রক্তের অক্ষরে লেখা মাতৃভাষার অধিকার: বিস্মৃতপ্রায় ১৯শে মে এবং শিলচরের ১১ অমর প্রাণ

সর্বাধিক আলোচিত

রাতের নিকষ কালো আঁধার সবে কেটে গিয়ে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। চারপাশের প্রকৃতি তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি, কিন্তু জেগে উঠেছে একটি জনপদ। ঘড়ির কাঁটায় তখন ভোর পাঁচটা চল্লিশ মিনিট। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষমাণ প্রথম ট্রেনের বাঁশি বাজার কথা, কিন্তু সেদিন কোনো ট্রেন ছাড়েনি। কাকডাকা ভোরের রাজপথ ছেয়ে গেছে আবালবৃদ্ধবনিতায়। মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের এক অদম্য স্পৃহা নিয়ে আপামর জনগণ এসে দাঁড়িয়েছে আসামের শিলচরের তারাপুর রেলওয়ে স্টেশনে (যার বর্তমান নাম ‘ভাষা শহিদ স্টেশন, শিলচর’)।

জনতার এই উত্তাল অথচ সুশৃঙ্খল ঢলে সেদিন গোটা জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছিল। যে ট্রেনের ভোর ৫টা ৪০ মিনিটে গন্তব্যে ছুটে যাওয়ার কথা, সেই ট্রেনের একটি টিকিটও সেদিন বিক্রি হয়নি। কেবল স্টেশন নয়, শিলচরের সরকারি অফিস, আদালত ভবনের সামনেও সাধারণ মানুষ অহিংস অবস্থানের মাধ্যমে নিজেদের দাবি তুলে ধরেছিল। দিনটি ছিল ১৯ মে, ১৯৬১।

পূর্ববাংলার রক্তস্নাত ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির ঠিক নয় বছর পর, মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষার্থে ফুঁসে উঠেছিল আসামের বরাক উপত্যকার গণমানুষ। আসামের বাঙালি অধ্যুষিত তিন জেলা—শিলচর, করিমগঞ্জ এবং হাইলাকান্দির মানুষের একটাই প্রাণের দাবি ছিল: বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। সেদিন জনগণের ইস্পাতকঠিন ঐক্যের কাছে হার মেনে রেল কর্তৃপক্ষ একের পর এক ট্রেনের যাত্রা বাতিল করতে বাধ্য হয়। প্রথম ভাগটা কেটেছিল অভাবনীয় এক শান্ত ও সংকল্পবদ্ধ আবহে।

আসাম রাইফেলসের সশস্ত্র সদস্যরা সেদিন শিলচর স্টেশনে এসে অবস্থান নিলেও, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ও অহিংস অংশগ্রহণ দেখে প্রথমে তারা কোনো সংঘাতে জড়ায়নি। চারদিকে শুধু মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকারের দাবিতে মুহুর্মুহু স্লোগান। কথা ছিল, বিকেল ৪টার ট্রেনের সময়সূচি পার হওয়ার পর এই অহিংস সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটবে। কিন্তু কে জানতো, এই শান্তিপূর্ণ অবস্থানের বুকেই লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর রক্তপাতের প্রস্তুতি? হাজার হাজার মানুষের সেই অহিংস অবস্থানে নির্বিচারে অতর্কিত গুলি চালায় ভারতের আধা-সামরিক বাহিনী।

সময় তখন দুপুর প্রায় আড়াইটা। কাটিগোড়া এলাকা থেকে পুলিশ নয়জন সত্যাগ্রহী আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার করে একটি বেডফোর্ড ট্রাকে তুলে তারাপুর স্টেশনের পাশের রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। নিজেদের ভাই-বন্ধুদের এভাবে ধরে নিয়ে যেতে দেখে সাধারণ মানুষের বাঁধভাঙা আবেগ ক্ষোভে পরিণত হয়। তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়ে বিক্ষুব্ধ জনতা। ট্রাকের দিকে জনতা ছুটে গেলে ভয় পেয়ে পুলিশ বন্দীদের নিয়ে পালিয়ে যায়। সেই মুহূর্তে চারপাশের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, উত্তেজিত জনতার একাংশ রেললাইনের কাঠের স্লিপারে আগুন দেয় এবং স্টেশনে ভাঙচুর শুরু করে। দমকল বাহিনীর সদস্যরা আগুন নেভাতে এলে তারাও বাধার মুখে পিছু হটে।

মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে, দুপুর ২:৩৫ মিনিটে তারাপুর স্টেশনের পাহারায় থাকা আধা-সামরিক বাহিনী যেন সাক্ষাৎ যমদূত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে আন্দোলনকারীদের ওপর। কোনো ধরনের প্ররোচনা ছাড়াই, রাইফেলের বাট আর বেয়নেট দিয়ে বেধড়ক পিটিয়েও যখন এই মুক্তিকামী জনতাকে টলানো গেল না, তখন তারা বেছে নিল সবচেয়ে নিষ্ঠুর পথটি। শুরু হলো নির্বিচারে গুলি। মাত্র সাত মিনিটে ১৭ রাউন্ড তপ্ত বুলেট ছুটে গেল সত্যাগ্রহীদের বুক লক্ষ্য করে। লুটিয়ে পড়লেন ১২ জন নিরীহ মানুষ। লাল রক্তে ভেসে গেল স্টেশনের মাটি।

Silchar Language Movement

সেদিন ঘটনাস্থলেই শহিদ হন ৯ জন তাজা প্রাণ। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুজনের মৃত্যু হয়। এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের জ্বলন্ত সাক্ষী হয়ে কৃষ্ণকান্ত বিশ্বাস নামের এক ব্যক্তি তাঁর বুকের ভেতর বুলেট নিয়ে বেঁচে ছিলেন পরবর্তী ২৪টি বছর!

সেদিনের সেই অমর ১১ জন শহিদ হলেন: কমলা ভট্টাচার্য, কানাইলাল নিয়োগী, হিতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্র দেব, কুমুদ রঞ্জন দাস, সুনিল সরকার, তরণী দেবনাথ, শচীন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর, সুকমল পুরকায়স্থ এবং চণ্ডীচরণ সূত্রধর। (পরবর্তী সময়ে বাংলা ভাষার অধিকারের লড়াইয়ে বিজন চক্রবর্তী, জগন্ময় দেব ও দিবেন্দু দাসও প্রাণ বিসর্জন দেন)।

একটু গভীরভাবে ভাবলে চোখ ভিজে আসে— পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া প্রথম নারী শহিদ কমলা ভট্টাচার্যের বয়স তখন ১৮ বছরও পার হয়নি! শচীন্দ্র পালও ছিলেন ঠিক তারই বয়সী। কী নির্মম পরিহাস, এই পৃথিবীতে শহিদ হওয়ার ঠিক আগের দিনই এই দুজন তরুণ-তরুণী স্কুলে তাদের জীবনের শেষ পরীক্ষাটি দিয়েছিলেন। “আমার বোনের রক্তে রাঙানো ১৯শে মে”— কমলার সেই আত্মত্যাগ আজ আমাদের হৃদয়ের গভীরে এক অনন্ত বেদনার জন্ম দেয়।

১৯৬১ সালের ২০ মে ভারতের বিভিন্ন সংবাদপত্রে এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে চারপাশ। শিলচরের মাটিতে ৪০ হাজার মানুষের এক বিশাল শোকমিছিল অনুষ্ঠিত হয়, যাদের অশ্রুজলে সিক্ত হয়ে শিলচর শ্মশানে ১১ শহিদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। আজও সেই শ্মশানে এই ১১ জন অমর প্রাণের স্মৃতিস্তম্ভ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তারাপুর স্টেশনের সামনে, যেখানে তাদের রক্ত ঝরেছিল, সেখানেও গড়ে উঠেছে স্মৃতিস্তম্ভ। দেরিতে হলেও, শিলচর রেল স্টেশনের নামকরণ করা হয়েছে ‘ভাষা শহিদ স্টেশন’।

ভাষা শহীদ স্টেশন শিলচর

বাংলাদেশের অহংকার ‘অমর একুশে’ আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বিশ্বজুড়ে মাতৃভাষাপ্রেমী মানুষের কাছে এটি এক পরম গর্বের দিন। কিন্তু এই গর্বের সমান অংশীদার আসামের বরাক উপত্যকার সেই ১১ জন ভাষাশহিদও। বাংলাদেশের ৫২’র রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের মতোই আসামের এই ভাষা-আন্দোলন ঐতিহাসিক, ঘটনাবহুল এবং বীরত্বের এক বিরল দৃষ্টান্ত। ৫২’র ২১শে ফেব্রুয়ারি আর ৬১’র ১৯শে মে—দুটি দিন যেন একই সুতোয় গাঁথা, যার রং লাল।

বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় আসামের এই ভাষাশহিদদের আত্মত্যাগকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। ১৯৫২ সালের ভাষা শহিদদের আমরা যেমন হৃদয়ের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধায় স্মরণ করি, ঠিক তেমনই ১৯৬১ সালের ১৯শে মে’র শহিদদের সম্মান জানানোও আমাদের নৈতিক কর্তব্য।

একজন বাঙালি হিসেবে, একজন লেখক হিসেবে আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি— বাংলাদেশ সরকারের উচিত আসামের এই অকুতোভয় শহিদদের স্মরণে বাংলাদেশের মাটিতেও একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা। তাঁদের আত্মত্যাগ যেন দুই বাংলার ভৌগোলিক সীমারেখা পেরিয়ে বাংলা ভাষার এক অবিচ্ছেদ্য ইতিহাস হিসেবে আমাদের আগামী প্রজন্মের কাছে চিরকাল বেঁচে থাকে। মাতৃভাষার জন্য যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের কোনো সীমানা নেই, তারা আমাদের সবার। ১৯শে মে’র অমর শহিদেরা আমাদের হৃদয়ে চিরঞ্জীব হয়ে থাকুক।

সর্বশেষ