১৯ ফেব্রুয়ারি – ইতিহাসের এই দিনে – বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা, জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী

সর্বাধিক আলোচিত

ইতিহাসের পাতা সবসময় শান্ত থাকে না, তবে ১৯ ফেব্রুয়ারি দিনটি মানব সভ্যতার টাইমলাইনে এক বিশেষ ‘শোরগোল’ তোলা তারিখ হিসেবে চিহ্নিত। এই দিনটিকে বলা যেতে পারে “প্রথম আঘাতের দিন”—সেটা হতে পারে মহাবিশ্ব সম্পর্কে প্রাচীন ধারণার মূলে প্রথম আঘাত, মারাঠা পরিচয়ের প্রথম হুঙ্কার, কিংবা রেকর্ড করা শব্দের প্রথম স্পন্দন। আবার একই সাথে এটি এক গভীর আত্মোপলব্ধির দিন, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ভয়ের সংস্কৃতি কীভাবে নাগরিক স্বাধীনতাকে নিমেষেই কেড়ে নিতে পারে।

১৯ ফেব্রুয়ারিকে বোঝা মানে হলো কর্তৃত্ব বনাম সত্য এবং সাম্রাজ্য বনাম স্বাধীনতার মধ্যকার চিরন্তন লড়াইকে বোঝা।

বাঙালি ও দক্ষিণ এশীয় প্রেক্ষাপট

দক্ষিণ এশিয়ায় ফেব্রুয়ারি মাস মানেই এক বিপ্লবী আবহাওয়া। বিশেষ করে বাংলা ও মারাঠা অঞ্চলের জন্য এই তারিখটি এমন কিছু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিত্বের জন্ম দিয়েছে, যারা আধুনিক ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন।

ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ (১৬৩০)

যদিও বিভিন্ন পঞ্জিকা অনুসারে তারিখের কিছুটা হেরফের হয়, তবে ১৯ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী ‘শিবাজী জয়ন্তী’ হিসেবে পালিত হয়।

  • স্বাধীনতার স্থপতি: শিবনেরি দুর্গে জন্ম নেওয়া শিবাজী কেবল একজন রাজাই ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক দূরদর্শী জননেতা যিনি প্রতাপশালী মুঘল সাম্রাজ্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। তিনি “হিন্দভি স্বরাজ্য” (স্বদেশী শাসন) এর স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন এবং একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন যা ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির মোকাবিলা করতে সক্ষম ছিল।

  • গেরিলা যুদ্ধ: তাকে “গণিমি কাভা” বা গেরিলা যুদ্ধকৌশলের প্রবর্তক হিসেবে গণ্য করা হয়। এই কৌশলের মাধ্যমেই ছোট বাহিনী নিয়ে তিনি বিশাল ও প্রথাগত বাহিনীকে পরাজিত করতে পারতেন।

অমৃতবাজার পত্রিকা: কলম যখন অস্ত্র (১৮৬৮)

১৮৬৮ সালের এই দিনে যশোরের (বর্তমান বাংলাদেশ) মাগুরা গ্রামে ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ তার যাত্রা শুরু করে।

  • সেই “রাতারাতি” অলৌকিক ঘটনা: ১৮৭৮ সালে ব্রিটিশ সরকার ‘ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট’ পাস করে যাতে দেশীয় ভাষার সংবাদপত্রগুলো সরকারের সমালোচনা করতে না পারে। অমৃতবাজার পত্রিকা তখন ছিল একটি বাংলা সাপ্তাহিক। আইন থেকে বাঁচতে পত্রিকাটি মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের পুরো কার্যক্রম ইংরেজিতে রূপান্তর করে একটি ইংরেজি দৈনিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই দুঃসাহসিক অবাধ্যতা ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক কিংবদন্তি হয়ে আছে।

বছর ঘটনা তাৎপর্য
১৬৩০ শিবাজী মহারাজের জন্ম মারাঠা সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন।
১৮৬৮ অমৃতবাজার পত্রিকার যাত্রা বাংলায় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্ম।
১৯১৫ গোপাল কৃষ্ণ গোখলের মৃত্যু একজন মহান মডারেট নেতা ও গান্ধীর রাজনৈতিক গুরুর প্রয়াণ।
১৯৯২ নারায়ণ সান্যালের মৃত্যু বিজ্ঞান ও সাহিত্যের মেলবন্ধন ঘটানো প্রখ্যাত সাহিত্যিকের প্রয়াণ।

বিশ্ব ইতিহাস

বিশ্ব ইতিহাস

উপমহাদেশের বাইরেও এই দিনটি বড় ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী।

যুক্তরাষ্ট্র: ৯-০-৬-৬ নম্বর নির্বাহী আদেশের কালো ছায়া (১৯৪২)

পার্ল হারবার আক্রমণের কয়েক মাস পর, ১৯৪২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ‘এক্সিকিউটিভ অর্ডার ৯০৬৬’ স্বাক্ষর করেন।

  • পরিণতি: এর ফলে প্রায় ১,১০,০০০ জাপানি বংশোদ্ভূত আমেরিকানকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে জোরপূর্বক সরিয়ে ইন্টার্নমেন্ট ক্যাম্পে বন্দি করা হয়।

  • বর্তমান গুরুত্ব: বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে এই দিনটি ‘ডে অফ রিমেম্বারেন্স’ বা স্মরণ দিবস হিসেবে পালিত হয়। এটি গণতন্ত্রের ভঙ্গুরতা এবং জাতীয় সংকটের সময় বর্ণবাদী কুসংস্কারের ভয়াবহতা সম্পর্কে আমাদের সতর্ক করে।

রাশিয়া: দাসপ্রথার বিলুপ্তি (১৮৬১)

জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার এই দিনে ‘ইমানসিপেশন ম্যানিফেস্টো’ স্বাক্ষর করেন, যার ফলে প্রায় ২ কোটি ৩০ লক্ষ সার্ফ বা ভূমিদাস মুক্তি পায়। এটি ছিল রাশিয়ার ইতিহাসের এক বিশাল সামাজিক রূপান্তর, যা ১৯১৭ সালের বিপ্লবের পথ প্রশস্ত করেছিল।

বিখ্যাত জন্মবার্ষিকী: ১৯ ফেব্রুয়ারি

বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় (১৮৯৮ – ১৯৭৪)

নদীয়া জেলার শান্তিপুরে জন্ম নেওয়া এই প্রখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী ও কবি ছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমসাময়িক। তিনি সাম্যবাদী চিন্তা ও স্বদেশি আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তার লেখনীতে সাধারণ মানুষের বঞ্চনা ও বিদ্রোহের সুর ফুটে উঠত।

সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯০১ – ১৯৭৪)

ঠাকুর পরিবারের এই সন্তান ছিলেন একজন বিশিষ্ট সাম্যবাদী নেতা, লেখক এবং চিন্তাবিদ। তিনি ‘রেভোলিউশনারি কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (RCPI)-র প্রতিষ্ঠাতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভ্রাতুষ্পুত্র হওয়া সত্ত্বেও তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।

নিকোলাস কোপার্নিকাস (১৪৭৩)

পোল্যান্ডের তোরুন শহরে জন্ম নেওয়া কোপার্নিকাস সেই অসাধ্যটি সাধন করেছিলেন যা ভাবাও অসম্ভব ছিল: তিনি সূর্যকে মহাবিশ্বের কেন্দ্রে স্থাপন করেছিলেন। তার ‘ডি রেভোলিউশনিবাস’ বইটি বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সূচনা করে।

থমাস এডিসনের ফোনোগ্রাফ (১৮৭৮)

এটি কোনো মানুষের জন্মদিন নয়, বরং একটি প্রযুক্তির “জন্মদিন”। ১৮৭৮ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি এডিসন ফোনোগ্রাফের পেটেন্ট লাভ করেন। মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মানুষের কণ্ঠস্বর তার দেহের চেয়েও বেশিদিন বেঁচে থাকার সুযোগ পায়। এটিই আজকের ভিনাইল রেকর্ড থেকে শুরু করে স্পটিফাই—সবকিছুর আদি পিতা।

১৯ ফেব্রুয়ারির আরও কিছু উল্লেখযোগ্য জন্ম:

  • ডেভিড গ্যারিক (১৭১৭): ইংরেজি থিয়েটারে ‘স্বাভাবিক’ অভিনয় শৈলীর প্রবর্তক।

  • স্ভেন হেডিন (১৮৬৫): সুইডিশ অভিযাত্রী যিনি মধ্য এশিয়ার মানচিত্র তৈরি করেছিলেন।

  • সিল (১৯৬৩): ব্রিটিশ গায়ক ও গীতিকার, যার “কিস ফ্রম এ রোজ” গানটি বিশ্বখ্যাত।

  • মিলি ববি ব্রাউন (২০০৪): বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও কালচারাল আইকন।

উল্লেখযোগ্য প্রয়াণ: ১৯ ফেব্রুয়ারি

  • হার্পার লি (২০১৬): ‘টু কিল আ মকিংবার্ড’ এর রচয়িতা এই দিনে পৃথিবীকে বিদায় জানান। তিনি কয়েক প্রজন্মকে শিখিয়েছেন সহানুভূতি এবং নির্দোষকে আঘাত করার পাপ সম্পর্কে।

  • উমবার্তো ইকো (২০১৬): ইতালীয় দার্শনিক ও ঔপন্যাসিক, যিনি আমাদের ‘দ্য নেম অফ দ্য রোজ’ উপহার দিয়েছিলেন।

  • বন স্কট (১৯৮০): বিখ্যাত হার্ড রক ব্যান্ড AC/DC-এর লিড ভোকালিস্ট। তার কণ্ঠ আজও রক মিউজিক প্রেমীদের অনুপ্রেরণা।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও মজার তথ্য

  • ইও জিমা দিবস: ১৯৪৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি মার্কিন মেরিন সেনারা ইও জিমা দ্বীপে অবতরণ করে, যা ছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় যুদ্ধের অন্যতম রক্তক্ষয়ী অধ্যায়।

  • ২ ডলারের নোট: ১৮৬২ সালের এই দিনে মার্কিন কংগ্রেস প্রথমবারের মতো ১ ও ২ ডলারের নোট ইস্যু করার অনুমতি দেয়।

  • জমাটবদ্ধ নায়াগ্রা: ইতিহাসে কয়েকবার (বিশেষ করে ১৮৪৮ ও ১৯১২ সালে) এই সময়ে চরম শৈত্যপ্রবাহের কারণে নায়াগ্রা জলপ্রপাতের কিছু অংশ জমে গিয়ে এক অদ্ভুত বরফের সেতু তৈরি করেছিল।

শেষ কথা

১৯ ফেব্রুয়ারি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ইতিহাস কেবল বড় কোনো স্থাপত্য বা যুদ্ধের নাম নয়; এটি সেইসব মানুষের গল্প যারা তাদের চিন্তা, নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা এবং সাহস দিয়ে পৃথিবীতে ছাপ রেখে গেছেন। রাজনৈতিক মোড় পরিবর্তন থেকে শুরু করে যুগান্তকারী আবিষ্কার—সবই এই তারিখের সাথে মিশে আছে। আমরা যখন এই দিনটির দিকে ফিরে তাকাই, আমরা বুঝতে পারি যে অতীত কীভাবে আমাদের বর্তমানকে প্রভাবিত করে এবং ভবিষ্যতের জন্য অনুপ্রাণিত করে।

সর্বশেষ