আমাদের মাথার ওপর থেকে সরে যাওয়া সেই বটবৃক্ষ: বাবা জয়ন্ত কুমার কুণ্ডুর প্রয়াণ দিবস স্মরণে

সর্বাধিক আলোচিত

ফেব্রুয়ারি। মাসটা এলেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি হয়ে যায়। পৃথিবীর কাছে এটা হয়তো বসন্তের মাস, ভালোবাসার মাস, ভাষার মাস। কিন্তু আমার কাছে? ফ্রেব্রুয়ারি আর এপ্রিল হলো শোকের মাস! ক্যালেন্ডারের পাতায় ফেব্রুয়ারি আর এপ্রিল—এই দুটি মাস আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দুটি ক্ষত। এপ্রিলে হারিয়েছি মাকে, আর ফেব্রুয়ারিতে বাবাকে।

আজ ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। ঠিক চার বছর হলো আমাদের মাথার ওপর থেকে সেই বিশাল বটবৃক্ষটি সরে গেছে, যার ছায়ায় আমরা রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে নিশ্চিন্তে বড় হয়েছি। বাবা জয়ন্ত কুমার কুণ্ডু আজ নেই, কিন্তু তাঁর অভাব প্রতি মুহূর্তে আমাদের ঘিরে থাকে।

এক অসম যুদ্ধের ইতিবৃত্ত

বাবার শরীরটা হার মেনেছিল হাসপাতালের বিছানায়, কিন্তু তাঁর মনটা ভেঙে গিয়েছিল আরও ১০ মাস আগে—১ এপ্রিল, ২০২১ -এ, যেদিন আমাদের প্রাণপ্রিয় মা কণিকা রাণী কুণ্ডু আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে যান। মা ছিলেন বাবার অস্তিত্বের অর্ধেকটা। মা চলে যাওয়ার পর বাবা যেন ভেতর থেকে ফুরিয়ে যাচ্ছিলেন।

এরপর এলো সেই অভিশপ্ত সময়। ২০২২ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি বাবার দ্বিতীয় অপারেশনটি হয়। ডাক্তারদের সিদ্ধান্তে তাঁর বাম পায়ের কিছুটা অংশ কেটে ফেলতে হয় (Partial Amputation)। ভাবুন তো, যে মানুষটা একাত্তরের রণাঙ্গনেসংগঠক হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সারা জীবন মাইলের পর মাইল হেঁটে ছাত্রদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন, তিনি হঠাৎ জানলেন তিনি আর স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারবেন না!

মায়ের চলে যাওয়ার শোক আর নিজের এই পঙ্গুত্ব—এই দুইয়ের ভার বাবা আর সইতে পারেননি। অপারেশনের পর টানা ১২টি দিন আইসিইউতে তিনি জীবনের সঙ্গে পাঞ্জা লড়েছেন। একদিকে বাঁচার অদম্য ইচ্ছে, অন্যদিকে প্রিয়তমা স্ত্রীর কাছে চলে যাওয়ার টান—এই দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুই জয়ী হলো। ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ তিনি আমাদের মায়া কাটিয়ে চলে গেলেন।

স্মৃতির দিনপঞ্জি

সময় ঘটনা ও স্মৃতি
১ এপ্রিল, ২০২১ মায়ের প্রস্থান: বাবার জীবনের আলো নিভে যাওয়ার দিন।
১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ অপারেশন: বাবার বাম পায়ের আংশিক এম্পুটেশন।
১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ বাবার প্রস্থান: মায়ের মৃত্যুর ঠিক ১০ মাস ১৩ দিন পর।
শেষ ১২ দিন আইসিইউর লড়াই: শরীরের সাথে মনের এক নীরব যুদ্ধ।

একজন শিক্ষক, একজন বিপ্লবী এবং তাঁর আদর্শ

একজন শিক্ষক, একজন বিপ্লবী এবং তাঁর আদর্শ

বাবা জয়ন্ত কুমার কুন্ডু কেবল একজন ব্যক্তি ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক জীবন্ত ইতিহাস। পেশায় শিক্ষক, কিন্তু চেতনায় পুরোদস্তুর বিপ্লবী। আমার দাদু অনন্তমোহন কুণ্ডুর রক্ত ছিল তাঁর শরীরে, যিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করেছিলেন, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর সাহচর্য পেয়েছিলেন। বাবা সেই মশাল বহন করেছেন একাত্তরের রণাঙ্গনে।

তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট—বামপন্থী (Left-Line Politics)। কিন্তু তাঁর রাজনীতি ক্ষমতার জন্য ছিল না, ছিল মানুষের জন্য। তিনি আজীবন মুক্তচিন্তা (Free Thinking) এবং বাক-স্বাধীনতার (Free Speech) পক্ষে কথা বলেছেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে তিনি কখনো দুবার ভাবতেন না। সমাজে কুসংস্কারের অন্ধকার দূর করে ‘প্রগতির আলো’ জ্বালানোই ছিল তাঁর ব্রত।

বাবা: এক নজরে

পরিচয় বৈশিষ্ট্য
মুক্তিযোদ্ধা ১৯৭১ সালে দেশের জন্য লড়েছেন নিঃশর্তভাবে।
আদর্শ বামপন্থী ও মানবতাবাদী; শোষিত মানুষের পক্ষে উচ্চকণ্ঠ।
পেশা শিক্ষক ও সমাজ সংস্কারক।
চরিত্র অন্যায়ের সাথে আপোষহীন, স্পষ্টবাদী।

সুসময়ের আগেই ঝরে পড়া পাতা

বাবার জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ বা ট্র্যাজেডি হলো—তিনি ‘সুসময়ের’ ফসলটুকু ভোগ করে যেতে পারেননি। সারাটা জীবন তিনি আর মা মিলে হাড়ভাঙ্গা খাটাখাটনি করেছেন। সংসারের অভাব-অনটন আর “নিরানন্দের ঢেউ” সামলে তাঁরা আমাদের মানুষ করেছেন। তিল তিল করে আমাদের ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন।

আজ যখন আমরা স্বাবলম্বী, আজ যখন সংসারে স্বচ্ছলতা এসেছে, তখন সেটা দেখার জন্য তাঁরা কেউ নেই। তাঁরা রোদে পুড়ে গাছ লাগালেন, কিন্তু সেই গাছের ছায়ায় একটু জিরিয়ে নেওয়ার সময় পেলেন না। এই অপরাধবোধ আমাকে কুড়ে কুড়ে খায়।

ওপারে ভালো থেকো বাবা

বাবা, আজ চার বছর হলো তুমি নেই। কিন্তু আমাদের প্রতিটি কাজে, প্রতিটি অর্জনে তোমার ছায়া আছে। তুমি ছিলে আমাদের সেই বটবৃক্ষ, যে ঝড়-ঝাপটা নিজের গায়ে মেখে আমাদের রক্ষা করেছে।

জানি না মৃত্যুর পর মানুষের কী হয়। তবে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে, তুমি এখন মায়ের সাথে আছো। যেখানেই থাকো, দুজনে ভালো থেকো। তোমাদের দেখানো পথেই আমরা হাঁটছি, আর হাঁটব।

বিনম্র শ্রদ্ধা রইলো প্রাণপ্রিয় বাবার প্রতি। 

আকাশের ঠিকানায় খোলা চিঠি

বাবা,

চার বছর হয়ে গেল। পৃথিবী বদলে গেছে। আমিও বদলে গেছি। কিন্তু বসার ঘরে তোমার রেখে যাওয়া শূন্যস্থানটা আজও একই আছে।

আশা করি তুমি মাকে খুঁজে পেয়েছো! আশা করি সেখানে তুমি আবার দুই পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছো—এমন এক জায়গায় যেখানে কোনো ব্যথা নেই, অপারেশন নেই, শোক নেই। হয়তো সেখানেও তুমি তোমার প্রয়াত কমরেড বন্ধুদের সঙ্গে পলিটিক্স নিয়ে তর্ক করছো, তাদের শেখাচ্ছ বিপ্লব কাকে বলে, মানবতা কাকে বলে!

আমরা ভালো আছি। আমরা লড়াই করছি। আমরা বেঁচে আছি। কারণ তুমি আমাদের এভাবেই বাঁচতে শিখিয়েছ।

শান্তিতে ঘুমাও, আমার মহানায়ক, আমার অনুপ্রেরণার বাতিঘর। আবার দেখা হবে হয়ত কোন এক ফাগুন সন্ধ্যায় তোমার ফেরার পথে…

সর্বশেষ