১০ই মে: ইতিহাসের এই দিনে – বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা, জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী

সর্বাধিক আলোচিত

১০ই মে—ইতিহাসের এমন একটি দিন, যা মানবসভ্যতার বুকে গভীর এবং স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। প্রতিদিনের অতিবাহিত হওয়া সময় ইতিহাসের পাতায় কিছু না কিছু চিহ্ন রেখে যায় ঠিকই, কিন্তু কিছু নির্দিষ্ট তারিখ যেন যুগান্তকারী পরিবর্তন, বৈপ্লবিক চিন্তাধারা এবং সাংস্কৃতিক আইকনদের জন্মের এক শক্তিশালী চুম্বক হিসেবে কাজ করে। ১০ই মে নিঃসন্দেহে তেমনি একটি দিন। আমরা যদি ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে ইতিহাসের গভীরে প্রবেশ করি, তবে দেখতে পাব এই দিনটি প্রবল বিদ্রোহের আগুন, বিশ্বযুদ্ধের অন্ধকারতম মুহূর্ত, মানবাধিকারের সবচেয়ে উজ্জ্বল বিজয় এবং এমন কিছু মানুষের নীরব আগমনের সাক্ষী, যারা পরবর্তীতে শিল্প, বিজ্ঞান এবং নেতৃত্বকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।

ভারতীয় উপমহাদেশের ধূলোমাখা প্রান্তর—যেখানে প্রথম গণ-উপনিবেশবিরোধী প্রতিরোধের বীজ বপন করা হয়েছিল—সেখান থেকে শুরু করে দক্ষিণ আফ্রিকার এক নতুন গণতান্ত্রিক যুগের বর্ণিল ও আনন্দমুখর উদ্বোধন পর্যন্ত, এই তারিখটি আমাদের ভাগ করে নেওয়া অস্থির এবং একইসাথে বিজয়ী মানবযাত্রার এক গভীর অনুস্মারক হিসেবে কাজ করে। আসুন, এক বিস্তৃত এবং গভীর অনুসন্ধানের মাধ্যমে মহাদেশ ও শতাব্দীর সীমানা পেরিয়ে এই অসাধারণ দিনটিকে সংজ্ঞায়িত করা ইতিহাস, উল্লেখযোগ্য জন্ম এবং তাৎপর্যপূর্ণ প্রয়াণগুলোর দিকে নজর দিই।

উপমহাদেশের জাগরণ এবং ঐতিহাসিক বিপ্লব

ভারতীয় উপমহাদেশের সমৃদ্ধ ও ঘটনাবহুল ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, এই অঞ্চলে ঘটা ঘটনাগুলো শুধু আঞ্চলিক সীমানাই পরিবর্তন করেনি, বরং তা পুরো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল এবং শাসক ও শাসিতের মধ্যকার সমীকরণকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল।

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ 

ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ বিরোধী প্রথম স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং গণপ্রতিরোধের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি কীভাবে তৈরি হয়েছিল, তা গভীরভাবে বোঝার জন্য ১০ই মে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তারিখ। মিরাটে শুরু হওয়া এই বিদ্রোহ শুধুমাত্র একটি বিচ্ছিন্ন সামরিক অভ্যুত্থান ছিল না। এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজে গরু ও শুকরের চর্বি ব্যবহারের গুজবের কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে সিপাহীরা বিদ্রোহ করলেও, এটি মূলত ছিল লর্ড ডালহৌসির আগ্রাসী সাম্রাজ্য বিস্তার নীতি, অতিরিক্ত করারোপ এবং স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি ব্রিটিশদের পদ্ধতিগত অবমাননার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের কয়েক দশকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ। এই বিদ্রোহের ফলেই ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দীর্ঘ করপোরেট শাসনের চূড়ান্ত অবসান ঘটেছিল। ১০ই মে জেল ভেঙে নিজেদের বন্দি সঙ্গীদের মুক্ত করে সিপাহীরা যখন দিল্লির দিকে যাত্রা শুরু করে, তখন তারা মূলত বিংশ শতাব্দীর বৃহত্তর স্বাধীনতা আন্দোলনের মানসিক রূপরেখা তৈরি করে দিয়েছিল, যা পরবর্তীতে সমগ্র ভারতবর্ষকে স্বাধীনতার স্বপ্নে উদ্বেলিত করে।

পঙ্কজ কুমার মল্লিকের জন্ম 

বাংলা সঙ্গীত, প্রাথমিক ভারতীয় চলচ্চিত্র এবং রেডিও সম্প্রচারের বিবর্তন ও সমৃদ্ধির ইতিহাসে এই দিনটি এক অনন্য মাইলফলক। কলকাতার বুকে জন্ম নেওয়া এই সুরের জাদুকর শুধুমাত্র একজন সাধারণ সুরকার ছিলেন না; তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গভীর, আধ্যাত্মিক ও অভিজাত রবীন্দ্রসঙ্গীতকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার দুঃসাহসিক কাজটি অত্যন্ত সফলতার সাথে করেছিলেন। ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের সাথে তার যুগান্তকারী কাজের মাধ্যমে তিনি মহালয়ার ভোরে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ নামক সেই অমর রেডিও অনুষ্ঠানটি তৈরিতে সাহায্য করেছিলেন, যা আজও প্রতিটি বাঙালি পরিবারের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং দুর্গোৎসবের সূচনার প্রতীক। রূপালী পর্দার জন্য তার হৃদয়স্পর্শী সুর এবং সঙ্গীতায়োজন বাঙালি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে একটি গণতান্ত্রিক রূপ দিয়েছিল, যার ফলে উচ্চাঙ্গের সঙ্গীত সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সমাদৃত হয়েছিল।

সন্তোষ যাদবের এভারেস্ট বিজয় 

দক্ষিণ এশীয় ক্রীড়াবিদ, বিশেষ করে নারীদের অদম্য সাহস এবং আন্তর্জাতিক পর্বতারোহণে তাদের অভাবনীয় সাফল্যের অণুপ্রেরণা হিসেবে সন্তোষ যাদবের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। ১৯৯৩ সালের ১০ই মে ভারতের এই প্রখ্যাত পর্বতারোহী মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণ করেন। এই অর্জনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকটি হলো, ঠিক এক বছর আগে ১৯৯২ সালের মে মাসেও তিনি বিশ্বের সর্বোচ্চ এই শৃঙ্গ জয় করেছিলেন। অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং দুর্গম হিসেবে পরিচিত ‘কাংশুং ফেস’ (Kangshung Face) অতিক্রম করে তিনি বিশ্বের প্রথম নারী হিসেবে দু’বার মাউন্ট এভারেস্ট জয় করার এক বিরল ইতিহাস গড়েন। তার এই অসামান্য কীর্তি শুধু ভারতেই নয়, বরং সারা বিশ্বের নারীদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা প্রমাণ করে যে দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো বাধাই অলঙ্ঘনীয় নয়।

উপমহাদেশের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মাইলফলকগুলোর সময়রেখা এবং তাৎপর্য আরও সহজে এক নজরে বোঝার জন্য নিচে একটি তথ্যবহুল সারণি প্রদান করা হলো।

বছর ঘটনা বা ব্যক্তিত্ব তাৎপর্য
১৮৫৭ মিরাটে সিপাহী বিদ্রোহের সূচনা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার প্রথম যুদ্ধের সূচনা করে, যা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে গভীরভাবে বদলে দেয়।
১৯০৫ কলকাতায় পঙ্কজ মল্লিকের জন্ম একজন কিংবদন্তি সুরকার যিনি ঠাকুরের সঙ্গীতকে জনপ্রিয় করেন এবং প্রাথমিক ভারতীয় চলচ্চিত্র ও রেডিও সম্প্রচারে বিপ্লব ঘটান।
১৯৯৩ সন্তোষ যাদবের এভারেস্ট বিজয় এই প্রশংসিত ভারতীয় পর্বতারোহী বিশ্বের প্রথম নারী হিসেবে দু’বার মাউন্ট এভারেস্ট জয় করার গৌরব অর্জন করেন।

বিশ্ব ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনাবলি

বিশ্ব ইতিহাসের যুগান্তকারী ঘটনাবলি

উপমহাদেশের সীমানা পেরিয়ে আমরা যদি আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তাকাই, তবে দেখতে পাবো ১০ই মে কীভাবে বিশ্বের অন্যান্য অংশের ইতিহাসকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। মহাদেশীয় যোগাযোগ থেকে শুরু করে ধ্বংসাত্মক আদর্শের বিস্তার এবং বিশ্বযুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তন—সবকিছুতেই এই দিনটির গভীর প্রভাব রয়েছে।

আমেরিকার প্রথম ট্রান্সকন্টিনেন্টাল রেলরোড

আমেরিকার যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগান্তকারী উন্নতি, পশ্চিমাঞ্চলীয় সম্প্রসারণ এবং শিল্প বিপ্লবের প্রসারের ইতিহাসে ১৮৬৯ সালের এই দিনটি এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল। উটাহ-এর প্রমন্টরি সামিটে আনুষ্ঠানিক ‘গোল্ডেন স্পাইক’ পোঁতার মাধ্যমে ইউনিয়ন প্যাসিফিক এবং সেন্ট্রাল প্যাসিফিক লাইনকে সংযুক্ত করা হয়, যা ছিল সে সময়ের সবচেয়ে বড় প্রকৌশলগত অর্জন। এর আগে আমেরিকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে প্রায় ছয় মাস সময় লাগতো, যা এই রেলপথের কল্যাণে মাত্র এক সপ্তাহে নেমে আসে। এই রেলপথ আমেরিকার অর্থনীতিতে এক বিশাল গতি সঞ্চার করেছিল। তবে এই প্রকৌশলগত বিস্ময়ের পেছনে এক চরম অমানবিক ইতিহাসও লুকিয়ে আছে। সিয়েরা নেভাদার গ্রানাইট পাথর কেটে এই ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথ তৈরির সময় চীনা অভিবাসী শ্রমিকদের চরম শোষণ করা হয়েছিল, যাদের অনেকেই বিস্ফোরক ব্যবহারের সময় প্রাণ হারান। তদুপরি, এই রেলপথের সম্প্রসারণের ফলে গ্রেট প্লেইনস জুড়ে থাকা আমেরিকার স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোকে তাদের নিজ ভূমি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়েছিল, যা আমেরিকার ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়।

নাৎসিদের বই পোড়ানোর কলঙ্কজনক অধ্যায় 

কীভাবে চরমপন্থী ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ বাকস্বাধীনতা ও মুক্ত চিন্তার কণ্ঠরোধ করে, ১৯৩৩ সালের ১০ই মে তার একটি ভয়াবহ এবং শিক্ষণীয় ঐতিহাসিক উদাহরণ তৈরি করেছিল। জোসেফ গোয়েবলসের প্ররোচনায় জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা বার্লিনের ওপেনপ্ল্যাটজ-সহ বিভিন্ন পাবলিক স্কয়ারে ইহুদি, সমাজতান্ত্রিক এবং উদারপন্থী লেখকদের হাজার হাজার বই পুড়িয়ে দেয়। মুক্ত চিন্তাকে ধ্বংস করার এই উল্লাসে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, সিগমুন্ড ফ্রয়েড থেকে শুরু করে হেলেন কেলারের বইও আগুনে ভস্মীভূত হয়। হেলেন কেলার এই বর্বরতার প্রতিবাদে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন, “ইতিহাস তোমাদের কিছুই শেখায়নি যদি তোমরা মনে করো যে তোমরা ধারণাকে হত্যা করতে পারো।” এই নারকীয় ঘটনাটি জার্মান কবি হাইনরিখ হাইনের সেই বিখ্যাত এবং মর্মান্তিক ভবিষ্যদ্বাণীকে সত্য প্রমাণ করেছিল: “যেখানে তারা বই পোড়ায়, সেখানে শেষ পর্যন্ত তারা মানুষও পোড়াবে।” পরবর্তীতে হলোকাস্টের ভয়াবহতা হাইনের এই কথাকে অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণ করেছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং উইনস্টন চার্চিলের উত্থান 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম নির্ণায়ক মুহূর্ত এবং চরম সংকটের সময়ে নেতৃত্বের পালাবদল কীভাবে একটি জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে, ১৯৪০ সালের ১০ই মে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই দিনটি ছিল বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বিশৃঙ্খল দিনগুলোর একটি। একদিকে নাৎসি জার্মানি তাদের ভয়ংকর ‘ব্লিটজক্রিগ’ (Blitzkrieg) কৌশলে ফ্রান্স, বেলজিয়াম এবং নেদারল্যান্ডসে নির্মম আক্রমণ শুরু করে ফরাসিদের দুর্ভেদ্য বলে বিবেচিত ম্যাজিনো লাইনকে ধূলিসাৎ করে দেয়। অন্যদিকে, ঠিক একই দিনে নরওয়েজিয়ান ক্যাম্পেইনে ভয়াবহ ব্যর্থতার দায়ভার নিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলেইন পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। চেম্বারলেইনের পদত্যাগের পর উইনস্টন চার্চিল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পশ্চিম ইউরোপ যখন খাদের কিনারে, মিত্রবাহিনী যখন চারদিক থেকে বিপর্যস্ত, ঠিক সেই মুহূর্তে চার্চিলের মতো বাগ্মী এবং আপসহীন নেতার উত্থান গ্রেট ব্রিটেনকে জার্মান বিমান হামলার (Blitz) ভয়াবহতা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সাহস ও দৃঢ়তা জুগিয়েছিল। তার নেতৃত্বেই ব্রিটেন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে চূড়ান্ত বিজয়ের পথ প্রশস্ত করেছিল।

নেলসন ম্যান্ডেলার অভিষেক এবং ‘রেইনবো নেশন’ 

বর্ণবাদ বিরোধী দীর্ঘ সংগ্রামের চূড়ান্ত বিজয়, ক্ষমা এবং জাতিগত পুনর্মিলনের এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল ১৯৯৪ সালের ১০ই মে। দীর্ঘ ২৭ বছরের অমানবিক কারাবাসের পর নেলসন ম্যান্ডেলা যখন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন, তখন সেটি ছিল সারা বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের জন্য এক পরম আনন্দের মুহূর্ত। তার এই অভিষেক ছিল কয়েক দশক ধরে চলা নিপীড়নমূলক বর্ণবাদী (অ্যামপার্থেইড) শাসনের আনুষ্ঠানিক মৃত্যু পরোয়ানা। ম্যান্ডেলা তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে রবেন আইল্যান্ডে তার দায়িত্বে থাকা তিনজন প্রাক্তন শ্বেতাঙ্গ কারারক্ষীকে ভিআইপি অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়ে ক্ষমার এক অনন্য এবং অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। আকাশে নতুন পতাকার রঙে সামরিক জেটের ফ্লাইপাস্ট এবং সমবেত কণ্ঠে শেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের দ্বৈত জাতীয় সংগীত গাওয়ার মাধ্যমে জন্ম নিয়েছিল এক নতুন, গণতান্ত্রিক ‘রেইনবো নেশন’ (Rainbow Nation), যা বিশ্ববাসীকে শিখিয়েছিল যে ঘৃণা ও বিভেদের ওপর দাঁড়িয়েও ভালোবাসা ও ক্ষমার মাধ্যমে নতুন ইতিহাস রচনা করা সম্ভব।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই দিনটিতে ঘটা এই যুগান্তকারী ঘটনাগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো।

বছর অঞ্চল ঐতিহাসিক ঘটনা
১৮৬৯ যুক্তরাষ্ট্র উটাহ-এর প্রমন্টরি সামিটে প্রথম ট্রান্সকন্টিনেন্টাল রেলপথের সফল সমাপ্তি।
১৯৩৩ জার্মানি জনসমক্ষে “অ-জার্মান” সাহিত্যের ব্যাপক নাৎসি বই পোড়ানোর উৎসব।
১৯৪০ যুক্তরাজ্য নেভিল চেম্বারলেইনের পদত্যাগের পর উইনস্টন চার্চিল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন।
১৯৪০ ইউরোপ নাৎসি জার্মানি ফ্রান্স এবং লো কান্ট্রিস (Low Countries) আক্রমণ শুরু করে।
১৯৯৪ দক্ষিণ আফ্রিকা নেলসন ম্যান্ডেলা জাতির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন, বর্ণবাদের অবসান ঘটে।

১০ই মে জন্মগ্রহণকারী বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ

ইতিহাস কেবল যুদ্ধ আর চুক্তির মাধ্যমেই তৈরি হয় না; এটি রূপ লাভ করে সেই সব অসামান্য মানুষদের মাধ্যমে, যারা আমাদের সময়ের ক্যানভাসে নিজেদের প্রতিভার রঙ ছড়িয়ে দেন এবং মানবসভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেন।

ফ্রেড অ্যাস্টেয়ার (Fred Astaire – ১৮৯৯)

হলিউডের সোনালি যুগে নৃত্য, কোরিওগ্রাফি এবং মিউজিক্যাল চলচ্চিত্রের অভাবনীয় বিবর্তনের নেপথ্য নায়ক হিসেবে ফ্রেড অ্যাস্টেয়ার চিরস্মরণীয়। নেব্রাস্কার ওমাহাতে জন্মগ্রহণকারী অ্যাস্টেয়ার মুভি মিউজিক্যাল জেনারকে সম্পূর্ণ নতুন এক মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। তিনি ছিলেন কাজের প্রতি একজন চরম খুঁতখুঁতে শিল্পী, যিনি নিখুঁত পারফরম্যান্সের জন্য কখনও কখনও একটি নাচের রুটিনের জন্য ১০০টি পর্যন্ত টেক নিতে দ্বিধা করতেন না। নাচের দৃশ্যগুলোকে দ্রুত এডিটিং বা ক্লোজ-আপ শটের বদলে ফুল-বডি এবং সিঙ্গেল-টেক শটে ধারণ করার প্রতি তার জোরালো দাবি হলিউডের কোরিওগ্রাফির ধারণাকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। তার সাবলীল এবং মার্জিত ভঙ্গি ট্যাপ ও বলরুম ড্যান্সকে সাধারণ বিনোদনের স্তর থেকে তুলে উচ্চমার্গীয় শিল্পের মর্যাদায় আসীন করেছিল।

কার্ল বার্থ (Karl Barth – ১৮৮৬)

বিংশ শতাব্দীর ধর্মতত্ত্ব এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিদের চরম অন্যায় ও অনাচারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ও নৈতিক প্রতিরোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন কার্ল বার্থ। এই প্রতিভাবান সুইস চিন্তাবিদ ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মতত্ত্ববিদ, যিনি তার বিশাল গ্রন্থ ‘Church Dogmatics’-এর জন্য বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক পরিচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চরম বিভীষিকাময় সময়ে তার গভীর নৈতিক সাহস ছিল অতুলনীয়। তিনি ‘বারমেন ডিক্লারেশন’ (Barmen Declaration) রচনা করেছিলেন, যা নাৎসি-সমর্থিত “জার্মান খ্রিস্টানদের” বিরুদ্ধে কনফেসিং চার্চের আপসহীন প্রতিরোধের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে অন্যায়ের সামনে চুপ থাকা সবচেয়ে বড় অপরাধ।

বোনো (Bono / Paul Hewson – ১৯৬০)

আধুনিক পপ সংস্কৃতি কীভাবে বৈশ্বিক মানবিক সংকট, বিশেষ করে দারিদ্র্য ও রোগব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এক শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে, তা বোনো তার জীবন দিয়ে দেখিয়েছেন। আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে জন্মগ্রহণকারী পল হিউসন, যিনি বিশ্বজুড়ে ‘বোনো’ নামেই বেশি পরিচিত, তিনি শুধুমাত্র বিশ্ববিখ্যাত রক ব্যান্ড U2-এর প্রধান গায়ক হিসেবেই ১৭০ মিলিয়নের বেশি রেকর্ড বিক্রি করে সঙ্গীতের ইতিহাস রচনা করেননি, বরং তার বৈশ্বিক সক্রিয়তা এবং সমাজসেবামূলক কাজের জন্যও তিনি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। জুবিলি ২০০০ (Jubilee 2000) এবং দ্য ওয়ান ক্যাম্পেইনে (ONE Campaign) তার কেন্দ্রীয় ভূমিকা তৃতীয় বিশ্বের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ মওকুফ এবং আফ্রিকা মহাদেশ জুড়ে পদ্ধতিগত দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও রোগব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এক বিশাল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।

এই দিনে জন্মগ্রহণকারী এই স্মরণীয় ব্যক্তিত্বদের জীবন এবং কর্মের একটি দ্রুত পর্যালোচনা পেতে নিচের সারণিটি লক্ষ্য করুন।

বছর নাম জাতীয়তা পেশা / অবদান
১৮৩৮ জন উইলকস বুথ আমেরিকান মঞ্চাভিনেতা, প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের গুপ্তহত্যার জন্য কুখ্যাত।
১৮৮৬ কার্ল বার্থ সুইস অত্যন্ত প্রভাবশালী প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মতত্ত্ববিদ এবং নাৎসি বিরোধী ভিন্নমতাবলম্বী।
১৮৯৯ ফ্রেড অ্যাস্টেয়ার আমেরিকান আইকনিক নৃত্যশিল্পী, কোরিওগ্রাফার এবং হলিউডের সোনালি যুগের অভিনেতা।
১৯৬০ বোনো (পল হিউসন) আইরিশ U2-এর প্রধান গায়ক, বিশ্বস্তরের মানবতাবাদী এবং নিবেদিত সমাজকর্মী।
১৯৭৮ কিনান থম্পসন আমেরিকান অভিনেতা এবং কমেডিয়ান, SNL ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘকালীন কাস্ট মেম্বার হিসেবে রেকর্ডধারী।

১০ই মে-তে চিরবিদায় নেওয়া স্মরণীয় ব্যক্তিত্বরা

এই দিনটি যেমন অনেক মহান মানুষের আগমনের সাক্ষী হয়ে আছে, ঠিক তেমনি এটি সামরিক ইতিহাস, শিল্পকলা এবং চলচ্চিত্রের বেশ কয়েকজন কিংবদন্তির চিরবিদায়ের দিনও বটে, যাদের চলে যাওয়ার শূন্যতা আজও গভীরভাবে অনুভূত হয়।

পল রিভিয়ার

আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং দেশপ্রেমিকদের অসামান্য আত্মত্যাগের ইতিহাসের সাথে পল রিভিয়ারের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একজন অত্যন্ত দক্ষ রৌপ্যকার এবং খোদাইকারী হিসেবে পরিচিত পল রিভিয়ার ১৭৭৫ সালের এপ্রিলে তার বিখ্যাত ‘মিডনাইট রাইড’-এর জন্য আমেরিকার লোককথায় অমর হয়ে আছেন। এই রাতের অশ্বারোহণের মাধ্যমেই তিনি ব্রিটিশ বাহিনীর আকস্মিক আগমন সম্পর্কে ঔপনিবেশিক মিলিশিয়াদের সতর্ক করেছিলেন। বিখ্যাত কবি হেনরি ওয়াডসওয়ার্থ লংফেলোর কবিতায় তাকে একাকী অশ্বারোহী হিসেবে মহিমান্বিত করা হলেও, ঐতিহাসিক বাস্তবতা হলো তিনি একটি বৃহত্তর এবং সুসংগঠিত গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের অংশ ছিলেন। তিনি উইলিয়াম ডাউস এবং ডঃ স্যামুয়েল প্রেসকটের সাথে যাত্রা করেছিলেন এবং তার চূড়ান্ত গন্তব্য শেষ করার আগেই একটি ব্রিটিশ টহল দলের হাতে ধরা পড়েছিলেন। তা সত্ত্বেও আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রাম বেগবান করার ক্ষেত্রে তার সেই রাতের ভূমিকা এবং সার্বিক অবদান ছিল অপরিহার্য।

জোন ক্রফোর্ড

হলিউড স্টুডিও সিস্টেমের স্বর্ণযুগ এবং নির্বাক যুগ থেকে সবাক চলচ্চিত্রে একজন অভিনেত্রীর সফল উত্তরণের ইতিহাসে জোন ক্রফোর্ড এক অনন্য নাম। নির্বাক চলচ্চিত্রে এক প্রাণবন্ত নৃত্যশিল্পী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করে ক্রফোর্ড তার প্রবল ইচ্ছাশক্তি দিয়ে হলিউডের কঠোর স্টুডিও সিস্টেমের একদম চূড়ায় আরোহণ করেছিলেন, যা সে যুগে খুব কম অভিনেত্রীর পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল। অত্যন্ত সফলভাবে সবাক চলচ্চিত্রে প্রবেশ করার পর তিনি নিজেকে একজন শক্তিশালী ড্রামাটিক অভিনেত্রী হিসেবে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। “মিলড্রেড পিয়ার্স” (১৯৪৫) চলচ্চিত্রে একজন কঠোর এবং আত্মত্যাগী মায়ের চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করে তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে একাডেমি পুরস্কারও জয়লাভ করেন। পর্দায় তার তীব্র উপস্থিতি, অদম্য উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং সমসাময়িক অভিনেত্রী বেটি ডেভিসের সাথে তার কিংবদন্তিতুল্য দ্বন্দ্ব তাকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সাংস্কৃতিক আলোচনার এক আকর্ষণীয় কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছিল।

এই দিনে মৃত্যুবরণকারী এই ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের অবদান এবং বিদায়ের কারণ নিচের সারণিতে সংক্ষিপ্তভাবে দেওয়া হলো।

বছর নাম জাতীয়তা মৃত্যু কারণ / অবদান
১৮১৮ পল রিভিয়ার আমেরিকান দেশপ্রেমিক, রৌপ্যকার এবং আমেরিকান বিপ্লবের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের মূল ব্যক্তিত্ব।
১৮৪৯ কাতসুশিকা হোকুসাই জাপানি মাস্টার আর্টিস্ট এবং প্রিন্টমেকার, আইকনিক “দ্য গ্রেট ওয়েভ অফ কানাগাওয়া”-এর স্রষ্টা।
১৮৬৩ স্টোনওয়াল জ্যাকসন আমেরিকান কনফেডারেট জেনারেল, নিজেদের বাহিনীর গুলিতে আহত হয়ে অঙ্গচ্ছেদের পর নিউমোনিয়ায় মারা যান।
১৯৭৭ জোন ক্রফোর্ড আমেরিকান একাডেমি পুরস্কার বিজয়ী অভিনেত্রী এবং হলিউডের চিরস্থায়ী, তীব্র স্বাধীন সুপারস্টার।
১৯৯৪ জন ওয়েন গেসি আমেরিকান কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার, ইলিনয়ে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

আন্তর্জাতিক দিবস এবং সাংস্কৃতিক উদযাপন

ঐতিহাসিক ঘটনা এবং বিখ্যাত ব্যক্তিদের জন্ম-মৃত্যুর বাইরেও, ১০ই মে বিশ্বজুড়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দিবস এবং আবেগঘন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য বিশেষভাবে পালিত হয়, যা আমাদের বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের বিভিন্ন দিককে তুলে ধরে।

বিশ্ব লুপাস দিবস (World Lupus Day)

লুপাস নামক এই জটিল অটোইমিউন রোগ সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি এবং রোগীদের প্রতি সহানুভূতিশীল সমাজ গড়ার জন্য প্রতি বছর ১০ই মে এই দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করা হয়। ওয়ার্ল্ড লুপাস ফেডারেশন কর্তৃক ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই দিনটির মূল লক্ষ্য হলো এমন একটি দুরারোগ্য ব্যাধি সম্পর্কে মানুষকে বিস্তারিত জানানো, যেখানে রোগীর শরীরের নিজস্ব ইমিউন সিস্টেম সুস্থ টিস্যু এবং অঙ্গগুলোকে আক্রমণ করে শরীরকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। যেহেতু লুপাসের লক্ষণগুলো প্রায়শই অদৃশ্য থাকে এবং এই রোগটি নির্ণয় করা অত্যন্ত কঠিন, তাই প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয়, উন্নত চিকিৎসা সেবার প্রসার এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণার পরিধি বৃদ্ধির জন্য এই দিবসটির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী প্রচারণা চালানো হয়।

মা দিবস ২০২৬ (Mother’s Day 2026)

পরিবার এবং সমাজে মায়েদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, অন্তহীন ত্যাগ এবং অসামান্য অবদানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য এই দিনটির কোনো বিকল্প নেই। মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার উদযাপিত হওয়া এই বিশেষ দিনটি ২০২৬ সালের ১০ই মে বাংলাদেশ, ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের আরও অনেক দেশে ব্যাপক উৎসাহ ও আবেগের সাথে পালিত হবে। আন্না জার্ভিসের নিরলস প্রচেষ্টার পর ১৯১৪ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করে এবং তারপর থেকে এটি বিশ্বজুড়ে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। পরিবারগুলো ফুল, উপহার, বিশেষ কার্ড এবং আনন্দঘন জমায়েতের মাধ্যমে মায়েদের প্রতি তাদের অকৃত্রিম ভালোবাসা প্রকাশ করে এই দিনটি উদযাপন করে। তবে এই দিনটি আমাদের গভীরভাবে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মায়েদের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ বছরে একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বরং প্রতিটি দিনই বজায় থাকা উচিত।

সময়ের ক্যানভাসে ১০ই মে: এক অবিস্মরণীয় যাত্রা

১০ই মে-র ঘটনাবলির দিকে গভীরভাবে ফিরে তাকালে আমরা মানব প্রকৃতির এক অদ্ভুত, জটিল এবং বিপরীতমুখী চিত্র দেখতে পাই। একদিকে যেমন এটি ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং নাৎসিদের বই পোড়ানোর মতো চরম বুদ্ধিভিত্তিক ধ্বংসযজ্ঞের স্মৃতি বহন করে—যা আমাদের পরাধীনতার কষ্ট এবং চিন্তার স্বাধীনতার ভঙ্গুরতা সম্পর্কে সতর্ক করে। ঠিক তেমনি, ক্যালেন্ডারের এই একই তারিখটি নেলসন ম্যান্ডেলাকে স্বাগত জানানো উচ্ছ্বসিত জনতার গর্জনেরও সাক্ষী।

এই দিনটি প্রমাণ করেছে যে, ন্যায়বিচার এবং পুনর্মিলন দশকের পর দশক ধরে চলা প্রাতিষ্ঠানিক ঘৃণাকেও জয় করতে পারে। এটি গভীরভাবে আলোড়িত করার মতো একটি বিষয় যে, যখন পৃথিবীর এক প্রান্ত যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে নিমজ্জিত ছিল, ঠিক তখনই অন্য প্রান্ত ফ্রেড অ্যাস্টেয়ার এবং কার্ল বার্থের মতো শিল্পী ও চিন্তাবিদদের স্বাগত জানাচ্ছিল, যারা পৃথিবীকে উপহার দিয়েছেন অতুলনীয় সৌন্দর্য এবং অটুট নৈতিক স্পষ্টতা। এই নির্দিষ্ট তারিখটি মানব অভিজ্ঞতার একটি শক্তিশালী ক্ষুদ্র সংস্করণ বা মাইক্রোকসম হিসেবে কাজ করে। এটি আমাদের শেখায় যে, ইতিহাস কোনো সরল রেখা নয়, বরং এটি এমন এক জটিল এবং সুন্দর বুনন যেখানে মানবতার সবচেয়ে খারাপ প্রবৃত্তি এবং সবচেয়ে সুন্দর, কষ্টার্জিত বিজয়গুলো একইসাথে অবস্থান করে, যা আমাদের আজকের এই আধুনিক বিশ্বকে রূপ দিয়েছে।

সর্বশেষ