বৈশাখের তীব্র গরম থেকে বাঁচতে ৭টি বৈশাখী ফল — জেনে নিন রেসিপি ও উপকারিতা 

সর্বাধিক আলোচিত

বৈশাখের শুরু মানেই বাঙালি জীবনে নতুন বছরের আনন্দ। কিন্তু এই উৎসবের মাঝেই আমাদের মুখোমুখি হতে হয় তীব্র রোদ আর ভ্যাপসা গরমের। এই সময়ে অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীরে পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন দেখা দেয়। ক্লান্তি, মাথাব্যথা ও দুর্বলতা দূর করতে শুধু পানি পান করাই সবসময় যথেষ্ট নয়। আমাদের দরকার এমন পুষ্টিকর খাবার, যা শরীরকে সতেজ রাখবে।

প্রকৃতি আমাদের এই সময়ের জন্য দারুণ কিছু ফল উপহার দিয়েছে। এগুলো শরীর ঠান্ডা রাখে এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগায়। আসুন, গরমের ফল সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই। গরমে শরীর ঠান্ডা রাখার ফল হিসেবে নিচে আলোচিত ৭টি বৈশাখী ফল আমাদের সবার কাছেই অত্যন্ত পরিচিত। নিচে এই ফলগুলোর চমৎকার সব উপকারিতা এবং সহজে তৈরি করা যায় এমন কিছু মজাদার বৈশাখী রেসিপি দেওয়া হলো।

১. আম

আম খেতে পছন্দ করেন না এমন মানুষ সত্যিই কম আছে। কাঁচা এবং পাকা দুই রকম আমই এই সময়ে বাজারে প্রচুর পাওয়া যায়। বিশেষ করে কাঁচা আম বা কচি আম শরীরের তাপমাত্রা কমাতে দারুণ কাজ করে।

কাদের জন্য উপযোগী : গরমে তাৎক্ষণিক প্রশান্তি পেতে এবং পানিশূন্যতা রোধ করতে।

কেন এটি উপকারী : কাঁচা আমে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে যা অতিরিক্ত গরমে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দেয়।

বিশেষ উপকারিতা :

  • শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত বাড়ায়।
  • খাবার হজম করতে এবং পেটের গ্যাস দূর করতে অত্যন্ত উপকারী।
  • ভেতর থেকে শরীরকে সতেজ করে তোলে।

যা খেয়াল রাখা জরুরি: অতিরিক্ত চিনি দিয়ে শরবত বানালে ক্যালরি বেড়ে যেতে পারে তাই চিনির পরিমাণ কম রাখাই ভালো।

নিচে খুব সহজেই তৈরি করা যায় এমন মজাদার কাঁচা আমের শরবত তৈরির রেসিপি দেওয়া হলো।

রেসিপির নাম উপকরণ প্রস্তুতির ধাপ প্রস্তুতির সময়
কাঁচা আমের শরবত ১টি বড় কাঁচা আম, ২ টেবিল চামচ চিনি, আধা চা চামচ বিট লবণ, ১টি কাঁচা মরিচ এবং ২ গ্লাস ঠান্ডা পানি। ১. প্রথমে আম ভালোভাবে সেদ্ধ করে বা আগুনে পুড়িয়ে এর ভেতরের নরম পাল্প বের করে নিন। ২. ব্লেন্ডারে আমের পাল্প, চিনি, বিট লবণ, কাঁচা মরিচ এবং পানি দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। ৩. গ্লাসে ঢেলে কয়েক টুকরো বরফ কুচি দিয়ে পরিবেশন করুন। ১০ মিনিট

আমের শরবতের পর গ্রীষ্মের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো তরমুজ।

২. তরমুজ 

তীব্র গরমের দুপুরে এক টুকরো ঠান্ডা তরমুজ নিমিষেই শরীরের সমস্ত ক্লান্তি দূর করে দেয়। বৈশাখের ফল হিসেবে এটি সবার পছন্দের তালিকায় ওপরের দিকে থাকে।

উপযোগীতা: শরীর দীর্ঘক্ষণ ঠান্ডা রাখতে এবং ডিহাইড্রেশন দূর করতে।

কেন এটি উপকারী: তরমুজের প্রায় ৯২ শতাংশই পানি যা ঘামের কারণে তৈরি হওয়া পানির অভাব খুব দ্রুত পূরণ করে।

বিশেষ উপকারিতা:

  • এতে থাকা লাইকোপেন নামক উপাদান রোদে পোড়া ত্বকের জন্য খুব ভালো কাজ করে।
  • রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
  • হার্ট সুস্থ রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

যা খেয়াল রাখা জরুরি: ফ্রিজ থেকে বের করে সাথে সাথে অতিরিক্ত ঠান্ডা তরমুজ খাওয়া গলার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

খুব সহজেই তরমুজের জুস তৈরির পদ্ধতি নিচের ছকে দেওয়া হলো।

রেসিপির নাম উপকরণ প্রস্তুতির ধাপ প্রস্তুতির সময়
তরমুজের জুস ২ কাপ তরমুজের টুকরো (বিচি ছাড়া), ১ চা চামচ তাজা লেবুর রস, ৩ বা ৪টি পুদিনা পাতা এবং সামান্য বরফ কুচি। ১. ব্লেন্ডারে তরমুজের টুকরো, লেবুর রস ও পুদিনা পাতা একসঙ্গে মসৃণ হওয়া পর্যন্ত ব্লেন্ড করে নিন। ২. চাইলে একটি ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে নিতে পারেন। ৩. গ্লাসে ঢেলে বরফ কুচি মিশিয়ে ঠান্ডা ঠান্ডা পরিবেশন করুন। ৫ মিনিট

তরমুজের মিষ্টি স্বাদের পর এবার আসা যাক টক মিষ্টি আনারসের কথায়।

৩. আনারস 

আনারস একটি অত্যন্ত সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর ফল। এর চমৎকার টক মিষ্টি স্বাদ গরমে মুখের অরুচি ভাব দূর করে এবং সতেজ থাকতে সাহায্য করে।

উপযোগীতা: মুখের রুচি বাড়াতে এবং গরমের সর্দি কাশি থেকে বাঁচতে।

কেন এটি উপকারী: আনারসে ব্রোমেলিন নামক বিশেষ এনজাইম থাকে যা খুব দ্রুত খাবার হজমে সাহায্য করে।

বিশেষ উপকারিতা:

  • ভিটামিন সি এর দারুণ উৎস হওয়ায় জ্বরের ভাব দূর করে।
  • এতে থাকা ক্যালসিয়াম শরীরের হাড় ও দাঁত মজবুত করতে সাহায্য করে।
  • শরীরের ক্লান্তি দূর করে এনার্জি ফিরিয়ে আনে।

যা খেয়াল রাখা জরুরি: খালি পেটে আনারস খেলে অনেকের এসিডিটির বা পেটে অস্বস্তির সমস্যা হতে পারে।

একটি সহজ এবং মজাদার আনারস মাখার বৈশাখী রেসিপি নিচে দেওয়া হলো।

রেসিপির নাম উপকরণ প্রস্তুতির ধাপ প্রস্তুতির সময়
আনারস মাখা ১ কাপ ছোট করে কাটা আনারস, ১ চা চামচ কাসুন্দি, ১ চিমটি লবণ, ১টি কাঁচা মরিচ কুচি এবং সামান্য ধনেপাতা কুচি। ১. একটি পরিষ্কার বাটিতে আনারসের টুকরোগুলো নিন। ২. এর সাথে কাসুন্দি, লবণ, কাঁচা মরিচ কুচি এবং ধনেপাতা দিন। ৩. খুব ভালোভাবে হাত দিয়ে মেখে নিয়ে পরিবেশন করুন। ৫ মিনিট

আনারসের পর পেটের স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে উপকারী ফল হলো পেঁপে।

 Baishakhi fruits

৪. পেঁপে 

পেঁপে আমাদের দেশে সারা বছরই পাওয়া যায়। তবে গরমে পাকা পেঁপে খাওয়া পেটের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। এটি খুব নরম হয় এবং সহজেই হজম হয়ে যায়।

উপযোগীতা: হজম প্রক্রিয়া সহজ করতে এবং কষ্টকর কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে।

কেন এটি উপকারী: পেঁপে খুব নরম ফল এবং এটি পাকস্থলীর জন্য খুবই আরামদায়ক হওয়ায় ভারী খাবারের পর স্বস্তি দেয়।

বিশেষ উপকারিতা:

  • প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ রয়েছে যা চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে।
  • গরমে ঘামে নষ্ট হওয়া ত্বকের উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনতে পেঁপে সাহায্য করে।
  • হজমশক্তি বহুগুণে বাড়ায়।

যা খেয়াল রাখা জরুরি: যাদের পেঁপের এনজাইমে অ্যালার্জি আছে তাদের এটি খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।

পুষ্টিকর পেঁপের স্মুদি তৈরির নিয়ম নিচের ছকে দেখতে পারেন।

রেসিপির নাম উপকরণ প্রস্তুতির ধাপ প্রস্তুতির সময়
পেঁপের স্মুদি ১ কাপ পাকা পেঁপের টুকরো, আধা কাপ ঠান্ডা তরল দুধ এবং ১ টেবিল চামচ মধু। ১. একটি ব্লেন্ডারে পাকা পেঁপের টুকরো, ঠান্ডা দুধ এবং মধু একসাথে দিন। ২. একদম মসৃণ হওয়া পর্যন্ত ব্লেন্ড করুন। ৩. একটি গ্লাসে ঢেলে সকালে বা বিকেলে পরিবেশন করুন। ৫ মিনিট

পেঁপের মতো কলাও একটি সহজলভ্য এবং দারুণ পুষ্টিকর ফল।

৫. কলা 

কলা একটি অত্যন্ত সস্তা এবং দারুণ পুষ্টিকর ফল। সারাদিনের কাজের মাঝে দ্রুত শক্তি পেতে কলার কোনো বিকল্প নেই।

উপযোগীতা: তাৎক্ষণিক শক্তি পেতে এবং ব্যায়ামের পর পেশির টান লাগা রোধ করতে।

কেন এটি উপকারী: কলায় প্রচুর পটাশিয়াম থাকে যা অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া খনিজের অভাব পূরণ করে।

বিশেষ উপকারিতা:

  • শরীরের রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখে।
  • খাওয়ার সাথে সাথেই শরীরে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়ে।
  • শারীরিক দুর্বলতা দ্রুত কাটাতে সাহায্য করে।

যা খেয়াল রাখা জরুরি: ডায়াবেটিস রোগীদের অতিরিক্ত পাকা কলা খাওয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ঝটপট কলার মিল্কশেক তৈরির প্রণালী নিচে দেওয়া হলো।

রেসিপির নাম উপকরণ প্রস্তুতির ধাপ প্রস্তুতির সময়
কলার মিল্কশেক ২টি ভালো করে পাকা কলা, ১ কাপ ঠান্ডা দুধ, ১ টেবিল চামচ চিনি বা মধু এবং সামান্য বরফ। ১. কলাগুলোর খোসা ছাড়িয়ে ছোট ছোট টুকরো করে কেটে নিন। ২. ব্লেন্ডারে কলা, দুধ এবং চিনি দিয়ে খুব ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। ৩. গ্লাসে বরফ দিয়ে ঠান্ডা মিল্কশেক পরিবেশন করুন। ৫ মিনিট

কলার পুষ্টিগুণের পর আমাদের ঐতিহ্যবাহী ফল বেলের কথা না বললেই নয়।

৬. বেল 

বেল বাংলাদেশের একটি অতি পরিচিত গ্রীষ্মকালীন ফল। এর শক্ত খোসার ভেতরে থাকে চমৎকার সুগন্ধি ও মিষ্টি শাঁস যা পেট ঠান্ডা রাখতে খুব জনপ্রিয়।

উপযোগীতা: দীর্ঘদিনের পেটের নানা জটিল সমস্যা এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে।

কেন এটি উপকারী: বেলের শরবত শরীরকে ভেতর থেকে একদম ঠান্ডা রাখে এবং এতে প্রচুর ডায়েটারি ফাইবার থাকে।

বিশেষ উপকারিতা:

  • হজমে ব্যাপক সহায়তা করে।
  • ক্লান্তি নিমিষেই দূর করে দেয়।
  • শরীরকে সতেজ ও প্রাণবন্ত রাখে।

যা খেয়াল রাখা জরুরি: বেলের শরবতে অতিরিক্ত চিনি ব্যবহার করলে এর প্রকৃত পুষ্টিগুণ কমে যেতে পারে।

মজাদার এবং স্বাস্থ্যকর বেলের শরবতের রেসিপি নিচের ছকে দেওয়া হলো।

রেসিপির নাম উপকরণ প্রস্তুতির ধাপ প্রস্তুতির সময়
বেলের শরবত ১টি পাকা বেল, ২ টেবিল চামচ চিনি বা গুড় এবং ২ গ্লাস সাধারণ পানি। ১. বেলের শক্ত খোসা ফাটিয়ে চামচ দিয়ে ভেতরের নরম শাঁস বের করে পানিতে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখুন। ২. হাত দিয়ে ভালোভাবে কচলে বেলের বিচি ও শক্ত আঁশ ফেলে দিন। ৩. মিশ্রণটিতে চিনি বা গুড় মিশিয়ে ঠান্ডা করে পান করুন। ১৫ মিনিট

বেলের শরবতের প্রশান্তির পর বৈশাখের আরেক আকর্ষণ হলো রসালো তাল শাঁস।

৭. তাল শাঁস 

কচি তালের শাঁস তীব্র গরমে এক টুকরো বরফের মতোই আরামদায়ক কাজ করে। এটি দেখতে যেমন সুন্দর খেতেও তেমনি সুস্বাদু।

উপযোগীতা: প্রাকৃতিকভাবে তৃষ্ণা মেটাতে এবং শরীর শীতল রাখতে।

কেন এটি উপকারী: এটি প্রাকৃতিকভাবেই শরীরের পানিশূন্যতা দূর করে এবং অতিরিক্ত গরমে বমি বমি ভাব কমায়।

বিশেষ উপকারিতা:

  • পেট ঠান্ডা রাখে।
  • প্রয়োজনীয় ভিটামিন এ এবং সি রয়েছে।
  • শরীরের ইমিউন সিস্টেমের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

যা খেয়াল রাখা জরুরি: তাল শাঁস বেশি দিন ফ্রিজে রাখলে এর আসল স্বাদ ও পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায়।

তাল শাঁসের দারুণ একটি পানীয় তৈরির রেসিপি নিচে দেওয়া হলো।

রেসিপির নাম উপকরণ প্রস্তুতির ধাপ প্রস্তুতির সময়
তাল শাঁসের শরবত ৩ বা ৪টি কচি তাল শাঁস, ১ গ্লাস ডাবের পানি বা সাধারণ পানি, ১ চা চামচ লেবুর রস এবং সামান্য চিনি। ১. কচি তাল শাঁসগুলোর উপরের পাতলা খোসা ছাড়িয়ে ছোট ছোট টুকরো করে কেটে নিন। ২. একটি গ্লাসে পানি, চিনি এবং লেবুর রস খুব ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। ৩. এর মধ্যে তাল শাঁসের টুকরোগুলো দিয়ে দিন এবং ঠান্ডা পরিবেশন করুন। ১০ মিনিট

এই সুস্বাদু ফলগুলো খাওয়ার পাশাপাশি গরমে সুস্থ থাকতে আমাদের আরও কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চলা জরুরি।

গ্রীষ্মের এই কঠিন সময়ে সুস্থ থাকার উপায়

শুধু বৈশাখী ফল খেলেই হবে না গরমের এই কঠিন সময়ে সুস্থ থাকতে আরও কিছু দিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রতিদিন অবশ্যই অন্তত ৮ থেকে ১০ গ্লাস বিশুদ্ধ পানি পান করুন। তীব্র দুপুরে একটানা রোদে থাকা থেকে বিরত থাকুন। খুব প্রয়োজনে বাইরে যাওয়ার সময় ছাতা ও রোদচশমা ব্যবহার করতে ভুলবেন না। ঘাম শুষে নেয় এমন সুতির ও হালকা রঙের পোশাক পরুন। বাইরের খোলা শরবত এবং অতিরিক্ত তেল ও মসলাযুক্ত ভারী খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন।

সর্বশেষ