২৪ মে: ইতিহাসের এই দিনে – বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা, জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী

সর্বাধিক আলোচিত

ক্যালেন্ডারের প্রতিটি পাতাই কোনো না কোনো ইতিহাসের ভার বহন করে, কিন্তু ২৪ মে দিনটি বিশ্বজুড়ে এক অনন্য এবং রূপান্তরমূলক দিন হিসেবে আলাদাভাবে নজর কাড়ে। আমরা যখন অতীতের পাতা উল্টাই, এই নির্দিষ্ট তারিখটি মানব প্রচেষ্টার এক অসাধারণ চিত্র তুলে ধরে। এটি এমন একটি দিন, যেদিন জন্ম নিয়েছিলেন এমন সব সাংস্কৃতিক বিপ্লবীরা—যাঁরা আমাদের চিন্তা করার ধরণ এবং আমাদের শোনা সঙ্গীতের ধারাকে চিরতরে বদলে দিয়েছেন। এই দিনেই প্রথম কোনো বিস্ময়কর স্থাপত্য দুটি শহরকে যুক্ত করেছিল, আবার এই দিনেই প্রকৃতির বিধ্বংসী রূপ আমাদের তার ভয়ংকর শক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল।

নিউইয়র্কের ব্যস্ত রাস্তায় একটি কিংবদন্তি ব্রিজের উদ্বোধনের সাক্ষী হওয়া থেকে শুরু করে ভারতীয় উপমহাদেশের নিভৃত কোণে এক “বিদ্রোহী কবির” বেড়ে ওঠা—২৪ মে-এর ঘটনাগুলো আমাদের সামষ্টিক স্মৃতিতে এক মুছতে না পারা ছাপ রেখে গেছে। এই দিনে কী ঘটেছিল তা জানা মানে কেবল কিছু তারিখ মুখস্থ করা নয়; বরং এটি হলো আমাদের আধুনিক সমাজ কীভাবে প্রতিভার স্ফুরণ, বিদ্রোহ এবং ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য সাহসের মাধ্যমে তিল তিল করে গড়ে উঠেছে, তার এক গভীর অন্বেষণ। চলুন, ইতিহাসের আর্কাইভে ডুব দিয়ে বাঙালি বলয়, আন্তর্জাতিক দিবস এবং বৈশ্বিক মাইলফলকগুলো ঘুরে দেখি—যা ২৪ মে দিনটিকে সত্যিই মনে রাখার মতো করে তুলেছে।

বাঙালি বলয়ে ২৪ মে

উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, সাহিত্যিক প্রতিভা এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের এক সমৃদ্ধ ও অশান্ত ইতিহাস রয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশের। এই অঞ্চলের ইতিহাস মূলত ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের আন্দোলনের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে, যা এই দিনে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিত্বদের আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।

ইতিহাস গড়া ঘটনা

উপমহাদেশের ভৌগোলিক দুর্বলতা অনেক সময়ই এর রাজনৈতিক আন্দোলনের মতোই এর ইতিহাসকে রূপ দিয়েছে।

  • ১৯৮৫ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়: বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল ঐতিহাসিকভাবেই চরম বৈরী আবহাওয়ার প্রবণ। কিন্তু ১৯৮৫ সালের ২৪ মে আঘাত হানা গ্রীষ্মমন্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়টি ছিল ইতিহাসের অন্যতম ধ্বংসাত্মক একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বিশাল জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি করে এই সাইক্লোন উপকূলীয় দ্বীপসমূহ এবং গঙ্গা বদ্বীপের ওপর দিয়ে আছড়ে পড়ে। এতে আনুমানিক ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটে এবং আরও লাখ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। এই বিপর্যয়মূলক ঘটনাটি পরবর্তীতে এই অঞ্চলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। যার ফলশ্রুতিতে আজ বাংলাদেশে এমন সব শক্তিশালী সাইক্লোন শেল্টার নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, যা প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষের জীবন বাঁচাচ্ছে।

উপমহাদেশে বিখ্যাতদের জন্ম

বাঙালি বলয় এবং বৃহত্তর ভারতীয় উপমহাদেশে এই দিনে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিরা এমন এক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।

বাচেন্দ্রী পাল 

শারীরিক ও সামাজিক সব বাধা অতিক্রম করে বাচেন্দ্রী পাল ইতিহাস গড়েন, যখন তিনি প্রথম ভারতীয় নারী হিসেবে মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছান। ১৯৮৪ সালের মে মাসের এই অসামান্য অর্জন গোটা উপমহাদেশের নারীদের চরম সাহসিকতার খেলায় অংশগ্রহণের পথ উন্মুক্ত করে দেয়। এরপর থেকে তিনি নারীদের বিভিন্ন অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া এবং আউটডোর লিডারশিপ প্রসারের কাজে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তিনি পদ্মশ্রী (১৯৮৪), অর্জুন পুরস্কার (১৯৮৬) এবং পদ্মভূষণ (২০১৯) সম্মানে ভূষিত।

কর্তার সিং সরাভা

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রাথমিক সশস্ত্র সংগ্রামের এক কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব ছিলেন কর্তার সিং সরাভা। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি বিপ্লবী গদর পার্টিতে যোগ দেন। তাঁর অসাধারণ মেধা এবং অগ্নিঝরা নিষ্ঠা তাঁকে এই আন্দোলনের অন্যতম সক্রিয় সংগঠকে পরিণত করেছিল। অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, মাত্র ১৯ বছর বয়সে ব্রিটিশরা তাঁকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তাঁর এই শাহাদাত তরুণ ভগৎ সিংকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল, যা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সরাভাকে এক ভিত্তিমূলক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

বিখ্যাতদের প্রয়াণ

এই দিনে এমন কিছু নক্ষত্রের পতন হয়েছে, যা আঞ্চলিক সংস্কৃতির একটি তাৎপর্যপূর্ণ যুগের অবসান ঘটিয়েছে।

  • তপেন চট্টোপাধ্যায় (২০১০): তপেন চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণে বাংলা চলচ্চিত্রের জগত এক প্রিয় আইকনকে হারায়। সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী সিনেমা গুপী গাইন বাঘা বাইন (১৯৬৯) এবং এর সিক্যুয়েলগুলোতে ‘গুপী গাইন’ চরিত্রে তাঁর কিংবদন্তিতুল্য অভিনয়ের জন্য তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁর অভিনয়ে সরলতার সাথে গভীর হাস্যরসের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছিল, যা এই চরিত্রটিকে বাঙালি সংস্কৃতির এমন এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছে—যা আজও শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক সবাইকে সমানভাবে মুগ্ধ করে।

আন্তর্জাতিক দিবস ও ছুটি

আন্তর্জাতিক দিবস ও পালনীয়

মানসিক স্বাস্থ্য, ধর্মীয় ইতিহাস এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের মতো বিষয়গুলোকে তুলে ধরে বিশ্বজুড়ে ২৪ মে বিভিন্নভাবে পালিত হয়। এই দিনগুলো স্বাধীনতা অর্জনের চলমান সংগ্রাম এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য উদ্যোগের গুরুত্বের বার্ষিক অনুস্মারক হিসেবে কাজ করে।

গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দিবস

  • বিশ্ব সিজোফ্রেনিয়া সচেতনতা দিবস (World Schizophrenia Awareness Day): সিজোফ্রেনিয়া নিয়ে সমাজে যে গভীর কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে, তা ভেঙে ফেলার উদ্দেশ্যে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক দিবসটি পালন করা হয়। বিশ্বজুড়ে এই জটিল মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে শিক্ষিত করা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, প্রাথমিক হস্তক্ষেপ এবং আক্রান্ত লাখো মানুষের জন্য সহানুভূতিশীল সামাজিক সমর্থন গড়ে তোলাই এর মূল লক্ষ্য।

  • অল্ডারসগেট দিবস বা ওয়েসলি দিবস (Aldersgate Day): বিশ্বজুড়ে মেথডিস্টদের (Methodists) জন্য এটি একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ দিন, যা ১৭৩৮ সালের ২৪ মে-র স্মৃতি বহন করে। এই দিনে জন ওয়েসলি লন্ডনের অল্ডারসগেট স্ট্রিটে একটি সভায় যোগ দিয়েছিলেন, যেখানে তিনি এক গভীর ধর্মীয় জাগরণ অনুভব করেন। তিনি লিখেছিলেন যে তিনি অনুভব করেছিলেন তার হৃদয় “অদ্ভুতভাবে উষ্ণ” হয়ে উঠেছে। এই মুহূর্তটিকে বিশ্বব্যাপী মেথডিস্ট আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

জাতীয় স্বাধীনতা ও প্রজাতন্ত্র দিবস

  • ইরিত্রিয়ার স্বাধীনতা দিবস (Eritrea Independence Day): ৩০ বছরের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর, ১৯৯৩ সালের এই দিনে ইরিত্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ইথিওপিয়ার কাছ থেকে নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। রঙিন কুচকাওয়াজ, ঐতিহ্যবাহী নৃত্য এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য দেওয়া আত্মত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপিত হয়।

  • পিচিঞ্চা যুদ্ধের দিন (Battle of Pichincha Day – ইকুয়েডর): ১৮২২ সালে পিচিঞ্চা আগ্নেয়গিরির ঢালে সংঘটিত এক যুগান্তকারী যুদ্ধের স্মরণে এই জাতীয় ছুটি পালিত হয়। জেনারেল আন্তোনিও হোসে দে সুক্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনী স্প্যানিশ রাজকীয় সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে, যা কুইটো প্রেসিডেন্সির স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। এই বিজয়টি ইকুয়েডর প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে একটি প্রধান পদক্ষেপ ছিল, যা আজও সামরিক কুচকাওয়াজ এবং ব্যাপক নাগরিক গর্বের সাথে উদযাপিত হয়।

বিশ্ব ইতিহাসে ২৪ মে

উপমহাদেশের বাইরে, ২৪ মে এমন সব প্রযুক্তিগত যুগান্তকারী আবিষ্কার, বিস্ময়কর স্থাপত্য এবং বিধ্বংসী সংঘাতের মঞ্চ হিসেবে কাজ করেছে, যা বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রকে নতুন করে এঁকেছে। নিচে এর একটি কালানুক্রমিক চিত্র তুলে ধরা হলো:

কোপারনিকাসের কালজয়ী প্রকাশনা (১৫৪৩)

পোলিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপারনিকাস তাঁর যুগান্তকারী বই De revolutionibus orbium coelestium (মহাকাশীয় গোলকের ঘূর্ণন প্রসঙ্গে) প্রকাশ করেন। মহাবিশ্বের কেন্দ্রে পৃথিবীর বদলে সূর্যকে গাণিতিকভাবে স্থাপন করে তিনি বিজ্ঞান বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন। কিংবদন্তি আছে যে, তাঁর মৃত্যুর দিনেই বইটির চূড়ান্ত মুদ্রিত কপি তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল।

সহনশীলতা আইন (The Toleration Act) (১৬৮৯)

ইংল্যান্ডের পার্লামেন্ট ‘অ্যাক্ট অফ টলারেশন’ পাস করে। এটি ছিল এমন একটি যুগান্তকারী আইন, যা চার্চ অফ ইংল্যান্ডের ভিন্নমতাবলম্বী প্রোটেস্ট্যান্টদের উপাসনার স্বাধীনতা প্রদান করেছিল। যদিও এটি রোমান ক্যাথলিকদের এই অধিকার থেকে বাদ দিয়েছিল, তবুও এটি ব্রিটেনে ধর্মীয় বহুত্ববাদের দিকে একটি বিশাল পদক্ষেপ ছিল।

প্রথম টেলিগ্রাফ বার্তা (১৮৪৪)

যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক অভাবনীয় পরিবর্তন আসে যখন স্যামুয়েল এফ.বি. মোর্স বিশ্বের প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈদ্যুতিক টেলিগ্রাফ বার্তা প্রেরণ করেন। ওয়াশিংটন ডিসির সুপ্রিম কোর্ট চেম্বার থেকে মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোরে বিঅ্যান্ডও রেলরোড ডিপোতে পাঠানো সেই বার্তাটি ছিল: “ঈশ্বর কী বিস্ময়কর সৃষ্টিই না করেছেন!” (What hath God wrought?)। এই একটি লাইন তাৎক্ষণিক দূরপাল্লার যোগাযোগের কার্যকারিতা প্রমাণ করে, যা আজকের আধুনিক ইন্টারনেটের ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

ভিক্টোরিয়া স্টিমবোট বিপর্যয় (১৮৮১)

কানাডার অন্টারিওতে টেমস নদীর বুকে উদযাপনের একটি দিন পরিণত হয়েছিল এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে। ভিক্টোরিয়া দিবস উদযাপন করতে আসা ৬০০ জনেরও বেশি যাত্রী নিয়ে ছোট এবং দোতলা স্টিমবোট ‘ভিক্টোরিয়া’ অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই হয়ে পড়েছিল। জাহাজটি উল্টে গিয়ে অগভীর জলে ডুবে যায়, যার ফলে ১৮২ জন মানুষ মর্মান্তিকভাবে পানিতে ডুবে মারা যায়। এই বিপর্যয় কানাডার সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিধিমালা এবং জাহাজের যাত্রী বহন ক্ষমতার নিয়মে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে বাধ্য করে।

ব্রুকলিন ব্রিজের উদ্বোধন (১৮৮৩)

১৪ বছরের হাড়ভাঙা পরিশ্রম এবং এর মূল নকশাকার জন এ. রোয়েবলিং সহ দুই ডজনেরও বেশি শ্রমিকের প্রাণহানির পর, নিউইয়র্কের ব্রুকলিন ব্রিজ আনুষ্ঠানিকভাবে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ব্রুকলিন ও ম্যানহাটনকে যুক্ত করা এই সেতুটি সেই সময়ে বিশ্বের দীর্ঘতম সাসপেনশন ব্রিজ ছিল, যা আমেরিকান প্রকৌশলের দক্ষতা এবং শহুরে বিস্তৃতির এক চিরস্থায়ী প্রতীকে পরিণত হয়।

অ্যামি জনসনের ঐতিহাসিক ফ্লাইট (১৯৩০)

ইংরেজ নারী বৈমানিক অ্যামি জনসন তার ডি হ্যাভিল্যান্ড জিপসি মথ বিমান, যার নাম ছিল “জেসন”, নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ডারউইনে অবতরণ করেন। এর মাধ্যমে তিনি ইংল্যান্ড থেকে অস্ট্রেলিয়ায় একাকী উড়ে যাওয়া প্রথম নারী হিসেবে ইতিহাস গড়েন। ধূলিঝড়, মৌসুমি বৃষ্টি এবং বাধ্য হয়ে বারবার অবতরণের মতো চরম বাধা পার হয়ে তার এই ১১,০০০ মাইলের কঠিন যাত্রা ১৯ দিন সময় নিয়েছিল। এই অর্জন তাকে একজন বৈশ্বিক নারীবাদী আইকন এবং বিমান চলাচলের পথিকৃতে পরিণত করে।

এইচএমএস হুড (HMS Hood) ডুবে যাওয়া (১৯৪১)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তেজনাপূর্ণ দিনগুলোতে, ডেনমার্ক প্রণালীর যুদ্ধে রয়্যাল নেভির গর্ব ‘ব্যাটলক্রুজার এইচএমএস হুড’-কে বাধা দেয় জার্মানির শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ বিসমার্ক। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিসমার্কের নিক্ষিপ্ত একটি গোলা হুডের ম্যাগাজিনে আঘাত হানে এবং এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটায়। জাহাজটি মাত্র তিন মিনিটের মধ্যে ডুবে যায়; ১,৪১৮ জন ক্রুর মধ্যে বেঁচে ছিলেন মাত্র তিনজন। এই বিশাল ক্ষতি ব্রিটিশ জনগণকে হতবাক করেছিল এবং বিসমার্ককে ধ্বংস করার জন্য এক নিরলস ও সফল অভিযানের সূচনা করেছিল।

অপারেশন সলোমন (১৯৯১)

ইথিওপিয়ার গৃহযুদ্ধ যখন ওই অঞ্চলের প্রাচীন ইহুদি সম্প্রদায়ের (বেটা ইজরায়েল) নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এবং এল আল এয়ারলাইন্স একটি গোপন ও বিশাল এয়ারলিফট অপারেশন শুরু করে। মাত্র ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে, ৩৪টি বিমান ১৪,০০০ এরও বেশি ইথিওপিয়ান ইহুদিকে নিরাপদে ইসরায়েলে সরিয়ে নেয়। এর মধ্যে একটি এল আল বোয়িং ৭৪৭ বিমান এক ফ্লাইটে ১,০০০ জনেরও বেশি যাত্রী বহন করেছিল—যা এমন এক রেকর্ড যা আজও ভাঙা সম্ভব হয়নি।

শি চুংশুনের মৃত্যু (২০০২)

চীনের বিশিষ্ট কমিউনিস্ট বিপ্লবী এবং রাজনৈতিক নেতা শি চুংশুনের (Xi Zhongxun) মৃত্যু একটি যুগের অবসান ঘটায়। রাজনৈতিক পরিমিতিবোধ এবং গুয়াংডংয়ে চীনের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের রূপকার হিসেবে পরিচিত এই নেতার অর্থনৈতিক প্রজ্ঞাই আধুনিক চীনকে গড়তে সাহায্য করেছিল। তিনি চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাবা হওয়ায় আজকের দিনেও তাঁর উত্তরাধিকার অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে।

বিখ্যাত জন্ম ও মৃত্যু

২৪ মে একদিকে যেমন রাজা-রানী, সঙ্গীতের জাদুকর এবং সাংস্কৃতিক আইকনদের পৃথিবীতে আসার দিন, তেমনি এমন অনেক বিজ্ঞানী ও শিল্পীদের বিদায় জানানোরও দিন—যাঁদের কাজ মানব ইতিহাসকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছিল।

স্মরণীয় জন্ম

  • রানী ভিক্টোরিয়া (১৮১৯): কেনসিংটন প্রাসাদে জন্মগ্রহণকারী ভিক্টোরিয়া মাত্র ১৮ বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর ৬৩ বছরের দীর্ঘ রাজত্বকাল, যা ‘ভিক্টোরিয়ান যুগ’ নামে পরিচিত, মূলত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ব্যাপক বিস্তার, অভূতপূর্ব শিল্প ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং কঠোর সাংস্কৃতিক নৈতিকতা দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা হয়। “ইউরোপের ঠাকুমা” হিসেবে তাঁর বংশধরেরা মহাদেশ জুড়ে বিভিন্ন রাজপরিবারে অবস্থান নিয়েছিলেন, যা বিংশ শতাব্দীর অনেকটা সময় পর্যন্ত ইউরোপীয় ভূ-রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছিল।

  • বব ডিলান (১৯৪১): মিনেসোটার ডুলুথে রবার্ট অ্যালেন জিমারম্যান হিসেবে জন্মগ্রহণ করা বব ডিলানকে ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবে গণ্য করা হয়। লোকজ ঐতিহ্যের সাথে পরাবাস্তববাদী কবিতা এবং রক-অ্যান্ড-রোল বিদ্যুতের মেলবন্ধন ঘটিয়ে তাঁর তৈরি “Blowin’ in the Wind” এবং “The Times They Are a-Changin'” এর মতো গানগুলো ১৯৬০-এর দশকের নাগরিক অধিকার এবং যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত সঙ্গীতে পরিণত হয়েছিল। ২০১৬ সালে তিনি প্রথম সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন।

  • প্রিসিলা প্রিসলি (১৯৪৫): একজন আমেরিকান অভিনেত্রী এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যবসায়ী। তাঁর প্রাক্তন স্বামী এলভিস প্রিসলির মর্মান্তিক মৃত্যুর পর, তিনি তাঁর দ্রুত কমতে থাকা সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নেন। ‘গ্রেসল্যান্ড’ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়ে তিনি একে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সফল পর্যটন আকর্ষণে পরিণত করেন। এর মাধ্যমে তিনি “কিং অফ রক অ্যান্ড রোল”-এর উত্তরাধিকার রক্ষা করেন এবং নিজের পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত করেন।

  • প্যাটি লাবেল (১৯৪৪): “গডমাদার অফ সোল” খ্যাত প্যাটি লাবেল একজন কিংবদন্তি আমেরিকান গায়িকা এবং অভিনেত্রী। অবিশ্বাস্য কণ্ঠশক্তির অধিকারী প্যাটি ‘লাবেল’ গ্রুপের প্রধান গায়িকা ছিলেন, যারা ডিস্কো অ্যান্থেম “Lady Marmalade” এর জন্য বিখ্যাত। পরবর্তীতে তিনি অত্যন্ত সফল একক ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন এবং একাধিক গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড জেতার পাশাপাশি গ্র্যামি হল অফ ফেমে নিজের জায়গা পাকা করেন।

স্মরণীয় মৃত্যু

  • নিকোলাস কোপারনিকাস (১৫৪৩): পোলিশ এই গণিতবিদ এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী ৭০ বছর বয়সে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তাঁর সারা জীবনের কাজ মহাবিশ্ব সম্পর্কে টলেমাইক দৃষ্টিভঙ্গিকে পুরোপুরি উল্টে দিয়েছিল। তিনি ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র থেকে মানবতাকে সরিয়ে গ্যালিলিও এবং কেপলারের মতো ভবিষ্যৎ জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য একটি সমালোচনামূলক ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।

  • ডিউক এলিংটন (১৯৭৪): এডওয়ার্ড কেনেডি “ডিউক” এলিংটন ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। একজন মাস্টার সুরকার, পিয়ানোবাদক এবং ক্যারিশম্যাটিক ব্যান্ডলিডার হিসেবে তিনি সম্ভবত জ্যাজ ইতিহাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তিনি জ্যাজ সঙ্গীতকে একটি জটিল এবং সম্মানিত শিল্পকলায় উন্নীত করেছিলেন, হাজার হাজার স্কোরের সুর করেছিলেন এবং ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁর অর্কেস্ট্রার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

  • টিনা টার্নার (২০২৩): আন্না মে বুলক নামে জন্মগ্রহণকারী “কুইন অফ রক অ্যান্ড রোল” সুইজারল্যান্ডে তার নিজ বাড়িতে দীর্ঘ অসুস্থতার পর শান্তিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মঞ্চে তার বিদ্যুতায়িত উপস্থিতি, অগাধ কণ্ঠশক্তি এবং অসাধারণ ব্যক্তিগত সহনশীলতার জন্য তিনি পরিচিত। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে নির্যাতনের শিকার হলেও তা অতিক্রম করে তিনি সর্বকালের অন্যতম সেরা রেকর্ডিং শিল্পী হয়ে ওঠেন, যিনি “What’s Love Got to Do with It” এবং “Proud Mary” এর মতো হিটের জন্য বিখ্যাত।

আপনি কি জানতেন?

ইতিহাস প্রায়শই ছোট, অদ্ভুত সব বিবরণের সমন্বয়ে তৈরি হয় যা অনেক সময় পাঠ্যবইয়ের পাতা থেকে হারিয়ে যায়। নিচে ২৪ মে সম্পর্কিত তিনটি চমকপ্রদ অজানা তথ্য তুলে ধরা হলো:

    • এক কাব্যিক কাকতালীয় ঘটনা: শিশুদের বিখ্যাত নার্সারি রাইম “Mary Had a Little Lamb” প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৩০ সালের ২৪ মে। এর লেখিকা সারাহ জোসেফা হেল শুধু শিশুদের কবি ছিলেন না; একজন শক্তিশালী ম্যাগাজিন সম্পাদক হিসেবে তিনি বছরের পর বছর ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের কাছে জোর তদবির করেছিলেন, যতক্ষণ না আব্রাহাম লিংকন শেষ পর্যন্ত ‘থ্যাঙ্কসগিভিং’-কে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় ছুটি হিসেবে ঘোষণা করতে সম্মত হন।

    • টেলিগ্রামের ছায়াসুরকার: টেলিগ্রাফ যে কাজ করে তা প্রমাণ করার জন্য স্যামুয়েল মোর্স যখন “ঈশ্বর কী বিস্ময়কর সৃষ্টিই না করেছেন” বার্তাটি পাঠিয়েছিলেন, তখন এই বাক্যটি তিনি নিজে নির্বাচন করেননি। তিনি এই প্রথম বার্তাটি বেছে নেওয়ার সম্মান দিয়েছিলেন ইউএস প্যাটেন্ট কমিশনারের তরুণী কন্যা অ্যানি এলসওয়ার্থকে, যিনি মোর্সকে এই সুখবরটি দিয়েছিলেন যে কংগ্রেস তার টেলিগ্রাফ লাইনের জন্য অর্থায়নের অনুমোদন দিয়েছে।

    • পৃথিবীর প্লাস্টিক পাথর: সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা যখন কোলা সুপারডিপ বোরহোল খনন করছিলেন, তখন আবিষ্কারের জিনিস ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে তারা থামেননি; তারা থেমেছিলেন কারণ পদার্থবিজ্ঞানের কাছে তারা হার মেনেছিলেন। মাটির ১২ কিলোমিটার গভীরে পৌঁছানোর পর তাপমাত্রা অপ্রত্যাশিতভাবে ১৮০°C-এ উঠে যায়। এত চরম তাপ এবং চাপে ভূগর্ভস্থ পাথর আর কঠিন পাথরের মতো আচরণ করছিল না, বরং তা নমনীয় প্লাস্টিকের মতো আচরণ করতে শুরু করে। যার ফলে প্রতিবার ড্রিল বিট বের করে আনার সাথে সাথে বিশাল ওই গর্তটি নিজে থেকেই বুজে আসত।

২৪ মে: সময়ের এক অনন্য আয়না

২৪ মে-এর ঘটনাগুলোর দিকে ফিরে তাকালে, মানব সভ্যতার অগ্রগতির তীব্র গতি এবং আমাদের ইতিহাসের চক্রাকার প্রকৃতির কথা মনে পড়ে যায়। যেদিন কোপারনিকাস মহাকাশ সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করেছিলেন, তার ঠিক কয়েক শতাব্দী পরে একই দিনে মোর্স একটি টেলিগ্রাফ কীর স্পর্শে পৃথিবীর বিশাল দূরত্বকে এক মুহূর্তে কমিয়ে এনেছিলেন। এই দিনটি একে অপরের সাথে যুক্ত হওয়ার প্রতি আমাদের নিরলস তাড়নার কথা মনে করিয়ে দেয়—তা সে ব্রুকলিন ব্রিজের মাধ্যমে ফিজিক্যালি হোক, বা সমুদ্রতলের কেবলের মাধ্যমে ডিজিটালি।

তবে একই সাথে এই তারিখটি আমাদের অস্তিত্বের ভঙ্গুরতার প্রতিও শ্রদ্ধাশীল হওয়ার দাবি জানায়। এইচএমএস হুডের মর্মান্তিক ক্ষতি এবং ১৯৮৫ সালের বাংলাদেশের ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতা মানুষের সীমাহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিপরীতে চরম বাস্তবতা হিসেবে কাজ করে। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় মানব সংঘাত এবং প্রাকৃতিক জগতের ক্ষমার অযোগ্য শক্তির কথা। সবশেষে, ২৪ মে-র ইতিহাস অধ্যয়ন আমাদের এক গভীর দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে: আমরা যে ইতিহাসের উত্তরাধিকারী, তা রানী ভিক্টোরিয়ার মতো পরাক্রমশালী শাসক এবং কাজী নজরুল ইসলামের মতো বিদ্রোহীদের দ্বারা যতটা নির্মিত, ঠিক ততটাই নির্মিত হয়েছে ওইসব অসংখ্য অদেখা মানুষের হাতে—যারা ব্রিজে পেরেক ঠুকেছিলেন, গভীর বোরহোল খনন করেছিলেন এবং স্বাধীনতার জন্য নিজেদের জীবন বাজি রেখে কুচকাওয়াজ করেছিলেন। আমরা যখন আমাদের নিজস্ব ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়াচ্ছি, তখন আজকের এই দিনের আর্কাইভ আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে—প্রতিটি কাজ, তা যত ছোটই হোক না কেন, যুগ যুগ ধরে প্রতিধ্বনিত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।

সর্বশেষ