প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে গেলে শুধু মন খারাপ হয় না, অনেক সময় শরীরও তার প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করে। কারও ঘুম কমে যায়, কারও কাজের ইচ্ছে থাকে না, কারও আবার সারাক্ষণ কিছু না কিছু খেতে ইচ্ছে করে। বিশেষ করে চকলেট, পিৎজা, আইসক্রিম, কেক, চিপস, বিরিয়ানি বা ভাজাভুজির মতো খাবারের প্রতি টান হঠাৎ অনেক বেড়ে যেতে পারে।
এটা অস্বাভাবিক নয়। গভীর মানসিক কষ্টের সময় মস্তিষ্ক দ্রুত স্বস্তি খোঁজে। খাবার সেই স্বস্তির সবচেয়ে সহজ রাস্তা বলে মনে হয়। কারণ খাবার হাতের কাছে থাকে, কারও অনুমতি লাগে না, আর খাওয়ার পর কয়েক মিনিটের জন্য মন সত্যিই একটু ভালো লাগতে পারে।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন খাবার শরীরের প্রয়োজন মেটানোর বদলে আবেগ ঢাকার উপায় হয়ে ওঠে। আপনি ক্ষুধার্ত নন, তবু খাচ্ছেন। খাওয়ার পর ভালো লাগার বদলে অপরাধবোধ হচ্ছে। আবার মন খারাপ হলেই খাবারের দিকে হাত যাচ্ছে। এই চক্রই ধীরে ধীরে আবেগজনিত অতিরিক্ত খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করে।
সম্পর্ক ভাঙার কষ্ট সত্যি। সেটাকে ছোট করে দেখার কোনো দরকার নেই। কিন্তু সেই কষ্ট সামলাতে যদি আপনি বারবার অস্বাস্থ্যকর খাবারের ওপর নির্ভর করেন, তাহলে শরীর ও মন দুটোই আরও ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারে। তাই দরকার নিজের আবেগকে বোঝা, খাবারের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুনভাবে দেখা এবং কিছু বাস্তব অভ্যাস তৈরি করা।
আবেগজনিত অতিরিক্ত খাওয়া আসলে কী?

আবেগজনিত অতিরিক্ত খাওয়া হল এমন এক প্রবণতা, যেখানে মানুষ শারীরিক ক্ষুধার কারণে নয়, বরং মন খারাপ, একাকীত্ব, উদ্বেগ, রাগ, অপমান, প্রত্যাখ্যান, হতাশা বা শূন্যতার অনুভূতি সামলাতে খাবার খায়।
ধরা যাক, আপনার রাতের খাবার হয়ে গেছে। পেট ভরা। তবু হঠাৎ পুরনো কোনো ছবি দেখলেন, সম্পর্কের স্মৃতি ফিরে এল, মন খারাপ হল। কিছুক্ষণ পর আপনি ফ্রিজ খুলে আইসক্রিম বের করলেন বা মোবাইল থেকে পিৎজা অর্ডার করলেন। শরীরের ক্ষুধা ছিল না। ছিল মনের অস্বস্তি। এই জায়গাটাই আবেগজনিত খাওয়া।
এখানে খাবার সমস্যা নয়। সমস্যা হল খাবারকে আবেগ সামলানোর একমাত্র উপায় বানিয়ে ফেলা। মাঝে একদিন পিৎজা খেলে ক্ষতি নেই। কিন্তু প্রতিবার মন খারাপ হলেই যদি অতিরিক্ত মিষ্টি, ভাজাভুজি বা প্যাকেটজাত খাবারে ভরসা করতে হয়, তাহলে সেটা ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে যায়।
সম্পর্ক ভাঙার পর কেন বেশি খেতে ইচ্ছে করে?
মানসিক আঘাতের পর শরীরের চাপ-প্রতিক্রিয়া সক্রিয় হয়। এই অবস্থায় কর্টিসল নামে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বাড়তে পারে। চাপ বাড়লে অনেকের চিনি, চর্বি ও বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়ে। কারণ এই ধরনের খাবার মস্তিষ্কের আনন্দ-প্রতিক্রিয়াকে অল্প সময়ের জন্য উদ্দীপিত করতে পারে।
চকলেট, পিৎজা বা আইসক্রিম খেলে সাময়িকভাবে মেজাজ একটু হালকা লাগতে পারে। কিন্তু এই স্বস্তি বেশিক্ষণ থাকে না। কিছু সময় পর আবার মন খারাপ ফিরে আসে। তার সঙ্গে যোগ হয় ভারী লাগা, আলস্য, অপরাধবোধ, নিজের ওপর রাগ এবং আবার খাওয়ার ইচ্ছে। ফলে একটি চক্র তৈরি হয়।
এই চক্রটা সাধারণত এমন হয়—
মন খারাপ হল।
খেতে ইচ্ছে করল।
অস্বাস্থ্যকর খাবার খেলেন।
কিছু সময় ভালো লাগল।
তারপর অপরাধবোধ হল।
আবার মন খারাপ বাড়ল।
আবার খাওয়ার ইচ্ছে হল।
এই চক্র ভাঙার জন্য প্রথমেই দরকার বোঝা, আপনি সত্যিই ক্ষুধার্ত কি না।
শরীরের ক্ষুধা আর মনের ক্ষুধার পার্থক্য কীভাবে বুঝবেন?
শরীরের ক্ষুধা ধীরে ধীরে আসে। পেট খালি লাগে। সাধারণ খাবারও খেতে ইচ্ছে করে। ভাত, ডাল, ডিম, সবজি, ফল—যে কোনো পুষ্টিকর খাবার খেলে তৃপ্তি আসে।
মনের ক্ষুধা হঠাৎ আসে। খুব নির্দিষ্ট খাবার খেতে ইচ্ছে করে। যেমন শুধু চকলেট, শুধু পিৎজা, শুধু মিষ্টি, শুধু চিপস। পেট ভরা থাকলেও খেতে ইচ্ছে করে। খাওয়ার পর তৃপ্তির বদলে অনেক সময় লজ্জা বা অপরাধবোধ হয়।
নিজেকে জিজ্ঞেস করুন—
আমি শেষ কখন খেয়েছি?
আমার পেট খালি লাগছে, নাকি মন অস্থির লাগছে?
আমি এখন ভাত-ডাল বা ফল খেতে রাজি আছি?
না কি শুধু চকলেট বা ভাজাভুজিই চাই?
খাওয়ার পর আমার ভালো লাগবে, নাকি অপরাধবোধ হবে?
এই প্রশ্নগুলো সহজ, কিন্তু খুব কার্যকর। কারণ এগুলো আপনাকে নিজের আবেগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে।
মন ভাঙার পর অতিরিক্ত খাওয়া কি সব সময় খারাপ?
না। মানুষ আবেগী প্রাণী। কষ্টের দিনে পছন্দের খাবার খেলে তা সব সময় অস্বাস্থ্যকর নয়। কোনো বন্ধুর সঙ্গে বসে এক কাপ চা, সামান্য মিষ্টি বা পছন্দের খাবার খাওয়া অনেক সময় মানসিক স্বস্তির অংশ হতে পারে।
সমস্যা তখনই, যখন—
খাবারের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
বারবার অতিরিক্ত খেয়ে ফেলেন।
খাওয়ার পর অপরাধবোধ হয়।
লুকিয়ে খেতে শুরু করেন।
শরীর খারাপ লাগলেও থামতে পারেন না।
মন খারাপ মানেই খাবার হয়ে যায়।
অর্থাৎ লক্ষ্য খাবারকে শত্রু বানানো নয়। লক্ষ্য হল খাবারের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক তৈরি করা।
১. খাবার মুখে দেওয়ার আগে ৫ সেকেন্ড থামুন
মন খারাপের মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কৌশল হল থামা। খুব বেশি সময় নয়। মাত্র ৫ সেকেন্ড।
যখনই চকলেট, পিৎজা, চিপস বা আইসক্রিম খেতে তীব্র ইচ্ছে করবে, সঙ্গে সঙ্গে খাবার মুখে দেবেন না। থামুন। গভীর শ্বাস নিন। তারপর নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, “আমি কি সত্যিই ক্ষুধার্ত, নাকি আমি কষ্ট পাচ্ছি?”
এই ছোট বিরতি মস্তিষ্ককে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় দেয়। আবেগের ঢেউ সাধারণত খুব তীব্র হলেও স্থায়ী নয়। আপনি যদি কয়েক সেকেন্ড নিজেকে থামাতে পারেন, তাহলে অনেক সময় খাবারের তাড়না কিছুটা কমে আসে।
চাইলে একটি সহজ নিয়ম করতে পারেন—
প্রথমে জল খান।
তারপর ৫ সেকেন্ড থামুন।
তারপর নিজের অনুভূতির নাম দিন।
যেমন, “আমি এখন একা লাগছে”, “আমি অপমানিত বোধ করছি”, “আমি রাগ করছি”, “আমি ভয় পাচ্ছি”।
অনুভূতির নাম দেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নামহীন কষ্টকে আমরা অনেক সময় খাবার দিয়ে চেপে রাখতে চাই। কিন্তু যখন আপনি বুঝতে পারেন কষ্টটা আসলে কী, তখন খাবারের বদলে অন্য সমাধান খোঁজা সহজ হয়।
২. নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খান, না হলে লোভ আরও বাড়বে
অনেকে সম্পর্ক ভাঙার পর ঠিকমতো খাওয়া বন্ধ করে দেন। সকালে কিছু খান না, দুপুরে অল্প খান, তারপর রাতে হঠাৎ প্রচণ্ড ক্ষুধা পেয়ে যায়। তখন যা সামনে থাকে, সেটাই খেয়ে ফেলেন। এই অভ্যাস আবেগজনিত খাওয়াকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
শরীর যদি সারাদিন পর্যাপ্ত খাবার না পায়, তাহলে সন্ধ্যা বা রাতে বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবারের প্রতি টান বাড়তে পারে। তাই মন খারাপ থাকলেও নিয়মিত খাবার দরকার।
খাবারে রাখুন—
ভাত বা রুটি
ডাল
ডিম, মাছ, মুরগি বা পনির
শাকসবজি
টক দই
ফল
বাদাম বা ভাজা ছোলা
পর্যাপ্ত জল
সকালের খাবার বাদ দেবেন না। এতে রক্তে শর্করার ওঠানামা বাড়তে পারে এবং দিনের শেষে মিষ্টি বা ভাজাভুজির লোভ বেশি হতে পারে।
একটি সহজ প্লেট নিয়ম মানতে পারেন। প্লেটের অর্ধেক রাখুন শাকসবজি বা সালাদ, এক-চতুর্থাংশ রাখুন প্রোটিন, আর এক-চতুর্থাংশ রাখুন ভাত, রুটি বা অন্য শর্করাজাতীয় খাবার। এতে পেট ভরবে, শক্তি থাকবে, আবার অকারণ খাবারের লোভও কিছুটা কমবে।
৩. অস্বাস্থ্যকর খাবার চোখের সামনে রাখবেন না
মানুষ শুধু ইচ্ছাশক্তি দিয়ে সব সময় খাবারের লোভ সামলাতে পারে না। পরিবেশও বড় ভূমিকা রাখে। আপনার টেবিলে যদি চিপসের প্যাকেট থাকে, ফ্রিজে কোল্ড ড্রিঙ্ক থাকে, মোবাইলে খাবার অর্ডারের ছাড়ের বার্তা আসে, তাহলে দুর্বল মুহূর্তে নিজেকে সামলানো কঠিন হবে।
তাই নিজের পরিবেশকে একটু বদলান।
ঘরে বড় প্যাকেট চিপস রাখবেন না।
রাতে একা থাকলে খাবার অর্ডার করার অ্যাপ খুলবেন না।
ফ্রিজে কোল্ড ড্রিঙ্কের বদলে জল বা ঘোল রাখুন।
মিষ্টি কিনলে অল্প পরিমাণে কিনুন।
বিছানায় বসে খাবেন না।
মোবাইল দেখতে দেখতে খাবেন না।
এর বদলে হাতের কাছে রাখুন—
ফল
বাদাম
ভাজা ছোলা
মাখানা
টক দই
ঘরে তৈরি ঝালমুড়ি
সেদ্ধ ছোলা
শসা, গাজর, লেবু
অল্প পরিমাণ ডার্ক চকলেট
মনে রাখবেন, লক্ষ্য নিজেকে শাস্তি দেওয়া নয়। লক্ষ্য হল এমন ব্যবস্থা করা, যাতে দুর্বল মুহূর্তে ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
৪. মন খারাপ হলে খাবারের বদলে বিকল্প কাজ বেছে নিন
যখন মন খুব খারাপ থাকে, তখন “খাব না” বললেই কাজ হয় না। কারণ মস্তিষ্ক তখন সান্ত্বনা চাইছে। তাই খাবারের বদলে অন্য সান্ত্বনার পথ তৈরি করতে হবে।
আপনি একটি “মন খারাপের তালিকা” বানিয়ে রাখতে পারেন। সেখানে লিখুন, মন খারাপ হলে খাবারের বদলে কী করবেন।
যেমন—
১০ মিনিট হাঁটব।
বন্ধুকে বার্তা পাঠাব।
গান শুনব।
ডায়েরিতে লিখব।
গরম জলে স্নান করব।
ঘর গুছিয়ে নেব।
শ্বাসের ব্যায়াম করব।
মায়ের সঙ্গে বা বিশ্বাসযোগ্য কারও সঙ্গে কথা বলব।
পুরনো ছবি দেখা বন্ধ করব।
সামাজিক মাধ্যমে প্রাক্তন মানুষটির খোঁজ করা থেকে বিরত থাকব।
এই ছোট কাজগুলো খাবারের মতো দ্রুত আনন্দ না দিলেও আবেগের ঢেউ কাটাতে সাহায্য করে।
বিশেষ করে ডায়েরি লেখা খুব কার্যকর হতে পারে। লিখুন—
আজ কী অনুভব করছি?
কোন ঘটনা আমাকে নাড়া দিল?
আমি এখন কী খেতে চাইছি?
খাবার ছাড়া আর কীভাবে নিজেকে শান্ত করতে পারি?
এই অভ্যাস আপনাকে নিজের আবেগের ধরন চিনতে সাহায্য করবে।
৫. হাঁটা, ব্যায়াম ও শ্বাসনিয়ন্ত্রণকে দৈনন্দিন অভ্যাস করুন
মন খারাপের সময় ব্যায়াম করার কথা শুনতে বিরক্তিকর লাগতে পারে। কিন্তু শরীর নড়লেই মস্তিষ্কের রাসায়নিক পরিবেশ বদলাতে শুরু করে। হাঁটা, যোগব্যায়াম, সাইকেল চালানো, হালকা দৌড়, নাচ, বাড়ির কাজ—সবই কাজে আসতে পারে।
প্রতিদিন জিমে গিয়ে কঠিন ব্যায়াম করতেই হবে, এমন নয়। শুরু করুন ১০ মিনিট দিয়ে। বাড়ির ছাদে হাঁটুন। পাড়ার গলিতে হাঁটুন। ঘরে গান চালিয়ে নড়াচড়া করুন। ধীরে ধীরে সময় বাড়ান।
শ্বাসনিয়ন্ত্রণও সাহায্য করতে পারে। একটি সহজ পদ্ধতি চেষ্টা করুন—
চার গুনে শ্বাস নিন।
চার গুনে শ্বাস ধরে রাখুন।
ছয় গুনে শ্বাস ছাড়ুন।
এভাবে পাঁচ বার করুন।
এতে স্নায়ুতন্ত্র কিছুটা শান্ত হতে পারে। মন শান্ত হলে আবেগের চাপে খাওয়ার তাড়নাও কমে।
প্রকৃতির সংস্পর্শ কেন সাহায্য করতে পারে?
প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটালে মন অনেক সময় ধীরে ধীরে স্থির হয়। গাছপালা দেখা, খোলা আকাশের নিচে হাঁটা, পার্কে বসা, ভোরের আলোয় কিছুক্ষণ থাকা—এসব অভ্যাস উদ্বেগ ও চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
ঘাসের ওপর খালি পায়ে হাঁটার অভ্যাস অনেকে পছন্দ করেন। কেউ একে মাটির সংস্পর্শচর্চা বলেন। তবে এটিকে অলৌকিক চিকিৎসা ভাবা ঠিক নয়। বরং এটিকে একটি সহজ জীবনযাত্রাগত অভ্যাস হিসেবে দেখা ভালো। খোলা বাতাস, সূর্যের আলো, হাঁটা, নীরবতা এবং প্রকৃতির দৃশ্য—সব মিলিয়ে মনকে কিছুটা স্থির করতে পারে।
প্রতিদিন সম্ভব না হলে সপ্তাহে কয়েক দিন ২০ মিনিট প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটানোর চেষ্টা করুন। মোবাইল ছাড়া হাঁটুন। কোনো গান নয়, কোনো ফোনকল নয়। শুধু হাঁটুন, শ্বাস নিন, চারপাশ দেখুন। এই নীরব সময় অনেকের ক্ষেত্রে আবেগ সামলাতে সাহায্য করে।
পুষ্টি ও মনের সম্পর্ক বুঝুন
শরীর ও মন আলাদা নয়। আপনি কী খাচ্ছেন, কতটা ঘুমোচ্ছেন, জল কতটা খাচ্ছেন, এগুলো মনের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন না থাকলে পেট দ্রুত খালি লাগে। ফলে বারবার খেতে ইচ্ছে করে। আবার অতিরিক্ত মিষ্টি খেলে রক্তে শর্করার ওঠানামা হতে পারে, যার ফলে কিছু সময় পর ক্লান্তি ও বিরক্তি বাড়তে পারে।
মন ভালো রাখার জন্য কোনো একক “জাদু খাবার” নেই। কিন্তু সামগ্রিকভাবে পুষ্টিকর খাবার মেজাজ ও শক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করে।
খাদ্যতালিকায় রাখুন—
ডাল, ছোলা, রাজমা
ডিম, মাছ, মুরগি বা পনির
টক দই বা ঘোল
লেবু, পেয়ারা, কমলালেবু
সবুজ শাক
বাদাম ও বীজ
ওটস বা লাল চাল
পর্যাপ্ত জল
অন্ত্রের স্বাস্থ্যও গুরুত্বপূর্ণ। পেটের সমস্যা, কোষ্ঠকাঠিন্য বা অস্বস্তি থাকলে মনও খারাপ থাকতে পারে। তাই আঁশযুক্ত খাবার, জল এবং ঘরে তৈরি সহজ খাবারের দিকে জোর দিন।
ঘুম কম হলে খাবারের লোভ বাড়তে পারে
ব্রেকআপের পর ঘুম নষ্ট হওয়া খুব সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু ঘুম কম হলে শরীরের ক্ষুধা ও তৃপ্তির সংকেতেও প্রভাব পড়ে। তখন মিষ্টি, ভাজাভুজি বা বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবারের লোভ বাড়তে পারে।
রাতে ঘুমের আগে কয়েকটি নিয়ম মানুন—
বিছানায় গিয়ে পুরনো বার্তা পড়বেন না।
ঘুমের অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল দূরে রাখুন।
রাতে ভারী খাবার কম খান।
ক্যাফেইন কমান।
ঘর অন্ধকার ও শান্ত রাখুন।
ঘুম না এলে বিছানায় পড়ে থেকে সামাজিক মাধ্যম দেখবেন না।
ঘুম ঠিক হলে আবেগ নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই সহজ হয়। মন স্থির থাকে, খাবারের সিদ্ধান্তও ভালো হয়।
সামাজিক মাধ্যম থেকে একটু দূরে থাকুন
সম্পর্ক ভাঙার পর অনেকেই বারবার প্রাক্তন মানুষটির ছবি, নতুন পোস্ট বা অনলাইন উপস্থিতি দেখতে থাকেন। এতে পুরনো কষ্ট বারবার নতুন করে জেগে ওঠে। তারপর সেই অস্বস্তি সামলাতে খাবারের দিকে হাত যায়।
তাই কিছুদিন সামাজিক মাধ্যমের সীমা ঠিক করুন। দরকার হলে মিউট করুন, আনফলো করুন, নোটিফিকেশন বন্ধ করুন। এটি শিশুসুলভ আচরণ নয়। এটি নিজের মনের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সীমারেখা।
নিজেকে বারবার আঘাত দিয়ে তারপর খাবার দিয়ে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চক্র থেকে বেরোতে হলে এই সীমারেখা জরুরি।
পরিবার ও বন্ধুর সঙ্গে কথা বলা কেন জরুরি?
একাকীত্ব আবেগজনিত খাওয়ার বড় কারণ। আপনি যখন কাউকে কিছু বলতে পারেন না, তখন খাবারই সহজ সঙ্গী হয়ে ওঠে। কিন্তু খাবার শুনতে পারে না, বোঝে না, পাশে বসে থাকে না। মানুষ পারে।
বিশ্বাসযোগ্য একজন মানুষ বেছে নিন। সব কথা বলতে হবে না। শুধু বলতে পারেন, “আমি ভালো নেই। একটু কথা বলবি?”
মানসিক সমর্থন কর্টিসলের চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। কারও পাশে থাকা, কেউ বিচার না করে শুনছে—এই অনুভূতি নিজেই আরাম দেয়। এতে খাবারের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে।
কখন বিষয়টি গুরুতর ধরে সাহায্য নেবেন?
সব মনখারাপ নিজের চেষ্টায় সামলানো যায় না। কিছু লক্ষণ থাকলে মনোবিদ, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা প্রশিক্ষিত পরামর্শদাতার সঙ্গে কথা বলা জরুরি।
যেমন—
আপনি প্রায় প্রতিদিন অতিরিক্ত খেয়ে ফেলছেন।
খাওয়ার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছেন।
পেট ভরে গেলেও থামতে পারছেন না।
লুকিয়ে খাচ্ছেন।
খাওয়ার পর খুব লজ্জা বা অপরাধবোধ হচ্ছে।
খাবার নিয়ে সারাক্ষণ চিন্তা করছেন।
ওজন নিয়ে ভয় বা ঘৃণা তৈরি হচ্ছে।
ইচ্ছে করে বমি করছেন বা ক্ষতিকর উপায়ে খাবার বের করার চেষ্টা করছেন।
ঘুম, কাজ, পড়াশোনা বা সম্পর্কের ওপর প্রভাব পড়ছে।
নিজের ক্ষতি করার চিন্তা আসছে।
এই অবস্থায় দেরি করবেন না। সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়। বরং নিজের জীবনকে গুরুত্ব দেওয়ার লক্ষণ।
ভারতে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার জন্য সরকারি টেলি মানস পরিষেবায় ১৪৪১৬ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়। জরুরি বিপদের আশঙ্কা থাকলে স্থানীয় জরুরি পরিষেবা, নিকটবর্তী হাসপাতাল বা বিশ্বাসযোগ্য পরিবারের সদস্যের সাহায্য নিন।
একটি সহজ সাত দিনের পরিকল্পনা
আপনি চাইলে নিচের সাত দিনের ছোট পরিকল্পনা দিয়ে শুরু করতে পারেন।
প্রথম দিন
ঘরে থাকা অস্বাস্থ্যকর খাবারের তালিকা করুন। কোন খাবার দুর্বল মুহূর্তে বেশি খেয়ে ফেলেন, তা লিখুন।
দ্বিতীয় দিন
নিয়মিত তিন বেলার খাবারের সময় ঠিক করুন। অন্তত এক বেলায় ডাল, ডিম বা অন্য প্রোটিন রাখুন।
তৃতীয় দিন
৫ সেকেন্ড বিরতির অভ্যাস শুরু করুন। কিছু খাওয়ার আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, “এটা শরীরের ক্ষুধা, নাকি মনের ক্ষুধা?”
চতুর্থ দিন
১০ মিনিট হাঁটুন। হাঁটার সময় ফোন দেখবেন না।
পঞ্চম দিন
মন খারাপের তালিকা তৈরি করুন। খাবারের বদলে পাঁচটি বিকল্প কাজ লিখুন।
ষষ্ঠ দিন
একজন বন্ধুকে বা পরিবারের কাউকে নিজের অবস্থার কথা বলুন।
সপ্তম দিন
সপ্তাহের অভিজ্ঞতা লিখুন। কোন সময়ে বেশি খেতে ইচ্ছে করেছে? কোন কৌশল কাজ করেছে? কোথায় সাহায্য দরকার?
এই পরিকল্পনা নিখুঁতভাবে মানতেই হবে, এমন নয়। লক্ষ্য হল শুরু করা।
কী খাবেন যখন মন খারাপের সময় কিছু খেতে ইচ্ছে করছে?
খেতে ইচ্ছে করলেই নিজেকে পুরোপুরি আটকাতে যাবেন না। এতে উল্টো লোভ বাড়তে পারে। বরং তুলনামূলক ভালো বিকল্প বেছে নিন।
চিপসের বদলে ভাজা ছোলা বা মাখানা।
কোল্ড ড্রিঙ্কের বদলে লেবু জল বা ঘোল।
বড় পিৎজার বদলে ঘরে তৈরি সবজি দেওয়া স্যান্ডউইচ।
আইসক্রিমের বদলে টক দইয়ের সঙ্গে ফল।
অতিরিক্ত মিষ্টির বদলে অল্প ডার্ক চকলেট।
রাতের ভাজাভুজির বদলে ডিমসেদ্ধ, শসা, গাজর বা স্যুপ।
মনে রাখবেন, খাবারকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করলে অনেক সময় তা আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। তাই পরিমাণ, সময় এবং প্রসঙ্গ—এই তিনটি জিনিস গুরুত্বপূর্ণ।
নিজেকে দোষ দেবেন না
একদিন বেশি খেয়ে ফেললে নিজেকে দোষ দেবেন না। বলবেন না, “আমি কিছুই পারি না।” বরং দেখুন, কী ঘটেছিল।
কোন অনুভূতি ছিল?
কোন স্মৃতি জেগেছিল?
সারাদিন ঠিকমতো খেয়েছিলেন কি?
ঘুম কম হয়েছিল কি?
একাকীত্ব বেশি ছিল কি?
প্রতিটি ভুল আসলে তথ্য দেয়। সেই তথ্য দিয়ে পরের দিন ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।
শেষ কথা
সম্পর্ক ভাঙার কষ্ট গভীর। এই কষ্টকে হালকা করে দেখা ঠিক নয়। কিন্তু সেই কষ্ট থেকে পালাতে চকলেট, পিৎজা, আইসক্রিম বা ভাজাভুজির ওপর ভরসা করলে স্বস্তি সাময়িক হবে, ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।
খাবার মুখে দেওয়ার আগে ৫ সেকেন্ড থামা, নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, অস্বাস্থ্যকর খাবারের সহজলভ্যতা কমানো, হাঁটা ও শ্বাসনিয়ন্ত্রণের অভ্যাস করা, প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকা এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সাহায্য নেওয়া—এই কয়েকটি পদক্ষেপ ধীরে ধীরে আবেগজনিত অতিরিক্ত খাওয়ার চক্র ভাঙতে সাহায্য করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা, নিজেকে ঘৃণা করবেন না। আপনি কষ্ট পাচ্ছেন, তাই সাহায্য দরকার। খাবার দিয়ে কষ্ট ঢাকার বদলে কষ্টটাকে বোঝার চেষ্টা করুন। ধীরে ধীরে শরীরের যত্ন নিন, ঘুম ঠিক করুন, মানুষের সঙ্গে কথা বলুন, নিজের প্রতি নরম হোন।
মন ভাঙা জীবনের শেষ নয়। অনেক সময় সেটাই নিজের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ার শুরু।


