৫ জুন: ইতিহাসের এই দিনে – বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা, জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী

সর্বাধিক আলোচিত

ক্যালেন্ডারের প্রতিটি পাতার পেছনেই লুকিয়ে থাকে ইতিহাসের এক বিশাল ও জটিল ক্যানভাস। তবে এর মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট তারিখ এমনভাবে ডানা মেলে, যা শতাব্দীর পর শতাব্দীকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলে। ৫ জুন ঠিক তেমনই একটি অনন্য সন্ধিক্ষণ। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এই একটি মাত্র দিনে একদিকে যেমন আধুনিক অর্থনীতির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী তত্ত্বগুলোর জন্ম হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি রক্তাক্ত সংঘাতের মধ্য দিয়ে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে ভূরাজনৈতিক মানচিত্র। আবার এই দিনেই অজান্তেই জ্বলে উঠেছিল এমন কিছু গণআন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ, যা পরবর্তীতে কাঁপিয়ে দিয়েছিল দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরশাসনকে। ৫ জুনের এই কাঠামোগত পরিবর্তন ও ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে আমরা আজকের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ব্যবস্থার এক নিখুঁত রূপরেখা দেখতে পাই।

নিচে অত্যন্ত যত্নসহকারে ৫ জুনের একটি বিস্তারিত ঐতিহাসিক খতিয়ান তুলে ধরা হলো, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার—বিশেষ করে বাঙালি পরিমণ্ডলের গভীর ইতিহাসকে বৈশ্বিক ও সমসাময়িক প্রেক্ষাপটের সাথে পরম মমতায় মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বাঙালি বলয়

দক্ষিণ এশিয়া ও বিশেষ করে বাঙালি অববাহিকার সামাজিক ও রাজনৈতিক মানচিত্রটি বারবার বদলে গেছে এই ৫ জুনে ঘটে যাওয়া কিছু বিচারবিভাগীয়, ঔপনিবেশিক এবং সামরিক ঘটনার হাত ধরে। ঢাকা থেকে শুরু করে কলকাতা—সর্বত্রই এই তারিখটি সাম্য, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং ন্যায়বিচারের লড়াইয়ের এক জীবন্ত দর্পণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ইতিহাসের মোড় ঘোরানো ঘটনাবলি

২০২৪ সালের কোটা সংস্কার মামলার রায় ও জুলাই বিপ্লবের স্ফুলিঙ্গ (বাংলাদেশ): ২০২৪ সালের ৫ জুনে বাংলাদেশের মহামান্য হাইকোর্ট এমন একটি রায় প্রদান করেন, যা দেশের পুরো রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে এক ধাক্কায় নাড়িয়ে দেয়। আদালত সরকারের ২০১৮ সালের সেই প্রশাসনিক পরিপত্রটিকে অবৈধ ঘোষণা করে, যার মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য বরাদ্দ থাকা ৩০ শতাংশ কোটা পদ্ধতি বাতিল করা হয়েছিল।

  • সামাজিক প্রভাব: এই বিচারবিভাগীয় সিদ্ধান্তটি দেশের সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়, যারা এমনিতেই একটি অত্যন্ত কঠিন ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ কর্মসংস্থানের বাজারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন।

  • ঐতিহাসিক গুরুত্ব: প্রথমে এটি সাধারণ ও স্থানীয় বিক্ষোভ হিসেবে শুরু হলেও খুব দ্রুতই তা ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এ রূপ নেয়। জুলাই ও আগস্ট মাসে এই আন্দোলন এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে (যা জুলাই বিপ্লব নামে পরিচিত) রূপ নেয়। ৫ জুনের সেই একটি রায়ের সূত্র ধরে তৈরি হওয়া গণজোয়ার অবশেষে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে তাঁর ১৫ বছরের একটানা শাসনের অবসান ঘটায়।

১৯৪৩ সালের খাদ্য সংকট এবং জনপ্রতিরোধ (বাংলা প্রেসিডেন্সি): কুখ্যাত ও মানবসৃষ্ট ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ বা বাংলার দুর্ভিক্ষের সেই অন্ধকার সময়ে, ১৯৪৩ সালের ৫ জুন গণমাধ্যম ও জনসচেতনতার ইতিহাসে এক অনন্য দিন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই দিনে তৎকালীন আঞ্চলিক সংবাদপত্রসমূহ, বিশেষ করে অমৃত বাজার পত্রিকা, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নীতির চরম ব্যর্থতা, চালের কালোবাজারি এবং গ্রামীণ খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলের ভেঙে পড়ার চিত্র অত্যন্ত সাহসের সাথে জনসমক্ষে তুলে ধরে। এই নির্ভীক সাংবাদিকতা স্থানীয় লতা-পাতা ও নাগরিক সমাজকে ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছিল এবং নীরব কান্নাকে ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে এক তীব্র রাজনৈতিক প্রতিরোধে রূপ দিয়েছিল।

১৯৮৪ সালের অপারেশন ব্লু স্টার-এর তীব্রতা বৃদ্ধি (অমৃতসর): ১৯৮৪ সালের ৫ জুন ভারতীয় সেনাবাহিনী পাঞ্জাবের অমৃতসরে শিখদের পবিত্রতম স্থান ‘স্বর্ণমন্দির’ (গোল্ডেন টেম্পল) কমপ্লেক্সে তাদের মূল পদাতিক বা ইনফ্যান্ট্রি আক্রমণ শুরু করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে শিখ চরমপন্থী নেতা জার্নাইল সিং ভিন্দরানওয়ালে এবং তাঁর সশস্ত্র অনুসারীদের সেখান থেকে সরাতেই এই অভিযান চালানো হয়েছিল। ৫ জুনের এই রক্তক্ষয়ী সমরে পবিত্র ‘অকাল তখত’-এর ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং বহু সাধারণ মানুষ ও তীর্থযাত্রী প্রাণ হারান। এই ঘটনাটি শিখ সম্প্রদায়ের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে, যার নির্মম পরিণতি হিসেবে পরবর্তীতে খোদ ইন্দিরা গান্ধীকে তাঁর শিখ দেহরক্ষীদের হাতেই প্রাণ হারাতে হয়েছিল।

স্মরণীয় জন্ম ও মৃত্যু

যোগী আদিত্যনাথ (জন্ম ১৯৭২): ভারতের উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ি গ্রাম পঞ্চুরে অজয় মোহন বিশত নামে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি পরবর্তীতে একজন সন্যাসী বা যোগী হিসেবে জীবন শুরু করেন। তবে কালক্রমে তিনি ভারতের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। ২০১৭ সাল থেকে ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই বিজেপি নেতার কট্টর শাসননীতি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং জনসংখ্যাগত কৌশলগুলো পুরো দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক বিশাল প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।

১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষের নামহীন লাখো প্রাণ (মৃত্যু): জনমিতি ও ইতিহাসবিদদের মতে, ১৯৪৩ সালের ৫ জুন নাগাদ বাংলার নদীয়া, যশোর এবং মেদিনীপুরের মতো জেলাগুলোতে ক্ষুধা ও তার অবধারিত সঙ্গী হিসেবে আসা কলেরা ও ম্যালেরিয়ায় দৈনিক মৃত্যুর হার চরম আকার ধারণ করেছিল। ইতিহাসের মূল নথিপত্রে এই প্রান্তিক ও সাধারণ মানুষদের নাম হয়তো আলাদা করে লেখা নেই, কিন্তু এই সমষ্টিগত আত্মত্যাগ বাংলার কৃষি ও গ্রামীণ সমাজকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল।

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উৎসবের মেলবন্ধন

জামাই ষষ্ঠী: হিন্দু চন্দ্র পঞ্জিকা বা তিথি অনুযায়ী, বাঙালির অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং আবহমান সংস্কৃতির অংশ ‘জামাই ষষ্ঠী’ উৎসবটি প্রায়শই জুনের এই প্রথম সপ্তাহের দিকেই পড়ে থাকে। জামাইকে কেন্দ্র করে শ্বশুরবাড়ির নানান পদের ঐতিহ্যবাহী রান্নাবান্না এবং পারিবারিক মেলবন্ধনের এই উৎসবটি বাঙালি গার্হস্থ্য জীবনের এক মধুর রূপ।

বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ও পরিবেশ সচেতনতা: যেহেতু ৫ জুন আন্তর্জাতিক পরিবেশ দিবসের সাথে মিলে যায়, তাই ঢাকা এবং কলকাতার মতো প্রধান বাঙালি মেগাসিটিগুলোর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এই দিনটিকে নিজেদের মতো করে আপন করে নিয়েছে। কংক্রিটের জঙ্গল ও তীব্র তাপপ্রবাহ (Urban Heat Island Effect) থেকে বাঁচতে প্রতি বছর ৫ জুনে দুই বাংলাতেই ব্যাপক হারে ‘বৃক্ষরোপণ’ ও পরিবেশ সচেতনতামূলক পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়।

নিচে পাঠকদের সুবিধার্থে দক্ষিণ এশিয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ এবং মোড় ঘোরানো ঘটনাগুলোকে তাদের সুনির্দিষ্ট বছর অনুযায়ী একটি ক্রমানুসারে সাজিয়ে দেওয়া হলো:

বছর ঘটনার নাম মূল সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব
১৯৪৩ দুর্ভিক্ষের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমের আওয়াজ ব্রিটিশদের কৃত্রিম খাদ্য সংকট ও নীতিগত ব্যর্থতাকে ফাঁস করে স্থানীয় প্রতিরোধকে চাঙ্গা করে।
১৯৭১ শরণ সিংয়ের কূটনৈতিক মিশন বাংলাদেশের শরণার্থী সংকটকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরে ইউরোপ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন আদায়ে ভূমিকা রাখে।
১৯৮৪ অপারেশন ব্লু স্টার-এর মূল আক্রমণ পাঞ্জাবের নিরাপত্তা এবং শিখ সম্প্রদায়ের আবেগকে গভীরভাবে আঘাত করে, যা পরবর্তীতে দেশের রাজনীতিকে রক্তাক্ত করে।
২০২৪ হাইকোর্টের কোটা পুনর্বহালের রায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়, যা পরবর্তীতে ঐতিহাসিক ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে রূপ নেয়।

আন্তর্জাতিক দিবস ও রাষ্ট্রীয় উদযাপন

আন্তর্জাতিক দিবস ও বিশ্বব্যাপী উদযাপন

দক্ষিণ এশিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে ৫ জুন বিশ্বমঞ্চে পরিবেশগত নীতি নির্ধারণ এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর সাংবিধানিক ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস (জাতিসংঘ)

১৯৭২ সালে সুইডেনের স্টকহোমে মানুষের পরিবেশ বিষয়ক ঐতিহাসিক সম্মেলনের প্রথম দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৫ জুনকে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। পরবর্তীতে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP)-এর অধীনে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরিবেশগত গণসচেতনতার প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়। প্লাস্টিক দূষণ রোধ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর মতো বৈশ্বিক চুক্তি ও আইনগুলো প্রণয়নের ক্ষেত্রে এই দিনটি বিশ্বনেতাদের জন্য একটি বার্ষিক জবাবদিহিতার দিন হিসেবে কাজ করে।

জাতীয় দিবস ও সাংবিধানিক মাইলফলক

একটি দেশের নিজস্ব সংবিধান ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার পেছনে কিছু নির্দিষ্ট দিনের অবদান থাকে অনস্বীকার্য। বিশ্বের মানচিত্রে ৫ জুনকে জাতীয় দিবস হিসেবে উদযাপনের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

দেশ উদযাপনের ধরন ঐতিহাসিক তাৎপর্য
ডেনমার্ক সংবিধান দিবস (Grundlovsdag) ১৮৪৯ সালের ৫ জুন রাজা সপ্তম ফ্রেডেরিক ডেনমার্কের প্রথম সংবিধানে স্বাক্ষর করেন, যা দেশটিকে নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র থেকে একটি আধুনিক সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে রূপান্তরিত করে।
সেশেলস মুক্তি দিবস (Liberation Day) ১৯৭৭ সালের এই দিনে ভারত মহাসাগরের এই দ্বীপ রাষ্ট্রে একটি অভ্যুত্থান ঘটেছিল, যা দেশটির আধুনিক রাজনৈতিক কাঠামো ও শাসনব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দেয়।

বৈশ্বিক ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন

৫ জুনের ঐতিহাসিক রেকর্ডগুলো ঘাঁটলে দেখা যায়, এই একটি দিনেই আন্তর্জাতিক আইন, নাগরিক অধিকার, ঠান্ডা লড়াই (Cold War) এবং সামরিক কৌশলের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঘনীভূত কিছু ঘটনা ঘটেছিল।

  • যুক্তরাষ্ট্র: ১৯৬৮ সালের ৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসের অ্যাম্বাসেডর হোটেলে ক্যালিফোর্নিয়া ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে বিজয়ী ভাষণ দেওয়ার ঠিক পরপরই মার্কিন সিনেটর রবার্ট এফ কেনেডিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে সিরহান সিরহান নামের এক যুবক। ২৬ ঘণ্টা পর কেনেডি মারা যান, যা আমেরিকার প্রগতিশীল আন্দোলনকে এক চরম ধাক্কা দেয়। ঠিক ১৩ বছর পর, ১৯৮১ সালের ৫ জুন, মার্কিন সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC) তাদের একটি সাপ্তাহিক বুলেটিনে লস অ্যাঞ্জেলেসের ৫ জন সমকামী তরুণের শরীরে এক বিরল ধরণের নিউমোনিয়ার সংক্রমণ নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই সাধারণ প্রতিবেদনটিকেই বিশ্বব্যাপী এইচআইভি/এইডস (HIV/AIDS) মহামারির আনুষ্ঠানিক ট্র্যাকিংয়ের প্রথম দলিল হিসেবে গণ্য করা হয়।

  • রাশিয়া ও সোভিয়েত ইউনিয়ন: ১৯৪৫ সালের এই দিনে মিত্রশক্তির চার প্রধান দেশ বার্লিনে সমবেত হয়ে ঐতিহাসিক ‘বার্লিন ঘোষণা’ স্বাক্ষর করে। সোভিয়েত মার্শাল গেওর্গি ঝুকভ এবং তাঁর পশ্চিমা সহযোগীদের স্বাক্ষরের মাধ্যমে নাৎসি জার্মানির ওপর মিত্রশক্তির পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে জার্মানিকে যে চারটি প্রশাসনিক জোনে ভাগ করা হয়েছিল, তা-ই পরবর্তীতে ঠান্ডা লড়াইয়ের মূল যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়।

  • চীন: ১৯৮৯ সালের ৫ জুনের সকালে বেইজিংয়ের চাঙ্গান এভিনিউতে এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখে থমকে গিয়েছিল পুরো বিশ্ব। আগের রাতেই তিয়েনআনমেন স্কয়ারে ছাত্রদের ওপর সামরিক বাহিনীর নির্মম অভিযানের পর, শপিং ব্যাগ হাতে একজন সাধারণ নামহীন নাগরিক (ট্যাংক ম্যান) এক সারিতে এগিয়ে আসা বিশালাকার টাইপ ৫৯ সামরিক ট্যাংকের সামনে গিয়ে একাই দাঁড়িয়ে যান। হোটেলের ব্যালকনি থেকে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের ক্যামেরায় বন্দি হওয়া এই ছবিটি আজ অব্দি রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অহিংস প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক প্রতীক।

  • যুক্তরাজ্য: ১৯৭৫ সালের ৫ জুন যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি দেশব্যাপী গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। বিষয় ছিল—যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সম্প্রদায় (EEC)-তে থাকবে কি না। ভোটের ফলাফল ছিল চমকপ্রদ; প্রায় ৬৭.২% মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে থাকার পক্ষে রায় দেন। এই দিনটির দিকে তাকালে আজ অবাক হতে হয় যে, এই একই জাতি ২০১৬ সালে এসে আবার ‘ব্রেক্সিট’ (Brexit)-এর মাধ্যমে ইউরোপ থেকে বের হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

  • ইউরোপ: ১৯৪৭ সালের ৫ জুন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমাবর্তন বক্তৃতায় মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব জর্জ মার্শাল এক যুগান্তকারী অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন, যা ইতিহাসে ‘মার্শাল প্ল্যান’ নামে অমর হয়ে আছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত পশ্চিম ইউরোপের পুনর্গঠনের জন্য এই পরিকল্পনার আওতায় প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ও কারিগরি সাহায্য দেওয়া হয়। এই একটি নীতি ইউরোপকে অর্থনৈতিক ধস থেকে বাঁচিয়ে আমেরিকার সাথে এক স্থায়ী অতলান্তিক জোটে (Transatlantic Alliance) বেঁধে ফেলে।

  • অস্ট্রেলিয়া: ১৯৮২ সালের ৫ জুন অস্ট্রেলিয়ার হাইকোর্ট ‘কুওয়ার্টা বনাম বিজেলকে-পিটারসেন’ মামলায় এক ল্যান্ডমার্ক রায় প্রদান করে। আদালত কুইন্সল্যান্ড রাজ্য সরকারের আপত্তির বিরুদ্ধে গিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘বর্ণবৈষম্য দূরীকরণ আইন ১৯৭৫’-এর সাংবিধানিক বৈধতা বজায় রাখে। এটি ছিল অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের (Aboriginal) ভূমির অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে এক ঐতিহাসিক বিজয়।

  • কানাডা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চরম উত্তেজনার মাঝে, ১৯১৭ সালের ৫ জুন কানাডার প্রধানমন্ত্রী স্যার রবার্ট বোর্ডেন পার্লামেন্টে ‘মিলিটারি সার্ভিস অ্যাক্ট’ বা বাধ্যতামূলক সামরিক চাকরি আইন উত্থাপন করেন। এই আইনটি কানাডায় এক তীব্র সংকটের জন্ম দেয়, যার ফলে ব্রিটিশ রাজের প্রতি অনুগত ইংরেজিভাষী কানাডিয়ান এবং বাধ্যতামূলক যুদ্ধের বিরোধী ফরাসিভাষী কুইবেকবাসীদের মধ্যে এক দীর্ঘস্থায়ী ও তেতো সামাজিক বিভেদের সৃষ্টি হয়।

  • মধ্যপ্রাচ্য (ইসরায়েল ও আরব বিশ্ব): ১৯৬৭ সালের ৫ জুনের সকালে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বদলে যায় মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি। ইসরায়েলি বিমান বাহিনী হঠাৎ করেই ‘অপারেশন ফোকাস’ নামে এক আকস্মিক বিমান হামলা চালায়, যা মিশর, সিরিয়া ও জর্ডানের বিমান বাহিনীকে রানওয়েতেই ধ্বংস করে দেয়। মাত্র ছয় দিনের এই যুদ্ধের অবসান ঘটে ১০ জুন, যার মাধ্যমে ইসরায়েল গাজা উপত্যকা, সিনাই উপদ্বীপ, পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম এবং গোলান মালভূমি নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়।

খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বদের জীবন আলেখ্য

৫ জুনের জীবনীমূলক পাতাগুলো ওল্টালে দেখা যায়, এই দিনে এমন কিছু মানুষের আগমন ও প্রস্থান ঘটেছে যারা মানব সভ্যতার জ্ঞান, অর্থনীতি, সাহিত্য ও চিন্তাধারার মূল ভিত্তিগুলো তৈরি করে দিয়ে গেছেন।

বিখ্যাত জন্ম

  • অ্যাডাম স্মিথ (১৭২৩–১৭৯০) | স্কটিশ: ১৭২৩ সালের ৫ জুন স্কটল্যান্ডের এই মহান অর্থনীতিবিদের ব্যাপটিজমের রেকর্ড পাওয়া যায়। স্কটিশ আলোকায়নের (Scottish Enlightenment) অন্যতম প্রধান এই পুরুষকে ‘আধুনিক অর্থনীতির জনক’ বলা হয়। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য ওয়েলথ অব নেশনস’ মুক্তবাজার অর্থনীতি, শ্রমবিভাগ (Division of Labor) এবং ‘অদৃশ্য হাত’ (Invisible Hand)-এর ধারণা দিয়ে পুঁজিবাদী অর্থনীতির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।

  • জন মেনার্ড কেইনস (১৮৮৩–১৯৪৬) | ব্রিটিশ: অ্যাডাম স্মিথের ঠিক ১৬০ বছর পর, একই দিনে জন্ম নেন বিশ শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী সামষ্টিক অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস। গ্রেট ডিপ্রেশন বা মহামন্দার সময়ে তিনি স্মিথের মুক্তবাজার তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। তিনি প্রমাণ করেন যে মন্দার সময়ে বাজার নিজে নিজে ঠিক হতে পারে না; বরং কর্মসংস্থান ও চাহিদা বজায় রাখতে রাষ্ট্রের সরাসরি আর্থিক হস্তক্ষেপ এবং ঘাটতি বাজেট (Deficit Spending) অপরিহার্য।

  • ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা (১৮৯৮–১৯৩৬) | স্প্যানিশ: স্পেনের আন্দালুসিয়ায় জন্ম নেওয়া লোরকা বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রখ্যাত কবি ও নাট্যকার। স্পেনের ‘জেনারেশন অব ২৭’-এর এই মূল নেতা স্প্যানিশ লোকগাথা ও আধুনিক পরাবাস্তববাদের মিশ্রণে ‘ব্লাড ওয়েডিং’-এর মতো কালজয়ী নাটক উপহার দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় উগ্র জাতীয়তাবাদী ফ্রাঙ্কো বাহিনীর হাতে এই মহান শিল্পীকে নৃশংসভাবে প্রাণ হারাতে হয়।

  • তিওদোরো ওবিয়াং এনগুয়েমা এমবাসোগো (১৯৪২) | ইকুয়েটোরিয়াল গিনি: ১৯৪২ সালের ৫ জুন জন্ম নেওয়া এই সামরিক কর্মকর্তা ১৯৭৯ সালে এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। কোনো রাজপরিবারের সদস্য না হয়েও আধুনিক পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে একটানা প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে থাকার বিশ্বরেকর্ডটি তাঁরই দখলে।

  • রিক রিঅর্ডান (১৯৬৪) | আমেরিকান: একজন সাধারণ স্কুলের ইতিহাসের শিক্ষক থেকে বিশ্বখ্যাত লেখক হয়ে ওঠা রিক রিঅর্ডান তরুণ পাঠকদের কল্পনার জগতকে বদলে দিয়েছেন। তাঁর লেখা বিখ্যাত ‘পার্সি জ্যাকসন অ্যান্ড দ্য অলিম্পিয়ানস’ সিরিজের মাধ্যমে তিনি গ্রিক, রোমান, মিশরীয় ও নর্স পৌরাণিক কাহিনীকে আধুনিক রূপ দিয়েছেন, যেখানে তিনি অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (Neurodiverse) চরিত্রদের মূল বীর হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

বিখ্যাত মৃত্যু

  • হোরাশিও হারবার্ট কিচেনার (১৯১৬) | ব্রিটিশ: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ ফিল্ড মার্শাল এবং যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী কিচেনার ১৯১৬ সালের ৫ জুনে সাগরে এক দুর্ঘটনায় মারা যান। তাঁর চড়াও করা গোঁফ এবং হাত উঁচিয়ে থাকা সেই বিখ্যাত ব্রিটিশ সামরিক রিক্রুটমেন্ট পোস্টারটি—“Your Country Needs YOU”—আজও বিশ্ব ইতিহাসের এক আইকনিক ছবি।

  • লুডভিক ফ্লেক (১৯৬১) | পোলিশ-ইউহুদি: একজন অসাধারণ অণুজীববিজ্ঞানী এবং দার্শনিক, যিনি বিজ্ঞানের সমাজতত্ত্বের (Sociology of Science) ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিদের আউশভিৎস এবং বুখেনওয়াল্ড কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দি থেকেও তিনি টাইফাসের প্রতিষেধক তৈরি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ১৯৬১ সালের ৫ জুন এই মহান বিজ্ঞানী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

  • রোনাল্ড রেগান (২০০৪) | আমেরিকান: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪০তম রাষ্ট্রপতি এবং বিংশ শতাব্দীর শেষভাগের রক্ষণশীল রাজনীতির অন্যতম প্রধান স্থপতি। ২০০৪ সালের ৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসের বেল-এয়ারে ৯৩ বছর বয়সে আলঝেইমার্স রোগের সাথে দীর্ঘ লড়াই শেষে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মুক্তবাজার অর্থনৈতিক নীতি (Reaganomics) এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে কট্টর অবস্থান ঠান্ডা লড়াইয়ের অবসানকে ত্বরান্বিত করেছিল।

“আপনি কি জানতেন?” কিছু ঐতিহাসিক বিস্ময়

  • অর্থনীতির দুই মেরুর এক মোহনা: মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী অথচ সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দুই অর্থনৈতিক ভাবধারার প্রবক্তা—অ্যাডাম স্মিথ (ব্যাপটিজম ৫ জুন, ১৭২৩) এবং জন মেনার্ড কেইনস (জন্ম ৫ জুন, ১৮৮৩)—একই ক্যালেন্ডার তারিখে পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন। একজন যেখানে মুক্তবাজারের পক্ষে কথা বলেছেন, অন্যজন বলেছেন রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের কথা।

  • একটি হত্যাকাণ্ডের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: সিরহান সিরহান মার্কিন সিনেটর রবার্ট এফ কেনেডিকে হত্যার জন্য ১৯৬৮ সালের ৫ জুন তারিখটি মোটেও কাকতালীয়ভাবে বেছে নেয়নি। একজন ফিলিস্তিনি অভিবাসী হিসেবে সিরহান কেনেডির ইসরায়েলকে সামরিক বিমান দেওয়ার প্রতিশ্রুতির ওপর ক্ষিপ্ত ছিলেন। তাই তিনি বেছে নিয়েছিলেন ১৯৬৭ সালের ৫ জুনে শুরু হওয়া ‘ছয় দিনের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ’-এর ঠিক প্রথম বার্ষিকী।

  • বাংলার বুকে স্প্যানিশ ফ্লু-এর প্রথম থাবা: ১৯১৮ সালের সেই মারাত্মক ইনফ্লুয়েঞ্জা বা স্প্যানিশ ফ্লু মহামারির কথা আমরা অনেকেই জানি। তবে নৌবাহিনীর আর্কাইভের নথি অনুযায়ী, ১৯১৮ সালের ৫ জুনের সকালে যুদ্ধফেরত সৈনিকদের নিয়ে আসা জাহাজ বোম্বে (মুম্বাই) বন্দরে নোঙর করার পর সাতজন পুলিশ সদস্য প্রথম অসুস্থ হয়ে পড়েন। এটিই ছিল অবিভক্ত ভারতে এই মহামারির প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রবেশ, যা পরবর্তীতে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল।

কালের খেয়ায় ৫ জুন: ইতিহাসের চিরন্তন প্রতিধ্বনি

৫ জুনের এই বহুমাত্রিক ও বিশাল ইতিহাসের পাতাগুলো যখন আমরা একের পর এক উল্টাতে থাকি, তখন স্পষ্ট বোঝা যায়—এটি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি সাধারণ সংখ্যা নয়। এটি মানব সভ্যতার অগ্রগতি, আদর্শিক সংঘাত এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল। খুব কম দিনই এমন সৌভাগ্যের অধিকারী হয়, যেখানে একদিকে পৃথিবীর দুই প্রধান অর্থনৈতিক দর্শনের জন্মলগ্ন মিশে থাকে, আর অন্যদিকে ঢাকার রাজপথ থেকে বেইজিংয়ের চাঙ্গান এভিনিউ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে ওঠে।

এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ইতিহাসের চাকা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে ঘোরে না। ঢাকার একটি আদালতের রায় হোক, কিংবা লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি ছোট হাসপাতালের মেডিকেল বুলেটিন—সেগুলো কীভাবে তরঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বের মানুষের অধিকার ও রাষ্ট্রীয় নীতিকে চিরতরে নতুন রূপ দিতে পারে, ৫ জুন তারই এক অমোঘ প্রমাণ। ইতিহাসবিদ, সাংবাদিক কিংবা সাধারণ পাঠক—সবার জন্যই ৫ জুনের এই যাত্রাটি আমাদের বৈশ্বিক আন্তঃসংযুক্ততার এক পরম ও জরুরি স্মারক।

সর্বশেষ