়’-ই মূল চরিত্র। নদী শুকিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে একটি সংস্কৃতির মরে যাওয়া—এই সমান্তরাল পতন তিনি দেখিয়েছেন নির্মম সততায়।
  • স্বীকৃতি: ২০০৭ সালে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের (BFI) এক জরিপে এই ছবিটি ‘সেরা বাংলাদেশি চলচ্চিত্র’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। মার্টিন স্করসেসি-র ‘ওয়ার্ল্ড সিনেমা প্রজেক্ট’ (World Cinema Project) এই ছবিটিকে পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ করেছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঋত্বিকের গুরুত্ব প্রমাণ করে।

৭. যুক্তি তক্কো আর গপ্পো: আত্মজীবনীমূলক স্বীকারোক্তি

১৯৭৪ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবিটি ঋত্বিকের ‘সোয়ান সং’ (Swan Song) বা শেষ কাজ। এখানে নীলকণ্ঠ বাগচী চরিত্রে তিনি নিজেই অভিনয় করেছেন।

  • দর্শন: একজন মাতাল, ব্যর্থ বুদ্ধিজীবী এবং তার সমাজকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি স্বীকার করেছেন, তিনি বিভ্রান্ত, কিন্তু অসৎ নন। তিনি বলেছিলেন, “আমি মাতাল, কিন্তু ভ্রষ্ট নই।”
  • রাজনীতি: ছবিতে নকশাল আন্দোলনের সময়কাল, পুলিশের এনকাউন্টার এবং রাজনৈতিক অবক্ষয় উঠে এসেছে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন রাজনীতির নামে তরুণদের বিভ্রান্ত হওয়া নিয়ে।

৮. ঋত্বিক বনাম সত্যজিৎ: একটি ভুল বিতর্ক ও তুলনামূলক আলোচনা

বাঙালি চলচ্চিত্র প্রেমীদের আড্ডায় প্রায়ই সত্যজিৎ রায় এবং ঋত্বিক ঘটকের মধ্যে তুলনা টানা হয়। কিন্তু সত্য বলতে, তাদের পথ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

বৈশিষ্ট্য সত্যজিৎ রায় ঋত্বিক ঘটক
মূল সুর ধ্রুপদী, সংযত, পরিশীলিত (Apollonian) বন্য, অসংযত, আবেগের বিস্ফোরণ (Dionysian)
নির্মাণশৈলী লজিক্যাল এবং ডিটেইল ওরিয়েন্টেড মহাকাব্যিক এবং রূপকধর্মী
শেষ দৃশ্য প্রায়ই আশাবাদ বা উন্মুক্ত সমাপ্তি থাকে ট্র্যাজেডি বা আর্তনাদ থাকে
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্বজনীন মানবিকতা লোকজ ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক ক্ষোভ


সত্যজিৎ রায় নিজেই ঋত্বিকের সম্পর্কে বলেছিলেন, “Ritwik was one of the few truly original talents in the cinema of this country.” তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল শ্রদ্ধার। ঋত্বিক বলেছিলেন, “Satyajit is gigantic, I am distinct.”

৯. পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে ঋত্বিক: শিক্ষকের ভূমিকায়

ঋত্বিক ঘটক পুনের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া (FTII)-তে কিছু সময় উপাধ্যক্ষ এবং অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন জাদুকরী।

  • শিষ্যকুল: মণি কল (Mani Kaul), কুমার সাহানি (Kumar Shahani), জন আব্রাহাম (John Abraham)-এর মতো ভারতের ‘প্যারালাল সিনেমা’ বা সমান্তরাল চলচ্চিত্রের দিকপালরা ছিলেন তার সরাসরি ছাত্র।
  • শিক্ষা: তিনি ছাত্রদের শিখিয়েছিলেন, “ক্যামেরা কেবল ছবি তোলার যন্ত্র নয়, এটি বিপ্লবের হাতিয়ার।” তার লেকচারগুলো আজও চলচ্চিত্র বিদ্যার অমূল্য সম্পদ হিসেবে ‘Cinema and I’ বইতে সংকলিত আছে।

১০. ব্যক্তিগত জীবন ও ট্র্যাজেডি: এক ভ্যান গগ-সম চরিত্র

ঋত্বিক ঘটকের জীবন ছিল ট্র্যাজেডিতে ভরা। অতিরিক্ত মদ্যপান, মানসিক অসুস্থতা এবং অকাল মৃত্যু—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন এক ভ্যান গগ-সম চরিত্র। ১৯৭১ সালে তাকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। কিন্তু সেই অবস্থাতেও তিনি সৃষ্টিশীল ছিলেন। তার জীবনের এই বিশৃঙ্খলা তার শিল্পকে আরও ধারালো করেছিল। তিনি কখনোই আপোষ করেননি, না বাণিজ্যিক সিনেমার সাথে, না নিজের আদর্শের সাথে।

শেষ কথা: কেন আজ ২০২৬ সালেও তিনি প্রাসঙ্গিক?

৫০ বছর পর, যখন আমরা ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ঋত্বিককে স্মরণ করছি, তখন তাঁর প্রাসঙ্গিকতা কেবল একটি স্মৃতিচারণ নয়। এর পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ:

  1. সাংস্কৃতিক বিচ্যুতি: বিশ্বায়নের যুগে মানুষ যখন নিজের সংস্কৃতি ভুলে ‘গ্লোবাল সিটিজেন’ হওয়ার ইঁদুর দৌড়ে শামিল, ঋত্বিক তখন আমাদের মনে করিয়ে দেন মাটির কথা। তিনি বলেছিলেন, ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো।”
  2. নারীবাদী পাঠ: ঋত্বিকের নারী চরিত্ররা (যেমন: নীতা বা সীতা) কেবল ভুক্তভোগী নয়, তারা জগতকে ধারণ কারী শক্তি। আজকের নারীবাদী আলোচনায় ঋত্বিকের সৃষ্ট নারী চরিত্রগুলো নতুন করে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
  3. রাজনৈতিক সততা: ঋত্বিক বিশ্বাস করতেন শিল্প মানুষের জন্য, এবং মানুষের মুক্তির জন্য রাজনীতি অপরিহার্য। আজকের সুবিধাবাদী শিল্পের ভিড়ে ঋত্বিকের এই আপোষহীন মনোভাব এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
  4. আবেগ বনাম কৃত্রিমতা: আজকের দিনে যখন এআই (AI) দিয়ে কন্টেন্ট তৈরি হচ্ছে, তখন ঋত্বিকের ছবির সেই কাঁচা, অমার্জিত কিন্তু তীব্র মানবিক আবেগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যন্ত্র কখনো মানুষের যন্ত্রণার গভীরতা স্পর্শ করতে পারে না।

আজকের এই দিনে, যখন বিশ্বজুড়ে সাম্প্রদায়িকতা, যুদ্ধ এবং বাস্তুচ্যুতির খবর প্রতিদিনের শিরোনাম, তখন ঋত্বিক ঘটক আমাদের বিবেক হয়ে ফিরে আসেন। ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে এই মহান শিল্পীর প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। ঋত্বিক ঘটক, আপনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন—বাঙালির মননে, চেতনায় এবং দ্রোহে।

সর্বশেষ